#শেষ_সূচনা
পর্বঃ৩০
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
যখন আমার ঘোরের মিশকালো ধোঁয়া উড়ে গেল শূন্যে, চেতনা ফিরে এলো তখন ভাবলাম, হায় হায়! এ কি করলাম! কপালে যে এবার বিরাট খারাবি আছে সেটা কে আটকাবে? আদতেই আটকানোর মতো কেউ থাকার কথা নয়। রক্তাক্ত অবস্থায় লোকটিকে হাসপাতালে পাঠানো হলো এবং আমার ওপর শুরু হল উত্তরোত্তর কথা বের করা নামে অমানুষিক নিপীড়ন। কখন, কোথায়, কীভাবে এসব যথেচ্ছ উৎপীড়ন চালানো হল সেসব অনির্বচনীয় কথা লেখায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু আমি আমার অবস্থানে বদ্ধমূল। ভুল করেও স্বর্ণার নামটা পর্যন্ত মুখে আনলাম না। এমন করে রিমান্ডের তিনদিন কেটে গেল। কিন্তু প্রায় হারাতে বসল আমার মুখশ্রী। শারীরিক অবস্থা প্রায় পশ্চিমে হেলে পড়ল হরদম অত্যাচারে। সামান্য পরিমাণ শক্তি বালাই নেই দেহে। রুিমান্ডের সময় শেষে পুনঃ আদালতে হাজির করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। যতটুকু বুঝলাম, এবার আরো দীর্ঘদিনের জন্য রিমান্ডের আবেদন করবে তারা।
এদিকে কারাগারে একটা পক্ষীও আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো না। আসলেই কি দেখা করতে দেয়া হয় এই কারাগারে!আমার জানা নেই। একটা নিষ্ফল অভিমান হৃদয়-শহরের সুনীল আকাশে কলুষিত ধূম্রজালে নিকষ কালো করে তুলল। সেই কলঙ্কিত ধোঁয়ায় বারবার নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে, সেই নিঃশ্বাসের বাষ্প অশ্রুফোয়ারা হয়ে নামছে। নেমেই চলেছে শব্দহীন। কেউ দেখেনি। শুধুমাত্র শীর্ণকায় দারোয়ান ছাড়া। আশপাশের আরো তিন চারটা সেল ছিল সম্পূর্ণ খালি। গলা বাড়িয়ে তাকালেও কারোর দেখা মেলে না। পাতালপুরীতে বাস করি বলে মনে হয়। কি থেকে কী হল! সারাদিন ঘরের কোণে পড়ে থাকা মাতাল আমি কোনোকালে পুলিশের চাকরিতে এসে আবার তাদেরই হাতে বন্দী হব তা ভাবিনি। ভাবনাতীত বিষয়গুলোই মানুষের পিছনে উঠে পড়ে লাগে। এটাই চিরাচরিত বিধি। এই দুর্লঙ্ঘ বিধি খণ্ডন করার সাধ্য অন্তর্যামি ভিন্ন কারোর-ই নেই। কিন্তু অদৃষ্টকে সদয় হয়ে মেনে নেওয়াই যথার্থ। আমিও তাই করছি। জন্মলগ্ন থেকেই ছন্দোবদ্ধ জীবন আমার ছিল না,ছিল ছন্নছাড়া মুক্তকচ্ছ এক অস্বাভাবিক জীবন। মাতৃসদৃশ দাদী মারা যাওয়ার পর থেকেই সেই ছন্নছাড়া জীবন ছেঁড়া মালার মতোই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল। সেই আমার কাছে এই বরাত মেনে নেওয়া অতো দুঃসাধ্য কিছু নয়!
পরের দিন রাতে অকস্মাৎ এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটল। দারোয়ান এসে বলে গেল আমার চাচি এসেছে আমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি কাঠের শক্ত বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বিষম যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ছিলাম। এই খবর শুনে আমার পরি মরি করে ছুটে আসার কথা। কিন্তু আমার আপাদমস্তক যেন অনবরত হুলযুক্ত বিছার কামড়ে বিষাক্ত হয়ে ওঠেছে। নড়ার অবসর নেই। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে আলগা করে ব্যথাতুর অর্ধনিমীলিত চোখে এগিয়ে এলাম। একটা বোরখা পরিহিত মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন সেলের শিক ধরে। গায়ে-গতরে মহিলা ধাঁচের হলেও চেহারায় যৌবনের ছাপ কিয়ৎ প্রস্ফুট।
দারোয়ান পাশে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। তথাকথিত চাচি ইশারায় তাকে বাইরে বের হতে বলল। কিন্তু দারোয়ান হতোদ্যম হয়ে নিজ জায়গায় অবিচল। এবার চাচি(?) ঢিলেঢালা বোরখার পকেট থেকে কড়কড়ে পাঁচশত টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দিল। দারোয়ান খানিকটা ছোঁ মেরে টাকাটা পকেটে চালান করে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেল। পুরো ব্যাপারটা আমি স্পষ্ট বিরক্তি মুখে টেনে প্রত্যক্ষ করলাম। এরপর সেই বিরক্তি নিয়েই বললাম,
— কে আপনি? আমার চাচির সঙ্গে তো আনাদের কোনো সম্পর্ক নেই!
থামলাম আমি। মায়ের মৃত্যুতেও ছোট চাচা কিংবা তার পরিবার আসেনি একেবারের জন্যও! সেই ক্ষোভটা ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম। কিন্তু আমার বাকশক্তি এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এসব কথা বেখাপ্পা। চেপে গিয়ে মুখ ফেরালাম। কথিত চাচি নেকাবের ফাঁকে ভাসাভাসা দু-চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।চোখের কোণে হয়তো দুইফোঁটা জলও ঝিলিক দিচ্ছে। ঠিক স্পষ্ট নয়। সেদিন চশমাটা স্বর্ণার কাছেই ছিল। কাছের জিনিস ঝাপসা ধূসর মনে হয় আমার কাছে। একবার মনে হল,এই চোখ আমি অনেকবার দেখেছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি। সঙ্গে সঙ্গেই সব চিন্তা মাথা ঝাড়া দিয়ে ঝেটিয়ে বিদায় করে আবার বললাম,
— আচ্ছা মুশকিল! দারোয়ান এক্ষুনি চলে আসবে। যা বলার বলে ফেলুন।
মহিলা এবার দুই চোখের পাতায় জমে থাকা কুয়াশা নিংড়ে নিয়ে নেকাব উল্টালেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি একটা ধাক্কা খেলাম। আমার মিটিমিটি জ্বলতে থাকা কূপির ন্যায় চোখ দু’টো আচানক ধক করে জ্বলে উঠে বিস্ফারিত হল।বিস্ময়-জড়ানো গলায় আমি আওড়ালাম,
— জুহি!
আমার ভ্রম ভাঙাতে জুহি বলল,
— হ্যাঁ জুহি।
এরপর আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি পাঠিয়ে ফিরে তাকিয়ে বলল,
— আমার দুইদিন ডিউটি নেই। সেই সুযোগেই এসেছি। আজই চলে যাব। স্বর্ণা জানিয়েছিল আমাকে তোমার কথা।
আমি অবনতমস্তকে চুপ করে রইলাম। জুহি আমার ব্যথিত দুই হাত ধরলে মোটা লোহার শিকের ফাঁকে। এরপর ব্যগ্রকণ্ঠে প্রায় কান্নার সুরে আবার বলল,
— একি,অবস্থা হয়েছে তোমার!
বলে কম্পিত হাতে মুখে একবার হাত গিয়েও সংকোচে ফিরিয়ে নিয়ে হাত পর্যন্তই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখল।
আমি মলিন হেসে বললাম,
— স্বর্ণার তথ্য জানতে চেয়েছিল ওরা…
পুরো বাক্য বলতে হল না। জুহি বুঝে নিল এবং ঘাড় ঘুরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস উপহার দিল। এবার আমি চঞ্চল হয়ে বললাম,
— স্বর্ণার সঙ্গে দেখা হয়েছে? কেমন আছে ও?
জুহি প্রথমে সাত-সতেরো বুঝালেও আমি ঠিকি ধরে ফেললাম।বললাম,
— সত্যি করে বল স্বর্ণা কেমন আছে।
জুহি বোধকরি একটু সময় নিয়ে নিজের ভিতরে কথা গুছিয়ে নিল।
— এসেই দেখি ও প্রচুর সিগারেট খাচ্ছে, খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই। আর রাতদিন জিম সেন্টারে ঘাম ঝরাচ্ছে।
শুনে আমি এক নৈরাশ্যমিশ্রিত দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। অনেক কাটল বাক্যহীন। দারোয়ান তাগাদা দেয়া শুরু করেছে খানিক পরপর। জুহির চোখ নিষিক্ত হয়ে আসছে বারবার। লজ্জিত হয়ে বারবার গোপন করতে চেয়েও পারছে না। আমি জানি জুহি ছিঁচকাঁদুনী নয়। তারপরও সে কাঁদছে। শুধু আমার জন্য। যে আমার জন্য এতোটা ঝুঁকি নিয়ে এতটুকু পর্যন্ত এসেছে, সে-ই আবার স্বর্ণাকে বলে, এখন আর আমাকে ভালোবাসে না!
আমি ধীরে ধীরে বিস্রস্ত পায়ে কাঠের খাটে ফিরে এলাম। মাদুরের নিচে রাখা কাগজ কলম নিয়ে খসখস করে কয়েক ছত্র লেখা হাতে করে ফিরে এলাম পুনরায়। জুহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,
— স্বর্ণাকে দিও। আর… আর তুমি এসবের মধ্যে থেকো না, এটা আমার অনুরোধ। তোমার ঘরে অসুস্থ মা আছে, কলেজ পড়ুয়া ভাই আছে। আমি চাইনা আমার জন্য অন্যকারো ক্ষতি হোক।
জুহি চোখ নামিয়ে কাগজটা নেড়েচেড়ে দেখার ভান করে রইল। তার দুই চোখের পানি গড়িয়ে এসে নাকের ডগায় দুলছে। যেই মুহূর্তে টুপ করে তা গড়িয়ে পড়বে তার আগেই সে দ্রুত মুছে নিয়ে তড়িদ্দামের মতো ঘুরে গেল। না তাকিয়েই অপ্রকট কথা ধামাচাপা দিয়ে বলল,
— যাই…
— ঠিক আছে।
আমার কথা জুহির কানে পৌঁছাল কি না জানি না। সে নেকাব নামিয়ে ছদ্মবেশী পৌঢ়ার ভড়ং ধরে দ্রুত প্রস্থান করল সেই স্থান হতে। আমি আপনমনে মলিন হেসে ধীর পদে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।
বলা বাহুল্য, উক্ত কাগজ কলম আমি অনেক কষ্টে জোগাড় করেছিলাম দারোয়ানকে বলে কয়ে। ভেবেছিলাম কোনরূপে স্বর্ণার কাছে একটা বার্তা পাঠাব। ঠিকই কাজে লাগল। সময় সল্পতার কারণে বেশিকিছু লেখা হয়নি বটে,কিন্তু যা লিখেছি এতেই স্বর্ণা একটুখানি কূল পাবে বলে আশা করা যায়।
এরপর আরো দুইদিন কাটল কোন ঘটনাবিহীন। মাঝেমধ্যে দুইজন এসে জেরা করে এই বলে যে, সব বলে দাও, নাতুবা আবার রিমান্ডে নেওয়া হবে। কিন্তু আমার আগাগোড়ায় কোনোপ্রকার হেলদোল নেই। নির্জীবের মতো শক্ত কাঠের ‘পরে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছি। মনে শুধু একটাই এলোথেলো চিন্তায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি, প্রয়োজনে নিজ জীবন জলাঞ্জলি দেব। তবু স্বর্ণার কোনো তথ্য এঁদের হাতে সঁপে দেব না। এতোদিনে আমার সমস্ত দেহ-মনে মেনে নিয়েছে যে,স্বর্ণা কোনো খারাপ কাজ করছে না!
আজকের দিনটাও চৌদ্দ শিকের ভেতরে চারদেয়ালের মাঝে গড়িমসি করতে করতে কেটে গেল। সম্ভব রাত আটটার দিকে খাবার দিয়ে গেল। আমি ছুঁলাম না। একমনে শুয়ে রইলাম। শেষে পেটের ভেতরে যখন খিদেরা খাবারের নিমিত্তে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু করল, তখন ভগ্ন শরীরটা ধীরে ধীরে তুলে খাবার খেতে বসলাম। সিদ্ধ চাউলের ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল আর গতরাতের আধবাসি বরবটি ভাজি। এই খাবার কেমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত হয় তা আমি বেশ জানি। ছোট্ট পুলিশী জীবনে অনেক অভূতপূর্ব ঘটনা আমি গভীরচোখে অবলোকন করেছি৷ প্রতিবেলায় কথঞ্চিৎ দুই গ্রাস খেয়ে ঢোক ধরে পানি খেয়ে খুদা নিবারণ করতাম। তবু মাঝরাতে আবার উদরযুদ্ধ শুরু হতো। কিন্তু আজ সেই দুই গ্রাসও মুখে তোলা হল না। হঠাৎ চারিদিকে প্রবল গোলাগুলি শুরু হল। ক্রমে সেই গোলাগুলির মাত্রা থেমে থেমে দ্বিগুণ হতে লাগল এবং খুব নিকট হতে আর্ত চিৎকার পুরু দেয়াল ফুঁড়ে কর্ণকুহরে বেঢপ জ্বালা শুরু করল। আমি কিছুটা সশঙ্কে এবং কিছুটা আশাহত হয়ে খাবার ঠেলে খাটে এসে বসলাম। প্রাণটা বুঝি এবার গেল! যাক! ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে এক গুলিতে ঠাস করে মরে যাওয়া উত্তম। একটি বুলেট দেয়াল ভেদ করে গুড়গুড় করে শক্ত কংক্রিট গুড়িয়ে দিয়ে ক্বচিৎ মেঝেতে বিছিয়ে দিল আর কিছু ধোঁয়ার মতোন ঘরময় ঘুরে ঘুরে সঞ্চরণ করতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করে প্রমাদ হয়ে আছি। নিজের মৃত্যুকে যেন চোখের সামনে খেলা করতে দেখছি। যে কোনো মুহূর্তে রুহ’টা কেড়ে নিয়ে শীর্ণ দেহটাকে রেখে যাবে।
প্রায় মিনিট দশেক পর গুলি করে সেলের তালা ভাঙার শব্দে চোখ মেললাম আমি। দারোয়ান পালিয়েছে বহু আগে। শিরদাঁড়া বাঁকা করে ঝুঁকে একজন মানুষ ঢুকল ভেতরে। পরনে আলখাল্লার মতো বিশাল পোশাক। আগাগোড়া মুখে কিম্ভুত এক ধরণের মুখোশ। কাঁধে কোমর অবধি ঝুলানো লম্বা ব্যাগ। হাতে সেইফটি গ্লাভস্। চোখে কালো চশমা। সেই চশমা থেকে বিদ্যুতের মতো আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। হাতে বিশালাকারের নাম না জানা এক বন্দুক। মানুষটি আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে হঠাৎ মাঝখানে এসে থমকে দাঁড়াল। চশমাটা খুলতে চেয়েও হাত নামিয়ে ঋভুর দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। এরপর আমাকে পাশ কাটিয়ে অনবরত দেয়ালের চারপাশে গোল করে গুলি চালাল। দেয়াল হয়ে গেল ভঙ্গুর। লোকটা দুই পা পিছনে এসে সবেগে কিক করল গুলি ছুঁড়ে বন্ধুর করা দেয়ালের অংশটাতে। দেয়ালটা ভেঙে গড়গড়িয়ে বহির্দেশে স্খলিত হয়ে পড়ল। ভেঙে পড়তেই সেই ফাঁকা অংশে এক ঝাপটা দমকা বাতাস আমার সর্বশরীর হিমায়ন করে তুলল। মনে হলো দীর্ঘদিন পর আমি পৃথিবীতে অবতারণ করলাম। এতোদিন আমি অচেনা আজানা বন্দী কোনো জগতের অস্থায়ী বাসিন্দা ছিলাম। আজ ফিরে এসেছি! ততক্ষণে আমি হতবুদ্ধি হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। পুরো ব্যাপরটা স্বপ্নাচ্ছন্নের ন্যায় দেখলাম আমি। অজ্ঞাতনামা লোকটা পকেট থেকে একটা সিরিঞ্জ খুঁজে বের করে চোখের পলকে আমার ঘাড়ে পুশ করে দিল। আমি ব্যথায় খানিক কুঁকড়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেলাম লোকটার ওপর। এরপর আর তেমন কিছু মনে নেই আমার। হুঁশ ঠিকই ছিল কিন্তু শরীর ছিল মড়ার মতো। শুধু ঝাপসা মনে পড়ে, আমি লোকটার কাঁধে আর চারিদিকে শরৎকালীন কালবৈশাখী ঝটিকার লীলাখেলায় মেতে উঠেছে নিষ্ঠুর প্রকৃতি।
পুরোপুরি চৈতন্য যখন ফিরে পেলাম তখন শরীরে স্বস্তি ফিরেছে কিছুটা। চারিদিকে ঔষধের উৎকট গন্ধ। সেই কাঠের বিছানার বদলে তুলা জামানো নরম বিছানায় আমার পিঠ। চোখ ঘুরাতেই দেখলাম স্বর্ণা ঈষৎ ঝুঁকে আছে আমার মুখের ওপর। তার চোখে অবৈধ হাসিমাখা জলের ফোয়ারা। চেহারা মলিন। গালের দুইপাশে ঝুলছে সিল্কি ঘনকালো চুপ। সে ভেজা কণ্ঠে হেসে বলল,
— কেমন লাগছে এখন?
আমার গতরাতের সমস্ত ঘটনা একে একে মনে পড়ে গেল। তাহলে সেই অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকটা স্বর্ণাই ছিল? নিঃসন্দেহে! যদিও আমি সেই দুই ছত্রের চিঠিতে আমার নিজের কথা কিছু উল্লেখ করিনি। যা করেছি, তা শুধু স্বর্ণার সাবধানতার কথা। তবুও সে এতো হন্তদন্ত হয়ে জীবন বাজি রেখে কেন ছুটে এলো সেটাও আমার অবিদিত নয়। সম্ভবত জুহি-ই আমার অবস্থার কথা নিজ সখীকে অবগত করেছে। কিন্তু সে আমাকে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করবে বা কেন? পুলকে প্রশ্নটা খেলে গেল মনে৷ সযত্নে রেখে দিলাম,পরে জানা যাবে। স্বর্ণা হালকা নাড়া দিয়ে বলল,
— কী হল! কথা বলছ না যে।
আমি হেসে বললাম,
— বোবা হইনি। চিন্তা নেই। শরীরের ব্যথাটা খানিক কমেছে। কিন্তু কীভাবে?
— ঔষধ লাগিয়েছি।
আমি নিজের দিকে একবার তাকালাম। তিনদিনের রিমান্ডে আমাকে আঘাত করেনি শরীরে এমন স্থান পাওয়া বিরল। পায়ের তলা হতে মাথার চুলের ডগা পর্যন্ত নির্যাতন চালিয়েছে তারা। আমি সলজ্জিত হয়ে বললাম,
— ঔষধ কে লাগিয়েছে?
— আমি! কেন কোন সমস্যা?
আমি রসিক গলায় বললাম,
— নাহ,তোমার তো আবার কাটাকুটার অভ্যেস আছে। তাই ভয় লাগল আর কি!
স্বর্ণা মৃদুহাস্যে কৃত্রিম রাগ নিয়ে ঠোঁট সংকুচিত করে চোখ কড়কে তাকাল। কখনো হাসির ছটা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর কখনো হাসির দীপ্তি ইচ্ছেকৃত ম্লান করে রাগের ভান ধরছে। সেই দৃষ্টির সম্মুখে আমার টিকে থাকা দায়। তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আধশোয়া হয়ে বসলাম ধীরে ধীরে। স্বর্ণা বলল,
— চিন্তা করো না। সব ঠিক আছে কিনা চেক করে দেখতে পার।
বলতে খাট থেকে নেমে “আসছি” বলে ঘরময় দুর্নিবার লজ্জার নহর বইয়ে দিয়ে কি এক কাজে ছুটে পালাল। আড়াল করে নিল নিজেকে।
এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম আমি আমার সেই চিরপরিচিত ঢাকার বিলাসবহুল বাড়িটাতে অবস্থান করছি। যদিও এই ঘরটাতে আমার খুব কমই আসা হতো। মাসাধিক পরপর বাবা এলে থাকত এই ঘরে। কাজেই আমার কখনো আসার প্রয়োজন পড়েনি। স্বর্ণা এতো ঘর ফেলে এই ঘরেই কেন ঠায় নিল কে জানে! স্বর্ণা নিশ্চয় আমাদের রাঁধুনি খালা থেকে এই ঘরের চাবি উদ্ধার করেছে। কতদিন খালাটার খোঁজ নেয়া হয় না! একটা দীর্ঘশ্বাস উচ্ছ্বসিত হয়ে বেরিয়ে এলো আমার বুকের নদী হতে। মিনিট দশেক কর স্বর্ণা ফিরে এলো খাবারের ট্রেতে করে খাবার সাজিয়ে।আমার পাশে এসে বসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— কালকে আমাকে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করেছিলে কেন?
স্বর্ণার খাবারের ট্রে টা পাশের টেবিলে রেখে বলল,
— কারাগারের চারপাশে সিসি ক্যামেরা আছে। যাতে লোকে বুঝতে না যে আমিই সেই ট্যারোরিস্ট যার সঙ্গে তোমার যোগসূত্র আছে,যে এতগুলল রেপিস্টকে মেরেছে। তারা যেন এটা ভেবে নেয় যে আমি অন্যদলের কেউ। বুঝলে?… গাধা!
শেষ শব্দটা মুখ ফিরিয়ে প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে উচ্চারণ করল স্বর্ণা। আমি চুপ করে রইলাম। নিজেকে আদতেই মস্ত বড় গাধা মনে হল। সামান্য বিষয়টা মাথা ঢুকল না! স্বর্ণাকে বিভিন্ন পদের খাবার প্লেটে তুলতে দেখে বললাম,
— এতোগুলা খাবার কি মুখে রুচবে? বাজার কে করে দিল?
স্বর্ণা না তাকিয়েই বলল,
— তোমাদের খালা করে দিয়েছে। রান্নাও করতে চেয়েছে অবশ্য। আমি করতে দিইনি। মহিলাটার শরীরও ভালো নেই।
আমি একটু থেমে বললাম,
— বাবা ওনার মাইনে দিয়েছে? জানো কিছু?
— হ্যাঁ আংকেল নাকি ওনার এক বছরের টাকা অগ্রীম পরিশোধ করে দিয়েছে।
— আচ্ছা।
স্বর্ণা খাবার বেড়ে নিল। নানাবিধ পদের তরকারি দিয়ে মেখে একটা লোকমা মুখের সামনে ধরে বলল,
— নাও হাঁ করো।
আমি বাধ্যগত পালিত প্রাণীর ন্যায় একে একে পুরো প্লেট উদরসাৎ করে নিলাম। মুখে রুচবে না মনে হয়েছিল বটে,কিন্তু জঠরের চাহিদা তো আছে! আমি না করলেও স্বর্ণাই বা শুনতো কেন? খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে স্বর্ণা জানাল,
— পুরো দেশ এখন গত রাতের ঘটনা নিয়ে তোলপাড়। সিসি টিভি ফুটেজের ভিডিও ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি শঙ্কিত চিত্তে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— ফুটেজে তোমার মুখে শুধু মুখোশ ছিল। কিন্তু আমার মুখ তো খোলা ছিল!
স্বর্ণা ধূর্ত হেসে বলেছিল,
— আমি অতো বোকা না। ইনজেকশন দেয়ার পর তোমার মুখেও মাস্ক লাগিয়েছি আমি৷ সুতরাং, কিছুই ফাঁস হয়নি। তোমাকে এবং আমাকে কেউ চিনতে পারবে না।
স্বর্ণার রহস্যজনক অর্ধকথন আমার ভালো লাগল না। ঘটনার আদ্যোপান্ত জানার জন্য মনে মনে চরম উদগ্রীব হলাম। তখন আপাতত ভুঁড়ি ভোজনের জোরে কথাটা চাপিয়ে রাখলাম মনের অতলান্তে। খাওয়া শেষে স্বর্ণা যখন ট্রে নিয়ে ফিরে গেল রান্না ঘরে। আমি তৎক্ষনাৎ সকল অবসন্নতায় জল ঢেলে উঠে দাঁড়ালাম। বাবার এই ঘরে একটা টিভি ছিল। অচিরাৎ ড্রয়ার হাতিয়ে আলমারি হাতড়ে রিমোট খুঁজে বের করে টিভি অন করলাম। ঘড়িতে সময় তখন আটটা। অর্থাৎ প্রায় একদিন আমার সংবিৎ ছিল না। এতক্ষণ সেই বিষয়টি আমার মাথাতেই আসেনি। যাইহোক, আটটার সংবাদ দেখে যা বুঝলাম, পরিস্থিতি অনুকূলে। স্বর্ণার একক কারাগার হামলায় কেউ নিহত হয়নি। হয়েছে আহত। নিটোল নিশানায় সবারই অগুরুত্বপূর্ণ স্থানে শুট করা হয়েছে। এই খবর শুনে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটেছে আমার। এটা ভেবে মন প্রফুল্ল হচ্ছে যে,স্বর্ণা অকারণে কাউকে হত্যা করছে না। তবে আমাকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে র্যাব,পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী। যদিও আমার কথা বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেনি কোনো সংবাদ মাধ্যম। অজানা কিংবা দিব্য কারণে আমার সমস্ত কুকীর্তি এখনো লুক্কায়িত। তবুও এটাই আমার সম্ভাব্য উৎপ্রেক্ষা। এতবড় ঘটনার পর আমাকে পুরো দেশে চিরুনি অভিযান চালিয়ে খুঁজবে এটাই অতি স্বাভাবিক! দেশের শীর্ষ পদস্থ লোকেদের বিভিন্ন জনের বিভিন্ন অনুমান,অভিমত গণমাধ্যমে প্রকাশ করে যাচ্ছে একের পর এক। কিন্তু সবচে’ বড় সত্যটা যে এই বাড়ির ভিতরেই আবদ্ধ সেই সংবাদ অন্তর্যামি আর তিনটি প্রাণ ভিন্ন সকলেরই অজ্ঞেয়৷
ছাদের এককোনায় নিচের দিকে পা ঝুলিয় বসে আছি আমি আর স্বর্ণা। রাত্রি তখন একভাগ পেরিয়েছে। জনারণ্য ঢাকা বিনিদ্র। চাঁদ নেই। রাত্রির আকাশের ফর্সা বুকে দুলছে শুধু কয়েকগুচ্ছ এলো তারা। তারাগুলো একাধারে দোদুল্যমান এবং জ্বাজ্জল্যমান। পাশের দালানের ছাদে লাগানো বড়বড় গাছগুলোর আড়াল হতে ঝিঁঝি পোকা চিৎকার করে চলেছে নিরবচ্ছিন্ন। এই ছাদের প্যারাপেট নেই। নিচের দিকে তাকাতেই মাথা ঘুরে ওঠছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ছাদে আমার অবসাদগ্রস্ত শরীরে নিয়ে আসতে চায়নি স্বর্ণা। তবু আমার জিদের কাছে পরাস্ত হয়ে নিয়ে আসতেই হল। হদ্দমুদ্দ এক সপ্তাহ থেকেছি কারাগারে অন্ধকার কূপে। এরই মধ্যে মনটা বিতৃষ্ণা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে যেন কলঙ্কিত আবিলতায় ঠেসে আছে। অস্বস্তি লাগছে প্রতিটা ক্ষণ। সেই অস্বস্তির ক্ষুরধার কাটাগুলো খোলা আকাশের নিচে একটুখানি প্রকৃতির সান্নিধ্যে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টায় আমার অকারণ গোঁ ধরা। স্বর্ণা দুই হাত দিয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে পাছে ব্যথাকাতর শরীরে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাই! ছাদে আসার পর থেকে স্বর্ণা একটা কথাও বলেনি। আমি কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— চুপ করে কী এতো ভাবছ?
নির্বিকার গলায়
— কিছু নাহ… স্বর্ণা বলল নির্বিকার গলায়।
— সুন্দরী একটা যুবতী আমার পাশে বসে আছে, অথচ কিছু বলছে না। এটা কিন্তু ভালো দেখায় না।
স্বর্ণা তাকাল আমার দিকে।বলল,
— আমি বুঝি সুন্দরী! আগে তো কখনো বলোনি!
আসলেই আগে কখনো অন্যান্য কপোত-কপোতীর মতোন ঘনঘটা করে ভালোবাসি বলা হয়নি কিংবা একে অন্যের প্রশংসা করা হয়নি। আমরা ভালোবাসি জেনেছিলাম মনের সঙ্গে মনের গোপন বার্তায়। মুখের নয়। আমি একটু অপ্রতিভ হয়ে বললাম,
— বলিনি তো বললাম!
স্বর্ণা মুখ ফেরাল আবার। হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে বলল,
— অব্যক্ত সব কথা বলে দিচ্ছ! সময় বুঝি শেষ হয়ে এলো, না?
— তুমিও তো সেদিন বলেছ!
— হুম,তাইতো বললাম,সময় বোধহয় শেষ হয়ে এলো!
আমি একটু চুপ থেকে কি যেন চিন্তা করলাম নিজেই জানি না। হুট করে বললাম,
— ধ্যুর, সময় শেষ হয়ে এলে জেল থেকে আমাকে নিয়ে আসার কী দরকার ছিল?
— একসাথে মরব বলে…
স্বর্ণা একটু থামে। আবার বলে,
— আমার জন্য তুমি কত নির্যাতন সয়েছ। আমার জন্য সারাশরীরে নির্যাতনের চিহ্ন তোমার। তুমি জানো না গত রাত থেকে তোমার গায়ে মলম লাগাতে লাগাতে কত কেঁদেছি।
আবার থামে স্বর্ণা। বড় বড় নিশ্বাস নেয় সে। আবার বলে,
— আমার না পাগল পাগল লাগছে। নিজেকে চরম অপরাধী মনে হচ্ছে। সেদিন নাইট ক্লাব থেকে তোমার পিছু না নিলে, তোমার ভবিষ্যতটা অন্যরকম হতে পারতো। দেখলে, কত্ত খারাপ আমি! নিজের জীবন তো নষ্ট হয়েছেই। সঙ্গে তোমারটাও অনিশ্চয়তায় দুলছে। কোন্ কবি যেন বলেছিল, “নারী একা ডুবে না, আশেপাশের কয়েকজনকে নিয়ে ডুবে” কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
বলতে বলতে আমার নির্যাতিত স্থান হাতে, পিঠে, বুকে,উরুতে হাত সঞ্চালন করতে করতে ফুঁসে ফুঁসে নিঃশব্দ কান্না করে চোখের নির্ঝরে যেন সমস্ত আপরাধ ঝরিয়ে দিতে লাগল। কপোলের নির্দিষ্ট জায়গা হয়ে চোখের প্রাকার পেরোনো বাঁধভাঙা লোনা জল গড়িয়ে পড়ছে কোলে। আমি আমতা আমতা করে বাঁধা দেয়ার প্রয়াসে বললাম,
— কি কান্না শুরু করলে। তোমার জন্য আমি এটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারব না? এতে তোমার অনুতপ্ত হওয়ার কী আছে?
স্বর্ণা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
— তুমি কেন করবে ত্যাগ? আমিতো কখনো কিছু করতে পরিনি তোমার জন্য।
— পারোনি, ভবিষ্যতে পারবে!আজকেই তো আমরা মরে যাচ্ছি না!
এরপর স্বর্ণা একটু ধাতস্থ হল৷ তার পরবর্তী অনুষঙ্গে বোঝা গেল সে এখন নেক্সট মিশনের দিকে আলোকপাত করতে শুরু করেছে। আমি ধরা পড়ার দিন তো সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। রাজিবের অন্য কোনো বড় পরিচয় আছে জেনে এবার আরো গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছে সে। এবার আর টার্গেট মিস হওয়া যাবে না!
হঠাৎ পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দে চমকে রাস্তার দিকে দৃষ্টিপাত করলাম দু’জনে। দারোয়ানকে আগে থেকেই বলা আছে এই বাড়িতে কারো অবস্থানের কথা যাতে কাউকে না বলে। রাস্তার মোড় ঘুরে গাড়িটা এসে থামল আমাদের দালানের ফটকের সামনে। একজন পুলিশের সদস্য আঙুল নেড়ে নিশ্চিত করল এটাই তাদের লক্ষ্যস্থল। গটগট করে পা ফেলে জিপ থেকে নামাল পুলিশের টীমটি। স্বর্ণা মৃদু ঠোঁট নেড়ে বলল,
— লাফ দিতে পারবে? অন্য উপায় নেই।
আমি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বললাম,
— লাফ দিলেও তো মরণ নিশ্চিত!
— পুলিশের হাতে পড়লেও মরণ নিশ্চিত।
চলবে…