রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-১২+১৩

0
968

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ১২
#Saiyara_Hossain_Kayanat

প্রিয় রুদ্রাণী,

সকল অপ্রত্যাশিত মুহূর্তই কিন্তু বিরক্তির কারন হয় না। কিছু কিছু অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত জীবনে কিছু সুপ্ত অনুভূতির সৃষ্টি করে। এই যেমন ধরুন আমাদের চিঠির বিষয়টা, এটাও কিন্তু আমাদের দুজনের জন্যই অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা। তবে এই চিঠির জন্যই আমরা আমাদের জীবনে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। নব্বই দশকের মতো চিঠি লেখা, পাশাপাশি বারান্দায় থেকেও একজন আরেকজনকে না দেখে একে অপরের অনুভূতি প্রকাশ করা এসব কিছু কি আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হচ্ছে!!

[বিঃদ্রঃ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপত্তিকর জিনিস চোখের সামনে এসে পরে। আর কল্পনার বাহিরে কিছু ঘটলে সেটা আমাদের স্মৃতির পাতায় খুব নিখুঁতভাবে গেঁথে থাকে। যাইহোক দু’দিন চিঠির উত্তর দিতে পারিনি, আপনি অপেক্ষা করেছেন কি না জানতে ইচ্ছে করছে।]

ইতি,
রৌদ্র

আরশি চিরকুটটা পড়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। সত্যিই তো সকল অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত বিরক্তির কারন হয় না। রুম থেকে ফোনের শব্দ বেজে উঠতেই আরশি চিরকুটা হাতে নিয়েই রুমে চলে গেল। ফোন হাতে নিয়ে দেখলো তাদের ফ্রেন্ডস গ্রুপ থেকে ভিডিও কল করেছে। কল রিসিভ করতে নীল চেচিয়ে বলে উঠলো-

“ওই তোর এতো সময় লাগে কেন ফোন রিসিভ করতে?? কাসফি তো তোর সাথেই থাকে তবুও তো কাসফি সাথে সাথেই কল জয়েন করে বসে আছে। তাহলে তোর কেন এতো সময় লাগে??”

নীলের এমন চেচিয়ে কথা বলা শুনে আরশি বিরক্ত হয়ে বলল-

“আরে নীল থাম তো এতো চেচাচ্ছিস কেন আজব!! আমি বারান্দায় ছিলাম তাই একটু সময় লেগেছে। এখন বল এই সকাল সকাল কিসের জন্য ভিডিও কল দিয়েছিস তোরা??”

আদ্রাফ গম্ভীর গলায় বললো-

“আজ বিকেলে আমরা তোদের বাসার জন্য রওনা হব। আমাদের পরিবার থেকে পারমিশন পেয়ে গেছি তোদের বাসায় যাওয়ার জন্য।”

আদ্রাফের এমন গম্ভীর গলা শুনে আরশি আর নীল বেশ অবাক হলো। তবে নীলা আর কাসফিয়ার তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ হয়নি হয়তো তারা জানে আদ্রাফের গম্ভীরতার কারন। নীল ভ্রু কুচকে আদ্রাফের উদ্দেশ্যে বলল-

“শালা তোর কথার ধরন শুনে মনে হচ্ছে আমরা ঘুরতে না বরং শোক পালন করতে যাবো।”

আরশিও নীলের কথায় তাল মিলিয়ে বলল-

“তোরা সবাই এমন চুপচাপ কেন আজ?”

নীলা একটা হাসি দিয়ে বলল-

“আরে এসব বাদ দে, ফোন রেখে এখন সবাই গোছগাছ শুরু কর।”

সবাই যে যার মতো করে ফোন দিল। ফোন রাখতেই কাসফিয়া আর নীলা বেশ চিন্তায় পরে গেল। কিভাবে আদ্রাফের মুখোমুখি হবে তারা!! কিভাবে তাদের মনকে বাধা দিবে আদ্রাফের প্রতি কোনো অনুভূতির সৃষ্টি হতে!! আর অন্য দিকে আরশি তাড়াতাড়ি করে চিঠি লিখতে শুরু করল। চিঠি লিখেই বারান্দা গিয়ে ছুড়ে মারলো পাশের বারান্দায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পুরো বারান্দা আর পাখি গুলোর দিকে নজর বুলিয়ে নিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুমে চলে আসলো। তার মন কু ডাকছে কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা খারাপ হতে যাচ্ছে। অকারণেই কষ্ট হচ্ছে তার এই বারান্দা আর পাখি গুলো ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে। তবুও আরশি এসব কিছু পাত্তা দিতে চায় না। মাথা থেকে সকল চিন্তা ভাবনা বের করে নিজের মতো করে কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো।

————————

অসময়ে ঝুম বৃষ্টি নামার পর এখন পিচঢালা রাস্তা গুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ঝকঝক করছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘে ঢাকা আকাশ আর গ্রীষ্মের বৃষ্টি শেষে শীতল হাওয়া। গ্রীষ্মের সময় এই পরিবেশটাই যেন আরশি চেয়েছিল। স্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসে আরশি আর কাসফিয়া অপেক্ষা করছে নীলদের জন্য। মিনিট পাঁচেক যেতেই নীল, আদ্রাফ আর নীলা এক প্রকার দৌড়ে এসে হাজির হলো আরশির সামনে। নীল আরশির পাশে এসে বসতেই আরশি শক্ত গলায় বললো-

“সাড়ে তিনটায় এখানে আসার কথা ছিল তোদের। এখন প্রায় চারটা বাজতে চলছে। আর কয়েক মিনিট দেরি করলেই তো ট্রেন মিস হয়ে যেত।”

নীল হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-

“আর বলিস না বৃষ্টির জন্য দেড়ি হয়ে গেছে। কে জানতো আজ বৃষ্টি হবে!!”

আরশি জ্বলন্ত চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল-

“আমি আর কাসফি কি তাহলে অন্য অন্য গ্রহ থেকে এসেছি!!”

কাসফিয়া উঠে দাঁড়িয়ে রাগী কন্ঠে বলল-

“তোরা ঝগড়া করতে থাক। আর ওইদিকে ট্রেনে চলে যাক।”

আরশি আর কিছু না বলে ব্যাগ নিয়ে হনহনিয়ে ট্রেনের দিকে চলে গেল। বাকি সবাই চুপচাপ তার পিছন পিছন হেঁটে যাচ্ছে। ট্রেনের ভিআইপি কেবিন এসেই আরশি গাল ফুলিয়ে বসে পরলো। নীল আরশির পাশে বসে আরশির দিকে ফিরে অনুনয়ের স্বরে বললো-

“আশু প্লিজ রাগ করে থাকিস না। একটুই তো দেরি হয়েছে। দেখ এখনো ট্রেন ছাড়তে অনেক৷ সময় আছে।”

নীলের কথাটা বলার সাথে সাথেই ট্রেন চলতে শুরু করলো। আরশি রাগান্বিত দৃষ্টিতে নীলের দিকে তাকাতেই নীলের অসহায়ের মতো মাথা নিচু করে ফেললো। নীলের এমন অবস্থা দেখে আদ্রাফ, কাসফিয়া আর নীলা উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। আরশিও নীলের মাথায় একটা চাটি মেরে দিয়ে সবার সাথে তাল মিলিয়ে হেসে উঠলো। ঘন্টা খানেক সময় ধরে আড্ডা দিতে দিতে একটা পর্যায় আরশি ক্লান্ত হয়ে নীলের কাধে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পরলো। তাই সবাই চুপচাপ বসে আছে। কাসফিয়া সবাইকে বলে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। কাসফিয়া যাওয়ার কিছুক্ষন পরই আদ্রাফ নীলকে বললো-

“তোরা বস আমি দেখে আসি কাসফি কোথায়।”

কথাটা বলে আদ্রাফও কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। নীলা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে কেবিনে দিকে। কাসফিয়া কেবিনের দিকে যেতেই আদ্রাফ কাসফিয়ার হাত শক্ত করে ধরে কিছুটা দূরে নিয়ে আসলো। কাসফিয়া নিজের হাত ছাড়ানো জন্য বার বার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু প্রতিবারই আদ্রাফের শক্তির কাছে হেরে যাচ্ছে। আদ্রাফের থেকে হাত ছাড়াতে না পেরে শেষমেশ কাসফিয়া রেগেমেগে চাপা কন্ঠে বলল-

“আদ্রাফ কি করছিস এসব?? হাত ছাড় আমার।”

এই মুহূর্তে আদ্রাফ কাসফিয়ার কথা শুনে যেন প্রচন্ড রেগে গেল। রাগে চোখ গুলো তার লাল বর্ন ধারণ করেছে। কাসফিয়া দু বাহু চেপে ধরে রাগে গর্জে উঠে বলল-

“কি সমস্যা তোর কাসফি?? আমার সাথে এমন করিস কেন সব সময়?? বার বার আমার ভালোবাসাকে এড়িয়ে যাস কেন?? একটা কারন অন্তত বল। কেন তুই আমার ভালোবাসা বার বার প্রত্যাখ্যান করিস??”

কাসফিয়া আদ্রাফের রাগ দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। আদ্রাফের মতো শান্তশিষ্ট আর দুষ্টু স্বভাবের ছেলে যে এতোটা রেগে যেতে পারে এটা তার চিন্তা ধারনার বাহিরে। কাসফিয়া নিজেকে স্বাভাবিক করে শান্ত গলায় বললো-

“আগে আমাকে ছাড় তারপর আমি বলছি।”

আদ্রাফ নিজের রাগ কন্ট্রোল করে কাসফিয়া ছেড়ে দিল। একটু দূরত্ব বজায় রেখে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। কাসফিয়া বেশ খানিকটা সময় চুপ থেকে একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললো-

“তুই নিশ্চয়ই একটা জিনিস খেয়াল করেছিস আশু এই সব প্রেম ভালোবাসা সব সময় এড়িয়ে যায়। যে কয়েকজন ছেলে ওকে প্রপোজ করেছে সবাই আশুর সাথে একদিন রেস্টুরেন্টে বসে কথা বলার পরেই তাদের আর দেখা পাওয়া যেত না। ওই ছেলে গুলোকে আশুই রিজেক্ট করেছে। আশুর বলা একটা কথার কাছে তাদের সবার ভালোবাসা ফিকে পরে যেত। আর আশুর এমন করার একটা কারন আছে সেটা আমি বলতে চাই না। তবে একটা কথা ভালো করে শুনে রাখ আশু যতদিন পর্যন্ত কাউকে ভালোবাসবে না, কোনো সম্পর্কে জড়াবে না ততদিন পর্যন্ত আমিও কোনো সম্পর্কে জড়াবো না। যদি আমি আশুর সামনে একটা ছেলের সাথে হেসে খেলে প্রেম করে বেড়াই এটা দেখে আশু হয়তো খুব খুশি হবে। কিন্তু আমি জানি আশু মনে মনে নিজের জীবনটাকে আরও ব্যর্থ মনে করবে, কষ্ট পাবে। আর দশটা মেয়ের মতো নিজের জীবনটাকে স্বাভাবিক না পেয়ে হয়তো এখন যতটা না কষ্ট পাচ্ছে এর থেকেও বেশ তখন আমাকে দেখে আফসোস করবে। তাই আমি এখন কোনো সম্পর্কে যেতে চাই না। আমি আগে আশুকে খুশি দেখতে চাই।”

আদ্রাফ কাসফিয়ার কথা গুলো চুপচাপ মনযোগ দিয়ে শুনলো। কাসফিয়ার কথা শেষ হতেই আদ্রাফ চিন্তিত গলায় বললো-

“আশুর কি কিছু হয়েছে কাসফি??”

কাসফি আগের মতোই শান্ত গলায় বললো-

“বললাম তো আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। চিন্তার কিছু নেই। আশু ঠিক আছে তবে একটু ডিপ্রেসড হয়তো দেখে বোঝা যায় না। কিন্তু আমি বুঝতে পারি আশু ভিতর ভিতর কষ্ট পাচ্ছে।”

আদ্রাফ কাসফিয়ার দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বললো-

” আমি অপেক্ষা করবো তোর জন্য কাসফি। কিন্তু একটা রিকুয়েষ্ট আমাকে ইগ্নোর করিস না। তোর যতদিন সময়ের প্রয়োজন হয় তুই নে আমার কোনো আপত্তি নেই আমি সব সময় তোর জন্য অপেক্ষায় থাকব।”

কাসফিয়া কিছু বললো না। আদ্রাফের দিকে একপলক তাকিয়ে থেকে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। আদ্রাফও কাসফিয়ার সাথে সাথেই চলে গেল।
আরশি ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া দিয়ে মাথা সোজা করে বসলো। নীল সরু চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে নম্রমুখে বললো-

“ম্যাম আপনার ঘুম আরামে হয়েছে তো?? যদি না হয় তাহলে আরও কিছুক্ষন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন আমার কাধে।”

আরশি হাই তুলে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো-

“নাহ আর ঘুমাবো না।”

মুহুর্তের মধ্যেই নীল ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো-

“চুপ থাক হারামি। আমার কাধ পুরো ব্যথা হয়ে গেছে। মরার মতো যে ঘুম দিয়েছিস এক ঘুমেই পুরো রাস্তা পাড় করে দিলি। তোর পাশে বসাই চরম বোকামি হয়েছে।”

আরশি নীলের রাগ পাত্তা না দিয়ে বলল-

“এবার তো শিকার করে নে তুই একটা বলদ। কোনো কাজই ঠিক করিস না।”

নীল কিছু বলতে যাবে তার আগেই বাকি তিনজন এক সাথে চেচিয়ে বলল-

“থামম তোরা।”

————————

রাত প্রায় নয়টা বাজে আরশি আর ওর বন্ধুরা সবাই এসে আরশিরদের এলাকায় পৌঁছালো। বৃষ্টির কারনে চারপাশে নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। মানুষজন তেমন নেই বললেই চলে। তারা সবাই নিজেদের মতো কথা বলতে বলতে হেটে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই আরশির পায়ে কাঁদা লাগায় দাঁড়িয়ে গেল। আরশি সবার পেছনে থাকায় বাকি সবাই খেয়াল করেনি। আরশি জুতা খুলে পা ঝাড়ছে এমন সময় পেছন থেকে এক শক্তিশালী হাত এসে আরশির মুখ চেপে ধরলো। আরশিকে জোড় জবর্দস্তি করে টেনে নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল। আরশি নিজেকে ছড়ানো চেষ্টা করেও পারছে না। অনেক বার চেষ্টা করার পর যখন নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে নিবে এমন সময় লোকটা আবারও সামনে এসে পথ আটকে ফেললো। ভয়ে আরশির পুরো শরীরে কম্পন সৃষ্টি হচ্ছে। হাত-পা অনবরত কেঁপে যাচ্ছে। মনে মনে শুধু একটাই কথা ভেবে যাচ্ছে “তবে কি সে ধর্ষণের শিকার হতে যাচ্ছে!!” আরশি ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-

“আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ। আমাকে যেতে দিন।”

বখাটে ছেলেটা একটা বিদ্রুপ হাসি দিয়ে আরশির কাছে এসে আরশির ওড়না টান দিয়ে ফেলে দিল। সাথে সাথে আরশি অঝোরে কান্না শুরু করে দিল। আরশির কান্না আর অনুরোধ কিছুই সেই নেশায় বুদ হয়ে থাকা বখাটে ছেলেটার কানে গিয়ে পৌঁছালো না। সে তো নিজের মতো করেই আরশির শরীরের দিকে ক্ষুদার্থ প্রাণীর মতো তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে তার আরশিকে কাছে পাওয়ার লালাসা। আরশি জোরে জোরে চিৎকার দিয়ে কান্না করতেই লোকটা ঝাপিয়ে পরলো আরশির উপর।

চলবে….

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ১৩
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমার কোনো ক্ষতি করবেন না প্লিজ…”

আরশি কান্নারত অবস্থায় চেচিয়ে কথা গুলো বলছে। এই মুহূর্তে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে আরশির। নিজেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে কেউ যেন এসে তাকে রক্ষা করে। তার নামের পাশে ধর্ষিতার পদক পাওয়ার থেকে রক্ষা করে। তার ইজ্জত যেন সে রক্ষা করতে পারে। আরশির চেচামেচিতে লোকটা ক্ষিপ্ত হয়ে আরশির গালে সজোড়ে থাপ্পড় মেরে মুখ চেপে ধরলো। টেনে হেঁচড়ে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

—————————

প্রিয় রৌদ্র,

অচেনা মানুষের সাথে অনুভূতি শেয়ার করা, কিশোরী মেয়ের মতো উৎসুক, আবেগপ্রবণ হয়ে চিঠি লিখতে বসা, এক বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্য বারান্দায় চিঠি ছুড়ে ফেলা এইসব কিছুতেই আমি অন্য রকম অনুভূতি খুঁজে পাচ্ছি। এই সকল অনুভূতির সাথে আমি আগে কখনো পরিচিত হইনি। এইসব অভিজ্ঞতা অনুভব করতেই হয়তোবা প্রয়োজন ছিল চিঠির অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা ঘটার।
যাইহোক আপনার পাখিগুলোর খেয়াল রাখবেন। আমি দু তিনদিন বাসার বাহিরে থাকবো। তাই আপনার পাখিগুলোর খেয়াল রাখতে পারবো না দুঃখিত। ভালো থাকবেন।

[বিঃদ্রঃ আপনার চিঠির অপেক্ষায় ছিলাম কি-না তা না হয় অজানাই থাকুক। আপনিই তো বলেছিলেন সব কিছু জেনে গেলে মানুষের আগ্রহ কমে যায়। তাই আমিও চাচ্ছি এটা আপনার কাছে অজানা থাকুক।]

ইতি,
রুদ্রাণী

রৌদ্র চিঠিটা পরতেই তার মন খারাপ হয়ে গেল। বুকে চিনচিনে ব্যথা করছে। তার রুদ্রাণী চলে গেছে ভেবেই তার রৌদ্রজ্বল আকাশ যেন কালো মেঘাচ্ছন্ন আকাশে পরিনত হয়ে গেল। কি হচ্ছে এসব!! দু দিন সে নিজেই বাসায় ছিল না আর এখন আরশি বাসায় থাকবে না ভাবতেই রাগ উঠছে তার। চিঠির জন্য অপেক্ষা করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। ময়না পাখির আকর্ষণীয় ‘আরু’ ডাকে রৌদ্র তার ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসলো। মুচকি হাসি দিয়ে পাখিটার দিকে তাকালো। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে এই আরু ডাকটা শিখিয়েছে পাখিটাকে। ময়না পাখির খাচার সামনে গিয়ে রৌদ্র শান্ত গলায় বলল-

“যতই কষ্ট হোক আমি আমার আরুর চিঠির জন্য অপেক্ষা করবোই। রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণীকে আসতেই হবে।”

কথা গুলো বলেই রৌদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অল্প কয়দিনেই মেয়েটার প্রতি এতটা দুর্বল হয়ে পারবে সে কল্পনাও করেনি। আদোও কি আরশি তার হবে কি না সেটাও জানেনা রৌদ্র। তবুও সে আরশিকেই তার রৌদ্রজ্বল শহরের রুদ্রাণী বানিয়ে রেখেছে।

—————————

আরশির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কাসফিয়া পেছন ফিরে আরশিকে খুঁজতে লাগলো। পেছন ফিরে তাকিয়ে আশেপাশে আরশিকে দেখতে না পেয়ে ভয়ে আঁতকে উঠলো কাসফিয়া। উত্তেজিত হয়ে উচ্চস্বরে চেচিয়ে বলল-

“এইই নীল.. আশু কোথায়?? আমাদের সাথেই তো ছিল হঠাৎ করেই কোথায় উধাও হয়ে গেল।”

সবাই কাসফিয়ার কথায় চমকে উঠলো। আশেপাশে তাকিয়ে সত্যি সত্যিই আরশি না দেখে তাদের সবার মনেই খানিকটা ভয় ডুকে গেল। নীলা বার বার আরশিকে ফোন দিয়েও ফোন বন্ধ পাচ্ছে।আদ্রাফ দ্রুত এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে বললো-

“চিন্তা করিস না এখানেই আছে হয়তো খুঁজে দেখ।”

নীল হন্তদন্ত হয়ে খুঁজতে লাগলো। সবাই আলাদা আলাদা হয়ে খুঁজে যাচ্ছে। কাসফিয়ার মাথা যেন পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ভয়ে চোখ মুখ ফেকাসে হয়ে গেছে। ডান পাশের মোড়ে দিকে আসতেই কাসফিয়া কারও গোঙানির শব্দ পেল। দ্রুত পায়ে সামনের দিকে যেতেই আরশিকে এই অবস্থায় দেখে কাসফিয়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক বখাটে টাইপের লোক আরশির মুখ চেপে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর আরশি নিজেকে ছাড়ানো আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আরশিকে এই অবস্থা দেখে কায়াফিয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার প্রানপ্রিয় বেস্ট ফ্রেন্ড আরশি ছোট থেকেই হাস্যজ্জল,দুষ্টু, চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তবে দু বছর আগের তিক্ত সত্যিটা এমনিতেই আরশির হাসিখুশি জীবনটা কালো মেঘে ঢেকে দিয়েছে। ব্যস্ততা আর হাসি ঠাট্টার মাঝেও যেন হুটহাট করেই উদাসিনতা ছেয়ে যেত আরশির মুখে। আরশি খুবই সেনসিটিভ একটা মেয়ে। অল্পতেই যেই মেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পরে সেই মেয়েটার জন্য এইরকম পরিস্থিতি হয়তো মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর কিছু। কাসফিয়া কিছু না ভেবেই আশেপাশে তাকিয়ে কিছু খুঁজতে লাগলো। ঝোপের ভেতর থেকে একটা লাঠি নিয়ে তাদের সামনে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লোকটাকে মারতে লাগলো কাসফিয়া। আচমকা আক্রমণে লোকটা তার সামলাতে না পেরে আরশিকে ছেড়ে দিল। কাসফিয়া লাঠি ফেলেই আরশিকে গিয়ে ঝাপটে ধরলো। আরশিকে দাঁড় করিয়ে দিতেই পেছন থেকে কাসফিয়ার হাত মুচড়ে ধরলো লোকটা। ড্রাগস নেওয়ার ফলে লোকটার চোখ রক্ত বর্ন হয়ে আছে। রাগে শক্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে তার। লোকটা তার সজ্ঞানেই নেই। কাসফিয়া ব্যথা কুকিয়ে উঠতেই আরশির ভয়ের পরিমান আরও মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল। আরশি লোকটার দিকে আসতে নিলেই কাসফিয়া বলে উঠলো-

“আরশি তুই যা এখান থেকে। ওইদিকে সবাই আছে।”

আরশি এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। অঝোরে চোখের পানি ফেলে যাচ্ছে। কাসফিয়া এবার নিজের হাত ছাড়ানো চেষ্টা করতে করতে চেচিয়ে বলল-

“আরশি তোকে আমাদের বন্ধুত্বের দোহাই তুই যা এখন থেকে। আমি এদিকটা দেখছি তুই বাকি সবাইকে নিয়ে আয়।”

আরশি কোনো কথা বলছে না। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে কাসফিয়ার দিকে৷ আচমকা কাসফিয়া বেশ জোরেই চিৎকার দিয়ে উঠলো। হাত পেছনের দিকে মুচড়ে ধরায় প্রচন্ড ব্যথায় গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো কাসফিয়া। আরশি এগিয়ে আসতে নিলে কাসফিয়া আবারও বাধা দিয়ে কান্নারত অবস্থায় জোড়ানো কন্ঠে বললো-

“আ আশু প্লিজজ তুই যা…”

আরশি কিছু করার আগেই পেছন থেকে নীল আর আদ্রাফ এসে তাদের এই অবস্থা দেখে বাঘের মতো হুংকার দিয়ে দৌড়ে আসতে লাগলো। লোকটা এবার বেশি মানুষ দেখে ভয়ে কাসফিয়াকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই পালিয়ে গেল। আরশি দু হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে মাঝ রাস্তায় বসে পরলো। আদ্রাফ এসেই কাসফিয়াকে ধরে ফেললো। কাসফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে হাতের ব্যথা সহ্য করে যাচ্ছে। নীল লোকটার পেছনেই ছুটে গেল। আর নীলা দৌড়ে এসে আরশিকে ধরে ওঠানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আরশি আগের মতো করেই মাথা চেপে ধরে অনবরত চোখেরজল ফেলে যাচ্ছে নিঃশব্দে। ভয়ে আরশির পুরো শরীর কেঁপে উঠছে। দু হাত মাথার চুল গুলো খামচে ধরে আছে। কাসফিয়া বাম হাত দিয়ে ডান হাত আলতো করে আঁকড়ে ধরে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রাফ দু হাতে কাসফিয়া আগলে ধরে রেখেছে। কাসফিয়া আরশির কাছে এগিয়ে আসতে চাইলেই আদ্রাফ কাসফিয়াকে ধরে নিয়ে আসে। নীল লোকটা ধরতে ব্যর্থ হয়ে ছুটে ফিরে এসেছে আরশির কাছে। কাসফিয়া আরশির দিকে ঝুকে কিছু বলতে নিবে তার আগেই আরশি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো। সবাই প্রচন্ড বিচলিত হয়ে পরলো আরশির অবস্থা দেখে। নীল তাড়াতাড়ি করে আরশির পাশে বসে আরশিকে তুলে ঝাপটে ধরে ডাকতে লাগলো। আরশির কোনো সাড়াশব্দ না পাঁজাকোলে তুলে নিয়েই দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। নীলা কাসফিয়াকে ধরে আছে। কাসফিয়া নিজের হাতের ব্যথা ভুলে গিয়েই আরশির জন্য উত্তেজিত হয়ে পরেছে। ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠেছে কাসফিয়া। আর আদ্রাফ দ্রুত আরশি আর কাসফিয়া বাসায় ফোন করে জানিয়ে দিল। মুহুর্তের মধ্যেই দু পরিবারের সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো রাস্তায়। তাদের মেয়ে দুটোর এই অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে সবাই। আদ্রাফ আরশির বাসা থেকে গাড়ি এনেই সবাইকে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে চলে গেল।

————————

হসপিটালের কেবিনে শুয়ে আছে আরশি। হাতে স্যালাইন লাগানো। অজ্ঞান অবস্থাতেই বার বার ভয়ে আঁতকে উঠছে। নিম্নস্বরে অস্পষ্ট ভাবে কাসফিকে ডেকে যাচ্ছে। নীল আরশির বেডের পাশেই দু’হাত ভাজ করে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কাসফিয়া প্লাস্টার বাঁধা হাত নিয়ে বসে আছে আরশির ডান পাশের একটা চেয়ারে। আদ্রাফ আর নীলা কেবিনের বাহিরে আরশি আর কাসফিয়া বাবা-মাকে সামলাচ্ছে। মেয়ের এক অবস্থা দেখে তারা প্রচন্ডভাবে ভেঙে পরেছে। কাসফিয়া অপলকভাবে তাকিয়ে আছে আরশির কম্পিত ঠোঁটের দিকে। নীলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-

“নীল ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আয়। আরশির অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না আমার কাছে।”

নীল মাথা নাড়িয়েই কেবিন থেকে বেড়িয়ে গেল।

চলবে…