#শেহরোজ — ৬
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
গনগনে তপ্ত ঢাকা। আর এই তপ্ত দুপুরে ছাত্রশক্তির সমাবেশ শুরু হয়েছে রাজু ভাস্কর্যে৷ ভার্সিটির প্রতিটা হলের শিক্ষার্থী প্রায় উপস্থিত৷ কেন্দ্রীয় ছাত্রশক্তির সকল নেতারাও উপস্থিত। ভাষণ চলছে এখন ভার্সিটির সভাপতির। এর মাঝেই টিএসসিতে এসে পৌঁছল শাজ। গরমে অতিষ্ঠ সে কল করল অঙ্কনকে৷ অঙ্কন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তখন। ওর কল পেয়ে ভিড় থেকে বেরিয়ে এলো। দেখতে পেলো, তানহা আর প্রিয়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে ও। কাছে এসেই জিজ্ঞেস করল, “তুই কী করিস এখানে?”
“তোরা যা করতে এসেছিস”, চোখে-মুখে বিরক্ত নিয়ে বলল শাজ। “আমিও তাই করতে আসছি।”
“উহুঁ।” সন্দিগ্ধ অঙ্কন, “কোনো মতলব নিয়ে আসছিস তুই।” বলে সে জিজ্ঞেস করল তানহা, প্রিয়াকে, “এই, ও কীজন্য আসছে রে?”
“শখের ঠেলায়”, প্রিয়াও বিরক্ত নিয়ে বলল। “বলেছিলাম ক্লাসগুলো করতে৷ আমরা যাতে পরে ব্যাকআপ পাই ওর থেকে। ও শুনল না৷ ঢ্যাংঢ্যাং করতে করতে চলে এলো। সে নাকি সমাবেশে থাকবে।”
“তোর অত গোয়েন্দাগিরি করতে হবে না”, এক ধমক বসালো শাজ অঙ্কনকে। “কুত্তাশক্তির সমাবেশে আসতে গিয়ে কুত্তা মরা গরমে শেষ! পানির ব্যবস্থা করার জন্য ডেকেছি তোকে।”
“আইছে আমার রানি এলিজাবেথ!” ব্যঙ্গোক্তি শেষে অঙ্কন বলল, “বেলা পাঁচটা পর্যন্ত থাক৷ নাশতা পানি পাবি। আর শখ মিটে গেলে বল, রিকশায় উঠিয়ে দিই।”
“দিবি না তুই?”
“চোখে পড়লে এনে দিয়ে যাব। এখন বের হওয়ার উপায় নাই। থাক তোরা।” হনহনিয়ে চলে গেল অঙ্কন।
“একটু যে ছায়াতে দাঁড়াব! দ্যাখ সেসব জায়গাও আমাদের মিস ওয়ার্ল্ড নেত্রীরা দখল করে আছে।” ওড়নায় ঘাম মুছতে মুছতে আফসোস করল তানহা।
শাজ কাউকে খোঁজার মতো আশেপাশে নজর ঘোরাচ্ছিল। কয়েক মিনিট যেতে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে পেয়েও গেল সে। বান্ধবীদের বলল, “কোথাও ছায়া পেলে সেখানে চলে যাস। আমি আসছি একটু পর।”
“কোথায় যাবি?” জিজ্ঞেস করল তানহা।
শাজ জবাব না দিয়ে পানি বিক্রেতা এক লোককে দেখে সেদিকে চলে গেল৷ এক বোতল পানি কিনে তারপর এগোলো সামনে।
দুটো মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাগজের পাখায় বাতাস নিচ্ছে আর গল্প করছে একে অপরের সাথে। হঠাৎ ওদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল শাজ, “কী খবর তোমাদের?”
মেয়েদুটোর একজনের নাম তিশা, অন্যজন পাখি। ওরা মিতুর রুমমেট। মিতুর রুমে কেবল এ দুজনই আছে মিতুকে পছন্দ করার জন্য৷ তাছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, এরা রুমের মাঝে সকলের জুনিয়র। শাজের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল একদিন মিতুর রুমে গেলে। বেশ ভালোই লেগেছিল তখন এদের। আবার শাজকেও ওদের খুব পছন্দ হয়। কারণটা অবশ্য শাজের বেশভূষা আর শারীরিক গঠন। ওর গতানুগতিক পোশাক হলো বিশাল ঘেড়ের স্কার্ট, শার্ট আর হিজাব নয়ত স্কার্ফ। এই গতানুগতিক ধারার পোশাকটাই ভীষণ সুরুচিসম্মত লাগে ওদের কাছে৷ আর তার থেকেও ওদের বেশি ভালো লাগে বলিউডের নায়িকার মতো শাজের দীর্ঘ উচ্চতা, ভারী স্বাস্থ্যেও শরীরের সুন্দর গঠন। যদি উজ্জ্বল ফরসার বদলে ধবধবে ফরসা হত শাজ, তাহলে তো ওকে ভেনাস দেবীই বলে বসত ওরা। মিতু হলে থাকতে ওরা প্রায়ই মিতুর কাছে শাজের প্রশংসায় গলে পড়ত৷
চঞ্চল হাসল তিশা, “এইতো, আপু। কেমন আছেন আপনি? অনেকদিন পর দেখলাম আপনরে।”
“আছি ভালোই। হ্যাঁ, বেশ অনেকদিন পর দেখা। একটু কথা বলতে এলাম তোমাদের সাথে। সময় হবে?”
“আরে হুদাই দাঁড়াই আছি, আপু।” সমাবেশকে ইঙ্গিত করে বলল পাখি, “সময়ের কথা আর কী বলব!”
“আসলেই একটা টর্চারের মতো এট।” সমর্থন করল শাজ।
তিশা ঘাড় দুলাল, “আপনারা যারা বাসা থেকে আসা যাওয়া করতে পারতেছেন, তারা সত্যিই এইসব টর্চার থেকে বেঁচে যাচ্ছেন।”
“কী আর করা!” এক পল চুপ থাকল শাজ। তারপরই মূল প্রসঙ্গ তুলল সে, “মিতুর সঙ্গে যেটা হলো! আমি ভাবতেও পারিনি ওর মতো সরল মেয়েটাকে এত কঠিন নির্যাতন সইতে হবে।”
“আমার তো কান্নায় চলে আসছিল আপুর অবস্থা দেখে। মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েরে ওরা ক্যামনে মারতে পারল!” বলল পাখি।
“আমি না চুপচাপ এটা মেনে নিতে পারছি না। অকারণে ওকে কেন মারধোর করল ওরা? আর আজকে মিতুর সঙ্গে হয়েছে, কালকে যে তোমাদের বা অন্যদের কারও সাথে হবে না। তার তো ঠিক নেই, তাই না?”
“সত্যিই। আমাদের রুমে ফোর্থ ইয়ারের যে দুইটা আপু আছে না? ওরাই আসলে এই মারটা খাওয়াইছে মিতু আপুরে। মিতু আপু রুমের ভেতর একটু বেশি পড়াশোনা করত, নামাজ-কালাম পড়ত, আমাদেরও পড়তে বলত৷ আমরাও আপুর জন্য প্রতিদিন নামাজ পড়ার তাগিদ বোধ করতাম। এই সামান্য বিষয়গুলো নিয়ে মিতু আপুর সাথে ওই দুইজন খালি খালি ঝগড়া লাগাত, বকাঝকা করত আপুরে৷”
“শুধু এই কারণে ওকে এত খারাপভাবে টর্চার করা হলো!” শাজ ক্ষোভ গলায় জিজ্ঞেস করল।
“না আপু।” তিশা জানাল, “ওদের এত রাগ হওয়ার কারণটা কী তোমারে বলি। মিতু আপু তো চুপচাপ থাকা মানুষ৷ ওরা যতই বকাবকি করত তাও আপু কোনো উত্তর দিতো না৷ কিন্তু একটা মানুষ কতদিন আর চুপচাপ অপমান, গালাগালি সহ্য করতে পারে? আপুও এই ঘটনার দুইদিন আগে ওদের কথার জবাব দিছিল। রাগটা হলো এখানেই যে, জুনিয়র হয়ে মুখে মুখে তর্ক করছে আপু। কিন্তু শোধটা নেবে কীভাবে রুমের ভেতর? তাই সাদিয়া আপুদের কাছে গিয়ে উলটাপালটা কথা বলছে মিতু আপুরে নিয়ে৷ আর সাদিয়া আপুদের আবার রাগ ছিল বেশিরভাগ সমাবেশ, র্যালিগুলোতে মিতু আপু হলেই থাকত না। ফাঁকি দিতো।”
না, মিতু ফাঁকি দিতে চাইতো না কখনোই। সে প্রচণ্ড ভীতু স্বভাবের। অসুস্থতা নিয়ে হলেও সে এসব সমাবেশ, মিছিলে অংশ নিতো শুরুতে। কিন্তু শাজেরই সেটা পছন্দ হতো না। তাই যেদিন এসব হওয়ার খবর শুনত ও, সেদিনগুলোতে জোর করেই মিতুকে নিজের বাসায় এনে রাখত। এমনকি টানা দুই, চারদিনেও মিতুকে হলে যেতে দিতো না সে। তবে কি ওর এ কাজেই মিতুকে ভুগতে হলো? বুকের ভেতর চেপে রাখা আগুন আরও দাউদাউ করে উঠল ওর মুহূর্তেই। জানাল তিশাকে, “আমাকে আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে, জানো? মিতুকে হসপিটাল নেওয়ার মেডিকেল রিপোর্ট আর এই টর্চার যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে তিনজন সাক্ষী কালকের মধ্যে হাজির করতে হবে ছাত্রশক্তির এক কর্মীর কাছে।”
“ও আল্লাহ! তোমারে ক্যান আলটিমেটাম দিছে?” আঁতকে উঠল পাখি।
তার আতঙ্কিত চেহারাটা দেখে শাজের আশা কমে এলো। ও যে উদ্দেশ্যে সমাবেশে এসেছে, তা বোধ হয় পূরণ হবে না। এই মেয়েদুটোই ওর ভরসা ছিল। এরা হলে ফেরার আগে এদের সাথে তাই কথা বলতে ছুটে এসেছে ও। কিন্তু যদি এভাবে ভয় পায় এরা, তাহলে সাক্ষী কীভাবে হাজির করবে সে?
“আমি আজ সকালে ক্যান্টিনে সাদিয়া, লাবণ্যদের সরাসরি ব্লেম করেছি ওই কর্মীর সামনে। ইরা মির্জাও ছিল সেখানে।”
“কোন কর্মী, আপু? রনি ভাইয়া থাকতে তোমারে আলটিমেটাম দেওয়ার সাহস হলো কার?” জিজ্ঞেস করল তিশা।
এমনিতেই রোদে আর টেনশনে মাথা গরম। তার মাঝে ছোটোবোনদের কাছেও রনিকে নিজের সাথে জড়াতে দেখে বিচ্ছিরি একটা গালি দিয়ে ধমকাতে মন চাইলো শাজের। মিনিটখানিক চুপ থেকে শান্ত হয়ে বলল তিশাকে, “রোজ নাম শুনেছ নাকি? ছাত্রশক্তির ফিউচার নেতা হবে হয়ত।”
“রোজ! হ্যাঁ, শুনছি তো”, জানাল তিশা। “দেখছিও কিছুদিন।”
“আরে এই লোক নেতা হলে বিরোধী দলের পোলাপান এর সামনে দাঁড়ালেই প্যান্ট ভিজায় ফেলবে৷ আমার তো দেখলেই কেমন ইংলিশ মুভির কুখ্যাত গুণ্ডাগুলোর মতো লাগে।” অদ্ভুতভাবে চোখ-মুখ খিঁচে বলল পাখি।
“আসলেই”, সহমত জানাল তিশা। “মেয়েগুলো যে ক্যামনে ওনার ওপর ক্রাশ খায়, আল্লাহ মালুম।”
ধুর! বিরক্ত বাড়ছে শাজের। মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে পড়ছে বাঁচাল মেয়েদুটো। তাই দ্রুত কথা শুরু করল সে, “আচ্ছা শোনো৷ রোজই আমাকে আলটিমেটাম দিয়েছে। এখন আমি মেডিকেল রিপোর্ট তো দেখাতে পারব। কিন্তু সাক্ষী ম্যানেজ করতে পারলে সাদিয়াদের চরম একটা শিক্ষা দেওয়া যেত। দেখো, আমি জানি তোমরা ভয় পাও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের। কিন্তু একবার প্রতিবাদী হও। তোমাদের দেখাদেখি আরও অনেকেই হবে তখন। হলে, ক্যাম্পাসে র্যাগিঙের নামে যে অমানবিক নির্যাতনটা চলে সেটাও বন্ধ হবে, সাদিয়াদের মতো সিনিয়রদেরও বিচার হবে। আমি মিতুর জন্য বিচার চাই। ক্যান্টিনে সবার সামনে তাই দোষারোপ করেছি সাদিয়াদের। তোমরা কি মিতুর জন্য সাক্ষী দেবে? প্লিজ, বোনেরা আমার!”
এই অনুরোধে দুজনেরই মুখ কাঁচুমাচু হয়ে গেল। সাক্ষী দেওয়া মানে যে হল থেকেই বের হয়ে যাওয়া! কিংবা এর চেয়েও খারাপ কিছু যদি হয় ওদের সাথে? মিতুকে সামান্য তর্ক করার জন্য এতটা ভুগতে হলো। সেখানে ভার্সিটির নেত্রীদের বিরুদ্ধে সবার সামনে সাক্ষী দিতে গেলে ওদের জীবনটাও তো নষ্ট হতে পারে!
“মাফ করো, আপু। আমার এত সাহস নাই”, তিশা অনুতপ্ত গলায় বলল।
পাখিও একই সুরে সুর মেলাল, “আমিও পারব না, আপু। অনেক ভাগ্য করে এখানে পড়ার সুযোগ পাইছি। কিন্তু এসব কারণে আমার ক্যারিয়ারে প্রভাব পড়লে আমার ফ্যামিলি খুব হতাশ হবে, কষ্ট পাবে।”
“মিতুর জন্য কি তোমাদের কষ্ট হচ্ছে না?” শাজ কোমল গলায় বোঝাতে চেষ্টা করল, “ও তো মরেও যেতে পারত। তোমরা আজকে ভয়ে চুপ থাকতে চাইছো৷ কালকে কোনো কারণবশত তোমাদের সাথে যদি…”
“কেউ কি শাজকেও জোরাজোরি করে ধরে নিয়ে এলো সমাবেশে?”
কথার মাঝে অন্য কারও কথা শুনে শাজ পেছন ঘুরে তাকাল। গা ছেড়ে কেমন ধীর পায়ে, স্বাচ্ছন্দে হাঁটতে হাঁটতে আসছে শেহরোজ ওরই কাছে৷ হাঁটার ভঙ্গিমাটা দেখে শাজ মনে মনে আরেকবার হোঁচট খেলো৷ কোনো একটা ম্যাগাজিনে সে পড়েছিল, যারা ধীর পায়ে ও স্বাচ্ছন্দে হাঁটে তারা নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে পছন্দ করে। এমন ব্যক্তিরা খুবই আত্মবিশ্বাসী হয়। তারা যে কোনো কাজই ঠান্ডা মাথায় করতে পারে। কোনো বিষয় নিয়েই তারা উত্তেজিত বোধ করে না। এই বিষয়টা পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল ওর। নিজের দ্রুত চলার ধরনও তাই বদলাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ধীর পায়ে আবার স্বাচ্ছন্দে কীভাবে হাঁটা যায়, তা শাজ বুঝতে পারেনি বলে হাঁটার ধরনও পরিবর্তন করতে পারেনি সে। এরপর মাঝেমধ্যে কিছু ছেলেদেরও হাঁটার ধরন সে লক্ষ করত — সেরকমটা দেখেনি তাদের চলনে। আর আজ শেহরোজকে অমনভাবে হাঁটতে দেখে ইচ্ছের বিরুদ্ধে আরেকবার মুগ্ধ হতে হলো ওকে। তবে সঙ্গে সঙ্গে এও মনে পড়ল, শেহরোজ কে! তাই ক্ষণিক পূর্বের ভালো লাগা ভুলে সামলে উঠল এবং জবাবও দিলো, “ছাত্রশক্তির সমাবেশে শাজের আসার বারণ, তা তো জানা ছিল না।”
“সকালে ছাত্রশক্তিকে কুত্তাশক্তি বলে দুপুরে ছাত্রশক্তির সমাবেশে হাজির! হিসাব তো মিলছে না, শাজ ইরশানা।”
“সিঙাড়া, কলা, মিষ্টির লোভে এসে পড়েছি, সিনিয়র। পাবো তো নাশতা?” ফিচেল হেসে জিজ্ঞেস করল শাজ।
কতক্ষণ চুপটি করে চেয়ে থাকে শেহরোজ। দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে হঠাৎ কী ভেবে ঠোঁট কামড়ে হাসে, “ওটা ছাত্রশক্তির কর্মীদের জন্য বরাদ্দ। তুমি কি আমাদের কর্মী?”
“ওয়ান সেকেন্ড।” শাজ সরু চোখে চেয়ে বলল, “আমাকে তুমি করে বলছেন কেন আপনি? কাল আমাদের মাঝে এমন কোনো সম্পর্ক হয়নি যে, এক লাফে আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসতে পারবেন। এমন পারমিশন আমি দেবোও না।”
“ভার্সিটির জুনিয়রকে আপনি বলার মতো পোলাইট হতে পারলাম না বলে ভেরি স্যরি। কাল যখন পরিচয় হয়েছিল তখন তুমি আমার কাছে স্টেঞ্জার ছিলে, শাজ।”
“আমি আসলে বুঝিনি।” উপহাস করে বলল শাজ, “রাতের হেল্পফুল, ইনোসেন্ট ম্যান সকালে স্বৈরাচারের দোসর রূপে প্রকাশ পাবে।”
শেহরোজ দু পা এগিয়ে এলো শাজের কাছে। কালো চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে ওর আগাপাছতলা চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসল। মৃদুস্বরে বলল, “আমিও বুঝিনি, রাতে মিকি মাউসের টিশার্ট পরা বেখেয়ালি সুন্দরী সকালে প্রতিবাদী, জাগরণী রূপে প্রকাশ পাবে।”
“আপনি সাক্ষী চেয়েছিলেন না?” কথাটা জিজ্ঞেস করেই বলল শাজ, “আমি এখনই দুজন সাক্ষীর মুখোমুখি করছি আপনাকে।”
“সময় দিয়েছি তো।”
“প্রয়োজন নেই”, জেদি গলা শাজের। “মেডিকেল রিপোর্টটা কালকে দেখাব।” বলেই ফিরে দাঁড়াল তিশা আর পাখির দিকে। কিন্তু ওরা কই? আশ্চর্য! চারপাশে তাকিয়ে কোনোখানেই দেখতে পেলো না ওদের। ওরা কি তবে রোজকে দেখেই পালিয়েছে? সে টেরও পেলো না!
“তোমার সঙ্গে যে দুজন ছিল তাদের কথা বলছ?”
মুখটা মলিন হয়ে গেছে শাজের। কোনো জবাব দিলো না। শেহরোজ জানাল, “আমি তোমার সাথে কথা বলার মাঝেই ওরা চলে গেছে।”
“ওরা আমার বান্ধবীর রুমমেট ছিল।” ভার কণ্ঠে বলল শাজ।
শেহরোজ কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই আচমকা হইচইয়ের আওয়াজ ভেসে এলো। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘ভালো’ জায়গায় দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে হাতাহাতি শুরু হয়েছে সমাবেশের দুই গ্রুপের মাঝে। দেখতে দেখতেই চোখের সামনে ঝামেলাটা বড়ো আকার ধারণ করল। একদল অন্যলকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান গেট পর্যন্ত ধাওয়া করে নিয়ে গেল। শাজ চমকে উঠল — সালমানকে চার, পাঁচজন মিলে খুব মারধোর করছে। ও চেঁচিয়ে উঠল, “সালমানকে ওরা মারছে কেন?” উত্তেজিত হয়ে পড়ল খুব।
শেহরোজ শাজকে নিয়ে হট্টগোলের মাঝামাঝিতে পড়ে গেছে। নিরাপদ কোনদিকে তা খেয়াল করতে গিয়ে হঠাৎ খুব অস্বস্তি অনুভব করল ও৷ আশেপাশে নজর ঘোরাতে ঘোরাতে কী যেন হলো — সহসা কব্জি চেপে ধরল শাজের। তারপর কোনো কথা ছাড়ায় ওকে নিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল সে।
“আমাকে কোথায় নিচ্ছেন? আমার বন্ধুকে মারছে ওরা! প্রিয়া, তানহা, ওদের ছেড়ে আমি যাব না। হাত ছাড়ুন, শেহরোজ।” চেঁচামেচি করতে থাকল শাজ। শেহরোজের শক্ত হাতের মুঠো থেকে হাতটা খসাতে পারল না একদম।
চারপাশে সবাই ছোটাছুটি করছে৷ যারা মারামারি শুরু করেছে, তাদেরকে অন্য নেতারা মাইকে ডাকাডাকি করে শান্ত হবার আদেশ দিচ্ছে বারবার।
শেহরোজ বেরিয়ে এসেছে টিএসসি থেকে। রাস্তায় এসেই একটা টয়োটা ফিল্ডারের কাছে এসে থামল। “উঠে পড়ো।” গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে সে নির্দেশ করল শাজকে।
“এটা কার গাড়ি? কেন উঠব আমি?” রেগে উঠল শাজ, “ওখানে আমার বন্ধুরা রয়েছে৷ আর আমি ওদেরকে ছেড়ে…”
“ওরা মরে যাচ্ছে না”, কথা আটকে দিলো শাজের৷ “এটা থেমে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই৷ ওদেরকে নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। গাড়িতে ওঠো তুমি৷ এটা আমার গাড়ি।”
“কিছুক্ষণের মধ্যে থেমে গেলে আমি এমন মরিয়া হয়ে আপনার গাড়িতে উঠব কেন?” কঠিন গলায় বলল শাজ।
প্রশ্ন যৌক্তিক। শাজ আলা-ভোলা কোনো মেয়ে নয়৷ উত্তর না নিয়ে সে একচুলও নড়বে না এখান থেকে। সেটা শেহরোজ বুঝতে পারল চট করেই৷ দু সেকেন্ড কিছু একটা ভাবল সে। তারপর আচমকা ওর গা ঘেঁষে দাঁড়াল সে — ঠিক প্রেমিক বা স্বামীদের মতো। শাজ অবাক হলো একটু। ওর সে অবাক চোখে চোখ রেখে নিচুস্বরে বলল শেহরোজ, “ইরা মির্জা তোমার কথা সম্পাদক আসিফের কানে তুলে দিয়েছে। আমি তখন খেয়াল করলাম, আসিফের ছেলেগুলো ওই সময় তোমার দিকে বারবার দেখছিল৷ এখন ভেঙে বোঝাতে হবে কেন দেখছিল?”
নিশ্চুপ শাজের উত্তরের প্রত্যাশা করল না৷ গাড়ির খোলা দরজা ইশারা করে শেহরোজ ড্রাইভিং সিটে এসে বসল৷ তা দেখে শাজও চুপচাপ বসে পড়ল ওর পাশে।
ঝামেলা থামেনি৷ আরও বেড়ে গেছে৷ মারামারির এক পর্যায়ে সবাই রাস্তায় উঠে আসায় গাড়ি চলাচল থেমে গেল৷ ততক্ষণে অবশ্য শেহরোজ কিছুটা এগিয়ে গেছে৷ কিন্তু মাঝপথে এসে নিত্যদিনের লম্বা জ্যামে ফেঁসে যেতে হলো ওদের। ইতোমধ্যে বেলা চারটা।
চুপচাপ বসে থাকা শাজ সামনের দিকে তাকিয়ে বুঝল, রাত আটটা বেজে যাবে এই জ্যাম থেকে মুক্তি পেতে৷ গাড়ির কাচ তুলে এসি চালু করে দিয়েছে শেহরোজ গাড়িতে উঠেই৷ শাজ বলে উঠল, “তিন-চার ঘণ্টার ঘুম হয়ে যাবে এখন এখানে বসেই।”
কোনো উত্তর দিলো না শেহরোজ৷ রেয়ার ভিউ মিররে দেখতে পাওয়া পেছনের গাড়িগুলোতে নজর ওর। শাজ এর মাঝেই বলল এবার, “একটু কল করুন আপনার লোকেদের কাছে। ঝামেলাটা থেমেছে না-কি জিজ্ঞেস করবেন না?”
সালমানের জন্য চিন্তা হচ্ছে ওর। কিছুক্ষণ আগে প্রিয়া আর তানহার সাথে কথা হয়েছে৷ ওরা নিরাপদেই বেরিয় পড়েছে টিএসসি থেকে৷ শাজকে বকাঝকা করল সেই সাথে৷ কারণ, ওরাও চিন্তা করছিল ওর জন্য। এরপর অঙ্কনকে কল করলে সে ফোন ধরেনি, সালমানও ধরেনি।
শেহরোজ চুপচাপ কানে ফোন চেপে রেখেছে৷ কয়েক সেকেন্ড পর ফোনটা কান থেকে নামিয়ে জানাল শাজকে, “ধরছে না। কিছুক্ষণ পর ট্রাই করব আবার।”
***
রাত ৮:৩০ ।
গাড়ি আকস্মিক সাংঘাতিকভাবে ব্রেক কষল। সেই ধাক্কায় ঘুম ছুটে গেল শাজের।
ওর অনুমান ভুল ছিল না। একটু একটু করে গাড়ি এগোতে এগোতে রাত হয়ে গেছে। এর মধ্যে ও খবর পেয়েছে সালমানের। তেমন বিপজ্জনক কিছু ঘটেনি। অঙ্কনসহ আরও কয়েকজন দ্রুত গিয়ে ওকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল তখন। খবরটা শোনার পরই শেহরোজকে বলে শাজ, “আমি চোখ বুজলাম। যদি ঘুমিয়ে পড়ি তাহলে একদম পৌঁছনোর পর ডেকে তুলবেন।”
জবাবে একটু হেসেছিল শেহরোজ সে সময়। সে হাসি দেখেই শাজ বিরক্ত নিয়ে চোখ বুজে ফেলে। বিরক্তের কারণ, টানা দুই ঘণ্টা লোকটা চুপচাপ বসে ছিল কেমন গম্ভীর হয়ে। ও কথা বললে কেবল সেটারই উত্তর দিয়েছে। তাছাড়া নিজে থেকে গল্প জমানোর চেষ্টা করেনি৷ উলটে ফোনের মাঝে ব্যস্ততা দেখাচ্ছিল শেহরোজ। এরপরের দুই ঘণ্টা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে শাজ।
কিন্তু এখন কী হচ্ছে? ঘুম ভেঙেই গাড়ির অস্বাভাবিক গতি আর বারবার বাঁক কাটা দেখে চমকে উঠল ওর আত্মাটা। ভয়ে চেঁচিয়ে বলল, “এমন করে গাড়ি চালাচ্ছেন কেন? অ্যাক্সিডেন্ট করব তো।”
শেহরোজের বজ্রকঠিন মুখটা চোখে পড়ল না ওর। এটাও খেয়াল করল না — মহাখালীর রাস্তায় ওঠার পর থেকে তিন তিনটা যান ধরাশায়ী করার চেষ্টা চালাচ্ছে ওদের গাড়িটাকে৷ দুটো হোনডা সিবিআর ১৫০আর স্পোর্টস বাইক, আর অন্যটা সাদা টয়োটা এলিয়ন।
বাইকদুটো ওদের গাড়ির দুপাশে চলছে। বাইকে বসা আরোহীরা হেলমেট পরিহিত। দুই বাইকের পেছনে বসা ব্যক্তিদের হাতে ধাতব কিছু রয়েছে৷ সেটা দিয়ে জানালার কাচে একযোগে আঘাত করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। শেহরোজ তখনই হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষে৷ তাতে বাইক দুটো ছিটকে সামনে চলে যায়। কিন্তু খুব বিশেষ একটা লাভ হলো না। পেছনের সাদা এলিয়ন স্কিড করে সামনে এগিয়ে আসছে এখন। উদ্দেশ্য, ওদের গাড়িটাকে আঘাত করবে। সেটা টের পেয়েই শেহরোজ চেঁচিয়ে আদেশ দিলো, “শাজ, বও ইয়োর হেড অ্যান্ড সিট টাইট।”
চলবে।