#শেষ_সূচনা
পর্বঃ ১৪
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
অনিকও কিছু না জেনে ছুটল আমার পিছু পিছু। কিন্তু হায়, ভাগ্য সহায় হলোনা। মেয়েটা একটা অটোরিক্সা নিয়ে চলে গেল। এবার আমার ষষ্ঠইন্দ্রীয় উল্টো কথা শুনাচ্ছে যে, এই মেয়ে কোনভাবেই স্বর্ণা হতে পারেনা। কারণ স্বর্ণার উপর আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে যে,সে আমাকে দেখে এভাবে পালাবেনা। তবে কি আমার অনুভবে ঘাটতি ছিল? একটা মানুষের চোখ, চলন-বলন,চাউনি একই হতেই পারে। এতে সৃষ্টিকর্তাকে দুষাও তো সমীচীন নয়। অনিক ছুটে এসে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে চলা গাড়িটির দিকে একপলক চেয়ে বলল,
— কাহিনীটা কি বলোতো? মেয়েটা কে?
আমি একটু বিব্রত গলায় বললাম,
— আর বলোনা,ভেবেছিলাম স্বর্ণা। এখন দেখি নাহ্। সে হলে আমাকে দেখে পালাত না এভাবে।
— এমন করলে তো গণপিটুনি খেয়ে মরবে লোকের।
— আচ্ছা বাদ দাও। চলো তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
— কোথায়?
— আমার একটা বোনের বাসায়।
— যাও তুমি, আমি যাচ্ছিনা। আমি আমার শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যেতে চাইলাম তখন গেলে না। এখন বোনের বাসায় কেন?
— ওকে থাকো তুমি। আমি একাই যাই।
—- না না ঠিকাছে যাচ্ছি, চলো। যাচ্ছি।
অনেক্ক্ষণ ধরে ফোন ঘেঁটে মেহেনাজের নাম্বারটা বের করলাম। ওর কাছ থেকে স্বর্ণা সম্পর্কে অনেককিছুই জানা যাবে। কারণ স্বর্ণাকে মারার জন্যই সে এসেছিল। সমস্ত ইনফরমেশন না জেনে মারতে আসাও নিশ্চয় কোন কিলারের কাজ না। যদিও আমি তার অপকর্মের কারণ জেনে সহমর্মী হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি,হৃদয় তেপান্তরের একটা জায়গা তার জন্য বরাদ্দ করেছি;বোন বলেছি। তবুও শেষ কয়েকটা মাস অনির্দেশ্য কারণবশত তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ে উঠেনি। দুইবার রিং বাজতেই ফোন রিসিভ করল মেহেনাজ। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে উৎকণ্ঠিত তরঙ্গ ভেসে এলো,
— আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। এতোদিন পর মনে পড়লো? মানুষ তো বেঁচে আছি কি মরে গেছি সেটা অন্তত খোঁজ নেয়।
আমি সালামের উত্তর দিয়ে সুস্মিত হেসে বললাম,
— তুমিও তো খবর নিতে পারতে…
মেহেনাজ চটুলকণ্ঠে বলল,
— ফোন করিনি? কললিস্ট চেক করুন তো পান কি-না। আপনাকে তো পাওয়াই মুশকিল।
আমি নিজের দোষ স্বীকার করে বিপন্ন গলায় বললাম,
— আচ্ছা আমার-ই ভুল। এখন তোমার বাসায় আসছি। চিংড়ি- মোরগ রেঁধে রেখো।
— হ্যা ঠিকাছে, আগে তো আসুন! ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেল। আমি বললাম,
— মজার করেছি। কিছু লাগবেনা। আমি যাবো আর আসব। রাখছি।
মেহেনাজের বাসায় গিয়ে পৌঁছালাম ঘন্টাদেড়েক পর। তার স্বামী কোথাও একটা চাকরী পেয়েছে; একটু রাত করেই বাসায় ফেরে। একটা মেয়ে বাবু হয়েছে তার। মাত্র কয়েকমাস বয়স। অনিক তার স্বভাব মতোই অল্পতে ভাব করে ফেলল মেহেনাজের সঙ্গে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে দু’জনের পরিচয় দীর্ঘদিনের;হঠাৎ দেখা হওয়ায় কথার ফুলঝুরি যেন কোন ছলে বলে কৌশলেই থামতে চাইছেনা। বরং কথার খই ফুটছে দু’জনের মুখে। মাঝখানে আমিই খইচড়ার মতো বসে রইলাম। দুজনের এতো কথার মাঝেও আমার মন স্বর্ণার আগাগোড়া জানার কথাটার জন্য উৎকীর্ণ হয়ে আছে। সময়-সুযোগ মিললেই জেনে নেওয়া যাবে। কিন্তু চপল অনিক সেই সুযোগই দিলোনা। নিজেকেই নিতে হলো। আমি একটু জরুরিভাবে বললাম,
— অনিক আমাকে যেতে হবে, কিছু কথা ছিল ওর সঙ্গে, তারপর তোমরা কথা বলো।
অনিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
— কথা শেষ হলে ডাক দিও কিন্তু।
মেহেনাজ নিঃশব্দ হেসে মাথা নাড়ল। এরপর আমার দিকে আড়দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
— এতো জরুরি কথা থাকলে ওনাকে না আনলেই পারতেন… কী মনে করবেন বলুন তো!
আমি তাচ্ছিল্যভরে বললাম,
— ওর কথা বলে লাভ নেই। ওর এতোসব আত্মসম্মানবোধ নেই। থাকলেও আমার ব্যাপারে সে সবসময়ই আপোষ করে।… আসল কথায় আসি। তুমি স্বর্ণা সম্পর্কে যা জানো সব আমি জানতে চাই। সব! আজই! কোনো কিছুই যাতে বাদ না যায়।
মেহেনাজ একটু সময় নিয়ে ভাবল। এরপর ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে সবিস্তারে বর্ণনা করা শুর করল।
.…………………………..…………
ফিরতে ফিরতে রাত ন’টা বাজল।
আজ অমাবস্যা। আকাশ মিশমিশে কালো। কোথাও ছিটে পরিমাণ মেঘের দেখা নেই। পৃথিবীটা বোধহয় তাঁর সুকুমার রূপ লুক্কায়িত করে কোন ঘোরতর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে। পাপের ভাগীদার হিসেবে জনমানুষও এর কিছুটা শাস্তি উপলব্ধি করছে। আমার রুমের থাই গ্লাসের জানালার একাংশ উন্মুক্ত। মাত্রই একটা বাদুড় পতপত করে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল খোলা জানালার গ্রিল ঘেঁষে। শহরে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। আইপিএস এর ব্যাটারি ফুরিয়েছে বহু আগে। পুরো ঘর আঁধারে কুহরিত। একটু আগে মেহেনাজের কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে ভাবাচ্ছে। Dont আসলে কোন দলীয় গ্যাং নয়। এটা স্বর্ণার নিজেরই প্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র সেই ছ জনকে মারার জন্য! এরই মধ্যে দু’জন কুপোকাত। বাকী চারজনকে কিভাবে, কখন কোন পাঁক,খানাখন্দে পাওয়া যাবে সেটা সবারই অজানা। তবে মেহেনাজের কথামতো সে একটা দলের সঙ্গেও যুক্ত আছে।
এই আট বছরের মধ্যেও সে তাদের খুন করতে পারতো। তথ্যমতে দীর্ঘ ছয় বছরই সে ট্রেনিংয়ে ছিল। উপর্যুপরি ফাইটিং, আত্মরক্ষার,আগ্নেয়াস্ত্র চালানোসহ বিভিন্ন স্কিল রপ্ত করেছে সে। ছয় বছর! কম বৈ তো নয়। না-হয় দারোয়ানকে একচোট মেরে জেল থেকে পালানো কোন সাধারণ ছিঁচকে আসামীর কাজ একেবারেই নয়। উপরমহল থেকে চাপ বাড়ছে। প্রশাসন তৎপর। বড়বড় ঘাড়ত্যাড়া নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের প্রশ্নে নাস্তানাবুদ। পুলিশের উর্ধ্বস্তরের কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, আসামী খুব শীগ্রই এ্যারেস্ট করা হবে। অথচ আসামীর কোন ছবিই সংগ্রহ করা গেলনা এই পর্যন্ত। পুলিশের কাছে একবার ধরা দেয়াটা নিশ্চয় চৌদ্দশিকের আড়ালে নিজের জীবনকে উপলব্ধি করার মতো। ইচ্ছে হলো ধরা দিল,আবার ইচ্ছে হলো ধড়-পাকড় করে হুট করে অদৃশ্য হয়ে গেল। পুলিশের কোল গড়িয়ে কেস গেলো র্যাবের কাছে। ঘোষণা হলো, দেখামাত্রই ক্রসফায়ার। গতকিছুদিন ধরে টিভি দেখা কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার না করার ফল এই; সমস্ত খবর আমার অগোচরে চলে যাওয়া। অবশ্য এমনো খবর আছে যে, সামনে আরো খুন হবার ঘোষণা দিয়েছে স্বর্ণা। এই খবর সম্পূর্ণ অমূলক, অবান্তর ঝঙ্কার বলে উড়িয়ে দিচ্ছে উপরমহল। এতোদিন জানতাম স্বর্ণা বদলেছে, কিন্তু এতোটা বদলাবে সেটা আমার চিন্তারও অতীত ছিল। তবে সে যতোই কদাচারী হোক আমার অন্তরীক্ষে তার পাকাপোক্তভাবে গাঁড়া আসন প্রোদ্ভিন্ন করে গুড়িয়ে দেওয়া দুঃসাধ্যই নয় বরং বিপুল সাহসীকতার পরিচায়ক। যেটা এই মুহূর্তে আমার জন্য যথেষ্ট নয়। মোমবাতি হাতে মা এসে দাঁড়াল। ঘরময় কমলা আলো টিকরে পড়ল চারিদিকে। আমি জানালা থেকে মুখ তুলে মৃদু হেসে তাঁকালাম মায়ের দিকে। মা ছদ্ম – বিস্ময়ে বলল,
— তুমি হাসতেও পারো? সারাদিন তো কেমন মুখটা কঠিন করে রাখ। কার স্বভাব পেয়েছ?
আমি হাসিটা আরো বিস্তৃত করে বললাম,
— মানুষ কি এমনে এমনে হাসে? জীবনে কখনো হাসার কারণ পাইনি তাই তেমন হাসিও আসেনা।
— তাহলে এখন হাসছ কেন?
— সেটা আপনি জানেন।
— আপনি? আপনি আর বলোনা। মা-ছেলের সম্পর্কে ঐ শব্দটায় একটা পরপর ভাব আছে। শেষ বয়সে না-হয় পাপী মাকে একটু আপন করে নাও! – একটু অভিমানী গলায় বলল মা।
কথাটা যেন তীরের মতো এসে কলিজায় বিঁধল। একটু থমকালাম। ক্লিষ্ট গলায় বললাম,
— এতোসব আগে জানলে তো আর…
কথায় বাঁধা পড়ল। মা বলে উঠলেন,
— না, এটা তোমার ভুল ধারণা। আগে জানলে তুমি সইতে পারতে না। এখন যতটা কষ্ট নিয়ে বড় হয়েছ। তখন তারচে দ্বিগুণ কষ্ট নিয়ে বড় হতে। শূন্যতা কাজ করতো।… একসময় এসে তোমার দাদীই না করতো তোমার সামনে কম যাবার জন্য। কারণ, মা-বাবাকে দেখলে তোমার কষ্ট হতো অন্য সাধারণ মা বাবার কথা ভেবে।
আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না। মনে হলো বড়ো কোন গোলকধাঁধায় পড়েছি৷ ঘুরেফিরে একই ঘটনাগুলোই আমার পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক্ক্ষণ মা-ছেলেতে কোন কথোপকথন হলোনা। একটু পর হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
— যা হয়েছে সেটা চলে গেছে। অতীত মনে রাখতে নেই। খেতে চলো।
আমি আর কোন বাগবিতণ্ডা না করে মায়ের পিছু পিছু গেলাম। এই প্রথম মনে হলো আমি সয়ংসম্পূর্ণ। আমার একটি পরিবার আছে।
বছর ঘুরে আবারে শীতকাল এসে পড়ল। টানাবৃষ্টিতে শীতের আগমনী বার্তা জনমনুষ্যের কানে কানে পৌছাচ্ছিল খুব দ্রুতভাবে। বেলা হলেও কুহেলিকার জাল যেন ছিন্ন হতে চায়না। সকালের মিষ্টি রৌদ্র যখন বাগানের ই্যয়ুকেলিপটাস গাছে ফাঁকে ঝিলিক দিচ্ছিল তখন আমি বেরিয়ে পড়লাম কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য। পরশুই চট্টগ্রামের পথে রওনা দিতে হবে। ঘরের গাড়িটা নিয়েই বের হলাম এই প্রথম৷ আজ আর অনিককে ডাকার প্রয়োজন পড়ল না। তাকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাওয়া মানেই ইজ্জতের ফালুদা। কখন, কোথায়, কি বলে ফেলে তার কোন ইয়ত্তা নেই এই ছেলের৷ তার চেয়ে বরং একা শপিং করাই উত্তম।
গাড়ি পার্ক করে শপিং সেন্টারে ঢুকে কিছু কেনাকাটা করলাম। মায়ের জন্য একটা বোরখা আর হিতাহিতজ্ঞানশূন্য বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনলাম। হাজার হোক, মা যেখানে বাবার দোষ ক্ষমা করেছে সেখানে আমার কী করার? মেহেনাজের জন্য একটা তাঁতের শাড়ি এবং তার স্বামীর জন্য একজোড়া শার্ট। কোন একদিন কথার তালে বলেছিল তাঁতের শাড়ি ভারি পছন্দ করে সে। সব কেনাকাটা করে ব্যাগগুলো পিছনের সিটে ফেলে যখনই ড্রাইভিং সিটে বসতে যাব ঠিক সেই সময় আমার চোখজোড়া আটকে গেল শপিংমলের বিপরীতে রাস্তার অপরপাশের লেনটির দিকে। আবার সেই হ্যালোসিলেসান! কথায় আছে যাকে যে যতবেশি ভাবে সে তাকে ততবেশি অনুভব করে,যেখানে সেখানে। দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ রগড়ে তাকালাম পুনরায়। হ্যাঁ এতো স্বর্ণারই প্রতিমা। কোনকিছু না ভেবে সোজা ছুটলাম মেয়েটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে,পাছে হারিয়ে না যায়! গায়ের খুব কাছ ঘেঁষে একটা গাড়ি সাঁই করে ছুটে গেল। পরোয়া করলাম না। ধীরে ধীরে খুব কাছে গেলাম। এবার আর চিনতে অসুবিধে হলনা যে এটাই স্বর্ণা। বেশকিছুক্ষণ ধরে দূর থেকে অনুসরণ করলাম। সে এখান ওখান থেকে ঘুরে ঘুরে কেনাকটা করছে। সব শেষে একটা সিএনজিতে চাপল সে। আমি তড়িৎ দৌড়ে রাস্তা পার হলাম।৷ দ্রুত গাড়ি স্টার্ট করে ছুটলাম সিএনজিটার পিছু পিছু। স্বর্ণার বিচক্ষণ ইন্দ্রিয় বোধহয় টের পেয়েছিল তাকে কেও অনুসরণ করছে। বারকয়েক মাথাটা বের করে মতিগতি পরখ করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু যথেষ্ট দূরত্বে থাকায় মনেহয় আমার চেহারাটা দেখতে পেলনা। এভাবে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ছোট-বড় গলিঘুঁজি পেরিয়ে সিএনজি গিয়ে ভিড়ল একটা সংকীর্ণ গলির মুখে৷ আমি একটু দূরে গাড়ি থামিয়ে আবডালে ওঁৎ পেতে দাঁড়ালাম।স্বর্ণা একবার পেছনদিকে ফিরে তাকিয়ে ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে গলির ভিতর হাঁটা শুরু করল। এই জায়গাটাতে আমি কখনো আসি নি। পরিবেশটা বেশ ভৌতিক টাইপের। দিনের বেলায়ই কেমন শিরশিরে ঠাণ্ডা বাতাসে গাটা ছমছম করে। কয়েকটা সুবিশাল নাম না জানা গাছ মাকড়সার জালের মতো ঘিরে রেখেছে পুরো তল্লাট। আশেপাশে কেমন স্যাঁতস্যাঁতে পুরোনো বাড়িঘর। হাঁটার রাস্তাটার অবস্থাটাও বেঢপ বলা চলে। স্বর্ণা হাঁটতে হাঁটতে গলির পুরোপুরি ভিতরে চলে গেল। আমিও মুখে মাস্ক পরে স্বর্ণার অগোচরে তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম।একটুপর একটা আধ-পুরোনো বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল সে। মিনিট কয়েক গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। ইতস্ততঃ করে মাথা ঝুঁকিয়ে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনটা পিস্তল চটাক্ চটাক্ করে তাক হলো আমার দিকে। আবার সেই চামচা ক্যাডারগুলো। আমি দুইহাত উপরে তুলে থামার ইশারা দিলাম ওদের। পরক্ষণেই পিস্তলগুলো ধীরে ধীরে নামিয়ে বাদুড়চোষা আমের মতো ফাঁকা হয়ে গেল ওরা। হোঁদলকুতকুত টাইপের একজন হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল অন্দরের দিকে। ঠিক তখনি আমার মনে পড়লো কুমিল্লায় স্বর্ণার সঙ্গে দেখা করার রাতটির কথা। কি বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ডই না ঘটেছিল! এক প্যান্ট পরে বাড়িতে ঢুকা আর পায়জামা পরে বের হওয়া! ছিঃ ছিঃ ছিঃ ভাবতেই গা গুলোয়। কেজানে ওরা কী ভাবল আমাদের নিয়ে।
বাড়িটি একতলা। সাজসজ্জার তেমন আড়ম্বর নেই বললেই চলে। পূব দিকে একটা বারান্দা ঝুলে আছে। স্বর্ণা ভেতর থেকে দরজা আটকে দিয়েছে। কাজেই অন্যপথে অনুপ্রবেশ করা ছাড়া পথ নেই। সেই কিম্ভুতকিমাকার লোকটাকে কাছে ডেকে বললাম,। — কোন মই পাওয়া যাবে?
লোকটি বলল,
— কেন?
আমি চোখ রাঙ্গালাম শুধু। লোকটি “আনছি, আনছি” বলে দৌড়ে মই আনতে গেল। মই দিয়ে সহজেই রেলিং টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বারান্দার দরজা অবশ্য খোলা ছিল। স্বর্ণার বেডরুমেই একসেট সোফা পাতানো রয়েছে। আমি একটাতে গিয়ে ধুপ করে বসে পড়লাম। যা বোঝা গেল স্বর্ণা শাওয়ার নিচ্ছে। এটাস্ট বাথরুম থেকে জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আসছে। আমি বিমনা হয়ে পাশের টেবিলের উপর রাখা এলোমেলো কিউবটা মেলানোর চেষ্টা করলাম। প্রত্যেক মানবের জীবনটা আসলে এই জড়বস্তু কিউবের মতোন। অকস্মাৎ যে কেউ এসে যদি জীবনের সমীকরণ বদলে দেয় কিংবা জীবনটা যদি শুরু থেকে বাতাবর্তে আচ্ছন্ন থাকে তখন বিবাগী না হয়ে ;উচিত সুত্রটা খোঁজা। যার দ্বারা জন্মটা সার্থক হয়, জীবনের সমীকরণটা ঠিকঠাক মেলে। সুত্র না জানলে যেমন কিউবের রং মেলানোটা সময় অপচয় বলে মনে হয় ঠিক তেমনি জীবনে মানে না জানলে ধরাধামে নিজের জন্মটা বৃথা মনে হয়।
কটাস করে বাথরুমের দরজা খুলে গেল। স্বর্ণা বেরিয়ে এলো গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে। তার আলুলায়িত ভেজা চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো-ছিটানো। কয়েকফোঁটা টলটলে জল বিন্দু বিন্দু জমে আছে কপোলে। ঘরের ভিতর ভিন্ন কারো উপস্থিতি বোধহয় সে লক্ষ্য করলনা। স্বাভাবিকভাবেই আদ্র চুলের পানি ঝাড়তে লাগল। আমি টুঁ শব্দ করলাম না। স্থির হয়ে বসে রইলাম। এবার ঠিক আমার দিকে পিঠ মেলে সোজাসুজি এসে দাঁড়াল স্বর্ণা। ডাইনিং টেবিলের আয়নার পর্দা ঝুলে থাকার কারণে আমার প্রতিবিম্বও হয়তো তার অগোচরে রয়ে গেল। একটুপর হঠাৎ একটু থমকাল সে। খুব ক্ষীণভাবে পিছনে তাকাল এবং বডি লোশন বের করে তার বাহুলতায় মাখতে লাগল। আমি বিমোহিত হয়ে দেখতে লাগলাম তার কার্যকলাপ। ইচ্ছে হলো এখুনি ছুটে গিয়ে আলিঙ্গন করি। দমন করলাম নিজের ইচ্ছেকে। স্বর্ণা তোয়ালেটাকে একবার বিপরীতে মেলে ধরে পুনরায় শক্ত করে বাঁধল এবং হঠাৎ আকস্মিকভাবেই টেবিলে সাজানো একটি ফুলদানি না তাকিয়েই উল্টোহাতে ক্ষিপ্রগতিতে ছুঁড়ে মারল আমার দিকে। আমি অপ্রস্তুত ডান হাত শক্ত করে সামনে এগিয়ে নিজের মস্তক বাঁচালাম। ফুলদানি সোজা আমার হাতে লেগে ঝনঝন শব্দে চূর্ণ হয়ে গেল। হাত কেটে টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়ল ফ্লোরে। না চাইতেও একটা চাপা আর্তনাদ বের হয়ে এলো আমার মুখে। স্বর্ণা তখনো উল্টোদিকে মুখ করা। পরমুহূর্তেই ডাইনিংয়ের ডেস্ক থেকে পিস্তল বের করে তাক করল আমার দিকে। আমি তৎক্ষনাৎ একটা ডাইভ দিয়ে স্বর্ণার পিস্তল ধরা হাতে কিক করলাম। লাথিটা যেন সোজা আমার বুকে এসে লাগল। কিন্তু আমি অপারগ! এতো সজোর কিক এও স্বর্ণার মুখে,অঙ্গ-ভঙ্গিতে কোন বিকার নেই। নিমেষে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আমি দ্রুত দাঁড়িয়ে বাঁ হাতে তার গলা পাকড় করলাম। কয়েকসেকেন্ড ওভাবে স্থবির হয়ে রইলাম দুজনে। স্বর্ণা বার-দুয়েক টানাহেঁচড়া করে ছাড়ানোর চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলল,
— তোমার পারফিউম শুঁকে বুঝলাম তুমি কে! ছাড়ো এখন।
আমি ছাড়লাম না। পেঁচিয়ে ঘুরিয়ে এমুখো করলাম। সে নিভাঁজ চোস্ত দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। হঠাৎ দেখা হবার কোন অনুভূতিই তার মাঝে নেই। গলিত মোম বুঝি আবার শক্ত হয়ে এলো! এতোটা ডানপিটে হলো কী করে হঠাৎ! অনেক্ক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থেকে বলল,
— কেন এসেছ?
আমি শুধু মুখ বাঁকিয়ে হেসে তার কাঁধ থেকে হাতটা নামিয়ে নিলাম। ডান হাত থেকে এখনো লোহিত রক্ত এখনো টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে জমাট বাঁধছে মেঝেতে। স্বর্ণা সেদিকে চোখ রেখে শান্তস্বরে বলল,
— সোফায় গিয়ে বসো। হাতটা পরিষ্কার করে দিই। ব্লিডিং হচ্ছে…
আমি গোঁ ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। কেমন একটা রুদ্ধ অভিমান কাজ করছে ভিতরে। স্বর্ণা মুখে বিরক্তিসূচক চ কারান্ত শব্দ করে আমাকে ঠেলে সোফায় বসিয়ে দিল৷ একছুটে তার আধ-মোছা চুলের তোয়ালেটা নিয়ে পেঁচিয়ে দিল আমার হাতে। এরপর দ্রুতপায়ে পাশের ঘর থেকে একটা ফার্স্ট এইড বক্স এনে সোফার পাশে টেবিলে রাখল। এরপর আমার পাশে এসে বসে চঞ্চল হাতে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে করতে বলল,
— তোমার হঠাৎ হঠাৎ এতো দরদ উতলে উঠে কেন বুঝিনা? শেষে এসে তো আমার হাতেই আঘাত পেলে!
স্বর্ণা তোয়ালে জড়ানো আধখোলা দেহ ঘেঁষে বসার কারণে আমার ভিতর অস্বস্তি গাঁট বাঁধছিল। আমি একটু দূরে সরে বসে বললাম,
— আমিতো আর তোমার মতো পাষাণ হতে পারিনা। তাই বারবার ছুটে আসি।
স্বর্ণা খুব মনোযোগ দিয়ে হাতে ক্ষতটা মুছতে মুছতে বলল,
— আসতে তো বলিনি। কেন আসো? এরপর হঠাৎই মাথা তুলে তাকিয়ে গজগজ করে বলল, কীই? এভাবে দূরে সরলে ব্যন্ডেজ করব কীভাবে?
আমার বোলশূন্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম শুধু। বোধকরি সঠিক উত্তর খুঁজে পেলাম না,অথবা আসল কথাটা পেট থেকে মুখের কাছে এসে বাঁধা পাচ্ছে। স্বর্ণা উৎসুক দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। উত্তর না পেয়ে স্বর্ণা হাঁড়িপানা মুখে সহসা চেঁচিয়ে বলল,
— আরে কী হয়েছে সেটাতো বলো। দেখোনা ব্লিডিং হচ্ছে? কোন ফিল নেই নাকি?
আমি দ্বিধা নিয়ে বললাম,
— না মানে। কাপড়টা চেঞ্জ করে আস। অস্বস্তি লাগছে।
— হ্যাঁ আমি আধাঘন্টা ধরে কাপড় চেঞ্জ করি আর তুমি মরে পড়ে থাকো তাইতো? দাও দেখি এতো কথা বলোনা। – স্বর্ণার কণ্ঠে শাসন পরিস্ফুট।
আমি আর বাক্যব্যয় না করে হাতটা এগিয়ে দিলাম। ক্ষণকাল বাক্যহীন কাটল। নীরবতা ভেঙে আমি বললাম,
— কেন আসি জানতে চেয়েছিলে না? যেদিন আসবনা সেদিনই বুঝতে পারবে।… কত্ত সুন্দর রোমান্স মুডে ছিলাম মাঝখানে একটা ফুলদানি এসে সব ভেস্তে দিল৷
স্বর্ণা হিশহিশ করে হেসে ফেলল। অনেক্ষণ পর্যন্ত মুখে সেই হাসিটা ঝুলে রইলো। আমি বিমুগ্ধ হয়ে সেই হাসি হাসি মুখটার পানে চেয়ে রইলাম। একটা মানুষের ভিতর সম্যক সম্মোহনী উপাদান কীভাবে থাকতে পারে? এইতো সে গোসল করে এলো৷ অথচ?অথচ দূর থেকে দেখে মনে হবে কোন শিল্পীর দীর্ঘদিনের সাধনার ফলে আঁকানো হয়েছে তার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, প্রত্যেকটা লোমকূপ। শুধু আমি বৈ আর কেউ জানেনা তার নিকষিত উচ্ছল যৌবনের কথা। কারণ আমি তার সমীপে রয়েছি। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের টনটনে ব্যথায় সাময়িক ধ্যন ভাঙল আমার। আমি খোঁচা দেয়ার ভঙ্গিতে বললাম,
— হুমম তুমি হাসছ! আরেকটু হলেই গুলি করে দিতে।
— দিইনি তো আর!
— দিলে তো মরে যেতাম।
— তাতে আমার কী?
— তোমার তো কিছু না। যা হবার আমারই হতো।
স্বর্ণা বোধহয় আমার কথার ভেতরে লুক্কায়িত অভিমানটুকু ধরে ফেলল। শ্লেষাত্মক ঢংয়ে বলল,
— আমার সঙ্গে বোধহয় এসব ফালতু প্যাঁচাল করতে এসেছ?
— নাহ, একটা জিনিস ফেরত দিতে এসেছি।
স্বর্ণা নির্বিকার। আমি নিশ্চিত স্বর্ণার জায়গায় অন্য কেউ হলে সব কাজ ফেলে কি জিনিস ফেরত দিতে এসেছি সেটা জিজ্ঞেস করতো। কিন্তু স্বর্ণা আগে হাতের ব্যান্ডেজে বাঁধার কাজটাই সারল। এরপর জগ থেকে পানি ঢালল। ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা ঔষধ বের করে পানির গ্লাসসমেত আমার মুখে ধরতে ধরতে বলল,
— কী জিনিস ফেরত দিতে এসেছো? আমার জানামতে আমিতো কিছু দিইনি তোমাকে।
আমি ঔষধটা পানি দিয়ে গিলে বললাম,
— দিয়েছ, দিয়েছ,। সেটা দিয়েও তোমার মনে হচ্ছে কিছু দাওনি তুমি। বাই দা ওয়ে, কিসের ঔষধ খাওয়ালে? আবার মারার ধান্দা করছ নাতো?
স্বর্ণা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে অপলক তাকাল। আমি একটু ইতস্তত করলাম।
— এর মানে কি বলতে চাইছ আমি তোমাকে ইচ্ছে করে মারতে চেয়েছি? -স্বর্ণার কণ্ঠ বরফের মতো শীতল। পদ্ম ফুলের মতো চোখদুটোয় রাজ্যের বিষণ্ণতা।
আমি হোহো করে ঘর কাঁপিয়ে হাসলাম এক মিনিট মতো। স্বর্ণা সেই দৃষ্টি স্থির রেখে বসে রইলো। হাসির গতি মন্থর করে বললাম,
— এতক্ষণ তো খুব টেরাবাঁকা কথা বলছিলে? তখন আমার কেমন লেগেছিল? এবার বুঝো!
স্বর্ণা ঠিক আগের মতো করেই বলল,
— মিনহাজ, তুমি বেশিক্ষণ সঙ্গে থাকলে আমি আমার নিজস্বতা হারাই। কেমন যেন নিভে যাই আমি। সেটা তুমি জানো। তুমি বারবার সামনে এসে আমাকে দুর্বল করোনা। আমি চাইনা তুমি আস। কি ফেরত দিতে এসেছ সেটা দিয়ে চলে যাও প্লিজ!
ভেতরে ভেতরে একটু গুড়িয়ে গেলেও আমি প্রহসনটা চালিয়ে গেলাম। বললাম,
— এতো উতলা হচ্ছো কেন? পাবে পাবে।
— ঠিকাছে, একটু অপেক্ষা করো৷
আমি অপেক্ষার ধার ধারলাম না। বাঁ হাত বাড়িয়ে কিঞ্চিৎ দূরে থাকা স্বর্ণার কোমর জড়িয়ে কোন তরিবত ছাড়াই সন্নিকটে নিয়ে এলাম৷ অাচানক টাল সামলাতে না পেরে একটু ককিয়ে উঠল সে। দুই হাতে ছাড়ানোর চেষ্টার বদলে সে তোয়ালেটা টানটান করে বেঁধে নিল আরো। আমি ফিসফিস করে বললাম,
— কী? মনে নেই কুমিল্লাতে দিয়েছিল? সেটা এখনো লেগে আছে মুখে। চোখ বন্ধ করলেই ভাসে। ফেরত দিতে হবে। নাহয় মনটা শান্তি পাবেনা।
স্বর্ণা চোখ দুটো বড়বড় করে তাকিয়ে রইল পলকহীন। ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে তার। না রাগে, না অভিমানে, না শক্ত হওয়া মোম পূনরায় গলানোর কুহকী চটকে!বোধহয় সে নিজেই জানেনা। কাঁপাঠোঁট যুগল ফুঁড়ে এবার কম্পিত গলায় শব্দ করল।
— তোমরা পুরুষ মানুষেরা এমন কেন? সবাই একি নৌকার মাঝি!
— কেমন?
— কামুক। নতুন শুনলে বুঝি? হুহ! -ছলছলে চোখে একটা শ্লেষাত্মক ধাক্কা দিয়ে হাসল স্বর্ণা। এরপর আমার বাঁ হাতটা ছাড়িয়ে খাটের উপর রাখা কাপড়গুলো নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল ধীরে ধীরে। আমি বাঁধা দেবার কোন প্রয়াস করলাম না। সর্বাঙ্গ বিবশ, রক্তশূণ্য মনে হলো নিমেষে। একটা কথাই শুধু বারবার কানে হূলের মতো ফুঁড়ছে, সবাই একি নৌকার মাঝি, পুরুষ মাত্রই কামুক! তবে কি আমি শরীরের নেশায় তার পেছনে ছুটছি? কী ভেবে বললো সে? নাকি নিজেকে সংযত করতেই এমন উপলক্ষ্যহীন কথা বলে প্রস্থান করা?
চলবে….
ভুল-ত্রুটি থাকবে অনেক। পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে হাঁটতে লিখেছি, বসতে লিখেছি, গাড়িতে বসে লিখেছি। মূল্যায়নটা আপনাদের হাতে…