লীলাবালি পর্ব-৮+৯

0
498

#লীলাবালি🌺
#পর্ব_৮
আফনান লারা
.
চাচির হাতে ফোন দেওয়ার সময় কুসুম খুব করে ভাবছিল ভবিষ্যতে যেটা হবে সেটা সে কি করে মেনে নিবে।ঠিক সেসময়ে হঠাৎ চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেলো।চোখ খুলতে কত সময় লেগেছে তা ওর অজানা।চোখ খুলতেই ভোরের আলো দেখতে পেলো সে।জানালার কাঁচ ভেদ করে ভোরের আলো দেয়ালে এসে লাগছে।উঠতে গিয়েও পারলোনা।হাতে ক্যানোলারের লম্বা দড়ি গিয়ে স্ট্যান্ডে ঝুলছে।কিসের যেন খচখচ আওয়াজ কানে আসলো হঠাৎ।মাথাটাকে একটুখানি তুলে পাশে তাকালো কুসুম।খয়েরী রঙের সুতোর পাঞ্জাবি পরা একজন হন্তদন্ত হয়ে ওয়ারড্রব হাতাচ্ছে।সেটারই শব্দ হচ্ছে।আচমকা পর পুরুষকে দেখে কুসুম লাফ দিয়ে উঠে বসলো।সামনের মানুষটা অর্ণব।তার লুঙ্গি খুঁজতেছে সে।কুসুম এখনও বুঝতে পারলোনা এটা কে হতে পারে।চুপ করে শুধু দেখছে।
অর্ণব লুঙ্গি নিয়ে পেছনে তাকাতেই কুসুমকে উঠে বসে থাকতে দেখে অন্ধকারে ভয় পেয়ে দেয়ালের সাথে লেগে গেছে।আবছা সব,ভোরের হালকা আলো তাও অন্যপাশে পড়েছে।মনে হয় বিছানায় কালো করে কি যেন!
তা দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বুকে থুথু দিয়ে লাইট জ্বালালো।কুসুম ও ভয় পেয়ে গেছিলো কিন্তু আওয়াজ করলোনা।
অর্ণব জোরে চেঁচিয়ে ফেলেছিল বলে পাশের রুম থেকে বাবা আর মা ছুটে আসলেন।বাবা এসে অর্ণবকে দেয়ালের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,’দেখলে তুমি সাগরের আম্মা?তোমার ছেলে আর কত নাটক দেখাবে?এই টুকুন একটা মেয়ে,এত সুন্দর তার চেহারা।আর সে এমন ভাব করছে যেন ভূত দেখেছে।ইচ্ছে করে ঢং করছে সে।আমি বুঝিনা এসব??’

অর্ণব বাবার কথা শুনে কুসুমের দিকে তাকালো।কুসুম ততক্ষণে বুঝে গেছে এটা অর্ণব।পিঠ দেখে চিনতে পারছিলনা প্রথমে।এখন চিনতে আর দেরি করেনি।লজ্জা পেয়ে ওড়না টানছে বারবার।অর্ণব কুসুমের দিকে একবার তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।মা এগিয়ে এসে বললেন,’আহা উঠলে কেন?সেলাইন দিয়েছে তোমায়।শুয়ে থাকো’

মা জোর করে কুসুমকে শুইয়ে দিলেন আবার।অর্ণবের বাবা এগিয়ে এসে বললেন,’দুইদিন ধরে কিছু খাওনি কেন তুমি?বাসায় এসে তো নাকি শুধু চা খেয়েছিলে।এরকম চাপা স্বভাবের হলে হবে?মুখ ফুটে বলবে তো যে বাড়ি থেকে কিছু খেয়ে আসোনি।আমরা কি করে জানতাম?
আর হুট করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে কেউ বেড়াতে আসে?এটা তো ঠিকনা।আমি তো ভাবলাম কি না কি হলো।হুট করে জ্ঞান হারানো তো ভাল লক্ষণ না।অনেক চিন্তায় পড়ে গেছিলাম।’

কুসুম দরজার দিকে তাকিয়ে থাকলো।যে মানুষটার জন্য এত অপেক্ষা ছিল আজ সে এত কাছে।
তার দেখা মিললো অথচ বিশ্বাস হচ্ছে না এখনও।সত্যি কি তিনি এসেছেন নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি?

অর্ণবের বাবা রুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন অর্ণব তাদের রুমে গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে চোখ বুজে।বাবা এক ধমক দিয়ে বললেন,’তুই কি করিস এখানে?’

-‘কি করবো?একটু ঘুমাতে শুইলাম।আমার রুমে তো ঐ…’

-“তো কি হয়েছে?যা ওর সঙ্গে একটু কথা বল।’

-‘আমি কিসের কথা বলবো?’

-‘যা খুশি বল যা।ভোর হয়ে গেছে আর কি ঘুমাবি তুই?আর নয়ত চল নামাজ পড়বি আমার সঙ্গে মসজিদে গিয়ে’

অর্ণব চললো বাবার সাথে।কুসুম চোখ বুজে ওর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছে।নামাজটা সেরে বাবা অর্ণবকে রেখে কোথায় যেন চলে গেছেন।অর্ণব অনেকদিন পর গ্রামের মাটিতে পা রেখেছে।একলা মনে হাঁটা ধরেছে সে।তার পুরনো কিছু বন্ধুবান্ধব মসজিদের পাশে কবরস্থানের পাশে বৈঠকখানায় বসেছিল।ওকে দেখে চিনে সবাই মিলে দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরলো।কজন তো কিল ঘুষি মেরে দিয়েছে অর্ণব আসতে এত দেরি করেছে বলে।
কুসুমের সেলাইন শেষ।ক্যানোলা খোলার জন্য ডাক্তার ডাকতে হবে অথচ অর্ণবের এখনও কোনো খবর নেই।বাবা ফোন হাতে নিলেন অর্ণবকে ডাকতে।তখনই সে এসে হাজির।

-‘কি নবাবজাদা! আবার ঢাকায় চলে গেছিলেন নাকি?নামাজ হইছে কয়টায় আর এখন কটা বাজে?কই ছিলি এতক্ষণ? এত বছর বনবাদাড়ে ছিলি! কোথায় বাপের পা ধরে বসে থাকবি তা না করে বাইরে বাইরে কি?কুসুমের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস?
আহারে!!যত ছলচাতুরী করোনা কেন।বিয়ে তোমাকে ঐ মেয়েকেই করতে হবে।
কুসুম যদি তোর ভাগ্যে থাকে যত কিছু করিস কোনো লাভ হবেনা।তুই যদি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়েও লুকাস ঐখানে তোর কুসুমের সাথে বিয়ে হবে। আমার কথা নোট করে রাখ।এখন যা ওর হাতের ক্যানোলা খোলার জন্য ডাক্তার ডেকে আন’

অর্ণব কাল রঙ করা সিমেন্টের পিলারের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বাবার লেকচার শুনছিল।হাই তুলে বললো, ক্যানোলা খুলতে ডাক্তার ডাকা লাগে নাকি?এটা তো আমিই পারবো’

-‘যে মেয়েকে দেখে ভয়ে দেয়ালে পিঠ লেগে গেছিলো তোর সেই মেয়ের হাত ধরে ক্যানোলা খুলবি তুই?উফ! সুপারি পাতার জন্য আজ সূর্যটা উঠছে কোন দিক দিয়ে তা দেখতে পারছিনা।সুমনকে ডেকে গাছগাছালি পাতলা করতে হবে’

মিশু চায়ের কাপ এগিয়ে ধরে বললো,’বাবা এমন করেন কেন?অর্ণব ছোট মানুষ বলে সবসময় বকবেন?কতদিন পরে এসেছে, কোথায় বাপ ব্যাটা মিলে গলা ধরাধরি করবেন তা না করে বকাবকি করছেন’

বাবা চশমা খুলে চেয়ারে আরাম করে বসে চায়ে চুমুক দিলেন।অর্ণব ভেতরে চলে গেছে।নিজের রুমে এসে দরজায় ঠাস করে হাত রাখলো।শব্দ শুনে কুসুম আচমকা ভয় পেয়ে উঠে বসে পড়েছে।বুকের ভেতর কাঁপছে।অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে বললো,’কি বলেছিলেন বাবাকে?’

-“আআআআআমি কিছু বলিনি’

অর্ণব এগিয়ে এসে ওর পাশে বসে খপ করে কুসুমের হাত ধরতেই ও নড়ে উঠলো।অর্ণব মাথা তুলে বললো,’ব্যাথা?’

-“না মানে….আপনি ওভাবে ধরলেন তো তাই একটু….’

-‘কিভাবে ধরলাম??হাত তো এমন করেই ধরে।একটু কি?’

-‘কাতুকুতু লাগে’

অর্ণব একটা একটা করে টেপ খুলছে।আর প্রতিটায় কুসুম কাঁপছে।ব্যাথায় নয় লজ্জায়।অর্ণবের গায়ের ঘ্রান নাকে এসে লাগলো তখন।
সে মাথা নিচু করে তার কাজে ব্যস্ত। কুসুম কাঁপা ঠোঁটে বললো,’হহহহহহহাতটা একটু ছাড়বেন?’

-“কেন?’

-“আমার কেমন যেন লাগছে।একটু পর হাত ধরিয়েন’

-“আর কত পর?আপনি নাকি কদিন ধরে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে বসে আছেন আমাদের বাসায় আসার খুশির ঠেলায়।এখন খাবার না খেলে আপনাকে নিয়ে তো আমায় ঢাকা যেতে হবে।আমার বাবা আপনার দায়িত্বকে আপনার বাবা মায়ের পরে আমার ঘাঁড়ে দিয়ে দিয়েছেন।শুলেন না রাত দেড়টার সময় আমায় ধমকিয়ে নিয়ে আসলো কুমিল্লায়।’

কুসুম মাথা নিচু করে ফেললো।তারপর আস্তে করে বললো,’আমি এখনও সে বিষয়ে কারোর সঙ্গে আলাপ করিনি’

-“আর করতে হবেনা।যা বলার আমি বলবো।আপনি কেমন বলতে পারেন তার নমুনা দেখা হয়ে গেছে।’

অর্ণব শেষ টেপটা ছুটিয়ে সুচের প্লাস্টিক ফ্রেমের জায়গায় আঙ্গুল রেখে বললো,’এভাবে কাঁপতেছেন কেন?এমন করলে আমারও হাত কাঁপবে’

-“আপনি একটু পরে করিয়েন।’

অর্ণব চোখ তুলে তাকালো কুসুমের দিকে।ওর দাঁতে দাঁতে ঘষা খাচ্ছে।কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে থুঁতনিতে এসে আটকে আছে।অর্ণবের এমন সময়ে খুব হাসি আসলো তাও হাসলোনা।হাসলে কুসুম আবার কি ভাবে।ব্রু নাচিয়ে বললো,’জানালায় একটা হলুদ পাখি’

কুসুম ঘাঁড় ঘুরিয়ে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে।তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে বললো,’কই জানালা তো বন্ধ।পাখি তো নেই’

অর্ণব মুচকি হেসে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগাতে লাগাতে বললো,’কাজ শেষ’

কুসুম হাতের দিকে চেয়ে রইলো অবাক হয়ে।অর্ণব চলে গেছে।হাতটাকে বুকে ধরে হাসলো সে।সকালবেলায় কি সুন্দর একটা মূহুর্তের সঙ্গে সে পরিচিত হলো।এই সকাল আজীবন মনে রইবে।যে মানুষটার ছোঁয়া এত ভালোলাগা সৃষ্টি করলো,অথচ আজকের পর হয়ত সেই মানুষটা থেকে দূরে যাবার কথা হবে।ঝগড়া হবে,মনমালিন্য হবে,রাগারাগি হবে।তারপর আমি আমার বাড়ি আর উনি অন্য কারোর অপেক্ষায়
চলবে♥

#লীলাবালি🌺
#পর্ব_৯
আফনান লারা
.
-‘বাবা শুনো!আমি এই বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারবোনা।আমাকে প্লিজ রেহায় দাও।’

বাবা রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে অর্ণবের দিকে ফিরে বসলেন।ডাইনিংয়ে ছিলেন তিনি।গম্ভীর গলায় বললেন,”ওর তো ষোল চলে নাহয় দু এক বছর পর ওরে বিয়ে করবি তুই।তখন তো সে আর বাচ্চা থাকবেনা।নাকি আরও কোনো সমস্যা আছে?পড়াশুনার দোহাই দিবিনা।বউরে দিয়ে তুই তো চাকরি করাবিনা।বউ তোর সংসার সামলাবে।তার জন্য হিসাব নিকাশ,অ,আ ই ঈ, ১.২.৩.৪.৫.৬ এগুলা তো তুই এক ঘন্টা ধরলেই শিখিয়ে নিতে পারবি।মাশাল্লাহ দিলে কুসুম যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। ওকে তুই একদিন শিখালে পরেরদিন সে নিজ থেকে পারবে।তাহলে আর কিসের সমস্যা তোর?
রুপে তো আছেই।খাটো ও না।আর কি চাই?নাকি অন্য কাউকে পছন্দ করিস।যদি করিস তবে তার নাম আমার সামনে নিবিনা।আমি তোকে বিয়ে করালে কুসুমের সাথেই করাবো তা নাহলে বউ নিয়ে বাসা ভাঁড়া নিয়ে থাকবি।আমার বাসায় আসবিনা’

বাবা অর্ধেক রুটে রেখেই চলে গেছেন।কুসুম দরজার কিণারায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।অর্ণব রেগে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে।কুসুমের কি মনে পড়ে সেও ছুটলে ওর পিছু।
দুপাশে সুপারি বাগান।আর মাঝে মাটির পথ।অর্ণব দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগোচ্ছে।কুসুম ওর সাথে এত দ্রুত যেতে না পেরে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বললো,’একটু থামুন’

অর্ণব থেমে পেছনে তাকালো।কুসুম ও দাঁড়িয়ে পড়েছে।অর্ণবকে চুপ থাকতে দেখে সে আস্তে করে এক পা দু পা ফেলে কাছে আসলো।অর্ণবের চোখ লাল হয়ে গেছে।পারছেনা কুসুমকে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছে।
কুসুম ভয়ে ভয়ে সামনে এসে বললো,’আমি চাচার সঙ্গে কথা বলবো আজ।
আপনি চিন্তা করবেননা।এই বিয়ে আমি হতে দেবোনা কিছুতেই।’

-‘বাবা আমার কথা শোনেন না।আপনার কথা শুনবেন কোন দুঃখে?’

-‘কারণ উনি আমাকে নিজের মেয়ের মতন দেখেন, যথেষ্ট স্নেহ করেন।আমার কথা নিশ্চয় রাখবেন।একটা চেষ্টা করতে তো ক্ষতি নেই”

কথা শুনে কোনো জবাব না দিয়ে অর্ণব অন্যদিকে ফিরে চলে গেছে।কুসুম ছুটলো অর্ণবের বাবাকে খুঁজতে।তিনি মসজিদের পাশের পুকুরঘাটে বসে ছিলেন।কুসুম তাকে পেয়ে সিঁড়িতে গিয়ে বসলো তারদিকে ফিরে।তিনি ওকে দেখে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন,’কি আর বলবো তোমায় মা!আমার ছেলে বোঝেনা যে আমি তার ভাল চাই।সে তোমায় বিয়ে করলে কত সুখী হবে তা বিবেচনা করেই তো আমি তোমাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।আর সে আমার কথা রাখলোনা।শুরু থেকে তার অমত দেখে আসছি।এরকম অমত দেখালে কি করে জোর করে বিয়ে দিই?
ভেবেছিলাম তিনটা বছর আমাদের ছেড়ে থেকে সে মন বদলাবে।আমাদের মায়া তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করবে।
তোমার বাবাকে কি জবাব দেবো তাই ভাবছি।তোমার এত ছোট বয়সে মন ভাঙ্গলো।আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাবো’

কুসুম একটা শুকনো পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে পানির দিকে চেয়ে বললো,’বাবাকে যা বলার আমি বলবো।আপনি ওসব ভাববেননা।তাছাড়া এই বিয়েতে আমারও মত নেই।উনি আনাকে পছন্দ করেন না।জোর খাটিয়ে যদি বিয়েও করেন না তিনি সুখী হবেন আর না আমি।
তার চেয়ে বরং তিনি যেমন করে জীবন যাপন করতে চান উনাকে সেটাই করতে দিন।আমার ভাগ্য হয়ত তিনি নেই’

অর্ণবের বাবা হাত দিয়ে চোখ মুছে চলে গেলেন।বাসায় এসে দেখলেন অর্ণব তার ব্যাগ গুছাচ্ছে।তার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার আর কটা দিন বাকি।তাকে চলে যেতে হবে।ঈদে আসতে পারে আবার না ও আসতে পারে।
বাবা কিছু না বলে তার রুমে চলে গেছেন।কুসুম দূরে থেকে অর্ণবের ব্যাগ গোছানো দেখছে।তার চোখে পানিতে টলমল করছে।তার জন্য একটা ছেলে তার বাবার সঙ্গে অভিমান করে এতবছর পর এসে আবার চলে যাচ্ছে।তার আর কি করা উচিত?কি করলে আর কারো মনে কোনো খুঁত থাকবেনা।
অর্ণব ব্যাগ নিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বাবার রুমের বাহিরে এসে বললো,’আমি যাই বাবা’

খালি হাতেই এসেছিল সে।বাসায় কিছু জামাকাপড় ছিল আজ সেগুলো ও নিয়ে নিলো।মা কাঁদছেন শুধু।ভাবছেন ও বুঝি আর ফিরবেনা।
অর্ণব চলে যাচ্ছে।কুসুম ছুটতে ছুটতে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বললো,’আমি আজ চলে যাবো।হয়ত আর কখনও আপনাকে দেখবোনা। আপনিও দেখবেন না।এখন আমি একটা জিনিস চাইলে দিবেন?’

অর্ণব জিজ্ঞেস করলো কি চাই।কুসুম ওর হাতের ব্রেসলেটের দিলে আঙ্গুল তুলে বললো,’এটা আমায় দিবেন?’

-‘এটা দিয়ে আপনি কি করবেন?’

-“এমনি চাইলাম।আপনার বেশি প্রিয় হলে দিতে হবেনা’

অর্ণব হাত থেকে ব্রেসলেটটা খুলে কুসুমের হাতে দিয়ে বললো,’খাওয়া দাওয়া ঠিক ঠাক করবেন আর ভালো থাকবেন।পারলে আমায় মাফ করে দিবেন।আমি আপনার যোগ্য না’

কথাটা বলে চলে গেলো সে।কুসুম যতদূর চোখ গেলো অর্ণবের চলে যাওয়া দেখলো।যেন বুকের ভেতরটার একটা দড়ি ঐ মানুষটার বুকের সঙ্গে জোড়া লাগানো।সে যাচ্ছে আর বুকে দড়িটার টান লেগে ব্যাথা করছে।
-‘কষ্ট হয়।তবে মানুষটা নিষ্ঠুর।আমায় তিনি চান না।দড়িটা কেটে ফেললেই তো পারেন।কেন এত বেদনা দেয়’

কুসুম মাটিতে বসে কাঁদলো অনেকক্ষণ।উত্তরের বাতাসে কান্না থামিয়ে চোখ মোছার সময় ঘাসের উপর অর্ণবের ব্রেসলেটটা দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে সেটাকে তুলে ওড়নার সাথে বেঁধে নিলো সে।আর কখনও এই মানুষটাকে নিয়ে সে ভাববেনা।মানুষটা তার নয়।শুধু শুধু আরেকজনের হক নিয়ে সে কেন স্বপ্ন দেখবে।এটা তো অন্যায়।
—–
ঢাকায় ফিরতে দুপুর হয়ে গেলো।সেই সকালে বেরিয়েছিল সে।ব্যাগ রেখে সোজা ক্লাসে চলে আসলো অর্ণব।বারোটার সময় তার ক্লাস শুরু।ভার্সিটিতে এসে ডিপার্টমেন্টে ঢুকার সময় জুথিকে দেখলো একটা ছেলের কান টেনে ধরে কিসব বলছে।বিষয়টা দেখার জন্য এগিয়ে গেলো সে।গিয়ে জানতে পারলো এই ছেলে নাকি জুথির চুল কেটে নিয়েছে তাবিজ করবে বলে, জুথি এটাই বললো।
কোনোরকমে জুথির থেকে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে অর্ণব তাকে প্রশ্ন করলো কেন সে চুল কেটেছে।

-“ভাইয়া শুনো আমি চুল ইচ্ছে করে কাটিনি।চুইংগাম খাচ্ছিলাম সেটা বেঞ্চে লাগিয়ে আমি ওয়াশরুমে গেছিলাম এই মেয়েটা বেঞ্চের সাথে হেলান দিয়ে ফ্যান দেখছিল বোকার মতন তাকিয়ে।তো তখন ওর চুলে চুইংগাম পুরোটা লেগে যাওয়ায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম তা দেখে।ভাবলাম আমাকে কাঁচা চিবাবে।ওর যা রাগ।তাই কেঁচি দিয়ে ঐ টুকুন কেটে নিছি।ওরে তাবিজ করবো কোন দুঃখে?
যে মেজাজ!!ওরে কে বিয়ে করবে?’

অর্ণব জুথির দিকে তাকালো।জুথি চোখ বড় করে বললো,’চুইংগাম ছুটাতে পারোনা ভাল কথা।আমাকে বললেই হতো।
তাই বলে আমার চুল কাটবে তুমি?স্যারের কাছে নালিশ করবো একদম।”

-“সরি বইন।মাফ করে দাও।আর জীবনে চুইংগাম খাবোনা।এই কানে ধরলাম।’

-‘চুইংগাম খাবানা কেন?অবশ্যই খাবা তারপর নিজের চুলে লাগাই দিবা,আমি আসি চুল কাটি দিব।তখন বুঝবে কত ধানে কত ভুষি।কত চাল সেটা বুঝতে হবেনা।অনেক খোসাতে চাল থাকেনা’

অর্ণব কপাল চাপড়ে চলে গেছে তার ক্লাসে।জুথির ক্লাসমেটরা ইনবক্সে অর্ণবকে শুধু নক দিয়ে জ্বালাচ্ছে। একজন বললো অর্ণব কাল রাতে যে অফলাইন হয়েছিল এখনও নেটে আসেনি।জুথি ওদের সবার কথা শুনে আর বাসায় গেলোনা।ভার্সিটিতে থেকে গেলো।অর্ণব ক্লাস থেকে বের হতেই জুথিকে দেখলো সে দেয়ালিকা পড়ছে কোণায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় আওয়াজ করে।কোনো কথা না বলে সে চলে যেতে নিতেই জুথি ছুটে এসে বললো,’আরে দাঁড়ান একটু”

-“কি চাই?’

-‘আমাকে প্লিজ আনব্লক করুন না ভাইয়া’

-“তারপর হাহা রিয়েক্টের বন্যা বসিয়ে দিতেন?দরকার নাই।’

-‘আচ্ছা হাহা দেবোনা।কোনো রিয়েক্টই দিবনা।প্লিজ আনব্লক করবেন?’

-“আপনাকে আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করিনা ‘

অর্ণব চলে গেলো।জুথি পিছু পিছু আসতে আসতে বললো,’যদি আনব্লক না করেন তবে ফেক আইডি খুলে আপনার আইডি যত সালে খুলছিলেন তত সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যত পোস্ট দিছেন সবগুলেতে হাহা মেরে আসবো’

অর্ণব থেমে গেলো।মেজাজ এমনিতেও খারাপ তার উপর মেয়েটা এত জ্বালাচ্ছে।ফোন বের করে আনব্লক করে পেছনে তাকিয়ে বললো,”শান্তি?’

জুথি দাঁত কেলিয়ে মাথা নাড়ালো।অর্ণব কিছুদূর গিয়ে আবারও পেছনে ফিরে বললো,’আপনি না আমায় সহ্য করতে পারেননা?তাহলে আনব্লক কেন করালেন?’

-‘শুনলাম অন্য মেয়েরা আপনাকে মেসেজ দেয়।আপনি নেটে নাই।তারা টেনসন করছিল।আমি তাই চাইলাম আপনার আইডিতে জায়গা পেয়ে আমিও টেনসন করবো’

জুথির কথাগুলো অর্ণবের সুবিধার লাগলোনা।যে মেয়ে তাকে একটুও পছন্দ করেনা সে কিনা এমন মিষ্টি কথা বলছে?ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট নেওয়া যাবেনা।আবার কি না কি করে বসে।আইডি ভর্তি রিলেটিভে ভরা।তার উপর সেরা সিঙ্গেল সিনিয়র ভাইয়া হিসেবে যে পদবী আমার আছে এই মেয়েটা এক সেকেন্ডে সেটা উল্টাই দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।এরে বিশ্বাস করা যাবেনা।নজরে নজরে রাখতে হবে”
চলবে♥