#রহমত
#পর্বঃ০২(শেষ পর্ব)
#Tabassum_Khondokar
-“তুমি কি ভুলে গেছো,বাংলাদেশ এর আইন অনুযায়ী ছেলেদের বিয়ের বয়স একুশ ধার্য করা হয়েছে?”
সামনে মাথা নত করে দাঁড়ানো শুভ কে উদ্দ্যেশ্য করে-ই কথা টা বলে উঠে উর্মির বাবা উমায়ের খন্দকার।উমায়ের খন্দকার এর কথা টা কানে এসে পৌঁছাতে-ই মাথা তুলে তাকায় শুভ।কিছুক্ষণ মৌনতা নিয়ে থেকে নিজ মনে কথা সাজিয়ে নেয়।সাজানো যখন শেষ তখনি কথা বলার জন্য উদ্যত হয়।জিহ্বা দ্বারা দুই ওষ্ঠ ভিজিয়ে নেয়।সাহস সঞ্চয় করে বলে,
-“আল্লাহর রহমতে আমার জ্ঞান-বুদ্ধি এখনো সচল আঙ্কেল।ছেলেদের বিয়ের বয়স যে একুশ সেটা আমি ও জানি।এবং কি পথি মধ্যে বাংলাদেশ সরকার একবার সিদ্ধান্ত নেয় মেয়ে দের বিয়ের বয়স ষোলো এবং ছেলে দের বিয়ের বয়স আঠারো করার।কিন্তু সাধারণ জনগণ সেটা মানতে নারাজ।তারা কোনো মতে-ই এই আইন মেনে নিতে চাইছে না বিধায় এই আইন আর জারীকৃত হয়নি।সাবেক আইন,সংবিধান অনুযায়ী মেয়ে দের বিয়ের বয়স আঠারো এবং ছেলে দের একুশ বছর এই টা-ই নির্ধারিত থাকে।কিন্তু আঙ্কেল আমি আবার সরকার এর থেকে ও এক কদম বাড়িয়ে চলতে চাই।তাই সরকার ছেলে দের বিয়ের বয়স আঠারো করতে চেয়েছে।আর আমি সতেরো তে বিয়ে করতে চেয়েছি।অন্তত প্রেম করে গুনাহ কামাই করতে চাইছি না।আপনি চিন্তা করবেন না আঙ্কেল প্রেম নামক যিনায় লিপ্ত না হয়ে যদি বিয়ে টা করি আল্লাহ রহমত দান করবে।কুরানুল কারীমে স্পষ্ট বলা আছে যে,
‘‘চরিত্র রক্ষার জন্য যারা বিয়ে করবে,তারা যদি অভাবী ও হয়।আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের কে অভাব মুক্ত করে দিবেন।’’-(সূরা;-আন-নূর,আয়াত-৩২)
এর পরে ও আপনি কিসের চিন্তা করছেন আঙ্কেল?আল্লাহর রহমতে আপনার মেয়ে সুখে থাকবে আঙ্কেল।আমরা যিনায় জড়াতে চাইনি।তাই বিয়ের অনুমতি নিতে এসেছি আপনার কাছে।আমরা বিয়ে করতে চাই।এখন আপনি হ্যাঁ বলে দিলে-ই আলহামদুলিল্লাহ।
এতক্ষণে কথা গুলো বলে থামে শুভ।এতক্ষণ সাহস নিয়ে কথা গুলো বললে ও এখন উর্মির বাবার উত্তর কি হবে এটা ভেবে-ই মোটামুটি ভ’য়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।পাশের ডাইনিং টেবিল এর উপরে রাখা পানি ভর্তি গ্লাস টা হাতে নিয়ে নেয় শুভ।বসে পড়ে একটা চেয়ার পেতে।”বিসমিল্লাহ্” বলে-ই তিন নিশ্বাসে পানি গলাধঃকরণ করে।পানি পান শেষ হতে-ই উঠে এসে আবার উমায়ের খন্দকার এর সামনে দাঁড়ায়।উমায়ের খন্দকার এখনো নিজের মন কে মানাতে পারেনি।তাই শুভ কে আবার সুধায়,
-“তাই বলে উর্মি’র এত অল্প বয়সে বিয়ে দিবো?”
শুভ হেসে দেয় উমায়ের খন্দকার এর কথা শুনে।হাসি থামিয়ে বলে,
-“উর্মি’র সতেরো বছর বয়সে বিয়ে করতে চাইছে , এটা কে আপনি অল্প বয়স বলছেন আঙ্কেল?আর যারা সাত আট -বছর বয়স এর মেয়ে দের বিয়ে করেছে তাদের কি বলবেন?যেমন,- আয়েশা (রাঃ) এর যখন ছয় বছর তখন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তাকে বিয়ে করে।আয়েশা (আ)সংসার শুরু করে নয় বছর বয়স থেকে।তাছাড়া আরো কিছু বিখ্যাত কবিদের কথা বলছি শুনুন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার স্ত্রীর যখন আট বছর তখন বিয়ে করে,বঙ্কিমচন্দ্র-স্ত্রীর বয়স পাচঁ,দেবেন্দ্রনাথ-স্ত্রীর বয়স ছয়,শিবনাথ শাস্ত্রী-স্ত্রীর বয়স দশ,রাজা ডেনিস-স্ত্রীর বয়স দশ,সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর -স্ত্রীর বয়স সাত,জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর-স্ত্রীর বয়স আট,রাজ নারায়ণ বসু-স্ত্রীর বয়স এগারো। এরা যখন তাদের স্ত্রীর এত অল্প বয়সে বিয়ে করতে পেরেছে তাহলে উর্মি কেন সতেরো বছর বয়সে ও বিয়ে করতে পারবে না আঙ্কেল?আল্লাহর রহমত থাকলে অল্প বয়সে বিয়ে করেও সুখে থাকা যায়।আর আল্লাহর রহমত না থাকলে দেরি করে বিয়ে করলে ও সুখে থাকা যায়না আঙ্কেল। ইসলাম সম্পর্কে আপনি আমার থেকে ও ভালো জানেন আঙ্কেল।তাই আশা করি ভালো বুঝবেন আমি কি বুঝাতে চেয়েছি। ”
উমায়ের খন্দকার কিছুক্ষণ কিছু একটা ভেবেই বলে,
-“আমার মেয়ে যে সুখে থাকবে এই বয়সে বিয়ে করে।তার নিশ্চয়তা কি?তুমি কি তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে?”
শুভ হাসে।একদম সুক্ষ্ণ হাসে।হেসেই উত্তর দেয়,
-“আল্লাহর উপর তায়াক্কুল করে দিন না হয়।আল্লাহ ইংশা আল্লাহ খারাপ রাখবে না।”
এই কথার পর আর কোনো কথা বলার জো খুঁজে পেলেন না উমায়ের খন্দকার। দুই দিন পর শুক্রবার।শুক্রবারে-ই উর্মি খন্দকার আর শুভ হাসান এর বিয়ে হয় ঘরোয়া ভাবে।কয়েকজন মুরব্বি,উমায়ের খন্দকার,শুভ’র বাবা,ভাই এর উপস্থিতি তেই তাদের বিয়ে হয়।বলা বাহুল্য শুভ আগে-ই তার নিজের ফ্যামিলি কে রাজি করিয়ে রেখে ছিলো। আর তার বাবার কারণে-ই সে এই উর্মির বাবার কাছে সাহস করে আসতে পেরেছে।যদিও প্রস্তাব গুরুজন-ই আনে।কিন্তু শুভ’র বাবা প্রথমে উমায়ের খন্দকার কে প্রস্তাব দিতে-ই তিনি নাখোশ করে ফিরিয়ে দেয়।সেই জন্য এবার শুভ নিজে এসেছে।
শুক্রবার রাতে বিয়ে পড়ানো হয় বলে সেই রাতে উর্মি দের বাসায় থেকে যেতে হয় শুভ কে।শনিবার দুপুরে খাওয়ার কাজ সম্পন্ন করে-ই উর্মি কে নিজের বউ এর পরিচয়ে নিয়ে আসে শুভ তাদের বাসায়।এক সাথে-ই তাদের থাকা হয়।বিয়ের চার মাসের শুরুর দিকেই উর্মি কনসিভ করে।এতে প্রথমে উর্মি’র বাবা রে”গে গেলেও পরে চুপ করে যায় মেয়ের সংসারে নিজের বোকামো পূর্ণ রা’গ আর কথা মানায় না এই ভেবে ।দুই জনের সিদ্ধান্ত এই তো নতুন প্রাণ আসতে চলেছে দুনিয়ায়।তবু ও মা ম’রা মেয়ে উর্মি। তাই চিন্তা টা বরাবরা-ই বেশি হচ্ছে।
সময় এইভাবে-ই পার হচ্ছে।আল্লাহর রহমতে ভালো ভাবেই সব কিছু কা’টছে।এর মধ্যে শুভ উর্মি দুই জনের ইন্টার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়,রেজাল্ট ও বের হয়ে যায়।অনার্স ভর্তি হয় দুই জনেই। অনার্স এর ক্লাস শুরু হওয়ার তৃতীয় দিন উর্মি,শুভ’র ছেলে দুনিয়ায় আসে।আর চার দিকে রটিয়ে যায় নানান মসলা মাখানো খবর।চাপা পড়ে হালাল সম্পর্ক এর নামটা।মানুষ কত টা জঘন্য হলে একটা নিষ্পাপ শিশু কে জা’রজ সন্তান বলে সবার কাছে পরিচিত করছে?ঘৃণ্য এই সমাজ।’’
এতক্ষণ পুরনো কথা মন্থন করে এক নাগাড়ে নুফায়ের কাছে উগলে বলে দিচ্ছিলো শুভ।তাদের বিয়ের শুরুর দিক থেকে ছেলে হওয়া পর্যন্ত সমস্ত কিছু নুফায়ের এর কাছে ব্যক্ত করেছে শুভ।
দুই জনে ভার্সিটির মাঠের এক পাশে বেড়ে উঠা কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছের নিচে পাতানো বেঞ্চে বসে-ই এতক্ষণ কথা গুলো বল ছিলো। নুফায়ের এর ক্লাস নেই আজ।ফাস্ট ইয়ার এর একটা ক্লাস নেওয়ার কথা ছিলো।তবে সেটা আজ ছুটি নিয়ে নিয়েছে।অন্য স্যার নিচ্ছে ক্লাস।
নুফায়ের আকাশ এর দিকে তাকায়।ভাবে,”রবের কি অশেষ রহমত প্রতিটা বান্দার উপর।রবের রহমত এর কারণে-ই হয়তো এত দূর পর্যন্ত আসা প্রতিটা মনুষ্য জাতির।” ভাবনা কে সমাপ্তি দিয়ে নুফায়ের শুভ’র দিকে তাকিয়ে প্রশস্ত হাসে।শুভ’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-“দোয়া রইলো তোমার আর উর্মির জন্য এবং তোমাদের ছেলের জন্য।আল্লাহ তোমাদের সম্পর্কে যেন আরো রহমত দান করে এই দোয়া সব সময় থাকবে।আর চিন্তা করো না তুমি নির্দ্বিধায় ভার্সিটিতে এসো।তবে হ্যাঁ, আগে ছেলে আর বউ এর সুস্থতার খেয়াল রাখিও।আমি সব ক্লাসে তোমাদের সম্পর্ক এর বিষয় টা সবাই কে বুঝিয়ে বলবো। ইংশা আল্লাহ এর পর আর কেউ তোমাদের নিয়ে অহেতুক কিছু রটাবে না।তুমি ভার্সিটি এসো।কোনো হেল্প লাগলে আমাকে বলিও।টিচার্স হিসেবে নয়,তোমার আরেকজন বড় ভাইয়া হিসেবে।”
শুভ’র অক্ষি কোটরে চিকচিক করে পানি এসে জানান দেয় তারা এসেছে।নুফায়ের এর ভরসা পূর্ণ কথায় যেন এক অদ্ভুত সাহস সঞ্চয় হয় তার ভিতর সত্তায়।সেই সাহস ধরে রেখেই একটা আবদার করে বসে নুফায়ের এর কাছে।কণ্ঠে কোনো প্রকার জড়তা,আড়ষ্টতা না রেখেই বলে,
-“স্যার আমি একটু আপনাকে জড়িয়ে ধরি?”
ইশ!কেমন আদুরে আবদার স্যার নামক বড় ভাইয়ার মতো ব্যক্তি টার কাছে।নুফায়ের উঠে দাঁড়ায়।চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে মাঠে স্টুডেন্ট নেয় আপাতত।দুই হাত প্রশস্ত করে দিয়ে শুভ কে চোখের ইশারায় বলে জড়িয়ে ধরতে।নুফায়ের এর ইশারা বুঝতে-ই শুভ এক প্রকার হামলে পড়ে নুফায়ের এর বুকে।নিজের দুই হাত দিয়ে নুফায়ের কে জড়িয়ে ধরে।নুফায়ের ও পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় ছোট ভাইয়ের মতো স্টুডেন্ট টাকে।যে তার থেকে ও বড় দায়িত্ববান হয়েছে এখন।
প্রবেশ দোর দিয়ে নিজের ছোট ভাইকে আসতে দেখেই শুভ কে ছাড়িয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় নুফায়ের।শুভ কে স্বগতোক্তি করে বলে,
-” আজ বাসায় চলে যাও শুভ।আমি ও যায়।”
কথা টা বলে-ই নুফায়ের আর না দাঁড়িয়ে প্রবেশ দোরে দাঁড়ানো তার ভাইয়ের কাছে যেতে অগ্রসর হয়।পিছন থেকে শুভ চেঁচিয়ে বলে উঠে,
-“কই যাচ্ছেন স্যার? ”
নুফায়ের ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন তাকায়।হেসে দিয়ে বলে,
-‘‘ধৈর্যের ফল রবের রহমত হিসেবে পাওয়া নেয়ামত কে আনতে”।
কথাটা বলে আবার মাথা ঘুরিয়ে সামনে তাকায়।গুণ গুণ করে গেয়ে উঠে,
“মারহাবা সাধি মোবারক মারহাবা,
মারহাবা সাধি মোবারক মারহাবা। ”
(সমাপ্)