শেহরোজ পর্ব-০৮

0
345

#শেহরোজ — ৮
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

শাজ তার সিটে বসে তখন দু’হাতে বুক ঢেকে মৃগী রোগীর মতো কাঁপছে। সেই সাথে কী যেন প্রলাপ বকছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ওকে এমনভাবে দেখে শেহরোজ “শাজ? শাজ?” বলে ডাকতে থাকল। মাথাটা নুইয়ে বসে আছে শাজ। কোনো সাড়া দিলো না শেহরোজকে, মুখটাও তুলল না৷ যেন শুনতেই পায়নি শেহরোজের ডাক।

ভেতরে এসে প্যাসেঞ্জার সিটে বসল শেহরোজ৷ শাজের অবস্থা দেখে দরজাটা আটকে দিয়ে ওকে ডাকল আবারও। বলল, “দেখো শাজ, বিপদ কেটে গেছে। আর ভয়ের কিছু নেই।”

আপনমনে বিড়বিড় করে শাজ তখনো প্রলাপ বকে যাচ্ছে। শেহরোজের উপস্থিতি বা তার কথা কোনো প্রভাবই ফেলছে না ওর মাঝে। ব্যাপারটা দেখে কতক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থাকল সে। চিন্তাও ফুটে উঠল শেহরোজের চেহারায়। আবার এদিকে এক্ষুনি এখান থেকে সরে পড়া দরকার ওদের৷ কিন্তু ড্রাইভিং সিটে গিয়ে শাজ বসে আছে। দ্রুত কিছু ভেবে নিলো সে। গায়ের টিশার্টটা হঠাৎ খুলে গাড়ির ভেতরের আলো নিভিয়ে শাজের কাছে সরে এসে বসল। “শাজ, তাকাও আমার দিকে”, ললিত সুরে বলতে বলতে ওর মাথায় হাত রাখলো আলতোভাবে। আর অমনি আঁতকে উঠে শাজ চেঁচিয়ে উঠল, “বাঁচাও কেউ… আমাকে বাঁচাও… মেরে ফেলবে আমাকে… ওরা মেরে ফেলবে!” অনর্গল চেঁচাতে থাকল এভাবেই৷

ওরা চেঁচামেচি শুনে সাব্বির আর আকাশ পেছন থেকে ছুটে এলো। জানালার কাছে উঁকি দিয়ে সাবধান করল সাব্বির, “ভাই, মানুষজন চলে আসবে তো। জলদি কেটে পড়েন আপনারা।”

হাতের ইশারায় ওদেরকে চলে যেতে বলেই শেহরোজ চেঁচামেচি করতে থাকা শাজকে দ্রুত বোঝাতে শুরু করল, “আমার কথা শোনো একবার, শাজ। শাজ? কেউ তোমাকে মারবে না, মারতে পারবে না। আমার দিকে দেখো, আমি তোমার সঙ্গে আছি। দেখো একবার?”

কিছুক্ষণ আগের পরিস্থিতি ওকে মাত্রাতিরিক্ত আতঙ্কিত আর হতবিহ্বল করে তুলেছে। এই আতঙ্ক অনুভব থেকেই শাজ এখনো বুঝতে পারছে না বিপদ কেটে গেছে। বরঞ্চ ও এখনো মনে করছে খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে ওর সঙ্গে, এক্ষুনি হয়তো ওকে মেরে ফেলা হবে। বছর দুই যাবৎ কোনো কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করলে অথবা কঠিন বা মানসিক চাপযুক্ত কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেই প্যানিক অ্যাটাক হয়।
এবং এই মুহূর্তেও ঠিক সেটাই হতে চলেছে ওর সঙ্গে।

সমস্যাটা ধরতে সময় লাগল না শেহরোজের। আকস্মিক তিব্র টানে ওকে নিজের বুকের মাঝে আনল সে। নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ওর কানের কাছে ঠোঁট নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “তুমি খুব সাহসী একটা মেয়ে, শাজ। খুব দৃঢ় ব্যক্তিত্বের তুমি। আমি জানি কোনো বিপদ, কোনো ভয় তোমাকে টলাতে পারে না কখনো। কোনো কিছুতেই তুমি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাও না। ছাত্রশক্তির ভয়ে মিতুর জন্য আর কেউ ভাবেনি। কিন্তু তুমি ভেবেছ ওর জন্য৷ একটুও ভয় করোনি কাউকে। ইউ আর ব্রেভ ফর অল টাইম, শাজ। এখনো তুমি বিপদকে হারিয়ে দিয়েছ৷ একবার চোখ খুলে দেখো। কেউ নেই তোমাকে মারার জন্য… কেউ নেই।”

কথাগুলোর ইতিবাচক প্রভাব বোধ হয় একটুখানি পড়ল শাজের মনে৷ তবে প্রলাপ থামল না৷ শেহরোজের বুকের মধ্যে থেকেই কেবল ধীরে ধীরে মাথাটা উঁচু করল আর প্রলাপ গাইলো, “আমাকে কেন মেরে ফেলবে? আমি তো কিছু করিনি। আমাকে মারল কেন বলো? আমার সঙ্গে কেন এরকম করল? আমি মরতে চাই না… আমি মরে গেলে আব্বু ফিরে এসে তো আমাকে পাবে না…” চলতেই থাকল কথাগুলো।

“কে মারবে তোমাকে? শেহরোজ আছি না?” ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদর সুরে বলল সে, “আমাকে ভরসা করো, শাজ। কেউ তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না, এই শেহরোজ তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।”

“শেহরোজ… শেহরোজ”, বিড়বিড়িয়ে নামটা দুবার উচ্চারণ করেই আবার শুরু করল শাজ, “আমাকে তো খুন করতে এসেছিল ওরা। আব্বুর মতো আমি হারিয়ে যেতাম, তাই না? ওরা আবারও আসবে আমাকে মারতে। তখন কে… “ পুরুষালী ঠোঁটজোড়া সহসা নেমে এলো ওর কম্পিত ঠোঁটের ভাঁজে। শেষ বাক্য তাই সম্পূর্ণ করা হলো না। নিমিষেই বুজে ফেলল চোখজোড়া। অনুভব করল, একটি দীর্ঘ আর্দ্র চুমু৷

ধীরলয়ে চোখ মেলল শেহরোজ — নবপল্লবের মতো কোমল দুটি ঠোঁটকে মুক্তি দিয়ে। আশপাশ থেকে আসা আবছা আলোয় দেখল, শাজের সজল চোখগুলো তখনো বন্ধ। ময়ূরের পেখমের মতো ঘন অক্ষিপক্ষ্ম বিছিয়ে আছে। তার উষ্ণ আলিঙ্গনে কাঁপছে মৃদু মৃদু। তবে শান্ত এখন । ঠোঁট চেপে স্মিত হাসল শেহরোজ। এক হাতে ওকে বাহুবন্ধনীতে মিশিয়ে রেখে অন্য হাতে ওর অবিন্যস্ত রেশম চুলগুলো গোছানোর ঢঙে গুঁজে দিলো কানের পিঠে। ভেজা গাল মুছে দিয়ে দৃষ্টি নামাল আবার ওর সান্দ্র ভেজা ঠোঁটে। নিষ্পলক চেয়ে থেকেই হঠাৎ গাঢ় স্বরে আওড়াল —

“আলিঙ্গন ও চুম্বন হায়
মরল তোমার ধ্যান করে;
তোমার ঠোঁটের চুমু না পেয়ে
পান্না চুনি গেল মরে !”

পঙক্তিগুলো কানে বাজতেই দৃষ্টি মেলল শাজ ঝট করে। অমনি চোখে চোখ পড়ল আবৃত্তিকারের। আবিষ্কার করল, তার পাথুরে চোখের চাউনিতে কী মায়া এখন! আর রহস্যময় সমুদ্রের মতোই গভীর। ওর মনে হলো, এই দুচোখের সমুদ্রে যেন কেবল ও নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে। মৃদুহাস্য শেহরোজও দৃষ্টি ফেরাল না। সম্মোহিতা শাজকে বুকের সঙ্গে লেপটে রেখেই নিজের টিশার্টটা পরিয়ে দিলো ওকে। চমকাল শাজ তক্ষুনি। শেহরোজের লোমশ বুকে মিশে আছে সে! বিব্রত হয়ে পড়ল খুব৷ আর একটু আগে যেটা হলো? আশ্চর্যভাবে নিজেও সাড়া দিয়েছিল সে! এটা কী করে করল ওরা? আস্তে আস্তে সরে এলো শেহরোজের কাছ থেকে।

“ঠিক আছ?” নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করল শেহরোজ। নীরবে উত্তর দিলো শাজ হালকাভাবে ঘাড় নেড়ে। তখন ওকে জানাল সে, “আমরা এখন বাসায় ফিরব। আর কোনো বিপদ নেই।”

কথাটা শুনে চারপাশে তাকাল শাজ। হামলাকারীদের কাউকে দেখতে পেলো না সে। রাস্তায় পড়ে থাকা লাশগুলোকে এর মাঝেই সাব্বির আর আকাশ তুলে ফেলেছে ওদের নোয়াহ-তে। গাড়ির বাঁ পাশে কেবল একজন পড়ে আছে অজ্ঞান হয়ে— যে শাজকে ধরতে এসেছিল।

“লম্বা করে কবার শ্বাস নাও। দেখবে ইজি লাগছে।” শাজকে বলেই শেহরোজ গাড়ি থেকে নেমে এলো। পায়ের কাছে তখন পড়ে আছে সেই অচেতন দেহটা। ওটাকে ডিঙিয়ে ঘুরে এসে
বসে পড়ল ড্রাইভিং সিটে। তবে এর মাঝেই পেছনে থাকা আকাশ, সাব্বিরকে কিছু একটা বলে দিলো ইশারায়।

গলির ডানে-বামে মোড় নিতে নিতে শাজকে লক্ষ করছে সে। গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিচ্ছে শাজ। কাজটা শেষ করে চোখদুটো বুজে নিলো। মাথাটা এলিয়ে দিলো সিটের সঙ্গে। তখন জিজ্ঞেস করল শেহরোজ, “পানি দেবো?”

“দিলে ভালো হত।” নিস্তেজ গলায় বলল শাজ। বোতলটা এগিয়ে দিলো শেহরোজ। খাওয়া শেষে বোতল কোলের ওপর রেখেই শাজ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, “ওরা ছাত্রশক্তির কোনো লোক ছিল না, তাই না? আপনি মিথ্যে বলেছিলেন?”

“হ্যাঁ, সে মুহূর্তে তোমাকে বোঝানোর সময়টা ছিল না হাতে”, আত্মপক্ষ সমর্থন করল শেহরোজ। “তুমিও ধৈর্য নিয়ে বোঝার মতো স্থির ছিলে না।”

“আপনি কী করে বুঝলেন ওরা আমাকে আক্রমণ করবে? ওদের চিনলেনই বা কী করে?”

“আমি তোমার সাথে কথা বলার মুহূর্তেই কবার চোখে পড়েছিল, দুজন ঘুরঘুর করছে আমাদের চারপাশ দিয়ে। প্রথম দিকে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝিনি, সন্দেহও হয়নি। কিন্তু ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ার পরই দেখলাম ভিড়ের মাঝে ওই দুজন ব্যক্তি মারমুখী হয়ে তোমাকে অনুসরণ করেই ছুটে আসছে। হাতে আবার নাইটস্টিক। তখন তো হেলমেট পরা ছিল না৷ তাই চেহারা দেখেই বুঝেছি ছাত্রশক্তির কেউ নয় ওরা। এখন আমাকে বলতে পারবে কি…” শাজের দিকে একবার ফিরল শেহরোজ, “কেন তোমার ওপর অ্যাটাক করল ওরা? তোমাকে কেন ধরতে চাইছিল?”

“আমি কী করে জানব সেটা?” মৃদুস্বরে বলে ভাঙা জানালার বাইরে তাকাল শাজ।

“কিন্তু কোনো একটা কারণ তো থাকবেই। আর ওরা কোনো পাতি মাস্তান টাইপের কেউ ছিল না, যতটুকু বুঝলাম৷ নাইটস্টিক, গান, ওদের কথাবার্তা আর ফাইটিংয়ের কৌশল, সব কিছুতেই পেশাদারিত্ব ছিল।”

“তাহলে আপনি?” সন্দিহান হয়ে তাকাল শাজ, “আপনি কী করে ওদের হ্যান্ডেল করলেন? ওরা গেলই বা কোথায়?”

হাসল শেহরোজ, “দেখতেই তো পেয়েছিলে কী করে হ্যান্ডেল করলাম।”

“কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? আপনি একজন সিভিলিয়ান হয়ে অমন চারজন প্রোফেশনাল রাইডারদের সঙ্গে একা লড়লেন!” কৌতূহল, বিস্ময় আর সন্দেহ শাজের চোখে।

“এমন সারপ্রাইজড হইয়ো না প্লিজ”, হাসতে হাসতে বলল শেহরোজ। “আমার ফিটনেস দেখে কিছুটা আন্দাজ কি হয় না আমি একজন বক্সার?” প্রশ্নটা রেখেই আবার বলল, “প্রত্যেক সামার ভ্যাকশনে জঙ্গলে শিকারেও যেতাম দাদুর সঙ্গে। তাই শুট করতেও জানি।”

“আচ্ছা!” সন্দেহ গেল না তবু শাজের। জিজ্ঞেস করল একটু পরই, “তারপর কী হলো ওদের?”

“তোমার চেঁচামেচি শুনে লোকজন চলে আসছিল বোধ হয়। সেটা বুঝতে পেরেই বাইক ফেলে পেছনের সেই গাড়ি করে ছুট দেয়।”

ভাবতে থাকল শাজ আপনমনে। শেহরোজের কথাতে কোনো ফাঁক পেলো না অবশ্য৷ কারণ, তখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সে পুরো পরিস্থিতি দেখার মতো বা বোঝাত মতো অবস্থাতেই তো ছিল না। যখন সম্বিৎ ফিরল, তখন সামনে কেবল বাইকদুটোই রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। কিন্তু এলাকার কোনো লোকজনকেই তো আশেপাশে চোখে পড়ল না! রাত কতই বা হয়েছে? সবাই ঘুমিয়ে পড়ার তো কথা না। হাতঘড়িতে সময় দেখার জন্য দৃষ্টি ঝুঁকাতেই আবিষ্কার করল, ঘড়িটা ওর হাতে নেই৷ খামচির দাগে ভর্তি সেখানে৷ বুক কেঁপে উঠল দেখেই। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে জিজ্ঞেস করল শেহরোজকে, “কত বাজে? আমার ঘড়িটা মনে হয় নিচে পড়ে গেছে।”

ফোনে সময় দেখল শেহরোজ, “প্রায় দশটা। তোমার ঘড়ি আমি কাল খুঁজে দেবো। গাড়ির মধ্যেই তো আছে৷ চিন্তা কোরো না।”

নিশ্চুপ হয়ে গেল শাজ। গাল, গলা আর বুকের কিছু জায়গায় জ্বলন অনুভব হচ্ছে ভীষণ। ধস্তাধস্তির সময়ে লোকটা জংলী জানোয়ারের মতো হামলা করেছিল ওর ওপর। মুহূর্তটুকু কী ভয়ঙ্কর ছিল! মনে পড়তেই আঁতকে উঠল আবার।

শেহরোজ আড়চোখে ওর ওপর নজর রাখছে। চোখে-মুখে আবার ভীতিবোধ দেখে বলল, “ভেবো না আর ওদেরকে। দেখি আগামীকাল ঝুমা আন্টিদের সাথে আলোচনা করে পুলিশকে ব্যাপারটা জানানো যায় কি-না।”

“না প্লিজ।” বারণ গলায় জানাল শেহরোজকে, “কাউকেই জানানোর দরকার নেই৷ আন্টি জানলে আবার বড়ো কাকুকে ফোনে জানিয়ে দেবে। কাকু এমনিতেই খুব চিন্তায় থাকে আমাকে নিয়ে।”

“কিন্তু জানানোটা দরকার, শাজ। এত বড়ো হামলার কথা লুকোনো একদম উচিত হবে না।”

“কিন্তু ঝামেলাটা হবে তখন কাকুর সঙ্গে আমার মামাদের। আমাকে নিয়ে তাদের মধ্যে টানাহ্যাঁচড়া চলে সারা বছরই৷ আমি আসলে ফ্যামিলি ক্রাইসিসটা আপনাকে ঠিক বলতে পারছি না।” মুখটা নুইয়ে ফেলল শাজ।

“ইট’স অলরাইট। বলতে হবে না। বাট তারপরও আমি এই বিষয়টা কাউকেই না জানিয়ে থাকার পক্ষে নই, শাজ। তোমার কাকু বা তোমার মামাদের অবশ্যই জানা উচিত। ভবিষ্যতে আবারও যে অ্যাটাকটা হবে না তোমার ওপর, তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে?”

“নেই। আবারও হবে জানি।” ফিসফিসানো গলায় বলল শাজ, “কারণ, এটা আমার ওপর সেকেন্ড টাইম অ্যাটাক। যেটা আজ বুঝলাম।”

“কী বলছ!” আশ্চর্য চোখে তাকাল শেহরোজ, “ফার্স্ট কবে হয়েছিল?”

ঠোঁট চেপে কিছু সময় চুপ থাকল শাজ। তারপর জানাল, “মাসখানিক আগে আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। বাইক অ্যাক্সিডেন্ট। সেদিন টিউশনি ছিল রাতে৷ টিউশনি শেষ করে সবে বেরিয়েছি৷ কিছুদূর এগোনোর পর মনে হলো, কেউ বা কারা আমাকে ফলো করছে। আমি পিছু ফিরলাম। কিন্তু সন্দেহজনক কাউকে দেখলাম না। রাস্তায় মোটামুটি দু চারজন ছিল। তাদের ভরসাতেই হাঁটছিলাম। একটা গলির মুখে আসতেই আবারও মনে হলো কেউ পিছু নিচ্ছে। আর সে সময় আমি একা। ভয় হলো খুব। তাই পিছু ফিরে না দেখেই ছুটলাম বাঁয়ের রাস্তায়। গলিতে ঢুকলাম না। সে সময় শব্দ পেলাম কয়েকটা পায়ের ছুটবার আওয়াজ। নিশ্চিত হলাম সত্যিই তবে ফলো করা হচ্ছিল আমাকে। আমি বখাটেই ভেবে নিয়েছিলাম। ওদের মাঝ থেকে কেউ একজন আমাকে গালি দিয়ে থামতেও বলেছিল। নয়ত ইট ছুঁড়ে মারবে। আমি আরও ভয় পেয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে গিয়েই মেইন রোডে এসে উঠি আর অমনিই একটা বাইকের সঙ্গে অ্যাক্সিডেন্ট হই। সে সময় লোকজন জড়ো হয়ে গিয়েছিল বলেই হয়তো ওদের হাত থেকে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম।”

“কিন্তু ওরা তো সত্যিই বখাটেও হতে পারে।”

“হতে পারত।” কয়েক পল সময় নিয়ে বলল শাজ, “যদি কণ্ঠটা একই না হত সেদিনের লোকটার আর আজকে যে বের করে দেওয়ার কথা বলছিল আমাকে, তার। আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট নিশ্চিত হয়েই বলছি, একই ব্যক্তি সে। এবং একই গালির সুর, হুমকির সুর।”

“এক মাসের ব্যবধানে দুবার আক্রমণ হলো তাহলে!” চিন্তা প্রকাশ পেলো শেহরোজের মাঝে, “ব্যাপারটা আমি তোমার বর্তমান অভিভাবককে না জানিয়ে থাকতে পারব না, শাজ। এখন বলো কে তোমার প্রায়োরিটি লিস্টে প্রথম? মামা না চাচা?”

“কাকু”, কেমন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল শাজ বলার পরই।

“আমি ঝুমা আন্টির সঙ্গে আলোচনা করব আগে।”

“কাকুর দেশে আসা সম্ভব নয়, শেহরোজ। তার ঘাড়ে কতগুলো মিথ্যে মামলা ঝুলছে। আমার এই বিপদের সংবাদ শোনার পর মানুষটা অস্থির হয়ে পড়বে। দেখা গেল দেশেও চলে এলো৷ আর এয়ারপোর্ট থেকেই হয়ত তখন গ্রেপ্তার হয়ে যাবে৷ তাই চাইছি না কাকু জানুক। আপনি টেনশন নেবেন না। আমি মামাদের সঙ্গে কথা বলে নেব।”

“মিথ্যে মামলাগুলো কারা করেছে?”

“করেছে আপনার সরকারের লোকেরা। আব্বু নিখোঁজ হওয়ার পর কাকু আব্বুর কিছু পরিচিত মানুষকে সন্দেহ করেছিল। যাদের নানারকম অনৈতিক কাজের কথা আব্বু নাকি জানত৷ তাদেরকে সন্দেহের তালিকায় এনে মামলাও করেছিল কাকু। আর তারপরই কারা যেন কাকুর নামেও একের পর এক মিথ্যে মামলা দিতে থাকে৷ সেসব মামলাতে যে অপরাধগুলো উল্লেখ ছিল, সব বানোয়াট। ডিবি পুলিশ কাকুকে গ্রেপ্তারের জন্য ছুটে আসতে থাকে প্রায় প্রতিদিন। কাকু সাদরেই ধরা দিতো। কিন্তু কোনো এক গোপনসূত্রে জানতে পেরেছিল, একবার ধরা দিলে আর তার মুক্তির সম্ভাবনা থাকবে না। তাই আমার কাকুর মতো একজন স্বনামধন্য, দেশের সম্পদতুল্য মানুষকে রাতের আঁধারে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল।” বলা শেষে দীর্ঘশ্বাস পড়ল শাজের। শেহরোজও চুপ হয়ে রইল কতক্ষণ।

বাসার প্রায় কাছাকাছি এসেই ওদের গাড়িটা আচমকা থেমে পড়ল৷ কবার চেষ্টা করল শেহরোজ চালু করার। কিন্তু স্টার্ট নিলো না গাড়ি। তা দেখে শাজকে বলল সে, “মনে হয় দীর্ঘ সময় হাই স্পিডে চালানোর জন্য ইঞ্জিনে লুব্রিক্যান্ট ঘাটতি হয়েছে।”

“তাও ভালো যে বাসার কাছে এসে থেমেছে।”

“সত্যিই। তুমি তাহলে নেমে যাও। আমি দেখি গাড়িটাকে ঠেলে গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য কাউকে পাই কি-না।”

“ইয়ে মানে… আমি কি হেল্প করব?” সঙ্কোচগ্রস্ত শাজ।

“পারবে না তুমি”, হাসতে হাসতে বলল শেহরোজ। “আর পারলেও তোমাকে ঠেলতে দেবো না।”

“কেন দেবেন না?” ভ্রু কুঁচকে বলল শাজ, “মেয়ে বলে পারব না ভাবছেন?”

“উমম…” ভাবনার সুর শেহরোজের, “অনেকটা তাই। তবে আসল কারণ হচ্ছে… ” হেঁয়ালি করে থেমে গেল সে। তা দেখে জিজ্ঞেস করল শাজ, “কী আসল কারণ?”

কিছুটা কাছে চলে এলো শেহরোজ। মৃদুস্বরে জানাল, “সুন্দরীদের এমন কাজে ব্যবহার করি না আমি।”

“চিজি ফ্লার্ট যদিও। তাও শুনি, কেমন কাজে ব্যবহার করেন সুন্দরীদের?”

মিটিমিটি হাসল শেহরোজ, “কোনোদিন সুযোগ দিলে দেখাব।”

মূক হয়ে তাকিয়ে রইল শাজ। শেহরোজের হাসি আর কথার কী অর্থ বুঝল কে জানে! ঝটপট নেমে পড়ল সে গাড়ি থেকে। “আসুন আপনি।” বলেই সে হাঁটা দিলো বাসার দিকে। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই চমকে উঠল সামনে এক লোককে দেখে। ঝুঁকে পড়ে লোকটি কী যেন খুঁজছে পথের মাঝে। পরনের কাপড়ের জীর্ণদশা আর আলুথালু জট পাকানো চুল দেখে বুঝতে পারল, লোকটা হয় পাগল নয়তো ফকির। আবারও কোনো আততায়ী কিনা এই ভেবে এক মুহূর্তের জন্য ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। ধারণা ভুল হওয়ায় নিশ্চিন্তে এগোলো আবার।

ওর যাত্রাপথে তাকিয়ে ছিল শেহরোজ। চলতে গিয়ে হঠাৎ পাগলটিকে দেখে থমকে পড়ায় বেশ মায়ায় অনুভব করল ওর জন্য। এও বুঝল, আজকের ঘটনা থেকে মেয়েটার বের হতে বেশ সময় লাগবে।

শাজ চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই নেমে পড়ল সে গাড়ি থেকে। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে এসে দাঁড়াল পাগলটার কাছে। “কয় পয়সা হারিয়েছ, মিয়া?”

“চৌচল্লিশ। খুঁইজ্জা দিবেন, আব্বাজান?” রাস্তায় হাতড়াতে হাতড়াতে বলল বৃদ্ধটি।

“খুঁজে দিতে পারব না। আমার কাছ থেকে দিতে পারব।” বলে শেহরোজ গাড়ির চাবিটা বৃদ্ধের সামনে ফেলে আরও কিছু জিনিস ফেলে দিলো তার কাঁধে থাকা থলির মধ্যে। সেগুলো ওই আক্রমণকারীদের ব্যবহৃত স্টিলেটো, ওয়ালেট আর পিস্তল। গাড়ির চাবিটা তুলে বৃদ্ধ আশ্বস্ত গলায় বলল, “এক্কেরে মুইচ্ছা দিমু এডির অস্তিত্ব। চিন্তা লইয়েন না, আব্বাজান। কেরু বাপই পমাণ পাইবো না।”

“রাতে ভালো ট্রিটমেন্ট দিয়ো দুটোকে। কাল সকালে এসে মলম লাগাব আমি।”

“আমারচে সেরা ডাত্তার কি আর বাংলাদেশে আছেনি, আব্বাজান?” বলেই বৃদ্ধ মুখ তুলে তরমুজের বিচির মতো দাঁতগুলো বের করে হাসল।

জবাবে ঠোঁট টিপে হেসে শেহরোজ বাসার পথ ধরল৷ সে সময়ই বৃদ্ধটি পেছন থেকে ভাবনাতীত জিজ্ঞেস করল, “আম্মাজানের বেশি কুনো ক্ষতি হইছেনি?”

শেহরোজ ফিরে দাঁড়াল। দেখতে পেলো বৃদ্ধের চোখে শাজের জন্য অকৃত্রিম স্নেহ। জানাল তাকে, “ক্ষতি একটু হয়েছে। চিন্তার করার মতো না তেমন।”

“আম্মাজান ম্যালা ভালা, আব্বাজান। খেয়াল রাইখেন আরও।”

মুচকি হেসে মাথাটা মৃদু নড করে সম্মতি জানাল শেহরোজ। বৃদ্ধ গাড়িটাতে গিয়ে বসল তারপর।
***

লিফটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে শাজ। কেন যেন শেহরোজকে ফেলে যেতে ইচ্ছা করেনি ওর। শেহরোজের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়েছে সে — গাড়িতে ওই অপ্রত্যাশি মুহূর্তটুকু কেমন অনুভূতির ছিল? আরও ভাবছে, কী করে তার অধরকে আঁকড়ে ধরেছিল ওর ঠোঁটদুটিও? তখন কোথায় হারিয়েছিল সে? এক লহমায় সব কিছু ভুলে বসেছিল! তবে কি শেহরোজ জানত, সে মুহূর্তে ওকে স্থির করা সম্ভব ছিল তার আকস্মিক, দুঃসাহসিক ঠোঁটের ওই গাঢ় ছোঁয়া? তারপর কেনই বা অমন আবেশ কণ্ঠে আবৃত্তি করল ওই শায়েরি?

“তুমি কি আমার অপেক্ষায়?” বিস্মিত শেহরোজ জিজ্ঞেস করল লিফটের সামনে ওকে দেখেই।

ভাবনায় ডুবে থাকা শাজ চমকে উঠল। বিব্রত হয়ে পড়ল শেহরোজের প্রশ্নে। সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলতে কেমন লজ্জা লাগছে। তাই একটু হাসল অপ্রস্তুত ভঙ্গিমাতেই। তা দেখে শেহরোজও হাসল। এগিয়ে আসতে আসতে বলল, “আমি ভেবেছিলাম আমার চিজি ফ্লার্ট তোমাকে ভয় পায়িয়ে দিয়েছে। তাই দ্রুত পালিয়ে এসেছ।”

চোখ পড়ল শাজের তখন শেহরোজের খোলা দেহে। হাতে, বুকে আর পেটের কোনায় তার কেটে যাওয়া লম্বা দাগ। রক্ত চুইয়ে পড়ছে সেসব ক্ষত থেকে৷ মুহূর্তেই শিউরে উঠল ও, “ইয়া আল্লাহ!” আঁতকে ওঠা গলায় বলে উঠল শেহরোজকে, “কী করে কাটল এত? রক্ত পড়ছে তো অনেক!”

#চলবে।