রাখি আগলে তোমায় অনুরাগে পর্ব-১০

0
625

#রাখি_আগলে_তোমায়_অনুরাগে💕
#written_by_Liza
#১০ম_পর্ব

উষ্মী ইন্সিয়ার এমন কান্ডে মনে মনে হাসছে আর বলছে “ইন্সু মনে হচ্ছে তোর গায়ে প্রেমের হাওয়া লেগেছে, ইন্সু তুই তো এবার গেলি”

উষ্মী ওয়েটারকে ডেকে বিল পে করতে গেলেই ওয়েটার বলে “বিল দেওয়া লাগবে না ম্যাম,অলরেডি পেইড। আরাশ স্যার করে দিয়েছেন”

উষ্মী কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ হয়ে যায়। ইন্সিয়া আর উষ্মী বাড়ির দিকে রওনা হয়। গেইটের সামনে উষ্মী ইন্সিয়াকে পৌছে দিয়ে নিজের বাসায় চলে গেলো উষ্মী।
আজো ফের দেরী আসতে (ইন্সিয়ার আম্মু)
ইন্সিয়ার আম্মু চেয়ারের একপাশে বসে ইন্সিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ইন্সিয়া পা টিপে টিপে দৃষ্টির অগোচরে রুমে ডুকতেই মায়ের আওয়াজে আৎকে উঠে ভয়ে, ইন্সিয়া পেছন ফিরে আমতা আমতা করছে তাঁর মাকে দেখে, ইন্সিয়ার হাতে কাগজের ব্যাগ দেখে ইন্সিয়ার আম্মু ইশারায় জিজ্ঞেস করে, “ব্যাগে ওটা কি?”

ইন্সিয়া কোনো কথা না বলে ব্যাগটা তার মায়ের দিকে এগিয়ে দেয়, ইন্সিয়ার আম্মু সন্দেহ দৃষ্টিতে ব্যাগটাকে এপিট ওপিট করে দেখছে,ইন্সিয়া দাড়িয়ে আছে মায়ের সামনে।ইন্সিয়ার আম্মু কাগজে মোড়ানো ব্যাগটা খুলতে লাগলো। ব্যাগটা অনেক ভারী বোঝায় যাচ্ছে। ইন্সিয়া উদ্ধীগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে, কি আছে ব্যাগের ভেতর তা দেখার জন্য।

ব্যাগ খুলতেই দেখা যায় দুটো মোটা টাকার বান্ডিল রাবার দিয়ে বাধায় করা। টাকার বান্ডিলগুলো দেখে ইন্সিয়ার আম্মুর চোখ রাগে লাল হয়ে আছে। বসা থেকে উঠে ইন্সিয়াকে কোনো প্রশ্ন করা ছাড়াই ইন্সিয়ার গালে চড় লাগিয়ে দেয় ইন্সিয়ার আম্মু আর বলতে থাকে
“এত টাকা কোত্থেকে পেয়েছিস?এত রাত করে বাড়ি ফেরা। এত টাকা। এসব আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিলো। তোকে এসবের জন্য পেটে ধরেছিলাম আমি?”
ইন্সিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইন্সিয়ার আম্মু বলে উঠে “কোনো সাফাই চাই না। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। তোর বাবা আসুক,আমি তাকেই প্রশ্ন করবো”

ইন্সিয়া কান্না করতে করতে রুমে চলে গেলো।রাত ৯টার দিকে ইন্সিয়ার বাবা আসে ঘরে,ইন্সিয়ার বাবা ঘরে প্রবেশ করতেই ইন্সিয়ার মা ঝগড়া বাধিয়ে দেয় টাকাগুলো দেখিয়ে। ইন্সিয়ার বাবা কোনো কথা না বলে ইন্সিয়ার রুমে সোজা চলে যায়।
ইন্সিয়া বিছানায় এক কোণায় মাথাগুজে কাঁদছে তখনো। ইন্সিয়ার বাবা বিছানার এক পাশে বসে ইন্সিয়াকে ডাকছে
“মা ইন্সু এদিকে আয়। এভাবে কেউ কাঁদে? মা নাহয় রাগ করে একটা চড় দিয়েছে তাই বলে কেঁদে নিজের চোখমুখের অবস্তা খারাপ করবি? দেখতো চোখগুলো ফুলে কুমড়োপটাশ হয়ে গিয়েছে।গিয়ে দেখ আয়না”

ইন্সিয়ার বাবার কথা শুনে ইন্সিয়া চোখ মুছে ফিক করে হেসে দেয়। ইন্সিয়ার বাবা বলে উঠে “এই যে আমার মা হেসে দিয়েছে। আয় আয় এদিকে আয়।”

ইন্সিয়া তাঁর বাবার পাশে গিয়ে বসে। ইন্সিয়ার বাবা ইন্সিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে “আচ্ছা মা আজ কই গিয়েছিলি? এত টাকা কোত্থেকে পেলি?”

ইন্সিয়া সবাইকে তাঁর মনের কথা না বললেও দু’জন মানুষকে তাঁর মনের কথা বলে, তাঁর বাবা ও উষ্মী। এই দুই মানুষের কাছে ইন্সিয়া সহজে কিছু লুকোয় না। ইন্সিয়া এবার বলতে লাগলো

“আব্বু আমি যাকে রক্ত দিয়েছিলাম? তার ভাই আমাকে রক্ত দিয়ে বাঁচানোর বদলে একটা গিফট দিয়েছিলো। সেই গিফট টা ছিলো একটা প্যাকেট। আমি তো জানি না প্যাকেটের ভেতর কী আছে। আমি ভদ্রতার খাতিরে প্যাকেট টা নিলাম, আমাকে জোর করেই দিয়েছিলো প্যাকেটটা।বাড়িতে এসে আম্মু হাতে প্যাকেট দেখার পর হাত থেকে নিয়ে নেয়। আমি প্যাকেট টা আম্মুকে দিয়ে দেই। এরপর আম্মু প্যাকেট খুলে টাকা দেখাতে আমাকে চড় দেয়”

এই বলে কান্না জুড়ে দেয় ইন্সিয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে আর বলে “আব্বু আমি যদি কিছু করতাম তবে আম্মুকে প্যাকেট টা দিতাম বলো? আম্মু আমাকে তবুও ভুল বুঝলো বিশ্বাস করলো না। তুমিই বলো আব্বু এখানে আমার দোষটা কোথায়?”

ইন্সিয়ার বাবার বুঝতে বাকি রইলো না কিছু। ইন্সিয়ার বাবা ইন্সিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বলে
“আমি তোকে খুব বিশ্বাস করি মা। তবে তোর মা তোকে খুব ভালোবাসে। সারাদিন তোকে নিয়ে ভয়ে থাকে৷ তার উপর তোর হাতে এত টাকা দেখে সে ভয় পেয়েছিলো৷ সবাই কি আমার মতো বুদ্ধিমান হয় মা?দেখিস না! আমি তোর মায়ের সাথে তর্ক করি না। এদের সাথে তর্ক করলে মানসিক রোগী হয়ে যেতে হবে। যত পারিস উপেক্ষা করবি। দেখবি নিজে নিজে চিৎকার করে শান্ত হয়ে গিয়েছে।আর শোন কাল টাকাগুলো যে দিয়েছে তাকে ফেরত দিয়ে দিবি। সকালে আমার কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে নিস। আর হে বলে দিবি, টাকা দিয়ে রক্ত পাওয়া যায়।কিন্তু মন থেকে দেওয়া ভালোবাসা, স্নেহ, শ্রদ্ধা এসব টাকা দিয়ে কেনা যায় না। বুঝলি? তুই যে মন থেকে সেই প্রসূতি মেয়েকে রক্ত দিয়েছিস, সেটা কেউ টাকা দিয়ে উপহাস করুক তোর তুই কি চাস? গিয়ে টাকাগুলো দিয়ে আসবি, বলেও আসবি”

কথাগুলো বলে ইন্সিয়ার আব্বু চলে যায়। ইন্সিয়া চোখ মুছে ভাবতে লাগলো “ঠিকই তো।টাকা আছে বলে এত অহংকার? আমি কি টাকা চেয়েছি? নাকি আমি ভিক্ষুক। কেন আমাকে টাকা দিয়ে ছোট করতে চেয়েছিলো উনি।কাল’ই ফেরত দিবো”

এদিকে আরাশ কাজ সেরে বাড়ি পৌছে রুমে শুয়ে আছে। রাজু এসে আরাশকে ঠান্ডা শরবত এনে দিলো খাওয়ার জন্য। আরাশ রাজুকে বলছে
“খেয়েছিস?”
রাজু হেসে বলে
“কবেই খাইলাম সাব (সাহেব)”
রাজুর কথা শুনে আরাশ স্বস্তি নিয়ে শরবত খেতে লাগলো আর ভাবতে লাগলো আজাদের কথা, “কিভাবে আজাদকে শায়েস্তা করা যায়”

আজাদের পরিচয়….. অতীত
আজাদ হলো অরীনের হাসবেন্ড। আরাশের জিজু। আজাদ অরীন সম্পর্ক করেই বিয়ে করেছিলো নিজেরাই। ফ্যামিলিতে মা-বাবা না থাকার কারণে তাদের বাধাঁ দেওয়ার মত কেউ ছিলো না। আরাশের তখন সবেমাত্র ১৮ বছর, সে কোনোভাবেই অফিসের কাজের অংশ নিতে পারবেনা, তার কারণ সে এখনো নাবালক। অরীণ ম্যাচিউর তাই অফিসের সকল দায়িত্ব তার হাসবেন্ড আজাদকে দেয়। আজাদ অফিস দেখাশোনা করছে এভাবেই সংসার চলছে৷ আরাশ পড়াশোনায় ব্যস্ত সে তখন ব্যবসা সম্পর্কে এত ধারণা লাভ করতে পারে নি। আস্তে আস্তে অফিসের উন্নতি থেকে অবনতি শুরু হলো, অরীন কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না, তার কারণ হলো আজাদ অরীনকে ব্রেইন ওয়াশ করে ভুলিয়েবালিয়ে ব্যবসা থেকে দুরে রাখতো। আজাদ ভালোবেসে বিয়ে করলেও অরীনের সাথে সংসার করার একটাই কারণ হলো আত্মসাৎ। আজাদ সম্পত্তি অফিসের লোভে অরীনের সাথে দিনের পর দিন মিথ্যে মায়ার সংসার করে যাচ্ছিলো। রাত ৯টা বাজতে বাজতে অরীন গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতো। আরাশকে অরীনের রুমের আশেপাশে আসতে দিতো না আজাদ। যখনি আরাশ আসতে চাইতো তখনি আজাদ বলতো
“তোমার আপুর ঘুম দরকার ঘুমাতে দাও”
আরাশ কিছু বুঝতো না তাই চুপচাপ সব মেনে নিতো।এভাবেই একবছর পার হয়ে গেলো। প্রতিনিয়ত অরীনকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ানো হতো যাতে অফিসের সকল ডকুমেন্টস অরীনের অবর্তমানে সরিয়ে ফেলতে পারে।
অরীন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে দিনের পর দিন।কোনো কথায় অরীনের মনে থাকে না।এদিকে আরাশের মনে খটকা লাগে, আরাশ অরীনের শরীরের অবস্তা দেখে চিন্তায় পড়ে যায়। আরাশ বুদ্ধি করে সেদিন সকালে আজাদ অফিসে যাওয়ার পর অরীনের রুমে যায়। অরীন কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত বিকেলে আজাদের গেস্টরা আসবে সেই কারণে। আরাশ এই ফাকে অরীণের মেডিসিন প্রেস্কিপশন সব গুলো সরিয়ে নিলো। ঘুমের মেডিসিন কৌটাতে আরাশ গ্যাস্টিকের ঔষুধ রেখে দেয়। সেদিন রাতেও অরীনকে নিয়ম করে তার জিজু ঘুমের ঔষুধের বদলে গ্যাস্টিকের ঔষুধ খাইয়ে দেয়৷ অরীনের ঘুম না পেলেও অভ্যাস হয়ে গিয়ে একই টাইমে ঘুমিয়ে পড়া। তাই আজাদের তেমন সন্দেহ হয় নি।
আরাশ ডক্টরের প্রেস্কিপশন মেডিসিন সব গুলো ডক্টরকে দেখিয়ে জানতে পারলো,
“তার বোনকে নিয়মিত ঘুমের ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়ানো হতো। এভাবে তার বোনের মস্তিষ্ক দুর্বল করে ফেলা হয়”
আরাশ সোজা অফিসে চলে যায়। অফিসে গিয়ে সকলের সামনের মিটিংয়ে আজাদের কলার ধরে টানতে টানতে বাহিরে নিয়ে আসে। মিটিংয়ে থাকা সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। অনেকে বলছে “এটাই তো আসল মালিক। আরাশ সাহেব। উনাকেই আমাদের দরকার। আজাদ সাহেবকে এই অফিস থেকে বিতাড়িত করুক আমরাও চাই। যা জুলুমি করছে আমাদের সাথে ইনি”
আরাশ আজাদকে অফিস থেকে বের করে দেয়। আরাশে ১৮ বছর হয়ে গেছে সে এখন নাবালক অংশীদার নেই ব্যবসায়। তাই সে সকল দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছে। আরাশ অফিসে আসার পর একের পর এক রেকর্ড চ্যাক করে দেখে তাদের অফিসের হাল খুব খারাপের দিকে।
এরপর অরীনকে ট্রিটমেন্ট করানো হয় ভালো ডক্টর দিয়ে। আস্তে আস্তে অরীন সুস্থ হয়ে উঠে।

আজাদ কিছুমাস নিজের আত্নগোপন করে থাকার পর আবার ফিরে আসে অরীনের কাছে। ততদিনে অরীন জেনে গিয়েছে সব সত্য৷ তবুও আজাদ অরীনকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে তার ফাঁদে ফেলে৷ অরীন আরাশকে বুঝিয়ে সুজিয়ে শান্ত করে তাদের বাসায় থাকতে দেয় আজাদকে। শত হলেও অরীনের হাসবেন্ড আজাদ,তাই অরীন চায় না সম্পর্ক নস্ট হোক। এখানেই এভাবে থেমে থাকে নি আজাদ। সে অরীন ও আরাশের সামনে ভালোর মুখোশ লাগিয়ে থাকলেও পেছনে অরীনের ক্ষতি করার জন্য বড় ফন্দি আঁটে, অরীন জানতে পারে অরীনে গর্ভে আজাদের সন্তান, আজাদ এই ব্যপারে উপরে খুশি থাকলেও মন থেকে একটুও খুশি হয় নি। আরাশ অরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু মেনে নেয় আজাদের। আরাশ রুমে হাইডেন ক্যামেরা ফিট করে রাখে এটা ঘরের কেউ জানেনা। আরাশ আজাদকে বিশ্বাস করে না অরীনের জন্য আরাশ চুপ করে আছে। অরীনের গর্ভে আজাদের সন্তান আসার পর মুনিয়া খালা অরীনের দেখভাল করতো নিজের মেয়ের মতো।

একদিন আজাদ সিড়িতে নামার সময় তেল ফেলে ফেলে নামতে লাগলো। যাতে অরীন সিড়ি থেকে পড়ে মারা যায় সন্তানসহ। আরাশ অফিসে বসে ক্যামেরা ফুটেজে সব দেখছিলো। আরাশের এসিস্ট্যান্ট সাইফকে আরাশ তাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়,
সাইফ আরাশের বাসায় এসে অরীনের কাছে গিয়ে বলে
“ম্যাম আপনাকে নিচে যেতে নিষেধ করেছে আরাশ স্যার,যতক্ষন না আরাশ স্যার বাড়িতে আসছে।”

কিন্তু আমাকে আমার হাসবেন্ড ডাকছে,(অরীণ)

সমস্যা নেই ম্যাম আজাদ স্যার আমার সাথে বের হচ্ছে মিটিংয়ে আপনি এখানেই থাকুন।মুনিয়া আন্টি অরীন ম্যামকে নিচে আসতে দেবেন না (সাইফ)

সাইফ কথাগুলো বলে নিচে গিয়ে সিড়িতে থাকা তেলগুলো লোকজন দিয়ে পরিষ্কার করালো। আজাদকে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো আজাদ বেরিয়েছে চালাকি করে যাতে অরীন পড়ে মারা গেলেও আজাদের উপস্থিতি না থাকলে সবাই বিশ্বাস করবে আজাদের দোষ নেই। সাইফ আজাদকে খুঁজে বের করে এবং তাকে মাইক্রোতে উঠিয়ে কারখানায় আঠকে রাখে টানা নয় মাস তেরোদিন। আজাদকে আটকে রাখার কারণ একটাই আরাশের বোনকে আজাদ মার্ডার করতে চেয়েছিলো।
কিন্তু আজাদ ভেবেছে আরাশ তাকে সেই অফিসের সম্পত্তি জন্য আটকে রেখেছে।

চলবে..