Home "ধারাবাহিক গল্প শেহরোজ শেহরোজ পর্ব-২৬ এবং শেষ পর্ব

শেহরোজ পর্ব-২৬ এবং শেষ পর্ব

0
শেহরোজ পর্ব-২৬ এবং শেষ পর্ব

#শেহরোজ – ২৬
#শেষাংশ_গ.
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***

শেহরোজ কল করে আইয়াজকে বেসমেন্ট থেকে ডেকে আনে। বোনের মুখোমুখি হবে সে কতদিন বাদে! কিন্তু আবেগ আর উত্তেজনায় দুরুদুরু বুকে আইয়াজ যখন শাজের ঘরে আসে‚ শাজ তার উপস্থিতি টের পেয়েও একবারের জন্যও মুখ তুলে তাকে দেখেনি। শেহরোজ তখন আপাতত সবকিছু ভুলে শাজের কম্পিউটার চিপের ব্যাপারে সকল কথা জানায় আইয়াজকে৷ আইয়াজ সে সময় শাজকে বলে ওঠে‚ “এটা একদম জটিল কিছু ছিল না‚ আপু। যদি চিপের ব্যাপারে ওরা জানতে পারে তবে ফাইলটা ওরা অনায়াসেই চুরি করে নিতে পারবে তোর কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে।”

এ কথার পরই শাজ তাকায় চোখে অবিশ্বাস নিয়ে। সেই চাউনি দেখে আইয়াজ বলে‚ “আমিই দেখাই তবে?”

জবাব দেয় না শাজ। ওর নীরবতাকে সম্মতি ভেবে নিয়ে
শাজের ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে আইয়াজ। শাজের কম্পিউটার থেকে সেই ফাইলটি উদ্ধার করে নেয় আর জানায়‚ “মূলত ওরা হ্যাক করলে এই পদ্ধতিতেই করত। আর আমি করলে সে পদ্ধতি আরও আশ্চর্যজনক হত তোর কাছে।”

শাজের ধারণাতে ছিল না তার ভাই কতটা উচ্চ পর্যায়ের হ্যাকার। শাজ দুটো বছরে নিজ প্রচেষ্টায় হ্যাকিং কার্যক্রম আয়ত্ত করলেও তা আইয়াজের কাছে কেবল প্রাথমিক পর্যায়। ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক করে শাজের কম্পিউটার সিস্টেমে ঢুকে পড়ে সিস্টেমের ওই গোপন ফাইলটি উদ্ধার করে আইয়াজ। কম্পিউটার সিস্টেমের তথ্যানুসারে অনুমানভিত্তিক অনেকগুলো পাসওয়ার্ড তৈরি করে সে। তারপর একটি প্রোগ্রাম সেট করে দেয়‚ যা একের পর এক অনুমানভিত্তিক পাসওয়ার্ড দ্বারা সিস্টেমটিতে প্রবেশ করার চেষ্টা করতে থাকে। সফটওয়্যারটি এক কমান্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোবটের মতো কাজ করতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে আইয়াজ সফল হয়ে শাজের কম্পিউটার সিস্টেমে ঢুকে পড়ে।

ফাইলটাতে ওমর ফারুক ভীষণ যত্নে প্রতিটি তথ্য‚ প্রমাণ সাজিয়ে রেখেছেন। সেগুলো দেখার পর শেহরোজ বাসা থেকে বেরিয়ে যায় কর্নেল রাশিদকে সঙ্গে নিয়ে।

আর শাজ! সারাটা দিন নিজেকে বন্দি করে রাখে ঘরে৷ ফাইল উদ্ধারের পর আইয়াজকে বাড়তি একটা কথাও বলার সুযোগ দেয়নি সে৷ দরজার ওপাশে সারাদিন সবাই ডাকাডাকি করে হয়রান হয়ে পড়ে। তবুও দরজা খোলেনি শাজ৷ খালিদ উসমানের ফোনও রিসিভ করেনি৷
***

রাত ১: ৩৫
শেহরোজ বাসায় ফিরল মাত্র। রাশিদকে বলল‚ “আপনি গিয়ে রেস্ট করুন‚ কর্নেল। আপনাকে আজ আর জাগতে হবে না।”

সম্মতি জানিয়ে রাশিদ বেসমেন্টে রওনা হলে শেহরোজ বাসার মূল ফটকের মুখে দাঁড়িয়ে থাকল একটু সময়। দ্বিধাদ্বন্দে ভুগল—আগে শাজের কাছে একবার যাবে কি? শাজ কেমন আছে‚ তা দেখতে ইচ্ছা করছে খুব। কিন্তু সবার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটাও আগে সেড়ে নেওয়া দরকার। তাই শেষমেশ বেসমেন্টেই চলে এলো সে। ড্রয়িংরুমে আজ আর আইয়াজের দেখা পেলো না। শিফান‚ ইব্রাহীম আর আকাশ বসে আছে৷ শেহরোজ ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বসল ইব্রাহীমের পাশে। জিজ্ঞেস করল ওদেরকে‚ “আইয়াজ ব্রো কোথায়?”

“শাজের রুমের সামনে বসে আছে মনে হয়”‚ জানাল ইব্রাহীম।

শিফান বলল‚ “শাজের অভিমান কিন্তু জায়েজ।”

“নিঃসন্দেহে”‚ সায় জানাল শেহরোজ।

“আচ্ছা আসল কথাই আসি আমরা।” শেহরোজকে জিজ্ঞেস করল আকাশ‚ “কাজ কি হয়েছে?”

“হুঁ‚ পিয়ালদের সংগঠন অন্যান্য ভার্সিটির স্টুডেন্টদের খুব ভালোভাবেই ম্যানিউপুলেট করতে পেরেছে৷ সরকার আর স্টুডেন্টদের মাঝে একটা ইস্যু তো চলছিলই। সেটাকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামবে ওরা কালই। আর এর মাঝেই ওই সিক্রেট ডকুমেন্টস ডিসক্লোজ করতে হবে আমাদের। যেটা সকলে দেখার পর স্টুডেন্টস সাধারণ জনতাকেও ইন্সপায়ারড করবে।”

“এটা তো ছাত্র-জনতার কাজ। আমাদের কাজ শুরু হবে কখন?” জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীম।

“ওয়েবসাইট রেডি?”

“হ্যাঁ।” জানাল শিফান‚ “আইয়াজ ওয়েবসাইট রেডি করে ফেলেছে৷ সকল তথ্যপ্রমাণ এখন মেথোডিক্যালি আপলোড হতে থাকবে। টাইম সেট করাও শেষ। আগামীকাল দুপুর। আমরা যদি ধরা পড়েও যাই তবুও কোনো প্রবলেম নেই। কেবল আইয়াজ ছাড়া কারও সাধ্য নেই এটা থামানোর।”

“ভেরি গুড। একেক করে যেহেতু লিক হবে পিএম-এর গোপন চুক্তিগুলো। সবটা লিক হওয়ার আগেই সে আমাদের খুঁজতে শুরু করবে। আগামীকাল রাত ঠিক দুটোর সময় আমার কথা হবে তার সঙ্গে।”

“ওয়েল।” শিফান বলে উঠল‚ “তোমার কথামতো সে রিজাইন তো করবে না‚ শেহরোজ। তাহলে তাকে একটা দিন সময় বেশি দেওয়া হয়ে যাচ্ছে না?”

“স্নাইপার অ্যাটাকের সুযোগ ছিল”‚ উপহাস করল শেহরোজ। “কিন্তু আমাকে তো এই পারমিশন দাওনি তোমরা। দিলে চার মাসের প্রয়োজন ছিল কি? চার দিনের মাঝেই মিশন সাকসেস করতাম। অ্যান্ড…” আক্ষেপের সঙ্গে বিড়বিড় করল শেষে‚ “আই উড রিটার্ন উইথ অ্যান ইনট্যাক্ট হার্ট।”

শেষ কথাটাই হেসে ফেলল শিফান। কিন্তু ইব্রাহীমের মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎই চঞ্চল গলায় বলে উঠল‚ “আমার আব্বা কাজী ছিলেন৷ তাই বিয়ে পড়ানোর নিয়ম জানি। খালি বিয়ের খাতাটা দরকার৷” বলেই আকাশকে জিজ্ঞেস করল‚ “বাপ‚ তুমি কি খাতা ম্যানেজ করতে পারবা?”

হাসি সামলে জানতে চাইলো আকাশ‚ “ম্যানেজ করার পর কী হবে?”

“রাশিদ ভাই উকিল বাপ হতো শাজের৷ আমি কাজী। তুমি‚ আইয়াজ আর শিফান স্বাক্ষী।” বলার পরই উত্তেজনায় আকাশের উরুতে চাপড় মেরে বসল‚ “বিয়ের সব রেডি‚ বাপ। খালি শেহরোজ বাপ আর শাজাম্মা কবুল বলবে।”

মুখ‚ কপাল চেপে ধরে হাসতে থাকল শিফান গা কাঁপিয়ে। শেহরোজ গালে হাত ঠেকিয়ে শুনছিল সবটা মনোযোগী ছাত্রের মতো। একবার শিফানের হাসি দেখে নিয়ে আবার ইব্রাহীমের দিকে নজর দিলো সে। ইব্রাহীম তখন মুচকি হাসতে হাসতে ভ্রু নাচাতে থাকল। অর্থাৎ জিজ্ঞেস করল ইশারায়‚ “ঠিক আছে না‚ বাপ?”

“সুপারব”‚ নিজস্ব ভঙ্গিমায় ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রশংসা করল শেহরোজ। “শুধু দেখেন কবুলটা আমি একা বললেই হয় নাকি। তাহলে সুপারবোল্ড হবে।”

শিফানের সঙ্গে এবার যোগ দিলো আকাশও। সবার হাসি আর শেহরোজের ঠাট্টা দেখে ইব্রাহীম মুখ গোঁজ করে ফেলল।

“আচ্ছা হয়েছে। ডিসকাশন শেষ করি”‚ শেহরোজ হাতের ইশারায় সবাইকে থামতে বলল। “সুযোগটা আমি পিএম-কে দিচ্ছি না। দিচ্ছি ছাত্র-জনতাকে। ওদের ফুঁসে ওঠার জন্য সময়টা দিচ্ছি। কারণ‚ পিএম ততক্ষণ অবধি আমার থ্রেট ভয় পাবে না‚ যতক্ষণ না দেশের নাগরিক খেপে ওঠে। আমাকে যেহেতু সবটা ইন গুড অর্ডার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে‚ সো আই কান্ট টেক অ্যাকশন অ্যাজ আই ওয়ান্ট। পিয়ালসহ অন্যান্য যেসব ছাত্রদের সাথে আমি গুড রিলেশনশিপ তৈরি করেছি‚ তাদের ওপর ভরসা রাখো তোমরা৷ কালই দেখতে পাবে ওদের ভেতরে কতটা আগুন। তাছাড়া ওই ইনফরমেশনস আর এভিডেন্স যখন পাবলিশড হবে‚ তখন ইন্টারন্যাশনাল নিউজও হবে। ইন্ডিয়ার পিএমও হাত গুটিয়ে থাকতে বাধ্য হবে কাল দুপুরের পরই। সব কিছুর ব্যবস্থা আমার করা শেষ। এবার…” শিফানকে ইশারা করল সে‚ “তুমি বলো তোমার কাজের কথা।”

“কোর্সমেটদের ভরসা করতে ভয়ই পাচ্ছিলাম। বাট দে আর রিঅ্যাশিওরড মি। ওরাও আগামীকালের অপেক্ষায় আছে। সব তথ্যপ্রমাণ দেখার পরই ওরা গোপনে ওদের ইউনিটের সকল জুনিয়র অফিসার‚ সোলজারকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবে।”

“তাহলে তো আমার কাজ প্রায় শেষই। সব কিছুর অ্যারেঞ্জমেন্ট কমপ্লিট”‚ বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল শেহরোজ। “রেস্ট শেষ হলে আইয়াজকে রুমে ডেকে চলে যাও তোমার ডিউটিতে।” আকাশকে বলল।

চলে এলো তারপর নিজের ঘরে। লাইটটা বন্ধ করে গড়িয়ে পড়ল বিছানায়‚ জামা-কাপড় না ছেড়ে পায়ের বুট সমেতই। গতরাত থেকে নির্ঘুম সে। চোখের ঝাঁপি নামতেই ঘুম জেঁকে ধরল পাঁচ মিনিটেই। কিন্তু ঘুমের স্থায়িত্ব হলো পনেরো মিনিট৷

কেউ ঘরে প্রবেশ করল৷ এসে দাঁড়াল ওর পায়েরই কাছে। সহজাত প্রবৃত্তির ফলে ঘুমের মাঝেই নাকে এসে বাড়ি খাওয়া ব্যক্তির গায়ের ঘ্রাণ তাকে জাগিয়ে তুলেছে। ঘুম ছুটলেও চোখদুটো বুজে মটকা মেরে পড়ে আছে সে। ব্যক্তিটি কী করে তা দেখতে চায়।

এক‚ দুই করে চারটা মিনিট অতিবাহিত হলো। কিছুই করতে দেখা গেল না ব্যক্তিটিকে। বরঞ্চ ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল সে আর মুহূর্তেই শেহরোজ বিদ্যুৎ গতিতে উঠে বসল। এবং ওর কব্জি চেপে ধরে আকস্মিক টানে ওকে নিজের কোলের ওপর এনে ফেলল। আঁতকে উঠে শাজ চিৎকার করতে গিয়েও সামলাল দ্রুত। কতক্ষণ দুজন কোনো কথা বলল না৷ আলো-আঁধারির ঘরটাই একজন আরেকজনকে নিষ্পলক দেখল শুধু৷ যেখানে শাজের চোখের তারায় গাঢ় অভিমান আর যন্ত্রণার ছায়া আর শেহরোজের চোখে আকুলতা।

“ফিরে যাচ্ছিলে কেন?” ফিসফিস স্বরে জিজ্ঞেস করে শেহরোজ আলুথালু চুলগুলো শাজের গুছিয়ে দেওয়ার জন্য হাতটা বাড়াল৷ অমনিই হাতটা ধরে বাধ সাধল শাজ‚ “থাকতে তো আসিনি।” উঠে পড়ল শেহরোজের কোল থেকে৷

কিছু বলল না শেহরোজ। কিছুক্ষণ মৌনতা কাটল দুজনের মাঝে আবারও৷ অতঃপর জিজ্ঞেস করল শাজ‚ “আপনাদের প্ল্যান তবে কী হলো?”

দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল শেহরোজ৷ একটু সময় চুপ থেকে ওকে বলল সবটা। সব কিছু শোনার পর শাজ আজ বুঝতে পারল‚ কেন শেহরোজ ভার্সিটিতে ছাত্রবেশে প্রবেশ করেছে আর কেন নিজেকে ছাত্রদের কাছে বিশ্বস্ত বানিয়েছে। কী দূরদর্শী আর সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে এই দেশে এসেছে সে! বিস্মিত হলো শাজ৷ মনে মনে অজান্তেই মুগ্ধও হলো। “ঠিক আছে।” আবেগশূন্য কণ্ঠে বলল‚ “দোয়া করব। যেন সাকসেস হোন আপনারা। আসি।”

“শাজ?” আকুল আবেদন জানাল শেহরোজ‚ “থাকবে একটু?”

“না”‚ কঠিন সুরে নির্দয় প্রত্যাখ্যান করে শাজ বেরিয়ে এলো। সত্যি বলতে‚ ওর ইচ্ছা হচ্ছিল আরও কিছুক্ষণ শেহরোজের কাছাকাছি থাকার। কিন্তু পরিকল্পনাগুলো জানার পর উপলব্ধি হলো ওর‚ মায়া বাড়ানোর চেয়ে কমানোই তো শ্রেয়৷ কর্তব্য পালন শেষে এই পুরুষ ফিরে যাবে তার স্বদেশ। এরা স্বার্থ আর উদ্দেশ্য ছাড়া কখনো কারও জীবনে প্রবেশ করে না‚ কাউকে নিজের সঙ্গে জড়ায় না।

ঘরে ফিরে এলো শাজ। দরজাটা বন্ধ করার মুহূর্তেই শুনতে পেলো ভাইয়ের গলা‚ “আপু‚ একটু দাঁড়া।”

আবার এসেছে আইয়াজ। মাত্র আধা ঘণ্টা হলো ওর দরজার সামনে থেকে ফিরে গেছে৷ সারাটা দিনে বহুবার চেষ্টা করে গেছে ওর সঙ্গে কথা বলার—সুযোগ দেয়নি ও। কিন্তু এবার আর ফেরাল না। দরজাটা পুরোপুরি খুলে দাঁড়িয়ে রইল অভিমানী মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে। ওর কাছে এসে আদরে মাথায় হাতটা বুলিয়ে দিলো আইয়াজ। “আমাকে বকে দে‚ যা বলতে মন চায় শুনিয়ে দে। তোর ডেড সাইলেন্স আমার দমবন্ধ ফিল দিচ্ছে।”

“ওসব আপনজনের সঙ্গে করা যায়।”

কান্না চলে এলো আইয়াজের‚ “শাজ‚ আই হ্যাভ কাম টু অ্যাটোন। জাস্ট গিভ মি ওয়ান চান্স।”

“রিল্যাক্স… আই অ্যাম নোবডি স্পেশাল।” প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপের সঙ্গে হাসল শাজ‚ “আমার কাছে প্রায়শ্চিত্ত করার কী আছে আর সুযোগই বা চাওয়ার কী আছে?”

অধীর হয়ে আইয়াজ কিছু বলার পূর্বেই শাজ বলল আবার‚ “আপনি আপনার বাবার সাথে হওয়া অন্যায়ের শোধ নিতে এসেছেন‚ দেশের জন্য কিছু করতে এসেছেন। আই অ্যাম গ্রেটফুল ফর দ্যাট।”

“আব্বু নেই। আমার আপন কেবল তুই আছিস। আমি তোর জন্য ছুটে এসেছি শুধু।”

“আমার জন্য হলে আমার সামনে এসে একটাবার দাঁড়ালেন না‚ আমাকে জানতেও দিলেন না কিচ্ছু। আরও অচেনা এক স্পাইকে আমার কাছে ঠেলে দিলেন। এরপর আমার মানসিক অবস্থা‚ আপনাকে নিয়ে আমার বিবেচনা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?”

“তোর দুঃখ‚ রাগ‚ অভিমান‚ সবটাই সঠিক।” আইয়াজ অশান্ত‚ অস্থির হয়ে বলল‚ “তবুও আমাকে সবটা একবার ক্লারিফাই করার চান্স দে। আমি সিচুয়েশনটা তোকে বুঝিয়ে…”

“আমি এখন ঘুমাতে চাই”‚ আইয়াজকে থামিয়ে বলে উঠল শাজ। “আরেকটু সময় একা থাকার প্রয়োজনবোধ করছি৷”

“ঠিক আছে। কিছু খেয়ে ঘুমা৷ সারাদিন কিছু খাসনি। আমি খাবার নিয়ে আসি?”

“না। খিদে নেই।”

“ঘুমিয়ে পড়। কাল সকালে আমার কথা শুনবি তো?”

“শুনব।”

এগিয়ে এসে শাজের কপালে চুমু খেল আইয়াজ। মুহূর্তেই চোখদুটো নোনাজলে সিক্ত হয়ে উঠল শাজের৷ কিন্তু তা দেখতে দিলো না ভাইকে৷ ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো জলদি।
***

রাত ২: ১৫
সিগারেটটা ধরিয়ে আকাশ বাড়ির বাউন্ডারির বাইরে এসে দাঁড়াল। শুনশান রাতের খোলা আকাশের নিচে হাঁটতে মজায় লাগে তার৷ কিন্তু আজকে বোধ হয় অমাবস্যার রাত। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো না জ্বললে ঘন আঁধারে ডুবে যেতে হতো৷ এসব আজগুবি চিন্তাভাবনা করতে করতে সবেই সে মূল সড়কে পা রাখল আর তাকে চমকে দিয়ে ল্যাম্পপোস্ট নিভে গেল সবখানের৷ বিস্মিত হয়ে চারদিকে নজর বুলাল সে৷ দূরের কয়েকটা বাড়ির গেটের সামনে আলো জ্বলত। তাও চলে গেছে৷ তার মানে লোডশেডিং! কিন্তু মনটা খুঁতখুঁত করতে থাকল আকাশের৷ এই মাঝরাতে আজ প্রথম এলাকায় লোডশেডিং হতে দেখল। হেঁটে আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখবে কি-না ভাবল। তবে তার আগে কল করা দরকার বাসাতে৷ ফোনটা কানে ঠেকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল রিসিভ হওয়ার। শেহরোজ রিসিভ করল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই‚ “সব ঠিক‚ আকাশ?” ওর চিন্তিত কণ্ঠ শুনে আকাশের চিন্তা আরও বেড়ে গেল৷

শেহরোজের ঘুম হয়নি শাজ যাওয়ার পর৷ হঠাৎ মনটা অস্থির লাগতে শুরু করে। তাই বেসমেন্টে ফিরে আসে সে। এসে বসতেই আচমকা লোডশেডিং হয়।

“বুঝতে পারছি না। জেনারেটর অন করেছেন?”

“করতে গেছে আইয়াজ৷ চারপাশ স্বাভাবিক লাগছে না?”

“ঘুটঘুটে অন্ধকার‚ ভাই৷ কেমন এক অস্বস্তি হচ্ছে। ঠিক বোঝাতে পারছি না।”

একই অনুভূতি শেহরোজেরও৷ অন্ত্রের অনুভূতি ভালো কিছুর ইশারা দিচ্ছে না৷ আকাশের কাছে তা প্রকাশ না করে বলল‚ “তুমি বাড়ির ভেতর চলে এসো। ছাদ থেকে চারপাশটা দেখো।”

“ছাদ থেকে আর কতদূরেই বা চোখ যায়? আমি আর কিছুক্ষণ থাকি৷ দেখি সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ে কি-না।”

“বি কেয়ারফুল‚ ব্রো।”

“ইয়া‚ ডোন্ট ওরি।”

জেনারেটর অন করে আইয়াজ আর ফেরেনি বেসমেন্ট। গ্যারেজের ভেতর দিয়ে বেসমেন্টে প্রবেশের রাস্তা বানানো হয়েছে। আপাতত গ্যারেজে গাড়ির হুডের ওপর বসে কিছুটা সময় একা কাটাচ্ছে সেও৷

কর্নেল রাশিদ আর ইব্রাহীম বেডরুমে ঘুমাচ্ছে আর শিফান ড্রয়িংরুমের কাউচে। শেহরোজ একা সারা ড্রয়িংরুম পায়চারি করছে। সেই সাথে বারবার আইয়াজের ল্যাপটপের কাছে ফিরে এসে সারা বাড়ির সিকিউরিটি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করছে৷ শাজের দাদী ঘুমে অচেতন৷ শুধু শাজকে দেখা যাচ্ছে এপাশ-ওপাশ করতে। খুব বেশিক্ষণ ওকে দেখল না সে। মনোযোগ এখন এদিকে দেওয়ার ইচ্ছা নেই।

আইয়াজকে কল করতে করতে শেহরোজ বেডরুমে এসে ইব্রাহীমকে ডাকল‚ “উঠুন জলদি‚ ইব্রাহীম ভাই।”

বরাবরই ঘুমটা বেশ গাঢ়ই হয় ইব্রাহীমের। তাই সহজে তাকে সজাগ করা গেল না৷ রাশিদ সাহেবের ঘুম ভাঙতেই ইব্রাহীমকে ঠেলাঠেলি করে জাগালেন। শেহরোজের থমথমে মুখটা দেখে জিজ্ঞেস করল দুজন একই প্রশ্ন‚ “কিছু হয়েছে?”

“দশ মিনিট হলো লোডশেডিং হয়েছে৷ এ সময়ে ইলেকট্রিসিটি অফ হয় না৷ আজ হলো আর এখন অবধি আসেনি। আমার এ ব্যাপারটা ঠিক ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।” ইব্রাহীমকে নির্দেশ করল‚ “আপনি আকাশের কাছে চলে যান‚ ইব্রাহীম ভাই৷ আই অ্যাম স্যরি। আই থিঙ্ক এভরিওয়ান শুড স্টে আওয়েক টুনাইট।”

“নো প্রবলেম। আপনি স্যরি হইয়েন না৷” রাশিদ বললেন‚ “আমাদেরই ভুল হয়েছে সবাই এক সঙ্গে ঘুমানো। আমাদের এখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত এলার্ট থাকা দরকার।”

আইয়াজ কল তুলছে না দেখে ইব্রাহীম বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বলে দিয়েছে‚ আইয়াজের দেখা পেলে যেন তাকে সে পাঠিয়ে দেয়।

শিফানও জেগে গেছে ওদের কথাবার্তা শুনে। পায়চারি করতে থাকা শেহরোজকে চিন্তামগ্ন দেখে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে সে। তখনই শেহরোজ তাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে কানে ঠেকানো ফোনে আকাশকে জিজ্ঞেস করল‚ “ইজ এভরিথিং অলরাইট?”

“চোখে তো কিছুই পড়ছে না। কিন্তু ওই খুঁতখুঁতুনিটাই মন থেকে যাচ্ছে না‚ ভাই।”

“ইব্রাহীম ভাই গেছে। দুজনে চারপাশটা একবার রেকি করে বাসায় ফিরে আসো।”

“হ্যাঁ ওই তো ইব্রাহীম ভাই। চলেও এসেছে।” শেষ কথাটা শেহরোজের কানে পৌঁছল না। কারণ‚ বলার সুযোগই পেলো না আকাশ।

অদূর থেকে একটা শক্তিশালী বুলেট এসে আকাশের মাথার পেছনে ঢুকে কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে‚ মাথার চাঁদিও উড়ে গেছে তার। ইব্রাহীম সবেই কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল৷ আকাশের ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মাথাটা থেকে ঘিলু আর রক্ত এসে ছিটকে পড়ল তার মুখের ওপর। কাটা কলাগাছের মতো আকাশ ধপ করে পড়ল তারই চোখের সামনে। প্রস্তর মূর্তির মতো ইব্রাহীম চেয়ে রইল আকাশের লাশের দিকে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার আগেই শুনতে পেলো শেহরোজের কণ্ঠ। আকাশের ফোনে শোনা যাচ্ছে মৃদুভাবে। হ্যালো হ্যালো করছে শেহরোজ।

কাছেপিঠেই শত্রু। ইব্রাহীম প্রচণ্ড ধাক্কাটা সামলে নিচু হয়ে ছোঁ মেরে আকাশের ফোনটা তুলে নিলো। পেছন থেকে গুলি লাগার ভয়কে বুকে নিয়েই ছুট দিলো বাসার ভেতর। সাইলেন্সার যুক্ত পিস্তলের গুলি খুব বেশিদূর হলে লক্ষ্য পূরণ করে না। তাই হয়তোবা এ মুহূর্তের জন্য বেঁচে ফিরল সে। গ্যারেজে ঢুকেই আইয়াজকে এখনো বসে থাকতে দেখে আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরল ইব্রাহীম। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জানাল‚ “অ্যাটাক শুরু‚ আইয়াজ। আকাশ আর নেই।”

বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল আইয়াজের‚ “কী বলছেন?” ইব্রাহীমকে সরিয়েই সে গ্যারেজের শাটার নামিয়ে দিলো৷ ফিরে এসে দেখল ইব্রাহীম দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে আর তার হাতে থাকা ফোনটা বাজছে অনবরত। ফোনটা নিয়ে নিলো আইয়াজ। শেহরোজের নাম দেখে জলদি রিসিভ করে বলল‚ “আকাশ ইজ নো মোর৷ দি অ্যাটাক হ্যাজ বিগান।”

“কাম টু দ্য বেইসমেন্ট”‚ চিৎকার করে উঠল শেহরোজ। “কাম কুইকলি।”

ইব্রাহীমকে ধরে নিয়ে আইয়াজ নেমে এলো বেসমেন্টে। তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে সবার৷ কর্নেল রাশিদ আর শিফানকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে দিচ্ছে শেহরোজ। ঠিক তখনই বাড়ির অ্যালার্ম বেজে উঠল। আঁতকে উঠল সকলেই৷ হামলাকারীরা বাউন্ডারি পার করে ভেতরে চলে এসেছে আর সেজন্যই অ্যালার্ম বেজে উঠেছে।

বেরেটা M9 লোড করে শোলডার হোলস্টারে ম্যাগাজিন নিয়ে নিলো সকলে। স্টিলেটো‚ অ্যাসিড ভর্তি মিনি স্প্রে বোতল‚ এক্সপ্লোসিভ‚ নাইট ভিশন এবং বুলেটপ্রুফ ভেস্টসহ সবাইকে প্রস্তুত করা শেষে শেহরোজ দেখল আইয়াজ নেই। আইয়াজকে বেসমেন্টে কোথাও পাওয়া গেল না‚ কলেও পাওয়া গেল না৷ মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় শেহরোজের৷ আইয়াজ কি অ্যালার্মের শব্দ শুনে বাসার ভেতর ছুটেছে কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই? বোকার মতো এই পদক্ষেপটা কী করে নিলো সে?

এদিকে অপেক্ষা করারও সময় নেই৷ সবাইকে পজিশন বুঝিয়ে দিয়ে শেহরোজ হঠাৎ অতিরিক্ত আরও একটি জিনিস নিলো। জানে না এই জিনিসটা আজ কাজে দেবে কি-না৷

গ্যারেজে পৌঁছতেই শাটার গুঁতানোর শব্দ পেলো ওরা। বুঝতে পারল‚ শত্রু খুব কাছেই। গাড়ির পেছনে কভার নিয়ে ওরা শাটার লক্ষ করে এক্সপ্লোসিভ ছুঁড়ে মারল একত্রে। শাটার ভেঙে তছনছ হয়ে গেল গ্যারেজের মুখ। ধোঁয়ার মাঝেই গুলির বর্ষণ শুরু হয়ে গেল দুপাশ থেকেই।

বাসার মূল ফটক বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে র-এর দুর্ধর্ষ কিছু ইনটেলিজেন্স অফিসার। আজ তারা সংখ্যায় শেহরোজের দলের থেকেও দ্বিগুণ।

জেনারেটর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারা বাড়ি তলিয়ে গেছে অন্ধকারে৷ আইয়াজ তখন অ্যালার্ম শুনে শাজের জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। তাই পিস্তল আর নাইট ভিশন নিয়েই ছুটে আসে সে বোনকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে৷

ছাদের পেছনের লোহার সিঁড়িটা বেঁয়ে ওপরে উঠল সে৷ শেহরোজের ঘর হয়ে করিডরে পৌঁছতেই পা থেমে গেল তার৷ দরজা খুলে বৃদ্ধা দাদী বেরিয়ে এসেছেন। সারা বাসা এমন আঁধার দেখে বকবকানি আরম্ভ করলেন‚ “বাড়িঘর এমুন আন্ধার করে রাখিছে ক্যারাই? বাবর ছ্যামড়াডা সারাদিন যে কী অরে! চোহে না দেইক্কা এহন নিচেই যামু ক্যাম্বা? ও শাজ?” শাজকে ডাকতে ডাকতে ওর ঘরের দিকে যেতে থাকলেন। আইয়াজ তাকে ডাকার আগেই দেখতে পেলো দুটো ছায়া উঠে আসছে সিঁড়ি বেঁয়ে। নিচু হয়ে বসে পড়ে তিনটা গুলি ছুঁড়ল তাদের উদ্দেশ্যে। গুলি তিনটা নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করল ছায়া দুটোর বুকে গিয়ে৷ কিন্তু তার গুলির আওয়াজে নিচে থাকা অস্ত্রধারীরা সতর্ক হয়ে গেল। এবং তাদের সঙ্গীর দেহদুটো সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়তে দেখে রাগে আগুন হয়ে জবাব পাঠাল তাদের AK-47 নিচ থেকেই। শাজের ঘরের সামনে বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে দরজায় মাত্রই নক করতে যাচ্ছিলেন। এক ঝাঁক গুলি এসে তার পিঠ আর মাথাতে ঢুকে বেরিয়ে গিয়ে দরজা ছিদ্র করে দিলো। আর্তনাদ করার সময়টুকুও পেলেন না তিনি৷

শাজ আইয়াজের গুলির আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠেছে একটু আগেই। শব্দটা কি গুলির না-কি অন্য কিছুর‚ তা নিয়েই অল্পক্ষণ সংশয়ে ভুগল সে। এদিকে অনেকক্ষণ বিদ্যুৎ নেই‚ একটু আগে জেনারেটরের লাইনও চলে গেছে। বেশ গোলমেলে লাগছে পুরো বিষয়টা৷ মনের মধ্যে কেমন অশুভ সঙ্কেত বাজছে।

সন্দিগ্ধ মনে বিছানা ছাড়ল শাজ। দরজাটা এসে খুলতেই পায়ের নিচে হঠাৎ ভেজা অনুভব করল৷ “এখানে আবার পানি এলো কী করে?” বিড়বিড় করতে করতে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে নিচে তাকাল৷

আয়েশা খাতুনের রক্তাক্ত লাশ! কিন্তু মুখটা চেনার উপায় নেই৷ অনেকগুলো বুলেট মাথার পেছন থেকে ঢুকে চোখ‚ নাক আর চোয়াল ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে গেছে। রক্তের স্রোত বয়ে চলছে করিডরে৷ শাজের মনে হলো ভারসাম্য হারাচ্ছে আর বমি করে ফেলবে সে। পরনের কাপড় যদি পরিচিত না হত তবে সে চিনতেই পারত না এই লাশটা ওর দাদীর লাশ।

আইয়াজ নিজেও দাদীর লাশটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল৷ কিন্তু শাজকে বেরিয়ে আসতে দেখে বুকের রক্ত ছলকে উঠল তার৷ নিচে তাকাল দ্রুত৷ শাজকে নিয়েই আলোচনা চলছে শত্রুদের মাঝে৷ তারা লিভিংরুমে ছড়িয়ে গিয়ে পজিশন নিয়েছে৷ আর শাজ তাদের প্রত্যেকের রাইফেলের নলের সামনে অসহায় শিকার হয়ে দাঁড়ানো। দৃশ্যটা দেখেই আইয়াজ ভুলে গেল শেহরোজের কমান্ড। এরূপ পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে খুব মাপঝোঁক করে পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু সব ভুলে গেল সে বোনকে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে৷ আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দৌড়ে গেল শাজের দিকে।

দাদীর লাশের কাছ থেকে নড়তে পারল না শাজ। শরীরটা কেমন অসাড় লাগছে। ঢোঁকটা পর্যন্ত গিলতে অসুবিধা হচ্ছে ওর। সবটা কি ওর দৃষ্টিভ্রম? আর নয়ত স্বপ্ন? এমনটাই ভেবে শাজ কষ্টেসৃষ্টে লাশটা স্পর্শ করার জন্য নিচু হলো। সে সময়ই তিনটা বুলেট বাতাসে শিস কেটে চলে গেল ওর মাথার ওপর দিয়ে আর আইয়াজও পৌঁছে ওর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ গুলির জবাবে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চেঁচিয়ে শাজকে বলল‚ “ঘুরে ঢুকে পড়‚ শাজ! জলদি ঘরে যা।”

ভাইয়ের চিৎকার শুনে শাজ দাঁড়িয়ে পড়ল সটান। কী বলছে ওকে? কেন বলছে? জবাবে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। তবে এবার গুলির আওয়াজ স্পষ্ট! একদম কাছ থেকে শুনল ও৷ তাহলে দাদীর লাশটাও সত্য? এটুকু ভাবার পরই ওর সামনে দাঁড়ানো ভাইটার শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠল‚ হাত থেকে তার পিস্তলটা হঠাৎ নিচে পড়ল আওয়াজ করে। একই মুহূর্তে গলা আর কাঁধের মাঝামাঝি অংশে শাজ অনুভব করল তীব্র জ্বালা আর মরণ যন্ত্রণা। হাতে ধরে রাখা ওন ফোনটা পড়ল তখন মেঝেতে। খিঁচুনি আরম্ভ হলো ওর।

আইয়াজের বুক ঝাঁঝরা হয়ে ওর পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে একটা বুলেট চলে গেছে শাজের গলার পাশ কেটে।

নিভু নিভু চোখদুটো পুরোপুরি বুজে আসার আগ মুহূর্তে ফোনের আলোয় শাজ দেখতে পেলো‚ ভাইটা লুটিয়ে পড়ল নিচে৷ দু’বার ঝাঁকি দিলো তার শরীরটা। তারপর একেবারে স্তব্ধ৷ ওর ভাই চিরতরে ফুরিয়ে গেল—স্পষ্ট উপলব্ধি হলো ওর। দাদীর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল ও-ও৷ চোখের বন্ধ দুয়ারের কোন গড়িয়ে এক বিন্দু অশ্রু ঝরল মেঝেতে।
***

ইব্রাহীমের চোখদুটো বুজিয়ে দিয়ে খুব আলগোছে মাথাটা কোল থেকে নিচে নামিয়ে রাখল শেহরোজ। মনের পর্দায় ভেসে উঠল কয়েক ঘণ্টা আগে করা তার সঙ্গে এই মানুষটির ঠাট্টা-তামাশা। তার আর শাজের সম্পর্ক পূর্ণতা না পাওয়ার কারণে সব থেকে বেশি আহত হয়েছিল এই মানুষটিই৷ আর এখন সেই মানুষটিই উৎসর্গ করে দিলো জীবনটা তার জন্য।

রাশিদ কান্না সামলাতে পারছেন না৷ বহুদিন বাদে যুদ্ধে নামার কারণেই কি এত বেশি দুর্বল হয়ে গেছে তার হৃদয়টা?

দু পক্ষের মাঝে গোলাগুলির শেষ পর্যায়ে শেহরোজের দলের কাছে শত্রুপক্ষরা হার মানে৷ লাশগুলোকে ডিঙিয়ে ওরা যখন গ্যারেজ থেকে বের হয়ে আসে‚ পেছন থেকে প্রায় মৃত এক অফিসার তার জীবনের শেষ বুলেটটা শেহরোজের লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়৷ ইব্রাহীম পেছন ফিরে তা দেখা মাত্রই শেহরোজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে নিয়ে সরে পড়ার জন্য৷ কিন্তু সেই সুযোগ সে পায় না৷ বুলেটটা ঢুকে পড়ে তারই ঘাড়ের ওপরে। শিফান দেরি না করে মুহূর্তেই সেই ঘাতকের মাথা লক্ষ্য করে দুটো গুলি পাঠায়।

খুব বেশিক্ষণ ইব্রাহীম টিকে থাকেনি। রাশিদ দ্রুত তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে কালেমা শোনান। ভার হয়ে আসা জিভ নাড়িয়ে তা পড়ার চেষ্টা করে সে। তার মাঝেই প্রাণবায়ু চলে যায়।

“কর্নেল!” রাশিদের কাঁধ চেপে ধরে শেহরোজ বোঝায়‚ “আমরা সময় ব্যয় করে ফেলছি৷ বাসার ভেতরে শাজ‚ শাজের দাদী আর আইয়াজ রয়েছে৷”

“তাছাড়া আমরা চাই না”‚ শিফান লাশগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল‚ “এদের একজনও জীবিত ফেরত যাক।”

“চাই না… সত্যিই চাই না।” চোখের পানি মুছে নিয়ে রাশিদ সাহেব বেরেটার গ্রিপ শক্তহাতে চেপে ধরলেন।

বাসার পেছন থেকে ওরা ছাদে উঠল৷ সে মুহূর্তে ছাদে র-এর অফিসার দুজনও উপস্থিত। তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে আরও কেউ আছে কি-না! শেহরোজের মুখোমুখি হওয়া মাত্রই আলোর বেগে পিস্তল ধরা হাতটা উঁচু করে সে গুলিবিদ্ধ করল দুজনকেই। একজন জায়গায় মরল আর আরেকজনকে কাঁধে গুলি ঢুকিয়ে আহত করল। আহত অফিসার ব্যথায় চিৎকার করার আগেই শিফান তার মুখ চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে হুমকি দিলো‚ “পরিবারকে দেখতে চাইলে যা বলছি তাই কর।”

অতিবাহিত হলো দশ মিনিট। অফিসারটি স্পাই ইয়ারপিসে জানিয়েছে রমেশচন্দ্রকে‚ ছাদে লুকিয়ে আছে দুজন। তারা যেন অবশ্যই ছাদের পেছন দিক থেকে আসে।

রমেশচন্দ্রের দলে আছে সর্বমোট ছ’জন। বাকিদের লাশের মাঝে ইব্রাহীমের লাশ দেখে সে বিশ্বাস করেছে‚ যে দুজন আছে তারা জান বাঁচাতে লুকিয়েছে।

পানির টাঙ্কির পেছনে বসে আছে শিফান আর রাশিদ। শেহরোজ বুকে ঝড় নিয়েই খুব দ্রুত ফাঁদ পাতছে। মাথার মধ্যে চলছে শাজ‚ আইয়াজ আর বৃদ্ধার চিন্তা৷

যে পথটুকু হয়ে ছাদের পেছন সিঁড়িতে উঠতে হবে‚ সেই পথের মাঝে মাটিতে ল্যান্ড মাইন পুঁতে দিচ্ছে সে। এই জিনিসটাই অনিশ্চিত হয়ে তখন সাথে নিয়েছিল। চার মাসের মাঝে আজ প্রথম এটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাওয়া গেল৷

রমেশচন্দ্র দুটি দল বানাল। একটা দলে সে আর একজন মাত্র অফিসার৷ দ্বিতীয় দলে চারজন৷ তাদেরকে পাঠিয়ে দিলো ছাদের পেছনে৷ শেহরোজ মেহগনি গাছের একটা মোটা ডালে চড়ে বসেছে৷ দ্বিতীয় দলটাকে আসতে দেখে ইয়ারপিসে শিফান আর কর্নেলকে সতর্ক করে দিলো‚ “দে হ্যাভ অ্যারাইভড।” শিফান আর রাশিদ সাহেব প্রস্তুত ছিলই৷

দলের প্রথম অফিসার ডিঙিয়ে গেল মাইনটা৷ কিন্তু দ্বিতীয়জনের পা পড়ল। চোখের পলকে বিস্ফোরণ ঘটে গেল। চারজনের মাঝে একজন কেবল আহত হলো আর বাকি তিনজনের শরীরই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল৷ শেহরোজ গাছ থেকে নেমে এসে আহত অফিসারকে লক্ষ্য করে দুটো গুলি ছুঁড়ে দিলো৷

রমেশচন্দ্র আর দ্বিতীয়জন বিস্ফোরণের শব্দ পেয়ে ইয়ারপিসে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল সবার সাথে। কারও কোনো জবাব পেলো না। কিছু বুঝতে বাকি থাকল না তার৷ গ্যারেজের বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকল পরবর্তী পরিকল্পনা। সে সময়ই ইয়ারপিসে শুনতে পেলো সেই অফিসারটির গলা৷ যাকে বন্দি করে নিয়েছে শেহরোজ। রমেশচন্দ্রের কাছে কাকুতি মিনতি করল‚ “আমাকে বাঁচান‚ স্যার৷ বেইসমেন্টে লুকিয়েছি আমি। গুলি খেয়েছি শোল্ডারে।”

“ওই দুজন কোথায়?” হুঙ্কার স্বরে জিজ্ঞেস করল রমেশচন্দ্র।

“একজন শেষ আমার হাতেই। আরেকজন থাকবে বাসার ভেতরই৷ আমাকে বাঁচান‚ স্যার।”

“ওরা কয়জন তা কিন্তু আমরা জানি না‚ স্যার।” বলে উঠল রমেশচন্দ্রকে অন্য অফিসারটি‚ “এভাবে ফাঁকা জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকলে যে কোনো সময় গুলি খাবো নয়ত এক্সপ্লোশন হয়ে মরব। বেইসমেন্ট মনে হচ্ছে আপাতত সেইফ৷ অন্তত ব্যাকআপ টিম পাঠানোর জন্য কল করার সুযোগ দরকার আমাদের৷”

বিবেচনা করে রমেশচন্দ্র মেনে নিলো অফিসারের পরামর্শ। বেসমেন্টে এসে ঢুকল তারা৷ সামনে রাইফেল তাক করে ধরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো৷ সঙ্গে সঙ্গেই আলোকিত হয়ে উঠল অন্ধকার ঘরটা৷ চমকে উঠল তারা দুজন৷

জেনারেটর বন্ধ করে দিয়েছিল আইয়াজ। বন্দি অফিসারকে দিয়ে কথা বলানো শেষে তাকে একেবারে ঘুম পাড়িয়ে দেয় শেহরোজ। তারপরই শিফানকে জেনারেটর চালু করার নির্দেশ দিয়ে সে বেসমেন্টে এসে ঢোকে। পরমুহূর্তেই ইয়ারপিসে শুনতে পায় শিফানের মর্মাহত কণ্ঠ। শাজ‚ আইয়াজ‚ আয়েশা খাতুনের পরিণতি জানতেই মানসপটে এসে ভীড় করে শাজকে কাছে পাওয়ার শেষ মুহূর্তটি‚ আইয়াজের সঙ্গে শেষ কথোপকথন। ওই বৃদ্ধ মানুষটিও ছাড় পেলো না!

বসার ঘরে প্রবেশ করে রমেশচন্দ্র ডাকতে থাকল‚ “অনিমেষ?”

শেহরোজ রান্নাঘরে ক্যাবিনেটের আড়ালে বসে আছে৷ রমেশচন্দ্রের গলা শোনা মাত্রই অদমনীয় ক্রোধের অশ্রু ডান চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল তার৷ ঝুঁটিওয়ালা চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর এসে ঝুলছে কয়েকটি। ধারাল চোয়ালদ্বয় হয়ে উঠেছে আরও কঠিন৷ মাথাটা একটু তুলেই অভেদ্য নিশানায় পৌঁছে দিলো প্রতিশোধের প্রথম বুলেট। রমেশচন্দ্রের হাত থেকে খসে পড়ল AK-47। সঙ্গে থাকা অফিসারের রাইফেল গর্জন করার আগেই অবিশ্বাস্য সময়ের মাঝে শেহরোজ দ্বিতীয় গুলিতে রক্তিম টিপ পরিয়ে দিলো তার কপালের মাঝে।

রাইফেলটা তুলে নিলো রমেশচন্দ্র পুনরায়৷ শেহরোজ জায়গা বদলে নিতেই তার ছোঁড়া এক ঝাঁক বুলেট চৌচির করে দিলো ক্যাবিনেট৷ একটা বুলেট এসে লাগল শেহরোজের বুকের মাঝখানে। শক্তিশালী বুলেটের ধাক্কাটা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট সামলে নিলেও নিষ্ঠুর চাপ সৃষ্টি করল সেখানে—দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। একটু সময় নিয়ে কোনোরকমে সামলে উঠল সে। হাতে উঠিয়ে আনল স্টিলেটো। সেটা উড়িয়ে দিতেই রমেশচন্দ্রের গুলিবিদ্ধ কাঁধের মাঝে গিয়ে ঢুকল৷ যন্ত্রণায় তার হাতের রাইফেলটা পড়ে গেল তখন।

বুকটা চেপে ধরে শেহরোজ বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে৷ হাতে ধরা অ্যাসিডের স্প্রে বোতলটা৷ রাইফেলটা তুলে নিয়ে রমেশচন্দ্রের সামনে এসে দাঁড়াল সে৷ ওকে দেখামাত্রই ছটফটিয়ে উঠল রমেশচন্দ্র৷ পড়িমরি হয়ে সুস্থ হাতটা দিয়ে কাঁধের মাঝ থেকে স্টিলেটো টান দিয়ে বের করে আনার চেষ্টা করতেই শেহরোজ সেখানে অবিলম্বেই নিকৃষ্ট লাথিটা বসিয়ে দিলো। আরও গভীরে গিয়ে গাঁথল ছুরিটা। রমেশচন্দ্র গগনবিদারী চিৎকার করে উঠতেই তার সামনে অ্যাসিডের বোতলটা ধরে শেহরোজ শীতল গলায় বলল‚ “তোমার থেকে আমি কোনো উপকার পাবো কি? পাবো না তো।” বলেই ছুরিটা এক টানে বের করে আনল৷ তারপর তার আর্তনাদ বাড়িয়ে দিলো গুলিবিদ্ধ স্থানে অ্যাসিড ঢেলে।

প্রতিটি ব্যক্তিরই যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা থাকে একটি নির্দিষ্ট সময় অবধি৷ উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত র-এর ইনটেলিজেন্স অফিসার রমেশচন্দ্রের এই সহ্য ক্ষমতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ ছিল বটে৷ কিন্তু ওই নির্দিষ্ট মাত্রার ওপর যন্ত্রণা পৌঁছনো মাত্রই সে জ্ঞান হারাল৷ শেহরোজ জ্ঞান ফেরাল আবার। তার দু বাহুতে দুবার পুশ করে দিলো সোডিয়াম থায়োপেন্টাল আর ব্যথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দেওয়ার ওষুধ। যদিও ট্রুথ সিরাম দ্বারা সব সময়ই সত্য কথা আদায় করা যায় না। শেহরোজ স্রেফ আতঙ্ক তৈরি করতে রমেশচন্দ্রকে বলল‚ “তোমার লাইফটাইম পনেরো মিনিট থেকে সর্বোচ্চ বিশ মিনিট। এর অ্যান্টিডোট আমি দিতে রাজি হবো তখনই‚ যখন তুমি কনফেস করবে তোমার পরিচয়‚ তুমি কেন বাংলাদেশ প্রবেশ করেছ‚ ইন্ডিয়ার পিএম আর বাংলাদেশের পিএম-এর সকল গুপ্ত উদ্দেশ্য‚ তাদের স্বার্থ‚ তাদেরকে তোমার সহযোগিতা‚ সেসবের প্রমাণ‚ সব কিছু জানাবে৷ জানাতে শুরু করলেই আমি ঠিক বারো মিনিটের মাথায় অ্যান্টিডোট দেবো তোমাকে।”

মরতে রাজি তবু কথা বলতে রাজি নয় রমেশচন্দ্র৷ কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে ট্রুথ সিরামের ফলে তার মানসিক বাধার মাত্রা কমে গেল৷ মস্তিষ্কের ক্রিয়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় সে মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারল না। স্বাধীনভাবে কথা বলতে শুরু করল সে অনর্গল৷ যে কেউ শুনলে মনে করবে সে একজন পাগল। প্রয়োজনীয়‚ অপ্রয়োজনীয় নানা কথায় বেরিয়ে আসতে থাকল তার পেট থেকে। সেসব কথা ফুরোনোর নয়। শেহরোজ ভিডিয়ো রেকর্ড করতে থাকল ধৈর্যের সঙ্গে।
***

১৭ই এপ্রিল
ভারী হয়ে থাকা চোখের পাতা মেলতে কী ভীষণ কষ্ট হলো শাজের! মাথাটাও কেমন ভার ভার। চেপে ধরার জন্য ডান হাতটা তুলতে গিয়েই বাধা পেল‚ ব্যথাও পেল। কারণ‚ হাতের ভেইনে ক্যানুলা। আবিষ্কার করল নাকে নল আর মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ফকফকে সাদা আলোয় চোখদুটো সয়ে আসতেই কেউ ওর মাথায় আদরের পরশ বুলাল। মাথাটা একটু কাঁত করে দেখতে পেলো চাচাকে—কাঁদছেন তিনি৷ কেন কাঁদছেন? স্বভাবজাত ভ্রু কুঁচকে ফেলে তা জিজ্ঞেস করার জন্য অক্সিজেন মাস্কটা নামিয়ে দিলো। বাধা দিলো না খালিদ উসমানের পাশে দাঁড়ানো ডাক্তার। কারণ‚ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে শাজ। বিপদমুক্ত সে৷ কিন্তু কথা বলতে গিয়েও শাজের অনুভব হলো বেশ ব্যথা। গলার পাশটাই ক্ষত এখনো শুকায়নি।

শিফান আর রাশিদ সাহেব সেদিন দেরিতে হলেও ভাগ্যিস টের পেয়েছিল শাজের নাড়িস্পন্দন। উত্তেজনায় শেহরোজকে জানানোর কথা ভুলে যায় তারা৷ কারণ‚ ওই মুহূর্তে প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ ছিল শাজের জীবনের জন্য৷ যত দ্রুত সম্ভব ওরা হাসপাতাল নিয়ে আসে শাজকে। তারপর শেহরোজকে খবর জানায়। ঝুমা শেখকেও জানায়। শেহরোজ ছুটে আসতে পারেনি তখনই৷ ঝুমা শেখ পরিবার নিয়ে পাগলের মতো কান্নাকাটি করতে করতে এসে যখন পৌঁছল‚ তখনই ডাক্তার দুটো সংবাদ জানাল তাদের৷ প্রথম সংবাদ ছিল‚ বুলেটটা শাজের শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে৷ আর দ্বিতীয় সংবাদ ছিল‚ ব্রেন হ্যামোরেজের শিকার হয়েছে শাজ।

সাতটা দিন সে কোমাতে থেকে আজ চোখ মেলেছে। এই সাতদিনে দেশটাই ঘটে চলেছে অনেক কিছু৷ সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ বেইমান কর্মকর্তাদের মুখোশ ফাঁস হয়েছে‚ র এজেন্টদের পরিচয় উন্মোচন হয়েছে৷ ওমর ফারুককে গুম করে কোথায় নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং কারা করেছে আর কেন করেছে‚ সবটাই প্রতিটা খবরের চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে৷ আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার হচ্ছে ভারত সরকার আর বাংলাদেশ সরকারের সকল গোপন চুক্তি আর এ দেশটাকে নিয়ে করা সকল চক্রান্ত৷ ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছে সেনাবাহিনীর সৎ ও দেশ প্রেমিক সেনাদল। রমেশচন্দ্রের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে শেহরোজ প্রধানমন্ত্রী মহসিন খন্দকারকে খুব সহজেই কাবু করে নিয়েছিল। কিন্তু শিফানের কথাকে সত্য করে পদত্যাগ করতে নারাজ সে৷ পরিস্থিতি সামলানোর নানারকম পদক্ষেপ নিয়েও বারবার পরাস্ত হচ্ছে। তবুও হাল ছাড়ছে না৷ তাতে ছাত্র-জনতা এবং সকল বিরোধী দল আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে রাজপথে অবস্থান করছে। হয়তোবা খুব শীঘ্রই নয়তো সামান্য দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রীর গণভবন ঘেরাও করার সিদ্ধান্তে নামবে তারা।

রাত ১১:৩৫
শাজের ঘুম ভাঙল হঠাৎ। অন্ধকার কেবিনে সে আর ঝুমা আন্টির থাকার কথা৷ কিন্তু ঝুমা আন্টি কি ওর বালিশে মাথা রেখে ঘুমাবে? ওর মাথায় আর কপালে বারবার ঠোঁট ছোঁয়াবে? ভাবতে ভাবতেই ঠোঁটদুটি ওর গালে এসে ঠেকল৷ অনুভব করল দাড়ি-গোঁফের খোঁচা। তবে কি কাকু? কিন্তু কাকু তো কখনো এভাবে আদর করে না ওকে। “কে?” ভাঙা গলায় বলে উঠল শাজ। জবাব এলো না কিছুক্ষণ।

শাজের স্মৃতিতে গত সাত দিন আগের সেই রাতটার সকল ঘটনা আপাতত মুছে গিয়েছে। তা ফিরবে ধীরে ধীরে। কিন্তু ওই রাতের সাথে সংযুক্ত এমন কিছু হঠাৎ করে দেখলে বা শুনলে ঝাপসা স্মৃতিগুলো মনে পড়বে দ্রুত। এবং তাতে প্যানিক হয়ে পড়বে সে। এ কারণেই শেহরোজ ওর মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছিল। তাই ও ঘুমিয়ে গেলেই সে কাছে আসলো। কিন্তু শাজের কণ্ঠ শুনে নিজেকে ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে গেল তার। শাজের গালের সঙ্গে ঠোঁটটা আলতো মিশিয়ে রেখেই আবৃত্তি করে উঠল গাঢ় স্বরে‚

“কত ঝরে ফুল‚ কত খসে তারা‚
কত সে পাষাণে শুকায় ফোয়ারা‚
কত নদী হয় আধ – পথে হারা‚
তেমনই এ স্মৃতি লোপ পাক।
অপরাধ শুধু মনে থাক!”

চকিতেই চোখটা বুজে ফেলল শাজ। একটা ঝাপসা মুখ পরিষ্কার হতে থাকল ওর কল্পনায়। ঘন দাড়ি-গোঁফ‚ দুর্ভেদ্য‚ পাথুরে চাউনির কালো দুটি চোখ‚ দুষ্টু দুষ্টু মুচকি হাসি আর ভরাট কণ্ঠের কিছু শায়েরী আনাগোনা করতে থাকল স্মৃতিতে। সে মুহূর্তে শেহরোজ ফিসফিসিয়ে বলল‚ “খু্ব করে চেয়েছিলাম আমার মরণ যেন এ দেশের মাটিতেই হয়। কিন্তু তুমি ফিরলে আর আমি সিজদাহে লুটিয়ে পড়লাম। তুমি ফিরলে‚ আমি আরও বহুদিন বাঁচার ফরিয়াদ করলাম। তুমি আমার বিদায়ের আকুতি জানিয়েছিলে! আমি শূন্য বুকে ফেরার পণ করলাম।”

শাজের গালে শেষবারের মতো গভীরভাবে ঠোঁট ডোবাল সে। ওর পাশ থেকে মাথাটা তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল তারপর। আঁধারের অদৃশ্য আলোয় অপলক তাকিয়ে দেখল কতক্ষণ শাজকে। কেবিনের দরজায় খালিদ উসমান এসে দাঁড়ালেন। তার উপস্থিতি টের পেয়ে নিজেকে সামলে নিলো শেহরোজ। বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।

শেহরোজ প্রস্থান করতেই চোখ মেলে চাইলো শাজ। শেহরোজের প্রতিটা কথা ওকে কিছু একটা মনে করানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না তা মনে করতে। কেবল বিড়বিড়িয়ে উঠল‚ “শেহরোজ!”
***

পরিশিষ্টঃ
“টানা তৃতীয়বার ক্র্যাব মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড পেলো আমাদের মোস্ট এলিজিবল ক্রাইম রিপোর্টার শাজ ইরশানা। লেটস চিয়ার্স!”

এক ঝাঁক তরুণ-তরুণীর কণ্ঠে সমস্বরে কোলাহলপূর্ণ স্ফূ্তি। বিয়ারের গ্লাসে সবাই ঠোকাঠুকি করে চুমুক দিলো একত্রে। যাকে ঘিরে তাদের আনন্দ উদযাপন, সে নীরবে ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে আর তাদের হই-হুল্লোড় উপভোগ করছে৷

জারিন এক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে এগিয়ে এলো ‘সাহসী’ উপাধিপ্রাপ্ত শাজের কাছে৷ ওর কাঁধ মৃদুভাবে জড়িয়ে ধরে বলল সবার উদ্দেশ্যে, “আমরা সবাই একই সঙ্গে কাজে ঢুকেছিলাম। তিন বছরে আমাদের ব্যর্থতার কাহিনি অনেক৷ কিন্তু দেখো, শাজের বেলায় তা বিপরীত। ওর জীবনে শুধু সফলতারই গল্প, তাই না?”

“হ্যাঁ”‚ সমর্থন জানাল সবাই৷

“ওর মতো আর হতে পারছি না আমরা”‚ বলল জোভান।

“তোমরা এক্সট্রাঅর্ডিনারি বানিয়ে দিচ্ছ আমাকে।” বিরোধ করল শাজ, “আমার জীবনেও ব্যর্থতার গল্প আছে। যে গল্প আমার চাকরিজীবনের সমস্ত সফলতাকেও হার মানিয়ে দেয়।” স্মিত হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকল ওর। তা লক্ষ করে সবাই থমকাল একটুখানি।

“শাজ, কী এমন গল্প সেটা?” বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলো জারিন‚ “যা তোমার এত এত সাফল্যকেও হার মানিয়ে দেয়?”

“আমার ভার্সিটির সব থেকে অন্যরকম আর সুন্দর ছেলেটার গল্প।” অপরাধীর মতো মাথাটা নুইয়ে স্বীকারোক্তি দিলো শাজ, “যাকে আমি আমার মননে, আমার জীবনে সব সময় কামনা করতাম। অথচ ভার্সিটি থেকে আজীবন বহিস্কার হতে হলো তাকে আমারই ভুল সাক্ষীর কারণে৷ আমিও তাকে হারিয়ে ফেললাম তখন চিরকালের জন্য।” বলতে বলতে কেঁপে উঠল ওর কণ্ঠস্বর।

“কে সে?” সমস্বরে জিজ্ঞেস করল সবাই।

আকাশপানে মুখটা তুলে চোখদুটো বুজল শাজ৷ “শেহরোজ। আমার ঝুঁটিয়াল”‚ জবাব দিলো মৃদুস্বরে।

“আচ্ছা সেই ঝুঁটিয়াল ছেলেটা? বলে উঠল জোভান‚ “তিন বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানের সকল পরিকল্পনার উৎস ছিল নাকি এমনই ঝুঁটিয়াল এক ছেলে? সব সময় ঝুঁটি বেঁধে থাকত‚ বডি স্ট্রাকচার ছিল হিরোদের মতো৷ আর তোমার সঙ্গে নাকি পরিচয় ছিল। তার একটা ছবি খুঁজছি আমি। আজকে তো প্রোগ্রামে তাকে নিয়েই আলোচনা করছিলাম। ভাবছিলাম তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব তোমার কাছে।”

হ্যাঁ‚ শাজ সে আলোচনা শুনতে পেয়েই প্রস্তুত করে নিয়েছে ঠিক কী গল্প বলে শেহরোজের ব্যাপারটাকে পাশ কাটানো যায়। এবং শেহরোজের পরিচয়ও আড়াল করা যায়৷ তিন বছর ধরে বহু সাংবাদিকই শেহরোজের ব্যাপারে তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই নক্ষত্রনিবাসে সেই কালরাত্রি আর গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে অসংখ্যবার শেহরোজের নাম উঠে এসেছে৷ কিন্তু কারও কাছে তার কোনো ছবি মেলেনি আর না কোনো সঠিক তথ্য।

আজ ওরই কলিগদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে তা জানত ও৷ তাই পিয়ালের বন্ধুই বানিয়ে শেহরোজকে নিয়ে সত্য-মিথ্যার একটা গল্প শোনাতে থাকল ৷ হঠাৎ কেন শেহরোজ উধাও হয়ে গেল‚ এ প্রশ্নটার জন্যই ভার্সিটি থেকে বহিস্কারের মিথ্যা গল্পটা ফাঁদল সে। কেউ বিশ্বাস করল‚ কেউ করল না৷ কিন্তু শাজ দায়মুক্ত হলো। পরবর্তীতে আর কখনো ওর কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে আসবে না এ ব্যাপারে।

পার্টি শেষ হলো রাত এগারোটাই৷ সকলে বিদায় নিলে শাজ সারা বাড়িতে হয়ে পড়ল নিঃসঙ্গ।

কোমা থেকে ফিরে সুস্থ হওয়ার পর যখন ধীরে ধীরে সব কিছু মনে পড়ে ওর‚ তখন সে আমেরিকাতে চাচার কাছে৷ দীর্ঘদিনের চিকিৎসা‚ সাইকোথেরাপি শেষে খালিদ উসমান ওকে আর কাছে রাখতে পারেননি৷ ফিরে আসে ও এই নক্ষত্রনিবাসেই। দাদীর মৃত্যু‚ ভাইয়ের মৃত্যু আর পরিশেষে শেহরোজের প্রস্থান‚ সবকিছুর যন্ত্রণা ও নিজে নিজেই সামলে উঠতে চেষ্টা করে৷ ঝুমা আন্টি সেই আগের মতোই আছে৷ প্রায় প্রতিদিনই ছুটে আসে ওর কাছে৷ থেকে যায় যতদিন ইচ্ছা। ওরও আর আগের মতো শ্বাসকষ্ট হয় না‚ আগের মতো কোনো কিছুতে ভয় পায় না‚ অচেতন হয় না। কেবল যখন মনে পড়ে ভাইটা ওর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল সেদিন৷ কিন্তু সে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়নি। আর আজ সুযোগ দিলেও সেই ভাইটাই আর নেই। তখনই বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে গলা থেকে৷ স্বার্থপর‚ পর মানুষ বলেছিল ওই ভাইটাকে। সেই স্বার্থপর ভাই-ই ওর সামনে ঢাল হয়ে ওকে সেদিন বাঁচায় আর নিজে ফুরিয়ে যায়।

না‚ আর মনে করতে চাইলো না সেদিনের কথা৷ বাবার কথাও মনে করতে চাইলো না৷ লিভিংরুম পরিষ্কারের বাহানায় নিজেকে ব্যস্ত করে তুলল। এর মাঝেই আচমকা কলিংবেল বেজে উঠল। বিরক্ত হলো শাজ‚ “আবার কে এলো?”

পিপহোলে গেটের দারোয়ানকে দেখতে পেয়ে দরজাটা খুলল। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দারোয়ান ধরিয়ে দিলো দুটে ফাইটার ফিশের অ্যাকোয়ারিয়াম। অ্যাকোয়ারিয়ামের গায়ে লাগানো একটি চিরকুট৷ দারোয়ান জানাল‚ “এক ব্যাডা আইসা জোর কইরা আমার হাতে ধরায় দিলো‚ আফা।”

তিন বছর আগের স্মৃতি সহসা ধাক্কা দিলো শাজকে৷ অ্যাকোয়ারিয়ামটার দিকে কতক্ষণ চেয়ে থেকে সেটা নামিয়ে রাখল নিচে৷ দ্রুত চিরকুটটা খুলল‚ “হোয়াই আর ইউ নট গেটিং ম্যারিড? আর ইউ ওয়েটিং ফর আ পার্সিয়ান বয়?”

“কে দিয়েছে এটা?” চিরকুটটা পড়েই চঞ্চল হয়ে পড়ল শাজ।

“ব্যাডারে চিনিনে।” জানাল দারোয়ান‚ “হুন্ডা নিয়া আইছিল।”

“চলে গেছে?”

“তাও কইতে পাইন্না‚ আফা। এতুক্ষুণি তো চইলা যাওনের কথা।”

শেষ কথাটা শোনার জন্য দাঁড়ালই না শাজ৷ ছুটে বেরিয়ে এলো সে বাড়ির গেটের বাইরে৷ ডানে-বামে ব্যাকুল হয়ে খুঁজতে থাকল ব্যক্তিটিকে। কিন্তু কোথাও দেখা গেল না। যতটা উৎকণ্ঠা আর আনন্দ নিয়ে ছুটে এসেছিল‚ ততটাই বিষণ্ন হয়ে পড়ল শাজ৷ ঠোঁট চেপে কান্নাটুকু আটকাতে চাইলো আর মনে করল‚ সে-ই তো চলে যেতে বলেছিল ওই মানুষটিকে। তাহলে কেন আজও আশা করে তার ফেরার?

চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না আর৷ নীরবে কাঁদতে কাঁদতে ফেরার জন্য দু কদম এগোতেই হঠাৎ বিশ্রী এক আওয়াজ তুলে একটা বাইক এসে দাঁড়াল গেটের সামনে। বুকটা কেঁপে উঠল শাজের তখনই। দাঁড়িয়ে থেকেই ঘাড়টা ফেরাল পেছনে। কালো লেদার জ্যাকেট পরনে এক যুবক বসে আছে কালো বাইকে। হেলমেটটা মাথা থেকে খুলল সে। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলটে আলোয় দেখতে পেলো শাজ ঢেউ খেলানো বাদামী চুল‚ পান্না সবুজ দুটি চোখ‚ গৌর বর্ণের কঠিন চোয়ালের মুখ‚ খোঁচা দাড়ি আর পাতলা একজোড়া ঠোঁট।

“আর ইউ ওয়েটিং ফর আ পার্সিয়ান বয়?” বলিষ্ঠ‚ ভরাট কণ্ঠে হঠাৎ বলে উঠল যুবকটি।

বিস্ময়বিহ্বল শাজ ড্যাবডেবিয়ে শুধু দেখতে থাকল যুবকটিকে৷ তিন বছর পূর্বের সেই যুবকের সাথে বিস্তর ফারাক। ঝুঁটি কোথায়‚ ঘন সেই দাড়ি-গোঁফ কোথায়? আনমনেই জিজ্ঞেস করে বসল‚ “শেহরোজ আহমাদ?”

“শেহরোজ শায়েগান।” মুচকি হেসে বলল শেহরোজ‚ “ফ্রম তেহরান। ব্রাইড খুঁজতে বাংলাদেশ এসেছি।”

“ব্রাইড?” সম্মোহিতার মতো আওড়াল শাজ। এখনো ওর বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুই।

“ব্রাইড। খালিদ উসমান বললেন নক্ষত্রনিবাস এলেই আমার ব্রাইডের সন্ধান পাবো।”

“কোথায়?”

গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে তর্জনী আঙুল তুলে শেহরোজ ইশারা করল শাজের দিকেই। চোখদুটো বুজেই বুকের বাঁ পাশ চেপে ধরল শাজ।

(সমাপ্ত)