#যদি_হঠাৎ_ইচ্ছে_হয়
#পর্ব_১৫
#Saji_Afroz
ফুয়াদের সামনে বসে রয়েছে দিশা। ফুয়াদ ওকে এত বোঝানোর পরেও রাদিনকে ছাড়তে ও রাজি নয়। ফুয়াদ বলল, একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের দু:খ কী তুমি বুঝছ না দিশা! এটা আমি আশা করিনি তোমার থেকে।
-আইরার সাথে ওর সম্পর্ক শেষ! ও কেন বুঝছে না? রাদিন এখন আমায় ভালোবাসে। সরে যেতে বলুন ওকে। যেই সম্পর্কে ভালোবাসা নেই সেই সম্পর্কে থেকে লাভ কী?
-আইরা এখন সবটা ঠিক করতে চায়। হয়তো সব জেনে রাদিনও রাজি হবে?
-এটা কখনোই হবে না।
-তবে রাদিনকেই আমরা সব জানাব।
দিশা আঁতকে উঠে। অনুনয় করে বলল, এটা করবেন না প্লিজ! আমি রাদিনকে হারাতে পারব না।
দিশাকে উত্তেজিত হতে দেখে ঘাবড়ায় ফুয়াদ। ও বলল, শান্ত হও তুমি। আমি তোমার ক্ষতি হোক এটা কখনোই চাই না।
-তবে রাদিন যেন কিছু জানতে না পারে। প্লিজ?
ফুয়ার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, আমি জানাব না। আইরা জানালে আমার করার কিছু নেই।
দিশা তাড়াহুড়ো করে উঠে সেখান থেকে চলে যায়। রাদিনকে ফোন করে কালই বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলে।
এদিকে দিশা রাদিনকে ছাড়তে রাজি নয় শুনে আইরার মনে সন্দেহ জাগে। দিশা হয়তো অন্যকিছু ভাবছে। এতকিছুর পরেও ও রাদিনকেই চায় কেন? আসলেই এতটা ভালোবাসে নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে!
দিশা বড্ড জেদ করছে। ওর জেদ এভাবে কথার মাধ্যমে ভাঙা সম্ভব নয়। তাই অন্য কিছু আইরাকেও ভাবতে হবে। আইরা সারারুমে পায়চারি করতে শুরু করে। একটা বুদ্ধি ওর মাথায় আসে।
রাইদার ফোন থেকে একবার আইরাকে কল করেছিল রাদিন। আইরা ওর ফোন নাম্বার সেইভ করে রেখেছিল। আজ রাইদাকে ফোন দেয় আইরা৷ নিজের পরিচয় দিলে রাইদা অবাক হয়ে বলল, আপনি কেন হঠাৎ?
-তোমার মা এর সঙ্গে আমার কিছু কথা রয়েছে। আমি তোমার বাসায় আসতে চাই। কিন্তু রাদিন না থাকা কালীন।
-কিন্তু কেন?
-খুব প্রয়োজন। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে সাহায্য করো প্লিজ।
-ভাইয়ার সঙ্গে আপনার ডিভোর্স হচ্ছে শুনলাম। আপনি কী সেটা চান না?
-না চাইলে ঘটনা এতদূর আসতো না।
-তবে?
-যা জানাতে চাইছি তা এখানে না এসে বলাটা সম্ভব নয়।
রাইদা একটু ভেবে বলল,
ঠিক আছে। ভাইয়া বাড়িতে না থাকা অবস্থায় আপনাকে জানাব আমি।
দিশাকে রাইদার পছন্দ। কিন্তু ওর মা এর কার্যকলাপ একেবারেই পছন্দ নয় ওর। আর মা এর ইশারায় দিশা উঠে বসে। বিয়ের আগেই সে মেয়ে কোটি টাকা খরচা করে ফেলছে, সে বিয়ের পরে সবাইকে পথে বসাবে না কী গ্যারান্টি!
আইরা কী বলতে চায় একবার শুনেই দেখুক। ও এখনো রাদিনের স্ত্রী। ওর অধিকার আছে এই বাড়িতে আসার৷ সেই অধিকার থেকে ওকে বঞ্চিত করার রাইদা কেউ নয়। তাই ও আইরাকে সাহায্য করবে জানায়।
আজ আর রাদিন বেরুলো না। তাই আইরাকে আসতে বলতে পারেনি রাইদা৷ একথা আইরাকে জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ও।
আজ রাদিন ও দিশার বিয়ে। দিশার জেদের কারণেই কোর্টে বিয়ের আয়োজন করে ও। কয়েক জন বন্ধু সাক্ষী হিসেবে তৈরী করে। দিশার এই তাড়ার কারণ অজানা রাদিনের। তবে ও এতটুকু বুঝতে পারছে, রাদিনের সঙ্গে দিশা ওর আভিজাত্য টাকেও ভালোবাসে। যেটা ও আইরার মধ্যে দেখেনি। আইরা! হঠাৎ আইরার কথা ভাবছে কেন ও? নাহ, সবটা মাথা থেকে ঝেড়ে ও বাড়ির বাইরে পা রাখে। দিশাকে নিজের করে পাচ্ছে। এটাই তো ওর জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাওয়া হবে!
হালকা গোলাপি রঙের একটি শাড়ি পরেছে দিশা। মাথায় দিয়েছে সাদা ঘোমটা। তাড়াহুড়ো করে এই শাড়িটা রাদিনের কাছ থেকে টাকা চেয়ে কিনেছে ও। হতে পারে গোপনের বিয়ে৷ তবুও বউ কী সাজবে না? সাদামাটা বিয়ে তাই সাদামাটা বউ সেজেছে ও। পার্লারের সামনে থেকে রাদিনের গাড়িতে উঠে বসে ও। ওকে দেখে যেন চোখ ফেরাতে পারছে না রাদিন।
দিশা বলল, এই যে! গাড়িটা চালাতে শুরু করুন।
-তার আগে ভাবছি একটা হোটেলের রুম বুকিং করি।
দিশা নিজের হাতে থাকা চুড়ি গুলো ঠিক করতে করতে বলল, সেসব কাবিনের টাকা হাতে পাওয়ার পরে হবে। এখন আপাতত বিয়েটাই হচ্ছে।
-আর টাকা না দিলে?
-আইরা যেভাবে তোমাকে হারিয়েছে তুমিও আমায় হারাবে।
ওর কথা শুনে রাদিনের ভ্রু কুচকে যায়। এই দিশাকে যেন ও চেনে না। মানুষ এত দ্রুত বদলায় কিভাবে!
রাহাত খান ও হাসিনার সামনে বসে রয়েছে আইরা ও রাইদা। আজ রাদিন বাসায় না থাকাকালীন সুযোগ বুঝে আইরাকে এখানে আসতে বলে ও। আইরা এসে ওদের নিজের প্রেগ্ন্যাসির কথা জানায়। একথা শুনে হাসিনা খান অবাক হয়ে বললেন, এতদিন তুমি একথা গোপন রেখেছ?
-ঘৃণা কাজ করেছিল মনে। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। আমার বাচ্চার বাবাকে আমি হারাতে পারি না। আমার জীবনে ওকে আমার চাই।
রাহাত খান বললেন, কিন্তু সে এখন দিশার প্রেমে অন্ধ।
-আপনারা চাইলে এটা করা থেকে ওকে আটকাতে পারেন! একবার বলেই দেখুন না, সব সম্পত্তির মালিক হবে এই বাচ্চা। তখন রাদিন কী করে দেখুন!
হাসিনা খান বললেন, তুমি কী এজন্যই এসেছ?
-এমন হলে আরও আগে আসতাম আমি। আমার কিছুই চাই না। আমি তা দলিলে লিখে দিতে পারি। শুধুমাত্র রাদিনকে আটকানোর জন্য এমনটা আমি বলতে বলছি।
হাসিনা খান একটু থেমে বললেন, সবকিছু এই বাচ্চারই প্রাপ্য। দিশার নয়! তুমিই তো আমার পুত্রবধূ। আর তোমার গর্ভে রাদিনের সন্তান। এটা ভেবে অনেক খুশি লাগছে যে, আমি দাদি হতে চলেছি! আমার নাতী বা নাতনীকে কে আমি ওর অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে দিতে পারি না! এখুনিই রাদিনকে এখানে ডাকছি আমি!
এই বলে ফোন আনতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যান তিনি। আইরার মুখে হাসি ফোটে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা! রাদিন কাকে বেছে নেবে? অনাগত সন্তান নাকি দিশা!
কোর্টে চলে আসে দিশা ও রাদিন। একজন সাক্ষী এখনো আসেনি। তারই অপেক্ষা করছে ওরা। ও এলেই বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
দিশা মনমরা হয়ে বসে রয়েছে। আসার সময় পথিমধ্যে ওদের গাড়ির সামনে একজন মহিলা চলে এসেছিল। গাড়ি থামিয়ে ওরা নেমে পড়ে। মহিলার স্বামী এসে রাদিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানায়, মহিলাটি পাগলপ্রায়। তাই এভাবে মাঝেমধ্যেই নিজেকে শেষ করতে চায়। কারণ হিসেবে বলেছিল, ওর সন্তান মারা গেছে। এখন আর সন্তান হয় না। ডাক্তারও সম্ভব না জানিয়ে দিয়েছে।
দিশা শান্তনা দিয়ে বলেছিল আশা না ছাড়তে। তখন মহিলাটি কান্না করে জানায়, অন্যের সংসার ভাঙার শাস্তি ও পাচ্ছে। সেই মেয়ের অভিশাপে আজ ওর এই দশা।
ব্যস! এই কথা শোনার পর থেকে দিশার মনেও অজানা এক ভয় কাজ করছে। আইরা ওকে বলেছে ওর সংসারটা বাঁচাতে সাহায্য করতে। কিন্তু ও সবার কাছ থেকে লুকিয়ে বিয়ে করতে এসেছে। কাজটা কী ও ঠিক করছে!
এদিকে রাদিনের ফোনে বেশ কয়েকবার মা এর ফোন আসলেও ও রিসিভ করছে না। বিয়ের আগে মেজাজটা আর খারাপ করতে চায় না। আজকাল মা ভালো কথা বলেই বা কখন!
সাক্ষী চলে আসে। দিশা ও রাদিনকে ভেতরে নেওয়া হয়। দুজন মালা নিয়ে সামনাসামনি দাঁড়ায়। জীবনের নতুন এক পর্বে প্রবেশ করতে চলেছে ওরা!
.
চলবে