রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-৩৫+৩৬

0
890

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৩৫
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আম্মু বাবা কাল বাসায় যেতে বলেছে কেন?? বাসায় কি কিছু হয়েছে?? সব কিছু ঠিক আছে তো!!”

আরশির আব্বু ফোন কেটে দেওয়ার কিছুক্ষণ সময় বাদেই আরশির ওর আম্মুকে কল করে। ফোন রিসিভ হতেই আরশি চিন্তিত গলায় এক সাথে সব গুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিল ওর আম্মুর দিকে।

“আমি কিছু জানি না আশু। তোর আব্বু আমাকে কিছু বলে নি। তুই বরং কাল বাসায় এসেই জেনে নিস।”

আরশি ওর আম্মুর কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হতাশ হয়ে বলল-

“আচ্ছা ঠিক আছে এখন এখন রাখছি। ভালো থেকো।”

আরশি ফোন কেটে বিছানায় ধপাস করে বসে পরলো। দু পা আড়াআড়ি ভাজ করে বসলো। গালে হাত রেখে ভাবতে লাগলো কি এমন জরুরি কাজ হতে পারে যার জন্য তার বাবা এমন কড়া হুকুম দিয়েছে!! মিনিট পাঁচেক চিন্তা ভাবনা করে কোনো কারন খুঁজে বের করতে না পেড়ে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ফোন হাতে নিয়ে নীলদেরকে গ্রুপে কল দিল। সবাই কলে জয়েন হতেই আরশি মলিন কন্ঠে বললো-

“নীল, কাসফি, আদ্রাফ আর নিলু তোরা সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নে। কাল বিকেলের মধ্যে আব্বু আমাদের সবাইকে ওনার সামনে দেখতে চায় বলে কড়া হুকুম দিয়েছেন।”

সবাই চমকে উঠে একসাথেই মৃদুস্বরে চেচিয়ে বলল-

“কিইইইই???”

আরশি বিরক্তিমাখা কন্ঠে বললো-

“উফফফ আস্তে কথা বলতো তোরা।”

“কিন্তু হঠাৎ করে তোদের বাসায় কেন যেতে বলেছে আশু??”

আদ্রাফের প্রশ্নে আরশি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো-

“জানিনা রে। আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু কিছু বলেনি।”

“আশু তুই কি কোনো গন্ডগোল পাকিয়েছিস না-কি!! দেখিস নিজের সাথে সাথে আবার আমাদেরকেও ফাঁসিয়ে দিস না।”

নীলের কথা শুনে আরশি রাগান্বিত কন্ঠে বললো-

“চুপ কর হারামি। আমি আবার কি গন্ডগোল পাকাবো?? ফালতু কথা বলিস না।”

নীল এবার কাসফিয়াকে উদ্দেশ্য করে সন্দেহের গলায় বলল-

“কাসফি তুই আর আদ্রাফ মিলে কোনো আকাম-কুকাম করিস নি তো!!”

কাসফিয়া ভড়কে উঠে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-

“নীলের ডিব্বা বাজে কথা বলা বন্ধ কর। আশুর আব্বু ফোন দিয়েছে হয়তো কোনো জরুরী কাজ বলে। আংকেল তো আর বিনাকারণে আমাদের যেতে বলবে না তাই না।”

নীলা বিরক্ত হয়ে গম্ভীর গলায় বললো-

“উফফ তোরা এভাবে ঝগড়া করছিস কেন আজব!! কাল গেলেই তো জানতে পারবি কেন যেতে বলেছে। এখন সবাই চুপ থাক।”

আরশি ক্ষিপ্ত হয়ে বলল-

“হুম তোরা সবাই এখন ফোন রাখ। তোদের আজাইরা প্যাচাল শুনতে ভালো লাগছে না আমার। অসহ্যকর।”

আরশি রাগে গজগজ করে কথা গুলো বলেই ফোন কেটে দিল। রাতে ডিনার করে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই ময়না পাখি “পাশের বারান্দা” “পাশের বারান্দা” বলে চেচামেচি করতে লাগলো। আরশি পাখিগুলোর শব্দে ভ্রু কুচকে পাশের বারান্দায় তাকালো। রৌদ্র রেলিঙে হাত রেখে সামনের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। আরশির উপস্থিতি টের পেয়েও তার দিকে ফিরে তাকালো না। আরশি রৌদ্র দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নম্র কন্ঠে বললো-

“গাড়ির বিব্রতকর ঘটানার জন্য দুঃখিত। আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে।”

রৌদ্র আরশির দিকে ফিরে তাকালো৷ শীতল চোখে তাকিয়ে আছে আরশির মুখের দিকে। নরম গলায় বললো-

“লোকটা কে মিস আরু??”

“ওনার সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। উনি প্রতিদিন ভার্সিটিতে এসে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন, ভালোবাসার কথা বলতেন ব্যস এটুকুই। তারপর একদিন আমার ব্যর্থতার কথা বলি সেদিনের পর থেকে তার সাথে আর দেখা হয়নি। কিন্তু আজ হঠাৎ করে কোথা থেকে আমার সামনে চলে আসলো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

রৌদ্র আর কিছু বললো না। আবারও আকাশের দিকে দৃষ্টি দিল। আরশিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা সময় পর নিরবতা ভেঙে রৌদ্র জিজ্ঞেস করলো-

“আপনি কি রাজি লোকটাকে বিয়ে করতে??”

আরশি হকচকিয়ে উঠলো এমন প্রশ্নে। রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে গম্ভীরমুখে বলল-

“আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই না।”

“আর আমাকে!!”

আরশি চমকালো। কিছু বলতে পারছে না। গলার মধ্যেই শব্দ গুলো গুলিয়ে ফেলছে। রৌদ্র আবারও বলে উঠলো-

“অনেক রাত হয়েছে। এখন আপনার ঘুমিয়ে পরা দরকার। এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে রুমে যান মিস আরু।”

আরশি রৌদ্রর গম্ভীরমুখের দিকে এক ঝলক তাকালো। এই গম্ভীর চেহারায় তাকে বড্ড বেমানান লাগিছে। লোকটার মুখে তো হাসি খুব বেশিই মানায়। তবুও যে কেন সব গম্ভীর হয়ে থকে!!আরশি কোনো কথা না বলে চুপচাপ রুমে চলে আসলো। রৌদ্র এখনো আরশির বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে চলছে হাজারো চিন্তা ভাবনা আর ভয়। বুক চিড়ে বেরিয়ে আসলো এক দীর্ঘশ্বাস।

—————————

সকাল সকাল আরশি আর ওর বন্ধুরা সবাই মিলে বেরিয়ে পরলো তাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। চিন্তায় আরশির মাথা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে। পুরো পথ কেউ কোনো কথা বা দুষ্টুমি কিছুই করেনি। সবাই চিন্তিত মুখে বসেছিল। দুপুরের দিকে সবাই বাসায় পৌঁছে গেল। আরশি বাসার কাছে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে যায়। অস্বস্তিতে হাত কচলানো প্রায় শুরু হয়ে গেছে তার। নীল আরশির অবস্থা দেখে ওর কাধে হাত রেখে বলল-

“আরে এতো চিন্তা করছিস কেন?? বাসায় তো এসেই পরেছিস এখন ভিতরে চল।”

আরশি নীলের দিকে তাকিয়ে একটা জোড়ালো শ্বাস ফেলে বাসার ভিতর চলে গেল। আরশি আর কাসফিয়ার বাবা মা সবাই ড্রয়িং রুমে বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আরশি আর ওর বন্ধুরা সবার সাথে কুশল বিনিময়ের পর আরশি আদিব হাসানের সামনে এসে নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলো-

“বাবা হঠাৎ করে আসতে বলেছো কেন আমাদেরকে?? কিছু হয়েছে??”

আদিব হাসান মুখে গম্ভীরতা এনে বললো-

“আমার মেয়েকে আমি যখন ইচ্ছে আসতে বলতে পারি কিন্তু এর জন্য যে আমাকে এতো কৈফিয়ত দিতে হবে তা তো জানতাম না।”

আরশি ওর বাবার পাশে বসে শালীন গলায় বলল-

“আহহ বাবা আমি কি তা বলেছি না-কি!! এভাবে হঠাৎ করে আসার কথা বলেছো তাই আমার চিন্তা হচ্ছে। তুমি তো এর আগে কখনো এমন করনি”

আদিব হাসান তার মেয়েকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন-

“আসলে মা তোকে না জানিয়ে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”

আরশি কৌতূহলী চোখে আদিব হাসানের দিকে তাকালো। সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“কিসের সিদ্ধান্তের কথা বলছো বাবা??”

“তোর বিয়ের।”

আদিব হাসানের এমন সহজ জবাব শুনে আরশি চমকে গেল। আরশির পায়ের নিচ থেকে মনে হচ্ছে মাটি সরে গেছে। আরশি প্রচন্ডরকম অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বিস্মিত হয়ে বলল-

“বিয়ে মানে!! কি বলছো তুমি বাবা!!”

আদিব হাসান সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন-

“যা বলেছি ঠিক শুনেছো। আগামীকাল তোমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে। তার আগে তুমি নিজেকে সব কিছুর জন্য রেডি করে নাও। আগামীকাল আমি কোনো প্রকার ঝামেলা চাই না। আশা করি আমার কথা বুঝতে পেরেছো।”

আদিব হাসান গম্ভীরভাবে পা ফেলে দোতলায় চলে গেলেন। আরশি আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। চোখ পানিতে টলমল করছে। আরশি ভেজা চোখে ওর আম্মু দিকে তাকিয়ে মলিন কন্ঠে বললো-

“আম্মু এসব কি হচ্ছে!!”

আরশির আম্মু আরশির কাছে এসে মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বললেন-

“তুই তো জানিস তোর আব্বু এক বার যা বলে সেটাই করে। তুই চিন্তা করিস না আমি দেখছি তোর আব্বুর সাথে কথা বলে।”

আরশির আম্মু চলে গেলেন। কাসফিয়ার বাবা-মা আরশিকে নানানরকম সান্ত্বনার বানী শুনিয়ে তারাও চলে গেলেন। আরশি মাথা নিচু করে সোফায় বসে আছে। এতোক্ষন নীল ওরা সবাই চুপ থাকলেও এখন সবাই যাওয়ার সাথে সাথেই আরশির পাশে এসে বসে পরলো। সবাই এক প্রকার হামলে পড়েছে আরশিতে সান্ত্বনা দিতে। নীল আরশিকে শান্ত করার জন্য বলল-

“আশু চিন্তা করিস না। পাত্রপক্ষ দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না তাই না।”

নীলের কথায় সবাই তাল মিলিয়ে আরশিকে বোঝাতে লাগলো। আরশি আগের মতোই চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। কারো কথার কোনো পাত্তা না দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলেশহীন ভাবে বললো-

“তোদের সবার কষ্ট করে আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে হবে না।”

আরশি আর কোনো কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেল। সারাদিন চুপচাপ রুমের মধ্যেই কাটিয়েছে। কারও সাথে কথা বলেনি। আর রুমের বাহিরেও যায়নি। নির্ঘুম সারারাত কাটিয়ে দেওয়ার পর সকালে একটু ঘুমিছে আরশি। কিন্তু ঘন্টা খানেক পেরুতেই কাসফিয়া আর নীলা এসে আরশিকে টেনেহিঁচড়ে ঘুম থেকে তুলে দিল। আরশি প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে ধমকের স্বরে বলল-

“উফফফ নিলু কি হয়েছে তোদের?? এভাবে গরুর মতো ধাক্কাধাক্কি করছিস কেন??”

কাসফিয়া আরশিকে তাড়া দিয়ে বলল-

“আংকেল আমাদের দু’জনকে কড়া গলায় হুকুম দিয়েছে তোকে এক ঘন্টার মধ্যে সাজিয়ে দিতে হবে।”

আরশি কিছু বলার আগে নীলা অসহায় কন্ঠে বললো-

“আশু প্লিজ তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। দেরি হলে আংকেল আমাদের দুজনকে বকা দিবে। তুই না আমাদের খুব ভালো বন্ধু প্লিজ আমাদের বকা খাওয়ার মতো কিছু করিস না। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে বোন।”

আরশিকে এক প্রকার জোর করেই কাসফিয়া আর নীলা রেডি করিয়ে দিল। আরশি গোমড়া মুখে বসে আছে। তার বাবার উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে তার। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু প্রকাশও করতে পারছে না। আরশি খুব ভালো করেই জানে তার বাবা কাওকে একবার কথা দিয়ে দিলে সে কথা কখনো ফেলে না। ঘন্টা খানেক পর কাসফিয়ার আম্মু এসে বলল-

“কাসফি আর নিলা বাহিরে আসো। মেহমান এসেছে তাদের খেয়াল রাখো যাও।”

আরশিকে রেখে সবাই চলে গেল। আরশি হতভম্ব হয়ে বসে আছে। বুক ফেটে কান্না আসছে তার। কি থেকে হয়ে গেল আরশি কিছুই বুঝতে পারছে। মূর্তি ন্যায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আরশি। চোখের সামনে বার বার সেই রঙিন চিরকুট গুলো ভেসে উঠছে। দুই চোখ পানিতে চিকচিক করছে।

চলবে…

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৩৬
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আমি ডক্টর রোদকে ভালোবেসে ফেলেছি নীল।

নীল আরশির রুমে আসতেই আরশি নিম্ন স্বরে নীলকে কথাটা বলল। নীল অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। মাথা নিচু করে বসে আছে আরশি। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। হাত দুটোর উপর অত্যাচার করছে বরাবরের মতোই। নীল আরশির পাশে এসে বিছানায় বসতেই আরশি জড়ানো কন্ঠে বলতে লাগলো-

“আমি নিজের মনকে অনেক বাধা দিয়েছি নীল। বার বার নিজের মনকে বুঝিয়েছি আমি কারও জন্য যোগ্য না। কাওকে বিয়ে করা বা ভালোবাসার যোগ্যতা আমার নেই। আমি অপরিপূর্ণ মেয়ে, আমার ব্যর্থতার জন্য আমি চাইলেও কাউকে ভালোবাসার সাহস করতে পারিনি। কিন্তু আমি হেরে গেছি নীল। আমি রোদের প্রতি দূর্বল হয়ে পরেছি। নিজেকে এসব অনুভূতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েও আমি পারিনি। সব সময় নিজের অনুভূতি গুলোকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছি কিন্তু এখন আর পারছি না। আমি ভালোবেসে ফেলেছি রোদকে।ওনাকে ছাড়া আমি অন্য কাওকে বিয়ে করতে পারবো না। নীল তুই প্লিজ আব্বুকে বুঝিয়ে বল আমি এই বিয়ে করতে চাই না।”

আরশি কথা গুলো বলার সময় দুচোখ দিয়ে কয়েক ফোটা অশ্রুজল গড়িয়ে পরলো। কাসফিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো। মুচকি হেসে আরশির পাশে বসলো। আরশির পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে। নীল আরশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-

“শোন আশু তুই একটা মানুষ কোনো রোবট না। মানুষের অনুভূতির উপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না এমনি নিজেরও না। দুইবছর ধরে তোকে আমরা সব সময় রোবটের মতোই দেখে আসছি। তুই আমাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে এসবের ক্ষেত্রে সব সময়ই তোকে অনুভূতিহীন দেখেছি। আগে হয়তো এসবের পেছনের কারন জানতাম না কিন্তু এখন তো জানি। আর সব জেনে শুনেই বলছি তুই এতোদিন বোকামি ছাড়া আর কিছুই করিসনি।”

আরশি মাথা তুলে অশ্রুসিক্ত চোখে নীলের দিকে তাকালো। নীলের আগের মতোই গম্ভীরতার সাথে বলতে লাগল-

“ভবিষ্যতে কি হবে না হবে না সেসব নিয়ে ভেবে নিজেকে এখন কতটা কষ্ট দিচ্ছিস তা একবারও ভেবেছিস তুই? কেন নিজের অনুভূতি গুলোকে নিজের ভিতর চাপা দিয়ে রাখছিস আশু? কাওকে ভালোবাসলে প্রকাশ করতে শিখ। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শিখ, মন খুলে বাঁচতে শিখ। রোবটের মতো অনুভূতি ছাড়া আর কতদিন থাকবি! এভাবে চলতে থাকলে তোর ভালোবাসা আর তোর কাছে থাকবে না। নিজের ভালোবাসাকে পাওয়া জন্য হলেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ কর আশু।”

নীলের কথা শেষ হতেই কাসফিয়া আরশিকে বলল-

“আংকেল তোকে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যেতে বলেছে আশু।”

আরশি আহত দৃষ্টিতে কাসফিয়ার দিকে তাকালো। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিম্ন স্বরে বলল-

“আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। তোরা প্লিজ কিছু একটা কর। আমি এখন বাহিরে যাবো না। নীল তুই আব্বুকে ডেকে নিয়ে আয় আমি আব্বুর সাথে কথা বলবো।”

নীল আরশির কাধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললো-

“এখন এসব বাদ দিয়ে আমাদের সাথে বাহিরে চল৷ ছেলে পক্ষ চলে গেলে না হয় তুই আংকেলের সাথে কথা বলিস।”

“কিন্তু নীল..”

আরশির কথা মাঝে থামিয়ে দিয়ে কাসফিয়া বলল-

“আশু নীল ঠিকই বলছে। এখন শুধু শুধু মেহমানদের সামনে ঝামেলা না করে বরং ওনারা যাওয়ার পরেই তুই যা করার করিস।”

আরশিকে নীল আর কাসফিয়া কোনো রকম বুঝিয়ে ড্রয়িং রুমে নিয়ে গেল। আরশি ড্রয়িংরুমের সোফায় মাথা নিচু করে বসে আছে। একবারের জন্যেও মাথা তুলে তাকাচ্ছে না। প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। বার বার রৌদ্রের বলা কথা গুলো কানে বেজে উঠছে। চোখের সামনে সেই রঙিন চিরকুট গুলো আর রৌদ্রর মুচকি হাসি দেওয়া মুখটা ভাসছে। আরশির চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এখনই সবার সামনে চোখের পানি ছেড়ে দিবে।

“আরে ক্রাশ ভাবি মাথা নিচু করে আছো কেন? আমাদের দিকে একটু তাকাও।”

আচমকা ‘ক্রাশ ভাবি’ নামটা শুনেই আরশি চমকে উঠলো। দ্রুত মাথা তুলে আশেপাশে তাকালো। আরশির সামনা-সামনি নির্বান দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশের সোফায় রৌদ্র নীল রঙের শার্ট পরে অপলক দৃষ্টিতে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। নীল রঙের শাড়িতে একদম মায়াবতী লাগছে আরশিকে। চোখ গুলো লাল হয়ে ফুলে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আরশি কান্না করেছে। চোখে কোনো কাজল নেই, আর না আছে মুখে কোনো মেকআপ তবুও এই মুহূর্তে রৌদ্রর চোখে আরশিকে বড্ড বেশিই মায়াবী লাগছে। বিশেষ করে আরশির লাল হয়ে যাওয়া ফোলা চোখ গুলো রৌদ্রর কাছে বড্ড বেশিই প্রিয় মনে হচ্ছে। রৌদ্র জানে আরশির এই অশ্রুসিক্ত চোখের পেছনে রৌদ্রই একমাত্র কারন। রৌদ্রর জন্য আরশির চোখ থেকে অশ্রুজল পরেছে সেটা ভেবেই রৌদ্রর নিজেকে সার্থক মনে হচ্ছে। আরশি যতই নিজের অনুভূতি গুলোকে লুকিয়ে রাখুক না কেন রৌদ্র ঠিকই তার রুদ্রাণীর চোখে তাকিয়ে সব বুঝে যায়। আরশি ড্যাবড্যাব করে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। পরপর কয়েকবার চোখের পলক ফেলে আবারও স্থির চোখে তাকালো রৌদ্রর দিকে। এই গুলো তার মনের ভুল তো নয়। কিন্তু তারা এখানে কিভাবে? সব কিছু আরশির মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। হতবাক হয়ে বসে আছে। রৌদ্র মা আরশির পাশে বসে আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-

“রৌদ্র তোর পছন্দ আছে বলতে হবে।”

আরশি মাথা নিচু করে ফেলল। এই মুহূর্তে এখানে কোনো ভাবেই রৌদ্রকে আশা করেনি। আর এসব কথা তো কল্পনাও করেনি। আরশি খুশি হবে নাকি অবাক হবে কিছুই বুঝতে পারছে। অস্বস্তিতে হাত কচলানো শুরু করে দিয়েছে এতোক্ষনে। রৌদ্র আরশির হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সবাই কিছুক্ষন কথা বলার পর নির্বান রৌদ্রর মাকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“ফুপি পাত্রপাত্রীকে তো আলাদা কথা বলতে দেওয়া উচিত কি বল!”

“হ্যাঁ তা তো বলবেই।”

“তার আগে আমার কিছু কথা আছে।”

আদিব হাসানের গম্ভীর কন্ঠে এই কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। সকলের কপালে চিন্তার ভাজ পরেছে। আদিব হাসান আরশির কাছে এসে বলল-

“তোরা একে অপরকে পছন্দ করিস কিন্তু আমার ভয়ে এসব প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চাস না তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু একবারের জন্য হলে-ও তো তুই আমার কাছে এসে বলতে পারতি তুই একজনকে পছন্দ করিস। আমি কি তোকে কখনো এতোটা কড়া শাসন করেছি যে তুই আমার ভয়ে রৌদ্রকে ভালোবেসেও তার থেকে দূরে সরে যেতে চাইছিস। ছেলেটা নিজেই তোকে বিয়ে করতে চায় আর তুই নাকি আমার ভয়ে ওর কথা পাত্তাই দিচ্ছিস না! তুই বড় হয়েছিস তোর আলাদা পছন্দ অপছন্দ থাকতেই পারে সেটা আমাদের সাথে শেয়ার করবি। তোর পছন্দ যদি ভালো হয় আমরা মেনে নিব আর যদি আমাদের মনে তোর পছন্দের জিনিস তোর জন্য ভালো না তাহলে আমরা তোকে বুঝিয়ে বলতাম কিন্তু তোকে তো আর মেরে ফেলতাম না তাই না! তোর ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব তো আমাদেরই কিন্তু তুই যদি আমাদেরকেই এতো ভয় পাস তাহলে কিভাবে হবে আশু?”

আরশি বিস্ফোরিত চোখে তার বাবার দিকে তাকালো। জড়ানো কন্ঠে বললো-

“কিন্তু বাবা..”

আদিব হাসান তার মেয়েকে থামিয়ে দিয়ে বলল-

“কিন্তু কি আশু? যদি নীল আর কাসফিয়া আমাকে রৌদ্রর সাথে কথা বলিয়ে না দিতো তখন কি হতো! তুই আমার ভয়ে চুপ থেকে একা একা কষ্ট পেয়ে যেতে তাই তো!”

আরশি জ্বলন্ত চোখে নীল আর কাসফিয়ার দিকে তাকালো৷ নীল মাথা চুলকে একটা মেকি হাসি দিলো। আমতা-আমতা করে বলল-

“আংকেল তুমি এখন একটু চুপ করো। শুধু শুধু আমাকে ফাসিয়ে দিচ্ছে কেন?”

রৌদ্রর মা ভদ্রতার সাথে বলল-

“হ্যাঁ ভাই এখন এসব বাদ দিন। ওদেরকে আলাদা কথা বলে সব কিছু মিটিয়ে নিতে দিন।”

————————

নীলা আরশি আর রৌদ্রকে ছাদে একা রেখেই চলে গেল। আরশি বেশ কিছুটা সময় চুপ করে থাকার পর শান্ত গলায় বললো-

“কিভাবে কি হয়েছে সব কিছু আমাকে খুলে বলুন।”

আরশি রৌদ্রর দিকে না তাকিয়ে কথাটা বলল। রৌদ্র সরু চোখে আরশির তাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে আরশির এমন শান্ত থাকাটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না তার কাছে। রৌদ্র শান্ত গলায় বলতে লাগল-

“আমি আরও তিনদিন আগেই নীল আর কাসফিয়ার সাথে দেখা করেছিলাম। তাদের সাহায্যেই আংকেলের সাথে পরিচিত হয়েছি। আংকেল আমার সম্পর্কে সব কিছু জেনে শুনেই আব্বু আম্মুর সাথে কথা বলতে রাজি হয়েছে। সবাই মিলে ঠিক করেছে এক সাথে বসে কথা বলে সব ঠিক করবে আর আম্মুও আপনাকে দেখতে চেয়েছিল তাই তাড়াহুড়ো করেই আপনাকে এখানে আসতে বলা হয়েছে। ব্যস এতটুকুই।”

আরশি রৌদ্র দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-

“ব্যস এতটুকুই?”

রৌদ্র ভ্রু বাঁকিয়ে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতেই আরশির রাগ মাথায় উঠে গেল। প্রচন্ড রাগে গর্জে উঠে বলল-

“আমাকে কি একবারের জন্যেও কিছু বলেছেন আপনি! জানেন কতটা ভয় পেয়েছিলাম? এই দু’দিন চিন্তায় চিন্তায় একটুও ঘুমাতে পারিনি আমি। আমাকে কি একটুও বলার প্রয়োজন মনে করেননি আপনি?”

রৌদ্র বরাবরের মতোই শান্ত গলায় বলল-

“আপনাকে বললে কি আপনি রাজি হতে নাকি! এই জন্যই তো বলিনি।”

রৌদ্র এমন সহজ উত্তর পেয়ে আরশির রাগ ধপধপ করে জ্বলে উঠলো। রৌদ্র দিকে তেড়ে গিয়ে আঙুল উঁচু করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-

“থাকুন আপনি এখানে। আমি আপনাকে বিয়েই করবো না। এখনই সবাইকে গিয়ে না করে দিব। আপনি আসলেই একটা অসভ্য ডাক্তার। আস্ত এক বজ্জাত লোক।”

আরশি রাগে গজগজ করে কথা গুলো বলে রৌদ্র পায়ে পারা দিয়ে চলে যেতে লাগলো। রৌদ্র মৃদুস্বরে আর্তনাদ করে লাফিয়ে উঠলো। আরশিকে যেতে দেখে দ্রুত পায়ে গিয়ে আরশির হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। আচমকা হাতে টান পরায় আরশি তাল সামলাতে না পেরে রৌদ্রর বুকে যেয়ে পরলো। রৌদ্র আরশির কোমড় জড়িয়ে ধরে কানে ফিসফিস করে বলল-

“হবু মিসেস রৌদ্র উরফে আরু বিয়ে না করার কথা যেন দ্বিতীয় বার তোমার এই মুখ থেকে বের না হয় আজকেই লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম। কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রাখো ভালো করে। জানো তো তোমাকে রাগলে একদম রুদ্রাণীর মতো লাগে। আর রুদ্রাণীকে শুধু মাত্র রৌদ্রর সাথেই মানায়। তুমি হলে এই রৌদ্রর শহরের রুদ্রাণী।”

রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাড়ালো। আরশি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে আরশি। কি থেকে কি হয়ে গেল! হঠাৎ করেই আরশি চোখ বন্ধ করে বড় করে একটা শ্বাস নিল। পরক্ষনেই লজ্জায় লাল বর্ন ধারণ করেছে আরশির গাল দুটো। বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে বার বার। তার হার্ট মনে হচ্ছে পাজরের হাড্ডি ভেঙে এখনই বাহিরে এসে লাফানো শুরু করবে। আরশি অন্য দিকে ফিরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। রৌদ্র আরশির কান্ডকারখানা দেখে ঠোঁট চেপে হেসে যাচ্ছে। খানিকটা সময় পর রৌদ্র গম্ভীর গলায় বলল-

“মিস আরু একটা কথা শুনেছেন!”

আরশি ভ্রু জোড়া কুচকে রৌদ্রর দিকে ফিরে তাকালো। সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“কি কথা?”

রৌদ্র হাল্কা হেসে শান্ত গলায় বললো-

“রুদ্রাণী না-কি রৌদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছে!”

আরশি বিষম খেয়ে কাশতে লাগলো। রসগোল্লার মতো গোলগোল চোখে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে বলল-

“আপনি কিভাবে জেনেছেন?”

রৌদ্র হাসলো। আরশির প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগেই ছাদের দরজা দিয়ে নীল আর বাকি ফ্রেন্ড সবাই হাসতে হাসতে এগিয়ে আসলো। নীল রৌদ্রর পাশে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে ভাব নিয়ে বলল-

“এটার ক্রেডিট আমাকে দেওয়া উচিত। আমিই তো এই সুখবরটা রৌদ্র ভাইকে দিয়েছে।”

আরশি নীলের দিকে কটমটিয়ে তাকালেই নীল চুপসে যায়। নীলের চুপসে যাওয়া দেখে সাবাই উচ্চস্বরে হাসলো। হাসির মাঝেই কাসফিয়া বলল-

“হাসাহাসি থামিয়ে সবাই নিচে চলো। আংকেল আন্টিরা কি যেন ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলবে। তাড়াতাড়ি নিচে যেতে বলেছে।”

চলবে..