শূন্যেরে করিব পূর্ণ পর্ব-০৫

0
226

#শূন্যেরে_করিব_পূর্ণ (পর্ব ৫)
নুসরাত জাহান লিজা

শ্রাবণী একটা তাঁতের শাড়ি পরেছে, গাঢ় লাল রঙের। ভীষণ মিষ্টি লাগছে দেখতে। তবে মুখে হাসি নেই এক বিন্দু। রাগও নেই। কিন্তু অদ্ভুত কাঠিন্য ফুটে আছে। এমন মিষ্টিমুখে কাঠিন্যও চমৎকার লাগছে। মিরান মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে। স্থান, কাল, পাত্র তার কাছে যেন মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়ে গেছে।

“হিমু বুঝি মেয়েদের দিকে এভাবে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায়? নকল হিমু তো এখানেই বোঝা যায়!”

এবার মিরানের সম্বিৎ ফিরল, তবুও ঝট করে চোখ নামিয়ে নিতে পারল না। খানিকটা সময় লাগল নিজেকে ধাতস্থ করে নিতে। এরপর গলা খাঁকারি দিয়ে উত্তর দিল,

“হিমু হতে চাইলেই বুঝি হওয়া যায়?”

“তাহলে হার মানছো?”

“আরও দু’দিন বাকি।”

“বেশ। খুব ভালো। তবে ওদের কিছু আবদার আছে তাদের ছোটকার কাছে।”

মিরান এবার দেখল শ্রাবণীর পাশে হাসিমুখে সৌম্য আর সূচি দাঁড়িয়ে আছে।

“ছোটকা, চলো, আমরা আজ হিমুর মতো মাঝরাতে হাঁটতে যাব বাইরে। আন্টি বলেছে আজ পূর্ণিমা।”

সৌম্যর কথায় মিরান নিজের চশমাটা খুলে মুছে আবার পরে নিয়ে বলল, “আমি তো সত্যিকারের হিমু নই বাবা।”

“কিন্তু তুমি তো বলেছ তুমি সত্যিকারের হিমু হতে চাও।”

মিরানের মনে পড়ল আগামীকাল অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্স আছে। তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। হিমুর কোনো পিছুটান নেই। কিন্তু ওর শক্ত পিছুটান আছে।

সে সৌম্যকে আদর করে সূচিকে কোলে নিয়ে বলল, “আচ্ছা, এখন চল তোরা। সামনের গলি দিয়ে হেঁটে আসি।”

সূচি বলল, “আন্টিও যাবে।”

“আচ্ছা।”

“ঘরটা এমন এলোমেলো করে রাখো কেন? এখানে মানুষ থাকতে পারে? আজ আমি গুছিয়ে মনুষ্য বসবাসের উপযোগী করে দিয়েছি।”

“আমি না-মানুষ বোধহয়। তাই থাকতে পারি।”

নিরস গলায় বলতে বলতে নিজের ঘরটা একবার অবলোকন করল। চিনতে কষ্ট হলো। ঝকঝকে পরিষ্কার করে গুছিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। যত্নের ছাপ ফুটে আছে যেন প্রতিটি কোণে। মিরানের মনে হলো এই যত্ন পাবার অধিকার তার নেই।

***
মিরান সূচিকে কোলে নিয়ে সৌম্যর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। পাশ থেকে শ্রাবণী সৌম্যের অন্য হাতটা ধরে আছে। মিরানের মনে হলো শ্রাবণীর সাথে তার সংসার হলে এমন দুটো ছোট্ট দুষ্টু মিষ্টি বাচ্চা হতো। তখন তারা এভাবে প্রতি পূর্ণিমার ভরা জোছনায় রাস্তায় নেমে আসত। জোছনার জলে অবগাহনে মেতে উঠত। কী বিচিত্র মনোমুগ্ধকর একটা জীবন হতে পারত। একবুক দীর্ঘশ্বাস জমল নিজের অপূর্ণতায়।

বাইরে তখনও লোকের আনাগোনা আছে৷ সবে দশটা আটচল্লিশ বাজে। চারপাশে লোকারণ্য সত্বেও তারা চারটা প্রাণী যেন অন্য জগতে বিচরণ করছে। আশ্চর্য মায়াময় মনে হচ্ছে সময়টাকে। পুরোটা সময়কে দৃষ্টি থেকে হৃদয়ে বসিয়ে নিচ্ছে মিরান। পরবর্তী সময় কেবল এই দেখার স্মৃতিগুলোই হয়তো ওর একমাত্র সম্বল হবে। কে জানে! এমন স্মৃতিময় রাত এক পৃথিবী মায়া নিয়ে মিরানের জীবনে হয়তো আর কোনোদিন আসবে না! হয়তো আসবে সে জানে না!

“মিরান, একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে? মিথ্যে বলবে না৷ এই সুন্দর রাত মিথ্যায় কলুষিত কোরো না।”

“বলো।” সভয়ে বলল মিরান।

“তুমি বিয়ে করতে চাইছ না কেন? তোমার কোনো সমস্যা থাকলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারো। হিমু হতে চাও, এই ধরনের আজাইরা গল্প আমাকে শুনিও না। কী ঢাকতে চাও বলো তো?”

মিরান থমকে দাঁড়ালো রাস্তায়। শ্রাবণী ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে। ওর ঘর গোছাতে গিয়ে কিছু দেখে ফেলল না তো! যা সে লুকিয়ে রেখেছে সবার কাছ থেকে! অস্থিরবোধ করছে মিরান। আচমকা যেন শ্বাসরোধ হয়ে আসতে চাইল ওর।

এজন্যই এতটা নমনীয় হয়ে ওর সাথে কথা বলছে শ্রাবণী। সহানুভূতি দেখাতে চাইছে! সে সহানুভূতি চায় না!
……