#লীলাবালি🌺
#পর্ব_৪
আফনান লারা
.
অর্ণবের বাবা ওর এমন আচরণে ভীষণরকম ভাবে নিরাশ হলেন।ওর মায়ের কথায় ভরসা পেলেননা।অর্ণব কখনও কথা শোনার মতন ছেলে না তা জানা আছে।আজ এতগুলো বছর পর ফোন করার পরেও তার মন গলানো গেলোনা।তবে তার একটা কথা মাথায় রাখতে হবে আমি তার বাবা মকবুল হাসান।সে তার সব জেদ এই আমার থেকেই পেয়েছে।জেদের দিক দিয়ে আমি প্রথম।তার জেদ আমার জেদের কাছে কিছুনা।যদি তার কোনোদিন বিয়ে হয় তবে কুসুমের সাথেই হবে।নাহলে কারোর সাথে হবেনা।
কপালে হাত রেখে সোফা থেকে উঠে রুমে যেতে যেতে তিনি বললেন,’বৌকে বলো তো এক কাপ চা পাঠাতে’
——-
যত সেলোয়ার কামিজ আছে সব একটা ব্যাগে পুরে নিয়েছে কুসুম।কাল বাবার সঙ্গে অর্ণবদের বাড়িতে যাবে।এই প্রথম সে ঐ বাড়িতে যাচ্ছে।বাবা বলেছেন স্কুলে ঈদের ছুটি দিলে কলিকেও রেখে আসবে যাতে কুসুমের ওখানে নিজেকে একা মনে না হয়।
মনে ভয় করছে একটা বিষয় নিয়ে।উনি যখন আসবেন তখন কি হবে?কি করে তার সামনে দাঁড়াবে।লজ্জা আর ভয় দুটোই মনের ভেতরে ডানা মেলে ঘুরপাক খাচ্ছে।যদি মুখ দেখেই মেজাজ খারাপ হয় তার?
টিনের বেড়ায় ঝুলানো ছোট আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়ালো কুসুম।নিজের মুখে হাত রেখে বললো,’এই রুপে মুগ্ধ হলেও এই মানুষটিতে মুগ্ধ হবেননা জানি।আমি যে আপনার যোগ্য নই।ইশ যদি যোগ্য হতাম, আমার আর কোনো চিন্তা থাকতোনা।আপনার মুখে হাসি রাখবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম।কিন্তু সেটার ধারের কাছেও তো আমি নেই।আমাকে তো আপনি পছন্দই করেন না’
-“ওসব কি বলিস কুসুম?তুই এগুলো ভেবে সারাদিন মুখ ভার করে রেখে এতদিন শুকিয়ে যাচ্ছিলি?তোকে কে বলেছে অর্ণব তোকে পছন্দ করেনা?ঘরের ছেলে ঘরে একদিন ঠিক ফিরবে।আর সে তো তোকে এখনই দেখেইনি।পছন্দ করা না করা বিবেচনার কথা তো এখনও ওঠেইনি।’
-‘আমি যে পড়ালেখা জানিনা তা তো উনি নিশ্চয় শুনেছেন?এই জন্যই তো তার পালিয়ে বেড়ানো’
কুসুমের মা ওর হাত ধরে চৌকিতে বসিয়ে দুহাত দিয়ে মুখটা ধরে বললেন,’আমার মেয়ের অনেক গুণ।সে পাগল না হয়ে যাবে কই?ঠিক ধরা দেবে।অপেক্ষা করতে সমস্যা কোথায় মা রে??এত বড় বাড়ি,এত বড় বাড়ির ছোট ছেলে,আদরের ছেলে,শিক্ষিত সুপুরুষ, তাদের কত চাহিদা!!
হয়ত তার মনে সংশয় জাগবে তারপরেও দেখিস তোকে ঠিক আপন করে নেবে।তুই মানা করে দেবার মতন মেয়েই নস!!আমার কথা শোন।এত চিন্তা করলে চেহারা খারাপ হবে তোর।বিয়ের কথা চলাকালীন হাসিখুশি থাকতে হয়।তাহলে দেখবি রুপ বাহিয়া পড়তেছে।লেখাপড়া কি জিনিস?জরুরি হলো রুপ।যেটা তোরে আল্লাহ দিছেন।পড়াশুনা শুনছি অর্ণবই শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে পারবে।আর সে নিজেও তো পড়তাছে।তারে পড়তে দিবিনা??
তুই চাস সে না পড়ে এসে তোরে বিয়ে করুক?’
কুসুম জিভে কামড় দিয়ে বললো,’না না।তা কেন চাইবো?আমি চাই উনি পড়ুক।অন্তত আমার মতন যেন না হয়।অনেক পড়ুক।অনেক নাম হোক তার’
-“তাহলে?এরকম মন খারাপ করে থাকলে তোর মন খারাপের জোর তো পোলাটাকে দূর থেকে টেনে নিয়ে আসবে গ্রামে।তোরে বিয়ে করলে সে কি আর তোরে ছাড়া একটা দিন ও থাকতে পারবে?পড়াশুনা সব তো ডুবাবে’
কুসুম লজ্জা পেয়ে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো।মা ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,’শুনেছি অর্ণব একটু রাগী হলেও মনের দিক দিয়ে অনেক ভালো একটা ছেলে।তোকে যদি ধমক ও দেয়,দু চারখানা কথাও শোনায় দিনশেষে এসে বুকে টেনে নিবে।আমার আর কোনো চিন্তা থাকবেনা তোকে নিয়ে।আমার এমন মেয়ে যেন অর্ণবের মতন একটা ছেলের ঘরে বউ হয়ে যায়।
মনে শান্তি নিয়ে মরতে পারবো’
-“মা ওসব বলোনা।তোমার আগে যেন আমি মরি।তোমার মৃত্যু আমি সইতে পারবোনা গো।যেন তার আগেই আমি মরে যাই’
——–
-‘কত বই!!ভাবছি লাইব্রেরি থেকে একটা উপন্যাস নেবো পড়ার জন্য।তুই কোনটা নিবি জুথি?’
-‘আমি কৃষ্ণকান্তের উইল নিলাম।’
-‘আচ্ছা তুই আজ প্রথম ক্লাসে আসিসনি কেন?’
-“রিকশা পাচ্ছিলাম না কি করবো?’
-“ভালো করেছিস।এখন চল নাহলে আবার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে’
ক্লাসে এসে বসতেই কিছুক্ষণ পর অর্ণবকে ক্লাসে ঢুকতে দেখে জুথির মাথা হ্যাং হয়ে গেলো।এটা কি করে হয়।প্রথম ক্লাস তো মিস দিয়েছিল এই অর্নবের ভয়ে তাহলে সেকেন্ড ক্লাসে তার আসার কারণ কি?
নিজের কোথাও ভুল হয়েছে কিনা তা ভেবে রুটিনটা বের করে দেখলো ঠিকই তো আছে।এখন অন্য স্যারের ক্লাস।তাহলে এই লোকটা কেন?’
অর্ণব বই হাত থেকে টেবিলে রেখে বললো,’স্যার অন্য ডিপার্টমেন্টে গেছেন।হয়ত আসতে দেরি হবে যার কারণে ক্লাসটা তিনি করাতে পারবেননা।আমাকেই আসতে হলো’
জুথি মাস্ক টেনে মাথা নিচু করে বসলো কোণার দিকে চেপে।অর্ণব বইতে চোখ বুলিয়ে পুরো ক্লাসে একবার চোখ বুলিয়ে নিতেই জুথিকে দেখতে পেলো।প্রথম ক্লাসে জুথি আসেনি তা সে জানতো।
জুথিকে চেনার একটা অন্যতম উপায় হলো ওর ডান ভ্রু ঘেঁষে একটা তিল আছে যেটা কিনা স্পষ্ট নজরে পড়ে।ওকে দেখে চিনতে পেরে অর্ণব বই খুঁজে একটা অধ্যায় বের করে বললো,’যে অধ্যায়টা পড়াচ্ছি তোমরা মনযোগ সহকারে শুনবে।এটা থেকে কমন পড়ে অনেক।’
জুথি ফোন বের করে দেখছে।পুরো ক্লাসটায় ঐ লোকটার উপর চোখ যেন না পড়ে তার জন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকতে হবে।
পড়াতে পড়াতে অর্ণব বুঝতে পারলো জুথি ফোন ঘাঁটছে।টেবিলে একটা থাবা দিয়ে বললো,’ফোন নিয়ে যাব।’
জুথি চমকে ফোন লুকিয়ে তাকালো সামনে।অর্ণব একসাথে সবার দিকে তাকিয়ে বললো,’যদি কেউ আমার ক্লাসে ফোন ঘাঁটো তবে।
তোমরা কত লাকি!!আমাদের সময় ফোন আনলেও স্যারের কথা শুনতে হতো।আর তোমরা ক্লাসে বসেও ফোন দেখার সাহস করে থাকো।যুগে যুগে কত কি দেখবো।’
জুথি আড় চোখে তাকিয়ে ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরের দিকে চেয়ে থাকলো।পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকেই অর্ণবের চোখ জুথির দিকে যাচ্ছিল।কারণ সবাই ওর দিকে মনযোগ দিয়ে চেয়ে থাকলেও একমাত্র জুথি অন্যমনস্ক।বিষয়টা ভালো লাগছিলনা একটুও।সে স্যার না বলে দাঁড় করিয়ে কথাও শুনাতে পারছেনা।কি করে টাইট দেওয়া যায় তাই ভাবছিল হঠাৎ প্রিন্সিপাল স্যার এসে রুমে দাঁড়াতেই তিনি জুথিকে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে দেখে ধমক একটা দিলেন।জুথি চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।তিনি এগিয়ে এসে বললেন,’একটা কথা জানো তোমরা?ভার্সিটি লাইফে সিলেবাসের চেয়েও কাজে দেয় প্রতিটা ক্লাস।স্যারের বলা কথাগুলো স্টুডেন্টরা নোট করে পর্যন্ত রাখে।আর তোমরা এত মূল্যবান ক্লাসে অমনোযোগী থাকো?’
অর্ণব মিটমিট করে হাসছে।মনে মনে বলছে, স্যার আরও ভাল করে বকুন।
প্রিন্সিপাল স্যার জুথির দিকে ফিরে বললেন,’করিম ভাইয়ের মেয়ে তুমি।বেশি কিছু বললাম না, কিন্তু স্যারের মতন মেধা হয়ত তোমার মাঝে নেই।তোমার বাবা কোথাও বেড়াতে গেলেও হাতে বই নিয়ে যেতেন।তোমাকে আরও মনযোগী হতে হবে।পড়াশুনার চিরবন্ধু হলো এই মনযোগ।এটা না থাকলে সারারাত বই নিয়ে বসে থাকলেও লাভ হবেনা।’
অর্ণব দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে নড়ে দাঁড়ালো।করিম স্যারকে সে চেনে।কলেজের টিচার উনি।এককালে তার কাছে সে প্রাইভেটও পড়েছিল।কিন্তু মনে পড়ছেনা তার বাসায় তো কোনোদিন এই ক্ষতিকে দেখলোনা সে।তাহলে?? ‘
—–
বাবার হাত ধরে এই প্রথমবার কুসুম অর্ণবদের বাড়িতে পা রেখেছে।শুরুতে যে সোফার রুম সেখানে অর্ণবের মা আর ভাবী দাঁড়িয়ে ছিলেন।কুসুমকে মিষ্টি মুখ করিয়ে ভেতরে আনলেন তারা।
কালো বোরকা পরে এসেছিল সে।কুসুমের বাবা সোফায় বসতেই ভাবী কুসুমের হাত ধরে নিয়ে গেলেন ভেতরের রুমের দিকে।একটা রুমে এনে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বললেন,’তুমি বুঝি কুসুম??মিনারপুরের?’
-‘জ্বী।’
-‘জানো আমিও ওখানকার।কেমন আছো তুমি সেটা বলো আগে’
কুসুম হাসি দিয়ে বললো ভালো আছে।তারপর রুমটায় একবার চোখ বুলালো।একটা কাঠের ওয়ারড্রব, একটা আয়না,একটা নরম তুলোর বিছানা,একটা টেবিল,চেয়ার,বেলকনি সবই দেখলো।সবুজ রঙ করা রুমটায়।ওকে এভাবে দেখতে দেখে মিশু ভাবী বললেন,’তুমি রুমটা দেখো আমি একটু আসছি।এক মিনিট কেমন?একটা জিনিস বানিয়েছি তোমার জন্য’
ভাবী চলে যাবার পর কুসুম বোরকা খুলে বিছানায় রেখে মাথায় ওড়না দিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো।
টর আগে এরকম বড় আয়না সে দেখেছে পাশের বাসার মিতুলদের।তাদের নিজেদের এমন আয়না ছিলনা।নিজেকে ভালো করে দেখতে যেয়ে খুশিতে পা উঁচু করে ঘুরলো।ঘুরতে ঘুরতে হাত লেগে ড্রেসিং টেবিলে উল্টো করে পড়ে থাকা একটা ছবি নিচে পড়ে গেলো হঠাৎ।জিভ কামড়ে কুসুম নিচ থেকে তুলে নিলো ছবিটা।ওড়না দিয়ে ছবিটা মুছতে যেতেই দেখলো ওটা অর্ণবের ছবি।
তবে সে জানতোনা ছবির এই ছেলেটাই অর্ণব।নীল টিশার্ট পরা।কক্সবাজারে পানি ছোঁয়ার সময় তোলা ছবিটা।চোখে সানগ্লাস।
ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলো কুসুম।অর্ণব নাকি তার বড় ভাই সাগর ঠিক বুঝতে পারলোনা।মিশু চায়ের কাপ হাতে রুমে এসে বললো,’ওটা কে বলোতো?’
কুসুম আন্দাজে সবসময় ভুল করে তাই বললো,’আপনি বলুননা উনি কে?’
-‘এটা তোমার হবু বর’
কুসুমের হাত কেঁপে উঠলো।ছবিটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানায় এসে বসলো সে।মিশু হেসে দিয়ে চায়ের কাপটা ওর সামনে রেখে বললো,’রান্নাবান্না পারো তো?আমাকে হেল্প করতে পারবে তো?’
কুসুম মাথা নাড়ালো।মিশু অর্ণবের ছবির দিকে তাকিয়ে বললো,’তোমার ভাগ্য দারুণ।অর্ণব খুব ভালো একটা ছেলে’
চেয়েও কুসুম কিছু বলতে পারলোনা।মনে তাকে নিয়ে অনেক কিছু জানার কৌতূহল।
চায়ের কাপটা হাতে ধরে আড় চোখে তাকানোর চেষ্টা করলো সেই ছবিটার দিকে।
চলবে♥
#লীলাবালি🌺
#পর্ব_৫
আফনান লারা
.
ছবিটা আজ তার নিতেই হবে।নিয়ে লুকিয়ে রাখবে।বারবার করে দেখা হবে।লজ্জা পাওয়া হবে।এতগুলো বছর পর তার মুখ দেখা হলো এই ছবিটা কিছুতেই হাত ছাড়া করা যাবেনা তার।মিশু তার বাড়ির কথা বলা ধরছিল সেসময়ে অর্ণবের মায়ের ডাক পড়ায় চলে গেলো সেখান থেকে।কুসুম ছুটে এসে ছবিটা নিয়ে বোরকা দিয়ে লুকিয়ে রাখলো।
চা খেয়ে এবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে।ফাঁকা,শূন্য বারান্দা।নিচ তলা বাসা ওদের।বারান্দার সামনে সুপারি বাগান।বাগিচার মতন দেখতে।ওখানে আর দেখার কিছু নেই বলে সে আবার রুমে চলে আসলো।
মিশু এসে বলে গেলো অর্ণবের মা বলেছেন ও আজ থেকে এই রুমেই থাকবে।অর্ণব আসলে মিশুর সঙ্গে গিয়ে থাকবে।সাগর তো বিদেশ থাকে।
কুসুম অনেক বেশি খুশি হলো।এত খুশি যে নাচতে ইচ্ছে করছে তার।
অর্ণবের মা রান্নাঘরে পিঠা বানাচ্ছেন কুসুমের বাবার জন্য।তিনি সোফায় বসে অর্ণবের বাবার সঙ্গে গল্প করছিলেন।তিনি অবশ্য এতক্ষণ ছিলেননা।বাজারে গিয়েছিলেন সদাই আনতে।
কুসুম বাড়ির মেইন দরজা দিয়ে বের হয়ে এদিক ওদিক তাকালো।সামনে দুটো টিনের বাড়ি।ওখান পর্যন্ত তাকে আর যেতে হলোনা।দুজন মধ্যবয়স্ক মহিলা এসে ওকে জেরা করলো।জিজ্ঞেস করলো ও কি হয় এদের।
কুসুম প্রথমে সালাম দিয়ে বললো তার চাচি আম্মা হোন অর্ণবের মা।
তার নাম কুসুম শুনে মহিলা দুজন মিলে বিড়বিড় করে একজন আরেকজনের সাথে কি যেন বলে কুসুমকে ভালো করে দেখতে লাগলো।কুসুম আসি বলে ওখান থেকে চলে আসলো বাসার ভেতর।সুবিধা ঠেকছিলোনা তেমন।প্রস্থানই মঙ্গল।পুনরায় সব রুম দেখতে দেখতে অর্ণবের মায়ের রুমের কাছে আসতেই দেখলো ফোন জ্বলছে উনার।আওয়াজ কমিয়ে রাখা বলে কেউ জানলোনা ফোন আসছে।কুসুম কাছে এসে ফোন হাতে নিলো।পড়তে জানেনা বলে বুঝলোনা কে কল করেছে।তাও রিসিভ করতে পারে সে।রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে অর্ণবের গলা শুনলো
-‘মা শোনো বাবাকে বলবা আমার সঙ্গে যেন জোরাজুরি না করে।একদম এই ঈদেও আসবোনা বলে দিলাম।
আমি জানি তুমি ফোন করেছিলে এটাই বলতে।তখন ক্লাসে ছিলাম বলে রিসিভ করতে পারিনি।বাবাকে পরিস্কার করে বলে দিবা আমাকে যেন কোনো কিছুতে জোর না করে।হ্যালো??শুনছো তো?’
কুসুমের হাত কাঁপছে।কথা বলবে নাকি বলবেনা তা ভাবতে গিয়ে সারা শরীর কাঁপছে ওর।অর্ণব হ্যালো হ্যালো বলেই যাচ্ছে।
-‘আআআআআআ’
-‘কে??আপনি কে বলছেন?’
-‘আসসালামু আলাইকুম’
-“ওয়ালাইকুম আসসালাম।আপনি কে?আমার মা কোথায়?তার ফোন আপনার কাছে কেন?’
-‘চাচি আম্মা পিঠা বানাচ্ছেন।ব্যস্ত!তাকে কি ফোনটা দেবো?’
-‘আগে বলুন আপনি কে?’
-‘রাখি তাহলে’
কুসুম ফোন রেখে এক দৌড় দিলো।আর কথা বলার শক্তি তার নেই।যা বলেছে তাই অনেক।আর কখনও ঐ রুমে সে যাবেনা।গলা শুকিয়ে গেছে।হাঁপাতে হাঁপাতে অর্ণবের রুমে এসে বসে পড়লো চুপ করে।
অর্ণব ভাবছে ফোন কে ধরেছে।তাদের বাসায় তো এমন ছোট গলার স্বরের কেউ সচরাচর আসেনা।বাড়িতে মেহমান এলো নাকি?রাতে আরেকবার ফোন দেবো মাকে।’
—–
-‘ভাইয়া শোনেন!!!’
অর্ণব থেমে গিয়ে পেছনে তাকালো।জুথি ছুটে এসে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,’আব্বুকে তো চেনেন আপনি তাইনা?’
অর্ণব ইতস্তত হয়ে বললো,’তোহহ?’
-‘তো আব্বু বলছে আজকে আপনি যেন আমাদের বাসায় আসেন।আপনার সাথে নাকি উনার জরুরি কথা আছে’
অর্নব কোমড়ে হাত রেখে বললো,’আপনার বাবা জানেন কি করে আমি আপনার ডিপার্টমেন্টের?’
-‘তা তো জানিনা।আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো অর্ণব নামের চতুর্থ বর্ষের কাউকে চিনি কিনা।তো আমি হ্যাঁ বলে দিলাম।এখন বললো আপনাকে বিকালে ইনবাইট করতে।বাসা চিনেন তো??’
অর্ণব মাথা নাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।জুথিকে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।তাই চুপ করে রইলো।জুথি ও বুঝতে পারলো অর্ণব ওকে সন্দেহের চোখে দেখছে।সে কিছু না বলে হাঁটা ধরতেই অর্ণব ওকে থামিয়ে বললো,’আমার পোস্ট থেকে হাহা রিয়েক্ট উঠিয়েছেন?”
জুথি দাঁত কেলিয়ে বললো,’নাহহহ’
এটা বলেই এক দৌড় দিয়েছে।
অর্ণব সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ওর চলে যাওয়া দেখলো।
-‘মেয়েটা এত নাছোড়বান্দা প্রথম দিনেই বুঝতে পেরেছি।কথা হলো পোস্ট গুলো মনে হয় ডিলেট করা ছাড়া হাতে আর কোনো উপায় নেই।মেয়েটা এত জ্বালাতন কেন করছে বুঝিনা।’
হঠাৎ নিচের তলার সিঁড়িতে ধপাস করে কারোর পড়ে যাবার আওয়াজ শোনা গেলো। অর্ণব কয়েকটা সিঁড়ি নিচে নেমে দেখলো জুথি পা ধরে বসে আছে।
তা দেখে মুখে এক গাদা হাসি ফুটিয়ে অর্ণব ওর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললো,’ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’
জুথির মেজাজ খারাপ হলো।উঠে গিয়ে হাতের ব্যাগ ছুঁড়ে অর্ণবের মাথায় মেরে দিলো।অর্ণব ব্যাগটা ধরে ফেলে ব্রু কুঁচকে বললো,’এই ব্যাগ আর আমি ফেরত দিচ্ছিনা’
মূহুর্তের মধ্যেই ব্যাগ নিয়ে চলে গেলো সে।জুথি রাগ নিয়ে দুপাশে তাকালো।
সবাই ওদের কান্ড দেখছিল।যখন হুশ আসলো তখনই ছুটলো সে তার ব্যাগের জন্য।ভার্সিটির বাহিরে এসে কোথাও অর্ণবকে পেলোনা।মিলিকে সাথে করে সোজা স্যারের কাছে নালিশ জানাতে গেলো।স্যার সবার আগে জিজ্ঞেস করলেন ঠিক কি কারণে অর্ণব এই কাজটা করলো।মৃদুল তখন স্যারের পাশে কাগজ গুছাচ্ছিল।সে বললো পুরো ঘটনাটা।
স্যার স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলেন সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি করলে এমনটাই হবে।এ ব্যাপারে তিনি মাথা ঘামাতে চাননা।সিনিয়র ভাইয়াদের সম্মান না করে ব্যাগ ছুঁড়ে মারা কেমন কথা??’
.
মন খারাপ করে রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতেই সামনে সেদিনের সেই ইন্টারে পড়া ছেলেটাকে আড্ডা দিতে দেখে ওর সামনে গেলো জুথি।জিজ্ঞেস করলো অর্ণবে দেখেছে কিনা।
ছেলেটা জুথিকে দেখেই চিনেছে।না চিনলে অর্ণবের ব্যাপারে কোনো তথ্যই সে কাউকে বলেনা।নিজের আপন বড় ভাইয়ার মতন দেখে অর্ণবকে সবসময়।সে বললো অর্ণব যেখানে থাকে সেখানেই গেছে।সিউরুিটি দিলোনা।
জুথি দেরি না করে সেদিকে ছুটলো।যে বাসায় অর্ণব ভাঁড়া থাকে সেটা একদম কাছেই।সেটার সামনে এসে অনেকক্ষণ সে ভাবলো যাবে নাকি যাবেনা।বাসা তিনতলায় বললো ঐ ছেলেটা।একা যাওয়া তো একদম ঠিক হবেনা তাই মিলিকে আসতে বলেছিল।সে ছবি তুলতে তুলতে আসতেছে ধীরে সুস্থে।শেষে বিরক্তি নিয়ে ওর হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে তিনতলায় উঠলো দুজন মিলে।কলিংবেলে দু তিনবার চাপার পরেও কেউ আসছেনা দেখে জুথি বারবার কলিংবেলে ক্লিক করছে।শেষে ওপাশ থেকে বিরক্ত স্বরে অর্ণব জবাব দিলো,’আসছি রে ভাই আসছি!’
দরজা খুলে দুটো মেয়েকে দেখে হাত দিয়ে গা ঢেকে বললো,’এটা কোন ধরনের ব্যবহার?ছেলেদের বাসায় আপনারা দুজন এসেছেন কেন?তাও এসময়ে?’
জুথি অর্ণবের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চেয়ে চেয়ে দেখছে।মিলি হাসতে হাসতে মুখ লুকিয়ে কটা সিঁড়ি নেমেও গেছে।জুথি চোখ বড় করে বললো,’আপনার গোসলের গুষ্টি,!!!আমার ব্যাগ ফেরত দেন বলছি নাহলে খুব খারাপ হবে’
অর্ণব ভেতরের রুমে চলে গিয়ে পুরনো পাঞ্জাবিটা আবার পরে ব্যাগ নিয়ে ফেরত এসে বললো,’এই আপনার ব্যাগ।তবে আমি দিচ্ছিনা।আগে আমার সব পোস্টের থেকে হাহা রিয়েক্ট সরান তারপর’
জুথি ফোন বের করে হাহা রিয়েক্ট একটা একটা করে উঠালো।সঙ্গে সঙ্গে অর্ণব ওর আইডিতে ব্লক দিয়ে তারপর ওর হাতে ব্যাগটা দিলো।জুথি বিড়বিড় করে কিসব বলতে বলতে মিলির সঙ্গে চলে গেছে।অর্ণব দরজা লাগিয়ে নিজের দিকে এক নজর তাকিয়ে দেখলো নিচে তোয়ালে পেঁচানো উপরে পাঞ্জাবি।কোন ধরনের স্টাইলে দুটো মেয়ের সামনে দাঁড়িয়েছিল তা ভেবে লজ্জা পেলো।এর আগে তাদের বাসায় কোনো মেয়ে আসেনি।ইনফ্যাক্ট তাদের নিজের রান্নাও করে একজন পুরুষ লোক।তাই রুমে এরকমই থাকা হয়।তাছাড়া এখন সে গোসল করছিল।গোসলের টাইম’
——
মিলি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।জুথি নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখে পেছনে তাকালো দালানটার দিকে।অর্ণবের প্রতি রাগ অনেক বেড়ে গেছে।কি করে এই রাগ যাবে তাই ভেবে মাটি থেকে ইটের একটা কণা তুলে অর্ণবদের বাসার বারান্দার দিকে ছুঁড়ে মারলো।প্রথমবার তিন তলায় যায়নি।কিন্তু দ্বিতীয়বার গেছে।সেখানে ছিল তপন।তার গায়ে গিয়ে পড়েছে।জুথি জিভে কামড়ে দিয়ে এক দৌড় দিলো।তপন হাত ঘঁষতে ঘঁষতে বললো,’কেরে??কার পাকা ধানে মই দিছিলাম?’
অর্ণব মাথা মুছতে মুছতে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো,’এটা ঐ ক্ষতির কাজ।আমার জানা আছে এমন দুষ্টামি ও ছাড়া আর কেউ করবেনা’
চলবে♥