#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_২৩
#M_Sonali
হাতের চিরকুটে লেখা কবিতাটা বেশ কয়েকবার পড়ে নিলাম। পুরোটা ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করলাম। যদিও গত দুইটা চিরকুটের চাইতে এটা একটু বেশি কঠিন মনে হচ্ছে! তবুও যতটা সম্ভব বুঝে নিয়ে চিরকুটটা যথাস্থানে রেখে দিলাম। তারপর সাথে আনা পানির বোতলটা থেকে সবটুকু পানি এক নিশ্বাসে খেয়ে নিলাম। খালি বোতলটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিসমিল্লাহ বলে পা বাড়ালাম। কয়েক পা এগিয়ে এসে সেই প্রাসাদের গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই যেন শরীর ঝাকি দিয়ে উঠল। এমন ঝাকি দেওয়ার কোন কারণই বুঝতে পারলাম না। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম সবই ঠিক আছে। তবে একটা জিনিস ভিষন খটকা লাগলো! এত বড় একটি প্রাসাদ অথচ আশেপাশে কেউ নেই। কাউকে চোখে পরলো না এখন অব্দি।মনে মনে ভাবলাম একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। কেউ আমায় দেখলে বিপদ হয়ে যেতো। তাই কেউ না থাকায় আমি অনেকটাই নিরাপদ।
কথাগুলো ভেবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। ঠিক প্রাসাদের দরজার কাছাকাছি পৌছুতেই হঠাৎ সারা শরীর কেমন ভার ভার অনুভব করতে লাগলাম। বুঝতে পারছিনা হঠাৎ করে শরীরে এমন ভার হয়ে গেল কেন? নিজের দিকে তাকাতেই ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। আমার সারা শরীরে ছোট ছোট জোকের মতো কিছু একটা ধরে আছে। আর সেগুলোর জন্য নিজেকে এতটা ভারী লাগছে আমার। হাতের সব কিছু ছুড়ে ফেলে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সেগুলো শরীর থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। ছন্দের কথা অনুযায়ী এখানে যা থাকবে তার সবকিছু সত্যি। তাই এতটাই ভয় পেয়ে গেলাম যে সেখানেই নিচে শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম।
কিন্তু কোনোভাবেই কাজ হচ্ছে না। সেগুলো আমার গায়ের সাথে থেকে একচুলও ছাড়ছে না। শত চেষ্টা করেও একটা কেও নিজের গায়ে থেকে সরাতে পারছি না। এমতাবস্থায় কি করা উচিত কিছুই মাথায় আসছে না। এদিকে ভয়ে যেনো আমার প্রান চলে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছে। তখনই চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে সূরা পড়তে লাগলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষন সূরা পড়তেই শরীরটাকে ভীষণ হালকা মনে হতে লাগল। চোখ মেলে তাকাতেই খেয়াল করলাম আমার গায়ের জামা পাল্টে ভীষণ সুন্দর কালো রঙের একটি গাউন জামা চলে এসেছে। ঠিক আমার স্বপ্নে যেমন পোশাক ছিল তেমন। তাহলে কি স্বপ্নটা সত্যি হলো? সেখানেও তো এমন কিছু প্রাণী’ই আমার শরীরে ধরেছিল। আর যখন আমি চোখ মেলে তাকাই, তখন সেগুলো কালো একটি গাউনে পরিণত হয়েছিল। তাহলে কি সেটাই আমার সাথে পুনরায় ঘটলো? কিন্তু এটা কিসের ইঙ্গিত ছিলো?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই উঠে দাঁড়ালাম। কোনো কিছুই যেন বুঝতে পারছি না। মীর কেও এখানে ডাকলে পাবো না। তাই একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। এখানে আমার উপকার করার মতো কেউ নেই। নিজেকে নিজেই সাহায্য করতে হবে। তাই ভয়টাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে, যে জিনিসগুলো হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে ছিলাম সেগুলো আশেপাশে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে আশেপাশে কোন কিছুই নেই। এমনকি সাথে করে নিয়ে আসা সেই রুপালি রঙের থলে টাও পাচ্ছি না। তাহলে আমি এখন কিসের সাহায্য নিব। ওই থলেটাই তো আমার শেষ সম্বল ছিল। মাথাটা যেন ঘুরতে শুরু করলো। নিজের ওপর ভীষন রকমের রাগ হতে লাগলো। কেন ছুড়ে ফেললাম আমি ঐ থলে টা? এখন ওটা ছাড়া সামনে কিভাবে এগোবো। জানিনা সামনে আর কী কী অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।
কথাগুলো ভেবে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার ভালো করে আশেপাশে সব জায়গার রুপালি রঙের থলেটাকে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলাম না। শেষে আর কোন উপায় না পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আর তাছাড়া ঐ থলেটা থেকে যেটা জানার সেটা আমি জেনে নিয়েছি অলরেডি। তাই সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রাসাদের মধ্যে প্রবেশ করলাম। ভিতরে প্রবেশ করতেই যেনো অন্য এক জগতে প্রবেশ করলাম। বাইরে থেকে প্রাসাদটা ঠিক যতটা ভয়ানক লাগছিল! ভেতর থেকে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সুন্দর। এত সুন্দর কোন জায়গা এর আগে কখনো দেখিনি। চোখটা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। যেদিকে তাকাই সেদিকে যেন হিরা মুক্তা দিয়ে জড়ানো। প্রসাদের প্রতিটা দেওয়াল থেকে যেন আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।
আমি মুগ্ধ নয়নে চারিপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। যেন কোনভাবেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছি না। অজানা এক আকস্মিক মায়াবী শক্তি যেন আমাকে টেনে নিচ্ছে প্রাসাদের দেওয়ালগুলো দেখার জন্য। এভাবে প্রাসাদের দেওয়ালের দিকে তাকাতে তাকাতে কতদূর চলে এসেছি নিজেও জানিনা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে নজর পড়লো নিচে পড়ে থাকা একটি রুপালি ও রঙের থলের দিকে। ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝলাম এটা নিশ্চিত সেই থলে। যেটা একটু আগে হারিয়ে ফেলেছিলাম। থলেটা দেখতেই চোখে মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠল আমার। দৌড়ে গিয়ে থলেটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর দ্রুত কিছু না ভেবেই থলে টা খুলে তার মাঝে হাত রাখলাম। থলের ভিতর থেকে প্রতিবারের মত একটি চিরকুট বেরিয়ে এলো। আমি দ্রুত সেটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। তাতে বেশ বড় বড় অক্ষরে লেখা,
“তুমি তৃতীয় ধাপও পার করতে সক্ষম হয়েছো আব্রু। এখন তুমি মুক্ত। আর সেই সাথে মুক্ত তোমার বাবা-মা ও স্বামী। এখন থেকে তুমি’ই এই জিন রাজ্যের রাজকন্যা। ও হবু রানী। তাই পিছনের সব ভুলে গিয়ে বর্তমানকে আপন করে নাও।”
লেখাটা পড়ে বেশ অবাক হলাম। সেইসাথে মুখে হাসির ঝিলিকও ফুটে উঠল। কারন আমি সক্ষম হয়েছি ভেবে। এই থলের মধ্যে পাওয়া লেখা তো কখনোই ভুল হতে পারে না! কিন্তু সত্যিই যদি আমি সফল হবো তাহলে তারা কোথায়? আর আমিতো এখনো মুকুটটা উদ্ধারও করে নি।
হঠাৎ পিছন থেকে কারো মিষ্টি গলায় আব্রু ডাকার আওয়াজ শুনে ধ্যান ভাঙলো আমার। পিছনে তাকাতেই দেখলাম ভিষণ সুন্দরী একজন মহিলা আমার দিকে মায়াবী নজরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে ছলছল চোখে আমার পাশে এগিয়ে এসে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল,
–“আব্রু মা, কেমন আছিস তুই? সেই কত ছোটবেলা তোকে হারিয়েছি। কোনোদিনও ভাবতে পারিনি এভাবে তোকে আবার কাছে পাবো। সোনা মা আমার, তোকে পেয়ে বুকটা ভরে গেল আমার।”
আমি তার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। সব কিছু যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। আমি তাকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলতেই, আমাকে থামিয়ে দিয়ে একজন অতি সুন্দর লোক কাছে এগিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
–“এটাই কি আমাদের সেই ছোট্ট আব্রু, সোনালী? যাকে আমরা পৃথিবীতে রেখে এসেছিলাম?”
উনার কথার উত্তরে সেই মহিলাটি হেসে দিয়ে বললো,
–“হ্যা আয়াজ, এটাই আমাদের সেই আব্রু। আমাদের একমাত্র কন্যা। যাকে আমরা পৃথিবীতে রেখে এসেছিলাম। দেখো কত মিষ্টি দেখতে হয়েছে ও। আর কত বড় হয়ে গেছে আমাদের মেয়েটা।”
উনাদের কথা শুনে অবাক এর শীর্ষে পৌঁছে গেলাম। “সোনালী, আয়াজ” এগুলোতো আমার বাবা-মা এর নাম। তার মানে কি উনারা আমার বাবা-মা? উনারা বেঁচে আছেন? আমি আমার লক্ষ্যে সফল হয়েছি বলে ওনাদের ফিরে পেয়েছি? কথাটা ভাবতেই চোখে অশ্রু চলে এলো আমার। নিজের আসল বাবা মাকে কখনো এভাবে সামনে থেকে দেখতে পাবো কল্পনাও করিনি। এসব যেনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি অবাক নয়নে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তখনই পিছন থেকে কেউ এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। সে দিকে ফিরে তাকাতেই দেখলাম মীর হাসি মুখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাকে দেখে আমি কিছু বলার আগেই সে বলে উঠলো,
–” হ্যা আব্রু, তুমি ঠিক ভেবেছো। এরাই তোমার আসল বাবা-মা। সোনালী এবং আয়াজ। যাদের কথা আমি তোমাকে বলেছিলাম। তখন তোমাকে একটি কারণে মিথ্যে বলেছিলাম যে তারা মারা গেছে। আসলে এনারা বেঁচে আছেন। আর তাই এখন তুমি তাদের সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছ। এখন থেকে আমরা সবাই মুক্ত। এটা আমাদের রাজ্য। এখানে আমরা সারা জীবন সুখে থাকতে পারবো। আমাদের মাঝে আর কোন বাধা নেই। আমাদের নতুন জীবন শুরু হবে এখানে।”
উনার কথা শুনে মুহূর্তেই আমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। খুশিতে চোখে অশ্রু চলে এল। আমি আমার লক্ষে সফল হয়েছি। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। জীবনটা সত্যিই অনেক মধুময় মনে হচ্ছে এখন। এতটা সুখী মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর সব সুখ আমি পেয়ে গেছি। আমার চোখে জল দেখে মা আমার চোখ মুছে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
–” অনেক কষ্ট করেছিস আব্রু মা। আর দেরি নয় চল তোকে তোর রুম দেখিয়ে দেই। এখন একটু বিশ্রাম নিয়ে নিবি। তারপর আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। তোর আর মীরের ফুলশয্যার ব্যবস্থাও তো করতে হবে। তোরা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছিস। আমি চাইনা তোদের আর কোন কষ্ট হোক।”
কথাগুলো বলেই উনি আমার হাত ধরে সামনে একটি রুমের দিকে নিয়ে গেলেন। আর মীর ও আব্বু কোথায় যেনো চলে গেলেন। মায়ের সাথে গিয়ে একটি রুমের মাঝে প্রবেশ করলাম। দেখলাম ভীষণ সুন্দর ও বড় একটি রুম এটা। তবে রুমের মাঝের সব আসবাবপত্র গুলো ভীষণ অদ্ভুত দেখতে। খাট থেকে শুরু করে রুমের মাঝের সবকিছুই কেমন সাপের মত ডিজাইন করা। তবে অতিরিক্ত সুন্দর সবকিছু। যেন প্রতিটা জিনিসের সাথে হিরা যহোরত লাগানো। অসম্ভব সুন্দর দেখতে সবকিছু। আমাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দিয়ে মা বললেন,
–” আব্রু কিছু খাবি মা?”
ওনার কথার উত্তরে আমি মাথা নেড়ে মানা করলাম। উনি মুচকি হেসে বললেন,
–“আচ্ছা ঠিক আছে মা। তুই এখন একটু ঘুমিয়ে নে। ঘুম থেকে উঠলে বাকি কথা হবে কেমন।”
উনার কথার উত্তরে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শরীর অসম্ভব ক্লান্ত থাকায় শোয়ার সাথে সাথে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালাম।
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,