#শেহরোজ — ৩
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভিন্ন কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নতুন নয়। শিক্ষা আর রাজনীতির গতিপথ ভিন্ন হলেও মূল উদ্দেশ্য প্রায় কাছাকাছিই বলা যায়। একটি জাতি বা একটি সমাজকে জ্ঞানের আলো প্রদান করে রাষ্ট্রকে উন্নত আর সভ্য করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সমৃদ্ধ রাজনীতির উদ্দেশ্যও জাতিকে উন্নত করা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি পরিবেশ কতখানি সমৃদ্ধ? কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির উদ্দেশ্যই বা কতখানি মহৎ? এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রকৃত সত্য হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির নামে যে অপরাজনীতির চর্চা চলছে এবং দেশের প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা এতটাই বেড়েছে, তা মূলত বহু শিক্ষার্থীদের জন্য বিশাল এক অভিশাপ।
অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বলতে গেলে ছাত্র রাজনীতির অংশ না হয়ে উপায়ই নেই। হলের সিট থেকে শুরু করে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কেবল ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাই পায়। আর এই তথাকথিত নিয়মটি চালু থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল জনশক্তি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরপর তিনবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে এ দলটি৷ ছাত্রশক্তি এই জনশক্তি দলের শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিচিত। বিগত পনেরো বছর যাবৎ এই ছাত্রশক্তির বিরুদ্ধে নির্যাতন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সহিংসতা, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ছায়ায় গড়ে উঠেছে ছাত্রশক্তিরই বিভিন্ন দল। দিনে দিনে হয়ে উঠেছে এরা স্থানীয় সন্ত্রাসদের মতো।
শাজের বান্ধবী মিতু মেয়েটির সাথে যা ঘটেছে তার পেছনের গল্পটা অনেক পুরোনো — অনেক শিক্ষার্থীকে এরকম নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু এই অন্যায় প্রতিহত করার মতো যেন কেউ নেই।
শাজের বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশক্তি যে প্যানেল ঘোষণা করেছে আর তার মাঝে পঁচিশ সদস্যের প্যানেলে যে নেত্রীগুলো মনোনয়ন পেয়েছে, তাদের ছাত্র-ছাত্রী কর্মীরাই হলের সকল শিক্ষার্থীদের শাসন করে থাকে সব সময়৷ অবশ্য শাসনের নামে তা মানসিক, শারীরিক নির্যাতন বলায় উত্তম। হলের কমনরুম, ক্যাফেটেরিয়া, গেস্টরুম, সারা ক্যাম্পাসেই ছাত্রশক্তির রাজত্ব চলে।
***
এপ্রিল ০৪, রাত ১:২৫
চার রুমের বিশাল ফ্ল্যাটটায় শাজের সঙ্গে বসবাস করেন একজন প্রৌঢ়া। সম্পর্কে যিনি শাজের দাদীই বলা চলে। তবে আপন নয়। বাবার ফুপু হন তিনি৷ শাজ যখন তিন বছরের অবুঝ বাচ্চা ছিল, তখন থেকে ওই মানুষটি ওর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হন। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে ওকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন তিনিই৷ তার সন্তান, নাতিপুতি থাকলেও কেন যেন শাজকে ফেলে তাদের কাছে কখনো ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন না। এই যে কটা দিন শাজ পা ভেঙে দেশের বাড়িতে গিয়ে পড়ে ছিল। তিনিও গিয়ে ততদিন ওর সঙ্গেই ছিলেন সেখানে।
গভীর রাতে বিছানার পরিবর্তে বসার ঘরের সোফায় শুয়ে আছে নির্ঘুম শাজ । ওকে সঙ্গ দিতে এত সময় টিভি চলছিল৷ কিন্তু টিভির কোনো প্রোগ্রামই ওর মনটাকে ব্যস্ত রাখতে পারছে না বলে বিরক্তিতে বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো কিছুই ভুলতে দিচ্ছে না, আজ ওর জন্মদিন। বছর দুই আগেও ও কল্পনা করতে পারেনি এই দিনটা হবে ওর জীবনের অবিস্মরণীয় একটি দিন, এই দিনটা থেকেই ওকে অভ্যাস করতে হবে বাবাকে ছাড়া একা থাকার। কে-ই বা ভেবেছিল ওর বাবার মতো সৎ, প্রচণ্ড সাহসী একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একদম হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যেতে পারে? যে-ই শুনেছে তাকেই অবাক হতে দেখেছে ও৷ দুটো বছরে কত জায়গায়, কতভাবে বাবাকে খোঁজ করেছেন বড়ো চাচা — কিন্তু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার মতোই হারিয়ে গেছে বাবা। একদিন চাচা এসে ভগ্ন গলায় ওকে বললেন, “যদি বেঁচে থাকে ওমর, তাহলে আল্লাহ একদিন ঠিক ফিরিয়ে দেবেন ওকে আমাদের কাছে। ওই একজনই আছেন ভরসা আর বিশ্বাসের জায়গা।” সেই থেকেই শাজ মহান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করে আছে, বাবার সন্ধান ওকে দেবেন তিনি খুব তাড়াতাড়ি।
কিন্তু আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? আদৌ কি বেঁচে আছে ওর বাবা? ভাবতেই বুকটা মুচড়ে উঠল শাজের… চোখদুটোতেও টাটানো অনুভব করল। কান্নাটুকু গিলতে চেষ্টা করে উঠে বসল৷ সোফা ছেড়ে এসে দাঁড়াল বাবার ঘরটার সামনে। কিন্তু দরজাটা খুলতে গিয়েও খুলল না। খুব বেশিই কষ্ট দেয় ওকে এই ঘরটা৷ সহ্য হতে চায় না সেই কষ্ট। বালিশে মুখ চেপে তখন চিৎকার করে না কাঁদলে বুকটা ফেটে আসতে চায়, দমবন্ধও লাগে৷ এই যে এখনো তাই হচ্ছে৷ আঁধারে ডোবা পুরো বাসাটাই এই মুহূর্তে ওকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে৷ যেদিকেই তাকাচ্ছে, সেদিকেই বাবার জলজ্যান্ত অবয়ব দেখতে পাচ্ছে যেন৷ অথচ এ যে ভ্রম, তা ওর জানা।
মা থাকলে ঘরের প্রতিটি কোনায় মায়ের স্পর্শ থাকে। কিন্তু শাজ তো মা’কে পায়নি। ও পেয়েছে মায়েরই অনুরূপ বাবাকে। বছরে যে কটা দিন বাবা ছুটিতে থাকত, সে কটা দিন এই ঘরের চেহারায় বদলে যেত। গৃহিণীর মতো ঘর গুছিয়ে রাখা, রান্না করার স্বভাব ছিল বাবার৷ সে ছুটিতে থাকায় বৃদ্ধা আমেনা দাদীকেও সংসারের কাজ থেকে ছুটিতে রাখত৷ এইতো এই সোফাতেই বাবা বসত সব সময়। মাঝেমধ্যে রাতের খবর দেখতে দেখতে আনমনে হয়ে পড়ত, কখনো অবসন্নতায় ঘুমিয়ে যেত।
বুক ধড়ফড় নিয়েই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পড়ল সে ছাদে যাওয়ার জন্য। মনে হচ্ছে, এখনই খোলা আকাশের নিচে না দাঁড়ালে ও মরেই যাবে। কিন্তু লিফটে ঢুকল না। পঞ্চম তলায় ছাদ৷ তিনটা তলা অতিক্রম করতে গিয়ে শরীরটা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারাতে চাইলো। দ্রুত দেওয়াল চেপে ধরে চেষ্টা করতে থাকল স্থির দাঁড়িয়ে থাকার৷ আর মাত্র তিনটা সিঁড়ি পেরোলেই ছাদের দরজা। আবছা আবছা চোখে শাজ দেখতে পাচ্ছে ছাদের খোলা দরজাটা। সেই দরজার মুখ জুড়ে হঠাৎই বিশাল এক ছায়াও কি দেখল? ছায়াটি কি কোনো দীর্ঘদেহী মানুষের? না-কি ভূত টুত? ধুর! সত্যি সত্যিই ওর হ্যালুসিনেশন হচ্ছে বোধ হয়। ভাবল, চোখদুটো বুজে আবার খুলে দেখবে সামনে কিছু আছে কিনা। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না৷ আঁধারের মাঝে আরও গাঢ় কোনো আঁধার ওকে গ্রাস করে নিলো নিমেষেই। পুরোপুরি জ্ঞান হারানোর আগে ও বুঝতে পারল, যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল সে সিঁড়ি থেকে নিচের সিঁড়িতে পড়তে শুরু করেছে।
অন্ধকার সিঁড়িতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার মাঝে অমন হঠাৎ করে পড়ে যেতে দেখে শেহরোজ অবাক হওয়ার সময়টুকুও পেলো না। ক্ষিপ্রতার সাথে ছুটে গিয়েই জাপটে ধরল নিচে গড়িয়ে পড়তে থাকা শাজকে। তবে চেতনাশূন্য মেয়েটিকে কোলে তোলার সময় বুঝল সে, কমপক্ষে বাষট্টি কেজি ওজন শাজের৷ তার জায়গায় পিয়াল হলে এই সিঁড়ির মধ্যেই শুয়িয়ে রেখে জ্ঞান ফেরাত ওর৷ কারণ, সে বেচারার নিজের ওজনই পঁয়ষট্টি।
মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে শেহরোজ ভেবে নিলো কী করবে সে! সরাসরি ছাদে নিয়ে এলো শাজকে। মেঝেতে ওকে শুয়িয়ে দিয়েই ছাদের দরজাটা বন্ধ করতে গেল৷ এই নিশি রাতে আরও কেউ এসে তাকে চমক দিক, তা অন্তত আজ রাতের জন্য চায় না সে।
দরজা লাগিয়ে শাজের কাছে ফিরে এসে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালাল৷ সে আলোয় দেখল শাজের অগোছাল অবস্থা। বাচ্চাদের মতো মিকি মাউসের কী এক ঢোলা কালো টি-শার্ট আর ঢোলা প্যালাজ্জো পরেছে মেয়েটা! টি-শার্ট যেমন পেটের ওপর উঠে গেছে, তেমন পাজামারও একই অবস্থা — ডান পায়ের হাঁটুর ওপর উঠে আছে। শেহরোজ বসল ওর পাশে। শাজকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে ভাবল, গতকাল সকালবেলাতে দেখে খুব একটা আকর্ষণীয় লাগেনি মেয়েটিকে। বোধ হয় হিজাবের জন্যই। এখন তো বেশ লাগছে! স্বাস্থ্য ভারীর দিকে হলেও দেহসৌষ্ঠব মারাত্মক মোহনীয়৷ নির্মেদ খোলা পেট, টি-শার্টের ওপর থেকে প্রকাশ পাওয়া উরোজের আকর্ষণীয় আকার। শেহরোজ ঠোঁট চেপে একটু হাসল৷ তবে সে হাসি বোঝার উপায় নেই৷
শাজের কাছে এগিয়ে এসে আচমকা ওর নাক চেপে ধরল সে। কয়েক সেকেন্ড যেতেই জ্ঞান ফিরল শাজের। নাক ছেড়ে দিয়ে শেহরোজ সেভাবেই বসে রইল, যেভাবে এতক্ষণ বসে ছিল এক হাঁটুতে ভর দিয়ে।
চোখ জোড়া খুলতেই তারা ঝলমলিত আকাশ দেখতে পেলো শাজ৷ সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় ক্লিক করল, ও জ্ঞান হারিয়ে সিঁড়িতে পড়ছিল৷ আর তার আগে ছাদের দরজায় কিছু একটার ছায়া দেখতে পেয়েছিল বোধ হয়। বিড়বিড়িয়ে উঠল তখন, “ওটা কী ছিল রে, ভাই ?”
“তার আগে ভাইকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছাদের মধ্যে কী করে শুয়ে আছেন।”
চমকে উঠে তড়িৎ গতিতে পাশ ফিরল শাজ। সকালের ওই ঝুঁটিওয়ালা না? ড্যাবড্যাবিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিশ্চিত হলো, হ্যাঁ সেই অসামাজিক জঙ্গল চেহারার ব্যাটাই এটা। কিন্তু এখানে কী করছে ওর সাথে? উঠে বসতে বসতেই জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করছেন আমার সাথে?”
মৃদু হাসল শেহরোজ উপহাসের সঙ্গে। বলল ঠাট্টা করে, “কিছু তো করছিলাম। টের পাননি?”
“মানে?” মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল শাজ, “টের পাবার মতো কী করছিলেন?”
“নাকটাই সবে ধরেছিলাম৷ তখনই চোখ খুলে ফেললেন।”
শাজ বুঝল, এই লোকই ওকে সিঁড়ি থেকে ছাদে এনেছে৷ তারপরও জ্ঞানও ফিরিয়েছে। কিন্তু কতক্ষণ জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিল সে? আর লোকটা এত হেঁয়ালি করে কথা বলছে কেন? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “সেন্সলেস ছিলাম কত সময়?”
“ঘড়ি হাতে নেই। তাই দেখতে পারিনি সময়।”
“আরে আশ্চর্য”, রেগে গেল শাজ এবার শেহরোজের হেঁয়ালিতে। “আনুমানিক সময় বোঝারও কি জ্ঞান নেই?”
“আছে” বলে পদ্মাসনের মতো বসল শেহরোজ। “লাইক টু মিনিটস ছিলেন সেন্সলেস।
উত্তরে কিছু বলল না শাজ৷ নিজের দিকে খেয়াল দিলো এবার। পাজামার বেহাল দশা দেখে দ্রুত ঠিক করে নিলো। আড়চোখে শেহরোজকে লক্ষ করল সেই ফাঁকে। ওকেই দেখছে লোকটা কেমন সরাসরি দৃষ্টিতে। প্রচণ্ড অস্বস্তি হলো ওর। যতই নায়ক নায়ক সুরত হোক — নিজের ঘরোয়া পোশাকে এত রাতে অপরিচিত এই পুরুষের সঙ্গে এক দণ্ডও আর বসে থাকার সাহস সেই ওর।
“থ্যাঙ্কস আপনাকে। একদিন পিয়াল ভাইয়ের সঙ্গে আসবেন আমার বাসায়।” বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল শাজ। কিন্তু এ কী! চোখের সামনে হঠাৎ আবার সব দুলে উঠছে কেন? মাথার পেছন পাশে চিনচিন করছে খুব৷ চেপে ধরল মুহূর্তেই৷ নির্ঘাত সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়ার সময় চোট পেয়েছে ওখানে৷
সবটা লক্ষ করল শেহরোজ বসে থেকেই। বলল, “মাথার পিছে আঘাত তো। কাল একবার ডক্টর দেখিয়ে আসবেন।”
“সামান্য ফুলেছে। বরফ দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“মাথা ঘুরে পড়লেন কেন হঠাৎ?”
চলবে।