Home "ধারাবাহিক গল্প শেষ সূচনা শেষ সূচনা পর্ব-৩২ এবং শেষ পর্ব

শেষ সূচনা পর্ব-৩২ এবং শেষ পর্ব

0
শেষ সূচনা পর্ব-৩২ এবং শেষ পর্ব

#শেষ_সূচনা
পর্বঃ ৩২ এবং (শেষ পর্ব)
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ

দু’জনে যখন হন্যে হয়ে সিলেট শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম ছদ্মবেশে। ঠিক তখনি লোকালয়ে বাঘের মতোন জুহির দেখা মিলল অকস্মাৎ। দূর থেকে হেঁকে আমার নাম ধরে ডাক দিল সে। আমরা দু’জনেই প্রায় ভুলতে বসেছিলাম যে,জুহি এই সিলেটেই থাকে। জীবন নিয়ে এমন টানাপোড়েনের সময়ে জুহিকে দেখা দেওয়ার ইচ্ছে আমাদের ছিল না। কিন্তু হঠাৎ দেখা হওয়ার পর পাক্কা চোরের মতো না দেখার ভান করে থাকব সেরকম অকৃতজ্ঞ ও নিষ্ঠুর আমরা নিশ্চয় নই। স্বর্ণা হাসিমুখে ঈষৎ ঠোঁট নেড়ে গজগজ করে বলল,
— এখানে আসার কথা তুমি ওকে বলেছিলে তাই না?
জুহি তখন আমাদের সামনে আসেনি। আমাদের দাঁড়ানোর ইশারা করে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে কি যেন বুঝিয়ে পাঠাল। সেই সুযোগেই কথাটি বলল স্বর্ণা। আমি ভারি অবাক হয়ে বললাম,
— না তো! ওর সঙ্গে আমার কথাই হয়নি!
স্বর্ণা মুখ বাঁকিয়ে তর্ৎসনা করে বলল
— উহঃ! মনে হচ্ছে ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানো না।
— আসলেই তো জানি না। জুহি এখানে কেমনে এলো আমি কি জানি!
— হয়েছে, চুপ থাকো৷ মুখে মুখে তর্ক করে রাগ বাড়াবে না।
আমি তবুও বললাম,
— হুম। তর্কে না পারলে মেয়েরা এরকমই করে।
স্বর্ণার রাগ এবার সপ্তমে চড়ে গেল। দিকবিদিকশুন্য হয়ে সম্মন্ধটা পাল্টে তুমি থেকে থেকে তুইয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল। রোষে রিরি করতে করতে বলল,
— এই, তুই কি মেয়ে বিশেষজ্ঞ রে? সত্যি করে বল্ তো আমার সঙ্গে যে আটবছর দেখা হয়নি তখন কত মেয়ের সঙ্গে টাঙ্কি মেরেছিলি!
অবস্থা বেগতিক উপলব্ধি করে আমি মুমুক্ষা চাইলাম মনে মনে। স্বর্ণার এই রুদ্রমূর্তির সামনে আর কিছু বলার সাহস পেলান না।

— এই যে, আবার কি নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে?
এমন অস্বস্তিকর বাগ্বিতণ্ডায় স্বস্তি হয়ে এলো জুহি।
স্বর্ণা মুখ মলিন করে বলল,
— না কিছু না।
এরপর জোরপূর্বক হেসে জিজ্ঞেস করল।
— তা, তুমি এখানে?
জুহি হেসে বলল,
— কথাটা তো আমার জিজ্ঞেস করার অধিকার বেশি। আমার তো এখানেই থাকার কথা। বরং তোমরা এখানে কেন সেটা বল।
বলে আমার দিকে তাকাল জুহি। আমি অন্যদিকে ফিরে মাথা চুলকালাম কেবল। কিন্তু স্বর্ণা নির্দ্বিধায় বলে ফেলল,
— সর্বশেষ মিশনের জন্য।
এভাবে অকপটে স্বীকার করাটা বোধহয় মোটেও প্রত্যাশা করেনি জুহি। একটু অপ্রতিভ দেখাল তাকে। তৎক্ষানিক সংযত হয়ে মুচকি হেসে বলল,
— ওহহ আচ্ছা।
স্বর্ণার খিলখিল করে একদফা হেসে বলল,
— এই পোশাকে এসব শুনেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছ না যে?
জুহি মাথা আনমিত করল। স্বর্ণা জুহির আড়ষ্টতা লক্ষ্য করে এড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল,
— যাকগে,কোথায় ডিউটি এখানে?
জুহি শুনজোর মেলে বলল
— মাদক বিরোধী জনসভা হচ্ছে৷ ওখানেই ডিউটি। মাইকের শব্দ শুনতে পাচ্ছ না?
— হ্যাঁ হ্যাঁ-স্বর্ণা বলল মাথা ঝাঁকিয়ে।
বাস্তবেই মাইকের আওয়াজ এতক্ষণে কানে এসে লেগেছে আমার। শহুরে যান্ত্রিকতা এতটা গভীরভাবে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে যে সাধারণের চেয়ে অনন্য কিছুও আমাদের নজরে কিংবা কানে এসে ঠেকে না। ভোঁতা,ধারহীন হয়ে গেছে পঞ্চইন্দ্রীয়।
স্বর্ণা এবার নিজ থেকে তাড়া দিয়ে বলল,
— ঠিক আছে তাহলে। আজ যাই। বেঁচে ফিরলে দেখা হবে।
জুহির মুখটা খানিক ম্লান হলেও প্রকাশ করতে চাইল না সে। বলল,
— সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আজকে রাতটা আমার বাসায় থেকে যাও। না করো-না প্লিজ।
তথাপি স্বর্ণা বাঁধা দিল৷ বাঁধাটা দেয়ারই ছিল। বলল,
— দেশে তোলপাড় সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসীকে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে বিপদ টানছ কেন?
জুহি দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
— তুমি সন্ত্রাসী নও।
— নই?
— না।
— বেশ,…চলো। কিন্তু শুধু আজকের রাত। ভোরেই আমরা বের হয়ে যাব।
একটু থেমে আমার দিকে সরল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, চাইনা আমার কারণে আর কারো ক্ষতি হোক। ছোট কথাটার ভেতরের কথাটা স্বর্ণার চোখের চাউনি আর ওষ্ঠাধর নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁচ করেছি আমি। আমার আজকের এই পরিণতির জন্য স্বর্ণা যে অনুতাপের অনলে নিজেকে পুড়ছে সেটা আমি বুঝে গেলাম খুব সহজে। জুহি বলল,
— ঠিক আছে। তোমরা এখানে একটু অপেক্ষা করো। আমি আসছি। প্রোগ্রাম প্রায় শেষে পথে…

জুহি একটু অপেক্ষার কথা বলে আমাদের কাঁটায় কাঁটায় দেড় ঘন্টা বসিয়ে রাখল এবং পরে এসে ইনিয়েবিনিয়ে নানান কথা বলে অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইল। সেটা আশ্চর্য নয়। কিন্তু পরমাশ্চর্য ও অবাক করা বিষয় হল, এই দেড় ঘন্টা আমি আর স্বর্ণা পাশাপাশি ঘেঁষে ফুটপাতে বসে রইলেও ভুলক্রমে হলেও একটা শব্দও কারো মুখনিঃসৃত হল না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, ভিনদেশি কোনো মানুষ কথা বলতে চেয়েও ভাষার স্বতন্ত্রতার কারণে সম্ভবপর হচ্ছে না। এরচে’ দুঃখের বিষয় আর কি আছে! একমনের দু’টি প্রাণ পাশাপাশি বসে রইল এতোটা সময় ধরে অথচ কোনো বাক্যবিনিময় তাদের মাঝে হল না এই ঘটনা শোকের যোগ্য! যাহোক, নতুন চটক হল, জুহি বাসা পাল্টেছে। রাত আটটার দিকে যখন সিএনজি যোগে জুহির বাসায় যাচ্ছিলাম তখন বারবার মনে হচ্ছিল ভুল পথে যাচ্ছি। বলতে চেয়েও বলতে পারছি না অনুচ্চারিত কথাটা৷ শেষমেশ মুগ উগরে ঠিকি বেরিয়ে এলো
জানা গেল। জুহি বাসা পাল্টেছে। এই কথা শোনার পর স্বর্ণা যেন আরো মনমরা হয়ে গেল। কারণটা খুবই স্বাভাবিক। আমার অবর্তমানে জুহির শূন্যতা অনুভব করাটাই বোধহয় স্বর্ণার বর্তমান মন খারাপের শীর্ষ কারণ। আমি ঠিকি বুঝতে পেরেছিলাম। সেই শেফালী ফুলে ছাওয়া পথ, সেই বারান্দা, আমার সেই বাড়ি যখন জুহি পেরিয়ে আসে তখন তার বুকের বাঁ পাশের হৃৎপিণ্ডে জমানো পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো আচানক উদ্বেলিত হয়ে ফেনিয়ে উঠে উছলে পড়ে শরীরে আনাচে-কানাচেতে। ছড়িয়ে পড়া সেই স্মৃতিগুলো শরীরে বিষাদ,বিতৃষ্ণার শিহরন জাগায়। আমি বুঝতে পারি! ঠিকি পারি! হারিয়ে যাওয়া ধন যখন ফিরে আসে সদ্য ক্রয়কৃত ধনটাকে তখন তুচ্ছ মনে হয়। আমার বেলায়ও তাই। কিছু করার নেই।

……………………………………….
জুহির নতুন বাসাটা বেশ ছিমছাম। দুইটা থাকার ঘর। একটা ডাইনিং আর কিচেন। থাকার ঘরের সঙ্গে ঝুল বারান্দা। নিঃসন্দেহে নীরবে একা থাকার জন্য যথোপযুক্ত আস্তানা। রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে জুহি চলে গেল শুতে। স্বর্ণা যেতে রাজি হল না। বলল, “তুমি শোও, আমি একটু পর গিয়ে শোব।
জুহি না গিয়ে ফের তেছরা চোখে তাকায় দেখে স্বর্ণা হেসে দিয়ে বলল,
— চিন্তা নেই, তোমার সাথেই শোব।
আমাকে খালি রুমটা দেয়া হয়েছিল ঘুমানোর জন্য৷ জুহি আর স্বর্ণা একসঙ্গে থাকার কথা ছিল। অগত্যা জুহি চলে গেল। টিভিতে রাত দশটার সংবাদের দিকে মন না দিয়ে আড়চোখে তাঁদের কথোপকথন শুনছিলাম আমি। জুহির অনিচ্ছা প্রস্থানের পর স্বর্ণা উঠে দাঁড়িয়ে আমার রুমের দিকে চলে গেল। আমি বেগুনি বকের মতোন গলা বাড়িয়ে তাকালাম একবার। সর্বনাশ এই মেয়ে কি আমাকে ঘরছাড়া করে সোফায় ঘুম পাড়ানোর পরিকল্পনা আঁটছে? কিন্তু নাহ্, সে খাটের ধারেকাছেও ঘেঁষল না। সোজা বেলকনিতে চলে গেল। আমি আরো মিনিট দশেক অন্যমনষ্ক হয়ে টিভির দিকে চেয়ে থেকে একসময় ঘুমানোর অভিপ্রায়ে বেডরুমের দিকে গেলাম। চুম্বকের পাশে যেমন লোহা গড়িয়ে গেলে চুম্বক সেটাকে আকর্ষণ করে নেয় ঠিক তেমনি আমি বিছানার উপর বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারলাম না। চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে স্বর্ণা আমাকে নিয়ে গেল তার দ্বারপ্রান্তে৷ বেলকনিতে পা রাখতেই সিগারেটের ধোঁয়ায় ভারী বাতাস নাকে প্রবেশ করল ভুরভুর করে। স্বর্ণা এক পা ছড়িয়ে আরেক পা নিতম্বের কাছে গুটিয়ে নিরুদ্বেগে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সিগারেট ফুঁকছে৷ বেলকনিতে জ্বলছে লাল নীল মিশেলের রঙিন বাতি৷ স্বর্ণা কথা বলল না। আমি বসতে চাই উপলব্ধি করে সটান পা’টা গুটিয়ে নিয়ে নড়েচড়ে বসল শুধু। আমি তার মুখোমুখি একি ঢংয়ে বসলাম। ছোট করে বললাম,
— রাগ করে আছো?
স্বর্ণা এমন ভাব দেখাল যেন আমার সঙ্গে কথা বলার চেয়েও সিগারেট খাওয়াটা তার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ইনহিলার না নিলে মরে যাবে এমন অবস্থা! একটু শুধু বলল,
— না।
— তাহলে সিগারেট খাচ্ছ কেন?
স্বর্ণা এবার যেন রেগে গেল। ঝুঁকে চিবিয়ে চিবিয়ে প্রশ্ন করল,
— আমি কি শুধু রাগ করলেই সিগারেট খাই?
আমি একটু কুঁকড়ালাম,
— নাহ্, রাগ করলে খাও এটাও তো তোমার সিগারেট খাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে আছে!
— বাল পাকনামো করতে এসো না। না ঘুমিয়ে এখানে কি চাও? সহজ গলায় বলল স্বর্ণা।
— কি আশ্চর্য! কাল কোথায় যাবে কী করবে একটু আলাপ করার প্রয়োজন না?
স্বর্ণা সিগারেটের সর্বশেষ ফুঁকটা দিয়ে টাইল করা মেঝেতে সিগারেটের মাথা গুঁজে হত্যা করে ফেলে রেখে বলল,
— নাহ্ কোনো প্রয়োজন নেই। যা করার সব আমিই করব।
আমি গোঁ ধরে বললাম,
— কিন্তু আমার তো প্রয়োজন আছে।
স্বর্ণা চাপা গর্জন করে বলল,
— তুমি এখন যাও আমার সামনে থেকে। হয় তুমি যাও না-হয় আমি যাই।
আমি এবার কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।হাত ছুঁড়ে বললাম,
—ঠিক আছে। একেবারে বেরিয়ে যাচ্ছি। গিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করি। যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।
বলে দ্রুতপদে দেখানো রাগটা নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থানোদ্যত হলাম এবং কয়েক কদম এগিয়ে বেলকনির বাইরে বেরিয়ে এলাম। আশায় বুক বাঁধলাম স্বর্ণা বাঁধা দেওয়ার। হলোও তাই। স্বর্ণা থামার জন্য নাম ধরে ডাক দিল আমার। এরপরও আমি কৃত্রিম দর্পটা জিঁইয়ে রাখার জন্য স্বর্ণার ডাকে সাড়া না দিয়ে গুমগুম করে পা ফেলে এগিয়ে গেলাম রুম পেরিয়ে ডাইনিংএ। স্বর্ণা এবার পড়িমরি করে দৌড়ে এলো আটকাবার জন্য। হাঙ্গামা শুনে জুহি ঘুম থেকে আথালিপাথালি দৌড়ে এলো ডাইনিংএ। তার পরনে নাইট ড্রেস। বিমূর্তের মতো চুল আলুথালু। সে ঘুমবিজড়িত কণ্ঠে উত্তেজিত হয়ে বলল,
— কী হয়েছে?
আমি কিছু বলার আগেই স্বর্ণা জবাব দিল,
— না না তেমন কিছু না। পাগলামি করছে আর কি। তুমি যাও ঘুমাও।
জুহি সন্দিহান চোখে আমাকে একবার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করল। তখনো স্বর্ণার সঙ্গে মৃদু ধস্তাধস্তি চলছে আমার। জুহির প্রস্থানের পর স্বর্ণা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে দু’হাত আগলে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল রুমে। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আমার কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে বসে বলল,
— উল্টা রিয়াকশন দাও কেন্ হ্যাঁ? কই না আমি রাগ করেছি…
আমি হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
— তুমিই তো বেরিয়ে যেতে বলেছিলে। তো বেরিয়ে যাচ্ছিলাম…
স্বর্ণা একটু থামল। গহন নিবিড় কালো চোখে তারা দু’টি আমার চোখের ‘পরে নিপতিত করে মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
— বেরিয়ে গেলে আমার শেষ সূচনা’টা কি তোমাকে ছাড়া হবে?
কথাটা বুঝতে না পেরে আমি আবিষ্টের ন্যায় তাকিয়ে রইলাম। স্বর্ণা আবার একই সুর ধরে বলল,
— বলেছিলাম, আমি সব ছেড়ে শেষ থেকে শুরু করব সব নতুন করে। এই কলঙ্কিত জীবনের দিকে আর পা মাড়াব না। সব তো তোমার কথাতেই। রাগের মাথায় না-হয় বলেছি। তাই বলে চলে যাবে?
আমি ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম,
— আমিতো শুধু অভিনয় করেছিলাম চলে যাওয়ার।
— মানে? মুহূর্তে স্বর পাল্টে ক্রুদ্ধ হয়ে বলল স্বর্ণা।
— যা শুনেছ তা-ই।
স্বর্ণা চোখ বন্ধ করে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে রাশ টেনে ধরল। এরপর অকস্মাৎ দূরে সরে গিয়ে দু’হাতে বুকে ধাক্কা দিয়ে বিছানার ওপর ফেলে বলল,
— ধ্যুর, থাকো। ঘুমাব আমি।
আমার পা ছিল মেঝের ওপর। যেই মাত্র স্বর্ণা ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যাওয়ার নিমিত্তে পা ফেলতে গেল ঠিক সেসময় আমি ডান পা’টা খানিক কুটিল করলাম। ব্যস, এতেই সে জালের মতো পা প্যাঁচিয়ে বিছানার ওপর পড়ে গেল। দুঃখের ব্যাপার হল, আমার সুপ্ত অভিলাষ মতে সে সিনেমার মতো আমার বুকের ওপর পতিত হল না। বরং মুখ থুবড়ে পড়ে নাসিকায় ব্যথা পেল। লাল হয়ে গেল নাকের ডগা৷ স্বর্ণার রাগ যেন সেই আছাড়েই ছলকে উঠে নির্গত হয়ে বিলীন হয়ে গেল। চট করে আমার বুকের ওপর দুই কনুই বসিয়ে গণ্ডদেশে দুইহাত ঠেকিয়ে বলল,
— কী চায় হ্যাঁ?
স্বর্ণা শাসনপূর্ণ তেজদীপ্ত কণ্ঠ অথচ মধুরিমা যেন ভলকে পড়ছে কলকণ্ঠী গলা বেয়ে। আর চাহনি! সে তো মায়া হরিণীর মতো। ঠোঁটের কোণের অনিরুদ্ধ হাসির চাপা হাসির ঝিলিক যেন সদ্য দিগ্বিজয়ী রাণীর মতোন। নিদারুণ এই মুহূর্তে কনুই রাখার ফলে পাঁজরের আঘাত আমার কাছে নগণ্য মনে হল। তবু বললাম,
— পাঁজরে ব্যথা পাচ্ছি।
— পাও। আরো পাও।
বলে আরো দেবে বসল স্বর্ণা। আমি ঈষৎ কুঁকড়ে গিয়ে স্বর্ণার পিঠ আঁকড়ে ধরে তাকে উল্টে দিয়ে স্থানপরিবর্তন করলাম। স্বর্ণা কিচ্ছুটি বলল না। গলা পেঁচিয়ে ধরল শুধু। একটু গভীর তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,
— কপালে থাকলে আজীবনের জন্য পাবেন। বুঝলেন? না থাকলে তো না-ই। অপেক্ষার ফল মিষ্টি হয়। আপনিও অপেক্ষা করুন। এই যে দেখো না। আমি চাইলেই ওদের জায়গায় মেরে শেষ করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমার যা রাগ,ক্ষোভ এতে মন ভরবে না।
আমি অসন্তোষে মাথা ঘুরিয়ে হুতাশ করে বললাম,
— কীসের সঙ্গে কি পান্তা ভাতে ঘি!
— হুম, উদাহরণ দিলাম। সো… অপেক্ষা করুন সঠিক সময়ের জন্য।
বলে আরেকটু নিবিড় হয়ে মুখটা আমার মুখের সামনে বিথার করল। তার যৌবনোদ্দীপ্ত উত্তপ্ত ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস চৈত্রের চাঁদিফাটা বাতাসের মতো বইতে লাগল আমার ললাটে,নাকে, মুখে। নিশ্চিদ্র আলিঙ্গনে প্রকম্পিত বুকের ভেতরের লালায়িত হৃৎপিণ্ড। নিরন্তর শব্দ হচ্ছে, ধক্ ধক্ ধক্। জোলো বাতাসে কচি ডগার মতো তিরতির করে কাঁপতে থাকা দুই ঠোঁট ধীরে ধীরে মিলিত হতে গিয়েও হল না। এক লাফে উঠে দাঁড়াল স্বর্ণা। বাঁকা হেসে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
— শুভ রাত্রি।
ঠিক সেসময় আচমকা বৃষ্টি নামল প্রকৃতিতে।
……………………………………………

রাতে সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল আর থামার নামগন্ধ নেই। ক্রমে বৃষ্টির চাপ বেড়েছে চলেছে। সকাল হল। সূর্যটা লুকিয়ে আছে কালো মেঘের আড়ালে। শীতল বাতাসে বরফের ছোঁয়া। বৃষ্টির প্রাদুর্ভাবে ঘুমটা একটু দেরিতেই ভেঙেছে সবার।ঘুম ভাঙার পরপরই বেরিয়ে পড়ার উদ্রেক করলাম আমরা। জুহিও নিরুপদ্রবে আমাদের বিদায় দিল। মনের বিষণ্ণতাটা মুখের ওপর তুলে ধরেনি সে। ধরেই বা কি লাভ!এতে নিজের ওপর অবিচার বৈ আর কিছু হবে না। হবে মা কারো মনের খুটির পরিবর্তনও।

আমাদের পুনরায় সিলেটে ফিরে আসা বোধহয় পুলিশ কল্পনাও করতে পারেনি যার কারণে আমরা এখনো নিরাপদে সিলেট শহরে বিচরণ করতে পারছি। স্বর্ণা তার ব্যবহৃত সিম বন্ধ করে ফেলেছে। বলা উচিত, যে গুপ্তচর তাকে সকল সংবাদ পৌঁছাত এবং দ্বিমুখী কাজ করে প্রতারণা করছিল সেই গুপ্তচর দুইদিন আগের স্বর্ণার হামলায় এখন হসপিটালে। দুমুখো সাপের মুখবন্ধের জন্য উপযুক্ত সাজা পেয়েছে সে। কারাগারে হামলা করে আসামি নিয়ে পালানোর মতো অভাবনীয় বৃত্তান্তের পর প্রধানমন্ত্রীর জামাতার গাড়িবহরে হামলাপূর্বক কিডন্যাপে পুরো দেশ চাঞ্চল হয়ে উঠল। দেশবাসী এখন বুঝতে পারল না একজন নারীর হাতে উত্তরোত্তর ধর্ষক খুনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর আবার কোন নাটকের ট্রেইলার দেখছে তারা। কেউ কেউ এটা নিয়ে নানান কুৎসাও রটাচ্ছে। কিন্তু স্বর্ণা এবার কোনো স্ট্যাটাস দিল না। দেশব্যাপী মানুষের জন্য অদ্ভুত এক চমক রেখে উহ্য রাখল।

গতরাত হতে সিলেটে বিরামহীন জোর বৃষ্টি নামলেও ঢাকায় মেঘের আধিপত্য আর বারকয়েক গুঁড়িবৃষ্টি ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি। স্বর্ণাকে ফোন করে জানানো হল, তার সহচরেরা গ্রামবাসীর উৎপাতের জন্য ইতিমধ্যে রাজিবকে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে সিলেটে রওনা দিয়েছে৷ কোটি টাকার লোভে গ্রামবাসী বাণবিদ্ধ উন্মাদের মতোন ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়াচ্ছে প্রেসিডেন্টের জামাতাকে। বলা তো যায় না! পাকেচক্রে যদি চোখে পড়ে যা তো কেল্লাফতে। এই টাকা দিয়ে চৌদ্দপুরুষ পায়ের ওপর পা তুলে খেতে পারবে। এই হল তাদের মনের গোপন বাসনা। স্বর্ণা তার অনুচরদের কোনো পাহাড়ের ঠিকানা দিল এবং আমরাও সেখানে খুবই সতর্কাবস্থায় রওনা দিলাম। সিএনজিতে চড়তে চড়তে জিজ্ঞেস করলাম,
— স্বর্ণা, পাহাড়টা কোথায়?
— আগের জায়গাতেই। শুধু এর পশ্চিমে যে বড় পাহাড়টা দেখেছ? ঐযে একেবারে ঘন বড় গাছপালায় ঠাসা ওখানেই।
— ওখানে থাকার কোনো জায়গা আছে?
স্বর্ণা ভ্রু, ঠোঁট সংকুচিত করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বলল
— উহঃ মনে হচ্ছে সংসার পাততে যাচ্ছে। ঘরদোর সব লাগবে!
— নাহ্ জঙ্গলে সংসার করলে মন্দ হয় না।
স্বর্ণা একবার আড়চোখে নাকের পাটা ফুলিয়ে তাকাল, আর উত্তর-প্রত্যুত্তর করল না।

সকাল আটটার দিকে আমরা পৌঁছালাম সেই ঘাটে। আজ আর গুপ্তস্থান দিয়ে নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হল না। আমরা মূল ঘাটেই এলাম। বৃষ্টিমুখর বাদলা দিনে আশেপাশে জনমানুষের চিহ্নমাত্র নেই। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর টিনটিনে এক বালক বেগে নৌকা ছুটিয়ে এলো ঘাটে। বালকটি সেই মাঝিরই ছেলে। গাড়িতে স্বর্ণা মাঝিকে ফোন করেছিল। ফোন রিসিভ করে তার ছেলে। বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই সে একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে হাপিত্যেশ করে বলেছিল।
— বাপ মইরা গেছে। চিকিৎসা না পাইয়া। আমি কিছু কইরতে পারিনাই।
শুনে স্বর্ণা শুরুতে প্রায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তার এতোদিনের চেনাপরিচিত একজন মাঝি, যে তাকে প্রায় সবসময়ই পাহাড়ের বাড়িতে আনানেওয়া করতো। তার আকস্মিক মৃত্যুতে ছোটখাট একটা আঘাত পেয়েছিল সে। আচমকা বাতাসে মনের দরজার পাল্লা ঠাস করে বাড়ি খেয়ে সুক্ষ্ম একটা কষ্টানুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল মাঝির জন্য। এখন তা মন্দীভূত হয়ে এসেছে কিছুটা। দু’জনেই ভয়ে ভয়ে একপ্রকার অপারগ হয়ে নৌকায় চড়ে বসলাম। ভয় এই কারণে, ঝড় বাদলের দিনে পাছে সুগভীর হ্রদের মাঝখানে গিয়ে নৌকা না উল্টে চুবিয়ে মারে৷ কিন্তু আমাদের ধারণা আগাগোড়া তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মাঝির বালক ছেলে পরিপক্ব মাঝির ন্যায় দুরন্ত বেগে দাঁড় চালাতে লাগল৷ টানা বর্ষণে হ্রদের জল ফুলে ফেঁপে প্রায় কয়েক হাত উপরে উঠে এসেছে। আপতত বৃষ্টি নেই। কিন্তু এই হেমন্তের শুরুতেও যেন আকাশটা এই উপত্যকার ওপর কি এক অভিমানে মুখ বাঁকিয়ে ঘোর বর্ষা নামিয়ে আনল।ফিরিয়ে আনল সেই শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ,নিরবচ্ছিন্ন বারিধারা। দূরে একটা হেলিকপ্টারের পটপট শব্দ ভেসে আসছে। দু’জনেই বুঝতে পারলাম ওরা এসে পড়েছে রাজিবকে নিয়ে। স্বর্ণার চোখে মুখে নির্লিপ্ত ভাব ধরলেও ভেতরটা যেন দুর্দমনীয় ক্রোধে ফাটছে৷ নৌকার ছইয়ে বসে দীর্ঘদিনের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার প্রহর গুনছে সে। প্রায় দুই ঘন্টা পর সেই আগের খালিজুলি,, পাহাড়ের পর পাহাড়ের লতাগুল্মের নিবিড় জড়াজড়ি হয়ে থাকা জায়গাগুলো পেরিয়ে মূল গন্তব্যে এসে পৌঁছালাম আমরা। আগের পাহাড়ের তুলনায় এই পাহাড় সমধিক খাড়া, উঁচু এবং বহুদূর বিস্তৃত গহীন অরণ্য বিদ্যমান। তথা ভীতপ্রদ বন্য প্রাণী তো আছেই। আশেপাশে একইরকমের গুটিকতক পাহাড় আছে বলে সঠিক ঠিকানাটা চিনতে না পেরে হেলিকপ্টার তখন আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। বলা বাহুল্য, পূর্বে এসব পাহাড়ি অঞ্চলে নেট সংযোগ দুর্বল হলেও অদূরেই পর্যটন এলাকা হওয়ায় সম্প্রতি ফোর জি চালু হওয়ায় এদিকে অন্তত ত্রি জির দেখা মেলে। স্বর্ণা তাদের পুনরায় ফোন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে ঠিকানা বাতলে দিল। আমরা ততক্ষণে পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠছি। এই পাহাড়ে পূর্বে কিছু মারমা জনগোষ্ঠীর বাস ছিল। শোনা যায়,কোন এক বিদেশি পর্যটককে এখানকার এক লোক মদ্যপ অবস্থায় কোনো কারণে বাগবিতণ্ডার পর ক্রোধবশত হত্যা করে। সেই থেকে সরকার এদের আলাদা জায়গা দিয়ে এই পাহাড় খালি করে। কারণ এখানকার লোকেরা প্রচুর মদ্যপান করতো৷ পুলিশ বাঁধা দিতে এলে পুলিশকেসহ বেপরোয়া মারধর করতো। অনন্যোপায় হয়ে এই পথ বেছে নেয় স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড় বেয়ে ওঠে একপ্রকার ক্লান্ত হয়ে পড়ি আমি। কিন্তু স্বর্ণার কোনো বিকার নেই। চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে না পেরে উঠতে লাগলাম সোপান বেয়ে। নিজেকে তালপাতার সেপাই প্রমাণ করার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।

হেলিকপ্টার স্থির কিছুক্ষণ ঘুরে দড়ির সাহায্যে পিছমোড়া করে বাঁধা রাজিবকে নিচে নামাল।ঝোপঝাড়ের ফাঁকফোকর দিয়েই তারা বিচক্ষণতার সঙ্গে রাজিবকে চালান করে দিল। ঘন অরণ্যের গাছগুলোর মাথা হেলিকপ্টার তীব্র বাতাসে নুইয়ে পড়ল প্রায়। ক্ষাণিক পরই পটপট করে উড়ে গিয়ে গাছগুলোকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দিল। এদিকে চাপালিশ গাছের ডালের সঙ্গে আটকে রাজিবের মুখের মুখোশ উপড়ে কোথায় যে পড়ে গেল খুঁজে পাওয়া গেল না। তার হাত বাঁধা।পা বাঁধা। চালানোর মতো আছে শুধু মুখ। দীর্ঘক্ষণ পর অবারিত হওয়া মুখেই সে তর্জন-গর্জন শুরু করল আশেপাশে কারোর সাহায্য পাওয়ার জন্য। আলামত ভালো। রাঘববোয়ালকে মেরে তৃপ্তি পাবে স্বর্ণা। নির্দেশমতো খাইয়েদাইয়ে বেশ তাজা রেখেছে তবে তাকে! মাটিতে অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকেই মুখে অনর্থক শব্দ করে চলেছে সে। আমি গিয়ে পায়ের বাঁধন খুলে দিলাম তার। এরপর বিস্তর ধাক্কাধাক্কি করে তাকে নিয়েই দুপুরবেলা সহিসালামতে পাহাড়ের চূড়ায় এসে পৌঁছালাম। পুনরায় পা বেঁধে দিলাম রাজিবের। রাগ এবং ভয়ে বড়বড় নিশ্বাস নিতে লাগল সে। প্রাণটা তার শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেল। আমি একটা গাছে হেলান দিয়ে ক্লান্তিবশত জিজ্ঞেস করলাম,
— উফফ, এতো কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে এখানে এনে মারার কী দরকার ছিল?
স্বর্ণার তারমতো করে চোখ নাচিয়ে হেসে কাঁধে ঝোলানো বড়ো ব্যাগটা নামিয়ে বলে,
— মরার এবং মারার জন্য এর থেকে ভালো জায়গা আছে নাকি? সাঁতার না জানলে ডানপাশে লাফ দিয়ে ঝর্নার নিচে খাদে পড়ে মরা যাবে আর সাঁতার জানলে বামপাশে পাহাড়ে পাদদেশের পাথরগুলোর উপর পড়ে মরা যাবে। আর মারার জন্য এমন শান্তশিষ্ট পরিবেশ আর হয় না।

রাজিবকে একপাশে ফেলে রেখে অনেক্ষণ ঘুরঘুর করে মারমা’দের একটা পরিত্যক্ত জীর্ণ কুটিরে প্রবেশ করলাম আমরা। ঘরে একটা মড়মড়ে খাট ছাড়া বাকিসব নিয়ে তারা নতুন বাসস্থানে উঠেছে বহুবছর অাগে। তবে ঘর তৈরির জন্য প্রোথিত বাঁশগুলো বেশ শক্তপোক্ত এখনো। রাজিবকে একটা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হল। অনেক টানাটানির পর পশ্চিমের কাঠের জানালাটা খোলা গেল। দপ করে একঝাঁক দেদীপ্যমান আলোকরশ্মি এসে ঘরময় দ্যোতিত হল। টানা বৃষ্টির পর পরিবেশটা বেশ ঝকঝকে। সদ্যস্নাত গাছের পাতাগুলো জুলজুল করছে। সেই সকালে জুহির বাসায় খাওয়া হয়েছে। পেটে টান পড়েছে। পেটের পোকাগুলো খাবারের অনিয়মে বকাবকি শুরু করেছে। স্বর্ণা আলগা হয়ে চৌকিটাতে বসে ব্যাগ থেকে কিছু শুকনো খাবার বের করল। দু’জনে মিলে সময় নিয়ে উদরস্থ করলাম সেগুলো। অনেকগুলো এঁটো খাবার পড়েও রইল। রাজিবকে খাবার সাধলে সে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে ওঠে। অকারণ ধস্তাধস্তি করে নিজের ক্ষমতার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেবার জন্য হম্বিতম্বি করে। তার এই নিষ্ফল আস্ফালনের জবাবে আমি থাকি নিরুত্তর৷ স্বর্ণা শুধু ফচকে হেসে বলে,
— মরার আগে ভালো করে খেয়ে নে। খোদার কাছে গিয়ে তোর কপালে খাবার নাও জুটতে পারে। যা অপকর্ম করেছিস পৃথিবীতে।
একথা শোনার পর মৃত্যুভয় বুকে নিয়েও চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে রাজিব। পুরো বিষয়টা যেন তার কাছে এখনো অভাবনীয়।

খাওয়াদাওয়া শেষে স্বর্ণা কিছুক্ষণ আশেপাশে অকারণ পায়চারি করল। আমি দূরে দরজার পাল্লার ওপর বসে তার অনুসন্ধিৎসু চোখে তার মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু অঙ্ক যেন মিলছেই না। তর্জনি ঘুরিয়ে কি এমন নির্দেশ করছে সে! নাকি নতুন উপায়ে শেষ প্রতিশোধটা সম্পন্ন করার ছক আঁকছে ? আমার বোধগম্য হল না। তাই পরবর্তী ঘটনার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। তবুও জিজ্ঞেস করে বসলাম,
— কী করবে তাড়াতাড়ি করে চলো না এখান থেকে। এতো ভাবার কী আছে?
স্বর্ণা হাঁটাহাঁটি থামিয়ে তাকাল আমার দিকে। এরপর এক পা দুপা করে এগিয়ে এসে বসল আমার পাশে। চোখ বন্ধ করে একটা নিশ্বাস নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
— খুব কষ্ট দিয়ে মারতে চাই তাকে। কী করি বলোতো!
আমি কিছু না জানার ভঙ্গিতে ঠোঁট আর দুইহাত প্রসারিত করে বললাম,
— তুমিই ভালো জানো।
— বেশ… DONT পেইজ থেকে ফেসবুক লাইভে যাব। ফোনটা শুধু স্থির করে ধরে রাখবে। এইটুকু পারবে?
আমি ম্লানমুখে মাথা নাড়লাম। কিন্তু মনে মনে একটা অনিচ্ছা রয়েই গেল। এমন দিন দেখব আমি ভাবিনি। স্বর্ণা আমার সামনে মানুষ হত্যা করবে আর আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তা পুরো পৃথিবীকে ধারণ করে দেখাব এটা আমার আগে মাথায় আসেনি। কিন্তু মানুষগুলোর মরারও অতীব জরুরি। পূর্বের খুনগুলোর পর যখন স্বর্ণা আত্মপ্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তখন থেকেই হিড়িক পড়ে যায় DONT পেইজে। প্রায় তিন মিলিয়নেরও অধিক লোক উন্মুখ হয়ে আছে পরবর্তী অধ্যায়টা দেখার জন্য। স্বর্ণা আগেই ঘোষণা দিয়েছিল হাতগোনা ছয়জনের প্রাণ যাবে তার হাতে। শুরুতে সরকার ফেসবুক কতৃপক্ষকে DONT পেইজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও পরে ভেবে চিন্তে মত পাল্টায় তারা। কারণ, স্বর্ণার কিছু আপডেট সেখানে পাওয়া যাবে যার দ্বারা র‌্যাব কিংবা পুলিশ অকুস্থলে অভিযান চালাতে সক্ষম হবে। স্বর্ণার ফেসবুক লাইভে হত্যাযজ্ঞ যে বিশ্বব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি করবে এতে সন্দেহ নেই।

যথাযথ সময়ে DONT পেইজ থেকে লাইভ শুরু হল। ক্যাপশন দিল স্বর্ণা নিজেই। লেখাটা ঠিক এমনঃ
” শেষজন,শিক্ষা নিক জাতি, জেগে উঠুক মনুষ্যত্ব, বন্ধ হোক ধর্ষণ”
লাখো মানুষ দেখতে শুরু করল নতুন এক লীলাখেলা।
স্বর্ণা উবু হয়ে রাজিবের মুখোমুখি বসল। সামনে রাখল ছোরা, ছুরি,ব্লেড, প্লায়ার্স, হাতুড়ি, রিভলবার সহ নাম না জানা বিদেশি বন্দুক। রাজিবের হাত-পা বাঁধা। পরনের জামাকাপড় ক্লেদাক্ত। ভাদ্রমাসের কুকুরের মতো চোখের চাউনি। স্বর্ণার মুখে শুধু কালো মুখোশটুপি। কপাল থেকে থুতনি অবধি আচ্ছন্ন করে রেখেছে সেটি। দেখা যায় শুধু নিটোল যুগ্মঠোঁট আর বড়বড় চোখের পাঁপড়িযুক্ত দু-চোখ। শুরুতে মুখোশ রাখতে চায়নি সে। কিন্তু আমি জোর করে পরিয়ে দিয়েছি। কারণ, আমার সবচেয়ে ভয়ের কারণ। এরপরে সে বাঁচবে কী করে? শেষ সূচনাটা কি তবে হবে না? হবে, অবশ্যই হবে। নিজেকে আশ্বাস দিই আমি। এরপর সুযোগ হলে দূর দেশে পালাব। এখন থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই মনে মনে। অকস্মাৎ চেঁচামেচির শব্দে ধ্যান ভাঙে আমার। বিশ্বাবাসীর দরবারে ধর্ষণের করুন পরিণতি তুলে ধরা হাতের ফোনটা কেঁপে ওঠে কিঞ্চিৎ। স্বর্ণা চেঁচিয়ে উঠেছে,
— রাজিব, স্বীকার কর সেদিন কী করেছিলি তোদের দলবল মিলে। আমার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলিসনি সেদিন?
ভারী হয়ে আসে স্বর্ণার কণ্ঠ। ভুক্তভোগী নিজের মুখে পুরো বিশ্বের সম্মুখে এভাবে প্রশ্ন করাটা সত্যিই অনন্য এবং কঠিন ব্যাপার। সাহসিকতারও পরিচায়ক বটে। দ্রুত নিজেকে সংযত করে নেয় স্বর্ণা। তবু ধরা পড়ে যায় ক্যামেরায়। রাজিব মুখ ফিরিয়ে নিজের দোষ গোপন করে বলল,
— আমি কিচ্ছু করিনি। এসব কিছুই জানি না আমি।
স্বর্ণা আর কথা বলল না। পাঁচ টাকা দামের চকচকে ব্লেড হাতে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে একবার নিরীক্ষণ করল সেটাকে। রাজিব ঠোঁট নাড়তে লাগল। বোধকরি কিছু বলতে চায়। স্বর্ণা ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞেস করল,— বলবি?
রাজিব ফের একই কথা কাঁপতে কাঁপতে বলে,
— আমি কিছু করিনি।
স্বর্ণা কালক্ষেপণ না করে ফস করে ব্লেড দিয়ে একটা পোঁচ দিল রাজিবের পায়ের তালুতে৷ মুখ হাঁ করে চিৎকার করে উঠল সে। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল। চিৎকার থামানোর দরুন চোখের পানি হয়ে ব্যথারা ঝরে পড়তে শুরু করল। মনে মনে হাসি পেল আমার। পুরো পৃথিবী এই ঘটনা সরাসরি দেখছে বলে মরণ চিৎকার দিতেও তার আঁতে লাগছে! স্বর্ণা আবার শুধাল, বলবি? রাজিব পুনরায় আগের বাক্য আওড়ালো। অন্য পায়ের তলায় ধারালো ব্লেডের টান পড়ল। টকটকে লাল মাংস দেখা যায়। রক্তের জলরাশি দুর্দান্ত মিছিল বিক্ষোভের মতো বেরিয়ে আসে। আবার প্রশ্ন ছোঁড়া হয়, বলবি?
রাজিব এবার আর পারে না। বারবার একটা শব্দ উচ্চারণ করে,
— বলব, বলব, বলব…
— হুমম বল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলবি।
রাজিব বলতে শুরু করল একে একে সমস্ত ঘটনা। কীভাবে, কখন থেকে তার বন্ধুদের মাথায় এই কুকর্মের মতলব আসে। এমনকি স্বর্ণার বাবা মাকে ভুজুংভাজুং প্যাঁচ লাগানোর কথাও বলতে থাকে সে। মাঝে আটকে গেলে রাজিবের পায়ের ক্ষতস্থানে পুনরায় ব্লেডের খোঁচা পড়ে। গগনবিদারী এক আর্তচিৎকার করে আবার বলা শুরু করে রাজিব। পুরো সময়টা স্বর্ণা কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রইল। কালোধূসর বর্ণের মুখোশের ওপর চোখের পানি মিশে ঘোর কালো হয়ে দেখা যায়। সব শেষে রাজিব বলল,
— আমারে মাফ করে দে স্বর্ণা।
স্বর্ণা চোখের পানি মুছে ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল,
— ক্ষমার মতো মহৎ গুণ আল্লাহ আমাকে দেয়নি। এটা আমার এবং তোদের দুর্ভাগ্য। এই মুখ নিয়ে বেঁচে থাকবি কী করে? বাঁচতে কীভাবে মন চায় এখনো? পুরো পৃথিবী এখন তোকে দেখছে সেটা কি ভুলে গেছিস?
রাজিব উদ্ভ্রান্তের মতো আমার হাতো ধরা মোবাইলটার দিকে তাকাল। এরপর উন্মাদের মতো চিৎকার করে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
— স্বর্ণা… আমার দলের হাত থেকে বাঁচতে পারবি না তুই। ওরা সিলেটেই আছে। ঠিকি খুঁজে বের করবে দেখিস্।
স্বর্ণা নির্ভার গলায় বলল,
— আমি নাহয় তাদের হাতে মরলাম। কিন্তু তুই তো আমার হাতে মরবি। আল্লাহ মানুষকে নানান উছিলায় মারে। আলসার,ক্যান্সার, গাড়িচাপা, লঞ্চডুবি ইত্যাদি ইত্যাদি… তেমনি তোর উছিলা আমি।
বলে বাঁধা রাজিবের ঠিক মুখ বরাবর সজোরে একটা কিক করল। শক্ত বাঁশের খুঁটি এবং বেড়া পলকেই বিদীর্ণ করে বাইরে ছিঁটকে পড়ল রাজিব। স্বর্ণা মচমচ করে বেড়া মাড়িয়ে তাকে পুনরায় আগের জায়গায় টেনে নিয়ে এলো। প্রাণনাশের ভয়টা এবার পুরোপুরি প্রবেশ করেছে রাজিবের মনে। বাঁধা হাতগুলো জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করল সে। স্বর্ণা কলুষিত সেই রাতের কথা রাজিবকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল,
— কেন? ক্ষমা আমিও চেয়েছিলাম। হাতে ধরে, পায়ে ধরে। ভাই ডেকে… কই,আমি তো ক্ষমা পাইনি!
কথা শেষ করতে না করতেই তীক্ষ্ণধার ছোরা দিয়ে একে একে হাতের জুড়েথাকা আঙুলগুলো সব আলাদা করে ফেলল। এরপর কুড়কুড়ে হাঁড়ের মতো মুচড়ে ভাঙল হাতের কবজা। রাজিবের মুখে হাঁ… হয়ে কণ্ঠনালী দিয়ে অনবরত যন্ত্রণার চিৎকার বেরিয়ে আসছে। তপতপ করে দুইহাত লাফিয়ে আছড়ে পড়ে মাতম করতে শুরু করল মাটির ওপর। এই হাতই একদিন স্বর্ণার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল, এই হাতই প্রমত্ত হয়ে স্বর্ণার শরীর ছিঁড়ে খেয়েছিল। মানুষের চেয়ে হাতের ওপর ক্ষোভ যেন বেশি। স্বর্ণা বড় হাতুড়ি দিয়ে পিলার গাঁড়ার মতো করে থেতলে ছিন্নভিন্ন করে দিল রাজিবের হাত দু’টি। এরপর একইভাবে রাজিবের পা দু’টিও একইভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল। নির্জীবের মতো পড়ে থেকে দবদবে চোখে চেয়ে আছে আছে সে। গলায় শব্দ হচ্ছে ঘোঁৎঘোঁৎ। কই মাছের প্রাণ নিয়ে জন্মেছে বটে! অন্যকেউ হলে এতক্ষণে আধমরা নয়তো অজ্ঞান হয়ে পড়তো। কিন্তু রাজিব এখনো জ্যান্ত গরুর মতো ধস্তাধস্তি করে চলেছে। বাইরে আকাশটা এরিমধ্যে হঠাৎ মেঘলা হয়ে বৃষ্টির আভাস দিল। সূর্যের আলোটা খানিক ম্লান হয়ে এলেও পশ্চিমাকাশের দিগন্তে জ্বাজ্জল্যমান সূর্যটা গোধূলির আলো ছড়াচ্ছে নিজে উপস্থিত থেকে। আশেপাশে কোথাও বোধহয় খেঁক শেয়ালের বিয়ে হচ্ছে! স্বর্ণা ধীরে ধীরে ব্লেড দিয়ে রাজিবের পেটে পোঁচ দিল। শুরুতে ঘি রঙা চর্বি এবং পরে টকটকে লাল রক্ত চিরিক দিয়ে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারিদিকে। স্বর্ণার হাত, পা, জামা, লোহিত রক্তে জবজব করছে। কয়েকবার আমার গায়েও ছিঁটকে এসে পড়ল রক্ত। হঠাৎ স্বর্ণা উত্তেজিত হল। দিগজ্ঞান হারিয়ে অনেকটা কান্নাবিকৃত গলায় আস্ফালন করে অনবরত ছোরা আর ব্লেড চালাতে লাগল রাজিবের শরীরে। রাজিব নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল। সঙ্গে যোগ হলো টিনের চালের ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। আমি পাথরের মতো একস্থানে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্বের কাছে রাজিবের এই করুণ পরিণাম তুলে ধরতে লাগলাম। আমার পায়ের পাশ গড়িয়ে লাল রক্ত নিজ ধর্মে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। স্বর্ণা এবার তার আসল কাজটি শুরু করল। উবু হয়ে বসে নিরুত্তেজ রাজিবের অন্ডকোষ আলাদা করে নিল শরীর থেকে। এরপর অকস্মাৎ ছোরা ব্লেড দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। বিদ্যুৎ বেগে হাতুড়ি হাতে নিয়ে মাথার উপর তুলে ধড়াম করে আঘাত করল রাজিবের মাথায়। মাথা থেতলে সেই অতি কলঙ্কিত মস্তিষ্কের মগজগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল দিকবিদিকে। সে কি অতি ভয়ঙ্কর দৃশ্য!আজীবন মনে থাকার মতো। রাজিবের পাপগ্রস্ত প্রাণপাখি উড়ে গেল খোদার দরবারে। শেষমেশ পূর্ণ হলো স্বর্ণার মনোবাসনা। বলা যায়, খুব ভালোভাবেই পূর্ণ হল। তবু যেন সে শান্তি পেল না! দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ল স্বর্ণা। আমি ক্যামেরা ঘোরাতেই সে আমার হাত ধরে পূর্বের জায়গায় রাজিবের মৃতদেহের ওপর ধরতে বলল। আমি আদেশ পালন করলাম। স্বর্ণা মারমা জনগোষ্ঠীর ফেলে যাওয়া ম্যাড়ম্যাড়ে খাটের ওপর বসে মাথা থেকে মুখোশ খুলল একটানে। তার এলোমেলো মসৃণ চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল গালের দুপাশে। দুইহাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে অশ্রুবারির বাঁধ খুলে দিল সে৷ আমার ফোনসমেত হাত রাজিবের বিকৃত লাশের ওপর নিবদ্ধ হলেও ঘাড় বাঁকা করে আমি স্বর্ণা দিকে তাকিয়ে রইলাম নির্নিমেষ। কিন্তু স্বর্ণার এই নিষ্ফল রোদনের কোনো হেতু উদ্ধার করতে পারলাম না। প্রায় মিনিট পনেরো পর স্বর্ণা আত্মসংবরণ করে চোখ মুখ মুছে কঠিন হল। মুখে মুখোশ পরে নিল পুনরায়। খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত থেকে ফোনটা নিল। এরই মধ্যে যারা ঘটনা শেষ মনে করে লাইভ থেকে প্রস্থান করেছে। তারা ফিরে এলো হত্যাকারিকে ক্যামেরার সামনে দেখে। বলা উচিত, পুরো সময়ে আমি মুহূর্তেকের জন্যও ক্যামেরার সামনে আসিনি। রক্তমাখা হাতে স্বর্ণা ফোনটা সুমুখে ধরে বলতে শুরু করল লাইভে উপস্থিত প্রায় অর্ধকোটি মানুষের উদ্দেশ্য,
— এই ভিডিওটা অনেকে দেখছেন সরাসরি। অনেকে দেখবেন পরে। একটা সময় আসবে যখন এই ভিডিও দেখেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। আমি চাইলেই আগের হত্যাগুলোর মতো একেও শেষ করতে পারতাম। কিন্তু, রাজিবকে দেশের অনেকেই চেনে দেশের প্রধানমন্ত্রীর জামাতা হিসেবে। অথচ আজ মরার পর চিনলেন একজন ধর্ষক হিসেবে। এই পরিচয়টার খুব দরকার ছিল। খুব…। এটা বলার কারণ হলো অপরাধকারী যেই হয় সাজা তার অবশ্যই প্রাপ্য। দেশবাসীর কাছে আমার কয়েকটা সহজ প্রশ্ন, একটা সাধারণ রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে কতটা অসহায় আর কতটা অপারগ হয়ে এই রাস্তায় নামে? এই দেশে ধর্ষণের মতো ব্যাধির কি কোন পরিতোষক নেই? সরকার কি আদৌও কখনো ধর্ষকদের সাজা দেবার ব্যাপারে ভাববেন না? ধর্ষন যদি আপনার আপন কেউ হতো! বোন,মা,স্ত্রীর হতো তখন ধর্ষককে কাছে পেলে আপনি কী করতেন? আপনাদের হয়তো প্রশ্ন থাকতে পারে, আমি কি পুলিশের কাছে যাইনি? গিয়েছিলাম, রাজিবের মুখেই আপনারা শুনেছিলেন বাবা মাকে কিভাবে তারা ভুলভাল বুঝিয়েছিল। বাবা না আমার পাশে ছিল না। আমি রাতের আঁধারে ঘর পালিয়ে পুলিশের কাছে যায়। পুলিশ আমার মামলা নেয়নি। বাবা মাকে নিয়ে আসতে বলেছিল তখন। পতিতা,কুলটা বলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল থানা থেকে। আপনারাই বলুন, আমার আর কী করা উচিত ছিল? ধর্ষকদের ক্ষমা করে দেওয়া? নাকি সত্যি সত্যি পতিতালয়ে নাম লেখানো? নাহ্ ,ক্ষমার গুণ তো আমার নেই। দেশের আইন যখন কানা হয় আইন তখন নিজের হাতে নিতে ভুল নেই। আমি কোনো ভুল করিনি। এদেশের নুলা পুলিশ, র‌্যাবের ক্ষমতা নেই আমাকে ধরার। আজ থেকে আমি আর কোনো অপকর্মে নেই ঠিক। কিন্তু যেখানে ধর্ষিতার করুণ আর্তনাদ আমার কানে আসবে এবং সে বিচার পাবে না। সেখানে আমার উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। আমি একজন ভুক্তভোগী। দেশে হাজারো ভুক্তভোগী ধর্ষিতারা আছে আমি জানি। মেয়ে, তোমাদের বলছি। ঘরে বসে চোখের জল ফেলে কিছু হবে না। তোমার শরীর যদি মাটির তৈরি হয়ে থাকে, রক্তমাংসে গড়া শরীর যদি তোমার হয়। তবে আর বসে কেন ঘরের কোণে? এখনি উঠে দাঁড়াও। সোচ্চার হও। নিজের ওপর ব্যাভিচারের বিচার শোধ নাও। দেশের প্রশাসনকে বলছি, দুইদিনের মধ্যে চিহ্নিত ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করবেন। নাহয়, দেশে যে অরাজকতা সৃষ্টি হবে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। আমরা ধর্ষকমুক্ত দেশ চাই। আল্লাহ হাফেজ!

ফেইসবুক লাইভ বন্ধ হল। পুনশ্চ মুখোশ খুলে নিল স্বর্ণা। বিমূঢ় হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ৷ কারো মুখে কথা নেই। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি নেমেই চলেছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেঘে মেঘে মানকলি বিচ্ছেদের গুড়ুম গুড়ুম বজ্রপাত।
হঠাৎ ঠাসঠাস গুলির শব্দ কানে এলো বাইরে থেকে। স্বর্ণা চকিতে বন্দুক হাতে উঠে দাঁড়াল। নিশানা তাক করে বাইরে বেরিয়ে এলো চপল পায়ে। আমিও কোমরে গোঁজা পিস্তল হাতে নিলাম। সতর্ক পায়ে চললাম স্বর্ণার পিছু পিছু। ঘর হতে বের হতেই নজরে এলো বিশ থেকে ত্রিশ জনের একটা দল পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে আর ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছে। তাদের পোশাক-আশাক, চলাফেরা দেখে চোখের নিমিষে আমি বুঝে গেলাম এরা রাজিবের লোক। গতবার আলতাফের সঙ্গে এই লোকগুলোই ছিল। আলতাফ এবং রাজিবের সঙ্গে অবশ্যই যোগসাজশ আছে সেকথা আমরা আগেই জানি। তাদের নজর এড়িয়ে দ্রুত জঙ্গলের ঝোপে লুকিয়ে পড়লাম আমরা। একটু পর ঝোপ বুঝে কোপ মারলাম দু’জনে। তারা দলবল নিয়ে আমাদের পাতিপাতি করে খুঁজে ফিরছে বৃষ্টির মধ্যে। কিন্তু স্বর্ণা আড়ালে থাকতে নারাজ। অবাধ্য হয়েই দৌড়ে বেরিয়ে গেল সে। তার দৌড়ানোর দাপটে ঘন ঘাসে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ছড়িয়ে পড়ছে চারিপাশে। হাতে থাকা ভারী বন্দুকটা ঠাসঠাস শব্দ করে চালাতে শুরু করল। চিরকালই স্বর্ণার নিকষিত নিশানা। কোনো হেরফের হয় না। এখনো হচ্ছে তা-ই। তারাও এলোপাতাড়ি পাল্টা গুলি করতে শুরু করল। আমি স্বর্ণার মতো পাকাপোক্ত কেউ নই। কাজেই ঝোপের আড়াল থেকেই গুলি তাক করে উইকেট ডাওন করতে শুরু করলাম। হঠাৎ একটা গুলি লাগল স্বর্ণার ডান হাতের পেশিতে। তবুও থেমে নেই সে। কুরুক্ষেত্র যখন গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করল ক্রমে ঠিক তখনি হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা গেল। যুদ্ধ থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে ওপরে তাকিয়ে দেখল সবাই। র‌্যাবের কালো হেলিকপ্টার। গায়ে লেখা “RAB”। পাহাড়ের চূড়ায় খোলা জায়গাতে দড়ি বেয়ে ধপধপ করে নামতে শুরু করলে র‌্যাবের পুরো দল। সবার হাতে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। এঁরা এখানে কীভাবে এলো? উত্তর খুঁজে পেলাম না আমি। ফেসবুকে লাইভ দেখে জায়গা চিহ্নিত করে এসেছে তারা? হতে পারে। তবে এখন এসব চিন্তার সময় নয়। অতিসত্বর পালাতে হবে। রাজিবের দলের লোকেরা যে যেদিকে পারে তিরোহিত হতো শুরু করল। অসহনীয় ক্রোধান্বিত হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে রইল শুধু স্বর্ণা। কিন্তু র‌্যাবের সঙ্গে পাল্লা দেয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এদিকে র‌্যাব খুব কাছাকাছি চলে এলো আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে। আমি স্বর্ণার হাত ধরে জোর গলায় বললাম,
— স্বর্ণা তাড়াতাড়ি চলো এখান থেকে।
বৃষ্টির শঁশঁ শব্দ কথাটার তরঙ্গ যেন গ্রাস করে নিল। স্বর্ণা কালো পোশাক পরিহিত র‌্যাব দলটার দিকে মাতালের মতো তাকিয়ে রইল। যেন শিকারের অপেক্ষারত সে। আমি এবার স্বর্ণাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে পালানোর জন্য তাগাদা দিলাম। র‌্যাব ঠাঁঠাঁ গুলি চালাল। গুলি এসে বিঁধল গাছের গুঁড়িতে। আমি স্বর্ণার হাত হেঁচকা টেনে দৌড় দিলাম। স্বর্ণাও একপ্রকার অনিচ্ছুক হয়ে দৌড়াতে শুরু করল। পালানোর চেয়ে যুদ্ধ করার নেশাই তার বেশি। বোধকরি শুধু আমার কথা ভেবেই দৌড়াতে শুরু করল। পেছন থেকে র‌্যাব গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণাও একটু পরপর পেছনে ঘুরে গুলি করে কয়েকজনকে কুপোকাত করে দিয়েছে নিজের দক্ষতা দিয়ে। গুলিবিদ্ধ হাত থেকেও রক্ত ঝরছে স্বর্ণার। সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপই নেই।
দীর্ঘক্ষণ বনে বাঁদাড়ের এবড়োখেবড়ো রাস্তার গাছপালা গুল্মলতা কেটে সামনে আগানোর পর আমাদের অবস্থা হলো শোচনীয়। বন্যগাছের কাঁটার আঘাতে হাত-পা কেটে লাল রক্ত ঝরে বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। আবার রক্ত উগরে বেরুচ্ছে, আবার ধুয়ে মুছে সাদা হচ্ছে। কিন্তু সামনে আর যাবার রাস্তা রইল না। বিশাল এক ঝর্না ধারার কাছে চলে এলাম আমরা। নিচে সুগভীর খাদ আর অদূরে বিস্তৃত হ্রদ আর তার ওপর খণ্ড খণ্ড পাহাড়। টানা বরিষণে ঝর্না হয়ে পড়েছে খতরনাক। উপায়ন্তর না দেখে স্বর্ণা র‌্যাবকে প্রতিহত করতে গুলি চালাতে শুরু করল। আমি নিরস্ত্র। কাজেই চেয়ে চেয়ে দেখে মৃত্যুক্ষণ গুনা বৈ আর কিছু করার থাকল না। এতক্ষণ আড়ালে থাকায় র‌্যাবের শকুনের চোখ পড়েনি আমার ওপর। এবার আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল একজন। দেখে স্বর্ণা একদাপটে এসে সরিয়ে দিল আমাকে। কিন্তু দেরি হয়ে গেল। গুলি এসে বিঁধল আমার উরুতে এবং সঙ্গে সঙ্গে আরো একটি গুলি এসে বিঁধল স্বর্ণার সেই আঘাতপ্রাপ্ত ডান হাতে। এবার ঠিক কনুই এর ওপরে। উপহৃত হয়ে স্বর্ণার হাত হতে বন্দুক ছিঁটকে পড়ল অদূরে। সেটা তুলতে গেলে একজন সদস্য পুনশ্চ গুলি চালাল আমাকে লক্ষ্য করে। স্বর্ণা আতঙ্কিত হয়ে বন্দুক হাতে নেওয়া এড়িয়ে একদৌড়ে এসে আমাকে সিনায় প্রবলবেগে ধাক্কা দিল। দু’জনেই নিপতিত হতে লাগলাম কুলকুল করে বইতে থাকা ঝর্ণাধারার ওপর। বাতাসে ভাসতে লাগলাম আমরা। র‌্যাব সদস্যরা ঝর্ণার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিভ্রম খেলছে তাদের চোখে। নিচের খাদের প্রফুল্ল জলরাশি যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অনেকদিন ধরে ক্ষুদার্ত তারা। স্বর্ণা ঠিক আমার ওপর। তার দুইহাত আমার কাঁধে। ঠিক যেই মুহূর্তে পশ্চিমাকাশে সূর্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল ঠিক সেসময় ঝপাং করে অনবরত আলোড়িত হতে থাকা পতিত হলাম আমরা। স্বর্ণার আমার কাঁধ ছাড়েনি এখনো। শক্ত করে আঁকড়ে আছে। দু’জনের শরীর থেকে রক্ত ক্ষয় হতে হতে সাদা জলরাশি রক্তিম হতে শুরু করল৷ আমার মনে পড়ে গেল স্বর্ণার সব ইচ্ছেগুলো। তার শেষ সূচনা। মনে পড়ল আমার ইচ্ছেগুলোও। এখান থেকে বেঁচে ফিরলে স্বর্ণাকে নিয়ে দূর দেশে পালাব। সুখের সংসার করব।

=======================(সমাপ্ত)==========================