শেষ বিকেলে তুমি আমি পর্ব-২৭ এবং শেষ পর্ব

0
709

#শেষ_বিকেলে_তুমি_আমি
#আলিশা_আঞ্জুম
#শেষ_পর্ব ( প্রথমাংশ)

রোদে উজ্জ্বল দিন হলো আজ। তাপটা সহনীয়। একে একে দশটা রোজা ফুরিয়ে গেছে। আজ স্মরণকে রিলিজ দেওয়া হবে। একদিন আমার বাসা থেকেই দৌড়ঝাঁপ করলাম। ছোঁয়াও আমার কাছেই থেকে গেলো। স্মরণের সাথে আমার সম্পর্ক হয়ে উঠলো এ’কদিনে অনেকটাই সহজ। তবে মাঝে মাঝে তার কিছু একটা হয়। হুটহাট বলে বসে,

” খেয়া, ইউ সুড গো। আমার নিজেকে সেলফিশ সেলফিশ লাগে। ”

স্বাভাবিক ভাবেই আমার মেজাজ সপ্ত আসমানে চড়ে বসে। কখনো রেগে তার সামনে থেকে চলে আসি। কখনো বলি, আমি ভালোবাসি বলে ভালোবাসার মানুষের পাশে আছি। এখানে আপনার নিজেকে সেলফিশ ভাবার তো কোনো কারণ নেই? স্মরণ চুপসে যায়। নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে।

.
সব গুছিয়ে নিয়ে সকলে প্রস্তুত। বাবা ব্যাস্ত রিলিজ হওয়ার আগ মুহূর্তে টাকা দিতে। ছোঁয়া ব্যাস্ত অঙ্কনের সাথে এতো এতো রুগী পরিদর্শন করা নিয়ে। মোট পাঁচ দিন হসপিটালে থাকতে হলো স্মরণের। এমন একটা দিন ছিলো না যে ছোঁয়া আসেনি। এসে স্মরণের পাশে বসেছে কম, অঙ্কনের গলায় ঝুলে থেকেছে বেশি। তার দারুণ কৌতুহল ডাক্তারদের ছুড়ি, কাচি, অস্ত্রর প্রতি।

স্মরণ মোটামুটি প্রস্তুত বাসায় যাওয়ার জন্য। হাঁটা চলা করা নিষেধ বিধায় সে হুইল চেয়ারকে সঙ্গী করেছে বিষন্ন মনে। একজন নার্স চেয়ার ঠেলে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলো। চলে যাচ্ছে সে। আমি এই রুমের দরজার নিকট দাড়িয়ে আছি। স্মরণ যখন দরজার খুব নিকটে পৌঁছালো তখন হঠাৎ স্থির করতে বললো গতিময় চেয়ারটা। বিণাবাক্যে শান্ত চোখে এক হাত বাড়িয়ে দিলো আমার উদ্দেশ্যে। বুকটা ধ্বক করে উঠলো আমার। আবার কিছুটা লজ্জা ঠাঁই পেলো মনের মাঝে। আড়চোখে নার্সটার দিকে তাকালাম। ওমনি যেন মেয়েটা আমার মনের অবস্থা বুঝে চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। স্মরণ তখন ভীষণ ভাব নিয়ে বলতে ব্যাস্ত

— এবারও কি রিজেক্ট করবে?

আমি হেসে উঠলাম। তবে ভাব নিতে ভুলে বসলাম না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম

— এতোটা সস্তা নয় খেয়া। ভালোবাসি বলে সবকিছু করতে পারবো না। নেভার।

— আমিও কম কিসে? এবার রিজেক্ট করলে এই যে হাত গুটিয়ে নেবো আর বাড়িয়ে দেবো না। সোজা বাসায় গিয়ে আরেকটা বিয়ে করে সংসার করবো।

আমি হতভম্ব হলাম স্মরণের কথা শুনে। বলে কি এই লোক? খপ করে তার গুটিয়ে নিতে চাওয়া হাতটা ধরে ফেললাম। বেশ রেগেই বললাম

— বেশ সাহস তো আপনার? জেনে রাখুন আপনার এপাড়ের বউটা মোটেও সুবিধার নয়। আমি অথৈয়ের মতো কিছুতেই বলবো না আমি মরলে আপনি বিয়ে করবেন। আর আমি বেচে থাকতেই আপনি বিয়ে করতে চান? মাথা ফাটিয়ে দেবো একদম।

— নাহ! বাদ দাও। এতো ভাবওয়ালী মেয়ের সাথে…. উহু! তার ওপর আমি বাচ্চার বাবা। তোমার সাথে আমার যায় না হয়তো। আমি না হয় আমার একটা বেস্ট ফ্রেন্ড আছে ওকে বিয়ে করে নেবো। ও আমাকে আগে থেকেই আবার পছন্দ করে। আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা ভালো হবে।

আমি বেজায় রেগে গেলাম এপর্যন্তে। বুকে অসহ্য এক ব্যাথা নাড়া দিয়ে উঠলো। বাজখাঁই গলায় বললাম

— কই আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড দেখি ডাকেন। অসুস্থ হলেন একবারও তো সেবা করতে এলো না। এই শুনুন, রেগে যাচ্ছি আমি এখন। আমাকে রেগে দেবেন না ওকে? চার বছর হলো ভালোবাসি। মাঝখানে ভুলেই গেছিলাম প্রায় তারপর হুট করে বিয়ে করে আনলেন। তারপর আমার হার্টের ওপর অনেক অত্যাচার করেছেন। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম চলে যাবো। তারপর আবার আপনি….

— আমি ভালোবাসলাম। তারপর আপনি আমার হার্টের ওপর অত্যাচার শুরু করলেন। কেন গো? আপনারা দুই সতিন কি শুধু আমার প্যানিক অ্যাটাকের কারণই হতে পারেন? আমার চিরস্থায়ী সুখের কারণ হতে পারেন না?

আমার রাগ আচমকা ধুপ করে যেন মাটিতে পতিত হলো। দেহ মন শান্ত হলো চোখের পলকে। স্মরণ আমার হাতটা আগের তুলনায় একটু শক্ত করে ধরতেই যেন আমার ভেতর হতে কিছু কথা ছুটে বাইরে চলে এলো

— আমি তো সেদিন থেকেই চেয়েছি আপনার সাথে সারাজীবন পার করতে। যেদিন জেনেছি আপনিই আমার মনের মানুষ।…… তবে ওভাবে গুরুত্বহীন হয়ে থেকে যেতে চাইনি। আমিও একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম। এখন যখন আপনি বলছেন আমি আপনার প্রিয়জন প্রয়োজন দু’টোই তখন আমি আর আপনার প্যানিক অ্যাটাকের কারণ হতে চাই না।

— সরি আমরাও লুকিয়ে আপনাদের ভালোবাসা দেখতে চাই না। হসপিটাল যে প্রেমের জায়গা এটাও জানতাম না। সরি এগেইন।

হঠাৎ তৃতীয় ব্যাক্তির কন্ঠস্বর কনে এলো। আমি চমকে উঠে স্মরণের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। সামনে তাকাতেই নজরে বন্দী হলো প্রিয়া, নীলিমা, শান্ত আর সজিব। ইশ! কি লজ্জার বিষয়! প্রিয়া কথাগুলো বলেই মিটিমিটি হাসতে ব্যাস্ত। স্মরণ যেন আমার চাইতেও দু’ধাপ ওপরের অস্বস্তি নিয়ে বসে রইলো। হুটহাট তার শুরু হলো কাশি। আমিও সুযোগ বুঝে তার চেয়ার টেনে ফ্রেন্ড নামক ভয়ংকর মানুষগুলোকে পেছন ফেলে একরকম পালিয়ে যেতে চাইলাম। পথে শুরু করে দিলাম আজ স্মরণের সাথে মিষ্টি ঝগড়া।

— আপনি একটা সভ্য ছাড়া লোক। বেসভ্য!

— আজব! আমি কি করলাম। তোমারই তো প্রেম প্রেম পাচ্ছিলো।

— কিন্তু আপনি আগে প্রেম প্রেম কথা বলা শুরু করেছিলেন।

.

সেদিন এক মিষ্টি ঝগড়ার পর স্মরণের সাথে আবারও এই বাড়িতে আসা। তবে একটু ভিন্নভাবে। মুখে হাসি নিয়ে। তারই চাওয়াতে।

স্মরণের বেডরুম এখন আমার কারণেই উজ্জ্বল থাকে। অথৈয়ের শাড়িগুলো আমি ছুয়ে দেখে আমিই রেখে দিয়েছি আলমারির অন্য তাকে। যে অথৈকে কেন জানিনা সম্পর্কের শুরুতে দেখার জন্য ভীষণ আগ্রহী ছিলাম সেই অথৈয়ের ছবি স্মরণ নিজে আমাকে দেখিয়েছে। আমার মাঝে মাঝে স্মরণের প্রতি ভীষণ ভালোলাগা কাজ করে। মন থেকে সম্মান আসে। প্রথম ভালোবাসা সত্যিই ভোলার মতো হয় না। স্মরণ যে খুব সহজে আমাকে মেনে নেয়নি এটা প্রমাণ করে মানুষ টা সত্যি করে ভালোবাসতে জানে। যে পুরুষ প্রথম বউ হারিয়ে ফেলে তৎক্ষনাৎ দ্বিতীয় বউকে মনে জায়গা দিতে জানে আমি বলবো সে পুরুষ সত্যি করে কাউকে ভালোবাসতে জানে না। পরদিন দ্বিতীয় বউ মৃত্যুকে বরণ করে নিলে আগামীতে সে তৃতীয় নারী ঘরে তুলতে পারবে খুব সহজে।

.

দেখতে দেখতে দিন কেটে রোজা ফুরিয়ে চলে এলো ঈদ। পেরিয়ে গেলো সেও । ধেয়ে এলো অঙ্কন আর প্রিয়ার বিয়ে। ঈদের দুদিন পর প্রিয়াকে তুলে নেওয়া হলো অঙ্কনের বাসায়। এরই মাঝে তাদের হানিমুনের ব্যাবস্থাটাও করা সারা। হঠাৎ একদিন প্রিয়া এসে হাজির আমার ঘরের চৌকাঠে। খুব ভোরে। ঈদের দশ দিনের মাথাতেই। ভীষণ অবাক আমিকে খচ্চর মেয়েটা আরো অবাক করে দিয়ে সোজা আমার আলমারির নিকট চলে যায়। আমি প্রশ্ন করতে গেলে বাধা হয়ে দাড়িয়ে জুড়ে দেয় শশুর বাড়ির গল্প। এই ঈদে মহারাণী মেহেদী দেয় নি৷ বিয়ের আগের দিন দিয়েছে। তবে রহ্যজনক ভাবে। এক হাত তার ফাঁকা ছিল। সে হাত বাসর রাতে অঙ্কনের সামনে মেলে দিয়ে বলেছিল তার বাচ্চাকালের বাসনা, বাসর রাতে বর তাকে মেহেদী দিয়ে দেবে। অতঃপর অঙ্কন প্রিয়ার হাতে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে। ভীষণ সুন্দর করে মেহেদীর ছোঁয়ায় লিখেছে

” মাথামোটা একটা ”

প্রিয়ার আবেগের মূল্য বেচারা এভাবে দিলো? ভাবতেই আমার হাসি পায়।

.
প্রিয়ার ওমন করে হুটহাট আগমনের কারণ হলো আমার আর স্মরণেরও যেতে হবে ওদের সাথে। এটা প্রিয়ার শখ, জেদ বা জোরাজোরি। আমার মন যাওয়ার জন্য একটু আধটু আনচান করলেও স্মরণের কানে একথা তোলার সাহস করে উঠতে পারলাম না। দু’দিন হলো সে ভালো নেই। তার মন বড্ড খারাপ। হয়তো অথৈয়ের কারণে। তবে আমার ওপর তার কোনো প্রভাব সে ফেলে না। দিব্যি সাঝে ছোঁয়াকে কোলে নিয়ে আমাকে পাশে রেখে গালগল্প করে। চায়ে চুমুক দেয়। পায়ের অবস্থাও মোটামুটি ভালোর দিকে। ব্যান্ডেজ খুলে আনা হয়েছে তিনদিন আগে। প্রিয়া বড্ড সাহস নিয়ে স্মরণ কে বলে, বাড়ির বাইরে গিয়ে অঙ্কনের সাথে গাড়িতে বসতে। এই সকালে সকলে মিলে একটু হাওয়া খেয়ে আসবে। স্মরণ মেয়েদের সাথে কম কথা বলে কিনা তাই সে ঈষৎ বিরক্ত নিয়ে সাবধানে হেঁটে চলে যায় অঙ্কনের কাছে। তার যেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। হসপিটাল থেকে ফেরার পর নিচ তলায় একটা রুমেই ছোঁয়া আমি আর স্মরণ থাকছি। স্মরণ চলে গেলে প্রিয়া আমার হাত টেনে বলল জলদি চল। ট্রেনে যাবো আমরা। সকাল আটটায় ট্রেন। আমি দিশেহারা হয়ে ওর কথাতে তাল, লয়, সুর সব দিয়ে তড়িঘড়ি করে ছোঁয়ার কিছু জামা আমার ব্যাগে নিয়ে নিলাম। সাথে স্মরণের তিনটা করে শার্ট প্যান্ট আর তার ওষুধের বক্সটা নিয়ে ছুটলাম। ঘুমন্ত ছোঁয়াকে প্রিয়া তুলে নিয়ে এক প্রকার দৌড় শুরু করলো। আমার মন হুটহাট এক অজানা আনন্দ পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে রইলো।

চলবে….

#শেষ_বিকেলে_তুমি_আমি
#আলিশা_আঞ্জুম
#শেষ_পর্ব ( শেষাংশ)

মনে চাপা এক ভয় রেখে গাড়িতে উঠে পরলাম। সকলে এক গাড়িতে। অঙ্কন ড্রাইভ করছিলো। স্মরণ তার পাশে বসে ভরপুর বিরক্তি নিয়ে বারকয়েক বলে, ” এভাবে সকালের হাওয়া খায় মানুষ? গাড়িতে বসে? ” কেউ কোনো জবাব দেয় না তার কথায়। অবশেষে যখন সকলে রেলস্টেশনে পৌঁছাই তখন বুদ্ধিমান সি আই অফিসার সব ধরে ফেলল। চোখ ভার্তি রাগ আর বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল

— মানে কি এসবের খেয়া? তুমি ব্যাগ গুছিয়ে রেডি? আমি কিছু জানি না? আমার পায়ে তো সমস্যা। ডিজগাস্টিং।

— সমস্যার জন্য কোনো সমস্যা নেই। ডাক্তার তো সাথেই আছে তাই না?

স্মরণ অগ্নিভরা দৃষ্টিতে চায় আমার দিকে। আমি তোয়াক্কা করিনি। ছোঁয়া কে লেগে দেই। তার বেড়াতে যেতে চাওয়ার বায়নার পেছনে পরোক্ষভাবে আমি কারণ হয়ে যাই। চুপিচুপি বললাম, তোমার বাবাকে বলো আমরা ট্রেনে করে বেড়াতে যাবো। অনেক মজা হবে। ব্যাস! এতেই কর্ম ফয়সালা হয়ে যায়।

.
ট্রেন জার্নিটা স্মরণের কারণে একটু গুমোট কাটলো। তবে ছোঁয়ার কারণে মজার ছিলো। প্রিয়া আর অঙ্কন আলাদা কামরায় ছিলো। তবে লম্বা জার্নির এক সময়ে আমাদের কামরায় এসে ছোঁয়াকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের কাছে।

মাগরিবের আজান দিতেই আমাদের ট্রেন জার্নির সমাপ্তি ঘটে। সন্ধ্যে নামার পরে পৌছালাম সিলেটে। প্রিয়া ট্রেন থেকে নেমেই আমাকে বলে উঠলো

— সারপ্রাইজ দোস্ত। এভাবে হুটহাট ঘুরতে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিলো না তোর? দেখ আমার কারণে তুই ফ্রি-তে স্বামী সন্তান নিয়ে ঘোরার সুযোগ পেলি। কথাটা আজীবন মনে রেখে আমাকে শ্রদ্ধা করিস।

প্রিয়ার কথার ধরণে আমি হেসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ” লাভ হউ দোস্ত ” বলে দেই। আমার কথার মাঝেই অঙ্কন আর স্মরণ মিলে গাড়ি ঠিক করে, ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে তৈরি। সকলে মিলে গাড়িতে চড়ে এবার রওনা হলাম রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এশার আজান দিয়ে দিলো। আমাদের দুই দম্পতির রুমগুলো হলো পাশাপাশি। ক্লান্ত শ্রান্ত আমরা তিনজন ঠাস ঠাস করে পরে গেলাম বিছানার মধ্যে। ছোঁয়া কথার ঝুড়ি খুলে দিলো। দুষ্টুমিতে মেতে উঠলো আমার সাথে। স্মরণ বন্ধ চোখে শুয়ে ছিলো বিছানায়। এমন সময় হঠাৎ ছোয়া বলে উঠলো

— মা চলো বাইরে যাই। আমরা ঘুরতে যাবো না? তুমি না বলেছিলে ঘুরতে যাবো। অনেক মজা….

কথা সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই আমি ছোঁয়ার মুখ চেপে ধরতে বাধ্য হলাম। স্মরণ যদি বুঝে যায় মেয়েকে আমি উস্কে দিয়েছি তখন এঘরে শুরু হবে কথার ঝড়। এক ঝটকায় শোয়া থেকে উঠে ছোঁয়াকে কোলে তুলে নিলাম। ভুজুংভাজুং কথার ভাজে ছোঁয়ার কথা লুকাতে ব্যাস্ত হয়ে বেলকণির দিকে ছুটলাম আমি। স্মরণের পানে তাকাতেই দেখি সে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখের দৃষ্টি রাগে ভরা। আমি স্বশব্দে হেসে উঠলাম। গুটি গুটি পায়ে বেলকনির দিকে অগ্রসর হওয়ার কালে একটু রসিকতায় ডুবে বললাম

— ওয়া আঁর মাইয়ার বাপ, হুঁনন এতো গোস্বা গরঁন কিন্তু ভালা ন।আন্নের গোস্বাও ম্যালা সুন্দর হয়। এতো সুন্দর কইরা গোস্বা গরতে নাই।

আমার একথার পিঠে স্মরণের অভিব্যাক্তি কেমন ছিলো সে কথা আমি বলতে পারবো না। তবে ছোঁয়া কিছু বুঝে বা না বুঝে খিলখিল হাসিতে মেতে উঠলো আমার কোলে থেকে।

.
ডাক পাওয়া গেলো একটা কোকিলের। গ্রীষ্মের সময়ে সে যেন সঙ্গী হারিয়ে একাই ছিলো এই চা বাগানের উঁচু গাছের মাথাতে। তেজস্বী সূর্য তেজ নিয়ে স্থির মাথার ওপর। আমি ছোঁয়ার হাত ধরে হাঁটছিলাম এক পা দু পা করে। পাশে স্মরণ। তার থেকে কিছুটা দূরত্বে চঞ্চল প্রিয়া হাঁটছে। অঙ্কন শান্ত মনোভাব ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয়ার সাথে। একটু আগেই সকালের সূচনা হতেই পাঁচ জনে খাওয়ার পাঠ চুকিয়ে নেমে পরেছি ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে। বেশি দূর পর্যন্ত যাওয়া স্মারণের জন্য অসম্ভব। পায়ের চোট নিয়ে এতো হাটাহাটি মোটেও ঠিক হবে না।

— প্রিয়া তোরা এগিয়ে যা। আমরা আর না যাই। ঐখানটায় বসি।

স্মরণের কথা ভেবেই একথা ব্যাক্ত করলাম। আমার কথা শেষ হতেই প্রিয়া বলে উঠলো

— আমরাও বেশি দূর যাবো না। এখানেই। তুই ভাইয়াকে নিয়ে বস। এই চা বাগানের মধ্যে থেকে আমরা ঘুরে আসছি।

তাই করলাম। স্মরণের সাথে গিয়ে পুরু করে বিছিয়ে থাকা ঘাসের ওপর বসে পরলাম। অঙ্কন ইতিমধ্যে ছোঁয়া কে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। প্রিয়াও যাচ্ছে পিছু পিছু। একটা দূরত্ব অঙ্কনের সাথে আমার লক্ষনীয়। আমিও একটু সুযোগের অপেক্ষায় থেকে তার থেকে দূরে চলি। স্মারণ কখনো অঙ্কনের বিষয় নিয়ে আর মুখ খোলেনি। সেই যে আমার হাতে মোটা চুড়ি, নাক ফুল পরিয়ে দিয়েছে তারপর তো বিয়ে। আর তারপর? ও বিষয়টা বিশ্বাসের প্রলেপ দিয়ে যেন ঢেকে দিয়েছে স্মরণ।

— চলো হেঁটে আসি। বসে থাকতে ভালো লাগছে না।

হঠাৎ স্মরণের বলে ওঠা বাণী। আমি কিছুটা দ্বিধা করে বললাম

— আপনার পায়ে সমস্যা হবে না?

— সমস্যার জন্য কোনো সমস্যা নেই। ডাক্তার সাহেব ও আছে।

আমি মৃদু শব্দে হাসলাম। আমার বোকার মতো বলা কথাটা স্মারণ কপি, পেস্ট করে উগড়ে দিলো। বসা থেকে উঠে স্মরণের পাশাপাশি হাটতে লাগলাম নগ্ন পায়ে। স্মরণ পায়েও একই ভাবে ঠাঁই পেলো না জুতো। এক পা, দুপা এভাবে বেশ কয়েক পা হাটার পর হঠাৎ স্মরণ বলে উঠলো

— তুমি একটা স্কুলে জব করো তাই না?

তার গলার স্বরটা অন্যরকম শোনালো। কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম আমি অজান্তেই। মিহি সুরে বললাম

— হুম।

সে দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করলো

— তুমি কি জানো খেয়া? তুমি আমার বয়স দিন কে দিন বাড়িয়ে দিচ্ছো? অযথা আপনি আপনি ডেকে আমাকে বুড়ো বানিয়ে দিচ্ছো।

আমি হতবাক হলাম স্মরণের কথা শুনে। এরপর আরো বেশি হতবাক হলাম তার বেপরোয়া ভাবে বলে ওঠা কথা শুনে

— চাকরি ছাড়বে। পড়ালেখায় মনোযোগ দাও। বি সি এস দিয়ে কলেজে জয়েন হতে না পারলে খবর আছে। আর আমি তোমার বুড়ো জামাই না। আপনি আপনি করে ডাকাডাকি বন্ধ করবে। আবার যদি এই সর্বনাশা শব্দ মুখে আনো তাহলে তোমাকে কবরস্থানে রাতের বেলা রেখে আসবো। মনে আছে তোমার পিঠে ভূত হাত রেখেছিল?

স্মরণ শেষোক্ত কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। ভীষণ ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। সেদিনের কথা মনে হতেই বুকে দুমদুম করে যেন মাদল বাজছে। স্মারক আমার এই ভয়ের সুযোগ লুফে নিলো। চাপা হাসি ঠোঁটে রেখে বলল

— চাকরি ছেড়ে দিবা?

আমি ভয়ে ভয়ে জবাব দিলাম

— হ্যা।

— আমাকে তুমি বলে ডাকবে?

— হ্যা

— গুড।

স্মরণ হাসি মুখে চা বাগানের মধ্যে প্রবেশ করলো। আমার বোকা মস্তিষ্ক তখন ভাবতে লাগলো, শর্তগুলো মেনেই নিই। যদি ওটা অথৈয়ের আত্মা হয়ে থাকে? যদি স্মরণের কথা অমান্য করলে আমার ওপর চেপে বসে? ও মা গো! ভাবতেই আমার চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ হয়ে আসে। লাফালাফি শুরু হয় ভয়ে।

— বাবা, আমার একটা এইটুকু ভাই লাগবে।

আমার বোকা বোকা ভাবনা গুলো উড়ে পালালো ছোঁয়ার কন্ঠে। স্মরণের মুখটা শুকিয়ে গেলো। রাজ্যের জড়তা, আড়ষ্টতা এসে ভীর জমিয়েছে তার মুখে। আমার এবার হাসি পেলো। বেশ ভালো পরিস্থিতিতে ফেলেছে ছোঁয়া। আমাকে তো একটু আগে ভূতের ভয় দেখালো। ধরে নিলাম এটা তার শাস্তি।

— তোমাকে এটা কে বলল?

— প্রিয়া আন্টি বলেছে। একটা ছোট ভাই আসলে আমি ওর সাথে খেলতে পারবো। আমার আর একা একা লাগবে না।

— তুমি কোথায় একা? এই যে আমি আছি, অঙ্কন আছে, প্রিয়া আছে, তোমার খেয়া মা আছে।

— তোমরা তো বড়। বড়দের সাথে কি খেলা যায়? খেলতে হলে তো ছোট বাচ্চা লাগে।

স্মরণ ফেঁসে গেছে দারুণ ভাবে। আমি আর এগিয়ে যাচ্ছি না। ছোঁয়ার কথা শোনার জন্য কান পেতে রইলাম

— ও মা, বাবাকে বলো না একটা ভাই এনে দিতে। আজকেই আনতে বলো। আমাকে ভাই কিনে এনে দিতে বলো। আমার ফ্রেন্ড মেধারও ভাই আছে। আমার কেন নেই? আমাকে এনে দিতে বলো।

কথায় আছে, হাসলে কপালে দুঃখ আছে। আমার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে বিষয়টা আসলেই সত্যি। খাঁটি কথা। আমার একটুও উচিত হয়নি স্মরণের পরিস্থিতি দেখে মিটিমিটি হাসার। হাসি পেলেও আমার চেপে যাওয়া উচিত ছিলো। আমি না হাতে পেরে অজ্ঞান হয়ে গেলেও আমার হাসা অবাঞ্ছিনীয় ছিলো। কেন যে এই ছোট বাক্যটা মানতে পারলাম না। এখন যে আমার লজ্জায় কান্না পাচ্ছে। পাঁজি প্রিয়াকে আমার ইচ্ছে হচ্ছে নর্দমায় ছুড়ে ফেলতে।

— ছোঁয়া দেখো গাছে পাতা।

যেন মাথা এলোমেলো হয়ে গেলো আমার। কথা কাটাতে গিয়ে বলে ফেললাম বেকুব বাক্য। ছোঁয়া চোখ দুটো বড় ভর করে বলল

— গাছেই তো পাতা থাকবে। আমি দেখেছি এগুলো। তুমি বাবাকে বলো একটা ভাই এনে দিতে।

এবার আমার মাটির নিচে ঢুকে পরার ইচ্ছে হলো। স্মরণ গলা খাকড়ি দিলো বেশ জোরে। অতঃপর হঠাৎই কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল

— গায়ের ওপর একটা লতা পরলেই যে বলে ভুত পিঠে হাত রেখেছে তাকে যদি আমি অন্ধকারে ছুঁই তাহলে না জানি আমাকে কি বানিয়ে দেবে।

কানটা আমার বেশ সজাগ। স্মরণের কন্ঠ কানে এলো খুব সহজেই। আমি লজ্জা পেলাম কম হতবাক হলাম বেশি। সেদিন তার পিছু গিয়ে অথৈয়ের কবরস্থানে আমি লতাকে ভুত ভেবেছিলাম? আবার সেকিনা এই লতাকে হাতিয়ার করে আমাকে শর্তে রাজি করালো? ও মাই গড! এটা তো রীতিমতো ধোঁকা। এই লোকটা তো আসলেই সুবিধার নয়।

— ওটা লতা ছিলো? তাহলে আমি আপনার শর্তে রাজি না।

— কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ কতরে হয় না। আল্লাহ পাপ দেয়।

নীতিবাক্য শুনিয়ে দিলো সে। অতঃপর ছোঁয়া দিকে তাকিয়ে বলল

— ভাই তো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না মা? ভাই পেতে হলে আল্লাহর কাছে চাইতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়।

— কতদিন?

— একবছর।

— তাহলে আমাকে এনে দেবে তো একবছর পর?

— উহুমমম! তোমার মা জানে।

স্মরণের সরল বাক্য। ছোঁয়া আমার দিকে তাকালো আশা ভরা দৃষ্টি নিয়ে। স্মরণ সামনে অগ্রসর হচ্ছে। ছোঁয়া চোখের পলক ফেলল না। আমি লজ্জা ঠেলে দূরে পাঠাতে চাইলাম। কিন্তু ব্যার্থ হলাম। তবুও মুখে স্বাভাবিক ভাব ভঙ্গী টেনে এনে ছোঁয়াকে বললাম

— হুম, একবছর পর আসবে কেউ। কিন্তু ভাই আসবে নাকি বোন আসবে জানি না তো মা।

— আমার বোন হলেও হবে মা।

কথাটা বলেই ছোঁয়া জাপ্টে ধরলো আমাকে। খুশিতে যেন সে আত্মহারা। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে স্মরণ কে অনুসরণ করে হাটতে লাগলাম সামনে। এই মুহূর্তে মনে অন্যরকম এক অনুভূতি। বুকের হৃদপিণ্ডের ধুকপুক ধুকপুক সুর অনুভব করার মাঝেও খুঁজে পেলাম অন্যরকম ভালোলাগা। প্রায় পাঁচ মিনিট হাটার পর দেখা পলাম প্রিয়া আর অঙ্কনের। চা বাগানের মাঝে হাঁটছে। আমাদের থেকে দূরে বটে। তবে আমরা যেন একই সরলরেখায়। মনটা হঠাৎ ভীষণ ভালো হয়ে গেলো। প্রিয়া গান ধরেছে।

চলো প্রিয়
শেষ বিকেলে
তুমি আমিইইই
নতুন এক অধ্যায় গড়ি
পুরোনো সব স্মৃতি বুকের ফ্রেমে বন্দি রাখি
তোমার কাঁধে মাথা রেখে ভুলে যাই
দুঃখ কি?

বলো প্রিয় হবে না কি কখনো এমন?
হঠাৎ এসে বলে দেবে ভালোবাসি ভীষণ?
চলো না প্রিয়
শেষ বিকেলে তুমি আমি
নতুন এক অধ্যায় গড়ি……

ছোঁয়া নিশ্চুপ ছিলো। আমি অনুভব করেছিলাম প্রিয়ার গান। দৃষ্টিতে রেখেছিলাম স্মরণ কে। সে তো সামনের পথে হাঁটছেই। আমি তো ভালোলাগা নিয়ে নিষ্পলক তাকিয়েই আছি। আমার এই ভালোলাগার বেড়িবাঁধ হঠাৎ ভেঙে দিলো স্মরণ। প্রিয়ার গলার সাথে সে সুর ধরে গেয়ে উঠলো একই গান। আমি চমকে উঠে থমকে গেলাম। মধুর মতো কানে বাজতে শুরু করলো তার কন্ঠ। প্রিয়া অদূর হতে চাইলো স্মরণের পানে। তবে স্মরণ চাইলো না। অঙ্কন প্রিয়ার চাইতে কিছুটা এগিয়ে ছিলো। প্রিয়া এই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিলো নিমিষেই। দৌড়ে গিয়ে অঙ্কনের বাহুতে মাথা ঠেস দিয়ে সে আরো চমৎকার ভাবে গাইতে লাগলো গান। ইশ! এতো সুন্দর কেন হয়ে উঠলো মুহূর্তটা? আমার ইচ্ছে হলো থমকে দেই এই মুহূর্ত। নয়তো…. নয়তো বন্দি করি এগুলো।

সমাপ্ত