শেহরোজ পর্ব-০১

0
587

#শেহরোজ — ১
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

নভেম্বর ০৩, বেলা ৪:৫৫, মেঘালয় ।

পাইন বনের সারি, তার মাঝে সবুজ উপত্যকা। তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের দল৷ ফোর সিটার হোল্ডাজেট এলিট এস উড়ে চলেছে সেই মেঘরাশি ভেদ করে৷

মেঘালয়ের পাহাড় বেষ্টিত সবুজ রঙের একটি গ্রাম দারিবোকগ্রে। এটি গারোদের গ্রাম। গ্রামের উচ্ছ্বল নদী, মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত, রুক্ষ পাহাড়ি টিলা ঘেরা জঙ্গল, উঁচু শৃঙ্গ, সব কিছুই যেন ভুবন ভোলানো সুন্দর৷ নরকেক জাতীয় উদ্যানের ওপর দিয়ে বিমানটি ছুটছে এখন। এই জাতীয় উদ্যানে আছে বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতির লাল পান্ডা, এশিয় হাতি, বার্কিং ডিয়ার এবং মেঘাচ্ছন্ন চিতাবাঘ সহ বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড ও প্রাণী। সেসব দেখা যায় কি-না সেজন্য পাইলটকে বলল শিফান, “একটু নিচে দিয়ে চল, ভাইয়া।”

পাইলট ইরফান ছোটো ভাইয়ের কথাটা শুনল চুপচাপ। যথেষ্ট নিচেতে নামাল বিমানকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “মেইলগুলো চেক করেছিলি?”

“সময় পেলাম কোথায়?” উদ্যানের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে জবাব দিলো শিফান, “ট্রেনিং থেকে ফিরে রেস্টও নিতে পারিনি দুটো দিন৷ এর মাঝে তোর ই-মেইল চেক করার সময়ও হয়নি। আর আজকে তো সশরীরেই ধরে আনলি নিয়ে যাচ্ছিস আবার দিল্লিতে।” কথাগুলো বলে চোখ ফেরাল সে ভাইয়ের দিকে। চিন্তার ঘন ছায়া ইরফানের চোখে-মুখে। তা খেয়াল করে কপালে ভাঁজ পড়ল শিফানের। “তোর কী হয়েছে রে? কোনো সমস্যা পিএম-এর ভাগ্নির সঙ্গে?”

“তার সঙ্গে সমস্যা হতে যাবে কেন?” বিরক্তের সুরে বলল ইরফান।

“বলেছিলি মেয়েটা তোকে পছন্দ টছন্দ করে মনে হয়। তাই ভাবলাম…।” মিটিমিটি হাসল শিফান।

“ওসব পরশি টরশির কথা কিছু না। বছরে পঞ্চাশবার তাকে ইন্ডিয়া থেকে আনা নেওয়া করতে করতে বিরক্ত আমি৷”

“কিন্তু এটাই তো তোর কাজ।”

“হ্যাঁ, এটাই কাজ। কারণে, অকারণে হাজারটা বাহানা দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠায় প্রিয় খালার কাছে। আর তারপর প্লেনে যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ লুতুপুতু কাহিনি সহ্য করতে হবে।” বিরক্তির সঙ্গে এবার রাগও স্পষ্ট হলো ইরফানের চেহারায়।

“কী আর করা!” ঠাট্টা করে বলল শিফান, “ভালো না লাগলে চাকরি ছেড়ে দিতে পারিস।”

“দেবো।” জলদগম্ভীর গলায় জানাল ইরফান, “ফরমালিটি করাও শেষ প্রায়৷ আর আজই আমার লাস্ট ডিউট।”

“কী”, বিস্মিত হলো শিফান৷ “আসলেই সিরিয়াস তুই? হয়েছেটা কী? সামান্য এই কারণে চাকরি ছাড়বি!”

“সামান্য না, শিফান। ব্যাপারটা খুব গুরুতর।”

“কী ব্যাপার সেটা?”

“তোকে যে মেইল পাঠিয়েছি সেগুলো সাধারণ কিছু নয়৷ বাসায় ফিরে চেক করবি অবশ্যই৷ তারপর তোর বসের হাতে তুলে দিবি। এখন যা বলব সেটাও জানাবি তাকে। পরশির লুতুপুতু সহ্য করে কিছু ফায়দা পেয়েছি৷ আমাকে প্রচণ্ড বিশ্বস্ত ভেবে যা উগড়ে দিয়েছে, তা শুনলে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”

“খুলে বল।” অধৈর্য গলা শিফানের।

“বাংলাদেশ এয়ারফোর্সে বিগত বছরগুলো যাবৎ বড়ো কিছু সমস্যা চলছে, শিফান। প্রায় প্রতি বছরই দেশের হাই স্কিল্ড পাইলটদের ক্রাশ ল্যান্ডিং কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। তাছাড়া শত শত কোটি ডলারের ষোলোটা প্রতিরক্ষা পণ্য ক্রয়ের কথা শুনেছি আমরা সেই কবে বলতো? এখন পর্যন্ত এমআরসিএ (যুদ্ধবিমান) কেন আসেনি? দুই হাজার উনিশ আর বিশে করোনার ইস্যু দিয়েছিল পিএম। কিন্তু এখন কীসের জন্য গাফিলতি?” প্রশ্নের উত্তর আশা করল না ইরফান৷ যোগ করল, “পরশির বর্তমান প্রেমিক বিজয় সিং। চিনিস তাকে?”

“এসপিওনাজ দুনিয়াতে ভারতের এক সময়ের খ্যাতিমান সিক্রেট এজেন্ট দুর্জয় সিংয়ের ছেলে হিসেবে চিনি৷ আবার ওখানের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবেও চিনি ওকে৷ কিন্তু বাপের মতো খ্যাতিমান হতে পারেনি।”

“খ্যাতিমান কেন হতে পারেনি তা এখন আরও ভালো করে বুঝবি। পরশির সঙ্গে ঘুমাতে এসে গড়গড় করে বের করে দেয় পেটের ভেতর যা থাকে৷ আর পরশি উগড়ে দিয়েছে আমাকে ঝোঁকের বশে। আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে এই সংস্থার বড়ো বড়ো প্রতিনিধি কন্ট্রোল করছে, শিফান৷ এমনকি তোদের সিক্রেট বিজেএফ-এর… ” বাক্যটুকু শেষ করতে পারল না ইরফান। হঠাৎই এলিট এস-এর ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় ধরে কাশতে থাকল কর্কশভাবে। কন্ট্রোল প্যানেল চেক করে বুঝল, ইচ্ছাকৃত যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটানো হয়েছে। চিৎকার করে উঠল সে, “স্যাবোটাজ করা হয়েছে, শিফান!”

“কী বলছিস?” অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল শিফান।

বিমানটি হঠাৎ চক্কার খেতে খেতে নিচের দিকে খসে পড়তে শুরু করেছে৷ আতঙ্কে মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল দু ভাইয়ের। নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য কন্ট্রোল প্যানেলের সঙ্গে একরকম যুদ্ধ শুরু করল ইরফান। তারপর আচমকাই আগুন লেগে গেল ইঞ্জিনে, কালো ধোঁয়া বের হতে থাকল। জ্বলন্ত আগুন নিয়ে বিমানটি নামতে শুরু করল নাক বরাবর দারিবোকগ্রে গ্রামটির দিকে।

“ওরা মনে হয় টের পেয়ে গেছে, শিফান। আমি সব জানিয়ে দিয়েছি তোকে, তা টের পেয়ে গেছে!” আতঙ্কিত সুরে ফিসফিসিয়ে উঠল ইরফান।

তার সে কথায় কান দিলো না শিফান। ভাবতে থাকল, গ্রামের ওপর বিমানটি ক্র্যাশ করলে ওদের সঙ্গে আরও বহু মানুষের বিপদ ঘটে যেতে পারে। “ফাঁকা মাঠ বা নদীতে ল্যান্ড করা, ভাইয়া।” উত্তেজিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল সে ইরফানকে।

“সেটাই চেষ্টা করছি।”

জীবনকে বাজি রেখে ইরফান দারিবোকগ্রের কাছে প্রবাহিত সিমসাং নদীর ওপর ছুটিয়ে আনল বিমানকে। তারপর সিট ইজেকশনের জন্য প্রস্তুত হলো। শিফানকে জিজ্ঞেস করল, “তুই রেডি?”

“রেডি।” প্যারাসুট ব্যাগটা ঠিকভাবে নিতে নিতে সতর্ক করল শিফান, “বি কেয়ারফুল, ভাই।”

এরপর ০.২ মিনিটের মধ্যে ওদের সিটদুটো বেরিয়ে গেল বিমান থেকে। কিন্তু বিপদ ঘটে গেল সে সময়ই৷ ইজেকশন প্রকৃয়ায় ওরা যখন বিমান থেকে বেরিয়ে এলো তখন বিমান নিচের দিকে ডিগবাজি খেলো। ফলে বিমান থেকে ওরা প্রচণ্ড বেগে ছিটকে নিচের দিকে পড়েই আবার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ গতিতে ওপরের দিকে ছিটকে গেল৷ শরীরে অত্যধিক জি ফোর্স প্রভাবিত হলো তখন। প্যারাসুটের সাহায্যে নিচে পড়ার
মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ইরফান। নদীর মাঝে পড়লও সে ওই অজ্ঞান অবস্থাতেই, তলিয়ে যেতে থাকল গভীরে৷ বিমানটিও ছুটে গিয়ে পড়ল অদূরেই। শিফানের পরিণতিও ঘটল অনেকটা নিজের ভাইয়ের মতোই৷
***

এপ্রিল ০১, বেলা ১১:৩০, ঢাকা ।

সকাল আটটায় অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। সময় মতো অ্যালার্ম ঘড়িটা বাজলেও শাজ সেটাকে বেশিক্ষণ চিৎকারের সুযোগ দেয়নি৷ চেহারায় মহাবিরক্ত এনে চোখ বুজেই অ্যালার্মটা থামিয়ে আবার নেতিয়ে যায় বিছানায়। ঠিক সাড়ে এগারোটায় কল আসলো ছাত্রীর মায়ের। ফোনটা তৃতীয়বার বাজতে থাকলে ঘুম সরল শাজের চোখ থেকে। ফোনের স্ক্রিনে আধো আধো মেলা চোখদুটোই মিনা আন্টি নামটা দেখল৷ দশ সেকেন্ডের মাঝে মাথায় ক্লিক করল এই মিনা আন্টি কে! অমনি লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে ঘড়িতে সময় দেখতেই বাকি ঘুমও তার দিলো উড়াল৷ মিনা আন্টির কল ধরল না। মহিলা বদরাগী স্বভাবের৷ এমনিতেই এক মাস পড়াতে যেতে পারেনি অ্যাক্সিডেন্টে পা ফ্র্যাকচার হওয়ায়৷ সুস্থ হয়েছে আজ সাতদিন। তাই কথা ছিল এ মাসের শুরু থেকেই পড়াতে যাবে বেলা বারোটায়। তাই মহিলা বলেছিল, বাসা থেকে যেন বেরিয়ে অন্তত ত্রিশ কী চল্লিশ মিনিট আগে বেরিয়ে পড়ে সে৷ এখন নির্ঘাত সেটাই জানার জন্য কল করেছে।

নামমাত্র ফ্রেশ হয়ে প্রায় কুঁচকে যাওয়া সাদা ফুল হাতা শার্ট ইন করে পরল সে গাঢ় খয়েরী রঙা লং স্কার্টের সঙ্গে৷ তারপর ওয়ারড্রবে তন্নতন্ন কনে খুঁজতে থাকল একটা ওড়না বা হিজাব৷ জামাকাপড় গুছিয়ে রাখার অভ্যাস না থাকার দরুন প্রায় প্রতিদিনই এই একই ভোগান্তি পোহাতে হয় তাকে।

অবশেষে হিজাবের খোঁজ পেয়ে যেমন তেমন করে মাথায় পেঁচিয়ে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। সব কিছুতে তাড়াহুড়ো করলেও ঘর লক করার সময় খুব ভালোভাবে চেক করে নিলো লক হয়েছে কি-না।

ওর ফ্ল্যাটের মুখোমুখি ফ্ল্যাটটাই থাকেন ঝুমা কবির। আদর্শ এক গৃহিণী তিনি৷ নিজের একমাত্র আপনজনের পরই ওর কাছে এই মানুষটির স্থান। তিনি এক বিচিত্র স্বভাবের মানুষ৷ ওকে যতটা ভালোবাসেন আবার ততটাই ওকে নিয়ে সমালোচনা করেন নিজের স্বামী সন্তানের কাছে৷ সে সমালোচনার বড়ো এক কারণও আছে৷ তবে কথা হচ্ছে, সমালোচনা করে তা আবার পরবর্তীতে নিজেই জানিয়ে দেন ওকে৷ এজন্যই আজ অবধি শাজ ঝুমা কবিরকে এক ফোঁটাও অপছন্দ করতে পারেনি।

ফোনে উবার বুক করতে করতে লাগাতার কলিংবেল চাপতে থাকল সেই ঝুমা আন্টির বাসায়৷ গত একটা মাস পূর্বে রোজ সকালে এ বাসাতেই নাশতা করতে হত ওকে৷ এবং সেটা ঝুমা আন্টির নির্দেশেই৷ যেদিন বেলা হত ঘুম থেকে জাগতে, সেদিন স্বয়ং আন্টিই নাশতার প্লেট হাতে করে দরজায় হাজির হতেন আর দাঁড়িয়ে এভাবেই লাগাতার কলিংবেল বাজাতে থাকতেন। নানুবাড়ি থেকে গতকাল রাতে ও যে ফিরেছে এখানে, তা জানেন না তিনি৷ তাই ভাবল শাজ, বেরিয়ে যাবার আগে আন্টিকে একটু চমকে দিয়ে যাবে আর সেই সাথে নাশতার পার্টও চুকানো যাবে।

দরজাটা খুলে গেল। ফোনে ঝুঁকানো দৃষ্টি না তুলেই আন্টিকে বলে উঠল, “কী ডার্লিং, চমকে গেছ না?” হাসতে হাসতে বাসার ভেতরে ঢুকতে উদ্যত হলো৷ সে সময় দরজার মুখে থাকা ব্যক্তিটি দ্রুত ভেতরে আসার জায়গা করে দিলো পাশে চেপে দাঁড়িয়ে। শাজের চোখ তখনো ফোনের মধ্যেই সেঁটে আছে। কল আসছে আবারও ছাত্রীর মায়ের। বিরক্তিতে “উফ্!” করে উঠে ফোনটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে আন্টির উদ্দেশ্যে বলল, “জলদি নাশতা দাও তো, ডার্লিং। সাত মিনিটের মধ্যে উবার আসছে৷ তিন মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে চার মিনিটের মধ্যে নিচে নামতে হবে।”

“স্যরি লেইডি, আপনার ডার্লিং আপনার জন্য কোনো নাশতা রেডি করে যায়নি।” অচেনা, অপরিচিত এক বলিষ্ঠ পুরুষালী কণ্ঠ।

চলবে।