“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ২৫
(নূর নাফিসা)
.
.
কয়েকবার কল করেছে ইফতেখার। লাইনে পায়নি শ্রাবণকে। ফোন বন্ধই দেখাচ্ছে বারবার। নিজের কাছেই কারণ তুলে ধরে, ফোনে সমস্যা। বন্ধ থেকতেই পারে। কিন্তু দুশ্চিন্তা কি কমে আসে তাতে? যদি কোনো বিপদ হয়েই থাকে! এতোটা সময় ধরে সে কোথায় আছে? একবার কি মজিদা কাকির কাছেই খোঁজ করে আসবে? দুদিন পরপরই ওবাড়ি গিয়ে এই বাড়ির বউয়ের খোঁজ করাটাইবা কেমন হবে! আরেকটু অপেক্ষা করতে চায় ইফতেখার। তবে খুব বেশি অপেক্ষায় তাকে রাখেনি শ্রাবণ। আজও মাগরিবের সময়েই বাড়ি পৌঁছাতে পেরেছে। দালানে থেকে তাকে দেখে দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসে ইফতেখার৷ বারান্দায় পা দিতে না দিতেই পিছু জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় ছিলে সারাদিন?”
পিছু ফিরে ক্লান্ত মুখে তাকিয়ে শ্রাবণ জবাব দেয়,
“খালাম্মার কাছে গিয়েছিলাম একটু।”
“একটু? সারাদিন পার করে এসে তুমি একটু বলছো? দুদিন পরপরই খালাম্মার কাছে তোমার কি? বলে গেছো কারো কাছে?”
শ্রাবণের জবাব মৃদুস্বরে হলেও তার জিজ্ঞাসার গলা হয়েছে মোটামুটি উচ্চ। এতোটা উঁচু গলায় এর আগে কখনোই কথা বলেনি শ্রাবণের সাথে। শ্রাবণ বুঝতে পারছে, তার উপর রেগেছে জনাব। তাই দৃষ্টিটা তার থেকে নামিয়ে নিলো মৌনতায়। জবাবের প্রত্যাশায় কিঞ্চিৎ বিরতি নিয়ে ইফতেখার একই গলায় আবার বলে,
“আর একদিনও তুমি বাড়ি থেকে বের হবে না। কোনো প্রয়োজনেও না।”
নামিয়ে নেওয়া দৃষ্টি পুনরায় তুলে আনে শ্রাবণ। অপ্রত্যাশিত নিষেধাজ্ঞার কারণে সূক্ষ্ম একটা মুহুর্ত তাকিয়ে থাকে ইফতেখারের মুখে। চোখে, চেহারায় বিরক্তির রগরগে অবস্থা তার। শ্রাবণ কোনোরকম কিছু না বলে মলিন মুখে চুপচাপ ঘরে চলে যায়। ইফতেখার হনহন পায়ে বাড়ির বাইরে চলে যায় রাগ নিরাময় করতে ও নামাজ আদায়ে মসজিদের কাতারে শামিল হতে। হাতমুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয় শ্রাবণ। ওযুটাও সেরে আসে নামাজের জন্য। পারভীনের সামনে পড়লেও পারভীন কিছুই বলেনি তাকে। ছেলে বলেছে, তা শুনেছে। অতিরিক্ত বলার প্রয়োজন মনে করেনি। কটাক্ষ দৃষ্টিতে নিন্দা প্রকাশ করে গেলো যেন শুধু। শ্রাবণ তার থেকেও চোখ সরিয়ে নিয়েছে হতাশিত নিশ্বাসের সাথে। হবেই না কেন, নীতি লঙ্ঘন যেহেতু করেছে রাগ করার অধিকারও আছে তাদের। নামাজ আদায়ের পর চুপ করে বসে থাকে বিছানার এক কোণে। অর্পা পড়ছে। পরী বাইরে থেকে কাপড়চোপড় এনে গুছিয়ে রাখছে। তাদের কানেও এসেছে ইফতেখারের শাসন কথা। পরী আড়চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সংসার রাইখ্যা এতোক্ষণ বাইরে থাকে বেডি মানুষ? ভাইজানের রাগ তো হইবোই। আমি আপনারে ওইবাড়ি গিয়া একবার খুইজ্জা আইছি। পাই নাই।”
শ্রাবণ তার দিকে এক পলক তাকিয়ে একই অবস্থায় বসে থাকে মলিনতা পুষে। বাইরের মলিনতাটা উপস্থিতদের নজরে পড়লেও ভেতরে ভেতরে প্রকৃত মলিন ও চিন্তিত রূপটা শুধুমাত্র শ্রাবণই প্রত্যক্ষতা করে যাচ্ছে। ক্লান্তও লাগছে শরীর। একটু ঘুমাতে পারলে হয়তো ভালো লাগতো। তবুও ঘুমায় না সে। এমনিতেই সারাদিন ছিল না বাড়ি, এই সময়ের ঘুম না আরও বিরক্ত করে তোলে আশপাশকে!
ইশারের নামাজের পরই বাবা ও ছেলেরা একত্রে বাড়ি ফিরেছে। ইফতেখার এসেই অর্পার ঘরের সামনে দিয়ে শ্রাবণকে দেখে যায়। মলিন মুখ নজরে পড়ে সুস্পষ্ট। তাই বলে সে যে ভুল কিছু করেছে, এমনটা একদমই ভাবে না। মন মলিন হলেও শাসন করাটা যথার্থ ও জরুরী ছিল ইফতেখারের মতে। নিজের ঘরে চলে যায় চলতি পায়েই। বিপু চলে গেছে মায়ের কাছে, ভাত চাইতে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আছে সে-ও। আজ কান্তাকে পরীক্ষা দিতে যেতে ও আসতে দেখেনি। কিছু হয়েছে কি না আবার, সেই দুশ্চিন্তা ঘিরে রেখেছে তাকে। মোড়ায় বসে রান্নাঘরেই খাওয়া সারতে চায় সে৷ ওদিকে একটু পরই নিজের ঘর থেকে পরীকে ডাকে ইফতেখার। পরী হাজির হতেই জিজ্ঞেস করে,
“রান্নাবান্না হয়েছে?”
“রান্নাবান্না তো সেই কখনই হইছে। আপনারে ভাত দিমু কি না, হেইডা কন। বিপু ভাইজান থালা পাইত্তা বইসাও পড়ছে।”
“তোর ভাবি ভাত খেয়েছে?”
“না, কেউই খায় নাই। হোপ কইরা বইসা রইছে আপার ঘরে।”
“গিয়ে বল, আমি ডাকছি।”
“মানাইবেনই যহন, কেল্লাই অযথা ঝাড়ি টাড়ি দিলেন!”
বেশি কথায় বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায় ইফতেখার। তাতেই পরী হনহন পায়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে বলে,
“যাইতাছি।”
পরীর ডাকবার্তায় শ্রাবণ এসে হাজির হয় এই ঘরে। দরজার কাছে থেকেই জিজ্ঞেস করে,
“ডেকেছেন?”
মালামালের ম্যামো দেখায় বিরতি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মলিন মুখের দিকে তাকায় ইফতেখার। তার দৃষ্টি এড়াতে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে শ্রাবণ। ইফতেখার জানে, সে-ই এই মন খারাপের কারণ। পুনরায় কাজে মনযোগ দিয়ে বলে,
“খেতে দাও।”
চুপচাপ চলে যায় শ্রাবণ। রান্নাঘরে বিপু খাচ্ছে, পারভীন চায়ের পানি বসাচ্ছেন চুলায়। ঘুমানোর আগে এক কাপ চা খাবেন আফজাল হোসেন। শ্রাবণ এসে চুপচাপ ভাত নিয়ে গেলো ইফতেখারের জন্য। ইফতেখার ম্যামো যত্নে তুলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করে,
“তোমার প্লেট কোথায়?”
“আপনি খান।”
“প্লেট নিয়ে এসো।”
“আমি এখন খাবো না।”
“কেন?”
পিছু ফিরে মনযোগে তাকায় ইফতেখার। শ্রাবণ এক পলক তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে বলে,
“আব্বাকে খাবার দিবো।”
“পরী দিবে। প্লেট নিয়ে এসো।”
শ্রাবণ চুপচাপ চলে যায়। অল্প খাবার নিয়ে হাজির হয়েছে ইফতেখারের সামনে। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে ইফতেখার চুপচাপ থাকলেও পরক্ষণে ধীরেসুস্থে বুঝাতে ব্যস্ত হয়,
“এমনিতেই আমাদের সাথে ওবাড়ির মিল নেই। তারপরও তুমি যাওয়া আসা করো অনবরত। মানলাম আত্মীয়, তাই যাও। যাওয়ারও তো একটা লিমিট আছে। সারাদিনের জন্য বসে থাকার কোনো মানে হয়?”
এই মানের কোনো জবাব দেয় না শ্রাবণ। কানে কথা গেলেও খাওয়ায় এক পাক্ষিক মনযোগ পেতে বসেছে সে। কোন খালাম্মার কাছে যে গেছে, তা তো স্পষ্ট করেনি তাকে। ইফতেখার আরও বলে,
“মা-ও পছন্দ করে না বাড়ির বউ কারণে অকারণে যখন তখন বাইরে যাওয়াটা। প্রয়োজন হলে যাবে স্বাভাবিক, ফিরবেও তো তেমন সময় নিয়েই। বিকেলে বাড়ি এসেই শুনি সারাদিনে তোমার খোঁজ নেই। তোমার ফোন বন্ধ। কত টেনশন হচ্ছিল, জানো? কম হলেও বিশটা কল করেছি এতোক্ষণে। আর তুমি গিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছো তোমার খালাম্মার কাছে।”
কোনোরকম প্রতিক্রিয়া আসে না শ্রাবণের মুখে। ইফতেখারও কথা থামিয়ে খেতে থাকে। বেশি বললে না আরও মন খারাপ করে বসে! শ্রাবণ নিজের প্লেট নিয়ে চলে যায়। পুনরায় আসে ইফতেখারের প্লেট নিতে। চলে যাওয়ার সময় ইফতেখার বলে,
“মন খারাপ করো না। টেনশন হচ্ছিল, তাই রেগে গেছি। এমন কাজও আর করো না।”
প্রতিক্রিয়াহীন শ্রাবণ চলে গেছে। অর্পার ঘরে গিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে কিছু নেয়। পুনরায় আসে এই ঘরে। ইফতেখার মশারি নিচ্ছে টানিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। শ্রাবণ এলেই ঘুরে দাঁড়ায়। প্যাকেটটা এগিয়ে দেয় শ্রাবণ।
“এটা আপনার জন্য কিনেছিলাম”
“কি এটা?”
বলতে বলতে হাতে নেয় ইফতেখার। প্যাকেট খুলে দেখে হাত ঘড়ি। ঠোঁট কার্ণিশে হাসি এলিয়ে বলে,
“এটা আবার কিনতে গেলে কেন!”
“এমনি, পরতেন। দেখে ভালো লাগলো, তাই ভাবলাম কিনে নেই।”
“তোমার জিনিস কিনেছো তুমি? টাকায় শর্ট পড়েনি?”
“হয়ে গেছে মিলেঝিলে।”
শেষ বাক্যের আগেই ঢেকুর তুলতে তুলতে বিপু এসে হাজির হয়েছে ঘরে। ইফতেখারের হাতের প্যাকেট টেনে নিয়ে বলে,
“কি এটা? ঘড়ি! সুন্দরই তো।”
বলতে বলতে প্যাকেট ছাড়িয়ে নিজ হাতে পরতে যায়।
“ভাবি গিফট করলো নাকি?”
বলে সারতে পারেনি। শ্রাবণ তার হাত থেকে হুট করেই নিয়ে নিয়েছে। ইফতেখারের দিকে আরেক কদম এগিয়ে হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বিপুকে বলে,
“যার ঘড়ি, সে-ই তো পরে দেখলো না কেমন যে দেখায়। আপনার এতো তাড়া কেন!”
“বাপরে! নিয়ে যাইনি তো আর। আপনাদেরটা আপনাদেরই আছে।”
কথা শুনে মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে শ্রাবণ। ইফতেখার তার হাতের দিকেও দেখে, মুখের হাসিটুকুও দেখে। একরাশ ভালো লাগায় মন ছেয়ে যায়। বিপু ব্যথিত ভণিতায় বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসতে বসতে বলে,
“আমাকেও আপনার মনে রাখার দরকার ছিল। দেবর হিসেবে আমিও তো পাওনা। নাহয়, ঘটক হিসেবেই একটা গিফট করতেন।”
শেষ বাক্যে নিশ্বাসে হাসির বেগ ভাসিয়ে তুলে শ্রাবণ। ইফতেখারের হাত ধরে রেখেই তার দিকে ফিরে প্রত্যুত্তরে বলে,
“ইনশাআল্লাহ, দিবো কখনো। যখন কিছু আয়ের ব্যবস্থা হবে, কারো জন্য কিনতেই কার্পণ্য করবো না তখন।”
“আশায় আশায় বসে থাকলাম।”
আশার বানী শুনিয়ে চিৎ হয়ে বিছানায় ঢলে পড়ে বিপু। শ্রাবণ ইফতেখারের চোখে তাকিয়ে বলে,
“ভালো লাগেনি?”
মৃদু হেসে ইফতেখার হাতের দিকে একবার তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে প্রশংসা ব্যক্ত করে,
“সুন্দর হয়েছে। তোমার পছন্দ তোমার মতোই সুন্দর।”
“আপনার মতো হতে পারে সুন্দর। আমি তো সুন্দরী।”
হাত ছেড়ে দিয়ে মৃদুস্বরে হাসতে হাসতে চলে যায় শ্রাবণ। ওদিকে শ্রাবণের কথায় হাহা করে হেসে উঠেছে বিপু। ইফতেখারও হেসেছে, তবে ঠোঁট প্রাঙ্গণেই তা শব্দহীন বিস্তৃত।
পরবর্তী সকালেও বিপু বাজারে বসে থাকে কান্তার কলেজের সময় হলে। দেখা মিলেই না। দুশ্চিন্তা বাড়ে তার। তাদের বাড়ির সামনে রাস্তায় থেকেও একটু উঁকিঝুঁকি দেয় বাড়ির ভেতরে। উঠুনে শিরিনকে কাপড়চোপড় মেলে দিতে দেখা গেছে। কান্তার ছায়াও নজরে ধরা দেয়নি। বাড়ি এসেই পরীকে পায় মিস্ত্রির সাথে কিছু নিয়ে তর্কবিতর্কে। গেইটের কাছাকাছি থেকেই থেমে সেদিকে ডাকে তাকে। পরী তর্ক থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ডাকেন ক্যা?”
“শুনে যা।”
হনহন পায়ে এগিয়ে আসে পরী।
“কি?”
“একটু সত্তর কাকার বাড়ি যা তো।”
“আমি কারো বাড়ি টাড়ি যাইতে পারতাম না। পাও দুইট্টা আমার এমনেই ব্যাথা করতাছে।”
বিপু বিশ টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দেয়।
“পা ব্যাথা হইলে ওষুধ খাইছ। এখন যা বলি, তা কর।”
মুখের বিরক্তি কাটিয়ে পরী টাকা পেয়ে মুখ টিপে হাসে। মুঠোয় টাকা রেখে বলে,
“হের বাড়ি গিয়া আমি করমু?”
“চুপচাপ যাবি। কেউ জিজ্ঞেস করলে কিছু বলবি না। মানে, আমি পাঠাইছি তা একদমই বলবি না। মানে, এমনি যাবি।”
“এতো মানে মানে করতাছেন ক্যা? গিয়া কি করতাম, হেইডা কন।”
“গিয়ে দেখবি কান্তা বাড়ি আছে কি না।”
“থাকলে?”
“এমনি দেখে আসবি, বাড়ি আছে কি না। ভালো আছে কি না।”
“ক্যা, ভালা থাকুক আর না থাকুক। হেইডা দেইখ্যা আমার কি কাজ? আমি কি ডাক্তার?”
“তোর কাজ নাই, আমার আছে। শুধু দেখে চলে আসবি।”
“কি…ই! হের খবর আপনার কি দরকার!”
“দরকার আছে। যা বলছি, তা কর।”
পরী আন্দাজ করতে পেরেই গেইটের দিকে না গিয়ে সাথে সাথেই পা বাড়িয়েছে ঘরের দিকে। শুধু তা-ই নয়, দ্রুত পায়ে যেতে যেতে উঠুন থেকেই গলা ছেড়েছে,
“আম্মা গো…”
বিপু বিস্ময়ের চূড়ায়! ধড়ফড়িয়ে উঠে বুকের ভেতর। শঙ্কিত গলায় ঝটপট পিছু ডাকে,
“এই পরী!”
কে শুনে কার কথা! পরীর এখন পা নয়, আম্মাকে পাওয়ার মর্মব্যাথা!
❌কেউ কপি করবেন না❌
“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ২৬
(নূর নাফিসা)
.
.
এই কূলেও নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে পরী। তুরন্ত ছুটে এসে পারভীনের কাছে ফড়ফড় করে বলে দিয়েছে বিপু তাকে কান্তার খবর আনতে বলেছে। কান্তার জন্য নাকি পাগল হয়ে যাচ্ছে। একটু হলেই তো আরেকটু গুছানো পরীর কাজ! সম্পূর্ণ ব্যাপার বুঝে নিতেও পারভীনের হয় না কোনো সমস্যা। ব্যাস! এই দুপুরে মায়ের এক ফালি বকাতেই পেট ভরে গেছে বিপুর। চোখ গরম, মাথা গরম রেখে ইচ্ছেমতো ছেলেকে শাসাল পারভীন। রাগে যেন গা শিরশির করছে তার। এমনিতেই এক ছেলে বউ নিয়ে হাজির হয়েছে, বউয়ের প্রতি মমতা আনতে চেয়েও পেরে উঠেনি। অন্য ছেলে এখন প্রেমের গীত শোনায়! তাও আবার অপছন্দের পরিবারের সম্পর্কে! শ্রাবণ কিছুটা দূরত্বে থেকে তাদেরকে শুনেও চুপই রইল। কাপড়চোপড় নিয়ে ধীর পায়ে চলে গেল গোসলে।
আফজাল হোসেন যোহরের নামাজ পড়ে মেম্বারের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এসেছেন। মেম্বার বিদায় নিয়ে চলে গেছে গেইটের ওপার থেকেই। আফজাল হোসেন ঘরে এসে বসে পরীকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
“তোর আম্মা কই?”
“কে, কাকা?”
“ভাত দিতে বল।”
“বসেন, আমি আনতাছি। আম্মায় ডাব পারাইতাছে বকুল কাকারে গাছে তুইলা।”
অর্পার ঘরে থেকেই গলা শুনেছে শ্রাবণ। আধ ভেজা চুলে চিরুনি চালিয়ে যাচ্ছিল সে। মুচকি হেসে চিরুনিটা রেখে মাথায় আঁচল তুলে বেরিয়ে আসে। রান্নাঘরে এসে দেখে পরী প্লেট ধুয়ে নিচ্ছে। জানালার ওপাশে দেখা যায় গোয়াল ঘরের কাছে পারভীন দাঁড়িয়ে ডাব পারিয়ে নিচ্ছে বকুল কাকাকে দিয়ে। শ্রাবণ পরীকে জিজ্ঞেস করে,
“কি করছো, পরী?”
পরী ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে গাল ভরে হেসে বলে,
“আপনারে যা সুন্দর লাগতাছে ভাবি! বুঝাইতে পারতাম না। কেল্লাই আপনে এত্তো সুন্দর হইলেন!”
“হয়েছে, এতোবার বললে নজর লেগে যেতে পারে।”
“লাগতেও পারে, কওন যায় না। তারপরও মনডা কয় খালি দেখতেই থাকি! বিয়ার দিনও আপনে এম্নে বাড়ি আসেন নাই।”
“তোমরা আনলে না আসতাম।”
“জানাইলে তো ঠিকই যাইতাম দৌড়াইয়া শাড়ি গয়না লইয়া।”
“তো যাও। বিপু ভাইয়ের বউটা দৌড়ে দৌড়ে নিয়ে আসো।”
বলতে বলতে হাতের প্লেট টেনে নেয় শ্রাবণ। পরী বলে,
“আরে, এইডা কাকার প্লেট। ভাত দিতে কইল।”
“আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
“যাইবেন? তো যান। কিন্তু মাথা নষ্ট আমার একদম হয় নাই ছোট ভাইজানের বউয়ের জন্যে দৌড় দিতাম।”
শ্রাবণ নিজ হাতে খাবার গুছিয়ে নিতে নিতে বলে,
“কেন?”
“ক্যা আবার! আম্মায় যাইবো কান্তাবানুরে আনতে! মাথা নষ্ট!”
“মাথা কেন এতো নষ্ট তোমাদের? কান্তা কি খারাপ?”
“ভালা খারাপ বুঝি না। তবে এই বাড়ি, ওই বাড়ির সম্পর্ক দাও আর কুমড়া।”
শ্রাবণ মৃদু হেসে বলে,
“দা আর কুমড়ার সম্পর্ক কিন্তু সবসময় শত্রুতূল্য হয় না। অন্যদিকে ভাবলে বন্ধুসুলভ কিছুই দেখতে পাবে। কুমড়া তো আর গিলে নেওয়া যাবে না। গিলতে হলে দায়ের প্রয়োজন ঠিকই অনুভব করতে হবে।”
“তা যা-ই কন না ক্যা। চেয়ারম্যানরে তাগো প্রয়োজন হইতে পারে, ভাবি। চেয়ারম্যানের কিন্তু তাগোরে প্রয়োজন নাই। ওই মনে করেন চেয়ারম্যানই দাও। কুমড়া কাটতে না গেলেও তার সমস্যা নাই। বরং কুমড়াই উল্টা পইচ্চা যাইবো।”
“কাটাকাটি না করলে দায়েও মরিচা ধরে যাবে রে পাগলী। তাই বড়াই করাটা দুই পক্ষেরই মন্দা ডেকে আনবে। সেজন্য উভয়েরই একটু ছাড় দিয়ে চলা উচিত।”
“জানি না এতো কথা। যার যারটা হেয় হেয় বুঝুক। আমি এইসব ঝামেলা টামেলাত নাই। এই বাড়ি কাজকাম কইরা আমার বেলা ফুরায়। অন্যের পক্ষ লইতে গিয়া নিজের বুড়া করার দরকার নাই।”
মৃদু হাসে শ্রাবণ। খাবার নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে যায় পরীকে গোসল করে নিতে। অযথা ঘুরেফিরে গোসলে দেরি করার দরকারও নেই। আফজাল হোসেন দুই হাতের আঙুল জড়ো করে চেয়ারে বসে আছেন। ভাবছিলেন বাজারের আয়ত্ত নিয়ে। কিছু জায়গা ছেড়ে দিলে তার প্রজেক্ট করাটা সংকীর্ণ হয়ে আসবে। আয়ও কমে যাবে। অন্যদিকে বাজার বড় না করলেও সমস্যা। ছাড়বে কি ছাড়বে না, দ্বিধায় আছেন। জনকল্যাণে জনপ্রিয়তাও তো তার ধরে রাখতে হবে। এমনি ধ্যানভঙ্গ হয়ে আসে তার। লাল বেনারসিতে ঘরটা পুরো লালাভ বর্ণের হয়ে উঠে শ্রাবণের উপস্থিতিতে। বাইরের কড়া রোদের আলো ঘরকে কড়াভাবেই আলোকিত করে রেখেছিলো। সেই আলো লালের স্পর্শ পেতেই যেন নিজের সোনালী রঙটায় পরিবর্তন নিয়ে এলো। আফজাল হোসেন চোখ তুলে তাকাতেই ঘোমটা মাথায় শ্রাবণ মুচকি হেসে সালাম দেয়। আফজাল হোসেন সালামের জবাব দিয়ে তার বেশভূষায় তাকায়। কোনো আয়োজন বিহীন বেনারসির ব্যবহার যেন ততটাও স্বাভাবিক নয়। শখের দিকে তাকালে বলা যায় অতি আহ্লাদ। তার মেয়েটাও তো এক আহ্লাদী। এ বুঝি ভিন্ন এক আহ্লাদী তার ঘরের। শ্রাবণের হাতে থালাবাটি থাকায় নিজেই ছোট টুলটা সামনে এগিয়ে আনেন আফজাল হোসেন। তাতে থালাবাটি রেখে শ্রাবণ পানি আনতে চলে যায় খালি জগ নিয়ে। আফজাল হোসেন এবার পেছন থেকে মনযোগে তাকান তার যাওয়ার দিকে। বেনারসি যেন তার চোখে আটকে গেলো! শ্রাবণ আবার ফিরতেই তিনি কাছ থেকে লক্ষ্য করে গম্ভীর হয়ে উঠেন মুহুর্তেই! এটা একদম নতুন শাড়ি নয়। যত্নে রাখা বহু দিনের পুরনো শাড়ি। এর রঙই তা প্রকাশ করে দেয় সুস্পষ্টভাবে। কাপড়চোপড় নতুন অবস্থা খুব বেশিদিন তুলে রাখলেও রঙটা আর ঝকঝকে থাকে না। একটু মলিন ভাব চড়ে আসে তাতে। গম্ভীরমুখে আফজাল হোসেন স্থির তাকিয়ে থাকেন নিচের কুচি তোলা পাড়ের দিকে। শ্রাবণ গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে তার স্থির চোখকে লক্ষ্য করে ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বলে,
“আব্বা, খাচ্ছেন না কেন?”
ধীর গতিতে চোখ উঠিয়ে তার মুখে তাকায় আফজাল হোসেন। শ্রাবণ হাসিমুখেই বলে যায়,
“আপনি খান। কিছু লাগলে ডাকবেন। আমি পাশের ঘরেই আছি।”
শ্রাবণ চলে গেলে গম্ভীরমুখে হাত ধুয়ে ভাত স্পর্শ করেন তিনি। খাওয়া চলতে থাকলেও মনযোগ উড়ে গেছে কোনো বিবর্ন কালের ডাকে। হন্নে হয়ে ছুটেও যেন এক ফোটা রঙের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না খুঁজে। পদপৃষ্ঠে পেরেকের ন্যায় বিদ্ধ হচ্ছে একেকটা প্রশ্নের সূক্ষতা! সময়ের সাথে প্লেট খালি হলেও চিন্তায় ভরপুর হয়ে গেছে মস্তিষ্ক। হাত ধুয়ে আফজাল হোসেন এখানেই বসে থাকেন। কাউকে ডাকেনও না। নিজেও উঠেন না এঁটো থালাবাটির সামনে থেকে। ধ্যানমগ্ন হয়ে বসেই থাকেন শুধু। কিছুটা সময় পর শ্রাবণ আবার আসে তার খাওয়া হয়েছে কি না দেখতে। নিজ দায়িত্বে থালাবাটি নিয়ে যায়। আফজাল হোসেন আবারও লক্ষ্য করেন বেনারসিতে। তার চোখ সুস্পষ্ট জানান দেয় এই শাড়ি তার পরিচিত। এই চোখ ভুল দেখছে, কিংবা চোখের দেখা ভুল হতে পারে এমনটা একবারের জন্যও মনে হয় না। শ্রাবণকে নিয়ে আগের সন্দেহটা ভিন্নরূপে ধরা দেয় তার কাছে। সন্দেহ ও উদ্দেশ্যটা যেন স্পষ্ট হয়ে আসতে চায় চোখের সামনে। চোখ দুটো খোলাসা করতে চায় পুরনো কিছু গল্পের!
বাড়ি এসে লাল বেনারসিতে শ্রাবণকে দেখে চমকিত হয় ইফতেখারের চোখ। অচিরেই মুখে হাসি এনে দেয় তার রূপ। মনে পড়ে বিয়েতে একটা বেনারসি শ্রাবণ পায়নি। অথচ বেনারসিতে কি অপরূপ লাগছে সহধর্মিণীকে! কাছাকাছি এগিয়েই জিজ্ঞেস করে,
“এটা কার শাড়ি?”
“আমার আম্মার।”
“দারুণ লাগছে।”
“কতটা?”
“যতটা দারুণ হলে শ্রাবণ বৃষ্টি ঝরায়।”
“তাই? কিন্তু বৃষ্টির দিন তো ফুরিয়ে গেছে মনে হয়।”
“গেলে যাক। তবুও এখনো শ্রাবণ ফুরায়নি।”
মৃদু হেসে বারান্দা থেকে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় শ্রাবণ। ঘরে যায় ইফতেখার। ওদিকে ডাব হাতে এসে পারভীন তাকে ডাকে। মায়ের ডাকে ইফতেখার বেরিয়ে আসে বারান্দায়। পারভীন দুটো ডাব কেটে দিতে বলে দা নিয়ে আসে। পরক্ষণে নিজের ঘরে এসে আফজাল হোসেনকে জিজ্ঞেস করে যায়,
“ভাত খাইছেন?”
“হুম।”
“ডাব খাইবেন?”
“না।”
গম্ভীরমুখে জবাব দিয়ে বসে থাকেন আফজাল হোসেন। পারভীন চলে গেছে ছেলের কাছে। ইফতেখার দুইটা ডাব কেটে ধরিয়ে দিয়েছে মায়ের হাতে। একটা তুলে রেখে আরেকটা পরীকে নিয়ে বারান্দাতেই খেতে বসেছে পারভীন। ইফতেখার আরেকটা অতিরিক্ত কেটে নিয়ে ঘরে গেছে। শ্রাবণ ততক্ষণে তার জন্য খাবার এনে রেখেছে এখানে। ইফতেখার কাটা ডাব তার দিকে এগিয়ে দেয়।
“নাও।”
“আমি এখন ডাব খাবো না। ভাত নিয়ে এসেছি।”
“পানিই তো। আগে খেয়ে নাও।”
“আমার কাছে ডাবের কচি নারকেল বেশি ভালো লাগে পানির চেয়ে। আপনি খেয়ে ফেলুন।”
গ্লাসে ডাব উপুড় করে অর্ধের গ্লাস পানি তবুও শ্রাবণের হাতে ধরিয়ে দেয় সে। ডাবের মুখে মুখ পুরে বাকিটা পানি শেষ করে নিজে। আবার দা নিয়ে ডাব দুই খন্ড করে আনে শ্রাবণের কচি নারকেল খাওয়ার জন্য। টেবিলের উপর রেখে দিয়ে বলে,
“পরে খেয়ে নিয়ো।”
দুপুরের খাবার সেরে উঠার পরপরই শ্রাবণ চা করেছে নিজ হাতে। এক কাপ চা নিয়ে সে আবার হাজির হয়েছে চেয়ারম্যানের ঘরে। মন্দ লাগছে না তার, ওই চোখে বিস্ময়ের কারণ হতে। তাই বারবারই আসতে আগ্রহী হচ্ছে সামনে। চায়ের বিনা ডাকেই চা নিয়ে হাজির পুত্রবধূ। ফাঁকা ঘরে একাকী বসে আছেন আফজাল হোসেন। চায়ের কাপ সামনে ধরে শ্রাবণ।
“আব্বা, আপনার চা।”
গম্ভীরমুখে তাকিয়ে হাতে কাপ নেন তিনি। শ্রাবণ চলে যেতে লাগলেই থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করেন,
“এই শাড়ি তুমি কই পাইছো?”
শ্রাবণ পিছু ফিরে মুচকি হেসে উত্তর দেয়,
“আপনার ঘরে।”
“মিথ্যা কথা।”
“তবে সত্য কি হতে পারে, আব্বা?”
“সত্য তুমিই ভালো জানো। কিন্তু এই শাড়ি ঘরে ছিলো না, তা আমি জানি।”
শাড়ির পাড় কিঞ্চিৎ উপরে তুলে পায়ের নুপুর জোড়াও প্রকাশ করে শ্রাবণ।
“এই নুপুর গুলোও ছিলো না বোধহয়।”
আফজাল হোসেন নুপুরে তাকিয়ে কঠিন চোখদুটো স্থির রাখেন শ্রাবণের চোখে। অনেক কিছু পরিষ্কার জানতে চেয়েও যেন চাইতে পারে না জোরপূর্বক সবটা জিজ্ঞাসা চালাতে। শ্রাবণ যে সব উত্তর দিবে না, এটাও তার বুঝে এসে গেছে কথার ভঙ্গিমায়। তার উপর নিজের সংশয়! তাই পারছে না চাওয়া মোতাবেক প্রশ্ন জুড়তে। অথচ চোখের কত আকাঙ্ক্ষা পরিষ্কার জেনে উঠার, এই শাড়ি ও নুপুরের মালকিনের সন্ধান তথা এই মেয়েটার পরিচয় পাওয়ার। এই মেয়েটা যে তার সূত্র টেনে আনতেই চেয়ারম্যান বাড়িতে প্রবেশ করেছে, তা-ও পরিষ্কার হচ্ছে চোখের সামনে। পুনরায় নুপুর আড়ালে ফেলে দেয় শ্রাবণ শাড়ি ছেড়ে দিয়ে। চোখ ও মুখের হাসির রাশি ধাঁধাময় করে ওই গম্ভীর চোখে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
“চেয়ারম্যান সাহেব, ভুলে গেছেন নাকি এই বাড়িতে যে আরও সদস্য ছিলো?”
আফজাল হোসেন আরও গম্ভীর হোন। মনে করার চেষ্টায়ও তাকে একদমই বেগ পোহাতে হয় না। বেনারসি তাকে অতি অল্প সময়েই মনে করিয়ে দিয়েছিল সেই একজনকে, যে এখন এই বাড়িতে নেই। পরিবারের এই সদস্যদের বাইরে আরও একজন আছে, যার ছায়াটাও দেখা হয়না আজ কত বছর! কেউ আছে, যে হয়তোবা বেঁচে আছে। নয়তোবা নেই। কিন্তু চোখের সামনে দাফন হয়নি। এবং তিনি নিশ্চিত, মেয়েটা তার কথাই বলছে। থমথমে মুখে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
“তুমি তার কে হও?
মিষ্টিমুখে হাসে শ্রাবণ। আফজাল হোসেনকে হেয় করা হাসি।
“আমার পরিচয় বাদ দিন। তাকে মনে আছে তো ঠিক?”
“তুমি কি তার মেয়ে হও?”
“নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি কেন তার মেয়ে হতে যাবো? আমি আপনার ছেলের বউ হই।”
“তার সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক?”
“তিনি আপনার সাথে সম্পর্কিত।”
“কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছো। পরিষ্কার কথা আমার পছন্দের।”
“পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়াটাও আমার পছন্দের। যা হয়তো আপনার না।”
“আমিও তো তোমার পরিবারের একজন। কোথায় দিচ্ছো গুরুত্ব?”
“আপনি তা পাওয়ার যোগ্য না।”
একেকটা বাক্যের পরপর শ্রাবণের গলা ধাপে ধাপে শক্ত হয়ে এসেছে আগের প্রতিটি বাক্যের তুলনায়। শেষ বাক্যটা যেন কথার সাথে মুখাবয়বও ক্রমশ শক্ত করে তুললো! মুখের উপর অপমানে যে কেউই নিদারুণ অপমানিত হবে। মনঃক্ষুণ্ন হবে। আফজাল হোসেনেরও হয়েছে। শ্রাবণ শক্ত চোখ, শক্ত চোয়াল নিয়ে এই ঘর ছেড়ে চলে গেছে। আফজাল হোসেনের জিজ্ঞাসার স্পষ্ট জবাব দিতে সে বাধ্য নয়।
❌কেউ কপি করবেন না❌
“শ্রাবণধারা”
পর্ব- ২৭
(নূর নাফিসা)
.
.
বিকেলে খাটে বসে পা ঝুলাতে ঝুলাতে কচি নারকেল খাচ্ছে শ্রাবণ চামচের আড়িতে তুলে। ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বিপু দেখতে পায় তাকে। ঘরের ভেতরে এসে শ্রাবণের সামনে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলে,
“ভাবি, কান্তার পরীক্ষা চলছে কলেজে। কিন্তু কান্তা যাচ্ছে না।”
“কেন?”
“জানি না। ঘরে কোনো সমস্যা হবে হয়তো।”
“বিপু ভাই, মানুষের জীবনের অন্য নামটাই হলো ‘সমস্যা’। আর ঘরের সমস্যায় বাইরের মানুষের এন্ট্রিই হলো মহা সমস্যা। এখন কি আপনি আমাকে বলবেন, তাদের সমস্যা মিটমাট করে দিয়ে আসতে?”
বিপু ইতস্তত হয়ে বলে,
“টেনশন হচ্ছে। কিছু তো হয়েছে। আপনি যদি গিয়ে একটু দেখেই আসতেন।”
“আম্মা কি বললো তখন আপনাকে?”
“কি আর। মিশতে সাবধান করলো।”
“কি সিদ্ধান্ত নিলেন?”
বিপু একটা মুহুর্ত চিন্তিত বেশে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আবার মেঝের দিকে দৃষ্টিচালনা করে। পরক্ষণে বলে,
“নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। নিলেও কান্তা ব্যাতিত নেওয়া যাবে না।”
“আর পরিবার ব্যাতিত?”
“জানি না আমি। আপাতত একটু দেখে আসুন। প্লিজ।”
“আপনার ভাই আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করে দিয়েছে।”
“মাকেই একটু বুঝান। আব্বাকে যেন মা কিছুটা হলেও বুঝাতে পারে।”
নিশ্বাসে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝেড়ে শ্রাবণ নারকলে চামচ দিয়ে আড়ি দিতে দিতে বলে,
“আপনার মা আমাকেই দেখতে পারেন না। আর আমি পারবো উনাকে কান্তার ব্যাপারে বুঝাতে? আমি দিপুকে বুঝাতে পারবো, বিপুকে বুঝাতে পারবো, পরীকে বুঝাতে পারবো, অর্পাকেও হয়তো পারবো। কিন্তু তাদের আব্বা আম্মাকে বুঝানোটা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। এখন বলবেন চেষ্টা করে একবার দেখতে পারি কি না। চেষ্টা আমি তখনই করবো, যখন সম্ভাবনা দেখবো। এখন শতকরা এক ভাগও দেখছি না।”
বিপু হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসে। ধীর পায়ে বারান্দা ছাড়ে। বাইরে বের হতেই ইফতেখারকে দেখতে পায় দালানে। মিস্ত্রিকে কিছু দেখিয়ে দিচ্ছে। বিপু ধীর পায়ে সেদিকে যায়। ইফতেখারের পাশে এসে দাঁড়ায়। মিস্ত্রির সাথে কথা শেষ হলেই সে বলে,
“ভাই, কিছু কথা ছিল।”
“কি?”
মিস্ত্রিদের থেকে কিছুটা দূরে যায় বিপু। ইফতেখারও এগিয়েছে। বিপু বলে,
“কান্তাদের বাড়ি কি যেন গন্ডগোল হইছে আজ। ভাবিকে বলবা, একবার দেখে আসতে?”
“কিসের গন্ডগোল?”
“কি জানি হইছে কান্তার ব্যাপারেই। আমি জানি না সবটা। শুনলাম মাত্র। একটু পাঠাও না।”
“সে ওবাড়ি গেলেই তো আর আসতে চায় না। মজে থাকে দিনব্যাপী।”
“পাঠাও না একটু। টেনশন হচ্ছে।”
ইফতেখার নিরুত্তর চলে যায়। বিপু অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে ভাই কোনদিকে যায়। ঘরেই তো গেলো। ভাবিকে কি পাঠাবে তবে? মনে খুশখুশ করতে থাকে।
ইফতেখার ঘরে এলেই নারকেল থেকে মনযোগ সরায় শ্রাবণ। কিছু বলবে মনে হচ্ছে। অপেক্ষাহীন বলেও ফেলে ইফতেখার।
“একটু তোমার খালাম্মার বাড়ি যাও তো।”
“খালাম্মার বাড়ি? কেন?”
“কি নাকি গন্ডগোল হয়েছে।”
“গন্ডগোল? কিসের? কার সাথে?”
“জানি না। বিপু বললো। কান্তাকে নিয়েই নাকি হয়েছে। দেখে এসো একটু।”
“আপনিই না নিষেধ করেছেন, আমাকে বাইরে বের হতে?”
“সারাদিনব্যাপী বাইরে কাটাতে নিষেধ করেছি। দেরি করো না। দেখেই চলে এসো।”
দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে নারকেল রেখে উঠে দাঁড়ায় শ্রাবণ।
“ও, এখন প্রয়োজন হয়েছে তো যাবো? প্রয়োজনে শুধু আমার ব্যবহার!”
কথা গায়ে লাগে ইফতেখারের। বাহুতে ধরে চলতে বাঁধা দেয় শ্রাবণকে।
“ব্যবহার বলছো কেন? এটা তোমার দায়িত্বে পড়ে না?”
ঘাড় ঘুরিয়ে ইফতেখারের চোখে তাকায় শ্রাবণ।
“আপনারও অনেক দায়িত্ব পড়ে আছে আমার প্রতি। তা পালন করতে একাংশও ভাবছেন না আপনি।”
“মানে? কি পালন করছি না।”
“বয়স এবং বুদ্ধিতে আপনি আমার চেয়েও বড়।”
এক কথাতেই তার মানের উত্তর করে মৃদু হেসে শ্রাবণ বেরিয়ে যায়। ভাবনায় মত্ত হতে গিয়েও হয় না ইফতেখার। বাঁধা দেয় শ্রাবণকে,
“দাঁড়াও, শুনে যাও।”
শ্রাবণ এগিয়ে এলেই বলে,
“শাড়ি পাল্টে যাও।”
“কেন?”
“সব রূপ সবাইকে দেখাতে হয় না।”
মুচকি হেসে শ্রাবণ ঘরে পা বাড়িয়ে বলে,
“তা অবশ্য ঠিক বলেছেন৷ আচ্ছা, যাচ্ছি পাল্টে।”
বন্ধ দরজার বাইরেই ইফতেখার দাঁড়িয়ে থাকে ভাবনায় মত্ত থেকে। দায়িত্বের ভাবনায় পড়ে আছে সে। কোন দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আছে সে? সব একসাথে হয় না ঠিক। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কিছু ছিল কি, যা সে তা পালন না করে পিছিয়ে গেছে! শ্রাবণ পোশাক পাল্টে বেরিয়ে আসে। ইফতেখার আরও একবার বলে দেয়, তাড়াতাড়ি ফিরতে। শ্রাবণ চুপচাপ চলে যায় মাথায় ওড়না পেচিয়ে নিয়ে।
শ্রাবণ যখন বাড়ি প্রবেশ করে, সাত্তার ভ্যান নিয়ে বের হয়। সামনাসামনি হতেই শ্রাবণ জিজ্ঞেস করে,
“আসসালামু আলাইকুম, কাকা। কেমন আছেন?”
কোনোরকম জবাব সাত্তার তাকে দেয় না। থমথমে মুখখানা নিয়ে চলে যায় ভ্যান টেনে। শ্রাবণ মজিদার সাথে দেখা করে ঘরে এসে। কিছুক্ষণ কথা বলে যায় কান্তার সাথে দেখা করতে। শ্রাবণের চেহারা দেখেই শিরিন চোখ কাচুমাচু করে রাখলেন। যতক্ষণ শ্রাবণ কান্তার সাথে কথা বললো, ঘরের দরজার সামনে থেকে নড়লেন না। শ্রাবণও খুব বেশি কথা বলেনি। কেমন আছে জিজ্ঞেস করলো, ফাইনাল পরীক্ষা তো এগিয়ে আসছে, তাই মনযোগে পড়াশোনা করতে বললো। আর তাতেই কান্তা জানিয়ে দিলো সে আর পড়বে না। শ্রাবণ বিদায় নিয়ে চলে এলো। শিরিনের কাছেও নিলো। শিরিন ভালোমন্দ কিছুই বললো না। শ্রাবণ সীমানা ছেড়ে বের হতেই রাস্তায় বিপুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। তাকে দেখেই এগিয়ে আসে বিপু।
“দেখা হয়েছে, ভাবি?”
শ্রাবণ হাটঁতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করে,
“ভাবিকে পাঠাতে ভাইকে মিথ্যে গন্ডগোলের গল্প শুনিয়ে নিলেন?”
বিপু তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে মাথা চুলকে বলে,
“মিথ্যে আর কি। কিছু তো হয়েছেই।”
“হ্যাঁ, হয়েছে। পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে। কান্তা আর কলেজ যাবে না।”
“তবে?”
“তবে আর কি? বিয়ে দিয়ে দিবে। সংসার করবে। এ-ই তো মেয়েদের শেষ পরিণতি।”
“আমার ব্যবস্থা হবে না কোনোভাবে?”
“দায়িত্ব নিতে পারবেন, কান্তার?”
কথার গম্ভীরতায় একটু বিস্ময়ের সাথে শ্রাবণের চোখে তাকায় বিপু। শ্রাবণ একই গম্ভীরতার সাথে বলে,
“কান্তাকে কোনোভাবে বাড়ি থেকে নিয়ে চলে এলাম। আপনি তার হাতটা ধরে রাখতে পারবেন সারা জীবনের জন্য? আপনার বাড়িতেও আপনাদের জায়গা হলো না। একটা ব্যবস্থা আপনি করে নিতে পারবেন?”
নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে বিপু। শ্রাবণের কথার গম্ভীরতা আরও গভীরে পৌঁছায়।
“জবাব নেই কেন? কিসের তবে বিয়ে বিয়ে করে এতো পাগল হয়ে যাচ্ছেন? একটা মেয়ে আপনার কাছে চলে আসবে, আপনি তার দায়িত্ব নিবেন না? তার চাহিদাগুলো মেটাতে হবে না আপনার? মানলাম, সে কোন চাহিদা দেখালো না। শুধুমাত্র আপনি হলেই তার চলে যাবে। তা কি আসলেই যাবে? আপনার মাসিক ইনকাম কত? ওই মেয়েটার কি কোনো আয় আছে তবে? হাওয়া খেয়ে বাঁচবে? নাকি ‘প্রেম’ শব্দটাকে গিলে খেয়ে? একটা পরিবারেরও সাপোর্ট নেই যে তার ভরসায় দুজন মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। আজ আপনার একটা উৎস থাকতো, একটা শক্তি থাকতো কারো কাছে আপনাকে এভাবে দৌড়াতে হতো না সাপোর্ট পাওয়ার জন্য। কারো ধারে ধারে ঘুরতে হতো না একটু সুপারিশের জন্য। নিজ দায়িত্বে নিজেকেও পরিচালনা করতে পারতেন। নিজের বাবামা, স্ত্রী সন্তানকেও পরিচালনা করতে পারতেন। আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদার ব্যাপক অভাব আপনাদের। এদিক থেকে আপনার ভাইটাও একদম এক লাইনের রেল। আমি বলছি না যে সে আমার চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম। কিন্তু তার নিজস্বতা বলতে কিছুই নেই। আপনার বাবা স্পিডনৌকার বৈঠা আপনাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে, আর আপনারা দুই ভাই তার হাল ধরে রেখেছেন। নৌকা চালানোর ক্ষমতা আপনাদের একজনেরও নেই। বাস্তব একটা কথা জেনে রাখেন, মনের ভালোতেই সব হয়ে যায় না। অবশ্যই মনের দিক থেকে আপনাকে ভালো থাকতে হবে। সেই সাথে যোগ্যতা দক্ষতায়ও এগিয়ে থাকতে হবে। কান্তার বাবা মা আপনার কাছে মেয়ে দেওয়ার জন্য কেন ভাববে? চেহারা দেখে? না চেয়ারম্যানের ছেলের পরিচয় দেখে? এর বাইরে কিছু আছে আপনার? কোনো শক্তি, সামর্থ্য? প্রেম করলেন আর জীবন চলে গেলো? হাড়িতে মাংস ঢেলে দিলেই মাংস রান্না হয়ে যায় না। এতে অনেক উপকরণ মেশাতে হয়। জীবনে প্রেম থাকতে হবে। কিন্তু বাঁচার উপকরণ বাদ দিয়ে এই প্রেমের জীবন চলবে না।”
একটা উত্তর করার মতো কথা বিপু পেলো না। নিদারুণ অপমানে একদম চুপ হয়ে শুধু হেঁটে গেলো শ্রাবণের সাথে। শ্রাবণ কথায় থামতেই তার পায়ের গতি ধীর হয়ে এসেছে। শ্রাবণ বাড়িতে প্রবেশ করলেও সে আর তা করলো না। বাড়ির সামনে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। প্রতিটি কথা মস্তিষ্কে ধাক্কাচ্ছে। একটা কথা তার জন্য অযোগ্য বলে খুঁজে পেল না। প্রত্যেকটা বাক্য, প্রত্যেকটা শব্দের অপমানের যোগ্য সে ছিল।
সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। শ্রাবণ বাড়ি এসেই উঠুন থেকে কাপড়চোপড় নিয়ে যায়। যার যারটা তার তার ঘরে রেখে আসে। আফজাল হোসেনের ঘরে যখন সে কাপড়চোপড় নিয়ে আসে, আফজাল হোসেন তখন ঘরেই ছিলেন। মসজিদের জন্য বের হবেন তৈরি হয়েছেন। শ্রাবণ এলেই তিনি থেমে যান। কাপড়চোপড় রেখে চলে যেতে লাগলেই পিছু জিজ্ঞেস করেন,
“সে এখন কই থাকে?”
পিছু ফিরে তাকায় শ্রাবণ। জানতে চায়,
“কে?”
“ফাতিহা।”
মুখে তাচ্ছিল্যকর হাসি টানে শ্রাবণ। শান্ত চোখের পলক ফেলে জবাব দিয়ে যায়,
“আপনার দুনিয়ার বাইরে।”
চলবে।