#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ২৯
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“আমাকে দেখা শেষ হয়েছে আরু?”
রৌদ্রর কথায় আরশিকে লজ্জায় আঁকড়ে ধরেছে। ঠিক যেমনটা চোরাবালি আঁকড়ে ধরে তেমন করে। এই লজ্জা থেকে বেরিয়ে আসা যেন আরশির জন্য খুবই কষ্টদায়ক। হলদেটে গায়ের চামড়া এখন লালচে বর্নে বর্নিত হয়েছে। চোখজোড়া ঘনঘন পলক ফেলছে অস্থিরতায়। রৌদ্রর আরশির অবস্থা দেখে হাসলো। ঠোঁট চেপে হাসলো। গালের মাঝখানের টোলটা দাঁড়ির আবরণে ঘন কালো হয়ে উঠেছে। পকেট থেকে ডান হাত বের করে খানিকটা ঝুঁকে পরলো। আলতো করে আরশির মাথায় হাত রাখলো। শীতল কন্ঠে বললো-
“এবার একদম পারফেক্ট রুদ্রাণী লাগছে। তবে এতো তাড়াতাড়ি আমাকে ঝলসে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিও না রুদ্রাণী।”
রৌদ্র আবারও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুজে দিল। আরশির লজ্জা ভাব কেটে এখন ঝেঁকে বসেছে বিস্ময়বোধক চিহ্ন। “আমাকে রুদ্রাণী লাগছে!!কিন্তু রুদ্রাণী দেখতে কেমন!! আমি আবার কিভাবে ওনাকে ঝলসে দিবো!! আর দুঃসাহসই বা কখন দেখালাম!!” আরশির মনে চলছে এতো এতো বিস্ময়বোধক চিহ্নের ছোড়াছুড়ি খেলা। বিস্ময়কর চাহনিতে তাকালো রৌদ্রর দিকে। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“কি বলেছেন এগুলো!! একটু সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন। আমি তো আপনার কথা বুঝতেই পারছি না।”
রৌদ্র ঠোঁটে হাসি রেখেই বলল-
“বাচ্চাদের এতো কিছু বুঝতে হয় না। কিছু জিনিস আপাতত অজানা থাকুক। এখন আপনি বলুন আমার দিকে এতো বড় বড় চোখে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলেন কেন??”
আবারও একথায় ফিরে আসাতে আরশি অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। অগোছালো ভাবেই বলল-
“কই না তো আমি কেন আপনার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকব!! আপনি হয়তো ভুল দেখেছেন।”
“আপনি তো মিথ্যাও বলতে পারেন দেখছি। আমি নিজ চোখেই দেখলাম আপনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আর এখন আমার মুখের উপরেই মিথ্যে বলছেন!!”
রৌদ্রর কথায় আরশির মেজাজ বিগড়ে গেল। আর সেই সাথেই করে বসলো আরেক বোকামি। রাগে গজগজ করে বলল-
“দেখেছি তো কি হয়েছে!! চোখ আছে বলেই দেখেছি। আর আমি তো আপনাকে না আপনার গালের এই জায়গাটা দেখছিলাম।”
লাস্ট কথাটা আরশি রৌদ্রর গালের টোল পরা স্থানে আঙুল ছুঁয়ে দিয়েই বলল। রাগের মাথায় কি থেকে করেছে আরশি নিজেই জানে না। রৌদ্রর আরশির এমন কাজে থতমত খেয়ে গেল। রৌদ্র ভাবতেই পারেনি আরশি এভাবে হুট করেই তার গাল ছুঁয়ে দিবে। আরশি নিজের বোকামি বুঝতে পেরে আরেক দফা লজ্জা পেল। আকাশসম লজ্কা নিয়েই দ্রুত রৌদ্রর গাল থেকে আঙুল সরিয়ে নিল। কয়েক কদম পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আমতা-আমতা করে বলল-
“মানে আপনার গালের এই জায়গায় কালো হয়েছিল তাই দেখছিলাম। কিন্তু সামনে এসে বুঝলাম এটা টোল।”
রৌদ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আরশির অস্থিরতা দেখছে। আরশির রৌদ্রর কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বলল-
“আপনি এখানে এসেছেন কেন?”
রৌদ্র ছোট্ট করে উত্তর দিল।
“এমনি।”
“আচ্ছা তাহলে আমি যাই, আপনিও যান এখন।”
আরশি আর এক মুহুর্ত দেরি না করে চলে যেতে লাগলো। কিন্তু তার আগেই রৌদ্রর ডাকে থমকে দাঁড়ালো।
“মিস আরু।”
আরশি পেছন ফিরে রৌদ্রর দিকে তাকালো। নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো-
“কিছু বলবেন??”
রৌদ্র আরশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-
“এভাবে হুটহাট করে একা বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা যেন আর কখনো না শুনি।”
“আপনি একথা কিভাবে জানলেন??”
আরশি কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো রৌদ্রকে। রৌদ্রর মুখের গম্ভীরতা আরও বারিয়ে বলল-
“আপনার ফ্রেন্ড কাসফিয়া আমাকে ফোন করেছিল। আমি আপনার সাথে কি না জানার জন্য।”
“ওহহ”
“আপনার ফোন কোথায়?? নিশ্চয়ই বাসায় ফেলে এসেছেন!! আজ কিছু বললাম না তবে নেক্সট টাইম যেন এমন বেখেয়ালিপোনা না দেখি। কথা গুলো মাথায় রাখবেন।”
রৌদ্রর এমন শক্ত গলা শুনে আরশি কিছু বলার সাহস পেল না। ভদ্র ভাবে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। রৌদ্র আরশির মাথায় হাত রেখে বললো-
“এখন যাও আর হ্যাঁ নিজের খেয়াল রেখো।”
রৌদ্রর আরশির মাথা থেকে হাত নামিয়ে নিতেই আরশি একটা মেকি হাসি দিয়ে বড়বড় পদক্ষেপ ফেলে চলে গেল। রৌদ্র আরশির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা মুচকি হাসি। আরশি তার ফ্রেন্ডদের কাছে এসে বসতেই নীল জিজ্ঞেস করল-
“কিরে এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে! আর কার সাথে কথা বলছিলি ওখানে??”
আরশি নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলল-
“ডক্টর মানে চিঠির মানুষ আমার পাশের বারান্দা। আজ আর এসব নিয়ে কোনো কথা বলিস না। আমার এখন আর এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।”
নীল কিছু বলতে গিয়েও বলল না। সবাই এসব বাদ দিয়ে অন্য আড্ডায় মেতে উঠলো।
——————————
আরশি বিছানায় শুয়ে অস্থিরতায় এপাশ ওপাশ করছে একটু পর পর। দু’দিন ধরে মনে হচ্ছে ঘুম তার সাথে প্রচন্ড অভিমান করেই চলে গেছে। এখন আর ঘুম দু’চোখের পাতায় ধরা দিতে চাইছে না। চোখের পাতা বন্ধ করলেই যেন রৌদ্রর বলা কথা, রৌদ্রর মুচকি হাসি আর গালের সেই অদ্ভুত টোল বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এসবের প্রতি ভয়াবহ বিরক্তি নিয়েই আরশি উঠে বসলো। পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে টাইম দেখলো। রাত একটা বেজে দশ মিনিট। আরশি টাইম দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। ফোনটা ছুরে বিছানার মাঝে ফেলে দিল। এতো রাত হয়ে গেছে অথচ ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না আরশি। রাগে গজগজ করে ওয়াশরুমে চলে গেল। চোখেমুখে বেশ কিছুক্ষন পানির ছিটা দিয়ে রুমে চলে আসলো। বড় বড় কয়েকটা শ্বাস নিয়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দায় এসে সর্বপ্রথম নজর পরলো মেঝেতে পরে থাকা নীল চিরকুটের দিকে। খুব আগ্রহের সাথেই চিরকুটটা নিয়ে পড়া শুরু করলো।
প্রিয় রুদ্রাণী,
জানো তো লজ্জায় যখন তোমার হলদেটে গাল গুলো লালচে বর্নের হয়ে ওঠে তখন তোমাকে একদমই রুদ্রাণীর মতো দেখায়। আর যখন তোমার আঙুল দিয়ে আমার গাল ছুঁয়ে দিলে তখন মনে হলো সত্যিই রুদ্রাণী রেগেছে। ভয়ংকর রেগেছে। আমাকে তার তপ্ত দাহনে ঝলসে দেওয়ার মতো ক্রোধ তার মনে জায়গা করে নিয়েছে। হুটহাট করে লজ্জায় শেষ বিকেলের শান্ত-শীতল রোদ আর কখনো রাগান্বিত হয়ে দুপুরের উত্তপ্ত সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠো। রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণীর অনুভূতি গুলো মিছিল শুরু করে দিয়েছে। রুদ্রাণীর এই অনুভূতি গুলোর প্রধান কারন কি হতে পারে তোমার জানা আছে!!!
[বিঃদ্রঃ পাখিগুলো রুদ্রাণীকে বড্ড মিস করছে। রুদ্রাণীর দেখা না পেয়ে সব গুলো পাখি চুপচাপ হয়ে গেছে। আপনি নিজের লজ্জাবোধ মনের এক কোণে লুকিয়ে রাখুন। যাতে করে আগের মতো বারান্দায় এসে পাখিগুলোর সাথে সময় কাটাতে পারেন। আমার নামে যত অভিযোগ আছে তা শোনার জন্য তো তারাই আপনার একমাত্র সঙ্গী। তাই তো পাখিটা কতো সুন্দর করে “অসভ্য” বলা শিখেছে।]
ইতি,
রৌদ্র
চিরকুটটা পড়েই আরশির হার্টবিট কয়েকটা মিস হয়ে গেল। বেসামাল হয়ে পরেছে তার মনের সকল অনুভূতি গুলো। লজ্জায় মিয়িয়ে যাচ্ছে আরশি। এ কেমন অনুভূতি!! আগে তো কখনো এমন হয় নি। আরশি নিজেকে সামলাতে পারছে না। এই নীল চিরকুট আর তার মধ্যে লেখা প্রতিটি লাইন, প্রতিটি অক্ষর খুব করে তাকে কাছে টানছে। আরশি রেলিঙের উপর হাত রেখে আকাশে দিকে তাকিয়ে পর পর কয়েকবার শ্বাস নিল। নিস্তব্ধ এই শহরে নিজেকে এখন মুক্ত পাখির মতো লাগছে। মনের মধ্যে চলছে হাজারো প্রশ্নের ছড়াছড়ি। কোনো প্রশ্নের উত্তরই আরশির জানা নেই।
——————————
ক্লাস শেষে বাহিরে আসতেই দেখলো রোদ্র দাঁড়িয়ে আছে। আরশি কাসফিয়াকে বলল-
“কাসফি তুই আদ্রাফের সাথে চলে যা। ডক্টর হয়তো আমাকে বাসায় পৌঁছে দিবে।”
“আচ্ছা তুই গিয়ে দেখ কি বলে।”
আরশি রৌদ্রর কাছে আসতেই রৌদ্র শান্ত গলায় বললো-
“চলুন আমার সাথে।”
“কোথায়??”
“এখন থেকে আপনি আমার সাথেই আসা যাওয়া করবেন। বেশি কথা না বলে এখন চলুন।”
আরশি কিছু বলার আগেই নীল আরশির হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। এভাবে আরশিকে হাত ধরে নিয়ে যেতে দেখে রৌদ্রর চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ সংযত করার চেষ্টা করছে। নীল আরশিকে অডিটোরিয়ামের কাছে নিয়ে আসলো। আরশিকে তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-
“আশু তোর সাথে আমার ইম্পর্টেন্ট কথা আছে।”
আরশি খানিকটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বলল-
“কি এমন ইম্পর্টেন্ট কথা যে তুই ডক্টরের সামনে থেকে আমাকে টেনে নিয়ে আসলি!! কি বলবি তাড়াতাড়ি বল দেরি হলে ডক্টর আবার আমাকে কথা শোনাবে।”
নীলের মুখের গম্ভীরতার রেশ আরও বেড়ে গেল। আরশির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে।
চলবে….
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৩০
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“কিরে বল কি বলবি। কি এমন ইম্পর্টেন্ট কথা আছে তাড়াতাড়ি বল।”
নীল গম্ভীরতার সাথে আরশির দিকে তাকালো। বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শক্ত গলায় বললো-
” আশু তুই আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সবার খুব প্রিয়। আমাদের সকলেরই খুব ভালো ফ্রেন্ড তুই। আর আমি তোকে আমার অনেক কাছের একজন মানুষ মনে করি। কারন আমি তোকে কখনো নিলুর চেয়ে কম কিছু মনে করি নি। নিলু আমার কাছে যতটা ইম্পর্টেন্ট ঠিক ততটাই তুই আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট। আমি চাই না তোর কোন ক্ষতি হোক। তাই যা করবি ভেবেচিন্তে করিস। এখন হয়তো মনে মনে তোর প্রশ্ন জাগবে যে আমি আমার নিজের বোনেরই খেয়াল রাখি না তাহলে তোর উপর কেন এতো শাসন করছি!! যদি এমন প্রশ্ন তোর মনে আসে তাহলে শুনে রাখ আমি নিলুর ব্যাপারে সব কিছুই জানি। নিলু কাকে ভালোবাসে, কখন কান্না করে, কখন ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েও হাসিমুখে ঘুরে বেড়ায় সবই আমি জানি। তবে কিছু বলিনা। কারন আমি জানি নিলুর সাথে আদ্রাফকে নিয়ে কথা বললে নিলু খুব বিব্রতবোধ করবে। তাই সব কিছু জেনেও চুপ করে আছি। কিন্তু আমি চাই না নিলুর মতো তুইও কষ্ট পাস। নিলুর মতো তুইও একা একা কান্না কর সেটা আমি চাই না। তাই আগে থেকেই সতর্ক করে দিচ্ছি।”
আরশি নীলের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে নীলের মুখে এমন কঠোর ভাবে কথা বলে শুনে। আরশি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নীলের দিকে। নীলের মতো দুষ্টু সব সময় হাসিঠাট্টায় মেতে থাকা ছেলেটার ভিতর এতো দায়িত্ববোধ!!! আরশি সন্দিহান কন্ঠে বলল-
“তুই এতো শাসন করা আর বোনদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা কবে থেকে শিখলি নীল??”
“নিলুর কষ্ট দেখে।”
নীল আরশির কাধে হাত রেখে শান্ত গলায় আবারও বললো-
“নিলুর কষ্ট দেখেছি এখন আবার তোর কষ্ট দেখতে পারবো না। আদ্রাফকে কিছু বলিনি কারণ নিলুর কষ্টের পেছনে ওর কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু তোর ওই চিঠির মানুষের জন্য যদি কখনো তোকে একটুও কষ্ট পেতে দেখি তাহলে ভাবিস না উনি আমাদের বড় বলে ওনাকে আমি ছেড়ে দিব। আমি সব সময় চেয়েছি তোকে আর নিলুকে ভালো রাখতে কিন্তু আমি পরপর দু বার ব্যর্থ হয়েছি। তোকে আমি ওই নরপশুর কাছ থেকে রক্ষা করতে পারিনি আর নিলুকে ওর ভালোবাসার মানুষ এনে দিতে পারিনি। আমার এই ব্যর্থতা আমাকে ভিতর ভিতর কুড়ে খাচ্ছে আশু। একজন ভাই হয়েও আমি কিছু করতে পারলাম না। জানিস তোদের বাসা থেকে আসার সময় আংকেল আন্টি আমার হাত ধরে বলেছিল আমি যেন তোর খেয়াল রাখি। আমি সেদিন খুব বুক ফুলিয়ে বলেছিলাম আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তোর খেয়াল রাখবো। তাই তোকে সতর্ক করে দিচ্ছে। ওই লোক যদি তোর সাথে কোনো প্রকার খারাপ ব্যবহার করে তাহলে তুই সবার আগে আমাকে জানাবি। আর আমার কাছ থেকে যদি কোনো কিছু লুকিয়ে রাখিস তাহলে একটা থাপ্পড়ও মাটিতে পরবে না মনে রাখিস।”
আরশি ঘাড় বাকিয়ে নীলের দিকে তাকিয়ে গোমড়া মুখে বলল-
“ইশশ আসছে আমাকে হুমকি দিতে!! তোর সাহস কি করে আমাকে এভাবে হুমকি দেওয়ার?? আমার আপন ভাই থাকলেও হয়তো এতো কড়া শাসন করতো না। তুই নিজের চেহারাটা দেখেছিস একবার!! তুই নিজেই একটা বাচ্চা পোলাপান তুই আবার আমাকে শাসন করিস কিভাবে??”
নীল রাগান্বিত চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে বলল-
“আরেকটা ফালতু কথা বলবি তো এক থাপ্পড় খাবি। চুপ থাক বেয়াদব মাইয়া।”
রৌদ্র আরশিকে খুঁজতে খুঁজতে অডিটোরিয়ামের দিকে এসে পরেছে। নীল আর আরশির সব কথাই রৌদ্র আড়াল থেকে শুনে ফেলেছে। নীলের কথা গুলো শুনে রৌদ্রর মুখে আপনা আপনিই হাসি ফুটে উঠলো৷ রৌদ্র ওদের দিকে এগিয়ে না গিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে ওখান থেকেই চলে আসলো। আরশি নীলের সাথে কথা বলে রৌদ্রর কাছে ফিরে আসলো৷ হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতো ফোনে কথা বলছে রৌদ্র। আরশি সরু চোখে রৌদ্রর কথা বলার ভঙ্গিমা পরোক্ষ করছে। রৌদ্র আরশিকে দেখে চোখের ইশারা সাথে আসতে বলেই হাঁটা শুরু করলো। আরশিও রৌদ্রর পেছন পেছন চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। ভার্সিটি থেকে বের হতেই রৌদ্র কানের কাছ থেকে ফোন নামিয়ে পকেটে রেখে দিল। আরশির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল-
“তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠুন আমাকে এখনই হসপিটালে যেতে হবে।”
“তাহলে আমি কেন যাবো আপনার সাথে??”
“আপনিও আমার সাথেই হসপিটালে যাবেন। আমি আমার কাজ শেষ করেই আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিব। ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি আমার কেবিনে বসে অপেক্ষা করবেন। এখন আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ গাড়িতে বসুন।”
আরশি আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে বসে পরলো।
—————————
“কাসফি তোর কাছে ঐ ডক্টরের ফোন নাম্বার আছে??”
“হ্যাঁ আছে কিন্তু তুই কি করবি??”
কাসফিয়া কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো। নীল নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দিল-
“ডক্টরের ব্যাপারটা আমার বেশ সুবিধার মনে হচ্ছে না। তাই ওনার সাথে দেখা করবো।”
কাসফিয়া ভ্রু কুচকে কিছুক্ষন ভাবলো। চিন্তিত গলায় বললো-
“আমারও কেমন যেন লাগছে। মানে উনি কখনো বাবা হতে পারবে না বলেই কি আশুর সব কথা জেনেও মেনে নিয়েছে না-কি সত্যি সত্যিই আশুকে পছন্দ করে তাই মেনে নিয়েছে!! এই ব্যাপারটাই বুঝতে পারছি না আমি।”
নীল গম্ভীর গলায় বললো-
“হুম সেটা জানতেই দেখা করবো ওই লোকের সাথে। তুই আরশিকে এসব নিয়ে কিছু বলিস না।”
“চিন্তা করিস না আমি আশুকে কিছু বলবো না তবে তোর সাথে আমিও যাবো।”
নীল ভ্রু বাঁকিয়ে সন্দেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-
“তুই গিয়ে কি করবি!!”
“কি করবো মানে কি!! আশু একটা মানুষের প্রতি দিন দিন দুর্বল হয়ে পরছে আর আমি সেই মানুষটার সম্পর্কে সব কিছু জানবো এটাই তো স্বাভাবিক। ডাক্তারের ব্যাপারটা এতদিন স্বাভাবিক মনে হলেও এখন আমার কেন যেন কিছুটা খটকা লাগছে। তাই আমি নিজে ওনার সাথে কথা বলতে চাই আশুকে নিয়ে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে তুই নিজেই ওনাকে ফোন করে বলিস কাল দেখা করতে। এখন আমি যাই নিলু হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
“ওকে যা।”
নীল বেঞ্চি থেকে উঠে দ্রুত পায়ে চলে গেল। কাসফিয়া চুপচাপ বসে আছে একা একা। আদ্রাফ কিছু একটা কাজের জন্য স্যারের সাথে কথা বলতে গেছে তাই বসে বসে আদ্রাফের জন্য অপেক্ষা করছে।
——————————
প্রায় পনেরো মিনিট ধরে রৌদ্রর কেবিনে অপেক্ষা আরশি। রৌদ্র সেই যে পনেরো মিনিট আগে আরশিকে বসিয়ে দিয়ে গেছে এখনো তার আসার কোনো নামগন্ধ নেই। আরশিকে রৌদ্র নিজের চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছে আরশি এখনো সেইভাবেই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। খানিকটা সময় পর রৌদ্র কেবিনে এসে আরশির সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“সরি একটু দেরি হয়ে গেল। আপনি নিশ্চয়ই বোর….”
“ভাইইইই এটা তোমার পাশের বারান্দার মেয়ে না??”
আচমকা নির্বানের কথা শুনে আরশি আর রৌদ্র দুজনেই চমকে উঠলো। আরশি জড়োসড়ো হয়ে মাথায় নিচু করে ফেলল। অভ্যাসগত ভাবেই অস্বস্তিতে হাত কচলাতে লাগলো। রৌদ্র কিছু বলার আগেই নির্বান কেবিনের দরজা থেকে এগিয়ে আসলো। প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়েই আবার বলল-
“কি হলো কিছু বলছো না কেন!! উনি তোমার চেয়ারে বসে আছে কেন??”
রৌদ্র গম্ভীর গলায় বললো-
“তোর এতো কিছু না জানলেও চলবে।”
নির্বান সন্দেহের দৃষ্টিতে কিছুক্ষন আরশি আর রৌদ্রকে দেখে বলল-
“ভাই!!! তোমরা নিশ্চয়ই প্রেম করছো তাই না!! আর এই কারনেই তুমি একা একা হাসতে, অদ্ভুত আচরণ করতে!! আমাকে আগে বললে না কেন?? তুমি এটা ঠিক করলে না ভাই।”
নির্বানের কথায় আরশি বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। নির্বান আবারও হতাশ হয়ে বলল-
“ইশশ ভাই তুমি জানো আমি প্রথম দেখেই ওনার উপর ক্রাশ খেয়েছিলা। আর তুমি শেষে কি-না আমার ক্রাশের সাথেই প্রেম শুরু করলে?? ভাই তোমার কি একটুও কষ্ট লাগলো না তোমার ছোট্ট ভাইয়ের এই ছোট্ট একটা ক্রাশকে চুরি করতে!! আর এই যে কি যেন নাম আপনার বলেছিলেন!! আরশি?? তুমি এটা একদমই ঠিক করলে না। চিঠি আমি লিখে দিলাম কিন্তু আমার প্রেমে না পরে তুমি আমার এই গম্ভীর ভাইয়ের প্রেমে পরলে কিভাবে??”
নির্বানের কথা শুনে আরশির জান যায় যায় অবস্থা। এই ছেলে ইচ্ছে করেই তাকে লজ্জায় ফেলছে সেটা আরশির আর বুঝতে বাকি রইলো না। রৌদ্র নির্বানের পিঠে জোরে একটা চাপড় মেরে বলল-
“নির্বান দুষ্টামি বন্ধ কর। নাহলে এক্ষুনি মামার কাছে ফোন করে বিচার দিব।”
“হুহ্ তুমি কি বিচার দিবে!! আমি নিজেই আরশির শাশুড়ীকে ফোন করে সব কিছু বলে দিব।”
রৌদ্র নির্বানের কান ধরে টান দিতেই নির্বান চেচিয়ে বলে উঠলো-
“আরে ভাই ব্যথা পাচ্ছি তো। ছাড়ো প্লিজ। আচ্ছা আর কিছু বলবো না।”
রৌদ্র নির্বানের কান ছেড়ে দিয়ে বলল-
“আবার এসব আজেবাজে কথা বলা শুরু করলে তোর কপালে মাইর আছে।”
নির্বান মিনমিনিয়ে বলল-
“আমি তো আমার ভাবির সাথে একটু মজা করছিলাম। উনি যে কি পরিমান লজ্জা পায় তা তো আমি প্রথম দিন বুঝে গিয়েছিলাম। ওইদিন লজ্জায় তাড়াহুড়ো করে আমার সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছিল তাই আজ একটু সুযোগ পেয়েছি তার লজ্জা কাটানোর। দেখো ভাই এখনো কিভাবে লজ্জায় লাল নীল হচ্ছে। ভাই তুমি কি সত্যিই এই বাচ্চা মেয়ের সাথে প্রেম করো না কি!!!”
নির্বানের কথা শুনে আরশির মনে হচ্ছে এখানে আসাই তার জীবনের বড় ভুল। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হবে জানলে কখনই এখানে আসতো না। আরশি লজ্জায় মাথা নুয়ে রেখেছে। আর হাত কচলাতে কচলাতে হাত লাল করে ফেলেছে। রৌদ্র আরশির দিকে তাকিয়ে আরশির এমন অবস্থা দেখে নির্বানকে ধমকের স্বরে বললো-
“নির্বান চুপ কর তো। আর মিস আরু আপনি তো মনে হচ্ছে এখনই হাতের চামড়া উঠিয়ে ফেলবেন মনে হচ্ছে।”
চলবে…
[ রিচেক করা হয়নি হয়তো অনেক ভুল হবে। ভুলের ক্ষমা করবেন।]