শ্রাবণের মধ্যদুপুর পর্ব-২৮+২৯+৩০

0
23

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৮

সাধনার বিয়ের দিন নাজিমউদ্দিন, মিলির ভাই ভাবি, মিষ্টি এসেছে। নিম্মিকে দুদিন আগে এনেছে সবুজ। বাবাকে কিছুই জানায়নি নিম্মি, সবুজ মিলির পরিবারের সঙ্গে নাজিমুদ্দিন এর পরিচয় করিয়ে দেন। মিলির ভাবী ভিতরে চলে যায়, নিম্মিকে দেখে অবাক হন। ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত, কর্মঠ একটা মেয়ে, মিলির চেয়ে বয়স কম হবে, দেখতে মন্দ নয়। গুছিয়ে কাজ করছে। বরপক্ষ এলে শরবত বিতরণ করলো, রান্নার দেখভাল করছে, সুমনার চুলের ফিতা ফুলে গেলেও লাগিয়ে দিচ্ছে, এ মেয়েকে ফেলে মিলির সাথে সবুজ কি আসলেই সংসার করবে? মিষ্টি এগিয়ে এসে একটা পান চাইলো, নিম্মি হেসে বলল,

• আগে খাবার খেয়ে নাও তারপর পান খেও
পুরোটা সময় রিমি নিম্মিকেই দেখছিলো, সাধনার বিদায়ের সময় বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলো, কোনমতে তাকে অটোতে উঠানো গেছে, মোটরসাইকেল দেওয়া হয়েছে জামাইকে, জামাই সেটা চালিয়ে বাড়ি যাবে, অটোতে শাশুড়ি বসলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিম্মি। কি জীবন পেতে যাচ্ছে মেয়েটা…. অবশ্য তার নিজের জীবন কি?

#
• ভাইয়া এনেছি তোর খবর। এখন আমার জিনিস দে!

• এত স্বার্থপর কেন তুই? আগে খবর বল?

• বেশ! নিম্মি বাড়ি এসেছে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাড়িতেই থাকবে, ওর ননদের বিয়ের জন্য এক সপ্তাহ থেকে আবার ফিরবে, ওর স্বামীর সম্ভবত কোন সমস্যা হয়েছে, সেটা লুকিয়ে গেছে

• কি হয়েছে?

• সেটা বলেনি, সযত্নে লুকিয়েছে, তার আগে বল, তুই এত উদ্বিগ্ন কেন?

• এত বড় ভুল করলাম, উদ্বিগ্ন হতেই হতো, তাছাড়া তুই,বাবা কত বকলি

• জানিস ভাইয়া, নিম্মির চোখের চমকটাই মরে গেছে, কি ভীষণ দুঃখ বুকে পুষে রাখে মেয়েটা, যখন হাসে তখন কান্নার মতো দেখায়

• একটা কাজ করতে পারবি?

• আর কোন কাজ না! আমার জিনিস আগে

• নে, একটা কাগজের প্যাকেট বাড়িয়ে দেয় রিফাত বোনের হাতে

প্যাকেট খুলে লিপস্টিকের সাথে একটা কাজল দেখে খুশিতে আত্মহারা, ফাহিমা বলেছিলো, কাজল পেলে খুশি হবে রাইসা, খোজখবর নিতে সাহায্য করবে। রিফাত নিজে কথা বলার চাইতে রাইসার মাধ্যমে যোগাযোগ নিরাপদ, মেয়েটার উপর দিয়ে আগেই অনেক বিপদ গেছে। খুশিতে ছাদে গিয়ে ফাহিমাকে কল দেয় রিফাত।

• হ্যালো

• জানিস তোর বুদ্ধি কাজ করেছে, শোন না….

• আর কোন কথা না! আগে ঢাকা আয় নিয়মিত ক্লাস কর, তারপর আরো বুদ্ধি দেব

• আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ তোকে

মিলন, রিমি বিয়ে খেয়ে পুকুর পাড়ে বসে আছে, মিষ্টি খেলে বেড়াচ্ছে, গ্রামের বিয়ে হিসেবে আয়োজন ভালো, কিন্তু আয়োজনের তুলনায় সবসময় মানুষ বেশি আসে আর একটা গৃহস্থকে বিপদে ফেলে, অবশ্য সবুজের সবকিছুর জোগাড় ছিলো, বাড়তি লোক দেখামাত্র রান্নার জোগাড় শুরু করে দিয়েছিলো, মেয়েপক্ষ পরে খেয়েছে। শেষ পাতে দেওয়ার জন্য দই, মিষ্টি শহর থেকে কিনে আনতে হয়েছে। বড় ভাই হিসেবে সবুজকে ফুল মার্ক দেবে মিলন কিন্তু বোন জামাই হিসেবে তাকে কোনভাবেই মানতে পারছে না, রিমির অনুরোধে আসা। রিমি বললো, এই উসিলায় সবকিছু সে দেখে শুনে নেবে,

• কেমন দেখলা?

• ভালোই তো

• এখানে মিলি থাকতে পারবে?

• ঈদে থাকবে, তোমাদের গ্রামে আমি থাকিনা?

• ঈদ ছাড়া তো আর থাকতে হয় না

• সেটা মিলি ম্যানেজ করে নেবে, আমি শুধু ভাবছি সবুজের প্রথম স্ত্রীর কথা

• কী?

• মেয়েটা অল্প বয়সী, সুন্দরী, লেখাপড়া জানা তাকে বাদ দিয়ে মিলির সাথে জড়ানোর কী হলো?

• তুমি একটা অনুষ্ঠানে দেখছ, আর সবুজ ও কে ছোট বেলা থেকে চেনে, হয়তো কোন আচার ব্যবহার অপছন্দ

• হবে হয়তো

• নিম্মির বাবা কিন্তু কিছুই জানেন না

• হ্যাঁ তাই তো মনে হলো

নাজিমুদ্দিন ভারী খাবার খান না, সাদা ভাত আর মুরগির বুকের মাংস দিয়ে খেতে বসলেন, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, নিম্মি পাশে বসা, সেও সাদা ভাত, ডিম ভুনা নিয়েছে নাড়াচাড়া করছে, দুজনের কারো মুখেই শব্দ নেই,

• কি? বাপ মেয়ের কি আলোচনা হয়? সালেহা প্রশ্ন করে

• কিছুই না, নিম্মি আমাকে কিছুই বলেনা

• দেখলেন তো কেমন ধুমধাম হয় আমাদের বাড়ির বিয়েতে

• হুম হেলাল খানের বয়স বেশি হলেও প্রথম বিয়ে, বিদেশে কাজ করে টাকা এনেছে, মেয়েকে পছন্দ করে বিয়ে করছে, তোমরাও খরচ করেছ বেশ, নিম্মি, সবুজের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিলো

সালেহা কথা না বাড়িয়ে খাবার খেতে থাকে, খাওয়া সেরে আবার কিছু লোকাচার সেরে তবেই মেয়ের বিদায় হবে। মালাবদল, আয়না দেখা, শরবত খাওয়ানো, মাঝে সাধনার বান্ধবীরা খুব দুষ্টুমি করছিলো, সবুজের ধমকে ঠিক হয়েছে, খুব চিন্তিত ছিল মাসুদের ব্যাপারটা নিয়ে, মাসুদ আবার দলবলসহ হাজির হয় কিনা…. তেমন কিছুই হয়নি।

ভারী লাল বেনারসি আর কেজিখানেক ওজনের ইমিটেশন গহনা পরে ভূত সেজে বসে আছে সাধনা। সে প্রতিক্ষায় আছে মাসুদের, বহু কায়দায় খবর দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে, কিন্তু পারেনি। বান্ধবীদের কারো সাথে মা দেখা করতে দেয়নি। মাসুদের ফোন বন্ধ। গ্রামে হাতে গোনা মানুষের কাছে ফোন আছে শুধু। চিরকুট লিখেছে আর ছিড়েছে, চোখের পানিতে বালিশ ভিজে একাকার, মাসুদ আসেনি। তাকে ডাকতে এসেছে বান্ধবীরা,মালা বদল হবে, বান্ধবী, গ্রামের সখীরা সব মিলে ঘিরে রেখেছে, নিম্মি নেই আশেপাশে। একটা মেয়ে খুব লাফালাফি করছে, তাকে অবশ্য চিনতে পারেনি সাধনা, সবকিছুতে তাকে এগিয়ে দিচ্ছে সবুজ। কে বাচ্চাটা? ভাইয়ের ঐ বান্ধবীর মেয়ে নাকি? সাধনা কাছে ডাকে মেয়েটাকে, নাম জিজ্ঞেস করে, মেয়েটা নাম বলে দৌড়ে পালায়। মালা বদলে খুব হাসাহাসি হয়, হেলাল অবশ্য তাকে সুন্দরভাবেই মালা পরায়, আয়নার দিকে তাকায় না সাধনা, কিন্তু ক্যামেরাম্যান বাধ্য করে তাকাতে, দুইজন তাকানো অবস্থায় ছবি তুলে নিল। এই ক্যামেরা ম্যান বহুত জ্বালিয়ে মেরেছে, হেলালের শখ! ক্ষেতে খামারে, মাঠে ঘাটে গিয়ে গিয়ে আজব আজব পোজ দিয়ে ছবি তুলতে হয়েছে। বয়সের বেশি পার্থক্য থাকলে নাকি আদর বেশি হয় বৌয়ের। বিয়ের কেনাকাটায় অবশ্য কার্পণ্য করেনি হেলাল। স্বর্ণ নাকি বৌভাতে পরাবে! তাই আজ এই গাদাখানেক ইমিটেশন পরতে হয়েছে শাশুড়ির কথায়। নিম্মি ভাবীর মায়ের চেন আর একটা ছোট দুল ছাড়া এ বাড়ি থেকে সে স্বর্ণ পায়নি। ভাইয়ের এক কথা, এরকম একটা অপরাধের পর আহ্লাদ করার কিছু নাই! নিজের বেলায় তো ষোল আনা! আনুক না নতুন বৌ, জ্বালিয়ে শেষ করবে সে!

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৯

নিম্মি রাতেই ফিরতে চাইছিল বাবার সাথে, সবুজের অনুরোধে রয়ে গেল। কাল সকালে সবুজ দিয়ে আসবে দুই দিনের পড়া জমে গেছে । বারবার এমন করলে কলেজ কতৃপক্ষ বারবার সাহায্য করবে না। সবুজ এসেছে ঘরে, সে কথা বলতে চায়,

• মিলির ভাই ভাবী এসেছিলেন

• হুম দেখেছি

• তোমার খুব প্রশংসা করলেন
জবাব দেয় না নিম্মি

• মিলি তালাকের জন্য চাপ দিচ্ছিলো, আমি বলেছি তা সম্ভব না
শুণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিম্মি,

• কিছু তো বলো

• বলার কি আছে?

• তোমার পরিকল্পনা কি?

• ক্লাস করে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়া, রিফাত ভাই একটা কোচিং সেন্টারে আলাপ করেছেন, পড়ার চাপ সামলে ক্লাস নিতে যাব

• রিফাত? মানে ঐ মারপিট করা ছেলেটা?

• হুম

• তোমার সাথে যোগাযোগ আছে?

• না, তার বোন এসেছিলো বাসায়, আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, পড়াতে চাই কিনা

• তার কিসের এত আগ্রহ?

• আমার সরাসরি আলাপ হয়নি, হলে জিজ্ঞেস করবো, এখন ঘুমাই, কাল ভোরের বাসে বাড়ি যাব

এত নিস্পৃহ আচরণ ভালো লাগেনা সবুজের। উঠে বাইরে চলে যায়। নিম্মির সারারাত কাটে চোখের পানিতে বালিশ ভিজিয়ে, সেটা সবুজের জানা হয়না।

রিফাত দুপুরে ঢাকায় পৌঁছে লম্বা একটা গোসল দেয়, সৌভাগ্যক্রমে আজ পানি ছিলো, রুমমেট পরশ সবে খেতে বসেছে, তাকেও ডাকে দুজন ভাগ করে খেয়ে লম্বা ঘুম দেয়। খাওয়ার ফাঁকে ভার্সিটির হালচাল জেনে নেয় রিফাত। টিউশনির ছাত্রগুলো আর পাবেনা নতুন করে খুঁজতে হবে, ঘুম ভাঙল ফাহিমার ফোনে,

• হ্যালো জড়ানো কন্ঠে বলে রিফাত

• আমাদের দেখা করার কথা ছিলো আমি ভার্সিটির মাঠে অপেক্ষা করছি

পড়িমরি করে ছুটে যায় রিফাত। মিথ্যা বলেনি ফাহিমা। ছাত্র পড়িয়ে ফিরেছে সে, হলের পঞ্চম তলায় তার সিট, একবার উঠলে আর নামতে ইচ্ছে করবে না। সে অপেক্ষা করছে, অনেক জুটি বসে আছে, কেউ কেউ আছে তার মতোই অপেক্ষায়, সবসময় সে জলপাই রঙের বোরকা আর গাঢ় সবুজ স্কার্ফ পরে আজ সে নীল রঙের সালওয়ার কামিজ হাতে চুড়ি পরেছে। সে জানে এসবের কিছুই রিফাত দেখবেনা। রিফাতের চোখ ভরা শুধু নিম্মির স্বপ্ন!

• কিরে? কতক্ষণ?

• অনেকক্ষন

• ইয়ে স্যরি চোখ লেগে এসেছিলো, পরশের সাথে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

• কাজ হলো?

• তোর কথাই ঠিক আমি সরাসরি মাফ চাইতে যাওয়াটা ভালো দেখায় না, রাইসা রাফিয়া ওরা গিয়ে আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করুক

• কেমন আছে নিম্মি?

• কেমন আর থাকবে বল? ওর জামাইটা আবার বিয়ে করছে, কিরকম অমানুষ

• আমার মনে হয় ভালবাসাহীন দাম্পত্য জীবনের চাইতে তালাক দিয়ে, পুনরায় বিবাহ ভালো, এই ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া, এরকম ভালবাসাহীন দাম্পত্য জীবন বয়ে বেড়াতে দেখবি না, ভাবখানা এমন, যেন বিশ্ব উদ্ধার করে দিচ্ছে!

• তোর এত রাগ কিসের?

• আমার আবার রাগ হতে যাবে কেন?

• মানুষ কি, মানিয়ে গুছিয়ে চলছে না?

• তাকে বেঁচে থাকা বলেনা, সুযোগ পেলে অবশ্যই ভালোবাসার মানুষের হাত ধরতে হয়

• সবুজের জায়গায় থাকলে তুই কি করতি?

• অবশ্যই ভালোবাসার মানুষের হাত ধরতাম

• দেখবো কেমন ভালোবাসার মানুষ হয় তোর

• দেখিস এখন উঠি

• উঠি মানে কি? কিছু একটা খাই, অন্তত এক কাপ চা

• বেশ, ক্যান্টিনে চল

• ক্যান্টিনের ঐ ফ্লাস্কের চা খাবো না, একদম মালাই চা খাবো, একটু হাটতে হবে পারবি?

• হুম আজীবন খুব আস্তে করে বলে ফাহিমা

• কী?

• পারব চল

নিম্মি ক্লাস করে ফিরছে, দুপুর রোদ মাথার তালু পুড়িয়ে দিচ্ছে। সোজা বাসায় গিয়ে একটা লম্বা গোসল, ভাত খেয়ে আজকের কেমিস্ট্রি স্যার ক্লাসে যা পড়িয়েছেন শেষ করতে হবে। বাসায় ফিরেই দেখে সালেহা অপেক্ষা করছে,

• আসসালামু আলাইকুম

• ওয়ালাইকুম আসসালাম, তা কি? ঘর সংসার কি বাদ দিলা?

সালেহার কথার ছুরি যেন এফোড় ওফোড় করে নিম্মির বুকটা, নিজেকে স্বাভাবিক রেখে সে প্রশ্ন করে,

• খেয়েছেন কিছু?

• না মানে চা দিলো মিনতির মা

• ভাত দিবার চাইছি, কইলো তোমার লগে খাইবো, তোমারে পিন না ফুটাইলে কি আর ভাত হজম হইবো?বলে মিনতির মা

• থাক খালা আস্তে করে বলে নিম্মি, আমাকে একটু শরবত করে দাও

• ফ্রিজে বানাই রাখছি, গন্ধ লেবুর শরবত প্রাণ জুড়াই যাইবো

নিম্মি শান্ত ভঙ্গিতে শরবত বের করে খায়। চওড়া ওড়নাটা নামিয়ে রাখে। ছোট ওড়না দিয়ে গলার ঘাম মুছে নেয়। শরবত ধীরে সুস্থে খায়।

• ফুপু ভাত খেয়ে নেন আমার দেরি হবে

• তুমি আসো এতক্ষণ বইয়া রইছি

ইচ্ছে করেই দেরি করে নিম্মি। সংসারের বিভিন্ন শলা পরামর্শ নেওয়ার কোন ইচ্ছা তার আপাতত নেই। সাধনার ঝামেলাটা না এলে বিয়েটা এতদিনে হয়ে যেত। বিয়েটা হবেই ,সে যেখানেই থাকুক। বাবার শরীর ভালো না, সে অন্তত নিজের পায়ে দাঁড়ালে বাবা শান্তি পাবে। পড়া গুছিয়ে কোচিং এর ক্লাস করানো শুরু করবে সে। মাঝের এক মাসে বুঝেছে সে মেয়েদের হাতে টাকা থাকা কি প্রয়োজন। হাতে টাকা থাকলে টুকটাক প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা যায়। সেদিন রান্নাঘরের বালব নষ্ট হয়ে গেল, পুরোটা সময় অন্ধকারে কাজ করতে হতো, মিনতির মা বাকিতে বালব এনে লাগিয়ে দিলো, ধার, বাকি এসব নিম্মির খুব অপছন্দ।

খেতে বসলো, শাপলা ডাটার চচ্চড়িতে কুচো চিংড়ি। এক পদের রান্না

• ওমা এই এক পদ?

• বাজার নেই ফুপু

• আমাদের বাড়িতে…. বলতে গিয়েও থেমে যান সালেহা, সে না বলে কয়ে এসেছে, এমন তো হবেই

• রান্না মজা হয়েছে, তুমি পারো এই রান্না? জিজ্ঞেস করে সালেহা

• না, খালার রান্না, আমি এত কোটা বাছা পারিনা

• তুমি বাড়ি চল, তোমারে না নিয়ে আমি আর এক পাও নড়বো না

জবাব দেয় না নিম্মি।
• তুমি বিয়েটা আটকাও, অসহায় কন্ঠে বলে সালেহা

নিম্মি বোঝে, মিলি শিক্ষিত, চাকরিজীবী, নিম্মির মতো অবলা না যে তার সাথে যা খুশি ব্যবহার করা যাবে, তার উপর সাধনা নেই বাড়িতে, সুমনা নরম মেয়ে। সালেহা দলছুট হয়ে গেছেন। কোন জবাব না দিয়ে খাওয়া শেষ করে ঘরে গিয়ে দরজা দেয়। একটু না ঘুমালে রাতে পড়তে পারবে না ভীষণ ক্লান্ত। ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আসছে। ঘুমের রাজ্যে বিচরণ শুরু হলো একটু পরেই।

বিকেলে বোনকে দেখে খুব একটা খুশি হলেন না নাজিমুদ্দিন সাহেব। সাধনার বিয়েতে সবুজের আবার বিয়ের ইচ্ছে আর পাত্রীপক্ষ দেখে এসেছেন। মেয়েটা তাকে কিছুই বলেনি এত এত কষ্টের পাথর জমে মেয়েটার বুকে কি তবে পাহাড় গড়ে উঠেছে? বিয়ের এক মাস পরেই যদি স্বামী আর একটা বিয়ে করতে চায়, তাহলে সেই স্ত্রীর মনের অবস্থা কেমন হতে পারে। নাজিমুদ্দিন সাহেবের কিছুদিন পরে রিটায়ারমেন্ট। মেয়ের বিয়ের পর ভেবেছিলেন এখন হয়তো কিছুটা নিশ্চিন্ত। কিন্তু মেয়েটা ফিরে এসে আবার যেন তাকে অথৈ সাগরে ফেলে দিয়েছে। মেয়ে রাত জেগে মনোযোগ দিয়ে পড়ে। ছাত্র পড়ানোর চেষ্টা করছে, একমাত্র মেয়ে, আদরের মেয়ে! তারপরও বাবার মন। মেয়েকে সংসারী দেখতে পারলে খুশি হতেন।

সাধনার পুরো কাহিনী উনি বিয়েতে জেনে এসেছেন। এত বড় পাপ ঢেকে,কি চমৎকার ভাবে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিল। ভালোভাবে আয়োজন করল। আর তিনি কি করলেন? লঘু পাপে গুরু দণ্ড না, একেবারে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে দিলেন। ইমাম সাহেব আর রিয়াজউদ্দিন অনেক চেষ্টা করেছেন। তিনি জেদ করে কারো কথা শুনলেন না। একবার তো নিজের মেয়ের কথা শুনতে পারতেন। তাও শুনলেন না। তিনি বাবা হয়ে মেয়েকে সম্মান না দিলে কে সম্মান দিবে তার মেয়েকে? সালেহা অসময়ে কেন এসে বসে আছে নিজেও বুঝতে পারছেন না। কাপড় ছেড়ে ফ্যানের নিচে বসেছেন, আজ হঠাৎ করে খুব গরম পড়েছে। মাঝে কয়দিন টানা বৃষ্টি হলো, আজ রোদের কি প্রখরতা।

• ভাইজান আসবো?

• এসেই তো পড়েছ

• আপনি কি মনে রাগ নিয়ে আছেন?

• নাতো

• নিজে আসেন না মাইয়ারেও পাঠান না

• মেয়েকে কোথায় পাঠাবো?

• তার সংসারে

• ওটা কি তার সংসার আর আছে?

• এভাবে হার মানলে তো চলবে না

• কি করতে চাও তুমি?

• মাইয়ারে নিয়ে যাব, সবুজরে আমার দিব্যি দিয়া কমু বিয়া করতে পারবি না

• এটা কি আর সে যুগ আছে? তোমার দিব্যি শুনে তোমার ছেলে আর বিয়ে করবে না? যদি এমন হতোই তাহলে আর এই দিন দেখা লাগতো না

• দোষটা পুরা সবুজের দিয়েন না, নিম্মির দিনরাত খালি পড়াশোনা আর পড়াশোনা, স্বামীর উপর কোন নজরই ছিল না

• আমার মেয়ে তো সবুজের সংসার করেছে এক মাস, তার আগে তুমি ছিলে তার মা, তাহলে তুমি তাকে দেখে রাখতে পারোনি কেন? আর যতদূর শুনেছি সম্পর্কটা বিয়ের আগে থেকেই শুরু হয়েছে

• আপনার কান ভাঙাইছে কে? নিম্মি?

• কেউ না

• নিজের মেয়ের দোষ তো দেখবেন না

• দেখা উচিতও না, তোমাকে আমি কিছু বিষয়ে অপচ্ছন্দ করি, কিন্তু সাধনার বিয়েটা যেভাবে সুন্দরভাবে দিলে, সেটা প্রশংসার যোগ্য, আমি যদি, তোমার মত মেয়েটাকে একটু সময় দিতাম বুঝতে চেষ্টা করতাম, বুঝেশুনে বিয়েটা দিতাম, তাহলে তো এসব সহ্য করতে হতো না আমার মেয়েকে

• আপনার মাইয়াও তো…

• সালেহা তুমি খুব ভালো করে জানো, সাধনার অপরাধ কি পরিমাণ গুরুতর, ওর স্কুলের হেডমাস্টার আর চেয়ারম্যান সাহেব মিলে হেলালকে জোগাড় করে এনে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে আর আমার মেয়ের সামান্য অপরাধে আমি গুরুতর সাজা দিয়েছি। এমন কিছু বলো না তোমার জন্য এই দরজা জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

সালেহা উঠে চলে যান। তিনি বুঝতে পারছেন এ যুদ্ধে হেরে গেছেন। নিম্মিকে নিয়ে আর একটু চেষ্টা করার সুযোগ তিনি পাবেন না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। সালেহা বেরিয়ে গেলেন, কেউ আজ তাকে আটকাবে না। নিজের ভাই আজ পর হয়েছে। সাধনা যাই করুক, সাধনার কাদা তো পরিবারে লাগতে দেননি সালেহা। ঐ বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়েছেন। চাল চুলো কিছুই ছিলো না ওদের। হেলাল বিদেশে গিয়ে হঠাৎ করে টাকার মুখ দেখেছে!

তার সাথে এই পরিস্থিতির কি সম্পর্ক? সন্ধ্যায় বাসে উঠলেন এই সময়টায় তিনি ঘরের বাইরে থাকতে ভয় পান। খারাপ কিছুর আসর পড়তে পারে। আজ ভয় লাগছে না। তার সংসার খারাপেই ভরে গেছে, নতুন খারাপ আর কি হবে?

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৩০

মিষ্টিকে ভাই ভাবির কাছে রেখে গ্রামে সংসার করতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা মিলির জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু সে আলাদা থাকার সাহস পায়নি। ভাবি বলেছিল, গ্রামে থাকতে পারলে বিয়েটা কর। যদি মনে কর শহরে থেকে সংসার করবে তাহলে এই বিয়েটা করা উচিত হবে না। নিম্মি অল্প বয়সী বুদ্ধিমতি মেয়ে, দেখতে শুনতে মন্দ নয়। সংসার বাগিয়ে নিতে সময় নেবে না। অবশেষে মিলি আর সবুজের চার হাত এক হতে যাচ্ছে। মিলি ঠিকানা নিয়েছে নিম্মিদের বাসার। একবার দেখা করলে কেমন হয়! যেই ভাবা সেই কাজ স্কুল শেষে বেরিয়ে পড়লো, নিম্মি বাসাতেই ছিলো, কলেজ বন্ধ, সামনে পরীক্ষা। মন দিয়ে পড়ছে। এইচএসসি ভালো মতো পাস করে সে ঢাকায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাবে। নিজেকে যাচাই করা উচিত। টাকা জমাচ্ছে। জানেনা পারবে না কিনা…. মিনতির মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পায়, দরজায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়, একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে। তার খোঁজ করছে। নিম্মি অবাক হলেও ভেতরে ডাকে।

• এক গ্লাস পানি হবে?

• হ্যাঁ নিশ্চয়ই

• নিন

• অবাক হচ্ছেন বুঝি, পুরো গ্লাস খালি করে টেবিলে রাখে মিলি

• আমাকে কেন খুঁজছেন?

• আমি মিলি

• ও আচ্ছা

• চা খাবেন? আমি পড়ছিলাম, মাথা ধরে গেছে আপনিও বোধহয় স্কুল থেকে ফিরলেন চা হলে মন্দ হয় না কি বলেন?

• হ্যাঁ খেতে পারি

• আমি নিজে হাতে বানিয়ে আনছি

নিম্মির ব্যবহারে মিলি খুব অবাক। কোন রাগ নেই অভিমান নেই, যেন কাছের কোন প্রতিবেশী। মেয়েটার বয়স কম। দেখতে, শুনতে মন্দ না! তাহলে?

বাড়িটা একদম ছোট, বেশ ফাঁকা জায়গা, ডেভলপারদের দিলে বেশ কিছু ফ্ল্যাট পেত, সবুজের মুখে শুনেছিল ফলবাগান আছে, সেটা বোধহয় পিছনে, সামনে তো কয়েকটা ফুলের গাছ দেখা গেল শুধু, কোণায় একটা পেয়ারা গাছ। মাত্র দুই কামরার বাসা। আরে এই এক চিলতে ডাইনিং। অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। মিলি নিজেও জানেনা সে কেন এসব হিসাব করছে।

• নিন চা

• ধন্যবাদ, আমি আসলে কিছু কথা বলতে চাইছিলাম

• বলুন

• মানে বাসায় মানুষ আছে

• আপনাদের বিয়েটা যখন হবে তখন তো এই মানুষটা জানতেই পারবে

• তাও ঠিক

• তারিখ ঠিক হয়েছে?

• আগামী মাসের ১৬ তারিখ

• শুক্রবার?

• হ্যাঁ

• গ্রামের বিয়ে শুক্রবারই হয়, যদি না কোন সমস্যা থাকে

• বেশ বড়সড়ো আয়োজন

• হ্যাঁ হতেই হত, ও বাড়ির একমাত্র ছেলে

• আপনি একেবারেই কিছু মনে করছেন না?

• আমার কি মনে করার আছে?

• এসব তো আপনি পেতে পারতেন

• আমি হয়তো অন্য কিছু পাব

• আপনার কি কারো সাথে…

• সবুজেরও এমন মনে হয়

• সত্যিটা কি?

• না কারো সাথে কিছু নেই

• তাহলে আপনি কি সবুজকে ভালোবাসেন না?

• ফুপাতো ভাই হিসেবে মানুষ ভালো, এক মাসের সংসার তাতেও তিনি আমার সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করেনি, পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে সবসময় আমার কে সাপোর্ট করেছেন, একটা সম্পর্ক থেকে যদি বের হয়ে আসতে হয়, তাহলে সে মানুষটার সম্পর্কে বাজে কথা বলতে হবে এমন তো কোন কথা নেই, তার অধিকার আছে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর

• আপনি ব্যাপারটা কিভাবে দেখছেন?

• তো আর কিভাবে দেখব?

• আপনার স্বামীকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এরকম মনে হচ্ছে না?

• আমার স্বামী হলে তো আর কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকত না

• আপনাকে যদি একটা অনুরোধ করি

• না সেটা রাখতে পারবো না

• আগে কিভাবে বুঝলেন?

• আপনি বরযাত্রী হিসেবে আমাকে চাইছিলেন, আমার যেতে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু যে কানাঘুষা হবে, সেটা নববধূ হিসেবে আপনি নিতে পারবেন না

• বেশ তাহলে উঠি

• বৌভাতে আমি থাকবো

• ধন্যবাদ

মিলির নিজেকে ধাতস্থ করতে অনেক সময় লাগলো। এতটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে, তার স্নায়ু নিয়ে যেন কুতকুত খেললো! এত পরিণত আচরণ! ভাবতেই পারেনি মিলি। বাসায় ফিরে গোসল করে শুয়ে পড়লো, মিষ্টি মোবাইলে কার্টুন দেখছিল, তাকে একটা ধমক দিয়ে বের করে দিলো! ভাবী এসে মিষ্টিকে নিয়ে গেল। মিলির কি যেন হলো, আকাশ,বাতাস কাঁপিয়ে কান্না পাচ্ছে, কিন্তু চোখ শুকনো, নিম্মি তাকে অপমান করতো, দুটো বাজে কথা বলত সেটাও ভালো ছিলো, কিন্তু এই নিম্মিকে সহ্য আপাত দৃষ্টিতে সহজ হলেও আসলে অনেক কঠিন। তার উপর শাশুড়ির ভাতিজি নিম্মি। তার পক্ষপাত তো আজীবন থাকবে। চাকরি ছেড়ে, বাচ্চা ছেড়ে এই বিয়ে কি তার প্রথম বিয়ের মতোই ভুল সিদ্ধান্ত? তালাকের ব্যাপারে অটল থাকতে হতো? নিম্মিকে সবুজের জীবনে রাখা কি নিরাপদ?

অবশেষে এলো সেই শুভদিন। মিলিদের টাওয়ার বিল্ডিংয়ের সামনে মরিচ বাতির গেট সাজানো হলো, পুরো বিল্ডিং মরিচ বাতির আলোয় ঝলমল করছে। মিলন সাধ্যের বাইরে গিয়ে বোনের বিয়ে দিচ্ছে ধুমধাম করে। মিলির কলিগরা ইতস্তত ঘুরপাক খাচ্ছে, কেউ সেলফি তুলছে তো কেউ গায়ে হলুদের পায়েস খাচ্ছে। গায়ে হলুদের আয়োজন ছিলো দুপুরে, ছাদে ছোট আয়োজন। ছেলেপক্ষ থেকে তেমন কেউ আসতে পারেনি, এক ফুপু আর ফুপাতো বোন আর দুজন বন্ধু এসেছিলো। দুপুরেই কনের জন্য পাঠানো সমস্ত তত্ত্ব চলে এসেছে। গায়ে হলুদের শাড়িটা ছেলেপক্ষ দিয়েছে। সবকিছু একটু বেশি রঙিন, হয়তো মিলির রঙহীন জীবন রঙিন করতে সবুজের আগমন। কলিগরা কেউ কেউ টিপ্পনী কাটছে অনেক অবিবাহিত কলিগ আছে। তাদের মনে ইর্ষা জাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিলি কতখানি আত্মত্যাগ করে এই বিয়েটা করছে সেটা তাদের জানা নেই, চাকরি ছেড়েছে, মেয়ের সাথেও কালেভদ্রে দেখা হবে। এসবের কিছুই তারা জানেনা। বরযাত্রী এলো রাত আটটায়। সবুজকে চেনাই যাচ্ছে না। কনেপক্ষের দেওয়া শেরওয়ানিতে তাকে একদম শহুরে মানুষ লাগছে। সালেহা, সুমনার মুখে হাসি নেই। সবুজের চাচা, ফুপুরা হাজির। মায়ের দিকে ঐ এক মামা নাজিমুদ্দিন। তার পক্ষে এই দৃশ্য দেখা আদৌ সম্ভব কিনা…. দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন সালেহা আর সবুজ। তিনি কোন জবাব দেননি। নিম্মির সাথে সেদিন শেষ কথা হয় সবুজের।

বিয়ের এক সপ্তাহ আগের শুক্রবার,
নিম্মির টেস্ট পরীক্ষা। সে পুরোদমে পড়াশোনা করছে। দরজায় কড়া শুনে এগিয়ে গিয়ে জমে গেল, সবুজ আর সালেহা দাঁড়িয়ে।

• কেমন আছ মা? সালেহা প্রশ্ন করে

• জি আলহামদুলিল্লাহ

নিম্মি ভেতরে চলে যায়। নামাজ পড়ে নাজিমুদ্দিন ফিরে এসে ভাত খান বোন আর ভাগনের সাথে। তখনই দাওয়াত দেন সালেহা। সবুজ নিম্মির সাথে কথা বলতে চায় একা,

• আসবো?

• আসুন

• কিছু কথা ছিলো

• বলুন

• আমি স্বামী হিসেবে ভালো না, কিন্তু তোমাকে কিছু কথা দিতে চাই, পরীক্ষা দিয়ে তুমি চাইলে আমার বাড়ি এসে থাকতে পার, বড় বৌয়ের সম্মান দেওয়া হবে

• স্বামী যদি নিজের না থাকে সম্মান দিয়ে কি হবে?

• জীবনে যেকোন প্রয়োজনে আমাকে পাশে পাবে, তোমার সকল যুদ্ধে আমি ঢাল হয়ে থাকবো

• অনেক ধন্যবাদ

সবুজের আরো অনেক কিছু বলার ছিলো কিন্তু নিম্মির এই রূপ সে কোনদিন দেখেনি। শান্ত স্নিগ্ধ রূপের মেয়েটার শরীর থেকে যেন প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে, ফ্যাকাসে চামড়া আর শুষ্ক ঠোঁট, সবুজের ভীষণ অপরাধবোধ হয়।

এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙল নিম্মির। প্রতিদিনের দেখা ভোর আজ যেন নতুন লাগছে। বুকের উপর একশ মণের পাথর চাপা দেওয়া। বাবা ফজর পড়ে এই সময়টা ঘুমায়। বাড়িতে জেগে থাকা মানুষ কেবল সে! গতকাল টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ইংরেজি প্রথম পত্র, রবিবার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। উঠে ঘরের বাইরে পা রাখে নিম্মি। কালো ওড়না গায়ে জড়ায়। ভোরের নরম আলোয় একটু ফলবাগানে বসবে চিন্তা করে, চা বানিয়ে চৌকিতে বসে। আজকের দিন সবুজ আর মিলির জন্য অনেক আকাঙ্ক্ষার। আর তার জন্য? রাফিয়া, রাইসার দেওয়া পর্তুলিকা ঝাড় হয়ে রং বেরঙের ফুল দিয়েছে। একটা ক্যামেরা থাকলে ছবি তুলে রাখত। কার জন্য রাখতো এই ছবি? জীবনের সকল রং কেড়ে নেওয়া সবুজের জন্য?

নাজিমুদ্দিন সাহেবের ঘুম আসেনা। মেয়ের ঘরের দরজার শব্দ পেয়েছেন আগেই, ধীর পায়ে বের হন ঘর থেকে, নিম্মির ফলবাগানের চৌকির উপর পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ কিন্তু চুমুক দিচ্ছেনা। ফল গাছের ফাঁকে পর্তুলিকার ঝোপ বানিয়েছে, সেটাই দেখছে অপলক। রিয়াজ উদ্দিনের মেয়েগুলো আসে, নিম্মির মন হালকা করতে, ওদেরই কাজ হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাজারে যাওয়ার জন্য তৈরি হন নাজিমুদ্দিন। কি কিনবেন বাজার থেকে? খাওয়ার রুচি আছে কারো? সালেহা বিয়েতে যেতে বলেছিল? কোন বাবা তার মেয়ের সর্বনাশ নিজ চোখে দেখতে পারে?

• বাবা অনেক দিন ইলিশ খাইনা ,সরিষা ইলিশ করবো, আনবে?

• তোর না পরীক্ষা?

• সব কেটে বেছে দেবে খালা আমি শুধু রান্না বসাবো,আধ ঘন্টার ব্যাপার

• বেশ কি কি লাগবে ফর্দ লিখে দে

মফস্বলের বাজারে ইলিশ পাওয়া কঠিন কিন্তু কপাল গুনে এক কেজির জোড়া ইলিশ পেয়ে গেলেন নাজিমুদ্দিন সাহেব। খুশি মনে কিনে ব্যাগ ভর্তি করেই রিয়াজুদ্দিন সাহেবের সাথে দেখা। হাসিমুখে কুশল বিনিময় শেষে ইলিশ মাছ দেখে নিজেই দাওয়াত চেয়ে বসেন রিয়াজুদ্দিন। খুশিমনেই দাওয়াত দেন নাজিমুদ্দিন। অথচ কোন এক শুক্রবারে এই রিয়াজুদ্দিনের ছেলে রিফাত নিম্মির জীবনের এই হাল করেছে, মনে কথাটা উঁকি দিতেই দাবিয়ে দেন নাজিমুদ্দিন। মেয়ের কথা শুনে কয়দিন নানাবাড়ি পাঠালেই হতো। পরিস্থিতি হালকা হলে ফেরত আনতেন মেয়েকে। অনেক দিন নানীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ নাই নিম্মির, দোকানের ফোন থেকে মাসুমের নম্বরে কল দেন নাজিমুদ্দিন। ফোন মাসুমের বাবার কাছে। তিনি খবর পৌঁছে দেবেন জানান। নিম্মির ব্যাপারটা নিয়ে ও বাড়িতে ভীষণ ক্ষোভ। তাদের রাগ, ক্ষোভ জায়েজ। যে ভুল নিম্মির মায়ের সাথে হয়েছে ঐ একই ভুল নাজিমুদ্দিন মেয়ের ক্ষেত্রেও করেছেন। ভালো স্বামী নাহলে আসলে ভালো বাবা হওয়া যায় না।

রিয়াজুদ্দিন নিম্মির হাতের সরিষা ইলিশ খেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শাপলার ডাটা চচ্চড়ি তার পাতেও পড়েছিল রাফিয়ার কল্যাণে ভুয়সী প্রশংসা করলেন নিম্মির। কথাবার্তা বলে, বিকেলের চা খেয়ে বিদায় নিলেন রিয়াজুদ্দিন। আজকের দিনে খুব প্রয়োজন ছিলো এই মেকি অভিনয়ের, নাহলে মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারতেন না নাজিমুদ্দিন।

চলবে