রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-৫৫+৫৬

0
834

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৫৫
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“তুমি চিন্তা করো না আমি আছি তো। আমি থাকতে তোমার বিয়ে অন্য কারও সাথে হতে দিবো না। আমি আজকেই বাসায় তোমার কথা বলবো। তুমি নিশ্চিন্তে…”

নীল আর পুরো কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই আরশি রেগেমেগে নীলের পিঠে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। হঠাৎ আরশির থাপ্পড়ের চোটে নীল তাল সামলাতে না পেরে সামনের দিকে পরে যেতে নিয়েও কৃষ্ণচূড়া গাছের সাহায্যে বেঁচে যায়। ফোনটা হাত থেকে ছিটকে গিয়ে কিছুটা দূরে পরলো। নীল এক হাত পিঠে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে চাপা আর্তনাদ করে উঠে। চোখে ভয়ংকর কৌতূহল নিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। আরশি লাল রঙের কুর্তি আর কালো ওড়না গাঁয়ে জড়িয়ে চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। দু চোখে দিয়ে যেন অগ্নিগিরির জ্বলন্ত লাভা বের হচ্ছে। চাহনি দিয়েই নীলকে ঝলসে দেওয়ার মতো রাগ দেখা যাচ্ছে আরশির চোখে। নীলের ভ্রু জোড়া খানিকটা কুচকে এলো। ফোনটা তুলে নিয়ে পকেটে রেখে আরশির দিকে এগিয়ে আসলো। চাপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-

“এটা কি হলো আশু? আমাকে মারলি কেন? তা-ও আবার এতো জোরে!! আমার পিঠ আগুনের মতো জ্বলছে। এতো শক্তি কই থেকে আসলো তোর মতো চিকনীর শরীরে!”

নীলের কথায় আরশির রাগ যেন আকাশ ছুঁই ছুঁই অবস্থা। প্রচন্ড রাগে যেন মুখ দিয়ে কথাই বের হচ্ছে না। নীলা আর নির্বান রৌদ্রর সাথে কথা বলতে বলতে আরশির দিকে এগিয়ে আসে। নির্বান আরশির কাছে এসেই হাসি মুখে জিজ্ঞেস করল-

“কেমন আছো পাশের বারান্দায় ওরফে ক্রাশ ভাবি? আচ্ছা এক মিনিট কিছুদিন পর তো তুমি আমার শালিও হয়ে যাবে। বাহ এটা দেখছি থ্রি ইন ওয়ান হয়ে গেল।”

নির্বান কথা গুলো বলেই হেসে দিল। রৌদ্র আর নীলাও হাসছে। নীল হাসতে গিয়েও আরশির রাগান্বিত চেহারা দেখে আর হাসার সাহস দেখালো না। আদ্রাফ কাসফিয়ার হাত ধরে হেঁটে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল-

“কি নিয়ে এতো হাসাহাসি হচ্ছে এখানে!”

নীলা তাদের দু’জনের দিকে এক অপলক তাকিয়ে নির্বানের হাসি মুখের দিকে তাকালো। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল-

“তেমন কিছু না। কেমন আছিস তোরা?”

কাসফিয়া হাল্কা হাসি দিয়ে বলল-

“আমরা ভালো আছি। তোদের কি অবস্থা? আশু তুই কেমন…”

কাসফিয়া আরশির দিকে তাকাতেই চুপ হয়ে যায়। আরশির চোখমুখের অবস্থা দেখে কিছুটা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস-

“কিরে আশু তোর কি হয়েছে? এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন! চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন তোর?”

কাসফিয়ার কথায় সবাই কিছুটা বিস্ময় নিয়ে আরশির দিকে তাকায়। আরশি চোখমুখ শক্ত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নীল জোড়ালো শ্বাস ফেলে বলল-

“ভূতে ধরছে ওরে। এসেই আমার পিঠে কত্তো জোরে একটা থাপ্পড় মারছে। আল্লাহ! ওর এতো শক্তি!! আমার তো আগে জানা ছিল না। আদ্রাফ ভাই দেখ তো আমার পিঠে ওর হাতের ছাপ পরছে কি-না!”

নীল আদ্রাফের দিকে এগিয়ে যেতেই আরশি দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বলল-

“এই হারামি আমাদের কাউকে না জানি প্রেম করে বেড়াচ্ছে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে প্রেমিকাকে বিয়ের জন্য স্বান্তনা দিচ্ছে। ভাবতে পারছিস তোরা ও কতো দূর চলে গেছে! ফোনে প্রেমালাপ করতো আর আমাদের শোনাতো যে অফিস থেকে জরুরি কল এসেছে।”

আরশির কথা শুনে নীল চুপসে যায়। কিছু বলার মতো মুখের ভাষা তার নেই। বাকি সবাই বিস্ফোরিত বোমার মতো চোখ দুটো বড় বড় করে নীল আর আরশিকে দেখে যাচ্ছে। আদ্রাফ ভয়াবহ উত্তেজনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল-

“কিরে নীল এসব কি সত্যি বলছে আশু?”

নীল কিছু বলছে না। নিচের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু করছে৷ আরশি আবারও ক্ষিপ্ত গলায় বলল-

“এই হারামজাদা রে কি জিজ্ঞেস করছিস!! আমি নিজ কানে শুনেছি ও ফোনে কথা বলছিল।”

নীলা সরু চোখে নীলের দিকে তাকিয়ে ভাবুকতার সাথে বলল-

“এখন বুঝলাম কেন তুই যখন তখন ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসতি।”

আদ্রাফ ডান হাতে নীলের গলা শক্ত করে পেচিয়ে ধরে। নীলের মাথা আদ্রাফের হাতের মাঝে রেখেই বুকের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। নীল আদ্রাফের হাত ধরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইলো। আদ্রাফ রাগান্বিত কন্ঠে বলল-

“শালা তুই লুকাইয়া লুকাইয়া প্রেম মারাছ আর আমাদের সবাইরে মিথ্যা কথা কছ!! আমরা কি তোর গার্লফ্রেন্ড নিয়া বাইজ্ঞা যাইতাম না-কি হারামির বাচ্চা! তুই তো ফ্রেন্ড নামের কলঙ্ক নীল।”

নীল আদ্রাফের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে অস্বস্তির সাথে বলল-

“আদ্রাফ ব্যথা পাচ্ছি তো। আমাকে ছাড়। আমি সব বুঝিয়ে বলছি।”

নীলা আর কাসফিয়া এক সাথে চেচিয়ে বলে উঠলো-

“আদ্রাফ ওরে ছেড়ে দিলে আজ তুইও মাইর খাবি বলে রাখলাম।”

কাসফিয়া নীলের কাছে এসে পিঠে ঘুষি মেরে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল-

“তুই আমাদের সবার কাছে কথা লুকিয়ে রাখলি কি করে!! কুত্তা, বাটপার… তুই আমাদের সত্যি সত্যিই বন্ধু মনে করিস কি-না সন্দেহ হচ্ছে।”

নীলা এগিয়ে এসে নীলের পায়ে লাথি মেরে রাগান্বিত কন্ঠে বলল-

“সয়তান বজ্জাত পোলা… আমি তোর মায়ের পেটের এক মাত্র যমজ বোন। আমার কাছেও কিভাবে লুকিয়ে রাখলি তুই!”

নীল অসহায় কন্ঠে বলল-

“আরে বোইন আমারে কিছু বলার সুযোগ তো দিবি তোরা না-কি!”

আরশি জ্বলন্ত চোখে নীলের দিকে তাকায়। বাঘিনীর রূপ ধারন করে নীলের কাছে এসে নীলের চুল গুলো নিজের হাতের মুঠোয় বন্দী করে নেয়। সাথে সাথেই নীল চেচিয়ে ওঠে। আদ্রাফ নীলের পেছনে একটা লাথি মেরে বলল-

“চুপ থাক শালা। একদম চেচামেচি করবি না।”

আরশি নীলের চুল ধরে মাথা উঁচু করে আরশির মুখোমুখি করে। আদ্রাফ এখনো নীলের গলা পেচিয়ে ধরে আছে। নীলের জান যায় যায় অবস্থা দেখে রৌদ্র আর নির্বান একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে। নির্বান একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল-

“ভাই এই গুলার এমন মাস্তানি রূপ তো আগে দেখি নাই। বাপরে বাপ কি রাগ এই মেয়ে গুলার!!”

রৌদ্র আর নির্বান দু জনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেঞ্চিতে বসে পরে। পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে পেছনের দিকে হেলান দিয়ে রৌদ্র আর নির্বান বেশ আরাম করে বসে আছে। তাদের দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে তারা কোনো মজাদার এ্যাকশন মুভি দেখছে। খুব এনজয় করছে তাদের মারামারি দেখে।

“এবার বল সব কিছু। কে তোর সেই নায়িকা যাকে আমাদের সবার কাছ থেকে আড়াল করে সিন্দুকে তালা মেরে রেখেছিস!”

নীলা আরশির হাত ধরে চুলের বাধন কিছুটা হাল্কা করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। আমতা-আমতা করে বলল-

“এই ভার্সিটির-ই আমাদের জুনিয়র। তোরা সবাই চিনিস ওকে।”

নীলা নীলের মাথার পেছন দিকে একটা চাপড় মেরে বলল-

“নাম বল কুত্তা”

“আরে আমাদের পাশের ক্লাসের শুভ্রতা।”

নীলের কথা শুনে সবাই যেন আরেক দফা চমকে উঠলো। চার জন একসাথে জোরে চেচিয়ে বলল-

“কিইইইই!!”

আদ্রাফ নীলের গলা ছেড়ে দিয়ে বিস্ময় নিয়ে নীলের দিকে তাকালো। কাসফিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-

“শুভ্রতা মানে আমাদের ভার্সিটির টিচারের মেয়ে!!”

নীল মাথা ঝাকালো। আরশিসহ বাকি সবার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। আদ্রাফ উৎকন্ঠা হয়ে বলল-

“তোর সাহস তো কম না নীল। তুই স্যারের মেয়ের লগে টাংকি মারছ। এই কারণেই শুভ্রতা আমাদের সামনে আসলে লজ্জায় কাচুমাচু করতো।”

নীল একটা বোকা হাসি দিয়ে বলল-

“আসলে শুভ্রতা আমাকে না করেছিল আমাদের সম্পর্কের কথা কাওকে না বলতে। আমাকে দিয়ে প্রমিজ করিয়েছিল। তাই তোদের কিছু বলিনি।”

আরশি ড্যাবড্যাব করে নীলের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-

“কবে থেকে চলছে এসব?”

নীল চুল গুলো ঠিক করে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে লাজুক চেহারায় বলল-

“আমি তো অনেক আগে থেকেই পছন্দ করতাম কিন্তু…”

নীল থেমে যায়। নীলা ভ্রু কুচকে বিরক্তির সাথে বলল-

“নেকামি না করে বল কবে থেকে প্রেম করে যাচ্ছিস?”

নীল মাথা চুলকিয়ে একটা মেকি হাসি দিয়ে বলল-

“এই তো বেশি দিন না। হবে হয়তো এক দেড় বছর।”

নীল কথাটা বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসে৷ নীলের হাসি দেখে যেন সবার শরীরে জ্বলজ্বল করে আগুন জ্বলে উঠলো। আরশি চেচিয়ে বলল-

“হারামির বাচ্চা তুই দেড় বছর ধরে প্রেম করছিস অথচ আমাদের কাউকে কিছু বলিস নি!! আমাদের বেলায় তো খুব ভাব নিয়ে আসিস ভাই সেজে জ্ঞান দিতে এখন কই গেল তোর ভাই গিরি!!”

কাসফিয়া নীলের দিকে তেরে এসে তেজি কন্ঠে বলল-

“ওরে তো ইচ্ছে করছে এখনেই পুতে ফেলি। ধোকাবাজ বন্ধু তুই। বাটপার পোলা।”

আদ্রাফ কাসফিয়ার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল-

“তুমি এখানেই দাঁড়াও বেশি নাড়াচাড়া করো না। ওরে তো আমরা সবাই দেখে নিবো।”

আদ্রাফ, নীলা আর আরশি নীলকে মারতে আসলেই নীল দৌড়ে দূরে চলে যায়। আদ্রাফ নীলকে ধরার চেষ্টা করেও পারে না। আরশি আর নীলাও পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। রৌদ্র আড়মোড়া ভেঙ্গে তাদের দিকে গম্ভীরভাবে পা ফেলে এগিয়ে যায়। আরশির সামনে এসে আরশির হাত ধরে থামিয়ে দেয়। গম্ভীর গলায় শাসনের সুরে বলল-

“এই সময় এভাবে দৌড়ানো সেফ না আরু। তুলতুলের কথা ভুলে যেও না। নিজের সাথে সাথে তুলতুলের-ও খেয়াল রাখতে হবে তোমার।”

রৌদ্র কথা শুনে সবাই থেমে যায়। ভ্রু বাঁকিয়ে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্র আরশির দিকে। আরশি মাথা নিচু করে ফেলে রৌদ্রর কথায়। নির্বানসহ বাকি চারজন রৌদ্রর দিকে এগিয়ে আসে। নির্বান বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল-

“এই সময় মানে কি ভাই! আর তুলতুল আবার কি?”

আরশি লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলে। রৌদ্র কোনো বিনীতা না করেই বলে দিলো-

“তুলতুল মানে তোর ভাই আর পাশের বারান্দার অনাগত সন্তান।”

রৌদ্রর কথায় সবার চোখ রসগোল্লার মতো গোলাকৃতি হয়ে গেল। অপ্রত্যাশিত কিছু শুনে ফেলেছে মনে হচ্ছে। কাসফিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল-

“আপনার আর আশুর অনাগত সন্তান!!”

রৌদ্র দু হাত আড়াআড়ি ভাবে ভাজ করে বলল-

“হুম আমাদের সন্তান।”

“মানে আমাদের আশু প্রেগন্যান্ট??”

নীলার প্রশ্নে এবার রৌদ্র ভ্রু জোড়া কুচকে এলো। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল-

“হ্যাঁ আমাদের আরু প্রেগন্যান্ট।”

নীল আরশির দিকে এগিয়ে আসে। আরশি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। অস্বস্তিতে হাত কচলাচ্ছে। গাল দুটো হাল্কা লাল আভা ধারণ করেছে। নীল আরশির দিকে থেকে মুখ ঘুরিয়ে রৌদ্রর দিকে চেয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল-

“আপনি সত্যি বলছেন!”

রৌদ্র একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে। বিরক্তি প্রকাশ বলল-

“হুম সত্যি। তিন সত্যি, হাজার সত্যি।”

সাথে সাথেই সবাই একসঙ্গে খুশিতে চেচিয়ে উঠলো। নীল আরশিকে জড়িয়ে ধরে। চোখ দুটো পানিতে চিকচিক করছে নীলের। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। আনন্দের ঝলক চোখের পানি হয়ে উপচে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু ছেলেদের যে কান্না করতে নেই। সমাজের সকলের তৈরি সেই পুরনো নিয়ম মানতেই নীল নিজের চোখ দুটোকে বাধা দিচ্ছে। চিকচিক করা অশ্রু গুলো চোখের মাঝে রেখেই আরশির দিকে মাথা তুলে তাকায়। আরশির দু কাধে হাত রেখে জড়ানো কন্ঠে বলল-

“আমি তোকে বলেছিলাম না তুই ব্যর্থ না। দেখলি তো আমি মামা হবো এখন। তুই মা হবি আশু। তুই ব্যর্থ না।”

আরশির অশ্রুসিক্ত চোখেই মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ালো। কাসফিয়া এসে আরশিকে জড়িয়ে ধরেই কান্না করে দেয়। আরশি কাসফিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কাসফিয়া শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে আরশিকে। কান্নারত অবস্থায় কাসফিয়া জোড়লো শ্বাস ফেলে। থেমে থেমে বলল-

“আজ আমি অনেক খুশি আশু। আমি জানতাম আল্লাহ কখনো তোকে এভাবে কষ্ট দিবে না। তোর মতো মেয়ে কখনো কষ্ট পেতেই পারে না। এখন থেকে তুই নিশ্চয়ই নিজেকে ব্যর্থ মনে করবি না আশু তাই নাহ!! বিশ্বাস হয়েছে তো এবার তুই যে ব্যর্থ না।”

নীলাও এসে আরশিকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদোকাঁদো গলায় বলল-

“অবশেষে তোর জীবনের সকল কষ্ট মুছে গেল আশু। আজ থেকে তুইও আর দশটা মেয়ের মতোই নিজেকে মনে করবি। তুই সম্পূর্ণ একটা মেয়ে। পরিপূর্ণ মেয়ে। তুইও বাকি মেয়েদের মতো মাতৃত্বের স্বাদ পাবি। খুব তাড়াতাড়ি তুইও মা ডাক শুনবি। তোর মাঝেও নতুন এক অস্তিত্ব বেড়ে উঠবে।”

চলবে….

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৫৬
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আমিও তো বাবা হচ্ছি কই আমাকে তো কেউ অভিনন্দন জানাচ্ছে না!!”

রৌদ্রর কথায় আরশি সবাইকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রৌদ্রকে দিকে। রৌদ্র দু হাত ভাজ করে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই কিছুটা সময় চুপ থেকে হুট করেই আদ্রাফ আর নীল রৌদ্রর উপরে ঝাপিয়ে পরলো। আচমকা এমন করায় রৌদ্র নিজের তাল হারিয়ে ফেলে। পেছনের দিকে পরে যেতে নিলেই নির্বান তাড়াতাড়ি করে রৌদ্রর পেছনে এসে দু হাতে রৌদ্রর পিঠে ভর দিয়ে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়। আদ্রাফ আর নীল এক সাথে রৌদ্রকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে আছে। আদ্রাফ উৎকন্ঠা হয়ে বলল-

“আপনাকেও অনেক অনেক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন আর ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার জন্যই সব হয়েছে। আপনাকে অভিনন্দন জানাতে কি ভুলে যাই!!”

রৌদ্র মুচকি হেসে বলল-

“অভিনন্দন জানাচ্ছো নাকি মেরে ফেলার চেষ্টা করছো!”

আদ্রাফ রৌদ্রকে ছেড়ে দেয়। তবে নীল এখনো আগের মতোই রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরে আছে। রৌদ্র নীলের পিঠে আলতো করে হাত রাখতেই নীল কিছুটা নেড়েচেড়ে ওঠে। রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরেই আবেগপ্রবণ হয়ে নিম্নস্বরে বলল-

“আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না রৌদ্র ভাই। আপনি আমাদের আশুর জন্য যা করেছেন তা হয়তো অন্য কেউ-ই করতো না। আপনার ভালোবাসার কাছে আশুর ব্যর্থতাও হার মেনে নিয়েছে। আশুকে এতো ভালোবাসা আর আনন্দে পরিপূর্ণ জীবন দেওয়ার জন্য আমরা সবাই আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আশু আমাদের সকলের জান। ওর মাঝেই আমাদের সকলের হাসি, আনন্দ আটকে আছে। আর আপনি আমাদের জানটাকে ভালোবেসে আগলে রেখেছেন। আপনার ঋণ আমরা কখনো শোধ করতে পারবো না।”

“কিরে এভাবেই থাকবি না-কি তুই!”

কাসফিয়ার কথায় নীল সকলের অগোচরে নিজের চোখের পানি মুছে নেয়। রৌদ্রকে ছেড়ে দিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি মুখে টেনে বলল-

“এতো বড় সুসংবাদ তাই একটু বড় করেই অভিনন্দন জানালাম।”

কাসফিয়া হাসি মুখে আবারও আরশিকে জড়িয়ে ধরলো। নির্বান আরশির কাছে এসে বলল-

“বাহ ক্রাশ ভাবি এবার দেখছি পাশের বারান্দায় একটা ছোট্ট রোদ এসে হানা দিবে। ভাই এবার তোমার ভালোবাসায় ভাগ পরবে বুঝলে তো!! এখন থেকে সব ভালোবাসা এই ছোট্ট তুলতুলে রোদের জন্য থাকবে।”

নির্বানের কথা শুনে সবাই হেসে দেয়। রৌদ্র একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-

“রৌদ্র আর রুদ্রাণীর ভালোবাসা মৃত্যুর পরেও একই রকম থাকবে।”

নীলা আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বলল-

“বাহহ কি নিরন্তর ভালোবাসা আশু!! তোরা তো দেখছি দিন দিন অনেক বেশি রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছিস।”

আরশি লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলে। সবার সামনে রৌদ্রর এমন লাগামহীন কথায় আরশির প্রচন্ড অস্বস্তিবোধ করছে। আদ্রাফ আরশির মাথায় টোকা মেরে বলল-

“ইশশ লজ্জাবতী লজ্জায় লাল হয়ে নুয়ে পরছে। থাম বইন আমাদের সামনে এতো আলগা লজ্জা দেখাতে হবে না।”

আরশি মাথা তুলে আদ্রাফের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আদ্রাফের পায়ে একটা লাথি মেরে বেঞ্চিতে যেয়ে বসে পরলো। নীলা, কাসফিয়া, আদ্রাফ আর নির্বানও আরশির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রৌদ্র আর নীল এক সাথে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছে। রৌদ্র কিছুটা দূরে বসে থাকা আরশির দিকে দৃষ্টি দিয়ে শান্ত গলায় বললো-

“জানো তো নীল!! আরু খুব বেশিই লাকি। তোমাদের মতো বন্ধু পাওয়া সত্যিই খুব সৌভাগ্যের ব্যাপার। তোমরা এক একজন আরুকে নিজের ফ্যামিলির মতো আগলে রেখেছো৷ একটা ছোট্ট বাচ্চাকে তার মা যেভাবে আগলে রাখে ঠিক সেভাবেই তোমরা আরুকে আগলে রেখছো। বিশেষ করে তুমি আরুকে নিয়ে যতটা চিন্তা করো, ভয় পাও ততটা হয়তো আজকাল আপন ভাইও নিজের বোনের জন্য করে না। এই স্বার্থপরের পৃথিবীতে তোমাদের নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বটা আসলেই খুব অবাক করার মতো। দোয়া করি সারাজীবন তোমাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর বন্ধুত্বটা অটুট থাকুক।”

নীল একটা অমায়িক হাসি উপহার দিয়ে বলল-

“রৌদ্র রুদ্রাণীর ভালোবাসাও সারাজীবন অটুট থাকুক মন থেকে দোয়া করি।”

রৌদ্র তৃপ্তিদায়ক একটা হাসি দিল। আরশিদের কাছে আসতেই নির্বানকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“নির্বান তুই একটু আমার সাথে হসপিটালে চল। আমার কিছু কাজ আছে তুই না হয় আমার সাথে থাকিস ততক্ষণ। এখন ওরা নিজেদের মতো করে আড্ডা দিক। আমরা পরে আসবো তারপর সবাই একসাথেই ডিনার করে বাসায় যাবো কেমন!!”

নির্বান রৌদ্র পাশে এসে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বলল-

“ঠিক আছে ভাই। নীলাদ্রি আমি যাচ্ছি। একটু পরেই চলে আসবো। আমাকে আবার মিস করো না কিন্তু।”

নির্বান শেষের কথা গুলো নীলার দিকে তাকিয়েই একটা চোখ টিপ দিল। নীলা ক্ষিপ্ত গলায় বললো-

“আমি একদমই আপনাকে মিস করবো না হুহ্।”

নির্বান হাসলো। শান্ত গলায় বলল-

“সেটা না হয় পরেই বুঝতে পারবে। ভাই চলো।”

রৌদ্র আরশির কাছে এসে আরশির চুলের আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-

“সাবধানে থেকো আরু। নিজের আর তুলতুলের খেয়াল রেখো।”

আরশি চোখের ইশারায় আস্বস্ত করতেই রৌদ্র হাঁটা শুরু করল। নির্বান নীলার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে রৌদ্রর সাথে চলে গেল। আরশির মুচকি হেসে রৌদ্রর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। আর নীলা মলিন মুখে চেয়ে আছে নির্বানের দিকে। নীল খোঁচা দিয়ে নীলাকে বলল-

“নির্বান ভাই যেতে না যেতেই তোর মুখে আধার নেমে আসলো!! আর একটু আগেই তো বললি নির্বান ভাইকে মিস করবি না।”

নীলা অপ্রস্তুত হয়ে একটা হাসি দিলো। পরক্ষণেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। আদ্রাফ নীলার লাজুক চেহারা দেখে এক তৃপ্তির হাসি দেয়। যে হাসি অন্য কারও চোখে পরেনি। অন্য কেউ বুঝতে পারেনি এই হাসির মানে। কাসফিয়া নীলার কাধে হাত রেখেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু কেন এই স্বস্তির নিঃশ্বাস তা কেউ জানেন!!

“আচ্ছা এখন চল ক্যাম্পাসটা একটু ঘুরে দেখি। অনেক দিন ধরে দেখি না।”

কাসফিয়ার কথায় সবাই সায় দিল। হৈচৈ করে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো। পুরনো সকল স্মৃতি যেন মাথার মধ্যে নাড়া দিয়ে উঠলো সবার। মাঠের মাঝখানে এসেই সবাই বসে পরলো কচিকচি ঘাসের উপর। পুরো ভার্সিটি ফাঁকা। মানুষজন নেই বললেই চলে। নেই কোনো হৈচৈ, ভিড়ভাড়। শুধু মাত্র আছে এক আত্মার পাঁচটি দেহ। এই পাঁচজন মানুষের দেহ আলাদা হলেও তাদের আত্মাটা যেন তিন অক্ষরের একটা ‘বন্ধুত্ব’ শব্দের মাঝেই আটকে আছে। তাদের আত্মা গুলো যেন একজন আরেকজনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মাঠের মাঝখানে গোল হয়ে বসে আছে আরশি, নীল, কাসফিয়া, আদ্রাফ আর নীলা। কিছুটা সময় চুপ করে বসে থাকার পর আরশি হুট করেই নীলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-

“ওই হারামি শুভ্রতাকে ফোন কর। আমরা কথা বলবো ওর সাথে।”

নীল ভ্রু কুচকে আরশির দিকে তাকায়। কিছু বলার আগেই আদ্রাফ নীলের পিঠে চাপড় মেরে বলল-

“যেভাবে তাকালি মনে হলো আমরা শুভ্রতার সাথে কথা বলতে না, খেয়ে ফেলতে চাইছি!

নীল আদ্রাফের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-

“আরে ভাই ফোন দিবো তো। একটু ধৈর্য ধর।”

নীল ফোন বের করে শুভ্রতাকে কল দিতেই আরশি নীলের হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নেয়। স্পিকার অন করে ফোনটা সবার সামনে এনে ধরলো। নীল হকচকিয়ে উঠে অপ্রস্তুত হয়ে বলল-

“আশু ফোন নিলি কেন? দে আমার কাছে।”

আরশি নীলের দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-

“একদম চুপ কর। যা বলার স্পিকারেই বলবি। আর বেশি পাকনামি করলে এখনই আমি আন্টিকে ফোন করে তোর সব কুকীর্তির কথা বলে দিবো। মনে রাখিস!”

নীল চুপসে যায়। চোখ ছোট ছোট করে আরশির হাতে নিয়ে রাখা ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফোন রিসিভ হলো। অপরপ্রান্ত থেকে মিষ্টি গলায় বলল-

“হ্যালো নীল।”

নীল কোনো কথা বললো না। মলিন মুখে আরশিদের দিকে তাকিয়ে আছে। শুভ্রতা কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আবারও বলল-

“নীল আপনি শুনতে পাচ্ছেন! কথা বলছেন না কেন!”

আরশি নীলকে খোঁচা মেরে চোখের ইশারায় কথা বলতে বলল। নীল কিছুটা ইতস্তত করে বলল-

“হুম শুভ্রা শুনতে পাচ্ছি।”

“আয় হায় কি ভালোবাসা!!! শুভ্রতা থেকে শুভ্রা! বাহ ভাই বাহ। তলে তলে তুমি এতো দূরে চলে গেছো অথচ আমরা কিছুই জানলাম না!! তুমি তো মামা পাক্কা খেলোয়াড়।”

আদ্রাফ নাক মুখ ছিটকে কথা গুলো বলল। আরশি ঝুঁকে আদ্রাফের মাথায় একটা থাপ্পড় মেরে বলল-

“গরু তুই কি একটু চুপ করে থাকতে পারলি না!! দিলি তো সব মজা নষ্ট করে!!”

আদ্রাফ নীলের দিকে চেয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল-

“দেখলি না কেমনে কথা কইতাছিলো!! আমি চুপ থাকলে এতোক্ষনে নিশ্চিত জানু, সোনা, মোনা, কলিজা এসব শুরু করে দিত। ওর লজ্জা না থাকলেও আমাদের তো আছে তাই না!!”

“আদু ভাইয়ের বাচ্চা চুপ থাকবি না-কি ঘুষি দিয়া তোর নাক ফাটামু!!”

নীল রাগী কন্ঠে বলল আদ্রাফকে। সাথে সাথেই আরশি চেচিয়ে উঠলো-

“একদম চুপ কর তোরা সবাই। কেউ কোনো কথা বলবি না।”

আদ্রাফ আর নীল চুপসে যায়। আরশি ফোনটা নিজের সামনে এনে বলল-

“হ্যালো শুভ্রতা!! আমি আরশি। নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছ আমাকে!”

অপরপ্রান্ত থেকে শুভ্রতা কিছুটা কাচুমাচু করে বলল-

“হুম চিনতে পেরেছি আপু।”

“যাক তাহলে তো ভালো। এবার বল তো তুমি কেন আমাদের কাছ থেকে তোমাদের সম্পর্কের কথা লুকিয়ে রেখেছো!!”

শুভ্রতা হকচকিয়ে উঠলো। খানিকটা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল-

“আসলে আপু তুমি তো জানোই আব্বু আমাদের ভার্সিটির টিচার। আর আব্বু তো খুব রাগী আর গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। উনি যদি জানে আমি ভার্সিটিতে এসে প্রেম করছি তাহলে তো আমাকে মেরেই ফেলবে। সেই ভয়েই আমি নীলকে না করেছিলাম কাউকে আমাদের সম্পর্কের কথা বলতে।”

আরশি বিজ্ঞ মানুষের মতো বলল-

“অহহ বুঝলাম। কিন্তু তোমাদের প্রেম হলো কখন! কে আগে প্রপোজ করেছে? আর তুমি জেনে শুনেই এই রকম একটা গাধার সাথে প্রেম করতে রাজিই বা হলে কি করে?”

আরশির প্রশ্নে শুভ্রতা হাসলো। হাসতে হাসতেই বলল-

“নীল এখনো আমাকে প্রপোজ করেনি। বলেছে বিয়ে সময় করবে। আর আমাদের সম্পর্ক কিভাবে হয়েছে তা আমরা নিজেও জানি না। তোমাদের এক্সামের শেষে একদিন নীল আমার কাছ থেকে নাম্বার নিয়েছিল। ব্যস তখন থেকেই আমাদের ফোনে কথা বলা শুরু হয়েছে। আমরা আগে থেকেই একজন আরেকজনকে পছন্দ করতাম তাই আর কখনো প্রপোজ করার দরকার পরেনি। কথায় কথায় কখন এই পর্যন্ত চলে এসেছি জানি না। কখনো দেখা হওয়া কিংবা ঘুরতে যাওয়া এসবও আমাদের মধ্যে হয়নি। মাঝে মাঝে রাস্তা ঘাটে একটুখানি দেখা পাওয়াই ছিলো আমাদের ডেট। আব্বুর জন্য আমার কখনো সাহস হয়নি নীলের সাথে সরাসরি দেখা করার। তবে নীল আমাকে এভাবেই মেনে নিয়েছে। উনি কখনো আমাকে জোর করেনি দেখা করার জন্য। শুধু বলতেন বিয়ের পর তো প্রতিদিন দেখবেই এখন এতো লুকোচুরি করে দেখা দরকার নেই।”

শুভ্রতার কথা শুনে সবাই একসাথে চেচিয়ে বলল-

“ওওওওওও…”

নীল অস্বস্তিতে কাচুমাচু করছে আর শুভ্রতা খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। আদ্রাফ নীলের পিঠে কিল মেরে বলল-

“তুমি ভিতর ভিতর প্রেমিক পুরুষ হয়ে উঠেছিলে অথচ আমরা কেউই বুঝলাম না! আহহ কি দুঃখ আমাদের। ইচ্ছে করছে হাঁটু পানিতে ডুবে মরি। কচু গাছে ফাঁশ দিয়ে ঝুলে মরি।”

আদ্রাফের কথায় সবাই এক সাথে হেসে ওঠে। শুভ্রতা নম্রতার সাথে বলল-

“আপু তোমরা এখন আড্ডা দাও আমরা না হয় পরে কথা বলবো। আর সুযোগ হলে একদিন দেখা হবে অবশ্যই।”

আরশি কিছুক্ষন কথা বলতেই শুভ্রতা ফোন কেটে দেয়। নীলের দিকে সবাই কিছুক্ষণ নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমকাই নীলের উপর হামলে পরে সবাই। নীলকে কাতুকুতু দিচ্ছে সবাই একসাথে। হাসতে হাসতে নীলের দুচোখ দিয়ে পানি এসে পরেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে নীলের। তবুও কেউ থামছে না।

বিকেলের শেষ সময়। সূর্য পুরো পুরি ঢলে পরেছে পশ্চিম আকাশে। রক্তিম আভা গুলো আস্তে আস্তে কালো রঙে ধারণ করছে। নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে পুরো ভার্সিটি। সুদর্শন কাক আর ঝিঝি পোকার ডাকেই গাঁ শিউরে ওঠার মতো সন্ধ্যা নেমে আসছে। সবাই একসাথে নিজেদের মাথা মিলিয়েই গোল হয়ে শুয়ে আছে। ক্লান্ত হয়ে পরেছে সবাই। বড়বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই। সকলের ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক অদ্ভুত সুন্দর রকমের হাসি। আরশির ডান পাশেই নীল শুয়ে আছে আর বাম পাশে কাসফিয়া। আরশি তাদের দু’জনের হাত আঁকড়ে ধরে বলল-

” আজ আমি অনেক খুশি নীল। আমার জীবনটা আজ সব কিছুতে পরিপূর্ণ। কোনো কিছুর অপূর্নতা নেই আজ। তোদের মতো বন্ধু আছে আমার সাথে। রোদ আর রোদের ভালোবাসা আছে। আর আমার মাঝে একটা ছোট্ট তুলতুল আছে। আমার মনের সকল বিষন্নতার কালো ছায়া তোদের সবার ভালোবাসায় খুশির ঝলকে পরিনত হয়েছে।”

কেউ কিছু বলল না। সবার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও দ্বিগুণ প্রসারিত হয়ে গেল। নীল ওরা পাঁচজন একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। এক সাথেই গলা মিলিয়ে গান গাইতে লাগলো সবাই-

বন্ধু মানে একটু পাশে থাকা
বন্ধু মানে হাতে হাত রাখা
বন্ধু মানে অবুঝ অভিমানে
তবুও বন্ধু কারণ বন্ধু জানি

বন্ধু মানে এলোমেলো পথ চলা
বন্ধু মানে বলা আর না বলা
বন্ধু মানে একটু বাড়াবাড়ি
তাই তুমি নেই বলেই চোখ ভারি

আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি
আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি
আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি
আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি

বন্ধু নামের কোন পদবী নেই
বন্ধুর ঠিকানা হাত বাড়ালেই
বন্ধু ডালের ফাঁকে পাখির বাসা
বন্ধু মানে ভালোবাসা-মন্দবাসা

বন্ধু পাতায় যেন শিশির জমা
বন্ধু একটা ভুলের ১০০ ক্ষমা
বুকের বাঁ পাশে বন্ধুর বাড়ি
বন্ধু তুমি ফিরে এসো তাড়াতাড়ি

আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি
আড়ি-আড়ি, আড়ি-আড়ি…..

সবাই গানের লাইন গেয়েই একে অপরকে শক্ত করে এক সাথে জড়িয়ে ধরলো। সকলের খুশি যেন আজ বাধ ভেঙেছে। আরশির খুশির কথা ভেবেই তাদের সকলের মন ভরে উঠছে আনন্দে। এইটাই হয়তো বন্ধুত্ব।

চলবে…