#শেহরোজ — ৯
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
নিজের শরীরে দৃষ্টিপাত করল শেহরোজ। হাত আর বুকের আঘাত দেখলেও পেটের কোনার দিকে নজর যায়নি ওর। কিন্তু ওখানেই বেশি কেটেছে দেখে বলল শাজকে, “তুমি না বললে তো ব্যথাও টের পেতাম না।”
“এত রক্ত পড়ছে! তাও ব্যথা টের পাননি বলছেন?” অস্থির হয়ে কাটাগুলো দেখতে দেখতে শাজ তাড়া দিলো, “জলদি বাসায় চলুন। রক্ত বন্ধ করা দরকার দ্রুত। জলদি চলুন।”
“প্যানিকড হইয়ো না, শাজ”। লিফটের বোতাম টিপে বলল শেহরোজ, “তখন আবার আরেক বিপত্তি হবে আমার।”
ওর পাশে এসে দাঁড়াল শাজ। ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি প্যানিকড হচ্ছি না৷ হলেও আপনার বিপত্তি কীসের? আপনার ঘাড়ে উঠে তো আর বাসায় পৌঁছচ্ছি না।”
শেহরোজ ঘুরে শাজের মুখোমুখি দাঁড়াল, “আমি তো অন্য কিছু ভেবে বললাম। তুমি এই মুহূর্তে আবার প্যানিকড হয়ে পড়লে যেটা আবারও করতে হত, সেটা এই লিফটের মধ্যে করাটা রিস্ক। ওই যে…” মুচকি হাসতে হাসতে আঙুলের ইশারায় সিলিঙের এক কোনে দেখাল শাজকে, “সিকিউরিটি ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে যাবে তাহলে। তখন তো বদনাম হয়ে যাব আমি। তাই বললাম বিপত্তিতে পড়ব।”
কোনো কথা বের হলো না শাজের গলা থেকে। অন্য দিকে মুখটা ফিরিয়ে নিলো চকিতে৷ বুকের ভেতরের অসামাল অনুভূতি আর দারুণ লজ্জা নিয়ে চুপচাপ রইল না পৌঁছনো অবধি।
***
ফ্লোরে এসে হঠাৎ দুজনই থমকে পড়ল৷ ঝুমা আন্টির বাসার ভেতর থেকে হইচইয়ের তীব্র আওয়াজ ভেসে আসছে৷ দরজাটাও হালকা ভিড়িয়ে রাখা। ব্যাপার কী? হচ্ছে কী ভেতরে? ভাবতে ভাবতে শেহরোজ এগিয়ে এসে দরজাটা খুলবে, ঠিক তখনই শাজ কপট আর্তস্বরে “খুলবেন না” বলে ছুটে গিয়ে ঠেকাল ওকে। ভড়কে গেল ও,“কী হয়েছে?”
“বলছি।” ফিসফিস করে বলল শাজ, “আগে এখান থেকে সরে পড়তে হবে।”
“কোথায় সরব? কেন সরব?” অবাক হয়েছে শেহরোজ।
ভাবতে সময় নিলো না শাজ, “আসুন আমার ঘরে। এখন ঢোকা যাবে না আন্টির বাসায়। পার্টিটা নষ্ট হবে তাহলে।”
“কীসের পার্টি চলছে? সকালে এমন কিছু তো বলল না আন্টি।”
শাজ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলো, “আমার জন্মদিনের পার্টি হচ্ছে৷ সারপ্রাইজ ছিল আমার জন্য। তাই জানায়নি বোধ হয় আপনাকেও।”
“বার্থডে যার তাকে ছাড়াই পার্টি!” ভেতরে এলো শেহরোজ।
দরজা আটকে দিয়ে শাজ জানাল ওকে, “আমাকে ছাড়া হতো না৷ নিশ্চয়ই সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষায় ছিল সবাই৷ দেরি হচ্ছে দেখে মনে করে নিয়েছে আমি দক্ষিণ খান চলে গিয়েছি। আর ঝুমা আন্টিকে যদি চিনে থাকেন এ কদিনে, তাহলে জানার কথা সে নিজের কষ্ট বিফলে যেতে দেওয়া লোক না। সব কিছুর আয়োজন যেহেতু করেইছে, পার্টিটাও করেই ছাড়বে। আর এজন্যই মনে হয় সব পরশিদের ডেকে ডুকে এনে মজমস্তি আরম্ভ করেছে। আমার দাদীও মনে হয় সেখানেই।”
“চমৎকার একটা ক্যারেক্টার আন্টি।” বসার ঘরটা দেখতে দেখতে জানাল শেহরোজ, “আই লাইক হার ভেরি মাচ।”
“আমি তাকে খুব ভালোবাসি।”
“বোধ হয় সেও।”
“কিন্তু কখনো মুখে সেটা স্বীকার যাবে না”, হাসতে হাসতে বলল শাজ। শেহরোজও হাসল। তবে হাসতে গিয়েই মৃদু কাতরানি বেরিয়ে এলো মুখ থেকে৷ ঠোঁটের কোনায় ছুঁয়ে দেখল শেহরোজ, সেখানেও কেটেছে হালকা।
“কী হলো?” শাজ চিন্তাসুরে জিজ্ঞেস করল এগিয়ে এসে, “ওখানেও কি কেটেছে?”
দাড়ির ভিড়ে রক্ত চোখে পড়েনি প্রথমে৷ এখন কাছে এসে বুঝল শাজ। শেহরোজ জানাল, “এটা ছুরির আঘাত না। টেনশন নিয়ো না।”
“আমি নিয়ে এলাম আপনাকে ফাস্ট এইড করে দেওয়ার জন্য৷” নিজেকে বকল শাজ, “অথচ দেখুন অভদ্রের মতো কেমন দাঁড় করিয়ে রেখেছি আপনাকে!”
“এত ওরিড হইয়ো না, শাজ। বললাম তো, আমি ঠিক আছি। তুমি একটু কষ্ট করে শুধু ফার্স্ট এইড কিট বক্সটা এনে দাও আমাকে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন আমার ঘরে।” তাড়াহুড়োই বলে শাজ এগোলোও কয়েক পা। শেহরোজও অনুসরণ করছিল। কিন্তু দরজার মুখে এসে হঠাৎ থমকে পড়ল শাজ। চোখে-মুখে কেমন আড়ষ্টতা ফুটে উঠল ওর। তা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল শেহরোজ, “কোনো অসুবিধা?”
অসু্বিধা তো আছেই। সেটা আগে কেন মনে পড়েনি শাজের? আর নিজের ঘরেই বা কেন আসার প্রস্তাব দিতে গেল? এখন ঘরে ঢুকতে না দিতে চাওয়ার ব্যাপারটা সামলাবে কী করে?
“শাজ?” বলল শেহরোজ, “কোনো প্রবলেম থাকলে আমি ফিরে যাই।”
কাঁচুমাচু মুখ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা শাজ তারস্বরে “না না” করে উঠেই বলল, “আসলে আমি খুব অগোছালো মানুষ, বুঝলেন? বাইরে বের হওয়ার সময় বেডরুমটা গুছিয়ে রেখে যেতে পারিনি।”
“ও আচ্ছা”, বিনয়ী হাসল শেহরোজ। “ইটস নো বিগ ডিল।” বলে ভেতরে ঢোকার জন্য সে নিজেই দরজাটা ফট করে খুলে ফেলল। শাজও আচমকা তখন দাঁড়িয়ে পড়ল ওর সামনে, “আপনার খুব বিরক্ত লাগবে এখানে৷” কৃত্রিম হেসে বলল, “তার চেয়ে চলুন আমার দাদীর ঘরে যাই।”
কেবল অগোছালো ঘরের জন্যই কি বাধা দিচ্ছে শাজ? ভাবাল শেহরোজকে৷ শাজের নকল হাসিমাখা মুখটা দেখতে দেখতে কিছু একটা ভেবে সে বলল, “তোমার বেডরুমের দরজায় যেহেতু দাঁড়িয়ে আছি। তাই তোমার বেডরুমেই ঢুকি। অমন অগোছালো সব ব্যাচেলর ছেলে-মেয়েই হয়। অবশ্য মেয়েরা একটু কম হয়। তবে ব্যাপার না। আমি কিছু মনে করব না। চলো তো তুমি।” তারপরই শাজকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে এলো সে৷ আর শাজ দরজার মুখেই দাঁড়িয়ে রইল চোখ-মুখ খিঁচে।
ঘরে ঢুকেই আগে চোখ পড়ল শাজের ওয়ারড্রবের মাথার ওপর। তারপর দেখল শেহরোজ শাজের বিছানা আর পড়ার টেবিল। তিনটি জায়গাতেই বিশেষ বিশেষ জিনিসের দেখা পেয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে সে, তা আপাতত নিয়ন্ত্রণ করে নিলো। হাসিটাও চেপে রেখে ঘুরে দাঁড়াল শাজের দিকে, “বিছানাতেই বসি?”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” বিব্রতপূর্ণ হাসিটা মুখে নিয়েই শাজ ছুটে এসে জামাকাপড়গুলো ঠেলে এক দিকে সরিয়ে দিলো। শেহরোজ বসলে ওকে সে বলল, “একটা মিনিট অপেক্ষা করুন। মেডিসিন বক্সটা নিয়ে আসি।”
পড়ার টেবিলের নিচের ড্রয়ার থেকে বক্সটা বের করার মুহূর্তে আড়চোখে দেখতে থাকল সে শেহরোজকে — ব্যাটার নজর ওর ওয়ারড্রব, বিছানা আর টেবিলের ওপর আসে কি-না৷ কারণ, ওয়ারড্রব আর বিছানার ওপর ঠায় পেয়েছে ওর লাল আর কালো রঙের স্বচ্ছ, আলোকভেদ্য কাপড়ের অন্তর্বাস। আর পড়ার টেবিলের ওপর রয়েছে একটি খোলা ম্যাগাজিন বই। যেখানে একজন তুর্কি অভিনেতা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার কেবল কমলা রঙা একটি শর্টস৷ আরও দুটো ছবি দেখা যাচ্ছে তার। সে ছবিগুলোতেও অভিনেতা অর্ধনগ্ন৷ সেখানেও পরনে ছোট্ট শর্টস৷ এ তিনটি জিনিসের কথা তখন মনে পড়েছিল বলেই সে ঢুকতে দিতে চাচ্ছিল না শেহরোজকে।
তবে ছেলে মাথা নিচু করে আছে দেখে শাজের অস্বস্তি একটুখানি কমল৷ কিন্তু চোখে তো নিশ্চয়ই পড়েছে এগুলো? কেন যে সব সময় এর সামনেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে সে!
শেহরোজের দৃষ্টি নত থাকার সুযোগে শাজ মেডিসিন বক্সটা নিয়ে আসার পথে ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখল আর ওয়ারড্রবের ওপর থেকেও অন্তর্বাসটা সরিয়ে নজরের আড়াল করে দিলো।
“আর একটু সময় বসুন।” বক্সটা বিছানায় রেখে বলল শাজ, “আমি হাতটা ধুয়ে আসি আন পানিও ফুটানোর ব্যবস্থা করে আসি।”
নীরবে মাথা নাড়ল শেহরোজ। মিনিট দুইয়ের ভেতরেই কাজ শেষ করে ফিরে এলো শাজ। শেহরোজের পাশে বসে ক্ষতগুলো ভালো করে দেখে নিলো৷ খুব বেশি গভীর নয়। চামড়ার ওপর দিয়ে কেটে গেছে কেবল। তবে রক্ত পড়ছে বুকের ক্ষত থেকে বেশি। গজ ব্যান্ডেজের মোটা টুকরো নিয়ে বুকের ক্ষততে ভালোভাবে চেপে ধরে রাখল রক্ষক্ষরণ বন্ধ না হওয়া অবধি। হাত আর পেটের ক্ষততেও একইভাবে চেপে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। ফাঁকে ফাঁকে শেহরোজের চোয়াল শক্ত করে রাখা মুখটা দেখতে ভুলছে না সে। নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে খুব! অথচ ছেলের সহ্যক্ষমতা তার চেয়েও খুব বেশি। একটু আহ্, উহ্ পর্যন্ত নেই! তা দেখে যতখানি বিস্মিত শাজ, ততখানি মুগ্ধও। জিজ্ঞেস করল শেহরোজকে, “ছুরিও ছিল ওদের কাছে?”
“হুঁ।”
“কীভাবে যে বেঁচে ফিরলেন এখনো ভেবে পাচ্ছি না।”
“আমিও তো ভেবে পাচ্ছি না এই প্রোফেশনাল অ্যাটাকার আসলে কারা? কেন তোমাকে বারবার অ্যাটাক করছে? বড়ো কোনো রিজন না থাকলে তো…”
“পানি বোধ হয় গরম হয়ে গেছে অনেক”, শেহরোজের কথার মাঝেই তড়িঘড়ি গলায় বলে উঠে পড়ল শাজ। “ভুলেই গেছিলাম। যাই, নিয়ে আসি।”
ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল শেহরোজ৷ ঘরের চারপাশে এক নজর বুলিয়ে উঠে এসে দাঁড়াল পড়ার টেবিলটার কাছে। জার্নালিজম নিয়ে পড়ছে শাজ। দু একটা বই নেড়েচেড়ে দেখে রেখে দিলো। ধরল সরিয়ে রাখা সেই ম্যাগাজিনটা। এটা জনপ্রিয় কিছু তুর্কি অভিনেতাদের নিয়ে লেখা। যে পৃষ্ঠাটা উন্মোচন করা ছিল সেই পৃষ্ঠা খুলল শেহরোজ৷ Can Yaman নামক তুর্কি অভিনেতার শর্টস পরিহিত ছবিগুলো দেখে ওর আর কিছু বুঝতে অসু্বিধা হলো না। মৃদু হেসে ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে ফিরে এলো পূর্বের জায়গাতে। তখনই শাজ ঘরে ঢুকলে হাতে উষ্ণ গরম পানির বড়ো এক পাত্র নিয়ে৷ তা দেখে শেহরোজ বলল ওকে, “একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলছি তোমাকে।”
“কথাটা আপনার নয়, আমার বলার কথা।” বলতে বলতে পাত্রটা মেঝেতে রাখল শাজ। “এই যে আবারও কষ্ট দেবো এখন। হাতটা দিন আগে।” প্রতিটা ক্ষতস্থান ধুয়ে ভালোভাবে ক্ষতস্থানের চারপাশে পরিষ্কার করে দিলো শেহরোজের৷ ড্রেসিং করার পালা এলে বলল, “এতক্ষণ যেমন দাঁত চেপে ছিলেন৷ এখনো তাই থাকবেন কিন্তু।”
হাসল শেহরোজ, “এমন কাটা ছেঁড়া, জ্বালাপোড়া সইবার অভ্যাস আছে। শিকারের সময় এর চেয়ে আরও কত গভীর ক্ষত হয়েছে শরীরে! তরতাজা সেই ক্ষতের দাগ দেখলে কী বলতে?”
“দেখান দেখি৷ তারপর ভাবব কী বলা যায়।”
“আরে… সত্যিই দেখতে চাও?” চোখে-মুখে কপট বিস্ময় শেহরোজের।
“হ্যাঁ। কত বড়ো ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন, তা দেখার কৌতূহল তো হচ্ছেই।”
“শিওর দেখবে?” এবার কৌতুক প্রকাশ পেলো শেহরোজের চোখে। মিটিমিটি হাসছেও।
“অমন হাসার কী আছে? এই আঘাতগুলোই আমাকে ভয় পায়িয়ে দিয়েছিল। অথচ আপনি কত স্বাভাবিকভাবে হজম করে নিচ্ছেন। আবার বলছেন এর চেয়েও বড়ো আঘাত নাকি হজম করেছেন আগে। তো সেটা দেখার ইচ্ছে হবে না?”
“প্যান্ট খুলতে হবে তাহলে।”
“কী!” বিস্ময়ের ধাক্কায় কেঁপে উঠল শাজের হাত। ঝুঁকে পড়ে সে শেহরোজের বুকের ক্ষততে ড্রেসিং করছিল তখন।
ওর বিস্ফারিত চেহারাটা দেখে দুষ্টুমির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিলো শেহরোজ, “কারণ, দাগটা আমার ঊরুতে।” ফিসফিসানির মতো করে বলল, “প্যান্ট না খুলে তো দেখানো সম্ভব নয়।”
লজ্জায় শাজ কোনো কথায় বলতে পারল না। সেই সুযোগে শেহরোজ জিজ্ঞেস করল, “দেখবে?”
“না”, ধমকে উঠল শাজ। লজ্জা ভাবটা আড়াল করতে কঠিন গলায় বলল, “চুপ করে বসুন। আমার কাজটা শেষ করতে দিন।”
“বাধা দিচ্ছি না-কি?” সরল কণ্ঠে বলল শেহরোজ। কটমট চোখে তখন তাকাল শাজ। দেখল, বজ্জাত দৈত্যের চেহারায় মশকরার আভাস। ওকে লজ্জায় ফেলে ভারি মজা নিচ্ছে। তাই একটু ইচ্ছা করেই ঠেঁসে ধরল কাপড়টা বুকের ক্ষততে। ব্যথা লাগলেও চোখ-মুখ খিঁচে তা সহ্য করে নিয়ে হাসতেই থাকল শেহরোজ মুচকি মুচকি। এই সহ্যক্ষমতা দেখে হতাশায় মাথা দুলিয়ে বলল শাজ, “মানুষ চেনার আমার এখনো অনেক বাকি।”
“অবশ্যই। কচি তো এখনো!”
“আমি কচি হলে আপনি কী”, হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতে দিতে বলল শাজ। “বুড়া?”
“হবো হয়ত।”
“সর্বোচ্চ দুই কি তিন বছরের সিনিয়র হবেন।” বলার পরই শেহরোজের মুখের কাছে এগিয়ে এলো৷ ঠোঁটের কোনায় দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, “এখানে লাগবে না?”
“না হলেও চলবে।”
অথচ রক্ত লেগে আছে ওখানেও৷ দাড়ির জন্য ভালোভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে না কতখানি কেটেছে। ওই রক্ত দেখেই শাজ বলল, “চলবে না। ক্লিন করে অ্যাডহেসিভ লাগিয়ে দিই।”
“আরে লাগবে না, শাজ। এবার থামো।”
বারণ শুনল না শাজ৷ সাবান পানিতে কাপড় ভিজিয়ে নিয়ে শেহরোজের কাছে এগিয়ে এলো। মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে ক্ষততে কাপড় ছোঁয়াতেই “উউহ্!” বলে সহসা আর্তনাদ করে উঠল শেহরোজ। আঁতকে উঠে হাত সরিয়ে নিলো শাজ, “কী হলো?” বিস্মিত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওখানে বেশি লেগেছে না-কি?”
“মনে হয়। মারাত্মক জ্বলছে।” বলেই ঠোঁটের কোনে হাত ছোঁয়াতে গেল শেহরোজ।
“আরে আরে”, ছুটে এসে শাজ হাত ধরে ফেলল শেহরোজের। “কী করছিলেন? নোংরা হাতে টাচ করলে ইনফেকশন হয়ে যাবে না?”
“জ্বলছে খুব।” ব্যথায় চেহারা বিকৃত করে বলল শেহরোজ।
“জ্বলুক।” শাজ আবারও সাবান পানিতে ভেজানো কাপড় চেপে ধরল ওখানে৷ তখন আবারও শেহরোজ “উহ্” করে উঠলে শাজ বিরক্ত হয়ে বলল, “কিন্তু এর চেয়েও আপনার হাতে আর গায়ের ক্ষতগুলো বেশি বড়ো ছিল।”
“ঠোঁটের কোনা অনেক বেশি সেনসিটিভ, শাজ।”
“তাই না-কি?” হেসে ফেলল শাজ৷ তারপরই শেহরোজকে অবাক করে দিতে ক্ষতের স্থানে কতবার ফুঁ দিলো সে। এত কাছে আসা শাজের মুখটা তখন দেখতে থাকল শেহরোজ অপলক। এর মাঝে শাজ যত্নের সঙ্গে ব্যান্ডেজও লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷ কাজের বাধা দিতে ওর কানের পিঠে গোঁজা চুলের গাছি যখন মুখের ওপর এসে পড়ল, শেহরোজ তখন আলগোছে তা সরিয়ে দিতে শুরু করল গাড়ির ভেতরের মুহূর্তটুকুর মতোই। কিন্তু দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রইল শাজের ঠোঁটজোড়াতে। তা দেখতে পেয়েই নিজেকে যেন অবশ অনুভব করল শাজ। অকস্মাৎ বুকের ধুকধুকানিও আরম্ভ হয়ে গেল। চকিতেই মোহাচ্ছন্নতা ঘিরে ধরল গাড়ির ওই অনাকাঙ্ক্ষিত চুমুর কথা মনে আসতেই। শেহরোজ চোখ তুলল সে সময়। দুজনের দৃষ্টির মিলন ঘটলেই শাজ এবারও আবিষ্কার করল— ওর চোখের প্রগাঢ় মায়া। দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইলে সে মায়ার অতলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কি? থাকলেও শাজ পারল না চেয়ে থাকতে৷ অদ্ভুত অনুভূতির জোয়ারে বুকে উথাল-পাতাল আরম্ভ হয়ে গেছে। ঝুপ করে তাই বুজে ফেলল চোখদুটো। তারপর? তারপর অপেক্ষায় রইল এই পুরুষালী ওষ্ঠাধরের মাঝে আরেকবার হারিয়ে যাওয়ার।
পার হলো পুরো একটা মিনিট। চোখ বুজে থাকা শাজের গালে দু আঙুল ছুঁয়িয়ে হঠাৎ মৃদুস্বরে ডাকল শেহরোজ, “শাজ?” ঝট করে চোখ মেলল শাজ। চোখ মেলেই দেখল, হাসছে শেহরোজ দুষ্টু চোখে চেয়ে।
মুহূর্তেই ছিটকে সরে এলো শাজ। কী প্রচণ্ড লজ্জা! সে কী ভাবছিল এতক্ষণ? শেহরোজের আরেকবার অধর ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে? ছি ছি! কী করে এত বেহায়া হয়ে যেতে পারল? এত অধঃপতন, আল্লাহ! “ব্যান্ডেজ শেষ।” বলেই ব্যস্ততার ভঙ্গিতে মেডিসিন বক্স গোছাতে শুরু করল সে।
“হ্যাঁ, আমারও এবার বিদায়ের পালা”, উঠে পড়ল শেহরোজ। “আর এত যত্ন করে আমায় সেবাদানের জন্য আমি কৃতজ্ঞ ভীষণ৷”
“আরে ধুর! আপনি যা করেছেন আজ তার কাছে এতটুকু যৎসামান্য।”
“তুমি রেগে যাওনি?” প্রশ্ন চোখে বলল শেহরোজ।
খানিকটা অবাক হলো শাজ তাতে, “ওমা! আপনি আমাকে সেইফ করেছেন। সেইফ করলে রাগতে যাব কেন?”
হাসি হাসি চেহারা শেহরোজের, “তাহলে বলছ খুশি হয়েছিলে?”
“আরে আজব!” বিরক্ত সুরে বলল শাজ, এত হেঁয়ালি কেন করেন বলুন তো? আমাকে সেইফ করাতে আমি খুশি হবো না তো কি কান্নাকাটি করব?”
“ও.কে”, মাথা ঝাঁকাল শেহরোজ মৃদুহাস্যে। “সেইফ তো তোমাকে গাড়ির বাইরে গিয়েও করেছি আর গাড়ির ভেতরে এসেও। অ্যান্ড ইউ আর হ্যাপি উইথ বোথ ওয়েজ, রাইট?”
উজবুকের মতো তাকিয়ে রইল শাজ প্রথমে। তারপর কিছুক্ষণ ভাবার পর শেহরোজের দ্ব্যর্থক কথাটা বুঝতে পেরেই নতুন করে আর লজ্জা সামলাবার জায়গা পেলো না। এত ফাজিল, হাড়ে বদমাশ লোকের পাল্লায় জীবনে পড়েনি সে। একদিনেই ওকে নাস্তানাবুদ করে করে মেরে ফেলবে বোধ হয়।
শাজের লাল হওয়া মুখটা দেখে দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে আফসোস করল শেহরোজ, “ইস! সেকেন্ড টাইম চান্সটা মিস করে ফেললাম?”
“কীসের সেকেন্ড টাইম চান্স?” রাগ দেখানোর চেষ্টা করে শাজ হুমকি দিলো, “আজেবাজে কিছু ভাববেন না বলে দিচ্ছি।”
“আচ্ছা”, ঠোঁট চেপে হাসি ঠেকাল শেহরোজ।
“আচ্ছা মানে?”
“আচ্ছা মানে আজেবাজে কিছু ভাবব না। কিন্তু চোখের সামনে পড়ে গেলে না দেখে তো থাকতে পারব না।”
“কী?” বুঝল না শাজ। এই ভদ্র বখাটের দুষ্টুমির লাইন সহজে ধরতে পারে না সে। বোধ হয় কখনো পারবেও না।