#রাখি_আগলে_তোমায়_অনুরাগে💕
#written_by_Liza
#২য়_পর্ব_৩য়_পর্ব
ইন্সিয়া ম্যাসেজটুকু পড়ে বুঝতে বাকি রইলো না এটা অভিক রয়ের ম্যাসেজ, ইন্সিয়ার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝড়ছে। কালকের কথা ভাবতেই ইন্সিয়ার ভয়ে বুক মুচড়ে উঠছে।
ইন্সিয়া চোখ মুছে ফোনটা হাতে নিয়ে উষ্মীকে ফোন করে, উষ্মীর ফোনে রিং পড়ছে বারবার কিন্তু কোনো রেস্পন্স নেয়, ইন্সিয়া ম্যাসেজ দিয়ে রেখেছে উষ্মীকে
“উষ্মী কাল সকালে বাসায় আসিস আমাকে নিতে,আমার শরীরটা ভালো না তেমন।”
ম্যাসেজটুকু দিয়ে ইন্সিয়া ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোর বেলা….
ইন্সু উঠ আমি এসেছি, কাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রে,উঠ না, আজ কলেজ ফাংশন আছে ভুলে গেলি? (উষ্মী)
ভেতরের রুম থেকে ইন্সিয়ার আম্মু এসে বলতে লাগলো,
“কিসের ফাংশন রে মা,আমাকে তো ইন্সিয়া কিছু বললো না”
উষ্মী মাথায় হাত দিয়ে জ্বীভে কামড় বসিয়ে দিয়ে বলে “আন্টি আপনাকে ইন্সু বলে নি?আমাদের এক্সাম শেষ, তাই স্যার,ম্যামদেরকে বলেছিলাম আমাদের কলেজে একটা ছোটখাটো ফাংশন করতে। তাই ডেট ফিক্স করে আজ ফাংশন ফেললো ম্যামরা,”
“ওহ তাই বলো মা।ইন্সিয়া তো কাল থেকে এ ব্যপারে কিছু বলে নি।বেশ ক’দিন ধরে অন্যমনস্ক, এক্সাম কি ওর ভালো হয়েছে? তুমি না ওর পাশে বসছিলা! এক্সামের সময়”
হাতে রান্নার খুন্তি নিয়ে ইন্সিয়ার আম্মু উষ্মীকে কথাগুলো বলছে।
উষ্মী মিট মিট করে হেসে বলে “আন্টি এক্সাম অনেক ভালো হয়েছে ইন্সিয়া তো ফুল মার্ক করে এসেছে এক্সামে,আমাদের আবার কিসের টেনশন”
ইন্সিয়ার মায়ের নাকে রান্নার ঘ্রান আসতে বলে উঠলো “আমার তরকারি বোধহয় পুড়ে ছাই,দেখেছো কান্ড? আমি যাই বাবা অনেক কাজ।নবাবজাদীকে ঘুম থেকে তুলো তো মা,এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে,আমাদের কথা তাঁর কানেই যাচ্ছে না। বড্ড অবাধ্য” কথা শেষ করে দ্রুত চলে গেলো ইন্সিয়ার আম্মু রান্নাঘরে।
উষ্মী ইন্সিয়াকে টেনে তুলে ঘুম থেকে, ইন্সিয়া ঘুমচোখে উষ্মীকে দেখে হায় তুলতে তুলতে বলে “আরেকটু আগে ডাকতে পারলি না,এখন ডাকছিস অলরেডি লেট,”
বা রেহ! আমি কতবার ডেকেছি তোর হিসাব আছে? ষাড়ের মতো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস আবার কথা,যা উঠে ফ্রেস হয়ে রেডি হো আর একঘন্টা বাকি আছে (উষ্মী)
ইন্সিয়া ঢুলতে ঢুলতে চলে গেলো ফ্রেস হতে, ফ্রেস হয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে ইন্সিয়া তৈরি হতে লাগলো, অমনি ইন্সিয়ার ফোনে টুং টাং ম্যাসেজ আসতে লাগলো, উষ্মী যেই না ফোনে হাত দিবে তখনই ইন্সিয়া ছো মেরে মোবাইল হাতে নিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে “কি দেখছিস হুম?”
উষ্মী ইন্সিয়ার এমন কান্ডে থ বনে গেলো, ইন্সিয়া উষ্মীর দিকে এতটা গুরুত্ব না দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে ম্যাসেজ গুলো চ্যাক করতে লাগলো।
ম্যাসেজ ফোল্ডারে সেই আননোন নাম্বার থেকে আবারো ম্যাসেজ, ইন্সিয়ার এবার ভয়ে হাত পা কাঁপতে শুরু করে।
ইন্সিয়া ম্যাসেজ চ্যাক না করে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দেয়। উষ্মী ইন্সিয়ার দিকে তাকিয়ে ইন্সিয়ার ফোনটা হাতে নেয়, অমনি উষ্মী চোখ বড় বড় করে ম্যাসেজগুলো পড়ছে। ম্যাসেজে লিখা ছিলো
“আর কতক্ষণ লেট করবে ইন্সিয়া ডার্লিং, আমি অপেক্ষা করছি কিন্তু, আজ তুমি আমাকে খুশি করতে পারলে, বড় একটা গিফট পাবে। লেট করোনা সোনা চলে এসো জলদি,ইটস ইউর অভিক রয়”
উষ্মী ম্যাসেজটুকু পড়ে বাকি ম্যাসেজগুলো পড়ার সাহস পেলো না,উষ্মী ইন্সিয়ার সামনে দাড়িয়ে বলতে লাগলো “এসব কি ইন্সিয়া? তুই অভিক স্যারের সাথে কিসের দেখা করবি? কিসের খুশি করার কথা বলছিলো স্যার?”
ইন্সিয়া উষ্মীর মুখ চেপে ধরে বলতে লাগলো “প্লিজ এখানে কিছু বলিস না বোন,আম্মু আব্বু জানতে পারলে আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলবে,আমি তোকে সব বলবো তাই তোকে ডেকেছি”
উষ্মী ইন্সিয়ার হাত ছাড়িয়ে বলে “ঠিকাছে চুপ হলাম,কিন্তু কিছু লুকোবি না ইন্সু, আমার ব্যপারটা মোটেও ভালো লাগছে না”
ইন্সিয়া মাথা নত করে চুপ করে আছে,উষ্মী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ইন্সিয়ার লেহেঙ্গায় পিন আপ করতে লাগলো। ইন্সিয়া হলদে-সোনালি রংয়ের লেহেঙ্গা পড়েছে উষ্মীর সাথে মিলিয়ে। উষ্মী হলদে-ছাই রংয়ের লেহেঙ্গা পড়ে এসেছে আজ। ঠিক ইন্সিয়াও তেমন’ই লেহেঙ্গা পড়েছে। দুই বান্ধবী মিলিয়ে সবসময় চলাফেরা করে,আজো তাই করলো।
ইন্সিয়া উষ্মী তৈরি হয়ে ঘর থেকে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো, গাড়িতে বসা মাত্রই এবার উষ্মী ইন্সিয়াকে বলতে লাগলো
“এবার বল ইন্সু কি হয়েছে, ব্যপার টা কি?”
ইন্সু এবার এক এক করে সেদিনের সব ঘটনা বলতে লাগলো, উষ্মী ইন্সিয়ার কথা শুনে ঢোক গিলছে আর বলছে
“তুই ভয় পাস না আমি আছি তো, তোকে ঐ শয়তান টা কিছুই করতে পারবে না। আমরা ঐ শয়তানকে আজ’ই এক্সপোস করবো সকলের সামনে”
ইন্সিয়া উষ্মীর হাত চেপে ধরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
গাড়ি এসেছে থেমেছে কলেজের সামনে,উষ্মী ইন্সিয়া ভাড়া মিটিয়ে কলেজের একপাশে দাড়ালো, অমনি আবারো সেই নাম্বার থেকে ম্যাসেজ আসতে লাগলো,উষ্মী ইন্সিয়ার হাত থেকে ফোন নিয়ে বলে “দাড়া সিম টা খুল জলদি,”
ইন্সিয়া উষ্মীর কথামতো সিম খুলে উষ্মীর হাতে দেয়, উষ্মী সিম টা হাতে নিয়ে বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে বলে “ইন্সু তুই তো আমাকে ভিতু বলিস,আজ দেখবি এই ভিতু কি কি করতে পারবে, আমাকে বিশ্বাস করিস তো ইন্সু?”
ইন্সিয়া ভয়চোখে উষ্মীর দিকে তাকিয়ে বলে “অনেক রে,তাই তোকেই বলেছি”
উষ্মী ইন্সিয়ার হাত ধরে সিম টা নিয়ে সোজা অফিস রুমে চলে যায়, অফিস রুমে সব স্যার ম্যাম উপস্থিত কিন্তু অভিক রয় নেই সেখানে। উষ্মী সিম টা নিয়ে সোজা হেড ম্যামের কাছে যায় আর বলে “ম্যাম আসসালামু আলাইকুম, আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো, এবং আপনার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি”
ম্যাম চোখ থেকে চশমা খুলে মুচকি হাসি দিয়ে বলে “ওয়ালাইকুম সালাম মাই গার্লস, সিট ডাউন (চেয়ারের দিকে তাক করে)বলো তোমাদের কি সাহায্য করতে পারি”
উষ্মী ইন্সিয়াকে ইশারা দিয়ে চেয়ারে বসতে বলে তার পাশে, উষ্মী ইন্সিয়া দুজন’ই বসে পড়ে চেয়ারে। উষ্মী ম্যামের দিকে তাকিয়ে সিমটা এগিয়ে দিয়ে বলে
“ম্যাম এই সিমটা রাখুন, এই সিমে এই কলেজের মধ্যে কেউ একজন নোংরা ম্যাসেজ পাঠাচ্ছিলো। আর কিসের ডিল এর কথা বলছিলো। যদি আমরা রাজি না হয় তাহলে ক্যারিয়ার নস্ট করে দিবে, যেহেতু এই কলেজ থেকে এমন ম্যাসেজ এসেছে সেহেতু আপনাকে জানানোটা আমি গুরত্ব মনে করি। আমার পরিবারের কেউকে জানাইনি কলেজের রেপুটেশন খারাপ হবে বলে, তাই আপনাকেই সর্বপ্রথম জানিয়েছি। আপনি যদি সাহায্য না করেন তাহলে পরিবারকে জানিয়ে সাহায্য চাইতে হবে”
ম্যাম চোখ বড় বড় করে সিমটা দেখতে লাগলো আর বলতে লাগলো “আচ্ছা একটু বসো তোমরা আমি দেখছি, আর হে এসব কথা কেউকে বলো না প্লিজ। খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছো আমাকে জানিয়ে তোমরা। আমি নিশ্চয় হেল্প করবো।আমি আসছি দাড়াও”
ইন্সিয়া ভয়ে উষ্মীর হাত চেপে ধরলো আর বললো “বোন আমার ভয় লাগছে আমাদের ক্ষতি হবে না তো?”
উষ্মী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ইন্সিয়াকে বললো “আমায় ভরসা করিস তো? তাহলে শোন এই ২৫ মিনিটের ভেতর তোর জীবন পাল্টে যাবে”
ইন্সিয়া উষ্মীকে খুব বিশ্বাস করে তাই উষ্মীর কথায় চুপ করে রইলো।
একটু পর হেডম্যাম এসে সামনে চেয়ারে বসলো, ম্যামের হাতে একটা বাটন মোবাইল আর এক হাতে সিম। ম্যাম উষ্মীর দিকে তাকিয়ে মোবাইলটা টিস্যু দিয়ে মুছতে লাগলো আর বললো “বেশ পুরোনো ফোন, দাড়াও সিমটা কানেক্ট করি,এরপর আমি বুঝবো বাকিটা”
উষ্মী মৃদু হেসে হাতজোর করে বলে “আমাদের দিকটা ম্যাম একটু ভাববেন প্লিজ,আমরা আপনাদের ভরসায় এই কলেজে শিক্ষা গ্রহণ করতে আসি, যদি এখানে হ্যারেজ হয় তাহলে আমরা যাবো কোথায়, আজ আমাদের সাথে এমন হলো কাল অন্যকারো সাথে হয়তো এর চেয়ে জঘন্য হবে। সবাই তো আমাদের মতো আপনার কাছে সাহায্য চাইতে আসবে না। তখন দেখবেন অনেকে হয়তো পুলিশ নিয়ে কলেজে চলে এসেছে। রেপুটেশন আর থাকবেনা আমাদের কলেজের”
হেড ম্যাম কথাগুলো শুনছে আর সিম কানেক্ট মোবাইল অন করছে। ইতিমধ্যে মোবাইলে অনেকগুলো ম্যাসেজ এসে জমা হলো। ম্যাম অধীর আগ্রহে এক এক করে ম্যাসেজ সবগুলো পড়লো। ম্যামের আর বুঝতে বাকি রইলো না কিছু। ম্যাম উষ্মী আর ইন্সিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
“তোমরা এনজয় করো পার্টি। বাকিটা আমি দেখছি, আর হে এসব কথা তোমরা কেউকে শেয়ার করবে না। সিমটা আমার কাছে থাকুক, আমি তোমাদের ক্ষতি হতে দেবো না।যাও তোমরা”
ইন্সিয়া আর উষ্মী ম্যামকে সালাম দিয়ে চলে গেলো ক্লাসে।
ম্যাম অভিক রয়কে ম্যাসেজ দিলো ইন্সিয়ার হয়ে “স্যার আপনি ওখানেই থাকুন। আমি আসতেছি, আপনার ডিল আমি এক্সেপ্ট করেছি”
অভিক রয় ম্যাসেজ পেয়ে সাথে সাথে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে উঠে “ঘুঘু এবার জালে ফেসেছে। অভিক দাদা তুমি বড়ই খেলোয়ার, খাসা মাল জুটিয়েছো ফাদে ফেলে”
ম্যাম ইন্সিয়ার হয়ে ম্যাসেজ দিয়ে হাসতে লাগলো আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো “স্যার আপনি এবার ফেসে গেলেন। আমার কলেজের মেয়েদের হ্যারেজ। আমি আইরিন থাকতে এটা হতে দেবো না।অপেক্ষা করুন সারপ্রাইজের জন্য”
অভিক রয় স্টোর রুমে আনন্দে অপেক্ষা করতে লাগলো, ইতিমধ্যে দুটো পুলিশ কন্সটেবল কলেজে হাজির। ম্যাম কন্সটেবলগুলোকে নিয়ে স্টোর রুমের দিকে এগোচ্ছে..
চলবে……
( শুরুটা আমি ভিন্ন থিমেই করেছি,জানি স্যারের কুকীর্তি অনেকে নেগেটিভ নিচ্ছেন,কিন্তু এমন স্যার আশেপাশে অনেক আছে মুখোশের আড়ালে,আমি সেটাই গল্পে প্রকাশ করেছি।এই গল্পে হাসি/কান্না/নেগেটিভ /পজেটিভ সব মিক্স। তাই এক পর্ব পড়ে বিচার করবেন না। সবার গঠনমূলক কমেন্ট চাই।আশা করি নিরাশ করবেন না)
#রাখি_আগলে_তোমায়_অনুরাগে💕
#written_by_Liza
#৩য়_পর্ব
অভিক রয় স্টোর রুমে আনন্দে অপেক্ষা করতে লাগলো, ইতিমধ্যে দুটো পুলিশ কন্সটেবল কলেজে হাজির। ম্যাম কন্সটেবলগুলোকে নিয়ে স্টোর রুমের দিকে এগোচ্ছে, কন্সটেবল গুলোকে হেডম্যাম সিম আর মোবাইল জমা দিয়ে স্টোর রুমের দিকে এগোতে লাগলো।
কলেজের বাকি স্যার/ম্যাম কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না, হেডম্যাম সবাইকে স্টুডেন্টদের সাথে এনজয় করতে বলে চলে গেলো নিজের কাজে।
অভিক রয় অতি আগ্রহে স্টোর রুমে পায়চারি করছে আর ভাবছে
“অভিক দা আজ তো তোর ঈদ, মেয়েটা এত ভয় পেলো যে, তোর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে বাধ্য হলো। এটাই তো মোক্ষম সময়”
দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখমুখ খিঁচিয়ে হাসতে লাগলো অভিক রয়। ইতিমধ্যে হেডম্যাম স্টোর রুমের দরজা খুলে সামনে দাড়িয়ে রইলো। অভিক রয়ের চোখ পড়তেই তব্দা হয়ে হেডম্যামের দিকে তাকিয়ে আছে। হেডম্যাম পুলিশ কন্সটেবলকে সাথে সাথে স্টোর রুমে ডুকতে দেয় নি। হেডম্যাম প্রথমে নিজেই স্টোর রুমে ডুকে অভিক রয়ের কান্ড দেখছিলো। অভিক রয় হেডম্যাম কে দেখে তোতলাতে তোতলাতে বলতে লাগলো,
“ম্যা ম্যা ম্যা….ম্যাম আপনি?”.
কেন? অন্যকেউ আসার কথা ছিলো নাকি স্যার? (হেডম্যাম)
অভিক রয় কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা,অভিক রয় উঁকিঝুকি দিয়ে ইন্সিয়াকে খুঁজতে লাগলো, অমনি হেডম্যাম বলে উঠে
“কাউকে খুঁজছেন নাকি স্যার?”
অভিক রয় তথমত খেয়ে বলতে লাগলো “না ম্যাম চলুন অফিসরুমে যায়”
হেড ম্যাম রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে উঠে “তা তো আমরা সকলেই যাবো যে যার কাজে কিন্তু নির্দিষ্টভাবে অফিস রুমেই যে যাবো তা বলতে পারছি না”
অভিক রয়ের কিছুটা খটকা লাগলো, অভিক রয় হেডম্যামের পায়ের নিচে বেঞ্চ ফেলে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতেই, বাহিরে থাকা কন্সটেবলগুলো অভিক রয়কে ধরে ফেলে। অভিক রয় আটকা পড়ে যায় কন্সটেবলের হাতে। হেডম্যাম অভিক রয়ের দিকে তাকিয়ে বলে
“ভাগ্যিস এমন নরপিশাচ ধরা পড়েছেন, নয়তো আমার কলেজের মেয়েদের আপনি শুষে খেতেন। নিয়ে যান আপনারা এই পশুকে,যা যা প্রমাণ ডকুমেন্টস লাগবে আমি দেবো আপনাদের, আর একটা কথা আপনারা সিমের কল লিস্ট গুলো ট্রেক করে আমাকে জানাবেন।আমি দেখতে চাই এই নরপশু লোকটা আর কতজনকে এভাবে ফাঁসিয়েছে”
কন্সটেবলরা অভিক রয়ের হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দেয়, অভিক রয় খিলখিল করে হেসে দিয়ে বলে
“এত বাড়াবাড়ি ঠিক না,চলুন আমরা ব্যপারটা এখানে মিঠিয়ে ফেলি।”
হেডম্যাম চিৎকার করে বলে উঠে অভিক রয়কে
“শাট আপ, নির্লজ্জ, বেহায়া, নিজের সন্তান বয়সী মেয়েদের সাথে এসব করতে আপনার বুক কাঁপলো না একটিবার? আমি আপনাকে এর শাস্তি এক এক করে দিয়ে ছাড়বো, নিয়ে যান আপনারা ওঁকে”
কন্সটেবল গুলো টানতে টানতে অভিক রয়কে নিয়ে যেতে লাগলো। পুরো কলেজের স্টুডেন্ট, মাঠে সমাবেশে বক্তৃতা শুনছিলো, তারা সবাই এমন দৃশ্য দেখে অবাক পর্যায়ে। সবাই বসা থেকে দাড়িয়ে যায়। অভিক রয় যেতে যেতে ইন্সিয়ার দিকে তাক করে বলতে থাকে,
“তোকে তো আমি ছাড়বো না। তোর শেষ আমি দেখে নিবো দেখিস”
ইন্সিয়া ভয়ে উষ্মীর পেছনে আড়াল করে দাড়ায়।সবাই ইন্সিয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে ঠিক অমন সময় হেডম্যাম এসে বলে
“হ্যালো মাই গার্লস..প্লিজ সিট ডাউন.”
সবাই বেশ উৎসুক হয়ে বসে পড়ে, হেডম্যাম এবার বলতে শুরু করে
“শোনো মেয়েরা,আজ যা দেখেছো তা আগামীতে আবারো দেখতে পারো। তাই তোমাদের সতর্ক হওয়া চায়। আমরা মানুষ আমরা ভুল করি,কিন্তু ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া কি ঠিক? বলো তোমরা।”
সবাই উচ্চস্বরে বলে উঠে “নো ম্যাম”
হেডম্যাম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে
“আমাদের কলেজে এমন একজন পশু লুকিয়ে ছিলো,যে দিনশেষে নিজের চাহিদার জন্য আমাদের কলেজের মেয়েদেরকে টার্গেট করতো,কিন্তু সবাই কি আর সব পেরে উঠতে পারে? হুম? অনেকে নিজে বাচাঁর জন্য পশুদেরকে প্রশ্রয় দেয়। অনেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়, যেমটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে আমাদের’ই কলেজের দুই মেয়ে ইন্সিয়া এবং উষ্মী, যাদের জন্য আমরা এই নরপশুকে চিনতে পেরেছি। তাদের বুদ্ধিমত্তার জন্য আমরা নিজেরা এই পশুর হাত থেকে বেচেঁছি। ইন্সিয়া এবং উষ্মীর সাহসিকতার জন্য জোরে হাত তালি দাও মেয়েরা”
সবাই করতালি দিয়ে ইন্সিয়া আর উষ্মীকে দেখছিলো,
ইন্সিয়া উষ্মীকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে আর বলে “তুই না থাকলে আমি কি করতাম উষ্মী? আমি হয়তো ঐ লোকটার হাত থেকে বাঁচতাম না”
উষ্মী মুচকি হেসে বলে “খুব তো বলেছিলি আমি ভীতু, ভুতের ভয়ে সেদিন পালিয়েছি। শোন আমি যদি সেদিন না পালাতাম তাহলে এই অভিক রয়ের সত্যতা কখনো সামনে আসতোনা। মনে রাখবি কিছু ভুল পরবর্তী ভালোর জন্যই হয়। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন”
ফাংশন শেষের দিকে। সবাই যে যার মত করে বাড়ি ফিরছে। ইন্সিয়া আর উষ্মী অফিসরুমে গিয়ে হেডম্যামকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে
“ম্যাম আমার ইংলিশ খাতাটা একটু দেখবেন প্লিজ। আমি প্রতিটা এক্সাম টেস্টে খারাপ করেছি। আমি ভালো পরীক্ষা দিয়েও ফেইল করেছি। প্লিজ ম্যাম একটু খাতাটা দেখবেন।”
হেডম্যাম ইন্সিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে “নিশ্চয় এটা আমাদের কর্তব্য তুমি চিন্তা করো না,নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও। আর হে যদি কখনো এমন প্রব্লেম ফেইস করো তাহলে আমাকে জানাবে।লুকোবে না”
ইন্সিয়া খুশিতে হেডম্যামকে বিদায় জানিয়ে উষ্মীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কলেজ থেকে, ইন্সিয়া আজ মুক্ত প্যারা থেকে। ইন্সিয়া উষ্মীকে নিয়ে রাস্তার এক পাশে হাটতে হাটতে বলতে লাগলো “চল দোস্ত আজ অনেক খুশি লাগছে। আই আমরা ফুচকা খাবো, ঘুরবো রিকশা করে”
উষ্মী মুহুর্তে রাজি হয়ে যায় আর বলে
“ইয়েপ বনু হামারি তারাফছে পার্টি তো বানতিহে। চল”
ইন্সিয়া উষ্মী রিকশা ঠিক করে উঠে পড়ে দুজনেই। সামনে মোড় পেরোতেই ফুচকার দোকান রাস্তার পাশে। ইন্সিয়া ভাড়া মিঠিয়ে ফুচকার দোকানের সামনে গিয়ে বলতে লাগলো “কাকু ঝাল দিয়ে দুই প্লেট ফুচকা দেন তো”
উষ্মী নিষেধ দিয়ে বলে “আমি ঝাল খাবো না বোন। আমি ঝাল খেতে পারিনা”
ইন্সিয়া হেসে বলে
“বড় আর হলি না, আমাকে দেখে শিখ।”
ফুচকাওয়ালা তাদের কথা থামিয়ে দিয়ে ফুচকার প্লেট হাতে দেয়,ইন্সিয়া উষ্মী ফুচকা খেতে লাগলো। ইন্সিয়ার পাশের দিকটাতে রাস্তায় ছোট ছোট অনেক গর্ত, যেখানে বৃষ্টির কারণে পানি ভরে গিয়েছে। ইন্সিয়ার কোনো খেয়াল’ই নেই সেদিকে,লেহেঙ্গা মাটিতে ছড়িয়ে আছে।
উষ্মী ফুচকা মুখে দিয়ে দুরে খেয়াল করে দেখে কালো কার একটা খুব দ্রুত গতিতে এদিকটা আসছে,বুঝা যাচ্ছে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছে কার’টা। উষ্মী ইন্সিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার আগেই কার এসে দ্রুতগতিতে গর্তের পানিগুলো দিয়ে ইন্সিয়াকে ভিজিয়ে দিলো। উষ্মী ফিক করে হেসে দিলো। ইন্সিয়া রেগেমেগে উষ্মীর দিকে তাকাচ্ছে আর কাপঁড়ের দিকে তাকাচ্ছে নিজের।
ফুচকাওয়ালা ইন্সিয়ার দিকে তাকিয়ে পানির বোতল এগিয়ে দেয় আর বলে “মা কাফড়ের নিচেরডি ধুইয়া ফালাও। জায়গা ভাঙ্গাচুরা হের লাইজ্ঞা এমন অইছে গাড়িডার দোষ নাই”
ইন্সিয়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে “কাকু আমার এত সুন্দর লেহেঙ্গা খবিশ ব্যাটা ভিজিয়ে দিলো”
উষ্মী ইন্সিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বলে “আরে গাড়িটার ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে মনে হচ্ছে। আল্লাহ জানে এক্সিডেন্ট হলো কি না। তুই এদিকে লেহেঙ্গার চিন্তা করিস? ওদিকে গাড়ির ভেতর যদি কোনো যাত্রীর ক্ষতি হয়?চল তো গাড়ি মনে হয় খুব দুর যেতে পারেনি। দেখি কি হয়েছে”
উষ্মী ফুচকার ভাড়া মিঠিয়ে ইন্সিয়ার হাত ধরে সামনে হাটতে লাগলো, উষ্মীর চোখ পড়লো ঠিক সেই গাড়িটার উপর। সেই কালো কার। কারের সামনের দিকটা ভেঙ্গে গিয়েছে খানিকটা বুঝায় যাচ্ছে, উষ্মী ইন্সিয়ার হাত ধরে যেতে লাগলো আর বলতে লাগলো
“দেখেছিস কার টা এক্সিডেন্ট করেছে। ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছে। নয়তো এভাবে কেউ গাড়ি চালায় না। আমি তোকে বলার আগেই কার’টা তোর পাশ দিয়ে তোকে ভিজিয়ে চলে গেলো। আই দেখি ভেতরের মানুষগুলো ঠিক আছে কি না”
চারপাশে মানুষের ভীড় গাড়িটা ঘিরে। ইন্সিয়া লেহেঙ্গা ধরে দৌড়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাড়ালো। লোকজনকে উষ্মী সাইড করে সামনে এগিয়ে গেলো।
ভেতরে কালো গ্লাস কিছুই বুঝা যাচ্ছিলো না। সামান্য গাড়ির সামনে একটু ভেঙ্গে গিয়েছে এত গভীর কিছু হয়নি গাড়ির। ইন্সিয়া গাড়ির গ্লাসে ধাক্কা দিতে লাগলো। অমনি গ্লাস নামিয়ে দ্রুত বেগে একটি ছেলে বেরিয়ে পরলো। পেছনের গাড়ির দরজা খুলে ছেলেটি কোলে করে একটা অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে নিয়ে সোজা হাটতে লাগলো। গাড়ির চাবি গাড়ির সিটে ফেলেই পাগলের মতো তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো মেয়েটিকে নিয়ে। ইন্সিয়া চাবিটা হাতে নিয়ে উষ্মীকে নিয়ে ছেলেটার পিছু নিলো।
সামনে ক্লিনিকের ভেতর ছেলেটি মেয়েটিকে নিয়ে প্রবেশ করলো, উষ্মী ইন্সিয়ার হাত ধরে বললো “মনে হচ্ছে রে মেয়েটির হাসবেন্ড। মেয়েটি প্রেগন্যান্ট খুব বাজে অবস্তা তাই তো ছেলেটি তাড়াহুড়ো গাড়ি চালাতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছে”
ইন্সিয়া অন্যমনস্ক হয়ে বলে “হুম রে আমারো তাই মনে হচ্ছে। আমরা ভেতরে অপেক্ষা করি চল। লোকটি বের হলে তার গাড়ির চাবিটি তাকে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাবো”
উষ্মী আর ইন্সিয়া ক্লিনিকের ভেতরে অপেক্ষা করতে লাগলো। ছেলেটি ডক্টরের পেছনে পাগলের মত ছুটছে আর বলছে
“প্লিজ ডক্টর খুব ইমার্জেন্সি পেশেন্ট একটু দেখুন, যত টাকা লাগবে আমি দেবো। আমার পেশেন্টের যেনো কিছু না হয়”
ডক্টর ছেলেটির কাঁধে হাত দিয়ে বলে
“বুঝেছি মিস্টার আরাশ, কিন্তু এই মুহুর্তে দুই ব্যাগ ‘ও পজেটিভ’ ব্লাড লাগবে। পেশেন্টের অবস্তা ক্রিটিকাল। এখানে টাকার জোর দিয়ে কিছু হয়না মিস্টার আরাশ। আপনি যত দ্রুত পারেন ও পজেটিভ ব্লাড যোগাড় করেন, নয়তো পেশেন্টকে বাঁচানো যাবে না।”
উষ্মী ইন্সিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে “দোস্ত তোর ব্লাড তো ও পজেটিভ। তুই দিয়ে দে না। মেয়েটা বাঁচবে না রে আরেকটু দেরী হলে”
ইন্সিয়া প্রথমে উষ্মীর কথায় না করলেও পরে অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটির কথা ভেবে রাজি হয়ে যায়। ইন্সিয়া আর উষ্মী ডক্টরের কাছে গিয়ে সবটা বলে, ডক্টর ইন্সিয়াকে বলে “ঠিকাছে আপনি স্বেচ্ছায় যেহেতু ব্লাড দিবেন তাহলে আগে আপনার টেস্ট করা দরকার। হুটহাট যেকোনো ব্লাড আমরা নিতে পারিনা এতে পেশেন্টের ক্ষতি, চলুন ল্যাবে”
ইন্সিয়াকে নিয়ে ডক্টর চলে গেলো। কারণ ডক্টরের কাছে সময় নেই, তাই ডক্টর আরাশের অপেক্ষা না করে ব্লাড ডোনাটের জন্য ইন্সিয়াকে তাড়াহুড়ো ক্ক্রে ল্যাবে নিয়ে চলে যায়।
ইন্সিয়ার ব্লাড পেশেন্টের জন্য গ্রহনযোগ্য, তাই ইন্সিয়াকে সরাসরি পেশেন্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ইন্সিয়া পেশেন্টের পাশের বেডটিতে শুয়ে আছে। ইন্সিয়া পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে দেখে।পেশেন্টে মুখে অক্সিজেন লাগানো, পেশেন্টের অবস্তা শোচনীয়।
ডক্টর ইন্সিয়ার কাছ থেকে পেশেন্টের জন্য এক ব্যাগ ব্লাড ডোনাট করলো।
ইন্সিয়া ব্লাড দিচ্ছে আর ভাবছে
“আমার এক ব্যাগ ব্লাডের জন্য কারো দুটো জীবন বাঁচবে। আল্লাহ যদি আবারো চাই আমি আবারো দিবো ব্লাড। তবুও বেঁচে থাকুক মা ও তাঁর সন্তান”
অন্যদিকে মিস্টার আরাশ ব্লাড ডোনাট করতে বেরিয়ে পড়েছে, উষ্মী বাহিরে বেঞ্চিতে বসে ইন্সিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। ইন্সিয়ার আম্মুকে উষ্মী ফোন দিয়ে সব বলে দিয়েছে,তারা যেনো চিন্তা না করে উষ্মী তাদের জানিয়ে দিয়েছে তারা ক্লিনিকে।
একটু পর মিস্টার আরাশ এসে হাতে এক ব্যাগ ব্লাড নিয়ে ডক্টরকে বলতে লাগলো আমি এসে গিয়েছি ডক্টর। জলদি করুন।ডক্টর মুখ থেকে মাস্ক খুলে বলে, “এখন এসবের দরকার পড়বে না”
আরাশ শক্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে আর বলছে “মানে?”
চলবে……..
(ইসস এবার বোধহয় নায়কের দেখা মিলবে না,গঠনমূলক কমেন্ট করবেন সবাই। ভুলক্রুটি
ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)