রহস্যে ঘেরা ভালবাসা পর্ব-২৪

0
683

#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_২৪
#M_Sonali

এক ঘুটঘুটে অন্ধকার কূপের অতল গহীনে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। কি হচ্ছে কোন কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি আমি যেন ভীষণ অন্ধকার কোনো কূপের অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। কোনভাবে কিছু আঁকড়ে ধরে নিজেকে আটকাতে পারছিনা। এত দ্রুত নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছি যেন হাওয়াও হার মেনে যাবে। ভয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করছি কিন্তু একটু আওয়াজ ও মুখ দিয়ে বের হচ্ছেনা। গলা ছেড়ে কথা বলার চিৎকার করার চেষ্টা করলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। আশে পাশে হাতড়িয়ে চলেছি কিছু একটা ধরার জন্য। কিন্তু পারছিনা। যেন মনে হচ্ছে আমি এমন কোথাও আছি যেখানে আশেপাশে শুধু সীমাহীন গর্ত ছাড়া আর কিছু নেই। যেটার সাহায্য নিয়ে নিজেকে বাঁচাতে পারবো।

তবুও নিজেকে বাঁচানোর জন্য যখনই চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে দোয়া পড়তে যাব, তখনই হঠাৎ কিছু একটার সাথে আটকে যাই আমি। আশে পাশে হাত দিয়ে স্পর্শ করতেই বুঝতে পারি এটা কোন জাল। হয়তো মাকড়সার জাল। তবে মাকড়সার জাল কখনো এতটা শক্ত হতে পারে সেটা জানা ছিলো না। চারিপাশ থেকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছি আমি সেই জালের সাথে। কোনভাবেই জাল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারছিনা। আর এমন মনে হচ্ছে যেন আমি ইচ্ছাকৃত ভাবেই আরো বেশি আটকে যাচ্ছি জালের মাঝে। নিজেকে ছাড়ানোর যতবেশি চেষ্টা করছি ততবেশি জড়িয়ে যাচ্ছি। অন্ধকারের জন্য আশেপাশে কি আছে তার কোনো কিছুই দেখতে পারছি না। এ যেনো এক দম বন্ধ করা পরিবেশ।

এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ে যেনো জান বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা। কোনভাবেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিনা। চিৎকার করেও কষ্ট কমাতে পারছিনা। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখনই যেন মরে যাবো আমি। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। শোয়া থেকে উঠে বসে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলাম। সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার। যেন যা কিছু ঘটেছে সবকিছু স্বপ্ন নয় বাস্তবেই ঘটেছে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আমি এখনো সেই রুমে শুয়ে আছি যেখানে একটু আগে মা আমাকে শুইয়ে দিয়ে গেছে।

ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। নিচে নেমে পুরো রুম ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। আর ভাবতে লাগলাম স্বপ্নে দেখা ঘটনাগুলো নিয়ে। কিন্তু স্বপ্নের কথা ভুলে রুমের সব কিছুর সৌন্দর্য দেখতে লাগলাম। আসলেই জায়গাটা পৃথিবী থেকে অনেক আলাদা। সবকিছুই যেন হীরা মানিক জহরত দিয়ে তৈরি। আর অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো গোছানো। দেখে যেন চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মত। তবে একটা জিনিস বেশ অবাক লাগল। এরা তো সবাই মুসলমান জিন। আর মুসলমানেরা তো মূর্তি দিয়ে কোন কিছু করে না। বা মূর্তি পছন্দও করে না। তাহলে এই পুরো প্রাসাদে এত মূর্তি কিসের? হ্যাঁ এই রুম থেকে শুরু করে পুরো প্রাসাদে জায়গায় জায়গায় কিছু কিছু মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো দেখতে অবিকল মানুষের মতই। শুধু প্রাণহীন পাথরের মূর্তিই যা।

কথাগুলো মনে মনে ভাবতেই হঠাৎ করে মূর্তির কথা মনে পড়ে গেল। হ্যা মীর তো আমাকে বলেছিল যে, ইদ্রিস জিন রাজ্যের সবাই মূর্তি রূপে আছে। তার মানে কি এরা সবাই জিন? আর এরা মূর্তি হয়ে গেছে ঐ মুকুটটার জন্যে? কিন্তু এমনটা কিভাবে সম্ভব? আমি তো আব্বু আম্মুর সাথে একটু আগে দেখা করেছি। তারা তো এখানেই ছিল। আর মীরও তো এখানেই।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে যখন’ই আমি একটা মূর্তিকে স্পর্শ করতে যাব! তখনই হঠাৎ আম্মুর ডাক শুনে পিছনে ঘুরে তাকালাম। সে হাসি মুখে আমার কাছে এগিয়ে এসে তার হাতে থাকা ফলের ট্রে টা সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,

–” তুই ঘুম থেকে উঠে পড়েছিস আব্রু মা! আমি তোর কাছেই আসছিলাম। এখানে এসেছিস থেকে তো কিছুই খাস নি। এই নে তোর জন্য জিন রাজ্যের সব চাইতে মিষ্টি ফল নিয়ে এসেছি। আমি নিজে হাতে কেটে খাওয়াবো তোকে।”

কথাটি বলেই আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানার উপর বসলেন তিনি। আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। কোন কিছু বলছিনা। আমাকে পাশে বসিয়ে রেখে আপেল কাটতে শুরু করলেন। তখনি তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বললাম,

–” এখানে এত মূর্তি কিসের রাখা?আপনারা তো মুসলিম জিন। আর মুসলিম কখনো নিজেদের বাসস্থানে কোনো জীবের মূর্তি বা প্রতিচ্ছবি রাখে না। সে মানুষ হোক বা জিন!”

আমি প্রশ্নটা করার সাথে সাথে হঠাৎ ওনার হাত ফসকে ছুরিটা ফল থেকে নিজের হাতে লেগে অনেকটা হাত কেটে গেলো। উনি হালকা চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু আমি তার হাতের দিকে তাকিয়ে প্রচন্ড পরিমানে অবাক হলাম। তার অনেকটা হাত কেটে যাওয়া সত্ত্বেও, হাতে এক ফোটাও লাল রঙের রক্ত নেই। বরং পুরো হাতের কাটা টাই একদম জ্বলন্ত আগুনে ঝলসে যাওয়া কয়লার মত। তবে সে কয়লা কালো নয় বরং সাদা রঙের। একদম খড়খড়ে সাদা কয়লা। যেন সেখান থেকে লাভা বের হচ্ছে। কিন্তু এমন তো হবার কথা নয়। আমি এবার ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গেলাম। কারণ যতদূর জানি আমার মা ছিল একজন মানব কন্যা। আর মানুষ হলে অবশ্যই তার শরীরে রক্ত বের হবে। কোন লাভা নয়। তাহলে কি উনি মানুষ নয়, কোনো জিন?

উনি আমার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে দ্রুত নিজের হাতটাকে লুকিয়ে বললেন,

–” তুই এখানেই থাক আব্রু। আমি এক্ষুনি আসছি।”

কথাটি বলে দ্রুত আমার চোখের সামনে থেকে বের হয়ে গেলেন। ওনাকে চলে যেতে দেখে মনে মনে সবকিছুকে মেলাতে লাগলাম। স্বপ্নের কথাগুলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে লাগলাম। এর আগে আমি যে স্বপ্নগুলো দেখেছিলাম সেগুলো সব কিছু এখানে আসার পর সত্যি হয়েছে। তার মানে একটু আগে দেখা স্বপ্নটারও কোনো না কোনো মানে নিশ্চই আছে।

আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পুরো রুমের মাঝে পায়চারি করতে করতে স্বপ্নের জিনিসগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলাম। স্বপ্ন দেখেছি অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। আর যখন গিয়ে থামলাম তখন একটি মাকড়সার জালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু মাকড়সার জালটা যেন, আসলে কোন মাকড়সার জাল নয়। সেটা ছিল কোন মায়াজাল। “মায়াজাল” কথাটা মনে পরতেই এখানে প্রাসাদের মধ্যে ঢোকার আগে সে কবিতাটার কথা মনে পড়ে গেল। যেখানে লেখা ছিল,

“শেষ ধাপে আছো তুমি
বিজয়ের অতি কাছে,
সামনে যা’ই পাবে খুঁজে
সবই সত্যি আছে।
শেষ ধাপ টা ভিষন ভয়ের
মায়াজালে বন্দি,
এখানে তুমি পাবে তাদের
যে করতে চাইবে সন্ধি।
ভুলেও যদি করো সন্ধি
হাড়াবে সকল আশা,
নিজের অজান্তে হাড়িয়ে ফেলবে
স্বামীর সত্যি ভালবাসা।
আর কখনো পারবে না ফিরতে
সেই পৃথিবীর বুকে,
যেখানে ছোট থেকে হয়েছো বড়
কাটিয়েছো দিন সুখে।”

কবিতা টার কথা মনে হওয়ার সাথে সাথে যেন ধীরে ধীরে সবকিছু পানির মত পরিস্কার হয়ে যেতে লাগল আমার কাছে। সেই সাথে ভীষণ ভাবে রাগ হতে লাগলো নিজের উপর। কিভাবে করলাম আমি এত বড় একটা ভুল? এখানে যে সবকিছু মায়াজালে ঘেরা সেটা কেন বুঝতে পারলাম না। এরা কেউই তো আমার মা-বাবা বা স্বামী নয়। তাহলে কেন সবাই এভাবে নাটক করছে আমার সাথে? আমাকে নিজের উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে দিতে? এসব কথা ভেবে মাথা ঘুরতে শুরু করলো। এখন কিভাবে এই মায়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করবো আমি। আর কী ভাবেই বা মুকুট এর কাছে পৌঁছাবো। চিন্তায় সারা শরীর কাঁপতে লাগল। সেই সাথে রাগটাও যেন কোনো ভাবেই কমছে না নিজের উপর থেকে।

হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে তাকালাম। মীর রূপি ইফ্রিত জিন আমায় ভয় পেতে দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,

–” কি হলো আব্রু, নিজের স্বামীকে দেখে এভাবে ভয় পেলে কেনো?”

ওনার কথার উত্তরে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়ে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে কাপাকাপা গলায় বললাম,

–“কই ভয় পাইনি তো। আসলে হঠাৎ করে কাঁধে হাত রাখায় কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।”

আমার কথার উত্তরে উনি অট্ট হাসি দিলেন। তারপর কাছে এগিয়ে এসে বললেন,

–” ওহ তাও ভালো! আমি তো ভাবলাম যে ভাবে ভয় পেয়ে সরে গেলে, তাতে আজ আমার আর ফুলসজ্জা করা হবে না তোমার সাথে।”

ওনার মুখে ফুলশয্যার কথা শুনে এবার আরো বেশি ঘাবড়ে যেতে লাগলাম। যেভাবেই হোক এই মায়াজাল থেকে বের হতে হবে আমায়। এদের কোনো না কোনো উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে যে কারণে এরা আমাকে এভাবে ভালো আচরণ দিয়ে আটকে রাখতে চাইছে। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে চাইছে। আমি জানিনা সে উদ্দেশ্যটা কি? তবে সেটা জানতে হলে এদের থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে। আর বুঝতে দেওয়া চলবে না আমি সবকিছু বুঝে ফেলেছি। তাই মুখে জোরপূর্বক হাসির রেখা টেনে আদুরে গলায় বললাম,

–” আপনার সাথে তো আমি ফুলশয্যা করবো না মীর।কারণ আপনার উপর আমি ভীষণ রেগে আছি।”

আমার কথা শুনে এবার উনি কিছুটা ভীত হয়ে গেলেন। ভিত কণ্ঠে বললেন,

–” কেন কি করেছি আমি, যে রেগে আছো তুমি। ফুলশয্যা ই বা কেন করতে চাও না? ”

ওনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল,

–“তার কারণ আমি এখানে এসেছি কতক্ষণ হয়ে গেল। অথচ এখনো আপনি আমাকে একটু জিন রাজ্য ঘুরে দেখালেন না। আপনি তো জানেন আমি পৃথিবীতে থেকেছি। তাই এখানের সব কিছু দেখার ইচ্ছাটা প্রবল।”

উনি যেনো হাফ ছেড়ে বাচলেন আমার কথায়। মুচকি হেসে বললেন,

–“আচ্ছা ঠিক আছে খাবার খেয়ে নাও তারপর নিয়ে যাবো।”

–“আমার পেট ভরাই আছে। তাই আমি এখনি যেতে চাই।”

কথাটা বলেই এক প্রকার জোর করে ওকে নিয়ে প্রাসাদ দেখতে বের হলাম। আমার উদ্যেশ্য সেই অদ্ভত রুমটা। যেখানে আছে সেই কাঙ্খিত মুকুট।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,