শেহরোজ পর্ব-১০

0
456

#শেহরোজ — ১০
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

জবাবে মুচকি মুচকি হেসে শেহরোজ দৃষ্টি ফেলল টেবিলে রাখা ওই ম্যাগাজিনে। তা দেখেই শাজ দু হাত সামনে তুলে দ্রুত হুঁশিয়ার করল, “থাক! আমি শুনতে চাই না।”

বিনীত সুরে প্রশ্ন করল শেহরোজ, “কী শুনতে চাও না? কিছু কি বলতে চেয়েছি আমি?”

“ঢং!” রাগ রাগ ভাব নিয়ে জানাল শাজ, “এভাবে যখনই হাসেন, তখনই ফাজিল ফাজিল কথা উগড়ে আসে আপনার গলা দিয়ে। এখনো তাই উগড়ানোর ধান্দায় আছেন।”

“তাই? কিন্তু কী উগড়াতে চাইছি?”

“সেটা তো আপনার মনের মধ্যেই।”

“এই ‘সেটা তো’ কী? আমার মনের মধ্যে থাকলে তুমি জানলে কী করে? মাইন্ডও রিড করতে পারো না-কি!”

“ধুর! জানি না।”

“বলছিলাম বাঘের খাঁচার কথা।” হাসতে হাসতে জানাল শেহরোজ।

“বাঘের খাঁচা?” অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল শাজ, “এখানে বাঘের খাঁচা এলো কোত্থেকে?”

“এ ঘরেই তো দেখলাম।”

“উফ্”, দীর্ঘশ্বাস ফেলল শাজ। “এত হেঁয়ালি জানেন আপনি! কী বলতে চাইছেন বলে দিন তো।”

“ও.কে”, শ্রাগ করল শেহরোজ। হাসিটা থামিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার মতো মুখ করে বলল, “একদিন নিউমার্কেটের মোড়ে ছিলাম আমি৷ তো চারপাশের হাউকাউয়ের মাঝে একটা কথা ভেসে আসলো কানে। ‘বাঘের খাঁচা চল্লিশ ট্যাকা… দেইখ্যা লন বাইচ্ছা লন।’ আমি কৌতুহল নিয়ে সেখানে এগিয়ে উঁকি দিলাম। দেখলাম ওখানে এক লোকের হাতে ধরা রেড কালার আন্ডারওয়ার আর তার ওপর আঁকা একটা বাঘের মুখ। তারপর খেয়াল হলো লোকটির ভ্যানেও বিছানো অনেকগুলো আন্ডারওয়ার।”

কথাগুলোর পর ছানাবড়া চোখ করে কতক্ষণ চেয়ে থাকল শাজ। তারপর হঠাৎ করেই হেসে উঠল হো হো শব্দে। হাসতে হাসতে যেন দম আটকে আসার উপক্রম। কোনোরকমে হাসিটা কমিয়ে বলল, “ট্রাস্ট মি, আমার লাইফে আপনার মতো এক্সট্রিম লেভেলের স্যাভেজ দেখিনি।”

“স্যাভেজ, না? অথচ আমাকে ওই শর্টস বিক্রেতার ভ্যানের কথা মনে করাতে বাধ্য করল তো তোমার ঘরটাই।”

শাজ ভার মুখ করে বলল, “ঘরে ঢোকার আগে না বলেছিলেন ইটস নো বিগ ডিল? অমনি খ্যাপানো শুরু করেছেন তো?”

“খ্যাপাচ্ছি? কই খ্যাপাচ্ছি? তোমার তুর্কি হিরো আর ঘরের হাল আমাকে জাস্ট মনে করিয়ে দিলো ওই…”

“আর নাটক করতে হবে না”, ভর্ৎসনা করে বলে উঠল শাজ শেহরোজকে থামিয়ে দিয়ে। “আর কক্ষনো আপনার ইনোসেন্ট হাসিকে ভরসা করব না।”

“সারাটাক্ষণ এত কেয়ারের পর এই বিদায়কালে নেগলিজেন্স!” মেকি আহত মুখ বানিয়ে বলল শেহরোজ, “আসলে নির্দয় নারীজাতের কাছে মিনিম্যাল এক্সপেকটেশনও রাখতে নেই। ঠিক আছে, যাই আমি।”

এমন নাটুকে ভাব দেখে হাসি আর ধরে রাখতে পারল না শাজ। হাসতে হাসতে হঠাৎ গায়ের টিশার্টের দিকে নজর এলো। দু জায়গায় ছিঁড়ে গেছে আর রক্তও মেখে আছে এটাই। তবু শেহরোজকে তো দেওয়া উচিত। কিন্তু অদ্ভুত সত্য হলো, শাজের ইচ্ছা করছে না টিশার্টটা আর ফেরত দিতে ওকে। আবার না দিলে যে ঝুমা আন্টি দেখে ফেলবে ওর গায়ের চোটগুলো৷ তখন তো আরেক ঝামেলা। শেহরোজ বেরিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ওকে ডেকে উঠল, “এই দাঁড়ান। আপনার টিশার্ট?”

দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল শেহরোজ, “ওহ তাই তো।”

“একটু অপেক্ষা করুন।”

বিছানার ওপর থেকে একটা জামা নিয়ে শাজ বাথরুমে ঢুকে ঝটপট পালটে নিলো৷ বেরিয়ে এসে টিশার্টটা শেহরোজকে ফেরত দিতে দিতে বলল, “আই অ্যাম ভেরি স্যরি, শেহরোজ। গেসগেস-এর টিশার্ট ছিল এটা। আমার জন্য এত দামী টিশার্টটা নষ্ট হয়ে গেল আপনার।”

“হ্যাঁ, দামী তো ছিলই।”

অপরাধী মুখ করে শাজ আবারও ক্ষমা প্রার্থনা করবে — শেহরোজ তখনই ওর একটু কাছে এসে অনুচ্চস্বরে জানাল, “কিন্তু তোমার থেকে বেশি দামী ছিল না, শেরি। একটা টিশার্ট নষ্ট করে যদি এই দামী মানবীকে পাওয়া যায়, তবে হোক না নষ্ট।”

“আল্লাহ!” কৃত্রিম হতাশ ভাব নিয়ে মাথাটা সিলিং অভিমুখে তুলল শাজ, “একটা মানুষ একটানা কী করে এত ফ্লার্ট করে যেতে পারে? আল্লাহর ওয়াস্তে আজ মাফ দিন। নয়ত গুলি করে দেবো!” শেষে হুমকি দিয়ে টিশার্টটা ছুঁড়ে দিলো শেহরোজের মুখে। খপ করে সেটা ধরেই শেহরোজ নাকের সঙ্গে মিশিয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে প্রেমাতুর চোখে চাইলো শাজের পানে। চেয়ে থেকেই আবৃত্তি করে উঠল,

“একদানা গন্ধমের দরুন
গোল্লায় গেল মাটির আদম,
আর আমি বান্দা যে তারও অধম!
সেই অধম নসিবে জোটে যদি
এক জোড়া গুলে মুহাম্মদি,
তবে বান্দা এ বুকে গুলি সাজাতেও রাজি।”

আবৃত্তির শেষ পথেই বুকের বাঁ পাশে হাতটা চেপে ধরে মাথাটা আলতো বেঁকে দিলো সে। আর শাজ চেয়ে রইল জড়ীভূতের মতো। ভাবল, এবারের পঙক্তিগুলো বোধ হয় শেহরোজের নিজস্ব তৈরি। কিন্তু ঠিক কী বোঝালো সে ‘গুলে মুহাম্মদি’ বলে?

পঙক্তির শেষটা যে ও বোঝেনি তা শেহরোজও টের পেলো ওর নির্বাক চেহারাটা দেখে। ফিচেল হাসিটা ঠোঁটে ধরে তাই নিজের দৃষ্টি পৌঁছল সে ওয়ারড্রবের ওপরে। যেখানে এক কোনে সরিয়ে রাখা গোলাপ ফুলের নকশার লাল রঙা ট্রান্সপারেন্ট অন্তর্বাসটি। ওর দৃষ্টিকে অনুসরণ করে শাজ সেদিকে দেখতেই কবিতার অর্থোদ্ধার করে ফেলল পলকেই— সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায়, আড়ষ্টতায় কাঠ হয়ে গেল। সব চেয়ে বেশি লজ্জা পেলো সে এবারই। পাশ্চাত্যের শহরে বেড়ে ওঠা এই বাঙালি ছেলের শিরাতে শিরাতে যে কী পরিমাণ দুষ্টুমি আর অসভ্যতা, তা হারে হারে বুঝছে সে। ফিরলো না আর শেহরোজের দিকে। উলটোদিকে মুখ করেই চেঁচিয়ে উঠল, “এই আপনি বিদায় হোন তো। আর একটা সেকেন্ডও দাঁড়াবেন না, অসভ্য বদমাশ লোক!”

“হ্যাঁ, আমিও বুঝলাম বঙ্গ ললনারা প্রচণ্ড ব্যাকডেটেড। এরা পড়ার টবিলে বইয়ের ফাঁকে শর্টস পরা সিক্স প্যাক হিরোদের ম্যাগাজিন ফটো দেখবে। কিন্তু সেটাই কেউ মুখে বললে হয়ে যাবে স্যাভেজার, বদমাশ।” বলতে বলতে সে বেরিয়ে এলো শাজের ঘর থেকে। চলে যাওয়ার জন্য ঘরের মূল দরজা দরজাটা খুলবে, ঠিক এমন সময়েই কলিংবেল বেজে উঠল হঠাৎ।

চমকে উঠে শাজ ঘর থেকে ছুটে এসে দেখল দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে শেহরোজ। ওকে মৃদু চিৎকারে বলল, “আপনি খুলবেন না। আমি খুলছি।” কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই দরজাটা খুলে ফেলেছে শেহরোজ। আর খোলামাত্রই ওপাশের ব্যক্তি ওকে না দেখেই ওকে ঠেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল৷ সেই সাথে চেঁচাতেও আরম্ভ করল, “আয়রনের বেটি কই? তার বেটির গতরে কত চর্বি তেল মজুদ হইছে, হ্যাঁ? আমার’চে বেশি? আমি দেখবার চাই আইজক্যা।”

ঝুমা শেখ। শেহরোজ তাকে দেখে আর তার কথাগুলো শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তবে শাজ আন্দাজ করে নিয়েছিল আগেই — ওর ঝুমা ডার্লিংই দরজার ওপাশে। তাই তো বারণ করেছিল শেহরোজকে।

“এই ফারুইক্কার মাইয়ে”, শাজের দিকে সেলফি স্টিক তুলে শাড়ির কুঁচি চেপে ধরে একরকম তেড়েই গেল ঝুমা শেখ। ওর
মুখের সামনে সেলফি স্টিকটা নাচাতে নাচাতে কর্কশ গলায় বকাবকি শুরু করল, “তর জইন্যে, একমাত্র তর জইন্যে আমি আমার তিরাশি কেজির শরীরের চর্বি ঝরাইয়া সক্কাল থেইকা দুপুর লাগাইয়া তর পছন্দসই রান্দোন করছি, র‍্যাড ভ্যালভ্যাট কেক বানাইছি। কাইলক্যা পাঁচ হাজার ট্যাকার হাইদরা ফেশ্যাল করায় আইসা আইজ পুরাডা দিন তর জইন্যে আগুনের সামনে খাঁড়াইয়া চামড়া কালা বানাইছি। তুই শাহাজাদী আয়রনের বেটি সারাদিন ছিলি কনে? আইছিস কহন ঘরে? আইসা আগে আমার ঘরে আহে হান্দাইস নাই ক্যা?”

“বলছি।” ভীতভাবে মুখের সামনে থেকে দু আঙুলে সেলফি স্টিকটা ধরে সরিয়ে দিতে দিতে বলল শাজ, “আগে কারেকশনটা করে দিই? রেড ভেলভেট অ্যান্ড হাইড্রা ফেসিয়াল হবে, ডার্লিং। তুমি রেগেমেগে র‍্যাড ভ্যালভ্যাট আর হাইদরা ফেশ্যাল বলে ফেলেছ।”

“চপ্”, বাজখাঁই গলায় ধমক বসালো ঝুমা। “আগে ক কই ছিলি? তর বাপের ওই চ্যাট লেক্স বাড়ি গেছিলি, তাই ন্যা?”

“ডার্লিং”, আহতস্বরে চেঁচিয়ে উঠল শাজ। আহ্লাদী গলায় বলল, “ওটা ডুপলেক্স, ডার্লিং। তুমি আমার আব্বু, আম্মু, সবার নামই ব্যঙ্গ করছ। আল্লাহ তো মারবে তোমাকে।”

“মারুক। তর বাপের কী? একশোবার কমু তর বাড়ি ওইটা চ্যাটলেক্স। তুই ফারুইক্কার মাইয়ে, আয়রনের বেটি। আমি পাঁচ হাজার ট্যাকার ফেশ্যাল নিয়া সারাদিন রান্দোন করছি, দাম দেস নাই…” আরও সময় চলতেই থাকল ঝুমা শেখের ফ্যাচফ্যাচ। অন্তত মিনিট তিনেক চলবেই। বরং তার কথার জবাব দিতে গেলে তার বকাবকির সময়ও বৃদ্ধি পাবে বলে মুখে কুলুপ এঁটে নিলো শাজ।

এদিকে, শেহরোজ ঠায় দাঁড়িয়ে দরজার মুখেই। সে হতবাক হয়ে শুনে চলেছে ঝুমা শেখের কথা।

এর মাঝে পিয়াল মায়ের চেঁচামেচি শুনে বাসা থেকে বেরিয়ে এসে শেহরোজকে শাজের ঘরের মুখে দেখে অবাক হলো। এগিয়ে গিয়ে ওকে ডাকল একবার। কিন্তু কঠোর মনোযোগী শ্রোতা হয়ে শেহরোজ ঝুমা শেখের কথার মাঝে ডুবে আছে। তা বুঝতে পেরে ওর গায়ে খোঁচা দিলো পিয়াল। মুহূর্তেই চমকে উঠে তাকাল শেহরোজ। ভ্রু নাচাল তখন পিয়াল, “ব্যাপার কী, ব্রাদার। তুমি এ ঘরে ছিলে না-কি?”

“তা পরে বলছি৷ আগে বলো…” ঝুমা আর শাজকে আঙুল দিয়ে দেখাল শেহরোজ, “আন্টি অত রেগেছেন কেন? খুব বকছে শাজকে। কিন্তু সব কথা বুঝতে পারছি না৷ কী কী বলে বকছে বলো তো!”

মায়ের বকাঝকার দুয়েকটা কথা কানে নিয়ে পিয়াল হাসল। তারপর শিক্ষকের মতো শেহরোজকে বোঝালো তার মায়ের ভাষা, “ধাওয়া খেলে অনেক সময় চোর পরনের লুঙ্গি খুলেই যেমন দৌড় দেয়৷ আমার মা রেগে গেলে আর উত্তেজিত হয়ে পড়লে সেরকম আমার মায়ের শুদ্ধ ভাষাও জামাকাপড় খুলেই ছুটতে শুরু করে৷ তখন তার কথার ধরন এই যে এরকম হয়ে যায়। যেমন শাজকে বলছে না ফারুইক্কার মাইয়ে? এটার মানে হলো ডটার অফ ফারুক। আর আয়রনের বেটি হলো ডটার অফ আইরিন। রেগেছে কেন? ঘরে গেলেই বুঝবে কেন রেগেছে। কী আয়োজন যে চলেছে আজ সারাদিন! কিন্তু শাজেরই খবর ছিল না এতক্ষণ। কারও কোনো ফোনও তুলছিল না।”

“ও আচ্ছা”, বুঝতে পেরেছে এমনভাবে মাথা দুলাল সে। তারপর শাজের দিকে তাকিয়ে আফসোস করল, “বেচারি! আমার জন্যই এখন বকা শুনতে হচ্ছে।”

“কেন কেন?” কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল পিয়াল, “তোমার জন্য কেন? তুমি ওর ঘরেই বা কী করছিলে?”

“তুমি তো আজ ভার্সিটি যাওনি। টিএসসিতে আজ গোলমাল হয়েছিল শুনেছ মনে হয়।”

“হ্যাঁ।”

“ওই গোলমালের ভেতর আমি পড়ে গিয়েছিলাম। দুই পক্ষের মারধোর ঠেকাতে গিয়ে নিজেই মার খেয়েছি। শাজের বন্ধুরা দেখে দ্রুত বাঁচায় আমাকে৷ হসপিটাল নিয়ে যায় ওরা জোর করেই। ওরাও ভালোই ইনজুরড ছিল৷ শাজ তাই সারাদিনই আজ হসপিটাল ছিল আমাদের জন্য। তাও বাসায় দ্রুতই আসা হত। বাট আই ফুলিশলি ডিলেইড কামিং দি আদার ওয়ে। সো নাও আই ওয়াজ অ্যাপোলোজাইজিং টু শাজ। অ্যান্ড আন্টি কেম ইন বিটুইন।” বলে কাঁধ ঝাঁকাল শেহরোজ।

“ভাগ্যিস শাজের দাদী ঘুমিয়ে গেছেন। নয়ত তোমাকে এখন শাজের সঙ্গে দেখলে কাজ সারা হয়ে যেত!”

“কী করতেন?”

হাসল পিয়াল, “ভেবো না বিয়ে করিয়ে দিতো। তোমার ইজ্জতের মায়রে বাপ করে খেদিয়ে দিতো এই বিল্ডিং থেকেই।’

“আরেব্বাপ!” আতঙ্কিত চেহারা করে বলল শেহরোজ, “আল্লাহর ফেরেশতা বাঁচিয়ে দিয়েছে দেখি।”

“হ্যাঁ, এক্কেরে হাতে ধরে।”

ওদের কথা থেমে গেল হঠাৎ ঝুমা শেখের চিৎকারে, “আমার র‍্যাড ভ্যালভ্যাটের মর্যাদা নষ্ট যাইবো! এ আমি মাইনা নিমু ভাবছোস? মাইনষের চ্যাটকায় যাওয়া কেকই খাইতে হইবো তর। ক, খাবি?”

“খাবো না মানে?” উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বলল শাজ, “আমি খাবো, আমার না হওয়া বর দেখা গেল কই থেকে উড়ে এসে কেকের মধ্যে হামলে পড়বে। তুমি দুই মিনিটে নিয়ে আসো, ডার্লিং। আমি দুই ঘণ্টায় সাবাড় করে দেবো আশাবাদী।”

“আনতাছি।” সেলফি স্টিক তুলে শাজকে শাসিয়ে বলল ঝুমা শেখ, “এহানেই খাঁড়াইয়া থাকবি, এহানে দাঁড়াইয়াই খাবি।” বলে কেক আনার জন্য ফিরল। শেহরোজকে সামনে দেখে মনে পড়ে গেল তখনই, ঘরে ঢোকার সময় ওকে ঘরের দরজায় দেখেছে সে। কিন্তু কেন দেখেছে? কী করছিল এই ছেলে শাজের ঘরে? গলার স্বর চড়াবে আবারও, সে সময়ই পিয়াল মায়ের মতিগতি টের পেয়ে শেহরোজের ব্যান্ডেজ হাত উঁচু করে ধরল আর হড়বড়িয়ে বলে উঠল, “ও মা গো! রোজ অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, দেখো মা! হাতের ওপর দিয়ে ট্র্যাক যেতে চেয়েছিল রোজের। একটুর জন্য সাইড কেটে যাওয়ায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছে হাতটা৷ আমরা পার্টিতে ব্যস্ত ছিলাম বলে বেচারা বিরক্ত করেনি আমাদের৷ চুপচাপ শাজের কাছে এসে ব্যান্ডেজ করিয়ে নিয়েছে। কী ইনোসেন্ট ছেলে!”

“কী!” বিস্ময়ে, আতঙ্কে দৌড়ে এলো ঝুমা বেগম শেহরোজের কাছে। ওর হাতটা দেখেই “ও আল্লাহ!” বলে চিৎকার করে উঠল, “এ ক্যামনে হইলো রে, বাবা? তুমি বাঁইচ্চা আছ, বাবা?”

এমন প্রশ্নের যে উত্তরটা দেওয়া যায় তা আর শেহরোজ মুখে আনতে পারল না সামনের মানুষটির বয়স বিবেচনা করে। তাই নীরবে শুধু মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ জানাল। ঝুমা শেখ তখন ওর আহত হাতটাকেই উলটে পালটে দেখতে লাগল আর বিড়বিড় করে কতসব দোয়া কালাম পড়ে ওর গায়ে ফুঁ দিতে আরম্ভ করল।

বিষম ব্যথায় তখন শেহরোজ ধমকেই উঠতে গিয়েছিল তাকে। মুহূর্তেই মানুষটি ঝুমা শেখ খেয়াল হওয়ায় চুপসে গেল আর ভাবল— শাজের ড্রেসিংয়ের কালেও ব্যথা পেয়েছে বটে। কিন্তু তখন সহ্য করা গেলেও এখন সহ্য করতে ইচ্ছা করছে না মোটেও। তাই পিয়ালের দিকে তাকাল সে সাহায্যের আশায়৷ ছেলেটা তখন অতি প্রশংসনীয় কায়দায় হাসি চেপে মুখটা ভীষণ চিন্তিত করে রেখেছে। দেখলই না ওর দিকে। তাহলে শাজই ভরসা। শাজের দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা পেছনে দাঁড়িয়ে বিধায় আর হাসি আটকে রাখতে হচ্ছে না তাকে— শব্দবিহীন হাসছে নিশ্চিন্তে। চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত তাকে এগিয়ে আসার ইশারা করল সে। কিন্তু শাজ নড়ল না একদম। বরঞ্চ অনামিকা আঙুলটা উঁচু করে নাড়িয়ে নিঃশব্দে ঠোঁট নেড়ে বলল, “বেশ হচ্ছে৷ আমাকে বারবার অ্যামব্যারেসড করার শাস্তি!”

সে সময়ই ঝুমা শেখ বলে উঠলেন, “আল্লাহ! কত বড়ো বিপদ হইতে গেছিল তোমার! জানের সদকা দিয়ে দিবা কাইল মসজিদ গিয়া।” তারপরই শাজকে ডাকল, “ও রে শাজ? তুই আমারে কইবি না পোলাডার এই অবস্থা? আমি কিনা আরও কেক নিয়া মরামরি লাগাইছি!”

“কিছু কইতে দিছোস, মাতারি?” বিড়বিড় করতে করতে শাজ এগিয়ে এলো। বলল ঝুমাকে, “উনি দাঁড়াতেই পারছিলেন না, জানো? মনে হয় মাথার মধ্যেও ট্রাকের গুঁতো খেতে গিয়েছিল। একটুর জন্য মাথাটা তরমুজের মতো ফেটে যায়নি৷ দেখো আবার জ্বর-টর আসে কিনা রাতে। আগে বাসায় নিয়ে গিয়ে দ্রুত খেতে দাও। বেচারা ট্রাকের গুঁতো খেতে খেতেও খায়নি। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে!”

হি হি করে এবার হেসেই ফেলল পিয়াল৷ তা দেখে চটে গেল ঝুমা ছেলের ওপর আর শাজের ওপরও। “এই বেত্তামিজ”, ধমক বসাল ওদের দুজনকেই। আর শাজকে বলল, “ওর কষ্টের মধ্যে তুই ফাইজলামি কথাবাত্তারা কচ্ছিস? এই রোজ…” শেহরোজকে নিয়ে বের হতে হতে বলল, “চলো তো বাপ। আমাগের ঘরে চলো। এই ফাতরা, বেয়াদ্দপের ঘরে আইছো ক্যা?”

“আর আমার দাদীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ো, ডার্লিং।” হাসতে হাসতে চেঁচিয়ে বলল শাজ। সে কথা কানেই নিলো না ঝুমা বেগম। শেহরোজের কাছে তার নামে নানারকম দুর্নাম, বদনাম গাইতে গাইতে বাসায় ঢুকে পড়ল।

হাসি ঠোঁটে নিয়ে শাজ ফিরে এলো শোবার ঘরে। বিছানা থেকে জামাকাপড় তুলতে তুলতে হাতে কালো রঙা অন্তর্বাসটা উঠে এলে মনে পড়ে গেল শেহরোজের শেষ কবিতাটা। আর মুহূর্তেই লজ্জায় মাখামাখি হয়ে পড়ল আবার৷ বিড়বিড় করে গোটা দুয়েক গালি দিলো তারপর শেহরোজকে। কিন্তু গালি দেওয়ার মুহূর্তেও তার মুখটা হাস্যোজ্জ্বল।

ঘর গুছিয়ে সে যখন বাথরুমে এলো গোসলের জন্য— আয়নাতে চোখ যেতেই তার নজরে পড়ল গলার নিচে আঁচড়ের দাগ৷ ভেসে উঠল চোখে তখন ঘণ্টা দুই আগের ভয়ানক মুহূর্তগুলো৷ স্তব্ধীভূত হয়ে পড়ল শাজ। কী দুঃসাহস বুকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিল শেহরোজ! দাঁড়িয়েছিল সরাসরি বন্দুকের সামনে। আর শেষবার এসে রক্ষা করল তাকে আক্রমণ করা জানোয়ারটির হাত থেকে। তারপর? ধীরে ধীরে শাজের মানসপটে এসে হাজির হলো প্রথম চুমুর ক্ষণ। নিজের ওষ্ঠাধরে আঙুল উঠে এলো আপনাআপনিই— চন্দন রঙা গালে অমনি ফুটে উঠল লালিমা ভাব। আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতেই আবিষ্কার করল সে, ওই বিপদ মুহূর্ত মনে পড়ে তার একদম ভয় করছে না এখন। করছে না বুকে চাপ অনুভব। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে না, অচেতন হওয়ার অনুভূতিও হচ্ছে না, টালমাটাল ভাব লাগছে না। শুধুই মনে পড়ছে তার জন্য শেহরোজের কোমলতা, দুষ্টুমি, ওর সকল কথাগুলোই।

আরও একটি ব্যাপার আবিষ্কার করল সে— মাত্র দুটো দিনের কয়েকটি ঘণ্টার সঙ্গতে শেহরোজের প্রতি তার প্রচণ্ড ভরসা অনুভব হচ্ছে৷ মনে হচ্ছে, শেহরোজ কাছে থাকলে সে খুব নিরাপদ। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আর এই অনুভূতি? এ কি বাড়াবাড়ি নয়?

জানে না শাজ। নিজের অনুভূতিগুলো আজ নিজের কাছেই তার অচেনা, অজানা। এমনটা আগে কখনোই কারও জন্য হয়নি যে!

চলবে।