#শেহরোজ — ৪
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
উত্তর দিলো না শাজ। মাথা চেপে চুপটি করে দাঁড়িয়েই রইল। শেহরোজ খেয়াল করল, ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে ও। আবার মাথা ঘুরে পড়ে যায় না-কি কে জানে! উঠে পড়ে কার্নিশের কাছে যেতে যেতে ওকে বলল, “পাঁচটা মিনিট বসে ধাতস্থ হন। তারপর ফিরে যান।”
শাজ তাকিয়ে দেখল, কার্নিশের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল শেহরোজ। ফ্ল্যাশ জ্বালানো ফোনটা রাখল কার্নিশের ওপর। তারপর প্যান্টের পকেট থেকে লাইটার আর সিগারেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল ওর দিকে পেছন হয়ে। তার এমন নির্লিপ্ততা দেখেই কিনা কে জানে, শাজের বিশ্বাস হলো লোকটা ক্ষতিকর হবে না ওর জন্য। যেখানে শুয়ে ছিল সেখানটিতেই গিয়ে আবার বসে পড়ল তাই।
কোথাও কেউ নেই, কোনো শব্দ নেই, বাতাস নেই। আর আকাশে সহস্র সহস্র নক্ষত্রের মেলা ছাড়া একটুও চাঁদের আলোও নেই। শেহরোজ সিগারেট ফুঁকছে আর তার ভাসা ভাসা সুন্দর চোখদুটোর পাথুরে চাউনিতে শাজকে পর্যবেক্ষণ করছে। চোখদুটো বুজে তখন নিজেকে শান্ত, স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে শাজ। আরও খেয়াল করল শেহরোজ — শাজের কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে সোজা গলা থেকে টি-শার্টের ভেতর চলে যাচ্ছে৷ গরমটা একটু বেশিই। কিন্তু সেও এতটা ঘামছে না, যতটা ও ঘামছে। মেয়েটার কোনো সমস্যা আছে বোধ হয়৷
“হাইপারহাইড্রসিস না-কি?” প্রায় তিন মিনিটের নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল শেহরোজ।
মাথা তুলে আসক্তিহীন দৃষ্টিতে তাকাল শাজ। শেহরোজকে একবার দেখে পুনরায় মাথা নুইয়ে ফেলে কয়েক মুহূর্তের মৌনতার পর উত্তর দিলো, “অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার।”
“ছোটোবেলা থেকেই?”
এবারও উত্তর দিতে দেরি করল শাজ। কারণটা দ্বিধা। তবে লোকটা যেহেতু দীর্ঘদিন পিয়াল ভাইয়ের বাসায় থাকছে, সেহেতু অনেক কিছুই জেনেছে হয়ত ওর ব্যাপারে৷ ভবিষ্যতেও জানবে৷ তাই দ্বিধা কাটানো শেষে জবাব দিলো, “না, আমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে।”
“ওহ। হ্যাঁ… শুনেছি। কষ্টদায়ক খুব!” সিগারেটে শেষ টান দিয়ে শেহরোজ জ্বলন্ত অংশটুকু পিষল পায়ের তলায়৷ তারপর কার্নিশের ওপর চেপে বসতে বসতে জানতে চাইলো, “প্যানিক অ্যাটাক এসেছে কখনো?”
“হুঁ।”
“কিন্তু একেবারে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন যে?”
“শারীরিক দুর্বলতার জন্য মনে হয়। তারপর প্রায় সারাদিনই না খাওয়া।” শেষ কথাটা বলতেই শাজের মনে পড়ে গেল সকালে এই ছোটোলোক ব্যাটা ওকে নাশতা খেতে দিতে চায়নি বলে মিথ্যা বলেছিল।
একই সময়েই শেহরোজেরও মনে পড়ল ওই ঘটনাটি। তখনই দুজন দুজনের চোখে চোখ রাখল৷ দেখতে পেলো শেহরোজ, শাজের ক্লান্ত, অচঞ্চল দৃষ্টিতে এখন ক্ষোভ ঝরছে তার জন্য। তা দেখে হাসি পেতেই ঠোঁট চেপে হাসিটা আটকাতে চাইলো দ্রুত — পারল না। তাই আড়াল করার জন্য দাড়ি-গোঁফে হাত বুলাতে থাকল৷
কেন শেহরোজ গতকাল ওরকম সংকীর্ণতার পরিচয় দিলো, তা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করলেও করল না শাজ। আবার অপমানের শোধ নেওয়ার ইচ্ছাও দমাতে পারছে না। কিন্তু কিছুক্ষণ আগের উপকারটি বাঁধা দিচ্ছে ওর বিবেককে। উপকারের কথা ভুলে যেতে পারলে এক্ষুনি ও বলে দিতো, “নেমে যান ছাদ থেকে! আমি ছাদে থাকলে কক্ষনো ছাদে পা দেবেন না।”
প্রথম সাক্ষাতের ঘটনা থেকে আপাতত বেরিয়ে আসতে শেহরোজ আগের প্রসঙ্গে ফিরল, “মাথা ঘোরা কি থেমেছে? ভালো লাগছে এখন?”
“কিছুটা।” ভার কণ্ঠে বলল শাজ। একটু আগের নমনীয়তার আর নেই।
বুঝতে পারল শেহরোজ, মেয়েটা আর এই মুহূর্তে সহজ হবে না৷ তাই জিজ্ঞেস করল, “তাহলে বলুন তো, আন্টিকে ফোন করে মিথ্যে কেন বলেছেন আমি আপনাকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলেছি?”
“তাহলে বসতে বলেছিলেন?” খিটখিটে মেজাজে বলল শাজ।
“না, তা বলিনি।” বিভ্রান্ত চেহারা শেহরোজের, “কিন্তু বের হয়ে যেতেও তো বলিনি।”
“মুখে বলেননি। কথার ভঙ্গিমায় আর চোখ-মুখের ভাব ভঙ্গিমায় বলেছিলেন।” কাটাকাটা জবাব শাজের।
“তাই?” তেরছা হাসল শেহরোজ। ফোনটা নিয়ে কার্নিশ থেকে হঠাৎ নেমে এসে বসে পড়ল শাজের মুখোমুখি। কেমন অন্যরকম গলায় বলল, “মানুষের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনস বোঝেন?”
“অবশ্যই বুঝি।” কঠিন সুরে জানাল শাজ, “খুব ভালোভাবেই বুঝি।”
“আচ্ছা?” তেরছা হাসিটা ফিচলেমোতে পরিণত হলো শেহরোজের। জিজ্ঞেস করল শাজের চোখে পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে, “অলসো আই রিডিং?”
“ইয়েস”, একটু জড়তাপূর্ণ গলায় বলল শাজ, “তাও পারি।” জড়তার কারণ, শেহরোজের এমন সরাসরি চাহনি ওকে কেন যেন অপ্রতিভ করে তুলছে সব সময়। এমনকি এখনো।
ফোনের ফ্ল্যাশটা তখন শেহরোজ ওদের দুজনের মাথার ওপর তুলল। স্মিত হাসতে হাসতেই ভাবনাতীত সে বলল শাজকে, “আমার চোখ পড়ুন তাহলে৷ পড়ে বলুন কী পেলেন আমার চোখে!”
এমন কাছে এসে কখনো কোনো ছেলে চোখ পড়তে বলবে শাজকে, তা সত্যিই অকল্পনীয় লাগছে ওর। তাও আবার চৌদ্দ ঘণ্টা আগে যে ছেলেকে ওর উপস্থিতিতে ভীষণ বিরক্ত হতে দেখেছিল!
শ্বাস-প্রশ্বাস যাওবা একটু স্বাভাবিক হয়ে আসছিল শাজের, শেহরোজের এমন কাণ্ডে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল ওর আবার। কিন্তু না তাকিয়েও পারল না ওর চোখে স্থির তাকিয়ে থাকা চোখদুটোই। তারপর কয়েক পলের মাঝেই আবিষ্কার করল ও — সামনের এই নিষ্পলক চোখজোড়া ভীষণ গভীর। সেই গভীরে কী আছে? একবার ওর মনে হলো, নির্দয়তা আর হিংস্রতা। কিন্তু, তার মাঝেই আবার যেন অপার মায়া। এ কেমন চোখের ভাষা? যেন কোনো গোলকধাঁধা। না, এমন কোনো চোখ আগে কখনো পড়েনি শাজ। যখন হল সংসদের নেতা রনির পাল্লায় পড়েছিল, তখন দেখেছিল তার চোখে শুধুই ক্ষমতা আর পয়সার লোভ এবং অহংকারও। যখন ভার্সিটির বড়ো ভাই অয়নের সঙ্গে জড়িয়ে একবার প্রেমের অভিজ্ঞতা পেতে চেয়েছিল, তখন দেখেছিল তার চোখে কপটতা আর ধূর্ততা। অঙ্ককনের চোখে দেখেছে সে কেবলই সরলতা আর আবেগ। কিন্তু শেহরোজের মতো এমন ধাঁধাপূর্ণ লাগেনি তাদের চোখের ভাষা। তবে কি এই লোকটিকে বিশেষভাবে গড়েছে সৃষ্টিকর্তা? না-কি ওর এলোমেলো মনের কাছেই বিশেষ ব্যক্তিরূপ লাগছে?
বিস্ময় আর ভাবনার ঘোরে কিছুক্ষণ আগের উদ্বেগ আক্রমণ যে দূর হয়ে গেছে, তা শাজ টেরই পেলো না৷ হঠাৎ বিড়বিড়িয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল, “আর ইউ সামওয়ান স্পেশাল?”
“আমি?” মেকি বিস্ময়ে বলল শেহরোজ। বলেই হেসে ফেলল সে। শাজকে একটু অবাক করে হাসতে হাসতেই দূরত্ব রেখে সরে বসল হঠাৎ। তারপর ওকে বলল, “আমি নই এমন কিছু৷ তবে আপনি হয়ত হতে পারেন… এক্সট্রাঅর্ডিনারি।” শেষ শব্দটি নিচুস্বরে বলল সে। যেন বিশেষ জোর দিলো শব্দটিতে — তা মনে হতেই শাজ একটু ঘাবড়ালো বোধ হয়। মুহূর্তেই বিরক্ত হয়ে উঠল, “এমন হেঁয়ালি ফেয়ালি করবেন না তো!”
“অলরাইট”, শ্রাগ করল শেহরোজ। “তো ঘরে ফিরবেন না?” জিজ্ঞেস করে আবার আরেকটা সিগারেট জ্বালাতে শুরু করল।
তা দেখে শাজ তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বরঞ্চ তাকিয়ে রইল সরু চোখে। ব্যাটা এত ঘনঘন সিগারেট ধরাচ্ছে কেন? বিশেষ কেউ বলে ফেলেছে বলে কি এখন বেনসন অ্যান্ড হেজেসের খাপ দেখিয়ে বেশি ভাব নিতে চাইছে?
ওর সে দৃষ্টি খেয়াল করল শেহরোজ। মৃদুস্বরে সে “স্যরি ফর আর্লিয়ার ডিসকার্টেসি” বলে এগিয়ে দিলো ওকে সিগারেটের প্যাকেটটা।
“আই ডোন্ট স্মোক”, ভুরু কুঁচকে বলে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো শাজ অন্যদিকে।
নির্বিকারভাবে তখন সিগারেটে টান দিতে শুরু করল শেহরোজ। জিজ্ঞেস করল আবারও, “ঘরে ফিরবেন না?”
“আরেকটু পর।”
শুনে একটু হাসল শেহরোজ৷ মুখ ঘুরিয়ে রাখা শাজ আড়দৃষ্টিতে তা দেখতে পেলে অমনিই মুখটা ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল তাকে, “হাসলেন কেন?”
“কখন?” প্রশ্নচোখে তাকাল শেহরোজ।
“এই যে মাত্র, আমার কথার পর হাসলেন।”
শাজের গতকালের সেই চঞ্চলতা আর ছেলেমানুষী রাগ দেখে আবারও মুচকি হাসল শেহরোজ৷ বলল, “তেমন বিশেষ কোনো কারণ নেই হাসির।”
“কিন্তু…”, গোয়েন্দাদের মতো তাকে দেখতে দেখতে বলল শাজ, “আমার মনে হলো আপনি আমার কথা শুনে কৌতুক বোধ করে হাসলেন।”
“কী চমৎকার অবজারভেশন আপনার”, বিশেষ কায়দায় ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রশংসা গাইলো শেহরোজ। “আমার তো এবার মনে হচ্ছে আপনি সত্যিই এক্সট্রাঅর্ডিনারি কেউ।”
“মোটেই না”, সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ কণ্ঠে বলে উঠল শাজ। “মজা করা ছাড়ুন। আপনি তখন তাহলে আমার কথা শুনেই হেসেছেন, তাই তো?”
উত্তর দিলো না শেহরোজ৷ পেছন দিকে এক হাতে ভর দিয়ে হেলে বসে সে আকাশ পানে ধোঁয়া ছাড়ছে। তার এই অবজ্ঞা ভাবটা ভালো লাগল না শাজের৷ তাই একটু শক্ত সুরেই জিজ্ঞেস করল আবার, “কেন হাসলেন বলুন?”
“জ্ঞান ফেরার পর তখন যেভাবে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়লেন বাসায় ফেরার জন্য, বুঝতে অসুবিধা হয়নি আনসেইফ ফিল করছিলেন। কিন্তু, কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই আবার সেইফ ফিল করছেন।” বলা শেষে বিদ্রুপপূর্ণ হাসিতে শাজের দিকে তাকাল শেহরোজ৷
কথাটা সত্য। শেহরোজ এই সত্যটা বুঝে ফেলায় বিব্রত হয়ে পড়ল শাজ৷ “এরকম কিছু না…” অপ্রস্তুত হয়ে স্বপক্ষে জবাব দিলো, “কাল সকালেও তো একাই ছিলাম আপনার সাথে।”
“সেটাই তো। কাল আপনি আপনি আজকের মতো আনসেইফ ফিল করেননি। উলটে মনে হলো…” শেষে হেঁয়ালিপূর্ণ আচরণে থেমে গেল শেহরোজ।
আর শাজ তার হেঁয়ালি ঢঙের কথায় কাঁচুমাচু হয়ে পড়ল। প্রথম দেখাতেই তাকে যে ওর ভালো লেগেছে খুব, তা কি বুঝে ফেলেছে সে? এ আশঙ্কা করে এক্ষুনি এখান থেকে চলে যেতে মন চাইছে। বুঝে ফেললে কী ভাববে ওকে লোকটা? এমনিতেই তো বোধ হয় যেচে পড়ে আলাপ করায় ওকে গায়ে পড়া ভেবে নিয়েছে। তবে অর্ধেক কথা শুনে এত কিছু ভাবছে কেন ও? জিজ্ঞেস করল শেহরোজকে, “উলটে কী মনে হলো?”
“কিছু না। ছাড়ুন এ কথা। বিশ্বাস করছেন দেখে ভালো লাগছে। আপনার ব্যাপারে আজ পিয়াল আর আপনার ডার্লিং অনেক কিছুই জানাল আমাকে৷ ইন্টেলিজেন্ট স্টুডেন্ট আপনি। আবার ডিবেটেও দারুণ সুনাম আছে আপনার। তো গ্রাজুয়েশন শেষে কী প্ল্যান আছে?”
“কোনো স্পেশাল প্ল্যান নেই৷ স্টাডি শেষে এখানেই চেষ্টা করব ভালো কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার হওয়ার।”
“খুব ভালো৷ তবে স্কলারশিপও তো নিতে পারেন।”
“ইচ্ছে নেই।” আকাশে মুখ তুলে উদাস গলায় বলল শাজ, “দেশেই থাকব।”
কিছু একটা বলতে চাইলো তখন শেহরোজ। কিন্তু কী ভেবে বলল না, সিগারেটে টান দিতে দিতে শুধু দেখতে থাকল শাজকে। কিছুক্ষণ কথা বলল না শাজও৷
তবে নীরবতা ভাঙল একটা সময়৷ শাজ জানতে চাইলো, “আপনি কোন ভার্সিটিতে গ্রাজুয়েশন করেছেন? দেশের বাড়ি কোথায় আপনার?”
“ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি(এমআইটি) থেকে। আর দেশের বাড়ি বলতে আমার বাবা বড়ো হয়েছে চট্টগ্রাম শহরে৷ কিন্তু আমার কখনো থাকা পড়েনি সেখানে।”
“আপনি কি ক্যামব্রিজে অবস্থিত এমআইটি ভার্সিটির কথা বলছেন?” বিস্মিত শাজ।
চলবে।