#রহস্যে_ঘেরা_ভালবাসা
#পর্ব_২৫_শেষ_পর্ব
#M_Sonali
প্রায় দুই ঘণ্টা হতে চলল মীর রুপি ঐ বদজিনের সাথে পুরো প্রাসাদটা ঘুরে ঘুরে দেখছি। কিন্তু এতক্ষণ অব্দি এমন কোন রুম চোখে পড়েনি যেটা দেখে সন্দেহ হবে। বা বুঝতে পারব যে ঐ রুমে মুকুটটা আছে। বুঝতে পারছি না এই জিনটা ইচ্ছে করেই আমাকে অন্য জায়গা দিয়ে ঘুরাচ্ছে নাকি এখনো সে রুম এর কাছে পৌঁছাতেই পারেনি আমরা। তবে বলতে গেলে জায়গাটা এতটাই সুন্দর যে বারবার মন থেকে সেই মুকুটের কথা হারিয়ে যাচ্ছে আমার। শুধু এই মায়াবি সৌন্দর্যের দিকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে মন। কিন্তু এভাবে কতক্ষন, যেভাবেই হোক নিজের উদ্দেশ্যে পৌঁছতে হবে আমাকে। আর সেটাও আজকের রাত হওয়ার আগেই। কারণ আজ রাতে ফুলশয্যার ব্যবস্থা করেছে ওরা। আর আমি এই বদ জিনটার সাথে কখনোই ফুলশয্যার কল্পনাও করতে পারি না।
আমি জানি এদের নিশ্চয়ই কোন না কোন উদ্দেশ্য আছে আমার সাথে এই নাটকগুলো করার। তাই এবার দ্রুত পা চালাতে লাগলাম সামনের দিকে। আর ভালোভাবে খেয়াল করতে লাগলাম চারিপাশে। এভাবে বেশ কয়েক পা সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে হঠাৎ সেই মীর রূপি জিন দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে ফেলল। তারপর উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
–” ওদিকে কোথায় যাচ্ছ আব্রু? ওদিকে যাওয়া নিষেধ। চলো আমরা এদিকে যাব। এদিকে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। আর ওদিকে গেলে তুমি ভয় পেয়ে যাবে।”
উনার কথার কোন গুরুত্ব না দিয়ে উনি যেদিকে যেতে নিষেধ করেছেন আমি দৌড়ে সে দিকেই যেতে লাগলাম। আর উনি এবার রাগী গলায় আমাকে ডাকতে ডাকতে পিছনে আসতে লাগলেন। জানি ওনার সাথে দৌঁড়ে পারবোনা। তবুও বৃথা চেষ্টা করে কিছুটা এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল অসম্ভব ভয়ংকর একটি অদ্ভত রুম। যে রুমটা পুরোটাই যেন ভয়ঙ্কর সব ছোট ছোট জীবজন্তু দিয়ে ঘিরে রাখা। আর ছোট ছোট সেই জীবগুলো ভয়ংকরভাবে চিল্লাচ্ছে। সেই চিল্লানোতে যেন শরীর শিউরে উঠলো আমার। চোখ বন্ধ করে অন্য দিকে তাকিয়ে হালকা চিৎকার করে উঠলাম। সাথে সাথে উনি রাগি গলায় বললো,
–” তোদের মানুষদের এক কথা একবার বললে গায়ে লাগে না তাই না? আমি তো তোকে আগেই বলেছি এখানে আসলে ভয় পেয়ে যাবি! তবুও কেন আসলি এদিকে? বলেছি না এদিকে আসা জিন রাজ্যের সকলের জন্য নিষেধ। আর তোর জন্য তো একদমই নিষেধ।”
ঐ জিনের কথায় হালকা ভয় পেলেও বুঝতে পারলাম এটাই সেই রুম। যেখানে রয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত মুকুট। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর রুমে কিভাবে প্রবেশ করব আমি? কিভাবেই বা এদের থেকে লুকিয়ে এখানে আসবো? রুম টার দিকে তাকাতেই সারা শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি দিয়ে কি করব এখন আমি?
কথাগুলো মনে মনে ভাবছি আর আনমনে সেই অদ্ভুত রুমটার দিকে তাকিয়ে রয়েছি। তখনই সেই জিন আমার হাত চেপে ধরে বলল,
–” এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না আব্রু। তাড়াতাড়ি চলো আমাদের ভিতরে যেতে হবে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। একটু পরেই আমাদের ফুলশয্যার আয়োজন। ”
কথাটা বলেই সে সামনের দিকে হাটা ধরলো। তার কথার উত্তরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
–“আচ্ছা আপনারা জিনে রা কেন ওই রুমটার কাছে যেতে পারবেন না? মানে নিষেধ কেন আছে, আমি কি জানতে পারি? ”
উনি আমার কথা অগ্নি দৃষ্টিতে ফিরে তাকালেন। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন,
–” আমাদের জন্য সেখানে যাওয়া বারণ। তার কারণ আমরা ঐ সীমানা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে পারিনা। সামনে গেলে আমাদের শরীরে আগুন ধরে যাবে। আর আমরা সেখানেই পুড়ে ছাই হয়ে যাব। ওই জায়গাটা আমাদের জন্যে অভিশপ্ত।”
উনার কথা শুনে আমার মুখে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। কারন আমি এই কথাটারই অপেক্ষা করছিলাম। তার মানে ওখানে গেলে আমাকে আর কেউ বাধা দিতে পারবে না। তবে ওই রুমের মধ্যে আমি প্রবেশ করব কিভাবে? অসম্ভব ভয়ানক সব ছোট ছোট জীবজন্তু কিলবিল করছে সেখানে। ওখানে পা রাখার সাথে সাথে ওগুলো আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে মেরে ফেলবে আমায়। তাহলে উপায়?
আমি যখন এসব ভাবতে ব্যস্ত তখনই সেই জিনটা আবার বলে উঠলো,
–” কি হলো এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন! চলো আমার সাথে।”
ওর কথার উত্তরে কোন কিছু না বলে এক দৌড়ে সেই রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার এমন কান্ড দেখে সে যেন রাগে গর্জে উঠলো। সে মীরের রূপ পাল্টে ভয়ংকর একরূপে পরিণত হল। এতটা ভয়ঙ্কর কোন কিছু এর আগে দেখিনি আমি। সারা শরীর শিউরে উঠল আমার। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল শরীর। মুহূর্তের মাঝে তার চারিপাশে অনেকগুলো জিন এসে প্রকট হল। কি ভয়ানক তাদের চেহারা। আর আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগল,
–” একপাও সামনে এগো বিনা আব্রু, তাহলে তোর মৃত্যুর জন্য তুই নিজে দাই হবি। ভেবেছিলাম তোকে মায়ার জালে ফাঁসিয়ে তোর সম্মতিতে তোর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে তোর সব শক্তি নিয়ে এই জায়গাটা দখল করব। আর ডাবল শক্তিশালী জিনে পরিণত হবো আমরা। কিন্তু সেটা তুই করতে দিলি না। তার মানে সব বুঝে গেছিস তুই। তোর আর বেঁচে থাকার অধিকার নাই। এখনোই তোকে শেষ করে ফেলব আমরা।”
কথাগুলো বলে রাগে গজরাতে লাগলো তারা। কিন্তু আমি সেদিকে তোয়াক্কা না করে চোখ বন্ধ করে “আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতোয়ানির রাজীম, বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” পড়ে সামনে কয়েক পা এগিয়ে এলাম। ভয়ে শরীর কেপে উঠল। মনে হলো সেই ছোট ছোট জীবজন্তু গুলো আমার শরীরে উঠবে হয়তো। কিন্তু না, চোখ মেলে তাকাতেই খেয়াল করলাম সেগুলো আমার চারিপাশ থেকে সরে গিয়ে আমাকে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। মনে মনে খুশি হলাম অনেক। মুখেও খুশির ঝিলিক ফুটে উঠল। দ্রুত রুমটার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু দরজাটা ভীষণ অদ্ভুত। বোঝাই যাচ্ছে না দরজার মুখ কোথায়। এদিকে পিছন থেকে সবাই বিকট শব্দে গর্জন করে চলেছে।
আমি এবার কোন কিছু না ভেবে আলতো করে দরজাটায় স্পর্শ করলাম। সাথে সাথে খটখট শব্দে খুলে গেল দরজা। এতে ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গেলাম। আমার স্পর্শে এভাবে এমন ভয়ঙ্কর দরজা খুলে যাবে সেটা কল্পনায়ও ছিল না। তবে সেইসাথে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল মুখে। আমি কোনোকিছু না ভেবে দ্রুত রুমের মাঝে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করতেই যেন আরো বেশী ঘাবড়ে গেলাম। নিজেকে এবার সাপেদের আস্তানায় আবিষ্কার করলাম। আমার চারিপাশে ছোট-বড় বিভিন্ন রকমের সাপে গিজগিজ করছে। একটি সুই রাখারও জায়গা নেই কোথাও। আর সব সাপের মাঝখানে একটি বিশাল ভয়নক মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। যে মূর্তি টাকে দেখতে এতটা ভয়ানক যা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়। আমি চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকালাম। সেইসাথে সারা শরীর কাঁপতে শুরু করেছে ভয়ে।তবুও নিজেকে সাহসী রাখার চেষ্টা করলাম। আর মনে করার চেষ্টা করলাম সেই কবিতাটা। সেখানে লেখা ছিলো,
“সব বাধা পেড়িয়ে যদি
সেই অদ্ভত রুমটা পাও,
একটুও দেরি না করে
দ্রুতো সেথায় যাও।
সেথায় অনেক হবে বিপদ
ভয়কে করো জয়,
যা কিছু সামনে পাবে
কিছুই সত্য নয়।
সেথায় পাবে বিশাল মূর্তি
ভয়ংকর এক রুপে,
সেটাই আসলে মুকুট তোমার
স্পর্শ করো নিশ্চিন্তে।”
কবিতাটা মনে পড়তেই মুখের হাসি ফুটে উঠল। তার মানে এখন আমি সামনে যা সব দেখছি তার কোনো কিছুই সত্য নয়। আর এই ভয়ংকর মূর্তি”ই হলো সেই মুকুট। কথাটা ভেবেই হাসি ফুটে উঠলো মুখে। তারপর মনে সাহস নিয়ে চোখ বন্ধ করে সামনে পা বাড়ালাম। তার আগে একবার বিসমিল্লাহ বলে নিলাম। সাথে সাথে সবগুলো সাপ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়ে আমাকে রাস্তা তৈরি করে দিল। আমি দ্রুত গিয়ে সেই ভয়ানক মূর্তিটার মাথায় হাত রাখতেই ভীষণ রকমের এক আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ে কেঁপে উঠল পুরোটা রুম। আর সেইসাথে বাইরে থাকা জিনদের ভয়ানক আর্তনাদ। সেই আলোকরশ্মির আলো সহ্য করতে না পেরে খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিয়ে নিচে হাটুগেরে বসে পরলাম।
এভাবে বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে যেতেই মীরের কথায় চোখ মেলে তাকালাম। সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে আদুরে কন্ঠে বলল,
–” সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে আব্রু। আমরা সবাই মুক্ত হয়ে গেছি। তুমি এখন উঠে দাঁড়াতে পারো। দেখো চারদিকে সব ঠিক আছে। ”
ওনার কথা শুনে আমি হাসিমুখে চোখ মেলে তাকালাম। চারিপাশে দেখতেই ভীষণ রকমের অবাক হয়ে গেলাম। কারণ এতক্ষণ যেটা একটি ভয়ঙ্কর রুম ছিল। সেটাই এখন অসাধারণ একটি ফুলের বাগানে পরিণত হয়েছে। তার চারিপাশে রংবেরঙের ফুল এবং নানা রকমের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। আর সামনে রাখা বিশাল এক চমৎকার পাথর, যে পাথরের উপর রয়েছে অসাধারণ সুন্দর একটি অমূল্য মুকুট। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে মীরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে উঠলাম,
–” আপনি এখানে কিভাবে এলেন মীর? আর ঐ বদ জিনেরা কোথায়? তারাতো এখানেই ছিল। এখানকার সেই ভয়ানক রুম টাই বা কোথায় গেল?”
আমার প্রশ্নের উত্তরে সে আমার দুবাহু ধরে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে বড় একটি চমৎকার পাথরের ওপর বসিয়ে দিলো। তারপর পাশে বসে আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলতে শুরু করল,
–” এতদিন তারা ইদ্রিস রাজ্যে থেকে এই ইদ্রিস রাজ্যের সবাইকে নিজেদের বন্দি বানিয়ে রেখেছিল। পাথরের মূর্তিতে পরিণত করে। আজ তোমার কারনে তারা নিজেরাই বন্দি হয়ে গেছে।তুমি যে মুহূর্তে ওই রুমে প্রবেশ করে ভয়ংকর মূর্তি রুপের মুকুটকে স্পর্শ করেছো, সেই মুহূর্তেই ওরা পালানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার আগেই ইদ্রিস জিনেরা জেগে ওঠে। আর তাদের ধরে ফেলে এবং বন্দী করে ফেলেছে। এখন সবকিছু নিরাপদ। সবাই নিজেদের আসল রূপ ফিরে পেয়েছে আব্রু। তুমি সফল হয়েছো তোমার উদ্দেশ্যে। তুমি আসলেই তোমার মা-বাবার যোগ্য সন্তান। তারা বেঁচে থাকলে তোমায় নিয়ে আজ গর্ব করতেন।”
ওনার কথা শুনে মনটা খুশি হয়ে গেল। আমি নিজের উদ্দেশ্য সফল হয়েছি! ভাবতেই ভীষণ রকমের আনন্দ লাগছে। নিজের বাবা-মায়ের আশা পূরণ করেছি। তাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছি। এর চাইতে বড় পাওয়া হয়তো আর কিছু হতে পারে না।
———————————
পৃথিবী থেকে জিন রাজ্যে এসেছি আজকে প্রায় 20 দিন হতে চলল। মুকুট উদ্ধার করার পর মীরের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিয়ে তাকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করেছি আমি। কারণ এই দায়িত্বটা নাকি আব্বু আমাকে দিয়ে গিয়েছিল। এখন মীর এই ইদ্রিস জিন রাজ্যের রাজা আর রানী হলাম আমি। এর মাঝে একদিন কিছু সময়ের জন্য পৃথিবীতে গিয়েছিলাম আমি আর মীর। পৃথিবীর সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি। তাদেরকে নিজেদের আসল পরিচয় সম্পর্কেও বলে এসেছি। যদিও এখানে আসার আগে আব্বু আম্মু আর হায়া ভীষণ কান্না করছিল! তবুও তাদের বুঝিয়ে এসেছি মাঝে মাঝে তাদের সাথে আমি দেখা করতে যাব বলে। এখন সবকিছু নতুন করে শুরু করেছি আমি এখানে মীরের সাথে। আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে। পূর্ণতা পেয়েছে একজন মানুষ এবং জিনের ভালোবাসা। মীর আমাকে এতটাই ভালোবাসে যেন এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের আড়াল হলে সে আমাকে চোখে হারায়। প্রতিটা মুহূর্তে নিজের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নিজের ব্যবহার এবং চোখের চাহনির দ্বারা বুঝিয়ে দিচ্ছে। তার ভালোবাসা পেয়ে আমার জীবনটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সত্যিই আমি ভীষণ ভাগ্যবতী তাই এমন একটি স্বামী পেয়েছি। সে হোক আমার জিন স্বামী। তাকে বড্ডবেশি ভালবাসি। হয়তো নিজের চাইতেও বেশি।
————-সমাপ্ত———-