রহস্যে ঘেরা ভালবাসা পর্ব-১৯

0
647

#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_১৯
#M_Sonali

–“আমার বাবা ছিলেন তোমার বাবা আয়াজের সব চাইতে কাছের ও প্রিয় বন্ধু ইদ্রিস জিন। আর আমার মা ছিলেন আশেক জিন জাতির মেয়ে। তারা দুই জাতির হলেও ভালবেসে বিয়ে করে এক হন। আর তাদের ঘরেই জন্ম হয় আমার। তাই আমার মাঝে আশেক জিন ও ইদ্রিস জিন দুই জিন জাতির শক্তি ও স্বভাবই রয়েছে। এই কারণেই ইদ্রিস জিন রাজ্যের সবার মত আমিও পাথরের মুর্তিতে পরিনত হইনি।”

একনাগাড়ে এতোটুকু বলে থামলেন মীর। ওনার কথায় আমি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

–” ইদ্রিস জিন রাজ্যের সবাই পাথরের মূর্তি তে পরিণত হয়েছে মানে? আমি ঠিক বুঝলাম না মীর!”

আমার প্রশ্নে উনি হতাশ হলেন। ছোট করে একটি নিশ্বাস নিয়ে বললেন,

–” তোমাকে একটু আগে আমি সবকিছু খুলে বলেছি আব্রু। তোমার বাবা আয়াজ আর মা সোনালীর সম্পর্কে। সেখানেতো তুমি শুনলেই যে তোমার বাবার ওই মাথার মুকুট এর জন্যই সবাই পাথরের মূর্তিতে পরিনত হয়েছিল। কিন্তু যখন সেটা তোমার মা গিয়ে খুঁজে নিয়ে এসে তোমার বাবার মূর্তির মাথায় পড়িয়ে দেন। তখন একে একে ইদ্রিস জিন রাজ্যের সবাই মূর্তি থেকে নিজেদের আসল রূপে ফিরে আসে।ঠিক একি ভাবেই তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর ঐ মুকুটটা একটি বিশেষ জায়গায় সুরক্ষিত যায়। যেটা সঠিক সময়ে শুধুমাত্র তুমি ছাড়া কেউ আনতে পারবে না। আর এই কারণের ইদ্রিস জিন রাজ্যের সকল জিনেরা এখন মূর্তিতে পরিণত হয়ে আছে। শুধু আমি ছাড়া।”

ওনার কথাগুলো যেন বুঝেও বুঝতে পারছিনা। সবকিছু যেন মাথার মধ্যে এসেও সব গুলিয়ে ফেলছি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সবগুলো কথা ভেবে বুঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না, কোনভাবেই কিছু বুঝতে পারছিনা। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে উনি বেশ হতাশ হলেন। হতাশ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বেশ রাগী গলায় বলে উঠলেন,

–“তুমি কি সত্যিই আমার কোন কথা বুঝতে পারছ না আব্রু? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করতে চাইছো? কোনটা বলতো?”

উনার প্রশ্নে হালকা গলা খাঁকারি দিলাম। তারপর উনার কাছে একটু এগিয়ে বসে শান্ত গলায় বললাম,

–” দেখুন মীর, আমি আপনার সব কথাই মেনে নিচ্ছি। বুঝার চেষ্টাও করছি। কিন্তু একটা কথা কোনমতেই আমার মাথায় ঢুকছেনা। আপনি একটু আগেই বলেছেন আমার মা ঐ মুকুট উদ্ধার করে বাবার মাথায় পরিয়ে দেওয়ার পর সবাই নিজেদের আসল রূপে ফিরে আসে। এবং খুব সুখে শান্তিতে সংসার করতে থাকে। আর সেখানে আমারও জন্ম হয়। কিন্তু এতো সুখের মাঝে হঠাৎ করে এমন কি হয়েছিল যে বাবা-মাকে মরে যেতে হয়েছে? আর সকল জিনেরা মূর্তিতে পরিণত হয়েছে?আর আমি যদি একটি জিনের কন্যাই হবো! তাহলে আমি মানুষের মাঝে কি করছি। এটা কোনোভাবেই আমার মাথায় ঢুকছেনা। তারা তো অনেক শক্তিশালী জিন ছিল, তাহলে এসবের কারণটা কি? আমাকে সব বুঝিয়ে বলুন মীর।”

আমার কথাগুলো শুনে উনি বেশ কিছুক্ষন চুপ করে বসে থেকে কিছু একটা ভাবলেন। তারপর আমার ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে বলতে শুরু করলেন,

–” তোমার বাবার ঐ মাথার মুকুট এর মাঝে ছিল অসাধারণ শক্তি। যে শক্তির দ্বারা সব জিনের সাথে মোকাবেলা করে জিতে যেতেন ইদ্রিস জিনেরা। তাই ইফ্রিত জিনদের অনেক আগে থেকেই লোভ ছিলো ঐ মুকুটের ওপর। তারা সব সময় সুযোগ খুঁজতো ঐ মুকুটটা হাসিল করার। কিন্তু তারা কখনোই সেই সুযোগটা পেয়ে ওঠেনি। আর তখনি জিন রাজ্যে জন্ম হয় তোমার। তুমি জিন কন্যা হলেও তোমার বাবা মা চেয়েছিলেন তুমি যেনো মানুষ হও কোনো জিন নয়। তোমার মাঝে যেন কোন রকম জিনের শক্তি বা জিনের অভ্যাস না থাকে। তুমি যেনো সম্পূর্ণ একটি মানুষ হও। কারণ সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। তাই তোমার বাবা-মা ঠিক করেন তোমাকে মানুষের মাঝে রেখে যাবে। আর তোমায় দেখাশোনার দ্বায়ীত্ব দেন আমায়। তখন আমার বয়স ছিলো ১০০ বছর। তিনবছর তারা তোমাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। আর তিন বছর পর যেদিন তোমাকে পৃথিবীতে মানুষের কাছে রেখে যাওয়ার কথা, তখনই আবেগের বসে ভুল কাজটা করে বসেন তোমার বাবা আয়াজ। সে তোমাকে পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার জন্য নিজের মুকুটটা খুলে জিন রাজ্যে সুরক্ষিত করে রেখে আসে। কিন্তু সে সুরক্ষা অতটাও জোরালো ছিলনা। কারণ কারো ধারণা ছিল না যে মুকুট টার উপরে ইফ্রিত জিনের নজর রয়েছে। আমাকে আর তোমাকে নিয়ে তোমার বাবা যখন পৃথিবীতে আসে। তখনই তার কাছে খবর জিন রাজ্যে বদজিনদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

তোমার মা তখন জিন রাজ্যেই ছিল। তাই তোমার বাবা পাগলের মত সেখানে ছুটে যান তোমাকে আমার কাছে রেখে। আর বলে যান যতক্ষণ না, সে না আসবে! তোমাকে নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে রাখতে। কারণ ইফ্রিত জিনেরা তোমাকেও মারতে চাইবে। তখন আমার বয়স ১০০ বছর হলেও জিন হিসেবে আমার তেমন শক্তি ছিলো না। তাই ভীষণভাবে ঘাবড়ে যাই। তোমাকে কোলে নিয়ে লুকিয়ে পড়ি এক পাহাড়ের গুহায়। সেখানেই কেটে যায় তিন তিনটা দিন। কিন্তু এর মাঝে তোমার বাবা আর ফিরে আসেননি। কোনো খবরও পাইনি আমি। শেষে তোমাকে নিয়ে কি করব বুঝে উঠতে না পেরে, তোমাকে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে থাকি। আর ভাবতে থাকি কি করা যায়। তোমাকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমার নজর পড়ে দোতালা এক বাসার ছাদের দিকে। সেখানে ১ বছর বয়সি একটি বাচ্চা মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে খেলছিলো। হয়তো সে একাই পৌছে গেছিলো সেখানে। কারণ তার আশেপাশে আমি কাউকে দেখিনি। আমি সেখানেই তোমাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বাচ্চাটাকে দেখতে থাকি। আর দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই বাচ্চাটা ছাদের একদম কিনারে এসে পড়ে। আমি তাকে ধরবো ভেবে এগিয়ে যেতেই সে হঠাৎ করে ছাদের উপর থেকে নিচে পড়ে যায়। আমি চেষ্টা করেও তাকে আর ধরতে পারিনি। বাচ্চাটা সাথে সাথে মারা যায়। তখনই চারিদিক থেকে হৈ হুল্লোড় শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কেউ বাচ্চাটার কাছে আসার আগেই আমি দ্রুত সেই বাচ্চাটা কে লুকিয়ে ফেলি। আর সেই বাচ্চাটার জায়গায় তোমাকে রেখে যাই। আমার শক্তি দিয়ে তোমাকে ঐ বাচ্চাটার মত করে দেই কিছু সময়ের জন্যে। তারপর সবাই তোমাকেই ঐ বাচ্চাটা ভেবে ভালবেসে বড় করতে থাকে। আর এটাই হলো সেই বাড়ি। তখন থেকে তুমি এখানে বড় হয়েছো।”

একটানা এতোটুকু বলে থামল মীর। ওর কথায় আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কেন জানিনা বুকের মাঝে এক হাহাকার বোধ এসে ভর করল। বুকে হালকা ব্যথা করতে লাগল। খুবই কষ্ট হতে লাগল। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

–” তারপর কি হল মীর? তুমি কি জিন রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলে? সেখানে কি অবস্থা ছিল সবার?”

–” হ্যাঁ তোমাকে এখানে সেভ ভাবে রেখে ওই বাচ্চাটিকে আমি কবরস্থানে দাফন করেই চলে যাই জিন রাজ্যে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগেই দূর থেকে আমার দুজন বন্ধুর কাছ থেকে খবর পাই ওখানকার অবস্থা খুব খারাপ। আমার সেই জিন বন্ধুরাও ছিল আশেক জিন। তারা আশেক জিন হলেও খুবই ভালো ছিলো। আর সেই দুজনেই তোমাকে পাহারা দিতো সবসময় এখানে পাখির রুপে থেকে। ওদের থেকে খবর পেয়ে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে জিন রাজ্যে প্রবেশ করি। যদিও খুবই কঠিন ছিল সেই সময়টা আমার জন্য। সেখানে গিয়ে দেখি অবস্থা খুবই খারাপ। ইফ্রিত জিনেরা সবাইকে পাথর বানিয়ে ফেলেছে। তোমার মা বাবাকে মেরে ফেলেছে। সাথে আমার বাবা মাকেও। আরো অনেক জিনই মারা গেছে। আর যারা বাকি ছিলো তারা পাথরের মুর্তিতে পরিণত হয়েছে।”

এক নিঃশ্বাসে এতোটুকু বলে থামল মীর। ওর চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেইসাথে আমারও একই অবস্থা। আমি যেন কথা বলতে ভুলে গেছি। দুচোখ বেয়ে ঝর ঝর করে পানি ঝরে যাচ্ছে। ভীষণভাবে কষ্ট হচ্ছে আমার। বুকের মাঝে তীব্র ব্যথা অনুভব করছি। কান্না করতে করতেই প্রশ্ন করলাম,

–” তার মানে কি ওই ইফ্রিত জিনেরা আমার বাবার সেই মুকুটটা হাসিল করতে সক্ষম হয়েছিল! আর সে কারণেই সবাইকে মেরে ফেলে পাথর বানিয়ে দিয়েছে?”

–” না আব্রু, তারা ওই মুকুট হাসিল করতে পারেনি। কারণ মুকুট যদি তারা হাসিল করতে পারত, তাহলে কেউ পাথরের মূর্তি হতো না। বরং সবার শক্তি চলে গিয়ে সবাই শক্তিহীন জিনে পরিণত হতো। আর সবাইকে আটকে রেখে তিলে তিলে মেরে ফেলতো তখন ইফ্রিত জিনেরা। কিন্তু সবার পাথর হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো ঐ মুকুটটা নিশ্চয়ই কোন সুরক্ষিত জায়গায় রয়েছে। যেটা হয়তো তোমার বাবার জীবন দিয়ে করে গেছেন তিনি। কারন ঐ মুকুটটা যদি আবার নতুন করে খুঁজে নিয়ে এসে ইফ্রিত জিনদের মাঝে কাউকে রাজা বানিয়ে তার মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আবার সবাই নিজেদের শক্তি ফিরে পাবে। সেই সাথে আসল রূপে ফিরে আসবে সবাই। তখন ইফ্রিত জিনেরা আর কোনভাবেই ইদ্রিস জিনদের সাথে পারবে না। আর এই কাজটা একমাত্র তুমি করতে পারবে আব্রু।”

ওনার কথায় বেশ অবাক হলাম। উনার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

–” কিন্তু আমি কিভাবে ঐ মুকুট আনতে পারব মীর? আমি তো একজন সাধারন মানুষ। আমার তো জিনদের মত কোন শক্তি নেই। তাহলে আমি কিভাবে তাদের সাথে পাঙ্গা নিয়ে মুকুট উদ্ধার করবো? বরং আমার তো মনে হয় ঐ কাজটা আপনি করতে পারবেন মীর। কারণ আপনার কাছে শক্তি আছে।

আমার কথার উত্তরে উনি শান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। অসহায় কন্ঠে বললেন,

–” এই কাজটা যদি আমি করতে পারতাম, তাহলে এতদিন অপেক্ষা করতাম না তোমার 25 বছর পূর্ণ হওয়ার জন্যে। বরং অনেক আগেই মুকুটটা আমি হাসিল করে নিয়ে এসে জিন রাজ্যের সবাইকে মুক্ত করতাম। আর সেইসাথে ইফ্রিত জিনদের ওপর বদলা নিতাম। কিন্তু আমার দ্বারা সেটা সম্ভব নয় আব্রু। এটা একমাত্র তুমি পারবে। তুমি কি ভুলে যাচ্ছ আমি তোমাকে বলেছি, ওই মুকুটটা তোমার মা সোনালী খুঁজে বের করেছিলো। আর সে ছিলো একজন সাধারণ মানুষ।”

–” কিন্তু আমি এটা কিভাবে করব মীর? আমিতো জানিওনা সেটা কোথায় আছে। আর সেখানে আমি যাবোই বা কিভাবে। আর আমার কাছে তেমন কোনো শক্তিও নেই যে আমি সেই শক্তিশালী ইফ্রিত জিনদের সাথে লড়াই করে মুকুট টা হাসিল করতে পারব!”

আমার কথার উত্তরে উনি আমার ডান হাতটা ধরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমাকে নিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে আয়নায় কিছু একটা করলেন। সাথে সাথে আয়নাটা সেই আগের মতো পানির ঢেউয়ের মতো উঠতে লাগল। আমি অবাক চোখে একবার আয়নার দিকে একবার তার দিকে তাকাতে লাগলাম। তখনই সে বলে উঠল,

–” এটাই হচ্ছে সেখানে যাওয়ার প্রবেশপথ। তোমাকে আমি বলেছিলাম না, যে এটা কোন সাধারণ আয়না নয় এটা জিন রাজ্যে যাওয়ার প্রবেশদ্বার! এখান দিয়েই তুমি পথ খুঁজে পাবে মুকুটের কাছে পৌঁছাবার। কিন্তু এই কাজটা মোটেও সহজ হবে না আব্রু। এই পথের প্রতিটা পদে পদে রয়েছে ভয়ংকর বিপদ। যে বিপদ থেকে শক্তি দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধি দিয়ে মুক্তি পেতে হবে তোমায়।”

ওনার কথায় কেন জানিনা সারা শরীরের লোম কাটা দিয়ে উঠলো আমার। ভীষণ ভয় হতে লাগল মনে। ভয়ে ঢোক গিললাম। তখনি মীর বলে উঠলো,

–” এভাবে ভয় পেলে চলবে না আব্রু। তাহলে তুমি কোন কিছু করতে পারবে না। মনে সাহস থাকতে হবে। তবেই তুমি এই কাজটা করতে পারবে। যদি তুমি সাহস ধরে না রাখতে পারো, তাহলে আয়নায় প্রবেশ করার সাথে সাথে প্রথম পদেই তোমার মৃত্যুও হতে পারে। তাই মনে সাহস যোগাও। কারণ আজ রাতের পর তোমার ২৫ বছর পূর্ণ হবে। আমি আর তোমার সামনে আসতে পাড়বো না।”

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,