#লোভ
#পর্বঃ৭ (অন্তিম পর্বের প্রথম অংশ)
লেখনীতে: #সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী
“রেগে আছো কেন? কী হয়েছে? মাথা ঠান্ডা করে বসো একটু। নেও, ঠান্ডা শরবতটা খাও।”
বলতে বলতে শরবতের গ্লাসটা আরেকবার এগিয়ে দিলো মমতা। তোফাজ্জল আচমকা গ্লাসটা হাতে নিয়ে তীব্র তেজে ছু ড়ে ফেললো মমতার সামনের দিকটাতে। মুহূর্তেই কাঁচের গ্লাসটা ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে কত টুকরো হলো, কে জানে! স্বামীর বেপরোয়া রাগ দেখে কয়েকবার কেঁপে উঠল মমতা! ভীত চোখে আশপাশে তাকালো। থেমে নেই আজ তোফাজ্জলও। লোকটা ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে স্ত্রীর গ লা চে পে ধরে ফুঁসে উঠলো,
“বেয়াদব মহিলা!”
মমতা ত্রাসে জড়সড় হয়ে এলো। আশপাশে তাকিয়ে আবারও কাউকে খুঁজলো। এত চেঁচামেচি শুনেও তার হয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। দু’টো ছেলে-মেয়ে দু’জনই ঘরকুনো। মেয়েটা তো জগতের মাঝেই নেই বোধহয়। ছোট ছেলেটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। হারা’মজা’দা মোবাইল নিয়েই বোধহয় রুমে পড়ে আছে। জগতের কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি তার কানের পাশ দিয়েও যাবে না। অন্যদিন হলে মমতাও হম্বিতম্বি দিয়ে ফেলতো এতক্ষণে। কিন্তু এখন তার সময়টা বড্ড খারাপ যাচ্ছে। মমতা অজানা ভয়ে আরও একটু নরম হয়ে এলো। স্বামীর হাত ছাড়াতে ছাড়াতে কোমল গলায় বললো,
“অধরার আব্বু, শান্ত হও!”
তোফাজ্জল আরও ভয়ানক ক্রোধ নিয়ে স্ত্রীকে ঝাঁকুনি দিয়ে ফেলে দিলো। নিজের রাগ সংবরণ করতে পাশের টি-টেবিলটাতে লা থি মে রে চেঁচিয়ে উঠলো,
“তুমি আমাকে শান্ত হতে বলছো, মমতা? এরপরও তুমি আমাকে শান্ত হতে বলছো? আমার সম্মান তুমি কিছু অবশিষ্ট রেখেছো? রাখোনি! তোমার লোভের জন্য ব/’লিদা’ন দিলে আমার মেয়েটাকে!
তুমি কী ভাবছো, তোমার কুকী/র্তি আমি কিছু জানবো না?”
মমতা বাধাহীন চোখের জলস্রোত নিয়ে বললো,
“আমি আমার কাজের জন্য লজ্জিত, অধরার আব্বু। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, প্লিজ! এমন কিছু হবে, আমি বুঝতে পারিনি।”
“কেন বুঝতে পারোনি, কেন? তোমাকে আমি বারবার সতর্ক করেছি, মমতা। বারবার বলেছি, আমরা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মানুষ, আমাদের কাছে সম্মানটাই সবার আগে। তুমি নিজেকে সংবরণ করে নাও। আমরা এভাবেই ভালো আছি।
কিন্তু তুমি বড় লোভী মহিলা! তুমি কী করেছো? কী করেছো? তুমি কোনো মা? কোনো মা যেচে নিজের মেয়ের এত বড় সর্বনা/শ করে? আমি লোকসমাজে মুখ দেখাবো কী করে এখন? কী করে আমি আমার মেয়ের এই বদনাম ঘোচাবো?”
মমতা নিশ্চুপ। নিজেকে কেমন অসহায় লাগছে তার। নিঃশব্দে কেবল চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে। কী-বা বলবে সে? সেই মুখ কি তার আছে? এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, তার করা জগতের সব পাপ একত্রিত হয়ে তাকে চে পে ধরেছে, গি লে খেতে চাইছে! আর মমতা কোনো কূলকিনারা না পেয়ে পাপের সাগরে কেবল হাবুডুবু খাচ্ছে।
তার মধ্যে, একটু থেমে তোফাজ্জল উচ্চ কণ্ঠে আবারও বললো,
“শুধুমাত্র ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে আমি এতদিন সব সহ্য করেছি, অনেক সহ্য করেছি। কিন্তু আর না। আর এক মুহূর্তও না!
ওদের ভালো থাকার জন্য দিনের পর দিন আমি তোমার কাছে নত হয়েছি, তোমার উচ্চস্বরে করা অপমান সহ্য করেছি, তোমার রাগ, অভিমান, অন্যায়—সব চুপচাপ মেনে নিয়েছি। শুধু চেয়েছি, আমাদের সন্তানরা শান্তিতে থাকুক, ওরা সুখী হোক।
কিন্তু আজ আমার সেই আদরের মেয়েটা তোমার জন্য সব হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত অশান্তি আর লাঞ্ছনার আ’গুনে পো/ড়াবে ওকে!
আমার তো সব শেষ হয়েই গেছে। কিন্তু তোমার?
শোনো? তোমার আর আমার সংসারে থাকার কোনো অধিকার নেই, মমতা। তোমার মতো স্বার্থপর, জঘ’ন্য নারীকে আমি আর এক মুহূর্তও সহ্য করবো না।
আজই আমি তোমাকে ত্যাগ করবো! আজই আমি তোমাকে ডিভোর্স দেবো!”
ডিভোর্স… স্বামীর বলা “ডিভোর্স” শব্দটা কানে লাগতেই মমতার শ্বাস আঁটকে এলো। দুনিয়া ঘুরে এলো। এই বয়সে এসে ডিভোর্স? ভাবতেই মানুষটা বুক চেপে ধরে আত’ঙ্কে উঠলো,
“কী বলছো, অধরার আব্বু?”
তোফাজ্জল ভূঁইয়া প্রচণ্ড রকমের তেঁতে আছেন। অনর্গল ঘরের জিনিসপত্র ছোড়াছুঁ’ড়ি করে নিজের রাগ বিসর্জন দিচ্ছে। অফিস টাইমে লোকের বাঁকা দৃষ্টি আর ফিসফিসানি শুনে লজ্জায় তার মুখ লুকানোরও জায়গা হয়নি।
নেহাত লোকটা ভদ্রলোক, স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার মতো কাপুরুষ নয়। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে মমতার মতো মহিলাকে কয়েক ঘা বসিয়ে বেহুঁশ করে ফেলতো। কিন্তু উনি তা পারছেন না। তাই নিজের ক্ষো’ভ মেটাতে ঘরের ভেতর কালবৈশাখীর তাণ্ডব চালাচ্ছেন।
জগতের কোনো কথাই তার কর্ণগোচর হচ্ছে না। মমতা আর এক মুহূর্তও লোকটার সামনে দাঁড়ানোর সাহস করলো না।আলগোছে মেয়ের রুমের দিকে ছুটে গেলো। একমাত্র মেয়ের কথাতেই তোফাজ্জল ঠান্ডা হতে পারেন। মেয়েটা তার বড় আদরের!
মমতা দূর থেকেই মেয়েকে ডাকলো,
“অধরা? মা, দরজা খোল? দরজাটা খোল, মা?”
অপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না। মমতা দৌড়ে গিয়ে দরজায় ধা ক্কা দিলো। দরজা খোলাই রয়েছে। মা দ স্যু বালিকার ন্যায় মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপানো স্বরে বললো,
“তোর বাবা খুব রেগে আছে, অধু। ভেঙেচুরে সব শেষ করে ফেলেছে। তুই গিয়ে তাঁকে একটু আটকা, মা।”
হাঁটুতে মুখ গুঁজে বিছানার দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিল অধরা। তার কানে মায়ের বলা কিছু ঢুকলো কি-না বোঝা গেলো না। বরং মেয়েটা মা’কে দেখে কিঞ্চিৎ বিরক্তই হলো। চোখেমুখে একরাশ ক্ষো ভ মিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে সে বললো,
“বিরক্ত করো না তো, আম্মু…..”
মেয়ের আচরণে মমতা পুরোপুরি হতাশ হলো! আশাহত হলো! কী বলছে এই মেয়ে? মাথা গেছে ওর? এদিকে তার সংসার ভাঙতে চলছে, আর মেয়ে কি-না তাতে বিরক্ত হচ্ছে! এই দিনও তার দেখতে হলো? সে এতটাই খারাপ মা?
মমতা এবার বেশ শব্দ করেই কেঁদে উঠলো। হাউমাউ করে মেয়ের সামনেই হাঁটু ধ সে বসে পড়লো। কিন্তু তা কিছুই লক্ষ্য করছে না অধরা। সে ভাবছে অন্য জগত নিয়ে…
গতকাল থেকেই তুমুল ভাবে ভাবছে মেয়েটা। দুনিয়ার সবকিছু তার অসহ্য লাগছে। নিজেকে,মা’কে, ঘরদোরকে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার। যে প্রেম পেতে একসময় ব্যাকুল হতো মেয়েটা, আজ সেই প্রেম-ভালোবাসার প্রতিও এসেছে বিতৃষ্ণা! ভালোবাসা… এই ভালোবাসা, মোহ-মায়া পুঁষে কি পেলো সে? কিছু পেলো? শেষমেশ সবই তো গেলো। এরথেকে ইরফান ভাইয়ের কথা মেনে নিজেকে সংযত করলেই তো পারতো সে। লোকটা তো তাঁকে বারবার সতর্ক করেছেন। সেবারও বলেছেন,
“সময় থাকতে নিজেকে শুধরে নে, অধরা। বেহায়ামো করে নিজেকে আর ছোট করিস না। প্রত্যেক মানুষের ভেতরে অন্তত কিছুটা আত্মসম্মানবোধ থাকা উচিত, কিন্তু তোকে দেখে মনে হচ্ছে তোর ভেতর সেটাও নেই।
মানুষ তোকে পুতুলের মতো নাচাচ্ছে, আর তুই সেই ছকের খেলোয়াড় হয়ে যাচ্ছিস! তুই কি এতটাই বোকা? কেন এই পাগলামি করছিস? জোর করে কিছু হয় না, এটা বুঝতে পারছিস না? তোদের এই লোভের জন্য একদিন দেখবি তোরা সব হারাবি।
আমি আবারও স্পষ্ট করে বলছি অধরা—তোকে নিয়ে আমার কোনো অনুভূতি নেই। আমি অন্য একজনের প্রতি আসক্ত। শুধু আসক্ত না, তীব্র ভাবে আসক্ত!”
এতোটুকু ভাবতেই অধরা ভেতরের সত্বাটা কেমন আফসোসে আফসোসে দুমড়েমুচড়ে গেলো। মেয়েটা অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় দু’হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো,
“আপনার বলা কথা সত্যি হয়েছে, ইরফান ভাই। আমাদের লোভ আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। আমার আর শেষ হওয়ার কিচ্ছু বাকি নেই, কিচ্ছু না! হারানো এই যন্ত্রণা আমাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে, আজীবন….”
°
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের কাছাকাছি অবস্থিত ক্যাফ ২৪ পার্ক। দুপুরের রোদ যেন চারপাশকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে, গাছের পাতাগুলোও নিঃস্তব্ধ। পার্কে জনসমাগম কম, কেউ কেউ ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। তবে এই নীরবতা খানিকটা দূরে ভেঙে দিচ্ছে তিন উদ্দীপ্ত যুবকের প্রাণবন্ত উপস্থিতি।
লেফটেন্যান্ট ইরফান তালুকদার, আদনান আর জয়।
কঠিন এক মিশনের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে গতকাল রাতে তারা ফিরেছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবারের অভিযানে কোনো মায়ের কোল খালি হয়নি, কোনো পরিবার হারানোর বেদনায় কাঁদেনি। মিশন ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং, জীবন-মরণের সীমানায় দৌড়াতে হয়েছে, তবু এক মুহূর্তের জন্যও পিছু হটেনি সৈন্যদল। ক্লান্তি, কষ্ট—সব জয় করে বিজয়ের নিশান উড়িয়েছে।
আজকের দুপুরটা ওদের। মেজর বিশ্রামের অনুমতি দিয়েছেন, আর সেই অবসরটাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে তিন বন্ধু সিভিল ড্রেসে পার্কে এসেছে। তাদের টগবগে শরীরে বিশ্রামের সময় নেই—বরং শুরু হয়েছে এক মজার বাজি!
“পাঁচ মিনিটে কে সবচেয়ে বেশি পুশআপ দিতে পারবে?”
শর্ত একটাই—যে জিতবে, তাকে বাকি দু’জন আজ জমিয়ে খাওয়াবে।
ব্যস, প্রতিযোগিতা শুরু!
পার্কের এক খোলা জায়গায় প্রথমে আদনান, তারপর জয় পুশআপ শেষ করল। এবার পালা ইরফানের। রোদের উত্তাপ উপেক্ষা করে সে গভীর শ্বাস নিল, শরীর টান টান করল, মাটি স্পর্শ করে প্রথম পুশআপ দিল।
সময় চলছে।
জয় ও আদনানের চোখে উত্তেজনা, মুখে চ্যালেঞ্জের হার-জিতের ছাপ।
তারা গুনছে—১… ২… ৩… ৪…
হঠাৎ করেই ওদের সংখ্যা গোনা বন্ধ হয়ে গেল। একটা রিনরিনে, মেয়েলী কণ্ঠ বাতাসে ভেসে এল—
“হায়, হ্যান্ডসাম!”
বন্ধুরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। পরমুহূর্তেই তারা ইরফানের দিকে তাকিয়ে কেমন কেমন করে হাসলো। সামনে থাকা মেয়েটিকে কিছু একটা ইশারা করে ওরা দু’জন দ্রুত সরে-ও গেলো।
অপ্রত্যাশিত, মেয়েলী কণ্ঠে ইরফানও স্থির হয়ে গেল, হাতের ভর দিয়ে সামান্য উঠে তাকাল—কে বলল এটা? মুহূর্তেই, তার সামনে দাঁড়ানো হাসি-হাসি মুখের মেয়েটিকে এখানে দেখে সে-ও কিছুটা অবাক হলো। কিন্তু, তা আর মুখে প্রকাশ করলো না। বরং ছেলেটা স্বভাবসুলভ গম্ভীর অবয়বটা বজায় রেখেই, হাত ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালো। সামনের মেয়েটার দিকে আর একবারও না তাকিয়ে শুধালো,
চলবে….
#লোভ
#পর্বঃ৮ (অন্তিম পর্বের দ্বিতীয় অংশ)
লেখনীতে: #সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী
“সিদরা তুই? এখানে কি করছিস?”
সামনের মেয়েটা অকপটে দুষ্ট হেসে দাঁত বের করে শুধালো,
“আপনাকে দেখতে এলাম, লেফটেন্যান্ট সাহেব।”
ইরফান ভ্রু বাঁকিয়ে বিরশ মুখে মেয়েটাকে একবার আগাগোড়া পরখ করে নিলো। চোখের দৃষ্টি তার স্বাভাবিক অথচ কোথাও যেন একটু ক্রোধ লেপ্টে আছে। ইরফানের চোখেমুখে বিরক্তি ভাব দেখে সিদরা খানিকটা শুকনো ঢোক গিললো। এরপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বললো,
“বাবার সাথে দেখা করতে এসেছি, ইরফান ভাই।”
ইরফান আগের মতো করেই বললো,
“একা এসেছিস?”
সিদরা মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ” বোঝালো। ইরফানের বিরক্তিতে কপালে চারটা ভাজ পড়লো। এই মেয়েটা এতো কেয়ারলেস! এতো বোকা! একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের প্রকাশ্যে, গোপনে কতো শত্রু থাকে! যদি ওর কিছু হয়ে যেতো। ইরফান আর নিজেকে বেশিক্ষণ দমিয়ে রাখতে পারলো না। ধমকে উঠলো,
“একা কেন এসেছিস?”
সিদরা কিছু বলতে পারলো না আর। এরমধ্যে পেছন থেকে শোনা গেলো শাহেদ ইলিয়াসের গম্ভীর কণ্ঠ,
“কী ব্যাপার, লেফটেন্যান্ট? তুমি আমার মেয়ে’কে ধমকাচ্ছ যে!”
ইরফান চাচার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে শুধালো,
“আপনার কেয়ারলেস মেয়ে’কে যে দু’টো থা’প্পড় দেইনি এটাই ঢেরবেশি!”
শাহেদ ওর দিকে ক’টমট চোখে তাকালো। কিছু বলবে তার আগেই সিদরা এসে বাবা’র বুকে ঝাপিয়ে পড়লো। আদুরে স্বরে ডাকলো,
“বাবাআআ?”
মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো, শাহেদ। আলতো হাতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বাবাও ডাকলো,
“মা!”
বাবা’র আদুরে স্পর্ষ,মিষ্টি স্বরে “মা” ডাকটা শুনে সিদরার আরো একটু গদগদ করে নিজেকে বাবা’র সামনে উপস্থিত করলো। শাহেদ মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফের বলল,
“তুমি একা কেন আসতে গেলে, মা?”
“আজ আমি নিজ হাতে কাচ্চি রান্না করেছি, বাবা। এটাই আমার হাতে করা প্রথম রান্না আর তুমি খাবে না, তাতো হয় না। তোমার তো আর বাসায় যাওয়ার সময় হয় না, তাই আমিই চলে এলাম।”
মেয়ের কণ্ঠে প্রথম রান্না নিয়ে আগ্রহ, কিছু অভিমান। যা দেখে হাসলো, শাহেদ। মেয়ের হাত ধরে, তার সঙ্গে সাথে কথা বলতে বলতে একটা ক্যাফের দিকে এগুলো। সিদরা বাবার সঙ্গে হাঁটলেও তার দৃষ্টি পার্কের আশপাশটায়। তার চোখ দু’টো খুঁজে চলছে একটা পরিচিত যুবককে। গেলো কই লোকটা? এতক্ষণ তো এখানেই ছিলো।
মেয়ের উদ্বেগ দেখে মুচকি হাসলো, শাহেদ। খানিকটা গলা পরিষ্কার করে আচমকা মেয়ে’কে বললো,
“কাচ্চি কি শুধু আমার জন্যই এনেছো, মা? আর কারো জন্য আনোনি?”
বাবা’র রসিকতা বুঝতে অসুবিধা হলো না, সিদরার। মেয়েটা খানিকটা লজ্জাও পেলো। সেভাবে মিনমিন করে বললো,
“ইরফান ভাইয়ের জন্যও এনেছি।”
শাহেদ আবারও মুচকি হাসলো। পিছনে তাকিয়ে ইরফানকে ডাক দিলো,
“আমার সঙ্গে এসো, বেয়াদব ছেলে!”
ইরফান ওদের বাবা-মেয়ের কথার মাঝখান থেকে সরে গিয়ে কেবলই একটা বেঞ্চিতে বসছিলো। আর আশেপাশটায় খুঁজে চলছিলো দুই বন্ধুকে। হা’রামি গুলো আর ভালো হলো না। বন্ধুকে বিপদে রেখে কেমন ভেগে গেলো! ম’রতে গেলো কোথায়? আশপাশটায়ও তো নেই। এরমধ্যে, চাচার অদ্ভুত ডাকনাম শুনে সেদিকে একবার অনিচ্ছা নিয়ে তাকালো। পরপর খানিকটা বেপরোয়া ভাবে হাত-পা মেলে দিয়ে বেঞ্চে আরাম করে বসলো। বললো,
“আমি এমুহূর্তে ছুটিতে আছি, কর্নেল সাহেব। কারো অপ্রয়োজনীয় কথা শুনতে বাধ্য নই!”
ছেলেটার বেপরোয়া ভাবসাব দেখে শাহেদ ইলিয়াস কটমট কণ্ঠে বললো,
“তুমি যতদিন এই পেশায় থাকবে ততদিন তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য, ইরফান তালুকদার। হারি আপ অ্যান্ড কাম উইথ মি, লেফটেন্যান্ট। দ্যাটস অ্যান অর্ডার।”
ইরফানের মধ্যে কোথাও যাবার তাড়া নেই। বরং সে নিজের জায়গাটায় আরেকটু আরাম করে বসলো। চাচার কথা তার কান অব্ধি পৌঁছালো কি-না তাও বোঝা গেলো না। শাহেদ ইলিয়াস নিজের কথা শেষ করে আর ওর ভরসাতে দাঁড়িয়ে থাকলো না। মেয়ে’কে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো। সিদরা বাবা’র সঙ্গে হাঁটলেও তার মনটা বরং পুড়ছে। উনি কি আসবে না? সিদরা তো তার পছন্দের কাচ্চিই রেঁধে ছিলো। কতোটা আগ্রহ নিয়ে এখানে এসেছে সে। লোকটা কি ওর রান্না একবার টেস্ট করবে না? তার মুখে একটু প্রশংসা শুনলেই তো সিদরার জীবন ধন্য। কিন্তু, চাপা স্বভাবের মেয়েটা বাবা’র সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে আর কিচ্ছু বলতে পারলো না। বারকয়েক পিছনে তাকিয়ে আওড়াল,
“আপনিও আসুন না, ইরফান ভাই! ”
°
পার্কের এক কর্ণারের ক্যাফে বসে আরাম করে সি’গারেট ধরিয়ে টানতে ছিলো, আদনান ও জয়। সেই সঙ্গে দুই বন্ধু ইরফানকে নিয়ে মজা মারছিল।
হালকা বাতাসে চারপাশটা বেশ শান্ত লাগছিল। হঠাৎ দূর থেকে কর্নেল ও তার মেয়ে’কে আসতে দেখলেন ওরা। মুহুর্তেই দু’জন হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। আদনান জয়কে তাড়া দিয়ে বললো,
“মামা দৌড় দে।”
জয় হতাশ কণ্ঠে বললো, “উপায় নেই, মামা। স্যার আমাদের দূর থেকেই লক্ষ্য করছেন, এখন দৌড় দিলে ব্যাপারটা ভালো হবে না। দাঁড়া কিছুক্ষণ।”
ছটফট স্বভাবের আদনান এতটুকুতেই বিরক্ত হলো।
“এই ইরফাইন্নার শ্বশুরটা যখন-তখন আসে কই থেকে? দেখা গেলো, আমার বন্ধুর রোমান্সের মধ্যেও এই শ্লায় এসে বলবে “দ্যাটস অ্যান অর্ডার”।
জয় ওকে হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বললো। এরমধ্যে, কর্নেল চলে এলো ওদের কাছাকাছি ।
সামরিক নিয়ম অনুযায়ী ডিউটির বাইরে স্যালুট বাধ্যতামূলক না হলেও, ওরা দু’জন ভদ্র বাচ্চাদের মতো তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সম্মানসূচক মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন,
“গুড আফটারনুন, স্যার!”
কর্নেল হালকা হাসলেন, মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলেন,
“এনজয়িং ইয়োর টাইম, লেফটেন্যান্ট’স?”
ওরা বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন,
“ইয়েস, স্যার।”
কর্নেল মেয়ে’কে নিয়ে এগিয়ে গেলেন পাশের টেবিলের দিকটাতে। আদনান আর জয় একটু একটু করে ওখান থেকে কেটে পড়ছিলো। তান্মধ্যে, ওখানে এলো ইরফান। ইরানকে দেখেই কিছু একটা ইশারা করে দাঁত বের করে হাসলে, আদনান। ইরফান চোখ কটমট করে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকটাতে। ওদের কিচ্ছু বললো না আর। নিরবে গিয়ে সে বসলো সিদরার মুখোমুখি। আচমকা মানুষটাকে দেখে, সিদরা মেয়েটার এতক্ষণের আমসি মুখটা চকচক করে উঠলো। সে চকচকে হাসিটাও চোখ এড়ালো না ইরফানের। সিদরা হাসি-হাসি মুখে নিজের ক্যারি করা খাবার বের করতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। আদনান জয়কেও ডাক দিলো,
“ভাইয়া, আপনারাও আসুন?”
আদনান ও জয় এতে তীব্র অস্বস্তিতে পড়লো। কারো পারসোনাল আড্ডা ও খাবারদাবারে ভাগ বসানো অনুচিত। ওরা আমতা আমতা করে বলছিল,
“তোমরা এনজয় করো, আপু। আমাদের একটু তাড়া আছে, আমরা আজ আসি তাহলে।”
কিন্তু সিদরা ওদের ছাড়লো না। ওদের অস্বস্তি বুঝতে পেরে বললো,
“আমি খাবার বেশি করেই নিয়ে এসেছি। সমস্যা হবে না, আপনারাও আসুন ভাইয়া।”
আদনান ও জয় ওর অনুরোধ আর ফেলতে পারলো না। ওরা দু’জন গিয়েও বসলো। কর্নেল সাহেব ওয়াটারকে ডাক দিয়ে আরো কিছু খাবার-দাবার অর্ডার করলো, সিদরা নিজের সঙ্গে আনা কাচ্চি সবাইকে বেড়ে দিলো। মূহুর্তেই জমজমাট হলো খাবার টেবিল।
মেয়ের হাতের রান্না বেশ আরাম করে খেলো, শাহেদ ইলিয়াস। খেতে-খেতে প্রশংসাও করলো। তার সঙ্গে তাল মিলালো, আদনান ও জয়। কিন্তু, পুরোটা সময়ই ইরফান ছিলো নিশ্চুপ।
এরমধ্যে, শাহেদের ফোন এলো। ইমার্জেন্সি কল, এক্ষুনি তাকে হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে। মানুষটা আর বসতে পারলো না। মেয়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে ইরফানকে বলে গেলো,
“আমার মেয়ে’কে বাসায় পৌঁছে দিও, লেফটেন্যান্ট।দ্যাটস অ্যান অর্ডার।”
ইরফানের প্রত্যুত্তর শোনার অপেক্ষা করলেন না, শাহেদ ইলিয়াস। গটগট পায়ে জায়গা ছাড়লো। তার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদনান, জয়ও উঠে দাঁড়ালো। ওদের দু’জনকে একান্ত কিছু সময় দিবার জন্যই বললো,
“আমাদের একটু তাড়া আছে, ইরফান। আমরাও যাই!”
ইরফান স্বাভাবিক ভাবেই বসে রইলো। ওদের কথার প্রত্যুত্তর করলো না। ওদের তাড়া-ফাড়া সম্পর্কে সে জানে। ওদের হালচাল বুঝতে তার অসুবিধা হয়নি। জয়, আদনান আর দাঁড়ালো না। আর কেউ না জানুক, তারা তো জানে বন্ধুর গভীর অনুভূতি!
চলবে…..