রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-৪৩+৪৪

0
867

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৩
#Saiyara_Hossain_Kayanat

আচমকাই শপিংমলে সবার মাঝ থেকে আরশির হাত টেনে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে আসলো রৌদ্র। হঠাৎ করে এমন কিছু ঘটায় আরশি হতভম্ব হয়ে গেল। স্তম্ভিত হয়ে আছে আরশি। রৌদ্র সিড়ির দিকটায় এসে আরশির হাত ছেড়ে দিয়ে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো। আরশি হাত ঘষতে ঘষতে উৎকন্ঠিত হয়ে বলল-

“পাগল হয়ে গেছেন না-কি! এমন করছেন কেন? মানুষ দেখলে কি ভাববে?”

রৌদ্র বরাবরের মতো শান্ত গলায় উত্তর দিল-

“সবাই লিফটে ওঠানামা করে তাই এখানে কোনো মানুষ আসবে বলে মনে হচ্ছে না।”

আরশি দ্রুত আশেপাশে তাকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলল-

“তবুও যদি কেউ এসে পরে তখন কি হবে!”

রৌদ্রর দৃষ্টি এখনো আরশিতেই নিবদ্ধ। আরশির কথায় রৌদ্র ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে জবাব দিল-

“আসলে আসবে কি হয়েছে! নিজের বউকে হাত ধরে নিয়ে এসেছি অন্য কাওকে না।”

রৌদ্রর নির্লিপ্ত জবাবে আরশির মুখে বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে। বিরক্তি প্রকাশ করেই বলল-

“সবাই হয়তো আমাদেরকে খুঁজছে। চলুন এখন।”

আরশি কথা গুলো বলে চলে যেতে নিলেই রৌদ্র আরশির হাত ধরে ফেলে। আরশি খানিকটা ভড়কে গিয়ে বলল-

“উফফ ডক্টর রোদ এমন করছেন কেন? ছাড়ুন আমার হাত।”

রৌদ্র কোনো প্রতিত্তোর না দিয়ে আরশির হাতে হেঁচকা টান দিয়ে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়। আরশি আবারও চলে যেতে নিলে রৌদ্র আরশির দু’পাশের দেয়ালে হাত দিয়ে আটকে দেয়। আরশির ছটফট করা বন্ধ হয়ে যায়। রৌদ্র আরশির মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-

“শেষবার সুযোগ দিচ্ছি তোমাকে। আমাকে ভালোবাসো কি-না বল।”

আরশি কিছু বলছে না। রৌদ্রর কাছে আসায় অস্থিরতায় আরশির কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেছে। হৃদ স্পন্দনের গতি যেন বেড়েই চলছে। রৌদ্র আরশির দিকে তাকিয়ে থেকে দু’হাতে নামিয়ে পকেটে গুজে দেয়। গম্ভীর গলায় বলে-

“যাও ছেড়ে দিলাম।”

আরশি এক মূহুর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করে। রৌদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশির পেছন পেছন চলে যায়।

——————————

“উহু এই কালারে তোমাকে একদমই মানাচ্ছে না নীলা।”

নির্বানের কথায় নীলা ভ্রু বাঁকিয়ে তার দিকে তাকালো। ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে হাতের লেহেঙ্গাটা রেখে দিল। মেরুন রঙের আরেকটা লেহেঙ্গা হাতে নিতেই নির্বান নাক মুখ ছিটকে বলল-

“ছিঃ ছিঃ এই কালারে তো একদমই পেত্নীর মতো লাগবে।”

নীলার ধৈর্যের বাধ ভেঙেছে। প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে হাতের লেহেঙ্গাটা রেখে দিল। চেয়ার থেকে উঠে নির্বানের দিকে এগিয়ে আসলো। একটা মেকি হাসি দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বললো-

“মেয়েদের শপিং নিয়ে যেহেতু এতই জ্ঞান তাহলে আপনি নিজেই একটা পছন্দ করে দিন না দেখি।”

নির্বান হাতের মোবাইলটা পকেটে রেখে ভাব নিয়ে বলল-

“ওকে এটা তো আমার এক মিনিটের কাজ।”

নির্বান নীলাকে পাশ কাটিয়ে সামনে গেল। সব গুলো লেহেঙ্গার মধ্য থেকে একটা নীল রঙের লেহেঙ্গা নীলার হাতে দিয়ে বলল-

“এটা একদম পারফেক্ট। তোমার নামের সাথেও মিলবে আর তোমাকেও বেশ মানাবে।”

নীলা লেহেঙ্গাটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। আসলেই আগের লেহেঙ্গা গুলো থেকে এটাই বেস্ট মনে হচ্ছে। নীলা আর কথা না বাড়িয়ে লেহেঙ্গাটা নিয়ে নেয়।

—————————

আরশি সবার কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই রৌদ্র এসে গম্ভীর গলায় বললো-

“রাত হয়ে গেছে এখন আমাদের যাওয়া উচিত।”

রৌদ্রর কথায় কাসফিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল-

“এখন তো মাত্র বিয়ের শপিং হয়েছে। গায়ে হলুদ আর বৌভাতের জন্য তো কিছুই কেনা হয়নি।”

“গায়ে হলুদের জন্য কাল কেনাকাটা করা যাবে। একদিনে এতো ঝামেলা করার কোনো দরকার নেই। আমি নিচে অপেক্ষা করছি সবাই আসো।”

রৌদ্র কথা গুলো বলেই গম্ভীর পায়ে চলে গেল। নীল আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে জিগ্যেস করলো-

“কিরে ভাইয়ার আবার কি হলো?”

আরশি নীলের দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে বলল-

“কই কিছুই তো হয়নি। উনি তো এমনিতেই গম্ভীর। চল এখন দেরি না করে।”

সবাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শপিংমল থেকে বেরিয়ে আসে। সবাই রৌদ্রর কাছে আসতেই রৌদ্র গম্ভীর গলায় বললেন-

“আমার আরুকে কিছুক্ষণের জন্য লাগবে। তোমারা বাসায় যাও। আমরা আধা ঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবো।”

আরশি এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রৌদ্র আরশিকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“গাড়িতে উঠুন মিস আরু।”

নীল আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে উঠে বসতে ইশারা করলেই আরশি গাড়িতে উঠে যায়। সাথে সাথেই রৌদ্র গাড়ি ড্রাইভ করা শুরু করে দেয়। বেশ খানিকটা সময় ধরে রৌদ্র চুপচাপ গাড়ি চালিয়েই যাচ্ছে। আরশি এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার বুকে সাহস জুগিয়ে বলল-

“কোথায় যাচ্ছেন? সেই কখন থেকে গাড়ি চালিয়েই যাচ্ছেন কিছু বলছেন না। আমাকে দিয়ে আপনার কি দরকার? আমাকে আপনার লাগবে কেন?”

আচমকাই রৌদ্র গাড়ি ব্রেক করে। আরশি খানিকটা ঝুঁকে পরলেও নিজেকে সামলিয়ে নেয়। রৌদ্র সিট বেল্ট খুলে আরশির দিকে এগিয়ে যায়। রাগে রৌদ্রর চোখ দুটো লাল হয়ে যাচ্ছে। চোয়ালে শক্ত করে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। রৌদ্রর আরশির একদম কাছে এসে রাগে গর্জে উঠে বলে-

“তোমাকে আমার শুধু এখন না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লাগবে। আমার বিয়ে করা বউ তুমি। আমি ভালোবাসি তোমায়। তোমাকে তো আমার লাগবেই।”

আরশি ফ্যালফ্যাল করে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। মানুষ ভালোবাসার কথা এভাবে বলে! উনি কি ভালোবাসার কথা বলছে না-কি আমাকে ধমকাচ্ছেন? আরশির ভাবনার মাঝেই রৌদ্র জোরে গাড়ির জানালায় হাত দিয়ে আঘাত করে। বিকট শব্দে আরশির ভাবনা ভেঙে যায়। রৌদ্র আরশির দু বাহু ধরে মুখোমুখি করে আবারও হুংকার দিয়ে বলল-

“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না আরু? তোমার চোখে আমি স্পষ্ট আমার জন্য ভালোবাসা দেখতে পাই। তবুও কেন তুমি মুখে শিকার করছো না? দশদিন ধরে পাগলের মতো অনুরোধ করে যাচ্ছি কিন্তু তুমি তো মুখ ফুটে একবারও ভালোবাসি বললে না। আর কত অপেক্ষা করাবে?”

আরশি ভয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়। চোখ বন্ধ করেই ভয়াতুর কন্ঠে বলল-

“ভালোবাসি কি-না তা তো বুঝতেই পারছেন। তবুও আমাকে আরেকটু সময় দিন সত্যি বলছি আপনার চেষ্টা বিফলে যাবে না।”

আরশিকে ভয় পেতে দেখে রৌদ্র নিজের সিটে শান্ত হয়ে বসে। নিজের রাগ কন্ট্রোল করার জন্য চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা করে কয়েকটা শ্বাস নেয়। খানিকটা সময় পর রৌদ্র চুপচাপ গাড়ি চালানো শুরু করে দেয়। আরশি এখনো ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। পুরো রাস্তা কেউ আর কোনো কথা বলেনি। বাসায় পৌঁছাতেই আরশি গাড়িতে থেকে নেমে যেয়। রৌদ্র আর একবারও আরশির দিকে ফিরে তাকায়নি।

—————————

সকাল প্রায় দশটায় রৌদ্রর ঘুম ভাঙে। আড়মোড়া ভেঙ্গে অলস পায়ে বারান্দায় আসে। শীতল হাওয়ায় রৌদ্রর শরীর খানিকটা কেঁপে উঠে। চারদিকে ঝড়ো হাওয়া বইছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে। চারপাশ আঁধার হয়ে বৃষ্টির আগমন বার্তা জানান দিচ্ছে। রৌদ্র তার শীতল চাহনিতে পাশের বারান্দায় তাকালো। কেউ নেই পাশের বারান্দায়। কাল রাতের কথা মনে পরতেই রৌদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পাখির খাঁচা দুটোর দিকে এগিয়ে এসে লাভ বার্ড গুলোকে খাবার দিল। ময়না পাখির খাঁচায় খাবার দেওয়ার সাথে সাথেই পাখি দুটো ভাঙা ভাঙা গলায় অনবরত ‘ভালোবাসি’ আর ‘রোদ’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করছে। রৌদ্র থমকে গেল। অপ্রত্যাশিত দুটি শব্দ শুনে অতিমাত্রায় চমকে উঠলো। খাঁচা থেকে হাত সরিয়ে দু-এক কদম পেছনে সরে দাঁড়ালো। বিস্ময়ে বড় হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে আবারও পাখি দুটোর দিকে তাকালো৷ পাখিগুলো মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে অনবরত ‘ভালোবাসি রোদ’ বলেই যাচ্ছে। রৌদ্র অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে উঠলো। খুশিতে চিকচিক করে উঠেছে তার শান্ত শীতল চোখ দুটো। চোখ দিয়ে যেন খুশির ঝলক উপচে পরতে চাইছে। আরশি এভাবে তাকে ভালোবাসার কথা বলবে এটা একদমই তার ভাবনার বাহিরে ছিল। রৌদ্র কোনো কিছু না ভেবেই হন্তদন্ত হয়ে বাহিরে ছুটে চলে যাচ্ছে। একপ্রকার দৌড়েই সিড়ি বেয়ে বাসার নিচে আসলো। ঝড়ো হাওয়ার মতোই ছুটে এসেছে আরশির ফ্ল্যাটে৷ কাঁপা কাঁপা হাতেই কলিং বেলে টিপ দিল।কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই দরজা খুলে যায়। দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসলো কাঙ্ক্ষিত মানুষের চেহারা। আরশি দরজা খুলে রৌদ্রকে এই অবস্থায় দেখে ভ্রু কুচকে ফেলে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রৌদ্রকে পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো আরশি। রৌদ্র হাঁপাচ্ছে, বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। সাদা টিশার্ট গায়ে জড়ানো। ধূসর রঙের থ্রি-কোয়াটার প্যান্ট। অগোছালো চুল আর ঘুমন্ত মুখ। দেখতে মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে সপ্নের মধ্যে কুকুরের দৌড়ানি খেয়েই এখানেই চলে এসেছে। আরশি অধিকমাত্রায় আগ্রহী হয়ে রৌদ্রর কাছে এগিয়ে আসলো। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-

“কি হয়েছে আপনার! আপনি ঠিক আছেন….. ”

আরশির কথা পুরো পুরি শেষ হওয়ার আগেই রৌদ্র আরশির উপরে ঝাপিয়ে পরলো। আরশিকে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে ঝাপটে ধরলো। আরশি স্তব্ধ হয়ে আছে। নড়াচড়া করার বিন্দুমাত্র শক্তিটুকু তার মাঝে নেই। রৌদ্র এতটাই শক্ত করে আরশিকে জড়িয়ে ধরেছে যে আরশির হাড়গোড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে উপক্রম হয়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে আরশির। কিন্তু রৌদ্রর মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। সে আগের মতোই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আরশিকে জড়িয়ে ধরে আছে।

“আরশি কে এসেছে?”

হঠাৎই ভেতর থেকে আরশির মা’র কন্ঠ ভেসে আসতেই আরশির টনক নড়ে উঠলো। গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করেই রৌদ্রকে ধাক্কা দিল। তেমন কোনো ফলাফল না পেলেও রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে যায়। রৌদ্রর বাহু থেকে মুক্ত হতেই আরশি বড় করে দু তিনবার স্বস্তির শ্বাস নিল।
নিজেকে কোনো রকম সামলিয়ে নিয়ে উচ্চস্বরে বলল-

“আমি আসছি মা।”

রৌদ্র এখনো আরশির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। আরশি রৌদ্রর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। রৌদ্রর দিকে তেড়ে এসে রৌদ্রর বাহুতে দু-তিনটা চাপড় মারে। দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত কন্ঠে বলল-

“একজন ডাক্তার হয়ে আপনি নিজের বউকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলতে চাইছেন! আপনি তো দেখছি একটা ডাকাত। দয়ামায়ার ছিটেফোঁটাও নেই আপনার মধ্যে। আরেকটু হলেই তো দম আটকে মরে যেতাম। আমাকে মেরে ফেলার জন্যেই কি সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে লেগে পরেছেন না-কি! প্রতিশোধ নিচ্ছেন কালকের জন্যে?”

আরশি রাগে গজগজ করতে করতে অনর্গল প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। রৌদ্রর আগের মতোই অপলকভাবে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। হুট করেই রৌদ্র দু হাতে আরশির গাল আগলে নিয়ে কপালে গভীর ভাবে নিজের ওষ্ঠদ্বয় ছুঁয়ে দিল। এক মিনিট বাদেই রৌদ্র আরশিকে আবারও জড়িয়ে ধরে শীতল কন্ঠে বলল-

“ভালোবাসি রুদ্রাণী।”

রৌদ্র সোজা হয়ে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ালো। আরশি মূর্তির মতো আগের জায়গাতেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আকষ্মিকভাবে রৌদ্র করা কাজ গুলোতে আরশি দফায় দফায় চমকে উঠছে বার বার। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। কথা গুলো যেন গলাতেই পাকিয়ে যাচ্ছে। ভেতর থেকে আবারও আরশির ডাক আসে। আরশি অপ্রস্তুত হয়ে পরে। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে মুখের কাছে এসে পড়া চুল গুলো কানের পেছনে গুজে নেয়। রৌদ্রর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আরশি নিজের পায়ের উপর ভর দিয়ে কিছুটা উঁচু হয়ে রৌদ্রর চুল গুলো ঠিক করে দেয়। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে রৌদ্রর হাত ধরে ফ্ল্যাটের ভিতর নিয়ে যায়।

চলবে…

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৪
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আরু কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?”

রৌদ্রর কথায় আরশি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তার দিকে। রৌদ্রর হাত ছেড়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে চাপা কন্ঠে বলল-

“এই সময় যেহেতু এসেছেন আম্মু আব্বুর সাথে দেখা করেই যান।”

রৌদ্র নিজের দিকে একবার তাকিয়ে। আরশির দিকে আহত দৃষ্টিতে চেয়ে বলল-

“কিন্তু এভাবে কি করে?”

আরশি নিম্ন স্বরে ফিসফিস করে বলল-

“কিছু হবে না ভালোই লাগছে। কিন্তু এখন যদি আমি একা একা তাদের কাছে যাই তাহলে কে এসেছে না এসেছে এসব নিয়ে নানান রকম প্রশ্ন করে আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলবে।”

রৌদ্র কিছু বলার আগেই আরশির আব্বু ড্রয়িংরুমে আসতে আসতে বলছেন-

“আরশি মা কে এসেছে! এতো সময় লাগছে কেন?”

আদিব হাসান ড্রয়িং রুমে এসে রৌদ্রকে দেখে বললেন-

“রৌদ্র তুমি! কেমন আছো?”

আরশি অপ্রস্তুত হয়ে মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বলল-

“আমি কল করে বলেছিলাম তোমরা এসেছো। তাই উনি তোমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে।”

রৌদ্র আদিব হাসানের দিকে এগিয়ে যায়। হাসি মুখে সালাম বিনিময় করে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পরে। রৌদ্র কন্ঠ শুনে ভেতর থেকে আরশির মা আর কাসফিয়া আব্বু আম্মু সবাই বেরিয়ে আসে। রৌদ্র সবার সাথে আড্ডা দিচ্ছে আর আরশি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রৌদ্রর কথা বলার ভঙ্গিমা দেখতে ব্যস্ত। লোকটা অল্পতেই সব কিছু সামলিয়ে নেয়। যে কোনো পরিস্থিতিতেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখা অসীম ক্ষমতা এই মানুষটা মধ্যে আছে। আরশি রৌদ্রর থেকে চোখ সরিয়ে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমে চলে যায়।

————————

বিকেলে সবাই আবারও শপিংমলে এসেছে। গায়ে হলুদের শাড়ি কেনার জন্য আরশি একটা দোকানে বসে শাড়ি দেখছে। আর রৌদ্র তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। বাকি সবাই অন্যসব দোকানে ঘুরে ঘুরে দেখছে। আরশি একটা হলুদ রঙের শাড়ি গায়ের উপর রাখতেই দোকানদার অতিমাত্রায় উত্তেজনা নিয়ে বলল-

“ম্যাম এই শাড়িটায় আপনাকে খুব মানিয়ে। আপনি এটা নিতে পারেন।”

দোকানদারের কথায় রৌদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে তাকালো। দোকাদার অতি উৎসাহ নিয়ে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। আরশি একটা মুচকি হাসি দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। রৌদ্র আরশির দিকে না থাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল-

“এই শাড়িটায় তোমাকে একদমই মানাচ্ছে না মিস আরু।”

আরশি রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে দেখলো সে ফোন স্ক্রোল করতে ব্যস্ত। রৌদ্র তাকে না দেখেই এই কথা বলেছে ভেবে আরশি একটা জোরালো শ্বাস ফেলে। হাতের শাড়িটা রেখে দিতেই দোকানদার আরেকটা শাড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল-

“ম্যাম আপনি এই শাড়িটি দেখতে পারেন। আপনাকে খুব সুন্দর মানাবে এই কালারটা।”

আরশি শাড়িটি হাতে নেওয়ার আগেই রৌদ্র গাম্ভীর্যের সাথে বলল-

“এটাও ভালো লাগছে না।”

আরশি বিরক্তিতে ভ্রু কুচকালো। দোকানদার এই শাড়িটাও রেখে দিয়ে অন্য শাড়িতে দেখাতে লাগলো। পর পর চার বার একই ঘটনা ঘটায় আরশি এবার প্রচন্ড ক্ষেপে গেল। রৌদ্রর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকালো। সে আগের মতোই ফোন নিয়ে ব্যস্ত। আরশি রেগেমেগে হাতের শাড়িটাও রেখে দিল। দোকানদার আবারও একটা শাড়ি এগিয়ে দিয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই আরশি দাঁতে দাঁত চেপে বলল-

“ভাইয়া আপনি চুপ করুন। আপনার আর কিছু বলতে হবে না। এভাবে চলতে থাকলে বিয়ের ডেট এখানেই পাড় হয়ে যাবে।”

আরশি কথা গুলো বলেই উঠে রৌদ্রর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল-

“কি শুরু করেছেন আপনি এসব? উনি তো ওনার কাজই করছেন। এখানে এতো জেলাস হওয়ার কি আছে অদ্ভুত! যাই হোক পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনি নিজেই সব পছন্দ করবেন। আমি আর এসবের মধ্যে নেই। আপনি যা করার করুন।”

রৌদ্র ফোনের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি তুলে আরশির দিকে তাকালো। চোখ মুখে রাগের আভাস স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আরশির। রৌদ্র কোনো কথা না বাড়িয়ে শাড়ি দেখতে লাগলো। বেশ খানিকটা সময় পর লালচে-হলুদ আর কমলা রঙের একটা শাড়ি পছন্দ করলো। আরশির গায়ের উপর রেখে মুচকি হাসি দিল। আরশির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-

“এটায় তোমাকে একদম রুদ্রাণীর মতো লাগবে। এটাই বেশ মানিয়েছে তোমাকে।”

আরশি কোনো কথা না বলে রৌদ্র পছন্দ মতো সব নিয়ে নেয়। শপিংমল থেকে বাসায় এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় আটটা বেজে যায়। গাড়ি থামার সাথে সাথেই কাসফিয়া ক্লান্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। আরশি গাড়ি থেকে নামতে নিবে তখনই রৌদ্র তার হাত ধরে ফেলে। আরশি কৌতুহলী চোখে রৌদ্রর দিকে তাকাতেই রৌদ্র আরশির দিকে এগিয়ে যায়। আরশিকে কপালে ছোট্ট করে একটা চুমু দিয়ে তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল-

“এই রৌদ্র তার রুদ্রাণীকে বড্ড বেশি ভালোবাসে আরু।”

রৌদ্র কথাটা বলেই নিজের সিটে স্বাভাবিক হয়ে বসে। আরশি বিস্মিত হয়ে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। রৌদ্র একটা অমায়িক হাসি দিয়ে বলল-

“মিস আরু তাড়াতাড়ি যাও কাসফিয়া দাঁড়িয়ে আছে তো।”

আরশি কোনো কথা না বলে চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে চলে যায়। রৌদ্র অপলকভাবে আরশির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

————————

ব্যস্ততার মাঝেই কেটে গেল দু’দিন। আজ রৌদ্র আরশির গায়ে হলুদ। চোখের পলকেই যেন দিন চলে যাচ্ছে। বিয়ের কাজ নিয়েই সবাই ব্যস্ত। বিকেল চারটায় শুরু হবে হলুদের হলুদের অনুষ্ঠান। আরশি চুপচাপ সোফায় বসে সবার ব্যস্ততা দেখে যাচ্ছে। তার বন্ধুরা কখনো নিচে কখনো ছাদে দৌড়াদৌড়ি করছে। কারও হাতে গোলাপ ফুল। কারো হাতে গাঁদা ফুলের মালা। আরশি একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। তার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অথচ কেউ তাকে সময় দিচ্ছে না। সবাই বাড়ির সাজগোছ করতেই ব্যস্ত৷ আরশি উঠে তার বন্ধুদের কাছে এসে ধমকের সুরে বলল-

“আমি একা একা বসে বোর হচ্ছি তোদের কি সে দিকে খেয়াল আছে! আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তোরা আমাকে সময় না দিয়ে উল্টো আমাকে একা করে দিচ্ছিস।”

আরশির কথায় সবাই বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালো। নীল আরশির দিকে চেয়েই নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল-

“বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মানে কি? তোর বিয়ে তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। আমরা তো এখন তোকে বিদায় করার জন্য এসব কিছু করছি।”

আরশি রাগে তেতে উঠলো। নীলের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই নীলের চুল নিজের মুঠোয় নিয়ে নেয়। নীল হাতের গাঁদা ফুলের মালা গুলো ফেলে দিয়ে আরশির হাত চুল থেকে ছাড়ানো চেষ্টা করছে। আদ্রাফ, কাসফিয়া আর নীলা মিটমিটিয়ে হাসছে তাদের ঝগড়া দেখে। এই দুইটা মানুষ এক সাথে হলেই টম এন্ড জেরির মতো ঝগড়া লেগে থাকে। নীল আরশির হাত ছাড়ানো চেষ্টা করতে করতে অনুনয়ের স্বরে বলল-

“আশু প্লিজ চুল ছাড়। ব্যথা পাচ্ছি খুব।”

আরশি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল-

“তোর মতো হারামির সাথে এমনটা-ই করা উচিত।”

আরশি নীলের চুল ছেড়ে দুহাত আড়াআড়ি ভাবে ভাজ করে নিল। নীল চুলে হাত বুলিয়ে নিতে নিতেই বলল-

“তোর মতো শাকচুন্নিকে যত তাড়াতাড়ি জামাইর বাড়ি পাঠিয়ে বিদায় করতে পারবো তত তাড়াতাড়িই আমরা তোর হাত থেকে রক্ষা পাবো।”

নীলের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আরশি তাদের দিকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষন চেয়ে থাকে। জোরালো শ্বাস ফেলে রুমের দিকে পা বাড়িয়ে যেতে যেতে শান্ত গলায় বলল-

“এখন আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছিস না যখন আমি থাকবো না তখন ঠিকই বুঝতে পারবি আমার গুরুত্ব।”

আরশি আর পেছন ফিরে তাকালো না। দেখলো না তার দিকে তাকিয়ে থাকা কয়েক জোড়া সিক্ত চোখগুলো। নীল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির রুমের দিকে। মুহুর্তের মধ্যেই তাদের উজ্জ্বল হাসি মুখখানা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আরশি শান্ত গলায় এমন কথা বলবে সেটা কেউ আশা করেনি। আদ্রাফ নীলের কাধে হাত রেখে বলল-

“নীল হাতে বেশি সময় নেই। স্টেজ সাজানো এখনো বাকি। তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করতে হবে।”

নীল আদ্রাফের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিচ থেকে ফুল গুলো তুলে নেয়। গম্ভীর পায়ে ছাদের উদ্দেশ্যে চলে যায়। নীলের সাথে সাথে বাকি সবাই চুপচাপ মলিন মুখে চলে যায়।

————————

হলুদের সাজে নিজেকে সাজিয়ে চুপটি মেরে বসে আছে আরশি। লালচে-হলুদ রঙের শাড়িতে কমলা রঙের পাড়। গায়ে জড়ানো বেলি, লাল গোলাপ আর গাঁদা ফুলের অলংকার। তাজা ফুলের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে আরশির চারপাশে। মুখে হাল্কা মেকআপ। দু চোখে কাজল আর ঠোঁটে হাল্কা লিপস্টিক। হাতে পায়ে রক্তলাল রঙের আলতা। এই মুহূর্তে কোনো ফুলপরি থেকে কম লাগিছে না আরশিকে। শাড়ি পরে নড়াচড়া করা আরশির কাছে খুবই বিপদজনক মনে হচ্ছে। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেই মনের মধ্যে ভয় ঝেঁকে ধরে। এই বুঝি শাড়ির কুচি খুলে যাবে। এখনই হয়তো হোঁচট খেয়ে পরে যাবে। এসব ভেবেই মনের মধ্যে ভয় নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

বিকেলের শেষ সময়। পশ্চিমা আকাশের সূর্য রক্তিম আভা ধারণ করছে। বিকেল চারটায় হলুদের অনুষ্ঠান শুরু করার কথা হলেও পুরো ছাদ জুড়ে এখন নিস্তব্ধতা ঘেরে আছে। সকলের চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। আরশি স্টেজের সোফায় ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। হঠাৎ করে এমন কিছু হয়ে যাওয়ায় কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে আরশি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও অনুষ্ঠানের মূল মানুষটা-ই সকাল থেকে গায়েব। রৌদ্র সকাল বেলা বাসা থেকে বেরিয়েছে এখনো তার ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। রৌদ্র ফোনে ট্রায় করেও সবাই ক্লান্ত। বার বার রৌদ্রর নাম্বারে করলেও প্রতিবার ফোন বন্ধই এসেছে। নির্বান, নীল আর আদ্রাফ বেরিয়েছে রৌদ্রর খোঁজে। রৌদ্র বাবা-মা চিন্তায় অস্থির হয়ে পরেছে তাদের ছেলের জন্য। আরশি নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই আরশির ফোন কেঁপে উঠলো। আরশি ফোন নিয়ে স্কিনের তাকাতেই বড় বড় করে নীড় লেখা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আরশি সোফা থেকে উঠে কিছুটা দূরে গিয়ে ফোন রিসিভ করলো। আরশি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই অপরপ্রান্ত থেকে নির্বান অস্থিরতার সাথে বলল-

“হ্যালো ক্রাশ ভাবি! ভাইয়ার গাড়ি এক্সিডেন করেছে। ভাইয়া এখন হসপিটালেই আছে।”

নির্বানের কথা শুনে আরশির পুরো দুনিয়া ঘুরে গেল। চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে তার। পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। আরশির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নির্বান আবারও অস্থির কন্ঠে বলল-

“হ্যালো কিছু বলছো না কেন! ভাবি ফুপিমণি কে কিন্তু কিছু বলো না। আমার ফোনে চার্জ….”

নির্বানের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল। আরশি কোনো রকম নিজেকে সামলিয়ে ছাদ থেকে নেমে গেল কাওকে কিছু না বলে। ড্রাইভারের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে একা একাই বেরিয়ে পরলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে। আরশি স্থির চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে অঝোরে নোনাজল গাল বেয়ে গড়িয়ে পরছে। চোখের কাজল গুলো লেপ্টে যাচ্ছে চোখের পানিতে। নির্বানের কথা গুলো মনে পরতেই তার বুকে বার বার মোচড় দিয়ে উঠছে। দুচোখ যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।

চলবে..