#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_২০
#M_Sonali
–“এভাবে ভয় পেলে চলবে না আব্রু। তাহলে তুমি কোন কিছু করতে পারবে না। মনে সাহস থাকতে হবে। তবেই তুমি এই কাজটা করতে পারবে। যদি তুমি সাহস ধরে না রাখতে পারো, তাহলে আয়নায় প্রবেশ করার সাথে সাথে প্রথম পদেই তোমার মৃত্যুও হতে পারে। তাই মনে সাহস যোগাও। কারণ আজ রাতের পর তোমার ২৫ বছর পূর্ণ হবে। আমি আর তোমার সামনে আসতে পাড়বো না।”
উনার কথায় বেশ অবাক হলাম। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলাম,
–“এটা আপনি কি বলছেন মীর! আমার জন্মদিনের তো এখনো দুই মাস বাকি। আর তাছাড়া আমার এবার ২৩তম জন্মদিন হবে, ২৫তম নয়।”
আমার এমন কথায় মীর বিরক্ত হওয়ার মত মুখ বানালো। তাকে দেখে বুঝতেই পারছি ভীষণ রকমের বিরক্ত হচ্ছে সে। সে বিরক্তি নিয়েই নিজের মাথায় আলতো করে চাপড় মেরে বললো,
–“সত্যিই আমি এবার পাগল হয়ে যাব আব্রু। মেয়ে মানুষকে বোঝানো যে এতটা কষ্টের, সেটা তোমাকে না বোঝাতে এলে হয়তো বুঝতে পারতাম না। আমার মাথা ধরিয়ে দিচ্ছো তুমি। তোমাকে আর কতবার বলবো যে তোমার আসল বয়স আজ 25 বছর হবে। আর তোমার আসল জন্মদিনও আজকে, দুই মাস পর নয়। কেনো বার বার ভুলে যাচ্ছো, তুমি একজন জিনকন্যা কোনো সাধারণ মানবী নও।”
ওনার ধমক খেয়ে বেশ ঘাবড়ে গেলাম। মুখটা ছোট করে নিচের দিকে তাকিয়ে ওড়নার সাথে নিজের আঙ্গুল প্যাঁচাতে লাগলাম। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে উনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর আমাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে গালে হাত রেখে শান্ত গলায় বললেন,
–” আমায় ক্ষমা করো আব্রু। আসলে তোমার একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে দিতে হাপিয়ে গিয়েছি আমি। তুমি কেন বুঝতে পারছ না আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। আজ রাত বারোটার পর আমি আর তোমার সামনে আসতে পারবো না। প্রয়োজন ছাড়া তোমার সাথে কথাও বলতে পারবো না। আমি চাই এটুকু সময় তোমার সাথে একান্তে কাটাতে। কিন্তু তুমি যেভাবে একই প্রশ্ন বারবার করে যাচ্ছ, তাতে আমি কিভাবে তোমার সাথে সময় কাটাবো বলো? কেন বুঝতে পারছ না আমার অবস্থাটা? তোমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতে হবে আমার, সেটাও আবার আজকের সময়ের মধ্যেই।”
ওনার কথায় ওনার দিকে চোখ মেলে তাকালাম। তারপর আবার মুখটাকে গম্ভীর বানিয়ে প্রশ্ন করলাম,
–“সবই বুঝলাম মীর। আমি আপনাকে এক প্রশ্ন আর বারবার করব না। তবে আরেকটা কথা জানার আছে আপনার থেকে। আশা করি আপনি তার উত্তর দেবেন। বিরক্ত না হয়ে!”
আমার কথার উত্তরে মুচকি হাসি দিলেন। আলতো করে আমার কপালের কাছে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পিছন দিকে সরিয়ে দিয়ে বললেন,
–” বল কি জানতে চাও, আমি অবশ্যই তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি আছি আব্রু।”
উনার সায় পেয়ে, উনার চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলে উঠলাম,
–” আপনি যদি আমাকে সত্যিই এতটা ভালোবেসে থাকেন! তাহলে এতদিন আমার সাথে এমন খারাপ আচরণ কেন করেছিলেন মীর? কেনইবা আমার থেকে সবসময় দূরে দূরে থাকতেন? কেনই বা আমাকে কখনো নিজের স্ত্রীর অধিকার দেননি। আমাকে সবসময় দূরে সরিয়ে রেখেছেন, কখনো নিজের কাছে আসার মত কোনো সুযোগ দেননি।আর এই কথাগুলোই বা কেনো বলেন নি এতদিন?”
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে ওনার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আমার প্রশ্ন শুনে উনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিরাশ কন্ঠে বলতে লাগলেন,
–” আমি জানি আব্রু, তুমি যে প্রশ্নগুলো করছ সে প্রশ্নগুলো করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তোমাকে কিভাবে বোঝাবো বলো, তোমার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা কতটা কষ্টের ছিল আমার। তবুও শুধুমাত্র তোমার ভালোর জন্যই এ কাজগুলো করতে হয়েছে। ইফ্রিত জিনেরা সবাই জানতো যে আয়াজ এবং সোনালীর একটি মেয়ে আছে। যে মেয়েটি মানুষের মাঝে আছে। তাই তারা সবসময় তোমার খোঁজ করতো পৃথিবীতে এসে। যদি কখনো খোঁজ পেতো তাহলে তোমায় সাথে সাথে সঙ্গে করে নিয়ে যেতো। আর তোমার ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে জিন রাজ্যে গেলে তুমি আর মানুষ থাকতে না। বরং জিনকন্যায় পরিণত হতে। তখন তোমার শক্তি ব্যবহার করে ইফ্রিত জিনেরা ঐ মুকুট উদ্ধার করে আরো শক্তিশালী হয়ে যেতো। তখন তোমার সাথে কতটা বাজে কিছু ঘটতো তা তোমার ধারণার বাহিরে আব্রু।”
এতোটুকু বলে থামলেন মীর। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বলতে শুরু করলেন,
–“তুমি জানো যে আমি ইদ্রিস জিন এর পাশাপাশি একজন আশেক জিনেরও অংশ। তাই আমার মাঝে আশেক জিনের অনেক অভ্যাস রয়ে গেছে। যার কারণে তোমার প্রতি অনেক বেশি আকৃষ্ট আমি। যার দরুন সবসময় তোমার কাছে আসার চেষ্টা করেছি। তোমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার ও চেষ্টা করেছি তোমার অজান্তে। নিজেকে শত চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। কিন্তু যখনই তোমার কাছে এসেছি তখনই মনে পড়েছে জিন রাজ্যের করুণ অবস্থার কথা। তাই তোমাকে নিজের থেকে দূরে রাখতেই তোমার সাথে সবসময় খারাপ আচরণ করেছি। যাতে করে আমাদের মাঝে কখনো কোনো সম্পর্ক গড়ে না ওঠে। কারণ তোমার ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তোমার সাথে আমার শারীরিক কোনো সম্পর্ক হলে তুমি ইদ্রিস জিন কন্যার শক্তি পেয়ে যেতে। সাথে সাথে সব ইদ্রিস জিনদের মত তুমিও মূর্তিতে পরিণত হতে। আর আমি হারাতাম সব শক্তি। তাই তোমার থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। কখনো তোমার এতটা কাছে যাইনি যতটা কাছে গেলে বিপদ ঘটবে। তুমি কল্পনাও করতে পাড়বে না, নিজেকে তোমার থেকে দূরে রাখতে, তোমার সাথে খারাপ আচরণ করতে কতটা কষ্ট হয়েছে আমার।”
এতোটুকু বলে থামলেন উনি। ওনার চোখের দিকে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠলো আমার। ওনার চোখে চিকচিক করছে অশ্রুজল। বুঝতে পারছি সত্যিই কতটা কষ্ট সহ্য করেছেন এতদিন তিনি। ভালোবাসার মানুষ থেকে দূরে থাকা সত্যিই যে বড় কষ্টকর। তখনই আমার মাথার মাঝে একটি প্রশ্ন খেলে উঠলো। আমি ওনার থেকে কিছুটা সরে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
–” যদি এসব সত্যি হবে তাহলে আপনি আমাকে বিয়ে করলেন কেন? আর বিয়ে করার পরও আমার সাথে বাজে আচরণই বা করতেন কেন? সেদিন আমাকে ওয়াশরুমে গলা টিপে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন আপনি! কিন্তু কেন মীর? এসবের মানে কি?”
–” তোমাকে বিয়ে করতে চাই নি বলেই, আর তোমাকে নিজের থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি বলেই সেদিন ছাদের উপর তোমার সাথে মিথ্যা অভিনয় করেছিলাম। কিন্তু ভেবেও দেখিনি যে তুমি এই নাটকটার জন্য জীবনের সবচাইতে বড় ভুল করে বসবে। সেদিন আমায় ছাদের ওপর অন্য মেয়ের সাথে দেখে ওয়াশরুমে কান্না করেছিলে তুমি। আর ওয়াশরুমে থাকে খারাপ জিন। কিন্তু তারা ততক্ষণ অব্দি তোমার রহস্য বুঝতো না যতক্ষণ না তুমি ওয়াশরুমে কান্না করতে বা উলঙ্গ হয়ে গোসল করতে। কারণ বদজিনরা সব সময় সেই সব মেয়েদের ওপর আসর করে যারা এই কাজগুলো করে। সেদিন ওয়াশরুমে কান্না করার ফলে একজন ইফ্রিত জিনের নজরে পরে যাও তুমি। সে প্রথম নজরেই বুঝে গিয়েছিলো তুমি’ই সেই জ্বীনকন্যা যাকে তারা খুঁজছে। তোমার মনে পরে সেদিন হঠাৎ করেই তোমার চারিপাশে সাদা ধোয়া হয়েছিলো। আর তখনি তুমি জ্ঞান হারাও।”
এতটুকু বলে থামলেন মীর। আমার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আমি ওনার কথা শুনে সেদিনের কথা মনে করতে লাগলাম। হ্যা সত্যি সেদিন আমি যখন ঝর্ণার নিচে বসে কান্না করছিলাম তখন চারিদিকে সাদা ধোয়ায় ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম অতিরিক্ত কান্না করার ফলে আমার চোখে ভুল কিছু দেখছি। তার একটু পরেই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাই। তাহলে সেদিন এই ঘটনা ঘটেছিল আমার সাথে? ভাবতেই যেনো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ভয়ে। আমাকে চুপ করে চিন্তা করতে দেখে উনি আবারও বলতে শুরু করলেন,
–” সেদিন তোমাকে অজ্ঞান করে ফেলেছিলাম আমি। যাতে করে তুমি দেখতে না পাও সেদিন ওয়াশরুমে কি হয়েছিল। তুমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর সেই ইফ্রিত জিন টাকে হত্যা করেছিলাম। সে একজন সাধারন জিন হওয়ায় আমার সাথে পেরে উঠেনি। তাকে হত্যা করে তোমাকে সেখানেই শুকনো অবস্থায় ফেলে রেখে ছিলাম। তোমার শরীরের সব পানি নিজের শক্তির দ্বারা মুছে দিয়েছিলাম। যার কারণে তোমার কাপড় একদম শুকনো ঝরঝরে ছিল মনে পড়ে কি সে কথা?”
ওনার কথা শুনে সবকিছু মনে পরতে লাগলো আমার। সবকিছু মাথার মধ্যে একে একে মিলে যেতে লাগলো। ওনার কথা ভীষণ মনযোগ দিয়ে শুনতে লাগলাম। উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
–“কিন্তু সেদিন ওই জিন টাকে মেরে ফেলার পরেও তোমার ওপর নজর পড়ে যায় বাকি জিনদের। সব ইফ্রিত জিনেরা উন্মাদ হয়ে পড়ে তোমাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর তাই সেদিন দুপুরে যখন তুমি গোসলের জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে ছিলে, তখন সেখানে তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটা জিনিসের আবির্ভাব ঘটে। যাদের মাঝে একজন ধোয়া রুপে তোমার গলা চেপে ধরে। আর তাদের সাথে লড়াই করতে আমি এবং পাখি রূপের সেই দুইজন জিন মিলে সেখানে হাজির হই। তখনই আমার ভয়ঙ্কর রূপ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাও তুমি। আর ভেবে নাও তোমাকে মেরে ফেলতে চাওয়া জিনটা আমি। সেদিন তুমি জ্ঞান হারানোর পরে আমার সঙ্গি পাখি রুপি জিন দুজন মারা যায়। আর সেই সাথে ঐ তিনজন ইফ্রিত জিনদেরকেও হত্যা করে। তারপরে তুমি যে স্বপ্নটা দেখেছিলে সেটা ছিলো তোমায় সতর্ক করার নিদর্শন।”
একটানা সবকিছু বলে থামলেন মীর। এবার ওনার কথা শুনে একে একে সবকিছু বুঝতে পারলাম। আর কোনো রহস্য রইলোনা আমার মনে। সব কিছু এবার বুঝে গেছি আমি। নিজেকে শক্ত করলাম, মনে মনে সাহস যোগালাম। যেভাবেই হোক আমার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, আর যারা মূর্তি হয়ে বেঁচে আছেন, তাদের মুক্ত করতে হবে আমায়। আর ভয় পেলে চলবে না। নিজেকে প্রস্তত করতে হবে বদজিনদের সাথে লরাই এর জন্যে। মীরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,
–” আমি সবকিছু বুঝতে পেরেছি মীর। আমার মাঝে আর কোনো সংসয় কাজ করছে না। বা কোন কৌতূহলও নেই। সবকিছুই বুঝে গেছি। কিন্তু আপনি এখন আমায় এটা বলুন, আমি কিভাবে সেই মুকুট এর কাছে পৌঁছতে পারব? আর সেটা উদ্ধার করে সব ইদ্রিস জিনদের নিজের আসল রূপে ফিরে আনতে পারব। সাথে ইফ্রিত জিনদের ওপর বদলা নিতে পারব?”
–” সেটা তুমি তখন’ই জানতে পারবে যখন তুমি এই আয়নার মাঝে প্রবেশ করবে। আর বুকে সাহস রেখে এগিয়ে যেতে পারবে। এই আয়নায় প্রবেশ করার পর যখন তুমি সাত কদম সামনে এগিয়ে যাবে, তখন’ই তুমি সেই থলেটা পাবে। যেটা ছিল তোমার মা সোনালীর কাছে। আর সেই থলেই তোমাকে পথের নিদর্শন দেখাবে। সেইসাথে প্রয়োজনের সময় আমিও তোমাকে দূর থেকে আওয়াজ দিয়ে হেল্প করব। তবে সামনে আসতে পারবো না ততক্ষণ, যতক্ষণ না তুমি ঐ মুকুটটা উদ্ধার করতে সক্ষম হও।”
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,