রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-১৬+১৭

0
969

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ১৬
#Saiyara_Hossain_Kayanat

” i wanna hug you মিস আরু।”

আরশি অনেক চিন্তা ভাবনা করে অবশেষে ডক্টরের কথা মতো নিচে এসেছে। নিচে নেমে ডক্টরের কাছে আসতেই ওনার গম্ভীরমুখে বলা এমন কথা শুনে আরশি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রৌদ্র কথাটা বলে সঙ্গে সঙ্গেই আরশির কোনো কথার অপেক্ষা না করে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো আরশিকে। রৌদ্রর এহেন কাজে আরশি অবাকের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। নড়াচড়া করার মতো পরিস্থিতিতে আরশি নেই। কিছুক্ষণ সময় পর আরশি নড়েচড়ে উঠেলেই রৌদ্র আরশিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শীতল গলায় বলল-

“জাস্ট এক মিনিট আরু। নড়াচড়া করো না।”

রৌদ্রর মুখে তুমি সম্মোধন শুনে আরশি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হুট করে এভাবে জড়িয়ে ধরাতে আরশির কেন যেন রাগ হচ্ছে না। কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে যেমনটা হসপিটালে হয়েছিল। এক মিনিট হতেই রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দিল। মাথায় হেলমেট পরতে পরতে বলল-

“হসপিটালে ইমার্জেন্সি আছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমাকে এখনই যেতে হবে। মিস আরু আপনি উপরে যান।”

আরশি স্থির চোখে তাকিয়ে আছে রৌদ্রর দিকে। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত ভাজ করে রাখা আর মাথায় কালো হেলমেট। কথা গুলো বলতে বলতে রৌদ্র বাইকে উঠে পারল। আরশিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রৌদ্র বলল-

“আমাকে পরেও দেখা যাবে মিস আরু। আপনি এখন উপরে যান।”

রৌদ্রর কথা শুনে আরশি নিজের অজান্তেই লজ্জা পেয়ে গেল। পেছনে ঘুরে দ্রুত গেইটের ভিতর চলে আসলো। কি যেন একটা ভেবে আবারও থমকে দাঁড়িয়ে গেল। পেছনে তাকিয়ে রৌদ্রকে না দেখে আরশি ভয়ে এক প্রকার দৌড়েই নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসলো। রুমে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো এগারোটা বাজে। আরশির পুরো শরীর এখন থরথর করে ভয়ে কাঁপছে। রৌদ্রর এমন অদ্ভুত আচরণ আর হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে যাওয়া দেখে আরশি রৌদ্রকে ভূত মনে করছে। আরশি কাঁপা কাঁপা হাতে আবারও সেই নাম্বারে কল করলো। রৌদ্রর বাইক থামিয়ে আরশির কল দেখে একটা মুচকি হাসি দিয়ে কল রিসিভ করলো। আরশি ভয়াতুর কন্ঠে আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-

“ডক্টর আপনি কি আমার বাসার এখানে এসেছিলেন??”

রৌদ্র নিজের হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-

“না তো; আমি কেন আপনার বাসায় আসবো এই সময়!!”

আরশি আর কিছু বললো না সাথে সাথেই ফোন কেটে দিল। রৌদ্র ফোনের দিক তাকিয়ে একটা বিশ্বজয়ী হাসি দিয়ে আবারও বাইক চালানো শুরু করলো। রৌদ্রর কথার আরশি ভয়ে দৌড়ে কাসফিয়ার রুমে গেল। কাসফিয়া ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘোরে ঘুমিয়ে আছে। তখন কাসফিয়ার ঘুমে প্রব্লেম হবে বলেই কাসফিয়াকে না ডেকে একা একা নিচে চলে গিয়েছিল। কিন্তু এইবার আর কাসফিয়ার ঘুমের চিন্তা করলো না। টেনেহিঁচড়ে জোর করেই কাসফিয়াকে ঘুম থেকে তুলে দিল। কাসফিয়া বাধ্য হয়ে উঠে বসলো। আরশির এমন কাজে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল-

“উফফ আশু এতো রাতে কি শুরু করছিস!! একটু ঘুমাতে দে তো।”

আরশি আকাশ সমান উত্তেজনা নিয়ে বলল-

“নিচে ডক্টর সাহেব এসেছিল।”

কাসফিয়া কিছুটা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলো-

“উনি কেন আসবেন!!”

“জানি না কেন এসেছে। কিন্তু আমি উনার কাছে যেতেই উনি হুট করে আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। তারপর বললো ওনার নাকি হসপিটালে জরুরি কাজ আছে এখন যেতে হবে বলেই মুহুর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে গেলেন।”

কাসফিয়া অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। সন্দিহান কন্ঠে বললো-

“উনি এখানে এসেছে!! তোকে জড়িয়েও ধরেছে!! আবার চলেও গেছে!!”

আরশি দ্রুত মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। কাসফিয়া এবার বিরক্ত হয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-

“ওনাকে এই বাসার ঠিকানা কি তোর বাপ দিয়েছে??”

আরশি কাসফিয়ার সাথে ঘেঁষে বসে। নিম্ন স্বরে বললো-

“আমার মনে হয় কি জানিস!! ওটা কোনো জ্ব্বিন, ভূত ছিলো। সাদা শার্ট পরা ছিল। আর আমি আসার সময় পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখি উনি নেই। আমি রুমে এসে ওনাকে কলও দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি তো বললেন উনি আসেনি।”

আরশির এমন আবোলতাবোল কথা শুনে কাসফিয়া হতাশ হয়ে বলল-

“তুই নিশ্চয়ই উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখিছ। জার্নি করে এসেছিস তাই হয়তো ক্লান্তিতে এইসব আজেবাজে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আর তোর ওই ডক্টরের তো বাসার ঠিকানাই জানে না তাই এখানে আসার কোনো প্রশ্নই উঠে না।”

“কিন্তু…”

আরশি কিছু বলতে নিলেই কাসফিয়া আরশিকে থামিয়ে দিয়ে শক্ত গলায় বললো-

“আশু প্লিজ এইসব অহেতুক কথাবার্তা বন্ধ কর। প্রচুর ঘুম পাচ্ছে আমার আর তোকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে যা ঘুমিয়ে পর চুপচাপ।”

আরশি আর কথা বাড়ালো না। কাসফিয়ার পাশেই শুয়ে পরলো। কাসফিয়া আরশির দিকে ভ্র কুচকে তাকিয়ে সন্দেহের গলায় বললো-

“এখানে শুয়েছিস কেন!! তোর রুমে গিয়ে ঘুমা।”

“নাহ আজ এখানেই থাকি।”

আরশি চুপচাপ শুয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। আরশি এখনো বুঝতে পারছে না ডক্টর কি সত্যি সত্যিই এসেছিল না-কি এটা তার মনের ভ্রম। আরশি নিজেকে আস্বস্ত করে মনে মনে বলল- “এসব হয়তো সত্যিই আমার হ্যালুসিনেশন। আর কাসফিয়ার কথাও তো ঠিক ডক্টর আমাদের বাসার ঠিকানাই বা পাবে কিভাবে!!” আরশি নিজের মনকে নানাভাবে আস্বস্ত করার পরে আবারও কাসফিয়াকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে মিনমিনিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“আচ্ছা উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন কেন!!”

কাসফিয়া হাতের ব্যথার জন্য ডান দিকে ফিরতে পারছে না। তাই আরশির দিকে না ফিরেই এক রামধমক দিয়ে আরশিকে চুপ করিয়ে দিল। আরশি আর কথা বলার সাহস পায়নি। কাসফিয়ার ধমক শুনেই চুপসে গেল।

—————————

প্রিয় রুদ্রাণী,

কখনো এভাবে আমার ঠিকানায় কেউ চিঠি লিখে পাঠাবে এটা একদমই আশা করিনি। এই মুহূর্তে আপনার চিঠি আর পাখি পাওয়াটা আমার জন্য ঝুম বৃষ্টির মাঝে হঠাৎ করেই রোদের দেখা পাওয়ার মতো ছিল। আপনি আমাকে এভাবে হঠাৎ করে পাখি আর চিরকুট দিয়ে চমকে দিয়েছেন তার বিনিময়ে আপনাকেও চমকে দিবো কোনো একদিন।

[বিঃদ্রঃ সব গুলো পাখির নাম আমি রেখেছি তাই এই নতুন পাখিটার নাম রাখার দায়িত্ব আপনার উপর দিলাম। তবে নামটা এখন না সময় হলেই জানতে চাইবো।]

ইতি,
রৌদ্র

আরশি চিঠিটা পড়ে নিজের বারান্দায় থাকা গাছ গুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। আরশির ফুল গাছ গুলো একদম সতেজ দেখা যাচ্ছে। আরশি ভেবেছিল হয়তো এতদিনে গাছ গুলো মরে গেছে। কিন্তু এখন তো গাছ গুলো একদম ঠিকই লাগছে আগের মতো। আরশি আনমনে বলে উঠলো- “তাহলে কি পাখিগুলোর মালিক আমার বারান্দার গাছগুলোতে পানি দিয়েছে??” আরশি পাখি গুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“কিরে কেমন আছিস তোরা??”

ময়না পাখিটা তখনই ‘আরু’ বলে চেচামেচি শুরু করলো। আরশি আরু নামটা শুনে আবারও কাল রাতের কথা মনে পরে গেল। কাল রাতের কথা মনে পরলেই আরশি মাথা যেন একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আরশি বারান্দায় বেশিক্ষন সময় না থেকে রুমে চলে আসে। খানিকটা সময় ধরে একটা চিঠি লিখে পাশের বারান্দায় ছুড়ে দিয়ে আবারও রুমে চলে গেল।

কাসফিয়ার হাতের জন্য ভার্সিটিতে যেতে পারবে না তাই আজ আরশি একা একাই যাচ্ছে। অবশ্য আরশি ক্লাস করার জন্য যাচ্ছে না। বাসায় বোরিং লাগছিলো তাই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। বাস থেকে নেমে কিছুটা পথ যেতেই আরশির চোখ পরলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রর দিকে। দু হাত ভাজ করে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আর কালকের মতো সাদা শার্ট গায়ে জড়ানো নেই, এখন গাঢ় নীল রঙের শার্ট পরা। আরশি কালকের কথা মনে করে ভয় আর অস্বস্তিতে দ্রুত রৌদ্রকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কিছুটা দূরে যেতেই রৌদ্র গম্ভীর গলায় আরশিকে ডাক দিল-

“দাঁড়ান মিস আরু”

আরশি সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে গেল। নিচের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু করছে আরশি। রৌদ্র আরশি কাছে এগিয়ে আসতেই আরশি কয়েক পা পিছয়ে গেল। মাথা তুলে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো-

“আপনার কি সাদা শার্ট আছে??”

আরশির এমন প্রশ্ন শুনে রৌদ্র হাসবে নাকি কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না।৷ রৌদ্র চোখ ছোট ছোট করে আরশির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো-

“কেন আপনার কি আমার শার্ট লাগবে না-কি??”

আরশি ইতস্তত করে বলল-

“না, আচ্ছা আপনি কাল রাতে সত্যি আমাদের বাসার ওখানে যাননি??”

রৌদ্র বরাবরের মতোই শান্ত গলায় বললো-

“কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো।”

রৌদ্রর মুখে এই কথা শুনে আরশি চমকে উঠলো। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মাথার মধ্যে চিঠির মানুষের কথা মনে পরে গেল। চোখের সামনে তার লেখা চিঠি গুলো ভেসে উঠলো। আরশি বিস্ময় নিয়ে বলল-

“আপনি এই কথা…”

রৌদ্র কথা পালটানোর জন্য আরশির কথার মাঝেই গম্ভীর গলায় বললো-

“মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়েই কথা বলবেন মিস আরু!! চলুন আমার সাথে।”

রৌদ্র চুপচাপ সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। রৌদ্র জানে আরশি আসবে তার সাথে সাথে। আরশি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে রৌদ্রর দিকে। রৌদ্র তাকে কোথায় নিয়ে যাবে আরশি জানে না তবুও আরশির মন বলছে রৌদ্রকে বিশ্বাস করতে। আরশি দ্রুত গিয়ে রৌদ্রর পাশপাশি হাঁটা শুরু করলো। রৌদ্রর আড়চোখে আরশির দিকে একপলক তাকিয়ে মনে মনে একটা মুচকি হাসি দিলো। আরশি চুপচাপ হেঁটে চলছে রৌদ্রর সাথে। খানিকটা পথ যাওয়ার পর রৌদ্র একটা রিকশা থামিয়ে আরশিকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“রিকশায় উঠুন মিস আরু।”

আরশি ভ্রু বাঁকিয়ে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। আরশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রৌদ্র গম্ভীর গলায় বললো-

“ভরসা করতে পারছেন না আপনার রৌদ্রকে??”

রৌদ্রর কথা শুনে আরশি আরেক দফা চমকে উঠলো। অবাক হয়ে বললো-

“আমার রৌদ্র মানে??”

“বেশি কথা না বলে রিকশায় উঠুন মিস আরু।”

রৌদ্রর ধমকে আরশি আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত রিকশা উঠে গেল। রৌদ্রও আরশির পাশে বসে পরলো। রিকশা চলছে আপন গতিতে রৌদ্র আর আরশি একদমই চুপচাপ বসে আছে। প্রায় দশ মিনিট পর রিকশা একটা ব্রিজের কাছে এসে থেমে গেল।

চলবে….

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ১৭
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“এখানে এসেছেন কেন?”

আরশির প্রশ্নে রৌদ্র আকাশের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরশির দিকে শান্ত চোখে তাকালো। সব সময়ের মতো এবারও শীতল কন্ঠে বললো-

“এই জায়গায়টা খুব শান্ত নিরিবিলি তাই যখন ব্যস্ততার বাহিরে একা সময় কাটাতে ইচ্ছে করে তখনই এখানে এসে পরি।”

আরশি বেশ মনযোগ দিয়ে রৌদ্রর কথা শুনলো। রৌদ্রর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আশেপাশে তাকালো। ছোট্ট একটা খালের উপরে এই ব্রিজ। সত্যিই খুব সুন্দর জায়গা। মানুষের আনাগোনাও হয়তো খুব কম হয় এখানে। আরশি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে এই মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির দিকে। আর রৌদ্র অপলক দৃষ্টিতে আরশিকে দেখতে ব্যস্ত। কিছুটা সময় পর রৌদ্র আচমকা আরশিকে জিজ্ঞেস করলো-

“এতদিন কোথায় ছিলেন মিস আরু??”

হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে আরশি রৌদ্রর দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। আরশি কোনো উত্তর দিচ্ছে না চুপচাপ মলিন মুখে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে। পুরনো কথা মনে পরায় অস্বস্তিতে হাত কচলাচ্ছে অনবরত। রৌদ্রর আরশির হাতের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো-

“অস্বস্তির কিছু নেই আমাকে ভরসা করলে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন মিস আরু।”

আরশি মাথা তুলে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে রৌদ্রর দিকে। খানিকটা সময় চুপ থেকে আরশি সব কিছু বলে দিল। আরশির চোখ পানিতে টলমল করছে মনে হচ্ছে এখনই গড়িয়ে পরবে। আরশির কাছে এসব কথা শুনে রৌদ্র রাগে চোখমুখ লাল হয়ে চোয়ালা শক্ত করে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। ভার্সিটির দারোয়ানের কাছে এক্সিডেন্টের কথা শুনে রৌদ্র খুব পেয়েছিল। কিন্তু আরশি সামনা-সামনি দেখে রৌদ্রর কেন যেন মনে হচ্ছিলো আরশির কোনো কার এক্সিডেন্টে হয়নি আর কোনো প্রকার ব্যথাও পায়নি। তাই রৌদ্রর মনে কিছুটা খটকা লাগছিলো। বার বার মনে হচ্ছিলো আরশির এতদিন গায়েব থাকার পেছনে অন্য কোনো ব্যাপার ছিলো। তাই আরশির কাছে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু আরশির সাথে যে এমন জঘন্যতম কিছু ঘটেছে সেটা রৌদ্র ভাবেনি।

“জানেন ডক্টর আমাদের চারপাশের মানুষ গুলো বড্ড ক্ষুদার্ত। খাবারের ক্ষুধা তাদের নেই তারা ক্ষুদার্ত মানুষকে ভেঙেচূরে খেতে। ক্ষুদার্ত পশুর মতো হিংস্র রূপ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে মেয়েদের উপর নিজেদের তৃপ্তি মেটাতে। সেদিন যদি কাসফি আর আমার বাকি ফ্রেন্ড গুলো না থাকতো হয়তো আমার গায়েও ধর্ষিতার সিল মেরে দিত এই সমাজ।”

কথা গুলো শেষেই আরশির চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পরলো রৌদ্রর চোখ থেকে সেটা এড়ায়নি। আরশির চোখে পানি দেখে রৌদ্রর বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। আরশির কান্না তার একদমই সহ্য হচ্ছে না। রৌদ্র কথা ঘুরানো জন্য গম্ভীর গলায় বললো-

“আচ্ছা মিস আরু আপনি আমাকে সাদা শার্টের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন?? বাই এনি চান্স আপনি কি সাদা শার্ট পরা কোনো ভূত দেখেছেন না-কি!!!”

সাদা শার্টের কথা শুনে আরশি তৎক্ষনাৎ মাথা তুলে রৌদ্রর দিকে তাকালো। নিখুঁতভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে পরোক্ষ করছে রৌদ্রকে। আরশি এখনো কাল রাতের ঘটনাটা নিয়ে কনফিউজড। ওটা কি সত্যিই রৌদ্রর ছিলো নাকি তার মনের ভ্রম কিছুই আরশি বুঝতে পারছে না। আরশি কিছু একটা ভেবে রৌদ্রর হাতে একটা চিমটি কাটলো। সাথে সাথেই রৌদ্র মৃদুস্বরে আর্তনাদ করে উঠলো। হাত ঘষতে ঘষতে ভ্রু কুচকে আরশিকে জিজ্ঞেস করলো-

“আপনি কি আমাকে চিমটি দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলবেন নাকি!! প্রতিবার কি আমাকে খামচি না দিলে আপনার শান্তি হয় না??”

আরশি একটা মেকি হাসি দিয়ে আমতা-আমতা করে বলল-

“দেখছিলাম আপনি ভূত না-কি মানুষ।”

রৌদ্র নিজের হাত আরশির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-

“এই যে দেখুন আমার রক্ত। জ্বিন ভূতের নিশ্চয়ই রক্ত থাকে না!!”

আরশি রৌদ্রর হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো সত্যি সত্যিই চামড়াটা হাল্কা ছিলে গিয়ে রক্ত বের হয়ে গেছে। আরশি দ্রুত রৌদ্রর হাত ধরে চোখ গুলো বড় বড় করে তাকিয়ে বিস্ময় নিয়ে বলল-

“এইটুকু চিমটিতেই আপনার হাত দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল!!”

রৌদ্র আরশির এমন বাচ্চামিতে মনে মনে হাসলো। কিন্তু মুখে গাম্ভীর্যতার ভাব এনে বলল_

“আমি আপনাকে আগেও বলেছি আপনার নখ খুব ধারালো সব সময় কেটে রাখবেন। কিন্তু আপনি হয়তো আপনার এই ধারালো ছুরির মতো নখ দিয়ে খামচেই আমাকে হত্যা করার চেষ্টায় আছেন।”

আরশি জ্বলন্ত চোখে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে রাগী কন্ঠে বলল-

“আমার নখ একদমই ঠিক আছে। আর এতটুকু রক্ত বের হওয়াতে কেউ মরে যায়??? এক ফোটা রক্তও তো বের হয়নি।”

“বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে ঝগড়া না করে এখন চলুন।”

রৌদ্রর কথায় আরশির রাগে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো। রেগেমেগে রৌদ্রর পায়ে পাড়া দিয়ে বলল-

“অসভ্য ডাক্তার।”

কথাটা বলেই আরশি রাগে গজগজ করতে করতে রৌদ্রর আগেই চলে গেল। রৌদ্র ব্যথায় লাফিয়ে উঠলো। দু একবার পা ধাড়া দিয়েই দ্রুত আরশির কাছে গিয়ে বলল-

“আপনি আসলেই একটা বাচ্চা তা না হলে কেউ এমন করে!!”

আরশি রৌদ্রর দিকে রাগি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই রৌদ্র চুপ হয়ে গেল। আরশির রাগ দেখে রৌদ্র মিটমিট করে হাসছে। আরশি পুরো রাস্তা আর কোনো কথা বলেনি। রিকশা আরশির ভার্সিটির কাছে আসতেই রৌদ্র আর আরশি নেমে গেল। আরশি সামনে সামনে হেঁটে যাচ্ছে। রৌদ্র পেছন থেকে শীতল কন্ঠে বললো-

“আপনি রেগে গেলে রুদ্রাণীর মতো জ্বলজ্বল করে ওঠেন মিস আরু।”

রুদ্রাণী নামটা শুনেই আরশি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আরশি পেছন ফেরার আগেই রৌদ্র আরশির বাম পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আরশি ডান দিকে ঘাড় বাকিয়ে পিছনে তাকিয়ে কাউকে দেখলো না।

“কি হলো মিস আরু!! কাউকে খুঁজচ্ছেন নাকি!!”

রৌদ্রর কথায় আরশি চমকে বাম পাশে তাকিয়ে রৌদ্রকে দেখে ভয়ে আঁতকে উঠলো। আরশি চিন্তিত গলায় মিনমিনে বলল-

“আপনি এখানে তাহলে..”

“আচ্ছা মিস আরু একটা প্রশ্ন ছিল।”

আরশির কথা শেষ করার আগেই রৌদ্র কথাটা বলে উঠলো। আরশি জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে তাকিতেই রৌদ্র বলল-

“এতটা সময় আপনি আমার সাথে একা ছিলেন আপনার ভয় করেনি??”

আরশি কোনো উত্তর দিলো না। নিজের মনে মনেই বলল- “আসলেই তো আমি ওনার সাথে ছিলাম আমার ভয় করেনি কেন!! উনি যদি আমাকে ওখানে নিয়ে মেরে ফেলতো?? ছিঃছিঃ এইসব কি ভাবছি!!”

“কিছু কথা অজানাই থাকা ভালো। এখন আপনি বলুন আপনি কি কাল আমার বাসায় এসেছিলেন!! আর আমি এতদিন এখানে ছিলাম না এটা আপনি কি করে জানলেন??”

“সময় হলেই সব জানতে পারবেন। আজ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আর হ্যাঁ এখন বাসায় যান ভার্সিটি যেতে হবে না। সাবধানে যাবেন আর নিজের খেয়াল রাখবেন আসছি।”

রৌদ্র আর একমিনিটও দেরি না করে বাইকের কাছে গিয়ে বাইক নিয়ে দ্রুত চলে গেল। আরশি এখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে। আরশির কাছে সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো লাগছে।

—————————

নীলা আদ্রাফের কাছ থেকে যতটা দূরে যেতে চাইছে নীলা তার থেকেও বেশি আদ্রাফের প্রতি দূর্বল হয়ে পরছে। এতদিন আদ্রাফের সাথে সময় কাটিয়ে এখন নীলার মন বড্ড বেশিই ছটফট করছে আদ্রাফের সাথে কথার জন্য। তাই আদ্রাফকে ফোন দিল কোনো একটা বাহানায় দেখিয়ে কথা বলার জন্য। ফোন রিসিভ হতেই নীলা ইতস্তত করে বলল-

“হ্যালো আদ্র।”

“কি হয়েছে হঠাৎ ফোন দিলি কেন নিলু!!”

নীলা নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললো-

“কেন তোকে ফোন দিয়ে কি পাপ করেছি না-কি!!”

আদ্রাফ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-

“ধুর গাধি আমি কি সেটা বলেছি নাকি!! কি বলবি বল।”

“তুই কি কাল ভার্সিটি যা…”

নীলার কথা পুরো শেষ হওয়ার আগেই আদ্রাফের ফোন আসলো। আদ্রাফ কান থেকে ফোন সামনে এনে কাসফিয়ার নাম্বার দেখে নীলাকে থামিয়ে দিয়ে বলল-

“নিলু তোর সাথে একটু পর কথা বলছি। কাসফি ফোন দিয়েছে হয়তো কোনো দরকার আছে।”

আদ্রাফ এক দমে কথা গুলো বলেই ফোন কেটে দিল। নীলা ফোন হাতে নিয়ে এক দৃষ্টিতে স্কিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রাফের এমন ব্যবহারে নীলার বুক ফেটে কান্না আসছে। তার চোখ আজ আর কোনো বাধ মানছে না। বাচ্চাদের মতো ডুকরে ডুকরে কেঁদে দিলো নীলা। কাদঁতে কাঁদতেই ফোনের দিকে তাকিয়ে জড়ানো কন্ঠে বলছে-
“আমার সাথেই কেন এমন হলো!! আমি কি তোর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না আদ্র?? তুই কেন এতদিনেও আমার ভালোবাসা বুঝতে পারলি না?? আমি মুখে কিছু বলেনি বলে কি তুই আমার ব্যবহারে কিছুই বুঝতে পারিস নি?? তোর চোখে অন্য কারও জন্য ভালোবাসা দেখে আমার বড্ড কষ্ট হচ্ছে রে আদ্র!! আমার বুকে প্রচন্ড ব্যথা করছে তোর এইটুকু অবহেলায়। আমি কিভাবে তোকে ছাড়া থাকবো আদ্র?”

কথা গুলো বলতে বলতে নীলার কান্নার গতি যেন আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আজ নীলাকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। নিজের উপরই খুব রাগ হচ্ছে। নীলা মুখে কিছু প্রকাশ না করলেও সব সময়-ই আদ্রাফকে নিজের ভালোবাসা বোঝানোর চেষ্টা করতো। নীলা ভেবেছিল আদ্রাফ হয়তো একদিন তাকে ভালোবাসবে। কিন্তু না নীলার ধারণা সব সময়ই ভুল ছিল। আদ্রাফ তো তাকে সব সময় একজন বন্ধুই ভেবে গেছে। বন্ধু ভেবেই সব সময় খেয়াল রেখেছে আর নীলা আদ্রাফের এইসব কেয়ার দেখেই দিন দিন আরও বেশি আদ্রাফের জন্য নিজের মনে ভালোবাসা সাজিয়ে রেখেছে। আর এখন আদ্রাফের জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা এই ভালোবাসা গুলাই তার কষ্টে কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

————————

“আদ্রাফ তুই কি আজ কলেজে গেছিস??”

কাসফিয়ার চিন্তিত গলা শুনে আদ্রাফ ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে বলল-

” নাহ যাইনি, কিন্তু কি হয়েছে তোর গলা এমন লাগছে কেন?? তোরা দুজন ঠিক আছিস তো??”

“আশু আমাকে না বলেই ভার্সিটিতে চলে গেছে একা একা। নীলকে ফোন করেছিলাম নীল আর নীলা কেউ-ই নাকি ভার্সিটিতে যায়নি। আশু তো আমার ফোনও রিসিভ করছে না। এমনিতেই ওর সাথে এমন একটা দূর্ঘটনা ঘটে গেছে এখন আবার একা-একা বাহিরে গেছে। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে আদ্রাফ।”

“কাসফি তুই শান্ত হ চিন্তা করিস না। আমি দেখছি ভার্সিটিতে গিয়ে। এই মেয়েটার কখনো একটু বুদ্ধিও হবে না। আচ্ছা নীল কি বেরিয়েছে আশুকে খুঁজতে!!”

“হ্যাঁ নীল সাথে সাথেই বেরিয়ে গেছে। তুইও একটু গিয়ে দেখ প্লিজ।”

“আচ্ছা আমি যাচ্ছি, তুই চিন্তা করিস না।

চলবে….

(রিচেক করা হয়নি ভুল-ত্রুটি হলে মাফ করবেন।❤️)