শেহরোজ পর্ব-২৩+২৪

0
369

#শেহরোজ – ২৩
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি

***
দরজাটা ভিড়িয়ে রাখা দেখে শাজ নক করল না। “হয়েছে আপনার?” বলতে বলতে শেহরোজের ঘরে ঢুকল৷ কিন্তু সেই বান্দা কোথায় যে একটু আগে ওর বাইরে যাওয়ার কথা জেনে নাছোরবান্দার মতো বায়না ধরল সেও যাবে? নেই তো ঘরে কোথাও। বাথরুমের দরজাটাও খোলা। পুলের পাড়ে গেছে না-কি? তা দেখার জন্য সেদিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ মেঝেতে বিছানো পশমির সাদা কার্পেটের ওপর চোখ আটকালো শাজের৷ তিনটা সেকেন্ড নিচে তাকিয়ে থেকে জিনিসটা তুলল। কালো লেন্স। এক চোখের সেটা। কিন্তু লেন্স কী করে এলো এখানে? ও তো কালো লেন্স ব্যবহার করে না কখনো। করলেও বা সেটা শেহরোজের ঘরে আসবে কী করে? তবে কি লেন্স শেহরোজই ব্যবহার করে? শাজের চেহারাতে কালো ছায়া নেমে এলো। নানারকম নঞর্থক ভাবনা উদয় হতে থাকল মাথায়। এখানে এ জিনিস শেহরোজের ছাড়া আর কারই বা হতে পারে? কিন্তু বিনা কারণে সব সময়ই লেন্স ব্যবহার কে করে? প্রশ্নটা মনে হতেই হঠাৎ ঘরের মুখে ইব্রাহীম এসে উপস্থিত হলো। “শাজাম্মা? রোজ বাপে ডাহে আফনেরে। হেতে নিচে যায়ি খাঁড়াইয়া আছে।”

লেন্সটা নিজের হ্যান্ডব্যাগের ভেতর রেখে দিয়ে শাজ বের হলো ঘর থেকে। ইব্রাহীমও ওর পিছু পিছু নামল আর ভাবল‚ শাজের চেহারাটা একটু বেশি গম্ভীর না? কিন্তু আজ সারাদিন তো ভীষণ আমেজে ছিল সে। এমন গম্ভীর তো দেখায়নি।

সকালে নাশতার পর তাকে বাড়ির পেছনের ঘাসগুলো কাটার দায়িত্ব দিয়ে শেহরোজকেও মহারানীর ভঙ্গিমায় হুকুম দিয়ে বসল‚ তাকে সহযোগিতা করার জন্য৷ আজ প্রায় দুপুর পর্যন্ত তাকে আর শেহরোজকে সারা বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজে লেগে থাকতে হয়েছে৷ কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে বাড়ির কর্ত্রী হিসেবে শাজ তদারকিও করত আর শেহরোজের কাজের নানান খুঁতও বের করত। তার শোধ নিতে আবার শেহরোজও কঠিন গলায় শাজকে হুমকি দিয়েছিল তখন‚ “এক জগ লেমনেড হাজির করবে এক্ষুনি। নয়ত সমস্ত জায়গা আবার নোংরা করে দেবো আমি।”

এই হুমকিতে শাজ ভয় পেয়েছিল সত্যিই। তাই এক জগ লেমনেড নিয়ে পরমুহূর্তেই হাজির হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর শেহরোজ ওকে ফিরতে দেয়নি ঘরে৷ যতক্ষণ তারা দুজন রোদের মধ্যে কাজ করেছিল বাইরে—ততক্ষণ শাজকেও নিজের পিছু পিছু রেখেছিল শেহরোজ এই বাহানায় যে‚ “যখনই আমাদের গলা শুকাবে‚ তখনই তুমি আমাদের সামনে লেমনেডের গ্লাস ধরবে।”

জবাবে শাজ নাকের পাটা ফুলিয়ে বলেছিল‚ “আপনি আমাকে সার্ভেন্টের মতো ট্রিট করছেন কিন্তু।”

“কীভাবে?” সকৌতুকে বলেছিল শেহরোজ‚ “এই যে আমাকে দিয়ে সারা বাড়ি ক্লিন করাচ্ছ। আমি তো নিজেকে সার্ভেন্ট ভাবছি না৷ র‍্যাদার মনে হচ্ছে”‚ মিটিমিটি হেসেছিল তখন‚ “আমি এ বাড়িরই কর্তা আর… তোমারও।”

দুজনের মাঝে প্রায় সারাটা সময় এভাবেই খুনসুটি চলেছে৷

বাসার সামনেই শেহরোজ গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। বেরিয়ে এসে শাজ তাকে দেখা মাত্রই তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল আগে৷ তাকাল সরাসরি শেহরোজের চোখে—আশ্চর্য হলো প্রচণ্ড। “আপনি চোখে লেন্স ইউজ করতেন!” বিস্ময়ে একরকম চেঁচিয়েই উঠল সে।

“হ্যাঁ। কেন কী হয়েছে?” শাজের বিস্মিত চেহারা দেখে নিজেও অবাক হওয়ার ভান করল শেহরোজ।

বেসমেন্ট থেকে বাকিদের সাথে কথাবার্তা বলা শেষে বের হওয়ার আগ মুহূর্তে শেহনান হঠাৎ লক্ষ করে তার ডান চোখের লেন্সটা নেই৷ তাড়াহুড়ো করে বেসমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে তখন শেহরোজ। তবে ঘরে যাওয়ার আগে ফোনটা বের করে সিসিটিভি ফুটেজে দেখে নেয় শাজের অবস্থান কোথায়। যখনই দেখল শাজ তারই ঘরে যাচ্ছে‚ কেন যেন ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিলো লেন্সটা চোখে পড়ে যাবে শাজের৷ হলোও তাই৷ তারপর খুব দ্রুত চিন্তা করে সমাধানও বের করে নিলো সে। বাঁ চোখের লেন্সটাও খুলে ফেলল আর ইব্রাহীমকে পাঠিয়ে দিলো শাজকে ডাকার জন্য৷

“এমারেল্ড গ্রিন”‚ বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে উঠতে পারছে না শাজ। “আপনি কি তাহলে বাঙালি নন?”

না হেসে পারল না শেহরোজ হাঁ করে থাকা শাজের চমকিত মুখটা দেখে। “আমার কি এখন ড্রামাটিক ওয়েতে বলা উচিত”‚ হাসতে হাসতে কণ্ঠটা অন্যরকম বানাল‚ “নো‚ মাই ডোনা। আই অ্যাম দ্য পার্সিয়ান বয়।”

“পার্সিয়ান!” আরেকবার ধাক্কা খেলো শাজ। অতি বিস্ময়ে চেহারাটা বিকৃতি হতে থাকল ওর৷ “আপনার বাপটা কি ইরানি?”

কোমরে হাত বেঁধে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে মাথা দুলাল শেহরোজ৷ শাজ অবাক ঘোরেই বলে উঠল তখন‚ “এই জন্য আপনার খাবারের নামধাম ছিল উদ্ভট কিছিমের!”

“ইস! কীভাবে বলছে দেখো? তোমার দেশের কত খাবারের নামও তো আমার কাছে অদ্ভুত শুনিয়েছিল প্রথম প্রথম।”

“কিন্তু আপনার দাদা আর দাদী তাহলে এখানে কেন আসবেন? ইরান থাকার কথা না?” দ্বিধা গলায় জিজ্ঞেস করল শাজ।

মুহূর্তের মাঝে শেহরোজ গল্প বানাল‚ “কারণ‚ দাদার বাবা এক কালে এই দেশে বিয়ে-থা করে বাঙালি বউকে ভালোবেসে এখানেই নিবাস গড়েছিলেন। কিন্তু আমার দাদা যুবক কালে পড়তে চলে যান আমেরিকা। পিতার ভূমিতেও যাতায়াত ছিল তার। তারপর আমার পাপা আর দাদীকেও এক সময় নিয়ে আসেন নিজের কাছে। তাই আমার জন্ম থেকে বড়ো হওয়া সবই দেশের বাইরেই।”

“কিন্তু…” শাজকে বাধা দিলো শেহরোজ। “আর যত কিন্তু আছে গাড়িতে বসে শুনো। তোমার ডক্টরের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। মনে আছে নিশ্চয়ই?”

শেহরোজের পান্না সবুজ চোখ দেখে ঝটকা খেয়ে ব্যাপারটা ভুলেই বসেছিল শাজ। গাড়িতে এসে বসার পর শেহরোজ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় উঠে এলে এবার জানতে চাইলো সে‚ “লেন্স কি মানুষ ঘরের মধ্যেও অলওয়েজ ইউজ করে? আপনি কেন সারাক্ষণই পরে থাকতেন?”

“কারণটা জানলে তুমি হাসবে।”

“আমার মনে হয় না।” গুরুগম্ভীর গলায় বলল শাজ‚ “কারণ‚ আপনার এই কাজটাও আপনার মেনুর মতো উদ্ভট লাগছে আমার। কেউ সারাক্ষণ কেন লেন্স পরে থাকবে?”

“তুমি চমকেছ না?”

“অনেক।”

“এটাই তো ফার্স্ট কারণ।”

শাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালে হাসল শেহরোজ। “ব্যাপারটা খুলে বলি৷ আমার বডি স্ট্রাকচার‚ হাইট আর আমি দেখতে এদেশের মানুষের সঙ্গে বেশ কিছুটা বেমানান৷ প্রথম যখন বের হতাম বাইরে‚ তখন দেখতাম সবাই কেমন কৌতূহল চোখে দেখছে। এমনকি তোমাদের পাড়া-পড়শীও। স্পেশালি আমার চোখের কারণেই এটা বেশি হত। তাই পিয়াল সাজেশন দিলো লেন্স ইউজ করতে। তারপর থেকেই আরকি লেন্সে ইউজড টু হতে রেগুলার পরে থাকতে শুরু করলাম৷ তুমি জানো তারপরও কত জন আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখে যখন রমনাতে দৌড়াতে যাই?”

শাজের কাছে তবুও যুতসই লাগল না উত্তরটা। “ঘরে তো আর এসব আপনাকে ফেইস করতে হত না৷ তাহলে ঘরের মধ্যে সব সময় কেন পরতেন?”

মনে মনে শাজের এই সন্দেহপ্রবণ মনটার প্রশংসাই করল শেহরোজ। মেয়েটা কেবল মানসিক আঘাতগুলোর কারণেই কি সব ব্যাপারে এত খুঁতখুঁতে আর অতি সতর্ক হয়েছে? না-কি আগে থেকেই এমন বুদ্ধিমতী ছিল? জানতে হবে ঝুমা শেখের কাছে—ভেবে রাখল সে। “আমি যে ঘরের মধ্যে সব সময়ই পরে থাকতাম সেটা কে বলল তোমাকে?”

“আজব! কে বলবে আবার? আমি নিজেই তো কাল থেকে দেখছি আপনাকে।”

“কিন্তু কাল পুলে যখন ছিলাম তখন লেন্স ছিল না আমার চোখে।”

অবিশ্বাস চোখে তাকাল শাজ‚ “ছিল না?”

“ছিল না।”

“নিশ্চয়ই ছিল”‚ দৃঢ়ভাবে বলল শাজ। “না থাকলে কালই আমি দেখতাম।”

“কিন্তু তুমি দেখোনি।” শেহরোজও আরও বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে বলল‚ “পুলে লেন্স পরে নামলে সেটা কি চোখে ঠিকঠাক থাকে? পুল সাইড অন্ধকার ছিল বলে তুমি বুঝতে পারোনি আমার চোখের রং। পরেও টের পাওনি যখন আলো জ্বেলেছিলাম। কারণ‚ নীলচে আলো ছিল সেখানে।”

“হতে পারে।” মানতে বাধ্য হলো শাজ। কারণ‚ ওই মুহূর্তে সে কেমন আচ্ছন্নে ডুবে ছিল শেহরোজের মাঝে। আর কিছুই খেয়াল করার মতো দশা ওর ছিল না। তবু কী একটা খুঁতখুঁতুনি থেকেই গেল ভেতরে।

“মাত্র দুদিন হতে যাচ্ছে আমরা কাছাকাছি থাকছি‚ কাছ থেকে দেখছি দুজন দুজনকে। আর আমার ধারণা এই দুদিনে যথেষ্ট ফ্র্যাঙ্কলি কথা বলার মতো আর আমার ব্যাপারে জানার মতোও গুড রিলেশন তৈরি হয়েছে তোমার সাথে। তাই আরকি আজ সকালে যেমন জানালাম আমার ইটিং হ্যাবিটস। তারপর এখন লেন্সের ব্যাপারটাও।”

“এবং দুটো ব্যাপারেই আমি বেশ সারপ্রাইজড।”

“সে তো দেখছিই৷ কিন্তু এমন গ্লুমি ফেইস করে আছ কেন? আমার ভালো লাগছে না।” বলে ড্রাইভের মাঝেই শেহরোজ তাকাল গাঢ় চাউনি মেলে। শাজও তাকাল তখন। জবাব দেওয়াটা মুশকিল ওর জন্য৷ সামান্য এই লেন্স ব্যাপারটার জন্যই ওর মনের মাঝে কেমন এক সন্দিগ্ধ মনোভাবের সৃষ্টি হচ্ছে‚ তা ও কী করে বলবে শেহরোজকে? এমনকি কী কারণে সন্দেহপ্রবণ থাকছে মনটা তা তো ও নিজেও জানে না৷ সেখানে শেহরোজকে সমস্যাটা কী করে বোঝাবে? উলটো মাঝখান থেকে শেহরোজই অপমানিত বোধ করবে এবং কষ্টও পাবে। “আমি ঠিক আছি”‚ বলে হাসল কৃত্রিম। জিজ্ঞেস করল তারপর‚ “আপনি চলেছেন কোথায়? ডক্টরের অ্যাড্রেস কি বলেছি আমি?”

“না‚ বলোনি৷ আমি একটা শপ খুঁজছি৷ লেন্স কিনে নেব।”

ভ্রু কুঁচকে তাকাল শাজ‚ “কেন? নেই বাসায়?”

“আছে তো। কিন্তু পরে আসিনি যে। তোমার পাশে এমন ভিনদেশী মনস্টার বসা। লোকে কিউরিওসিটি নিয়ে দেখতে থাকলে তোমার অস্বস্তি হবে বোধ হয়।”

“আমার কোনো কিছুই হবে না।” নির্বিকারভাবে বলল শাজ‚ “কারণ‚ মনস্টারকে মানুষ কিউরিওসিটি নিয়ে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক।”

“হুঁ… রাইট”‚ মাথা নেড়ে সায় দিলো শেহরোজ। তারপর নিজস্ব কায়দায় ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল‚ “আবার মনস্টারের পাশে এভাবে হ্যাপিলি একমাত্র মনস্ট্রেস ছাড়া কোনো সাধারণ নারী বসে থাকবে না‚ সেটাও স্বাভাবিক। বুঝবে লোকে।”

হেসে ফেলল শাজ। “কথায় জেতা মুশকিল আপনার সঙ্গে”‚ হাসতে হাসতেই হতাশার ভঙ্গিতে মাথা নাড়াতে থাকল সে।
***

সন্ধ্যা সাতটা।
গাড়িটা এসে থামল বারিধারা এলাকাতে বহুতল এক ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে। জ্যামে আটকে পৌঁছতে ওদের দেরি হয়ে গেছে৷ তবুও ডাক্তার রেবেকা কোনো আপত্তি করেনি৷ বলেছে‚ সে অপেক্ষা করবে। কোনো সমস্যা নেই।

শাজ আর শেহরোজ সপ্তম তলার উদ্দেশ্যে লিফটে চড়ল৷ আসতে পথে ডাক্তারের সম্পর্কে বেশ প্রশংসায় করেছে শাজ শেহরোজের কাছে।

মাস তিন আগে একদিন হঠাৎ ঝুমা আন্টি আর পিয়াল ওকে বলেছিল‚ ও যে সমস্যাগুলোর জন্য দিন-দিন মানসিক‚ শারীরিক‚ উভয়ভাবেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে আর ভেঙে পড়ছে৷ এজন্য অবশ্যই প্রথমে ওর একজন ভালো সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যাওয়া জরুরি। কাউন্সিলিং করানোটাও খুব দরকার। বেশ জোর করেই ঝুমা রাজি করিয়েছিল ওকে৷ তারপর পিয়ালের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল তার এই পরিচিত সাইক্রিয়াটিস্টের ঠিকানায়৷ প্রথমবারেই ডাক্তারকে দেখে এবং তার কথা শুনে শাজ বেশ মুগ্ধ হয়েছিল আর সব থেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিল ডাক্তারের সুমিষ্ট আচরণে।

“দেখে মনে হবে না ডক্টর থার্টি”‚ কলিংবেল বাজিয়ে শাজ অবগত করল শেহরোজকে।

“আচ্ছা?”

“হ্যাঁ।” মুচকি হেসে শাজ আড়চোখে তাকাল‚ “আপনি দেখে ডক্টর রেবেকার প্রেমে পিছলেও পড়তে পারেন। ভীষণ সুন্দর উনি।”

“তাই নাকি? তুমি বলছ আমি তাকে দেখার পর তোমাকে ভুলে তার সামনে পিছলে পড়ব?”

“উফ্! এখানেও শুরু করে দিয়েন না তো আপনার রোমিও মার্কা ফ্লার্টিং।”

“কিন্তু আমি তো গতরাতে রোমিও ছিলাম না।” মন খারাপের সুরে বলল শেহরোজ‚ “তবুও আমাকে আন্সার করলে না।”

কথাটা শুনতেই শাজ আবার কলিংবেল চাপল। এক্ষুনি যেন ডাক্তার দরজাটা খোলে সেই প্রার্থনা করতে থাকল৷ প্রসঙ্গটা এড়াতে চায় দ্রুত। শেহরোজ তা টের পেলো ওর চেহারার অভিব্যক্তি পড়েই। তাই আর ওকে অপ্রস্তুত করল না। প্রসঙ্গ বদলাতে জিজ্ঞেস করল‚ “আচ্ছা বলো তো আমাকে দেখতে এক্সাক্টলি কত মনে হয়?”

“জীবনেও মনে হয় না টুয়েন্টি ফাইভ অর সিক্স”‚ অবিলম্বেই বলে দিলো শাজ৷ “বরং ডক্টর রেবেকার যে এইজ‚ ওটাই আপনাকে দেখতে লাগে।”

“অ্যাকিউরেট”‚ মনে মনে শাজের প্রশংসা করে হাসল শেহরোজ।

সে সময়ই দরজাটা খুলে গেল৷ দরজার মুখে দাঁড়িয়েছে এসে ডাক্তার রেবেকা। হলুদাভ ফরসার ছোট্ট গোল মুখশ্রী তার। চিকন গোলাপি ঠোঁটটাও ছোট্ট। মাঝারি উচ্চতা আর শারীরিক কাঠামো ছিপছিপে গড়নের। কাঁধ অবধি রেশমি চুলগুলো কালোর মাঝে মাঝে কিছু বাদামী বর্ণ। এবং কাজল চোখে রিমলেস চশমা তার। দেখতে সত্যিই ভারি সুন্দর। “আই অ্যাম সো স্যরি‚ শাজ”‚ চেহারায় বিব্রতভাব প্রকাশ পেলো তার। “ওয়াশরুম ছিলাম বলে বেলের আওয়াজ শুনতে পায়নি প্রথমে। প্লিজ এসো।”

“কোনো সমস্যা নেই”‚ বলতে বলতে শাজ শেহরোজকে নিয়ে ভেতরে এলো। তারপরই তাকে পরিচয় করিয়ে দিলো ডাক্তারের সঙ্গে‚ “ডক্টর‚ উনি শেহরোজ আহমাদ। পিয়াল ভাইয়ার খুব কাছের বন্ধু। আর আমারও।” শেষ বাক্য বলার পরই ও দারুণ লজ্জা পেলো। কারণ‚ কথাটা শেষ হতেই শেহরোজ চকিতে ফিরে চায় ওর দিকে আর তা দেখে ডাক্তার মিটিমিটি হেসে ফেলে।

“নাইস টু মিট ইউ‚ শেহরোজ। আই অ্যাম রেবেকা গোমেজ।” মুচকি হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিলো সে৷ হাতটা ধরে হালকাভাবে ঝাঁকাল শেহরোজ‚ “আপনার ব্যাপারে প্রায় সবটাই শুনতে শুনতে এসেছি শাজের থেকে৷ ও খুব পছন্দ করে আপনাকে।”

“আর আমিও ওকে”‚ বলে শাজের গালটা টেনে দিলো সে আদরে। তারপর ওদের নিয়ে এলো নিজের চেম্বার রুমে। কাজের লোক কফি নিয়ে এলে গল্প‚ আলাপ শুরু হলো তিনজনের মাঝে।

রেবেকা যে ভীষণ মিশুক তাও আজ জানতে পারল শাজ। শেহরোজের সঙ্গে দারুণ গল্প জমিয়ে ফেলেছে। কারণ‚ রেবেকার পড়াশোনা শেষ হয়েছে আমেরিকাতেই। তাই দুজনের মাঝে গল্পের নানান প্রসঙ্গ আসার কমতি নেই। একটু আগেও বেশ উপভোগই করছিল শাজ ওদের গল্পগুলো। কিন্তু হঠাৎ করেই এখন অনুভব হচ্ছে‚ ওর আর ভালো লাগছে না এদের দুজনের এত কথাবার্তা। এমনকি রেবেকার দিকে লক্ষ করতেই অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছে ওর‚ রেবেকা যেন বেশ উৎসাহী আর উত্তেজিত হয়ে পড়েছে শেহরোজকে ঘিরে। শেহরোজও কি তাই? সে কি সত্যিই আগ্রহী হয়ে পড়েছে রেবেকার জন্য? পাশের চেয়ারে বসা শেহরোজের দিকে একবার সরাসরিই তাকাল শাজ। বেশ মনোযোগের সঙ্গেই সে রেবেকার কথা শুনছে রেবেকার চোখে চেয়ে। এই চাউনি সাধারণ না-কি মুগ্ধতার‚ তা ভালোভাবে বিচারও করার ইচ্ছা হলো না শাজের। ম্লান হয়ে আসা মুখটা নুইয়ে হাতে নিলো ফোনটা। ওর যে ভালো লাগছে না একদম‚ তা যেন ওর চেহারা দেখে এরা বুঝতে না পারে তাই চুপচাপ ফোনে ডুব দিলো।

তবে কোনা চোখে শেহরোজ শুরু থেকেই শাজের এ সকল অভিব্যক্তি লক্ষ করছিল। শাজ ফোনে মনোযোগ দিতেই তার কপট সস্মিত মুখটা স্বভাবজাত গম্ভীর হলো৷ বকবক করতে থাকা রেবেকার দিকে শীতল চাউনি ছুঁড়তেই রেবেকা দ্রুত কথা থামিয়ে শাজের দিকে তাকাল৷ অপ্রতিভ চেহারায় নিঃশব্দে সে ঠোঁট নাড়িয়ে শেহরোজকে “স্যরি” বলেই সশব্দে তাকে বাইরে যেতে অনুরোধ করল‚ “ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড‚ শেহরোজ…”

“ইট’স অলরাইট”‚ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শেহরোজ চকিতেই। “অনেক কথা বলে আপনার সময় নষ্ট করে ফেললাম। প্লিজ টক টু ইয়োর পেশেন্ট।” বলে বেরিয়ে এলো সে।

শাজ একটু অবাক হলো। তাকিয়ে রইল শেহরোজের যাওয়ার পথে। রেবেকা তো কী এক বিষয়ে কথা বলছিল। আচমকা গল্প মাঝপথে থেমে গেল কেন দুজনের?

ড্রয়িং রুমে এসে বসল শেহরোজ। শাজের কাউন্সিলিং শুরু হবে এখন৷ কিন্তু সত্যিটা হলো শাজকে সম্মোহিত করা হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। এবং এ নির্দেশটা তারই। শাজ পুরোপুরি বশীভূত হলেই সে আবার চেম্বারে ঢুকবে।

ঝুমা শেখের থেকে যখন শাজের প্রতিটা অভ্যাস‚ অনাভ্যাস‚ সমস্যা‚ সুবিধা‚ অসুবিধা‚ সব ব্যাপারেই তথ্য নিয়েছিল তখনই শাজের ভয়ঙ্কর মানসিক দুরাবস্থাটা টের পেয়ে ঝুমা শেখকে বলেছিল‚ ওর জন্য যত দ্রুত সম্ভব একজন ভালো সাইক্রিয়াটিস্টের প্রয়োজন৷ শাজের ‘ট্রাস্ট ইস্যু’ এবং ‘প্যানিক অ্যাটাক’ এই দুটো বিষয়ই তাকে ভাবিয়েছিল সে সময়৷ যেটা তখন ঝুমাকেও ভাবতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু একমাত্র শাজকে নিয়েই সাইক্রিয়াটিস্ট ব্যস্ত থাকবে‚ এমন কাউকে প্রয়োজনবোধ করে শেহরোজ। সে চাইছিল শাজের জলদি সুস্থতা এবং মানসিক উন্নতি৷ যাতে মেয়েটা দ্রুত একটা সুস্থ‚ স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করতে পারে‚ সুখী থাকতে পারে আর সে নিজেও সহজেই ওর কাছাকাছি যেতে পারে—ওর বিশ্বাসকে জয় করতে পারে। তাই ব্যাপারটা নিয়ে সে খালিদ উসমানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়‚ ওদেরই কারও পরিচিত ভালো সাইক্রিয়াটিস্টকেই শাজের ব্যক্তিগত সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে নিযুক্ত করবে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার অর্থের বিনিময়ে। তারপরই খালিদ উসমানের থেকে সেই অর্থ এবং কিছু শর্ত গ্রহণ করে দেশে আসে রেবেকা গোমেজ। শেহরোজ আর আইয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদেরই সাহায্যে এই ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে সে৷ যতদিন অবধি শাজ সুস্থ না হয়‚ ততদিনই তাকে থাকতে হবে এখানে।

মিনিট বিশেক সময় গেলে হঠাৎ ব্লুটুথ ইয়ারপডে শুনতে পেলো রেবেকার কণ্ঠ‚ “ভেতরে আসুন‚ শেহরোজ।”

হাতঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে শেহরোজ চেম্বারে পা রাখল৷ শাজকে জানালার সামনে ইজিচেয়ারে আধশোয়া দেখল সে। মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে। ওকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল‚ “ঠিকঠাক পেরেছেন তো?”

“নিশ্চিন্ত থাকুন৷ একজন স্কিলড হিপনোটিস্ট হিসেবে এটা বোঝার ক্ষমতা আছে পেশেন্ট আদতেই হিপনোসিস হয়েছে কি-না।”

“সময়টা বেশি লাগালেন মনে হয়।”

“ওকে আমার বোঝাতে সত্যিই সময় লেগেছে যে ওকে ঘোরে না প্রবেশ করালে নিজের সকল সমস্যাটা ও বলতে পারবে না আমাকে অকপটে। আমার থেকে কথা আদায় করে নিয়েছে‚ ওকে এমন কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন করব না যেটা ও কখনোই প্রকাশ করতে চায় না। তবুও বেশ দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে তারপর রাজি হয়েছে।”

“কিন্তু আপনি কথা রাখতে পারছেন না‚ গোমেজ”‚ নিষ্পলক চোখে শাজকে দেখতে দেখতে শেহরোজ এগিয়ে এলো ওর কাছে। মৃদুস্বরে বলল‚ “আপনি প্রথম প্রশ্নই করবেন ওর বাবাকে নিয়ে।” ফোনের রেকর্ড অপশন চালু করে দাঁড়িয়ে রইল সে ওর পেছনেই।

রেবেকা এসে বসল শাজের মুখোমুখি চেয়ারে। নরম‚ মোলায়েম কণ্ঠে উচ্চারণ করল শাজের উদ্দেশ্যে‚ “লিটল…স্টার।” সম্মোহনের মাঝে নির্দেশ দিয়েছিল সে‚ এই দুটি শব্দ বললেই শাজ যেন জেগে ওঠে। “শুনতে পাচ্ছ আমাকে? শুনলে মাথা ডানে কাত করো।”

ডান দিকে মাথা কাত করল শাজ।

“গুড। ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসো।”

ধীরে ধীরেই উঠে বসল শাজ চোখ বন্ধ অবস্থায়।

“এবার আমার দিকে তাকাও। ঘোর নিদ্রা কাটবে না তোমার। গভীরভাবে সম্মোহিত রয়েছ তুমি৷ আমার চোখে চাইলে আরও গভীর ঘোরে ডু্বে যাবে। তাকাও আমার দিকে।”

তাকাল শাজ ধীরে ধীরে। নিঃস্পন্দন মূর্তির মতো চেয়ে রইল রেবেকার পলকহীন চোখে। শাজও পলক ফেলছে না। ওর চোখের সামনে প্লাটিনামের ক্রুশ লকেটটা উঁচু করে ধরল রেবেকা‚ “তোমার নাম কী?”

“শাজ ইরশানা”‚ জড়ানো কণ্ঠ শাজের।

“বাবার নাম কী?”

“ওমর ফারুক।”

“কী করেন তিনি?”

“সেনা অফিসার আব্বু৷”

একে একে আরও কিছু প্রশ্ন করা হলো শাজকে ওমর সাহেবের ব্যাপারে। তারপর মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করা হলো‚ “কোথায় তোমার আব্বু?”

“নিখোঁজ।”

“কেন নিখোঁজ হলো‚ শাজ?”

উত্তর দিলো না শাজ। রেবেকা জিজ্ঞেস করল আবার‚ “কেন নিখোঁজ হলো ওমর ফারুক? বলো‚ শাজ।”

মুখ খুলল না শাজ এবারও৷ সম্মোহিত হওয়ার আগ পর্যন্তও ও নিশ্চয়ই নিজের মস্তিষ্ককে স্রেফ এই প্রসঙ্গে সতর্ক থাকার হুকুম দিয়েছে! এবং এ প্রসঙ্গকে এতটাই বেশি সতর্কতার সাথে নিজের মন আর মস্তিষ্কে দাফন করেছে সে‚ সহজে সেখান থেকে বের করে আনা তাই মুশকিল হচ্ছে। অবচেতন মনেই মস্তিষ্ক ওকে বাধা দিচ্ছে এ ব্যাপারে কোনো কথা না বলতে৷ যেটা দেখে শেহরোজ বিরক্ত নয়‚ শাড়ের দৃঢ়তা আর নিজের প্রতি কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেখে মুগ্ধ হলো রীতিমতো।

“আমাকে বলো‚ শাজ৷” গম্ভীর হলো রেবেকা‚ “আমি জানতে চাইছি কেন তোমার আব্বু নিখোঁজ হলো?”

“ভারত সরকারের বহু এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে পিএম। ভারতকে বিনা শুল্কে নৌ ট্রানজিট‚ সড়ক ও রেল ট্রানজিট দেওয়া ছাড়াও কিছু গোপন চুক্তিতে সই করেছে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ব্যবহারের অনুমতি নয়‚ এ দুই বন্দরের পূর্ণ অধিকারই লিখিতভাবে দিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারতকে। এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপও। এছাড়াও মাসে সাতশো কোটি টাকার ক্ষতি করে ভারত সরকারের বন্ধু দীপেন্দ্রর কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়ার পরও ভারত থেকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করেছে পিএম। ভারত সরকারের দীপেন্দ্রর সঙ্গে সম্পাদিত এ চু্ক্তি দেশের স্বার্থে নয়, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান দীপেন্দ্রর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই সম্পাদন করা হয়েছে। বাংলাদেশে লাখো বেকার চাকরির জন্য ঘুরছে। কিন্তু ভারতের কয়েক লাখ মানুষ বৈধ ও অবৈধভাবে চাকরি করছে এখানে। যাদের থেকে প্রতি অর্থবছরে পাঁচ থেকে ছয় কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ যায় ভারতে। অর্থাৎ আনঅফিশিয়ালি বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ভারতে রেমিট্যান্স যায়৷ এবং সব থেকে ভয়াবহ চুক্তি হলো স্বার্বভৌমত্বকে হুমকিতে রেখে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চু্ক্তি করা। এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ সিকিম ও হায়দ্রাবাদের মতোই স্বাধীনতা হারাবে খুব শীঘ্রই। সিকিম ও হায়দ্রাবাদ দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল। বিভিন্ন চুক্তির বেড়াজালে ফেলে ভারত এ দুটি দেশকে যেভাবে অঙ্গ রাজ্য হিসেবে দখল করে নিয়েছে। ঠিক একই পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশকে নিয়েও। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের তিন পাশের প্রায় পুরোটাই ভারত দ্বারা বেষ্টিত। সেই ভারতের সঙ্গে পাঁচশো মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়চুক্তি সই করেছে পিএম অত্যন্ত গোপনে। এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে পিএম-এর নতজানুনীতি”‚ রোবটের মতো শাজ অনর্গল আরও অনেক গোপন চুক্তির কথা উল্লেখ করতে থাকল। যা হুবহু পড়েছিল সে ওমর ফারুকের দেওয়া ফাইলটার মধ্যে। সেই ফাইলটা কোথায় সংরক্ষিত তাও অবশেষে তাও জানিয়ে দিলো সে। পরিশেষে শেহরোজের জানা আরও একটি তথ্য প্রকাশ করল শাজ‚ “সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে এবং এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মতো সংগঠনেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ভারতের র এজেন্ট। আরও এজেন্ট ছদ্ম পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গাতে বড়ো বড়ো ব্যবসা করছে‚ প্রথম গ্রেডের চাকরিও করছে।”

এই এজেন্টদের মাঝে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে আছে যারা‚ তাদের সত্য পরিচয়ও উদ্ঘাটন করেছিলেন ওমর ফারুক৷ যা ওই ফাইলের অন্তর্ভুক্ত। এবং সেই সব কর্মকর্তাই তার গুম হওয়ার সঙ্গে জড়িত। এই সকল এজেন্টের একজন রমেশচন্দ্র। যে বর্তমান ছদ্ম পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্ব পালন করছে। তারই তথ্য শেহরোজকে জানিয়েছিল মেজর শেহনান শিফান। এবং শেহনান শিফান জানতে পেরেছিল তার ভাই ইরফানের দেওয়া মেইলের মাধ্যমে৷ গত পরশু রাতে যারা শেহরোজের দলের কাছে খুন হয়েছে তারা অধিকাংশই ছিল র-এর ইনটেলিজেন্স অফিসার৷ এমনকি শাজের ওপর সেদিন আক্রমণ করা অফিসারের মাঝেও র-এর অফিসার ছিল। যাদের একজনকে জীবিত শিকার করেছিল সাব্বির৷ কিন্তু তার পেট থেকে সম্পূর্ন কথা বের করার আগেই সে আত্মহত্যা করে বসে।

শাজের কথা থামতেই রেবেকা বলে উঠল‚ “ওকে এখন ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া উচিত‚ শেহরোজ। প্রয়োজনে রাতটা থেকে যান আজ। মাঝরাতে আবার ওকে…”

“কোনো প্রয়োজন নেই”‚ গম্ভীরস্বরে রেবেকাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলো শেহরোজ। “আর কিছু জানার নেই ওর থেকে৷ ওর থেরাপির ব্যাপারে বলুন।”

একটু মনঃক্ষুণ্নই হলো রেবেকা মুখের ওপর না শুনে৷ বলল‚ “হিপনোসিসের প্রভাবটা কাটিয়ে ওঠার পর ও মানসিক‚ শারীরিক‚ উভয়ভাবেই ক্লান্ত আর দুর্বল থাকবে। আজ আর থেরাপি সম্ভব নয়।”

“বেশ। কাল ফোন করে ওকে থেরাপির জন্য আসতে বলবেন। ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিন৷”

“এভাবেই নিয়ে যাবেন? থেকে গেলে ভালো হত।”

শক্ত চাহনিতে শেহরোজ রেবেকার চোখে চাইলো আর রুক্ষতার সঙ্গে সতর্ক করল‚ “ডেডিকেট ইয়োর ফিলিংস টু দ্য রাইট প্লেস অ্যান্ড টু দ্য রাইট ম্যান।”

ভীষণ লজ্জিত হলো রেবেকা আর নিজের ভুলে নিজেকেই মনে মনে দুষতে থাকল‚ “নির্বোধ মেয়ে‚ এই আলফা মেলের সঙ্গে পরিচয়ের সময়ই তো টের পেয়েছিলি এ হলো নর্থ স্টার। যাকে কেবল দূর থেকে জ্বলজ্বল করতে দেখে মুগ্ধ হতে পারবি। কিন্তু তার কাছে কখনো পৌঁছতে পারবি না। তবুও কেন যে নির্লজ্জ হতে গেলি!”
***

গণভবন‚ রাত ১১:৩০।

বিলাসবহুল বিশাল ড্রয়িংরুমে রাতের পোশাকে বসে আছে মহসিন খন্দকার। চেহারা থমথমে৷ ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে তার গত দুদিনে। সেই সাথে ঘুম হারাম সেনাপ্রধান আর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরও৷ তারাও উপস্থিত এই মুহূর্তে৷ আছে আরও একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি—বাংলাদেশে নিযুক্ত র এজেন্টদের প্রধান চিফ রমেশচন্দ্র। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল সে দুটোদিন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে আজ ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ডাকে।

“আমি কল্পনাও করতে পারছি না।” মহসিন খন্দকার ক্ষিপ্ত‚ “ওই গুপ্ত ডেরাতে কারা না কারা ঢুকে পড়ল কীভাবে তা টেরও পেলো না কেউ৷ তারপর হামলা চালিয়ে‚ খুন করে পালিয়েও চলে গেল। সবার সামনে এখন ওই বাড়ির রহস্য উন্মোচন হতে চলেছে। বাহ্! ওয়ান্ডারফুল!”

কারও মুখে কোনো রা নেই৷ সব থেকে বেশি লজ্জিত আত্মম্ভরি রমেশচন্দ্র। তার অহমিকাতে আঘাত করে গেছে শেহরোজ গত পরশু৷ আহত বাঘের মতো ভেতরে ভেতরে কতখানি ক্ষুব্ধ আর ক্রুদ্ধ সে‚ তা কাউকেই বলতে পারছে না৷

“এক ভুল করেছিলে তুমি ওই ব্রিগেডিয়ার ওমরকে বিশ্বাস করে”‚ তপ্ত মেজাজে বলল সেনাপ্রধানকে প্রধানমন্ত্রী৷ “আরেক ভুল করলে তুমি‚ রমেশ।” রমেশচন্দ্র মুখ তুলে তাকাতেই মহসিন খন্দকার বলল‚ “ওমরের মেয়েটাকে ‘জ্যান্ত ধরা চাই’ বলে আজ তিনটা মাস সময় নষ্ট করলে।”

“জ্যান্ত চেয়েছি কারণ”‚ রমেশচন্দ্র ব্যাখ্যা দিলো‚ “ওমর ফারুক ডকুমেন্টস যদি মেয়ের কাছে না দিয়ে অন্য কারও কাছে রেখে যায়৷ তার পরিচয় মেয়েটার থেকে পাওয়ার চান্স থাকবে।”

“আর সেটাই ভুল করেছ৷ তোমার উচিত ওই মেয়েকে খতম করা আর ওর আশেপাশে যারা থাকবে তাদেরকেও।”

“স্যার‚ আমারও এখন সেটাই ঠিক মনে হচ্ছে”‚ সহমত জানাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী। “এই মেয়ের প্রোটেকশন যারা দিচ্ছে তারা সব সময় এর আশেপাশেই থাকছে। বাইরে বের হলে পাবলিক প্লেসে তাই কোনোভাবেই ওর কাছাকাছি পৌঁছনো যাচ্ছে না।”

“তাহলে সরাকরি ঘরের ভেতরে পৌঁছও৷” বিরক্ত গলায় বলল মহসিন‚ “ঘরে ঢুকেই মেরে দিয়ে আসো না! বাইরে তাড়া করে বেড়ানোর কী দরকার? খোঁজ নেওয়া হয়েছে না মেয়েটা এখন কোথায় আছে?”

“দক্ষিণখান আছে”‚ বলল সেনাপ্রধান। “ড. খালিদ উসমানের বাড়িও বলা হয় ওই বাড়িটাকে‚ বর্তমান যেখানে থাকছে মেয়েটা।”

“ড. খালিদ তো আর ওখানে নেই। রাতের অন্ধকারে কমবাইন্ড অ্যাটাক চালাও। যাকে সামনে পাবে তাকেই ঝাঁজরা করে দেবে। এত ফালতু টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না।”

“স্যার।” ঠান্ডা সুরে বলল রমেশচন্দ্র‚ “কমবাইন্ড অ্যাটাকের প্রয়োজন নেই৷ এই অপারেশনটা আমি আমার কিছু এজেন্টকে নিয়ে করতে চাই।”

প্রধানমন্ত্রী খেয়াল করল রমেশচন্দ্রের অভিব্যক্তি৷ বুঝতে পারল ওই ইনটেলিজেন্স অফিসারগুলোর মৃত্যু আর নিজের আহত শরীর তাকে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগাচ্ছে। তাতে উপলব্ধি করল‚ এই অপারেশন যদি সফল করতে পারে তবে সেটা রমেশচন্দ্রই পারবে৷ শুধু বলল‚ “কাকপক্ষীও টের পাওয়া চলবে না কিন্তু।”

“পাবে না।” পৈশাচিক হাসি ফুটল রমেশচন্দ্রের চেহারায়‚ “কেউ টের পাবে না।”

#শেহরোজ – ২৪
#শেষাংশ_ক.
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

সিটবেল্ট বাঁধা৷ সিটে বসিয়ে রাখলে তেমন অসুবিধা হতো না শাজের। যেদিকে ওর মাথা কাত করে দিতো‚ সেদিকে সেভাবে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে থাকত সে। ঘুমের মাঝে ওর নড়চড় করার অভ্যাস একদম নেই। কিন্তু শেহরোজের কী হলো কে জানে! ঘুমন্ত শাজকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো রেবেকার বাসা থেকে৷ তারপর গাড়িতে শাজকে বসিয়ে সহসা ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল বুকের কাছে আর অন্য হাতে ড্রাইভ শুরু করল। কেমন যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল তাকে সারা পথ।

নক্ষত্রনিবাসের সামনে গাড়িটা থামল এসে রাত প্রায় বারোটাই। পাশ ফিরে শেহরোজ দেখে শাজ ঘুমে বিভোর। হয়তো আর কিছুক্ষণের মাঝেই ঘুম ভাঙবে৷ তার আগেই ওকে ওর ঘরে পৌঁছে দেওয়া দরকার। বাসার মূল ফটক খুলে ইব্রাহীম বেরিয়ে এলো৷ তাকে দেখে শেহরোজও গাড়ি থেকে নেমে এসে চাবিটা উড়িয়ে দিলো তার দিকে। সেটা লুফে নিয়েই জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীম‚ “কাজ হয়াছে‚ বাপ?”

সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলো না শেহরোজ৷ শাজকে কোলে তুলে বের করে আনতেই ওকে ঘুমন্ত দেখে ইব্রাহীম ভাবল‚ ও বোধ হয় জ্ঞানহারা৷ চিন্তায় বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল সে। “কী হয়েছে শাজের? ও ঠিক আছে তো?”

“ডোন্ট ওরি”‚ ভার সুরে আশ্বস্ত করল শেহরোজ। “ঘুমাচ্ছে। আর হ্যাঁ‚ কাজ হয়েছে। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে বেসমেন্ট যান। আসছি আমি।”

ইব্রাহীমের ভালো লাগল না কী একটা বিষয়। যাওয়ার সময় শাজকে যেমন অস্বাভাবিক গম্ভীর দেখাচ্ছিল। শেহরোজকে এখন তেমনই লাগছে আর বেশ বিষণ্নও লাগছে তার চোখের ভাষা৷ হয়েছে কী? লেন্সের বিষয়ে কি শাজ খুব বেশি সন্দেহ করেছে? ঝামেলা করেছে নাকি মেয়েটা? ধুর! এত টেনশন নিয়ে চুপ থাকা যায়? পিছু থেকে তাই জিজ্ঞেস করে বসল‚ “ও কি কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে আপনার ব্যাপারে?”

প্রশ্নটা শুনতে পেতেই থমকে পড়ল শেহরোজ দরজার মুখে৷ কয়েক পল মৌনাবলম্বন করা শেষে ম্লান সুরে বলে উঠল‚ “করতে পারলে আমাকে ও কীভাবে নেবে‚ ইব্রাহীম ভাই?”

গত চার মাসে যে ভাবনাকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি তা মাত্র দুদিনেই শেহরোজকে ভাবিয়ে অস্থির করে তুলছে। একটা সময়ে শাজ সকল সত্যের মুখোমুখি তো হবেই। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটা ভাই আর চাচার প্রতি অভিমান করবে‚ কষ্টও পাবে সব কিছু ওর থেকে গোপন করার জন্য৷ কিন্তু তার প্রতি ওর ধারণাটা কী হবে?

শাজের প্রতি মায়া অনুভব করত সে প্রথম থেকেই। মেয়েটার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে এ দেশে আসার পর প্রতিটা সময় না চাইতেও ওকে নিয়ে ভাবনায় মগ্ন থেকেছে৷ কখন আর কীভাবে ওর ওপর আক্রমণ আসতে পারে‚ কীভাবে ওকে বিপদ থেকে আগলে রাখবে‚ কীভাবে ওর ভরসাযোগ্য হবে আর কী করলে কাছের মানুষের মতো তাকে বিশ্বাস করবে শাজ‚ সর্বক্ষণ এসবই চিন্তা করে গেছে সে। এমনকি কিশোর সময় থেকে হৃদয়ঙ্গম করা মায়ের পছন্দের শায়েরীগুলো এই প্রথম সে উৎসর্গ করেছে কোনো নারীকে—যে কিনা মায়েরই মতো বাঙালি। তাই সে মুহূর্তগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য আবৃত্তি করলেও আদতে তা যে ওর হৃদয়ের গহিন থেকেই আবৃত্তি হতো। কারণ‚ মনে হতো তার শায়েরীর প্রতিটা পঙক্তি উৎসর্গ করার যোগ্য নিশ্চয়ই সাধারণের মাঝে লুকায়িত অসাধারণ এই বাঙালি লাবণ্যময়ী। এবং সব থেকে চমৎকৃত সত্য হলো‚ শাজকে নিয়ে প্রতিটা দিন ভাবনার জালে কবে যেন আটকা পড়ে গেছে তার হৃদয়ানুভূতিও৷ আর তা উপলব্ধি করতে অনেকটা দেরি করে ফেলল সে।
***

পুলের এক পাশ দিয়ে লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে। সে সিঁড়ি বেঁয়েই শেহরোজ নিচে এসে বেসমেন্টে প্রবেশ করল। দরজায় নির্দিষ্ট সেকেন্ডের বিরতিতে তিনবার ঠকঠক করলে তারপর দরজাটা খোলা হলো৷ কর্নেল রাশিদ খুলেছেন। শেহরোজ তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনি এখনো যাননি ডিউটিতে?”

“আজ আকাশের ডিউটি।” হাসলেন রাশিদ‚ “ভুলে গেছেন?”

“ওহ! স্যরি‚ কর্নেল। হ্যাঁ‚ ভুলে গিয়েছিলাম”‚ বলতে বলতে ভেতরে এলো শেহরোজ।

দরজা বন্ধ করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন রাশিদ। আজ চারটা মাসে শেহরোজের মুখ থেকে এই প্রথম ‘ভুলে গিয়েছিলাম’ কথাটা শুনলেন তিনি৷ নিশ্চয়ই তা স্বাভাবিক বিষয় নয়। কেমন যেন মলিনও লাগছে শেহরোজের চোখ-মুখ৷ কিছু নাকি হয়েছে তার‚ একটু আগে তা ইব্রাহীমও বলছিল৷ ঘটনা তবে মনে হচ্ছে বেশ গুরুতর!

বসার ঘরের বড়ো সোফা জুড়ে আইয়াজ পা ছড়িয়ে বসে আছে‚ কোলে ল্যাপটপ নিয়ে। শেহরোজকে দেখে পা গুটিয়ে নিলো সে। চুপচাপ তার পাশে এসেই বসল শেহরোজ‚ “সবাই কোথায়?”

“ইব্রাহিম ভাই আর আকাশ কিচেনে৷” বলল আইয়াজ নিস্পৃহতা নিয়ে‚ “ডিনার করছে আকাশ।”

“মেজর?”

“বেডরুমে শিফান।”

পাশ ফিরে তাকাল শেহরোজ। আইয়াজের নাখোশ চেহারাটা দেখে হাসল একটু‚ “এখনো রেগে আছ‚ ব্রাদার?”

জবাব দিলো না আইয়াজ৷ শাজের ঘুমন্ত মুখটা দেখছে নীরবে সিসিটিভি ফুটেজে। বিকালে ওরা বের হওয়ার আগে শেহরোজের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল ভালোই। কারণ‚ শাজের খুব কাছাকাছি শেহরোজের যাওয়ার চেষ্টাটা সে কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না৷ হ্যাঁ‚ সে একটা সময় চাচার কথা অনুযায়ী সবটাই মেনে নিয়েছিল শাজের ব্যাপারে৷ কারণ‚ শাজের জীবন মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে যে। কিন্তু এ বাড়িতে আসার পর চোখের সামনে শেহরোজের কর্মকাণ্ড কেন যেন তার সহ্য হচ্ছে না আর অভিনয়ও লাগছে না শেহরোজের আচরণগুলো৷ বরং রীতিমতো শেহরোজের হাবেভাবে তার মনে হচ্ছে‚ শাজের সঙ্গে মানসিক‚ শারীরিক‚ উভয়ভাবেই ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে সে৷ যার কোনোটাই সমর্থন দেবে না আইয়াজ কোনোদিনই।

“কী খবর‚ বাজার্ড?” সামনের সোফায় এসে বসল শেহনান শিফান। জিজ্ঞেস করল শেহরোজকে‚ “ইব্রাহীম ভাই বলছে তোমার নাকি মন ভালো নেই? হয়েছে কী?”

“নাথিং স্পেশাল”‚ কাঁধ ঝাঁকাল শেহরোজ। “সবাইকে জলদি আসতে বলো।”

“আমরা হাজির‚ ওস্তাদ”‚ হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে এলো ইব্রাহীম আর আকাশ। টি টেবিলের ওপর শেহরোজের খাবারগুলো রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল‚ “শাজের ঘুম ভাঙেনি?”

“ভাঙার তো কথা। কিন্তু দেখে মনে হলো আজ রাতে আর জাগছে না ও।”

“কেন?” আইয়াজ চিন্তিত হয়ে পড়ল মুহূর্তেই‚ “অসুস্থ হয়ে পড়েছে না-কি?”

ওর কাঁধে হাত রাখল শেহরোজ। শান্ত করতে বলল‚ “বেশ অনেকক্ষণ হিপনোটাইজ ছিল। মে বি হার ব্রেইন ইজ স্ট্রেসড। এজন্য ঘুম ভাঙতে যদি সময় লাগে, তাতে ভালোই হবে। রেবেকা গোমেজ প্রচণ্ড স্কিলড হিপনোটিস্ট। তার হিপনোটিজম থেকে বের হতে সময় লাগবে বলেছে।”

“শেহরোজ‚ আগে তুমি খেয়ে নাও। তারপর কথাবার্তা শুরু করি।” বলল শিফান।

তেমন ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে না শেহরোজের৷ মূল প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল তাই‚ “কথাবার্তা শেষে খাবো। তোমাদের চিন্তাভাবনা এখন কোনদিকে যাচ্ছে সেটা জানাও একে একে।”

শাজের কথাগুলোর রেকর্ড সে ওই মুহূর্তেই সবার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ তথ্য প্রমাণের সন্ধান জানার পর সবার মাঝে ইতোমধ্যে একতরফা আলোচনা শেষ। সেটাই শেহরোজকে সবাই জানাতে শুরু করল। পরিকল্পনার শেষ ধাপে এসে শেহরোজ বলল‚ “কম্পিউটার চিপটা শাজ নিজে থেকেই আমার হাতে তুলে দেবে। সে ব্যবস্থাই করব আমি।”

“আর সেই ব্যবস্থাটা কী?” গুরুভার স্বরে প্রশ্ন তুলল আইয়াজ চকিতেই।

“কালই জানতে পারবে।”

“এখনই কেন নয়?” উত্তেজিত হয়ে পড়ল আইয়াজ‚ “আমার জানাটা জরুরি এখনই৷ এমন কোনো স্টেপ যদি নেন আপনি যেটা আমার বোনকে ইন ফিউচার হার্ট করতে পারে! সেক্ষেত্রে আমি পারমিশন দেবো না আপনাকে।”

“হার্ট করতে পারে”‚ নীর্জব চোখে চাইলো শেহরোজ‚ “এটা কোন পার্সপেকটিভ থেকে বললে তুমি?”

“ওয়েল‚ ইউ ড্র সার্টেইন বাউন্ডারিস ফর শাজ। অ্যান্ড ডোন্ট গো আউটসাইড অফ দ্যাট”‚ কিছুক্ষণ থমথমে মুখে চুপ থেকে বলে উঠল আইয়াজ কথাগুলো।

স্থিরদৃষ্টিতে শেহরোজ ওর দিকে চেয়ে রইল। তারপর সবাইকে আশ্চর্য করে সে মুচকি হেসে সায় জানাল আইয়াজকে‚ “ইউ ক্যান রেস্ট অ্যাশিওরড।”

কিন্তু সবাই-ই টের পেলো‚ শেহরোজকে কথাগুলো বেশ বিদ্ধ করেছে৷ এবং এই ব্যাপারটাতেও অবাক হয়েছে ওরা।

“আমি শাজের কাছে আগামীকাল সবটা কনফেস করব ভেবেছি”‚ সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠল শেহরোজ। “ও আমাকে অবিশ্বাস করবে না এটা আমার বিশ্বাস। নিজে থেকেই হেল্প করবে আমাকে।” বলেই উঠে দাঁড়াল সে। তারপর আইয়াজকে জানাল‚ “তোমাকে কাল ওর মুখোমুখি হওয়ার পারমিশন দিলাম।”

“আপনি কি ইমোশনালি ট্রিগার হলেন?” জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীম‚ “ভেবেচিন্তে কনফেস করার কথা ভাবছেন তো? না-কি আইয়াজের কথায় হার্ড-হিট হলেন?”

“ইব্রাহীম ভাই”‚ রাশভারী সুর শেহরোজের। “আমি আজ অবধি মিশনের স্বার্থে কখনো ইমোশনালি ডিসিশন নিইনি।” বলা শেষে আর দাঁড়াল না৷ না খেয়েই বেরিয়ে গেল বেসমেন্ট থেকে।

আকাশও বেরিয়ে পড়বে বাড়ির চারপাশে নজর রাখার দায়িত্ব পালনে৷ কিন্তু যাওয়ার আগে আইয়াজকে বলে গেল‚ “তুমি অভার রিয়্যাক্ট করলে‚ ভাই৷ এই পরিস্থিতিতে নিজেদের মাঝে দ্বন্দ বিরোধ সৃষ্টি করায় বিপজ্জনক। এমনকি ইমোশনাল সেন্টিমেন্টকেও গুরুত্ব দিলে বিপদ।”

এমনকি এ মুহূর্তে ইব্রাহীমের মতো রসিক মানুষও নারাজ হলো‚ “শেহরোজকে তুমি কী নজরে দেখো‚ আইয়াজ? সে কি কখনো শাজের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করো?”

বিরক্ত হয়ে উঠল আইয়াজ‚ “আপনারা আমার জায়গাতে থাকলে একইভাবে রিয়্যাক্ট করতেন‚ ভাই। আপনারা কি খেয়াল করছেন না শেহরোজ নিজেও অ্যাট্রাকটেড শাজের প্রতি? ইন্ট্রেস্টেড সেও।”

“তাতে ক্ষতি কী‚ বাছা?” বললেন রাশিদ‚ “হি ইজ আ জেম। তাকে পাওয়ার ক্ষমতা সবার হয় না।”

“হি ইজ আ জেম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড অফ এসপিওনাজ। তার নিজের দেশের জন্য সে জেম। কিন্তু আমার বোনের জন্য সে সত্যিই সঠিক নয়‚ আঙ্কেল। আমি কোনোদিনই চাইবো না তার মতো কোনো পুরুষ আমার বোনের সঙ্গী হোক। যার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই সে কী করে আমার বোনের জন্য ব্লেসিং হতে পারে?”

উপলব্ধি করল সবাই—আসলেই তো তাই। ভাইয়ের জায়গা থেকে আইয়াজের সিদ্ধান্তে কোনো ভুল নেই৷ শিফান তাই সমর্থন করল ওকে‚ “তুমি একদম ঠিক আছ‚ ভাই। শাজ ডিজার্ভস আ নাইস নরমাল লাইফ।” একটু হাসল তারপর‚ “তবে শেহরোজ হচ্ছে সেই রত্ন‚ যাকে পেলেও ধারণ করার ক্ষমতা সবার থাকে না৷”

শেষ কথাটাই আইয়াজও সমর্থন করতে বাধ্য হলো৷ আর শিফানকে বলল‚ “আমার কথাতে তুমিও নিশ্চয়ই কষ্ট পেলে! আব্বুর পছন্দের মানুষ ছিলে তুমি৷ শাজকে তোমার হাতেই তুলে দিতো সে। কিন্তু এখন তো পরিস্থিতি বদলে গেছে। তুমিও খুব শীঘ্রই ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্সের একজন হয়ে যাবে। আমি আমার বোনটাকে সত্যিই হাসিখুশি‚ স্বাভাবিক জীবনে দেখতে চাই।”

“আর তোমার চাওয়াকে আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করছি”‚ মুচকি হেসে বলল শিফান।

বিনিময়ে আইয়াজও ছোট্ট করে হাসি ফিরিয়ে দিয়ে চলে গেল শোবার ঘরে। সে মুহূর্তে ইব্রাহীম আহত গলায় বলে উঠল‚ “সিরিয়াসলি শেহরোজ ইজ ইন লাভ উইথ হার! আই নেভার ইমাজিনড ইট উড হ্যাপেন।”

“কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি না”‚ হাসতে হাসতে বলল শিফান। “শাজের প্রতি ও ফল করছে এটা আমার সব সময়ই মনে হত।”

“আমারও”‚ সহমত প্রকাশ করলেন রাশিদ। “কারণ‚ ওর কথাবার্তাতে বুঝতে পারতাম বাঙালি সুন্দরী নারীদের প্রতি ওর এক বিশেষ দুর্বলতা আছে।”

“হ্যাঁ”‚ সায় দিলো শিফান৷ “এ কারণেই। ওর মায়ের জন্যই হয়তোবা।”

“কিন্তু আমি এসব ভাবছি না।” ইব্রাহীম মন খারাপের সুরেই বলল‚ “ও যদি কনফেস করে শাজের কাছে সবটা। শাজও কি আইয়াজের মতোই ব্যবহারটা করবে না ওর সাথে? এটা ভেবেই আমার ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল শিফান‚ “কালকে অনেক কিছুই ঘটবে‚ ইব্রাহীম ভাই।”
***

ভোর পাঁচটা।
প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে শাজ চোখ মেলেছে। কোনোরকমে ফ্রেশ হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে ছুটে এসেছে পেটের ছুঁচোটাকে থামানোর জন্য। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করতে করতে কালকের কথা ভাবতে শুরু করল। রেবেকা গোমেজের বাড়ি থেকে কী হলো আর কখন‚ কীভাবে নিজের বাড়ি এসে পৌঁছলো কিছুই তো বুঝতে পারছে না সে। শেহরোজকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে এক মগ কফি নিয়ে রওনা হলো সে ছাদে। গতরাতের ঘুমটা এত ভালো হলো যে কী করে! সেটাও বুঝছে না সে৷ এসব ভাবতে ভাবতে এসে ছাদে পৌঁছলো আর মুহূর্তেই হৃৎস্পন্দন এক পলের জন্য থেমে গেল ওর৷ এত দ্রুত গতিতে কোনো ছেলেকে পুশ আপ দেওয়া সামনাসামনি এই প্রথমই দেখল শাজ।

ছাদের মৃদু নীলচে আলোটা এখনো জ্বলছে। তার মানে শেহরোজ অনেকক্ষণ ধরেই ব্যায়ামে মগ্ন৷ কিন্তু সবে পাঁচটা। এত ভোরে কেউ ব্যায়াম করে? পরনে কেবল কালো স্পোর্টস ট্রাওজার—গা আবরণশূন্য। শাজ মন্থর পায়ে এগিয়ে এলো। শেহরোজের পেছনে এসে দাঁড়াল চুপচাপ। ঘামে চিকচিক করছে সারা শরীর। কতক্ষণ ধরে ব্যায়াম করছে এই ছেলে? ও চুপিচুপি দাঁড়িয়ে থেকেই গুণে ফেলল বিশবার পুশআপ দেওয়া শেষ। তারপরই থেমে পড়ল শেহরোজ। ওকে চমকে দিয়ে না ফিরেই বলে উঠল‚ “শাজ‚ চেয়ার থেকে টাওয়ালটা আনবে প্লিজ?”

“আরে!” বিস্মিত হলো শাজ‚ “কীভাবে বুঝলেন আমার উপস্থিতি?” কথার মাঝেই তোয়ালেটা আনল সে। শেহরোজ উঠে এসে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালে বাড়িয়ে দিলো তোয়ালে।

শরীরটা মুছতে মুছতে নীরবে‚ নিষ্পলক চেয়ে রইল শেহরোজ ওর মুখটাতে। জবাবের আশায় শাজ আবারও জিজ্ঞেস করবে ঠিক তখনই ওকে বলল সে‚ “আমার কিছু কথা আছে‚ শাজ। সবটা শোনার পর তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব এবং মানব৷ বাট ইউ মাস্ট লিসেন টু মি কমপ্লিটলি। অ্যাগ্রি?”

শেহরোজের চোখের ভাষা এই মুহূর্তে শাজ খুব ভালোভাবে পড়তে পারছে কী করে যেন। খুব গুরুতর কিছু ঘটেছে—তা প্রকাশ পাচ্ছে শেহরোজের চোখে৷ আর সেটা কি গতকালই ঘটেছে রেবেকা গোমেজের বাসা থেকে? সে বলে ফেলেছে সব? বুক ধড়ফড় আরম্ভ হলো শাজের‚ “কী কথা?”

“আমি আরও কিছু বলেছি তোমাকে”‚ নিস্পৃহ স্বর শেহরোজের।

স্নায়ু দুর্বলতায় গলা শুকিয়ে এসেছে মনে হলো শাজের৷ “আই অ্যাগ্রি”‚ ঢোঁক গিলে বলল।

ওর হাতটা ধরে শেহরোজ চেয়ারে এনে বসাল ওকে। আর সে বসল নিচে ওর পায়ের কাছে এক হাঁটু ভেঙে। শাজের হাতটা জড়িয়ে ধরেই রাখল নিজের দু হাতের মুঠোতে৷ “তোমাকে অনুভব করতে তোমার রোজ স্মেইলই যথেষ্ট আমার জন্য।” বলার পর কোমল হাতের পিঠে ঠোঁটটা ছোঁয়াতে গিয়েও থেমে পড়ল সে। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল নিজের সীমাবদ্ধতা মনে করে। সস্নেহে বলল শুধু‚ “আমার জন্য তোমার ফিলিংস আমি কখনো জানতে চাই না। তুমি বলতে চাইলেও না। কারণ‚ আমি তা অনুভব করতে পারি। কিন্তু…”

“ডু ইউ ওয়ান্ট টু কনফেস ইয়োর ফিলিংস অ্যাগেইন?” একটু আগের রক্তশূন্য চেহারাটা ধীরে ধীরে লালিমা বর্ণ ধারণ করতে থাকল শাজের।

শেহরোজের কথা মাঝপথেই থেমে গেছে এ প্রশ্নে। শাজের লাজুক হয়ে ওঠা মুখটা দেখে ‘না’ বলতে দ্বিধা হচ্ছে খুব৷ যে প্রসঙ্গে আস্তে আস্তে প্রবেশ করতে চাইছিল সে‚ তাও ভুলে যেতে মন চাইছে এ মুহূর্তে। সবটা জানার পর এমন মুখটা দেখার সুযোগ আর ভাগ্য আর কি হবে তার? না‚ হবে না৷ তাই শেষবারের মতো সীমা লঙ্ঘন করল সে৷ আইয়াজের নিষেধাজ্ঞাকে অবমাননা করল শাজের ডান হাতের পৃষ্ঠে গাঢ়ভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে। শাজ বোধ হয় তার আকস্মিক এ কাণ্ডে একটু চমকে উঠল। যার ফলে কেঁপে উঠল ওর হাতটা।

চলবে।