শেষ সূচনা পর্ব-৩১

0
368

#শেষ_সূচনা
পর্বঃ৩১
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ

— পুলিশের হাতে পড়লেও মরণ নিশ্চিত।
পুলিশের টীমটি দারোয়ান থেকে কি যেন জিজ্ঞেস করে বাড়িতে ঢুকল। দারোয়ান পুলিশকে কি জানাল ঠিক বোধগম্য হল না। স্বর্ণা চপলদৃষ্টিতে দ্রুত আশেপাশে বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে লাগল। বোধ হয় পেলেও গেল। বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়াল সে। তার বাহুপাশে আমার ধরা হাতটা ধরে অনেকটা তাড়াতাড়ি দাঁড় করিয়ে বলল,
— পাশের বাড়িটা দেখছ? এই বিল্ডিং থেকে চার ফিট দূরত্বে। দেখো ওখানে বড় গাছপালাও লাগানো আছে। সহজে ঘাপটি মেরে থাকা যাবে।
আমি বেজায় দ্বিধায় পড়লাম। চার ফিট কেন, এক ফিট দূরত্বেও লাফ দেয়ার মতোন শক্তিসামর্থ্য আমার শরীরের কোনো নিগূঢ় কোনে অবশিষ্ট নেই। ঘন তিমির রাতেও স্বর্ণা যেন আমার মুখের ওপর অক্ষমতার ছায়াপাত অবলোকন করল৷ ঘোর বিপদেও মুচকি হেসে আশ্বাস দিয়ে বলল,
— আরে আমি আছি তো। পড়বে না। এই যে হাত ধরে আছি।
বলে ধরা হাতটা একটু উঁচিয়ে দেখাল স্বর্ণা।
সিঁড়ি ঘরের কাছে কয়েক জোড়া বুট জুতার খটখট শব্দ শোনা গেল। স্বর্ণা আর দেরি করল না। রুদ্ধশ্বাসে একবার সেদিকে তাকিয়ে আমার হাত ধরে দৌড় দিল পাশের দালানের ছাদের দিকে। আমিও শরীরের অবশীভূত সমস্ত শক্তি পায়ের কাছে এনে প্রাণপণে দৌড়ালাম স্বর্ণার হাতকে ভরসা করে। বলা উচিত, ঐ ছাদের প্যাটাপেট ছিল। কার্নিশের কাছাকাছি এসে লাফ দিলাম দু’জনে। স্বর্ণা ওপারে পৌঁছে গেল অবলীলায়। আমি অর্ধেকেই পরাভূত হলাম এবং সঞ্জীবনী ভূমিকা পালন করে স্বর্ণা শক্ত করে আমার হাত আঁকড়ে হ্যাঁচকা টানে ওপারে নিয়ে গেল। আমি অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠে ছাদে বসে বড়বড় নিশ্বাস নিতে লাগলাম। স্বর্ণা আমার বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। এর কয়েক সেকেন্ড পরই কয়েকজন পুলিশ সদস্য টর্চ হাতে এসে চটুল চোখ বোলালো ছাদের চারিকোণে। আমরা যথাক্রমে মেহেদি গাছ এবং কলবে লাগানো আম গাছের নিচ প্রান্তে অবলুণ্ঠিত হলাম। পুলিশ সদস্যগুলো মিনিট দুয়েক আশেপাশে পায়চারি করে তিরোহিত হল। তবুও বিপদের রেশ কাটেনি ভেবে আমরা বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে রইলাম। শরতের স্নিগ্ধ সারবান রাত। কুয়াশা নেমে হিমশীতল হয়ে কংক্রিটের ছাদ। খানিক পরপর মেহেদি গাছের ছোট্ট পাতা কুয়াশার জল বুকে ধরতে না পেরে উগরে দিচ্ছে আমার গায়ের ওপর। শিউরে উঠছি আমি। শজারুর মতো খাড়া হচ্ছে রোমকূপ। বেশিক্ষণ এইভাবে থাকতে হল না। মিনিট দশেক তল্লাশি চালানোর পর বোঝা গেল পুলিশ পরাভব মেনে যেভাবে উচ্চস্বরে সাইরেন বাজিয়ে এসেছিল ঠিক তার উল্টো করে নিঃশব্দে প্রস্থান করল। আমরা আগের মতোই কসরত করে নিজেদের ছাদে ফিরে এলাম। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম, স্বর্ণার এতো লুকোচুরি শুধুমাত্র আমার জন্যেই। নয়তো পুলিশগুলোকে এক হাতের আঙুলে ঘুরিয়ে এক রুমে আবদ্ধ করতো সে। কারণ এসব কাজেই সে আজীবন সিদ্ধহস্ত।

এরপর প্রায় সপ্তাহখানেক কেটে গেল। পুলিশী অভিযানের দুইদিন পরেই বাড়ি ছেড়ে আমরা একটা মোটামুটি ভালো মানের হোটেলে ওঠেছি। ঝুঁকি নিয়ে থাকার কোন মানে হয় না। তদুপরি আমার শরীর তবিয়ত ঠিক ছিল না। আকস্মিক আক্রমণে দ্রুত পালানোর জো ছিল না। পুরো একসপ্তাহ ধরে বিছানায় নিরন্তর বিশ্রাম আর স্বর্ণার শুশ্রূষায় আমি সম্পূর্ণ আরোগ্য চাঙা হয়ে ওঠলাম। রিমান্ডের তিনদিন অবিরাম বিবিধ অত্যাচারে যে স্বাস্থ্য পোকায় ধরা লেবুপাতার মতো ক্ষয়ে গিয়েছিল সে স্বাস্থ্য যেন স্বর্ণার সেবার সারের উৎকর্ষে ক্ষয়ে যাওয়া পাতা ঝরে নতুন ডগা অঙ্কুরিত হল। পুনরায় আগের মতো হয়ে ওঠলাম আমি। এদিকে বাহিনীগুলো মতিগতি বড় বোঝা যাচ্ছে না। সারাদিন শঙ্কিত হয়ে থাকতে হয়। পাছে কোথাও না আবার ওত পেতে থেকে গায়ের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে! স্বর্ণার পরিকল্পিত কারাগার হামলায় এরিমধ্যে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ টিভিতে এই সংবাদ দেখে স্বর্ণা মিনিট কতক টানা অট্টহাসি হাসল এলোথেলো হয়ে, আমার গায়ে আছড়ে পড়ে, ইচ্ছেকৃত খোঁচা দিয়ে। এরপরও হাসি থামে না, হাস্যবিকৃত গলায় বলে,
— দেখলে তোমাদের পুলিশের অবস্থা! আমার প্ল্যানে হেল্প করা চ্যালাপ্যালদেরও তো গ্রেফতার করতে পারল না। কোত্থেকে কোন ব্যাক্কল কতগুলো ধরে জেলে পুরে দিল!
আমি গর্বভরে বললাম,
— আমি হলে ঠিকি বের করতাম গর্তের সাপ।
স্বর্ণা আরেকদফা হেসে নিয়ে বুড়ো আঙুল দুলিয়ে বলল,
— কচু পারতে…
আমি আর বাগ্বিতণ্ডা করলাম না। স্বর্ণা এবার গুরুত্বপূর্ণ গলায় বলল,
— এদের প্রত্যেকের মাথার ওপর একটা একটা রাঘববোয়াল আছে। দু’দিন পরই নিঃশব্দে ছাড়া পেয়ে যাবে দেখে নিও।
আমি দেখে নেয়ার অপেক্ষাতেই রইলাম। ক্রমে দিন গড়াচ্ছে। স্বর্ণা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে রাজিবের ব্যাপারে। কে হতে পারে রাজিব? কোন্ জলের মাছ সে? মিঠা পানির? না নোনা পানির? যার কারণে প্রশাসনের এতো চাপা উৎকণ্ঠা? রাতদিন অষ্টপ্রহর হোটেলে বসেই এসব নিয়ে গবেষণায় নিবিষ্ট থাকে সে। এভাবে দিন অতিবাহিত হয়। হোটেলের ভাড়ার টাকা জমে ক্রমশ। কখনো স্বর্ণা তার অতলস্পর্শ উৎস থেকে আর কখনো আমি বাবার সিন্দুক থেকে টাকা পরিশোধ করতে থাকি৷ শেষ পর্যন্ত স্বর্ণা আবিষ্কার করে রাজিব মূলত কোন জলের মাছ। তার আবিষ্কার অনুসারে পুরো ঘটনা এইঃ-
আজ থেকে ছয় বছর আগে রাজিব চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসে পড়ার জন্য। বাপের অঢেল টাকা থাকার দরুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার নামে নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে সে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তো বর্তমান প্রেসিডেন্ট শাহরিয়ারের এর মেয়ে শাহনাজ। যে মেয়ে তখন পুরো ভার্সিটিতে একা রাজত্ব করতো। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া রাজিব তথা স্বর্ণার মূল শিকার শাহনাজের সঙ্গে ছলে বলে কৌশলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে। শাহনাজও রাজিবের বাবার অগাধ ঐশ্বর্যে অন্ধ হয়ে অকপটে রাজিবের ধৃষ্ট বর্শির টোপ গিলে নেয়।
শাহরিয়ার তখন(ছয় বছর আগে) প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তবে বিরোধীদলীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন নেত্রী। তখন থেকেই তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করেন নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্য। শেষে যখন ২০১৯ সালের নির্বাচনে শাহরিয়ার জয়লাভ করেন তখন তার মেয়েও একটি অল্পবয়সেই বাবার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে সিটি মেয়র পদে আসীন হয়। এর আগেও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল সে। এবং একই সালে ধুমধাম করে রাজিব এবং শাহনাজের বিয়ে হয়। যা কুলক্ষণেও স্বর্ণার দৃষ্টিগোচর হয়নি। মূল ঘটনা এখানেই। প্রেসিডেন্টের জামাতাকে রক্ষার জন্যই সংগোপনে এতোটা তৎপর হয়েছে বাহিনীগুলো। এমনকি গোপনসুত্রে এও জানা গেছে যে শাহনাজ এরইমধ্যে রাজিবের বিরুদ্ধে বেঁকে বসেছে৷ সে ধরেই নিয়েছে যে তার স্বামী একজন ধর্ষক! হোক সে সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে যুক্ত,হোক সে নৈরাজ্যবাদী, তবু স্বামী ধর্ষক একথা মেনে নেওয়া তে যে-সে কথা নয়। তথাপি দিনশেষে স্বামী তো! সেই স্বামীকেই বাঁচানোর জন্য আমাকে ধরা হয়েছে,স্বামীকে বাঁচানোর জন্যই স্বর্ণাকে দেখামাত্র ক্রসফায়ারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু স্বর্ণা! সে তো ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে আছে সবার চোখে ধুলো দিয়ে।

স্বর্ণা এখন নিরস্ত্র। অনতিবিলম্বে তার অস্ত্র-সস্ত্র প্রয়োজন।যা ছিল সব প্রায় সেদিনই ফুরিয়েছে। আজ আমাকে হোটেলে রেখে কার কাছ থেকে যেন সেসব অতিপ্রয়োজনীয় সামগ্রী রিসিভ করতে যাবে। হোটেলে আনলে বিপদে পড়ার আশঙ্কা আছে বলে গুপ্ত কোনো স্থানে রাখার বিষয়টাও ফোনে নিশ্চিত করেছে সে।
বসে আছি বিলাশবহুল পনেরো তলা হোটেলের দশম তলার ফ্লোরের বারান্দায়। ভেতরে ঘরে স্বর্ণা তৈরি হচ্ছে বাইরে বেরোনোর জন্য। শরৎকাল পেরিয়ে হেমন্ত গুনগুন করছে সকালের স্নিগ্ধ বাতাসে৷ হালকা শীতের আমেজপূর্ণ প্রভাতের রৌদ্রকিরণের বর্ণচ্ছটায় বারান্দায় ঝোলানো নানাবিধ ফুল গাছের পাতাগুলো প্রসন্নমনে খেলা করছে মৃদুমন্দ বাতাসে। সাদা গোলাপ গাছের কণ্টকাকীর্ণ পাতার আড়ালে উঁকি দিচ্ছে সুনীল আকাশে সুবিমল দিনমণি। প্রাতঃকৃত্য সেরে বেরিয়ে পড়েছে ব্যস্ত শহরে ব্যস্ত মানুষগুলো। শুকনো দিনের পিঁপড়ের মতো মানুষগুলো পিলপিল করে একে একে স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে যোগদান করছে। একটু পর স্বর্ণাও সেই মানুষগুলো ভিড়ে চেনা হয়েও অচেনা হয়ে যাবে। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখতে বেশ লাগে। রম মনে হয় পৃথিবীকে। কিন্তু আবার ঐ পিঁপড়ের দলের সঙ্গে মিশলেই দম বন্ধ হয়ে আসে সৌন্দর্য উপভোগ করা মানুষগুলোরও।
দরজার নব ঘুরিয়ে বারান্দায় এসে ঢুকল স্বর্ণা। হাতে কফি আর নাশতা। ট্রে’টা সুমুখের টেবিলে রেখে ইজিচেয়ারে বসতে বসতে বলল,
— কী ব্যাপার সকাল সকাল ফ্লোরে বসে আছ কেন? আস খেয়ে নাও। রুম সার্ভিস দিয়ে গেল মাত্র।
সব শুনেও আমি মূর্তির ন্যায় যেদিকে চেয়ে ছিলাম সেদিকেই তাকিয়ে মানুষের পিলপিল করে হাঁটাচলা দেখতে লাগলাম। স্বর্ণা এবার তারস্বরে কড়কে বলল,
— কী হল। কথা কানে যায় না?
এই কথাটা আমার কানে যেন গলিত শিসার ন্যায় প্রবেশ করল। আমি একহাত রেলিং-এ দিয়ে অনন্যমন হয়ে বাইরে চেয়ে ছিলাম। ধড়ফড় করে সটান বসে ইতস্তত করে বললাম,
— হ্যাঁ বলো।
— বলছি, আজ কেমন আছ? স্বর্ণা একথাটাও আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বলল। আমি মুখ একটু ম্লান করে উত্তর দিলাম,
— ভালোই। জিম সেন্টারে নিয়ে যাও। শরীর ফিট করি একটু।
স্বর্ণা সুমুখে ঝুঁকে ছিল। এবার মুখ ফিরেয়ে হেলান দিয়ে বলল,
— হুমম,কুকুরে কামড়েছে আমাকে, তোমাকে নিয়ে যাব জিমে!
আমিও মুখ ফিরেয়ে আগের মতো বাইরে তাকালাম কয়েক মুহূর্তের জন্য৷ পুনশ্চ স্বর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— রিস্ক তো একটু আছেই বটে। কিন্তু শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। আর কয়দিন এভাবে ঘরবন্দী হয়ে থাকব?
— জানি না। কাল হয়তো বের হবো।
— কোথায়? কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম।
স্বর্ণার মুখ কঠিন। ভুরু কুঁচকে জড়ো। চোখের দৃষ্টিতে আগামীকালের বিজয়ের নিশান। যন্ত্রের মতো করে বলল,
— রাজিবকে ধরতে।
— সে কোথায় আছে এখন? -দ্বিগুণ উচাটনে শুধাই তাকে।
স্বর্ণার সেই সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি রেখেই একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
— এখন ঢাকাতেই আছে। কাল পালাবে ইন্ডিয়ায়। কেউ যাতে সহজে বুঝতে না পারে এজন্য বাসযোগে পাঠানো হবে তাকে।
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— এতসব কী করে জানলে?
স্বর্ণা চিররহস্যময়ী। ঘুড়ির নাটাইয়ের মতো সে। যতই খুলি। খুলতেই থাকে। নাটাই-এর সুঁতো যেমন একসময় গিয়ে আর পাওয়া যায় না, ঘুড়ি হারিয়ে যায় অসীম নীলাম্বরে। ঠিক তেমনি স্বর্ণাকে সম্পূর্ণ বুঝতে বুঝতে আমার এই জীবন ফুরোবে। আমিও হারিয়ে যাব মরণের প্রয়োজনে। এবারো সে রহস্যময় হাসি দিল শুধু। আবার বলল,
— সকাল সকাল ওখানে বসে কেন? মনে হচ্ছে ভিক্ষে করতে বসেছ। এসো, চেয়ারে বসো।
আমি চেয়ারে বসলাম না। হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে কফি আর নাশতা নিয়ে মুখে পুরলাম। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম,
— তাহলে কালকে কোথায় যাব আমরা?
স্বর্ণা ইতঃপূর্বে খাওয়া শুরু করেছিল যথা সময়ে বাইরে বেরোনোর তাগাদা মাথায় রেখে। এবার গরম কফিটা বার দুয়েক নেড়েচেড়ে পুরোটা এক চুমুকে নিঃশেষ করে বলল,
— সেসব নিয়ে রাতে আলাপ করব। এখন আসি।
বলে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল স্বর্ণা। আমি ঝট করে পেছন থেকে হাত ধরে বললাম,
— সবসময় এমন তাড়াহুড়ো কর কেন? বসো কথা আছে।
ঠিক সেসময় স্বর্ণার ফোনে বেয়াড়া রিংটোন দু’টি চোখাচোখি হওয়া মানুষের মাঝে মধ্যস্থতা করল। স্বর্ণা আননওন নাম্বার দেখে কেটে দিয়ে বলল,
— তাড়াহুড়ো করলাম কই। সঠিক সময়ে যেতে হবে না ওখানে?
— এখনি যেতে হবে? সময় তো অনেক আছে।
আবার সেই রিংটোন বাজল ফোনে। স্বর্ণা এবার বিরক্তিকে আটখানা হয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে দিল। ওপাশ থেকে বোধহয় সালাম দিল। স্বর্ণা উত্তর দিল,
— ওয়ালাইকুমুস্সালাম,কে বলছেন?
স্বর্ণার মুখটা যেন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত আমোদে ভরপুর হয়ে গেল। বলল,
— একটু হোল্ড করুন প্লিজ।
বলে স্বর্ণা ফোনটা নামিয়ে রেখে পা বাড়িয়ে সোফার নিচ থেকে নিজের জুতো জোড়া বের করল। এরপর পুনর্বার দুইপা পেছনে এসে ইজিচেয়ারে বসে পড়ল৷ জুতোজোড়া সামনে রেখে স্বর্ণা ফোনের স্পিকার অন করে ট্রে’র পাশে টেবিলে রাখল মুঠোফোনটি। স্বর্ণা শব্দ করে আগের কথাটা রিপিড করল,
— হ্যাঁ কে বলছেন আপনি?
ফোনের ওপাশ থেকে যুবতীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
— আমি *** সিটির মেয়র শাহনাজ ইসলাম বলছি। আপনি কি স্বর্ণা বলছেন?
শেষের কথাটা বেশ রসিয়ে বললেন তিনি। অনাগত বিপদের আশঙ্কায় অকৃত্রিম চটকে গা কেঁপে উঠল আমার। কিন্তু স্বর্ণা নিরুদ্বিগ্ন। পায়ে জুতো গলিয়ে ফিতা বাঁধার কাজে মগ্ন হয়ে বলল,
— হ্যাঁ আমিই স্বর্ণা। আপনার সঙ্গে কোন প্রয়োজন আছে বলে তো জানা নেই আমার! কী দরকার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।
শাহনাজ খানিক সময় নিয়ে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আপনি থেকে তুমিতে নেমে বলল,
— আমি কেন ফোন দিয়েছি তুমি জানো। তুমি আমার স্বামীকে রেপিস্ট বলে হত্যা করতে চাইছ৷ দেশে কি আইন আদালত নেই?
— আছে সেগুলো আপানাদের মতো ক্ষমতাবানদের হাতের মুঠোয়। আমি আইনি ব্যবস্থা নিতে গেলে সেই খবর কেউ জানার আগেই মামলা ডিসমিস করবেন আমি তা আমার ভালো করেই জানা আছে।
ফোনের ওপাশ থেকে কঠিন কড়কড়ে কণ্ঠে ভেসে এলো,
— ভেবো না তুমি বেঁচে যাবে। তাই বলছি ভালো হয়ে যাও। তোমার পরিবারের সব জানা আমার। ওদের ক্ষতি হবে।
স্বর্ণার জুতা বাঁধা শেষ হলো। পায়ের উপর পা চড়িয়ে ফোনটা হাতে নিল সে। শুনিয়ে শুনিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলল,
— ঠিক আছে। আমার হয়ে কাজটা আপনি করে দিন। সব তো জানেন। এটাও জেনে নিন। আজকের এই আমির জন্য আমার পরিবারই দায়ী। শুধুমাত্র জন্মদানকারী বাবা মা বলে বুকের ওপর অস্ত্র ধরতে পারিনি। আমার হয়ে যখন আপনি এই কাজ করতে চাইছেন তাহলে আমি না করব না। ওনাদের মেরে লাশের ছবি এমএমএস করে দিবেন। কেমন?
আর কোন শব্দতরঙ্গ এলো না ওপাশ থেকে। মুহুর্তেক তব্দা মেরে বসে থেকে রাগে গজগজ করতে করতে ফোনটা কেটে দিলেন শাহনাজ ইসলাম। অপরপ্রান্তে থেকে সেই দৃশ্য মনের রংতুলিতে এঁকে নিলাম আমি। স্বর্ণা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল চোখ বন্ধ করে৷ ফোনটা আলগা করে ছেড়ে দিল পেটের ওপর।তার নিমীলিত নেত্রের মলিন দেয়াল বেয়ে দুইফোঁটা অশ্রু-শিশির গড়িয়ে পড়ল দুই কানের ডালায়। এইমাত্র পরিবারের জন্য জমাকৃত মায়াটুকুও যেন সে অবশিষ্ট রাখেনি। কারণ, মায়া কঠিন কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই, দুইফোঁটা অশ্রুবারিতে তা উৎসর্গ করে দিলে বিশেষ ক্ষতি নেই। তবু আমি জানি স্বর্ণা কথাগুলো কতকটা কষ্ট এবং কতক পরিবারের কথাই ভেবে বলেছে। স্বর্ণার পরিবারের প্রতি নিস্পৃহ কথাবার্তার কারণেই তাদের ক্ষতি কেউ করতে যাবে না। এই সত্য মাথায় রেখেই স্বর্ণা এমন ধারালো কথা বলেছে শাহনাজের সাথে। সে আর কেউ না বুঝলেও আমার আর বোঝার এতটুকুও বাকি নেই।

রাতে মধ্যে আমরা পরবর্তীদিনের সকল পরিকল্পনা এঁটে নিলাম। রাজিব ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক হয়ে যশোর পেরিয়ে, বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ইন্ডিয়ায় পৌঁছাবে। স্বর্ণার ভাষ্যমতে, কোনোরূপেই এতদূর এগুতে দেয়া যাবে না তাকে। ঢাকা- ময়মনসিংহ সড়কের কোনো এক জায়গায় আক্রমণের জন্য উদ্যত হয়ে অপেক্ষা করব। গুপ্তচরের মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে সকাল সকাল গাঁটরি-বোঁচকা বেঁধে পালানোর অকস্মাৎ পরিকল্পনা করেছে রাজিব। কারণেই, আমরা ভোর রাতেই বেরিয়ে পড়ব। বলা উচিত, স্বর্ণার যে গুপ্তচর রাজিবের সকল খবরাখবর স্বর্ণার কাছে পাচার করেছে আবার সে-ই স্বর্ণার সকল ঊহ্য কথা মেয়র শাহনাজের কাছে ফাঁস করেছে। স্বভাবতই স্বর্ণা নিজের শুভাশুভ-জ্ঞান প্রাণপণে দমিয়ে সেই গুপ্তচরের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছে। তারপর এই গোঁজামিলের সব হিসেব কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নেয়া হবে।

পরেরদিন ভোর রাতে সূর্য আকাশ ফুঁড়ে রোদের ঝলকানি দেয়ার আগেই আমরা খুব সাধারণভাবে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমত স্বর্ণার গতকালের রাখা অস্ত্রসস্ত্রের একটা গোপন ঘরে গিয়ে কিছুসংখ্যক প্রস্তুতকৃত ককটেল এবং ব্যাগে ভরে কয়েক রাউন্ড গুলি নেয়া হল। আত্মরক্ষার্থে আমার কোমরেও একটা পিস্তল গুঁজে দিল স্বর্ণা। মুখে শুধু বলল, “রাখো,কাজে লাগবে।”
সূর্য তখন পূব আকাশে নিবিড় সফেদ মেঘের অন্তরালে লোহিত দীপ্তির আবির মেখে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে তল্লাটের ঘুমকাতুরে মানুষগুলোকে। হিমালয় বরফশৃঙ্গ থেকে ক্ষয়ে আসা হেমন্তের সকালের হিমায়িত হাওয়া এক বিষম কঠিন অভিযানেও মনটা উদাস করে দিচ্ছে কুহকী শক্তিতে। সকাল হতেই হরদম কঠোর হয়ে থাকা স্বর্ণাকে আচম্বিতেই ইন্দ্রজালে কোমল করে আলিঙ্গন করতে মনটা অদ্ভুত উচাটন করে উঠল। নিজেই নিজের গালে মৃদু মৃদু চড় দিয়ে আত্মসংবরণ করলাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সিএনজি যোগে পৌঁছে আমরা নিজেদের অবস্থান গেঁড়ে নিলাম মহাসড়কে। যে সড়ক দিয়েই বেশ আড়ম্বরভাবে রাজিব ইন্ডিয়ায় পাড়ি দেবার পাঁয়তারা করেছে। সূর্য তখন দৃশ্যমান। ঘড়িতে সময় সাতটা। মহাসড়কের পাশের সারি সারি বিলের পাশে একটা ঘিঞ্জি শালবন। আশপাশটা জনমানবহীন। মাথার ওপর চড়ুইপাখির ঝাঁক অনবরত কিচকিচ করে যাচ্ছে। শালগাছের কিঞ্চিৎ ফাঁক গলে সূর্যের কাঞ্চনপ্রভা আলো বিচ্ছুরিত করছে। দু’জন ঘাপটি মেরে বসে আছি ঝোপের আড়ালে। স্বর্ণার পরনে আঁটসাঁট ধূসর রঙা পোশাক। ঝুটি করে বাঁধা চুল কোমর অবধি ঝুলছে পেছনে। মুখে শক্ত করো বাঁধা কালো রুমাল এবং চোখে কালো চশমা।
স্বর্ণা ঘড়িতে সময় দেখে ধীরেসুস্থে বলল,
— তোমার এখন কাজ নেই। তুমি রাস্তার ওপারে বেতগাছের পেছনে চলে যাও। ওদের আসার সময় হয়ে গেছে।
আমি বোকার মতো করে বললাম,
— কাঁটা যে ওখানে!
— গুলি খেয়ে মরার চেয়ে কাঁটা ফুটে একটু আঘাত পাওয়া ভালো।
আমি হতবিহ্বল হয়ে চিঁচিঁ করে বললাম,
— কিন্তু! আমি তোমার সঙ্গে থাকলে সমস্যা কী? আমাকে ওপারে পাঠানোর মানে কী?
স্বর্ণা দরাজ কণ্ঠে বলল,
— কোনো মানে নেই! এই প্রতিশোধ আমার। একান্তই আমার। তোমাকে আমার সঙ্গে আনা মানে, যদি কোনো কারণে আমার পালানোর প্রয়োজন হয় তখন যেন তোমাকে নিয়েই যেতে পারি। তারমানে এই না যে, তুমিও আমার সঙ্গে এসব অপকর্ম করবে। এটা আমি হতে দিব না। যাও!
বলে স্বর্ণা একপ্রকার জোর করে ঠেলে আমাকে ওপারের কাঁটায় ছাওয়া বেতগাছের আড়ালে লুকাল। ইতঃপূর্বে মহাসড়কের ব্যস্ততা বেড়েছে। শাঁইশাঁই করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে। বেতগাছের আড়াল থেকেই স্বর্ণা গতিবিধি স্পষ্ট মূর্তিমান। কাঁধে ঝোলানো বিশাল ব্যাগ হতে M249 মেশিনগান খুব দ্রুত মাটিতে সেট করল তির্যকভাবে। এরপর অপেক্ষা করতে লাগল শিকারের জন্য। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ভাবী লোকলীলা সাঙ্গ করার নিমিত্তে। হঠাৎ স্বর্ণা চমকে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখ রাখল পিচঢালা সমান্তরাল পথের সুদূর বাঁকে। দেখাদেখি আমিও সেদিকে তাকালাম সরু দৃষ্টিতে। কয়েকটা মাইক্রোবাস আসা শুরু করেছে বেগার্ত হয়ে। বাসে আসার কথা ছিল! প্ল্যান কি পরিবর্তন হল? এরপর আরো চঞ্চল হল স্বর্ণা। দ্রুত উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল মাটিতে। কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে একহাতে গুলির বেল্ট সেট করে অন্যহাতে ট্রিগার চেপে খটখট শব্দে মেশিনগানের নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করল। বচসারত চড়ুই পাখির ঝাঁক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফুরফুর করে উড়ে গেল। উত্তপ্ত গুলির খোসা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে লাগল আশেপাশে। একটু থামে। আবার খটখট গুলি চলে। প্রতিপক্ষ বোধহয় এবার দিগ্বিজ্ঞান ফিরে পেল। তারাও স্বর্ণাকে লক্ষ্য করে গুলি ছাড়লে লাগল। এদিকে মাইক্রোবাসগুলোর চাকার টায়ার ফেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলছে। খানিক পর গোলাবর্ষণ থামিয়ে কয়েকটা ককটেল ছুঁড়ল স্বর্ণা। ধোঁয়ায় ভরে যায় পুরো মহাসড়ক। ভেসে আসে শত্রুপক্ষের আর্ত চিৎকার। তবুও দু’পক্ষের গোলাগুলি থেমে নেই। অকুস্থলের পাশে ভিড় জমানো গাড়িগুলোর ড্রাইভার গাড়ি রেখে পালিয়েছে এরিমধ্যে। কিন্তু পেছনে মূল ঘটনার সঙ্গে না জানা ড্রাইভাররা সাধারণ যানজট মনে করে হর্ণ বাজিয়ে চলেছে। খানিক পর মূল ঘটনা জানতে পেরে, গোলাগুলির শব্দ উপলব্ধি করে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকার গাড়িঘোড়া। ককটেলের আক্রমণে ধোঁয়ান্ধ হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষ। আশেপাশে থাকা শত্রুদের শরীর যায় ঝলসে। এরপর থেমে যায় সব। শুধু উড়ে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী। স্বর্ণা মেশিনগান হাতে নিয়েই দৌড়ে আসে রাস্তায়। দৌড়াতে দৌড়াতে হাত নেড়ে ইঙ্গিতে আমাকেও বেরিয়ে আসতে বলে ঝোঁপ থেকে। আমি চপল ছন্দে বেরিয়ে তার সঙ্গ দিই। সঠিক সময়েই স্বর্ণার পরিকল্পনামতে একটা হেলিকপ্টার নেমে আসে চোখের দৃষ্টিসীমানার উর্ধ্বে তেপান্তরের বুকে। হেলিকপ্টার থেকে দুইজন লোক নামে দুরন্ত পদক্ষেপে। স্বর্ণা তাদের হাতে মেশিনগানটা ছুঁড়ে মেরে এলোমেলো বিধ্বস্ত গাড়িগুলোর দরজা খুলে রাজিবকে খোঁজে উন্মাদের মতো। খুঁজতে থাকি আমিও। চারিপাশে ছড়িয়ে আছে আহত-নিহত পশুগুলো। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পশুটা কোত্থাও নেই। পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ কর্ণকুহর ভেদ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে মনে। ঠিক তখনি রক্তমাখা উপহত হাতে রাজিব গুলি ধরে স্বর্ণার পিঠে। কিন্তু স্বর্ণার দুরন্তপনার কাছে যে ভোজবাজিও হার মানতে বাধ্য! চক্ষের নিমিষে বেগে পেছনে কনুই সঞ্চালন করে রাজিবের পেটের নাড়িভুঁড়ি পেঁচিয়ে দিলে স্বর্ণা। হাত থেকে পিস্তল ছিঁটকে পড়ল। কুঁইকুঁই করে পেটে হাত দিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করল সে। স্বর্ণা পেছন থেকে নাটকীয় ভঙ্গিতে খপ করে ধরে টেনে হিঁচড়ে বিলে নামিয়ে হেলিকপ্টারে তুলল।
…………………………………………………………………………………………………….

দুইদিন পরের কথা।সিলেট শহরে এলাম স্বর্ণার বসের স্পেশাল গাড়িতে করে। স্বর্ণার এরইমধ্যে তার বসকে জানিয়ে দিয়েছে যে, সে আর তাদের দলের সঙ্গে থাকছে না তথা কোনোপ্রকার কোন্দলে সে আর নেই। আশ্চর্য ব্যাপার হল, স্বর্ণার আধবয়সী বস জানালো সেও আর দেশে থাকছে না। খুব শীঘ্রই থাইল্যান্ডে চলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের জন্য। এমনকি নাও ফিরতে পারে। দেশের উত্তরাঞ্চলে সেও নাকি কি এক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এখন তার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মতোন অবস্থা! স্বর্ণার বসের ঠিক করে দেয়া গাড়ির ড্রাইভার যখন সেধে বাসা কিংবা হোটেল ভাড়া করে বিদায় নিতে চেয়েছিল স্বর্ণা তাকে অগ্রাহ্য করে লোকারণ্যের ভেতর নেমে গিয়ে ড্রাইভারকে বিদায় করেছিল আর বলেছিল,
— সুযোগ পেলেই এরা হাটে হাঁড়ি ভাঙতে ভুলবে না। টাকার লোভে মানুষ পশু হয়, আর এরা চিটার বাটপার হয়। তারচেয়ে নিজে একটু কষ্ট করে ব্যবস্থা করা উত্তম।
যুক্তি আছে স্বর্ণার কথায়। মাথা নত করে মেনে নেওয়ার মতো যুক্তিযুক্ত। কাজেই নিচের পায়ের শক্তি গচ্চা দিয়ে, চোখের ক্লান্তি বাড়িয়ে নিজেরায় কষ্ট করে ভালো একটা ঝুঁকিমুক্ত জায়গার সন্ধান করছিলাম। এমন সময় ঘটল এক অনভিপ্রেত কাকতালীয় ঘটনা। থাক, আগে আমাদের সিলেটে আকস্মিক আগমনের কথা উল্লেখ করি, সেদিন হেলিকপ্টারে করে আমরা দূরের একটা জনশূন্য এলাকায় এসে পৌঁছাই। এবং পরিকল্পনা মতে সম্পূর্ণ অন্য একটা হেলিকপ্টারে করে আমরা ঢাকার অদূরে একটা পুরোনো বাড়িতে রাজিবকে নিয়ে আসি।যাতেকরে পুলিশ ঐ হেলিকপ্টারকে অনুসরণ করে আমাদের পাকড়াও করতে না পারে। রাজিব এখনো সেখানেই বন্দী। এখানে আমাদের মুষ্টিমেয় বাসস্থান ঠিক হয়ে গেলেই স্বর্ণার অনুচরেরা রাজিবকে সিলেটে নিয়ে আসবে। এর আগ পর্যন্ত সে ঐ পুরোনো বাড়িতেই থাকবে। মূলত পুলিশের যে কোপদৃষ্টি আমাদের পড়েছে তা থেকে কিছুমাত্র পরিত্রাণের জন্যই সিলেটে আসা।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর জামাতা নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে সংবাদমাধ্যমগুলো সরব। দেশে হৈচৈ পড়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী, নিখোঁজ জামাতাকে খুঁজে দিতে পারলে কোটি টাকা উপহারের ঘোষণা দিয়েছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ধনী থেকে গরীব, আলালের ঘরের দুলাল হতে রাস্তার টোকাই, উঞ্ছজীবী থেকে বড়বড় অফিসের কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর জামাতার একখানা ছবি হাতে পুরো দেশময় সন্ধ্যায় আবছা আঁধারে গরু খোঁজার মতো করে খুঁজতে শুরু করল। দেশের এই পরিস্থিতিতে ঐ পুরোনো বাড়িতে রাজিবকে বেশিক্ষণ আঁটকে রাখা নিয়েও একটা দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। এবার আসা যাক কী হয়েছিল সেই অনভিপ্রেত ঘটনায়।

চলবে…