#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_২২
#M_Sonali
বেশ অনেকটা সময় হলো সেখানেই বসে আছি। আয়নার জগতে আসার আগে সাথে যে খাবারগুলো নিয়ে এসেছিলাম, সেই খাবার গুলোকে খেয়ে নিলাম। তারপর পানি খেয়ে নিলাম। এতটা পথ আসার কারণে বেশ ক্ষুধা লেগে গিয়েছিল। খাওয়া শেষ করে সেই ছন্দটা আবারো বের করে সামনে ধরলাম। এবার পুরোটা পড়ে বেশ অনেকটাই বুঝে ফেললাম। বুঝতে পারলাম সামনে আমার জন্যে মহা বিপদ রয়েছে। আর সামনের সবকিছু মরীচিকার মত হবে। তার মানে এই কারণেই মীর আমাকে ঐ ফুলগুলোর কাছে যেতে বারণ করেছিল। কথাটা ভেবেই একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর নিজের সাথে নিয়ে আসা জিনিসপত্র ঠিকভাবে গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। ঝর্নাটা এখনো আগের মতই বয়ে চলেছে। আর সামনের ফুলের বাগানের ফুলগুলো বাতাসে তালে তালে দুলছে। সেই ফুলের ঘ্রাণ এসে বারবার বারি খেয়ে যাচ্ছে আমার নাকে। যেন আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ফুলের কাছে। কিন্তু না আমি ফুলগুলোর কাছে যাব না। কারণ এই ছন্দে লেখা ধাধাগুলোর মাদ্ধমে যতটা বুঝেছি তাতে ঐ ফুলগুলোও হয়তো আমার জন্যে কোনো ফাঁদ।
কথাগুলো ভেবে ফুলের দিকে আর না গিয়ে, ঝর্নার পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের ভেতর দিকে। সেই রাস্তার দিকে পা বাড়ালাম। বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ পিছন থেকে ভীষণ ভয়ানক গর্জন শুনতে পেলাম। সাথে সাথে পিছন ফিরে তাকালাম আমি। আর দেখলাম, গাছের ফুল গুলো হঠাৎ করে নিজেদের রুপ বদলে ভীষণ ভয়ানক এক প্রানীর রূপ নিয়েছে। আর খুব জোরে জোরে গর্জন করতে শুরু করেছে। তবে সেগুলো নিজেদের জায়গা থেকে সামনে এগোতে পারছে না। তারা সেই বাগানের জায়গা টুকুতেই সীমাবদ্ধ। তবে আমার দিকে তাকিয়ে ভীষণভাবে রাগে গর্জন করে চলেছে তারা।
ফুলগুলোর এমন পরিবর্তন দেখে ভয়ে যেন শরীর শিউরে উঠলো। সেই সাথে নিজেকে যতটা সম্ভব সাবধান করেও নিতে পারলাম। সামনে এভাবে আর কোনো ভুল করবোনা। নিজেকে যতটা সম্ভব মানিয়ে চলবো। মনে মনে বলে আবারো এগিয়ে যেতে লাগলাম। এভাবে বেশ কিছুটা দূর সামনে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার চারিদিক থেকে যেন ভীষণ মাংস পঁচার তিব্র গন্ধ ভেসে আসছে। গন্ধটা এতটাই তীব্র যে বমি পেয়ে যাচ্ছে আমার। নিজেকে কন্ট্রোল করাই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারছি এখন আমার চারিপাশে বদজিনেরা ঘোরাফেরা শুরু করেছে। কারণ মীরের কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি, তাতে যেখানে কোন খারাপ জিন থাকে, সেখানে এমন বিদঘুটে গন্ধ বের হয়। তাই যতটা সম্ভব মনে সাহস যুগিয়ে মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলাম। এখানে ভেঙে পড়লে এখনই মারা পরবো। মনে সাহস যুগিয়ে দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
তখনই পিছন থেকে ভীষণ রকমের ভয়ানক শব্দ করে কেউ যেনো আমাকে ধরতে আসছে এমন মনে হতে লাগল। যেন ভয়ানক কোন প্রাণী দ্রুত গতিতে তেড়ে আসছে আমাকে ধরার জন্য। এই মুহূর্তে পিছনদিকে ফিরে তাকানো মানে নিজের মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া। এটা ভেবে সামনের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। নিজের পরিপূর্ণ শক্তি দিয়ে দৌড়ে চলেছি সামনের দিকে। তখনই হঠাৎ চারিদিক থেকে প্রচুর বাতাস শুরু হল। এতটাই বাতাসের তীব্রতা যে আমাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোনভাবেই বাতাসের তীব্রতার সাথে পেরে উঠছি না। বারবার’ই হার মেনে নিচ্ছি। কোনো উপায় না পেয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলাম। এক মনে জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলাম।
একবার আয়াতুল কুরসি পড়ার সাথে সাথে চারিদিকের তিব্র বাতাস নিমিষেই একদম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পুরো পরিবেশ একদম ঠান্ডা। চারিদিকে সবকিছু ঠিক দেখে চোখ মেলে তাকালাম। তাকাতেই যেন ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গেলাম। আমার সামনে আগুনের নদী বয়ে চলেছে। পুরো নদীটাই যেন একটি আগ্নেয়গিরির খাদ। কি ভয়ানক সে লাভা। যেনো এখনি সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
আমি ভয়ে দুপা পিছনদিকে পিছিয়ে আসলাম। চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগলাম। খেয়াল করলাম চারিপাশে শুধু আগুন আর আগুন। সেই আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে আমার শরীর জ্বালাপোড়া করছে। বুঝতে পারছি খুবই ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেন এখনই পুড়ে ছাই হয়ে যাব। আগুনের তাপে দরদর করে ঘামতে শুরু করেছি। তখনই হঠাৎ খেয়াল হলো সেই ছন্দের কথাগুলো। যেখানে লেখা ছিল,
“সামনে সবই মরিচিকা
মিথ্যে চোখের ভুল,
যেটা দেখবে আগ্নেয়গিরি
সেটাই নদীর কূল।”
এটা মনে পড়তেই মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। নিজেকে বুঝাতে লাগলাম সামনের কোনো কিছুই সত্য নয়। এগুলো সব মরীচিকা। এগুলো আমায় ভয় পাইয়ে এখানেই থামিয়ে দেওয়ার জন্য রাখা। কিন্তু আমি থামবোনা। সামনে এগিয়ে যাব যা কিছু হয়ে যাক না কেন। চোখ দুটো বন্ধ করে নিলাম। একটা বড় করে নিশ্বাস নিলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব প্রস্তুত করে সামনের দিকে বিসমিল্লাহ বলে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এভাবে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসার পরেই অনুভব করলাম আমার পা দুটি ভিজে যাচ্ছে। সাথে সাথে চোখ খুলে তাকালাম। চারিদিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটে উঠল। চারিপাশে আর কোন আগুন নেই। সব জায়গায় শুধু পানি আর পানি। আর এই পানি বেশি গভীর নয়। খুব বেশি হলে হাটু পর্যন্ত হবে। এবার হাসিমুখে সামনের দিকে পানির মাঝে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এভাবে বেশ খানিকটা এগিয়ে আসার পরেই সামনে দেখলাম নদী মাঝখানে যেনো ভাগ হয়ে গেছে। আর ঐ প্রান্তে পানির জায়গায় শুধু ছোট ছোট জোক আর সাপ কিলবিল করছে।
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। মনের সব সাহস নিমেষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমি দ্রুত কয়েকপা পিছনে দৌড়ে পিছিয়ে আসলাম। ভয়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো। ছোটবেলা থেকে সাপের চাইতেও অধিক পরিমাণ বেশি ভয় পাই জোক কে। যার নাম শুনলেও আমার শরীর কাঁপতে শুরু করে। আর আজকে সেটা সামনে থেকে এত পরিমান দেখে নিজেকে ধরে রাখা সত্যিই বড় কষ্টকর। সেটা এই পরিস্থিতিতে কেউ না পড়লে হয়তো বুঝতো না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কান্না করতে শুরু করলাম। চোখের পানি যেনো বাঁধ মানছে না। এতটাই ভয় করছে যে শরীর কাপতে শুরু করেছে।
তখনই অদৃশ্য থেকে মীরের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। সে আমাকে ডেকে বলছে,
–” ভয় পাচ্ছ কেন আরু পাখি। এতটা ভয় পেয়োনা। তুমি সামনে যেটা দেখছো সেটা তো সত্যি নাও হতে পারে। সেই ছন্দের ধাঁধা গুলোর কথা ভাবো। নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করো। আমি বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা। কিন্তু এখানে ভয় পেলে মৃত্যু যে নিশ্চিত। আমি চাইনা তোমার কোন ক্ষতি হোক। প্লিজ নিজেকে শান্ত করো আরুপাখি।”
মীরের কথা শুনেও যেন নিজেকে শান্ত করতে পারছিনা। ভয়টা যেন কোন মতেই মন থেকে দূর করা যাচ্ছেনা। এমন একটা পরিস্থিতিতে, একদম একা একটি অচেনা জায়গায়! এভাবে নিজের সব চাইতে ভয়ের জিনিস দেখলে হয়তো কেউ নিজেকে সামলে রাখতে পারবেনা। আমার বেলায়ও ঠিক একই রকম হয়েছে। মুখে বলাটা যত সহজ করাটা যে কতটা কঠিন সেটা নিজেকে দিয়েই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কিন্তু তবুও কন্ট্রোল করতে হবে নিজেকে। তাই চোখ বন্ধ করে নিলাম। মনে মনে সাহস যোগানোর চেষ্টা করলাম। যদিও ভয়ে চোখ দিয়ে এখনো পানি পড়ে যাচ্ছে। তবুও কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। মনে মনে মীরকে নিজের সাথে আছে ভেবে কল্পনা করতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর মনোবল যেনো বেশ বেড়ে গেল। এখন আর ভয় তেমন একটা লাগছেনা। তাই দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। বেশ কিছুটা যাওয়ার পরেই হঠাৎ কিছুর সাথে হোঁচট খেয়ে নিচে পড়ে গেলাম।
সাথে সাথে হাতে শক্ত কিছু অনুভব করে চোখ মেলে সামনের দিকে তাকালাম। তাকিয়েই যেন ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গেলাম। সবকিছুই যেন পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি যেখানে ছিলাম তার কোন কিছুই এখন কোথাও নেই। বরং আমার সামনে বিশাল বড় একটি প্রাসাদ। এমন প্রাসাদ পৃথিবীতে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। আর সেই প্রাসাদের ঠিক সামনেই শক্ত মাটির উপর পড়ে আছে। এটাকে মাটি বললে ভুল হবে যেন মনে হচ্ছে পুরোটাই একটা বিশাল আকৃতির পাথর। অবাক চোখে চারিদিকে দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়ালাম। চারিপাশের পরিবেশ অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু প্রাসাদটা এত বড় হওয়া সত্ত্বেও কেমন যেন ভয়ানক লাগছে। চারিপাশে কেমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজমান। ভয়ে যেন শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমি আর দেরি না করে দ্রুত থলেটা হাতে নিলাম। কারণ যতটুকু বুঝতে পারছি আমি দ্বিতীয় ধাপ পুরোটাই কমপ্লিট করে আসতে পেরেছি। এটা নিশ্চয়ই তৃতীয় ধাপের শুরু।
কথাগুলো ভেবে বিসমিল্লাহ বলে থলে টা খুলে তার মাঝে হাত দিলাম। সেটা থেকে আগের মতো একটি চিরকুট বের করে নিয়ে আসলাম। তারপর সেটা যখনই পড়ার জন্যে খুলতে যাবো তখনই কোথা থেকে যেন মীরের আওয়াজ ভেসে আসলো। সে আমাকে করুন গলায় বলছে,
–” আব্রু, এই চিরকুট খোলার আগে আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে নাও। তুমি যেই মাত্র এই প্রাসাদের মধ্যে পা রাখবে, তখন থেকে আমি আর তোমার সাথে কোনরকম যোগাযোগ করতে পারব না। আমার কন্ঠও আর শুনতে পাবেনা তুমি। তোমাকে কোনভাবেই হেল্প করতে পারবো না। সবকিছুই এখন তোমার নিজেকে সামলাতে হবে। তাই নিজেকে প্রস্তুত করে নাও। কারণ এর পরে আমার আর কোনো শক্তি কাজ করবে না। এখন আমি তখনি তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারবো, যখন তুমি ঐ মুকুটটা উদ্ধার করবে।”
মীরের কথা শুনে মুহূর্তেই যেন মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওকে আর সাথে পাব না, ওর কন্ঠটাও শুনতে পারবো না ভেবে মনের মাঝে কেমন একটা শূন্যতা অনুভব করতে লাগলাম। সত্যিই ভালবাসার মানুষটা যখন দূরে চলে যায় তখন অনেক কষ্ট হয়। কথাগুলো ভেবে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর হাতের চিরকুটটা খুলে ধরে পড়তে শুরু করলাম,
“শেষ ধাপে আছো তুমি
বিজয়ের অতি কাছে,
সামনে যা’ই পাবে খুঁজে
সবই সত্যি আছে।
শেষ ধাপ টা ভিষন ভয়ের
মায়ার জালে বন্দি,
এখানে তুমি পাবে তাকে
যে করতে চাইবে সন্ধি।
ভুলেও যদি করো সন্ধি
হাড়াবে সকল আশা,
নিজের অজান্তে হাড়িয়ে ফেলবে
স্বামীর সত্যি ভালবাসা।
আর কখনো পারবে না ফিরতে
সেই পৃথিবীর বুকে,
যেখানে ছোট থেকে হয়েছো বড়
কাটিয়েছো দিন সুখে।
সব বাধা পেড়িয়ে যদি
সেই অদ্ভত রুমটা পাও,
একটুও দেরি না করে
দ্রুতো সেথায় যাও।
সেথায় অনেক হবে বিপদ
ভয়কে করো জয়,
যা কিছু সামনে পাবে
কিছুই সত্য নয়।
সেথায় পাবে বিশাল মূর্তি
ভয়ংকর এক রুপে,
সেটাই আসলে মুকুট তোমার
স্পর্শ করো নিশ্চিন্তে।”
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,