শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৩৭
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। নিম্মি নানাবাড়ি ঘুরতে এসেছে। নানী খুব অসুস্থ। মাঝে তার সাথে যা হয়েছে তাতে, নানীর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না। মাসুম নানীর বেশ দেখভাল করে। তরকারি আসে বেলায় বেলায় বিভিন্ন ঘর থেকে। নানী ঠিক মত সবাইকে চিনতে পারে না। দুপুরে ছোট খালা ভাত দিতে আসে,
• কিরে তুই কয় দিনের জন্য আসছিস?
• মাত্র তো এলাম
• না মানে তো শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে না?
• হ্যাঁ যেতে হবে
• বলছি যে ঐ মেয়েটা কেমন?
• কোন মেয়েটা
• তোর স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী
• ওহ মিলি আপা, তার সাথে আমার বিশেষ কথাবার্তা হয়নি
• মানে কি? এতদিন হলো আছিস একসাথে?
• আমি তো বেশিরভাগ সময় বাবার বাড়িতেই থাকি, পরীক্ষার জন্য, মাঝে উনি অসুস্থ হলেন, হাসপাতালে দেখা হয়েছে বেশ কয়েকবার
• কি করবি ভেবেছিস?
• আপাতত ভালো মার্কস এলে ভর্তি পরীক্ষা দিব বিভিন্ন জায়গায়
• দুলাভাই কি তোকে পড়াতে পারবে?
• পাবলিকে চান্স পেলে পারবে
• সংসারের মায়া তাহলে ত্যাগ করলি?
• তা কেন মানুষ বিয়ের পর পড়াশোনা করে না?
• তা করে কিন্তু তোর যা পরিস্থিতি, একটা বাচ্চা নিয়ে নিলে হতো না?
• একটা বাচ্চা এখানে কি সমাধান করবে?
• না মানে একটা বন্ধন তৈরি করবে
• যেখানে বন্ধন থাকে সেখানে একটা বাচ্চা সুন্দর পরিবেশ পায় বড় হওয়ার, বাচ্চা কখনো বন্ধনের কারণ হতে পারে না
• না মানে মুরব্বিরা বলে তো
• মুরুব্বীরা তো অনেক কিছুই বলতেন, সবকিছু যেমন ভুল না সবকিছু ঠিকও না
• বেশ খেয়ে নে, বাসন দিয়ে যাস
• কাল থেকে আমি এখানে রান্না করে নেব, আপনাদের আর কষ্ট করতে হবে না
• আহা এভাবে বলছিস কেন?
• আমি বেশ কিছুদিন থাকতে চাই, কারো গলগ্রহ হয়ে থাকতে চাই না, এটা আমার নানা বাড়ি আমি যে কয়দিন ইচ্ছা এখানে থাকতেই পারি
• তোকে মানা করেছে কে?
• হ্যাঁ সেজন্যই বলছি আমাকে স্বাধীনভাবে থাকতে দেওয়া হোক
• বেশ যা ভালো মনে করিস, তোদের প্রজন্ম খুব বেশি বুঝিস, আমরা বাপু এত বুঝতাম না, এজন্যই আমাদের ঘর হয়েছে, বর হয়েছে, তোরা কোন কূল কিনারা পাস না….
ছোট খালার বিয়ে হয়েছে জমির বিনিময়ে। অনেক জোরজবরদস্তি করে, চেয়ারম্যান, মেম্বারদের ধরে বসতভিটার জমি আদায় করে ঘর তুলে আছে, মামাদের সাথে সারাবছরই কোন না কোন কিছু নিয়ে তার বিরোধ চলতেই থাকে। নিম্মি কোন কথা বলেনা। শুধু ভাবে, জোর যার, মুল্লুক তার!
সবুজ আর মিলির স্বপ্নের জীবন শুরু। মিলি এই সংসার জীবনটাকে আজীবন লালন করে এসেছে বুকের ভেতর। যদিও মাঝে মাঝে মিষ্টির জন্য খুব মন খারাপ হয়। সপ্তাহান্তে চেষ্টা করে শহরে গিয়ে মিষ্টিকে দেখে আসার জন্য। সবুজ ভোর বেলা উঠে চা দিয়ে মুড়ি অথবা বিস্কিট খেয়ে চলে যায় নিজের ক্ষেত খামার পরিদর্শনে। সেখান থেকে শহরে কাজ থাকলে যায়, না থাকলে খামার আর পুকুর দেখে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরে আসে। গোসল সেরে মসজিদে নামাজ পড়ে দুপুরে একসাথে ভাত খায়। মিলি এখনো কাঠের চুলায় রান্নাতে তেমন অভ্যস্ত না, সে কুটা বাছা করে দেয়, সালেহা কেই রান্না করতে হয়।বিকেলে দুজন পুকুর ঘাটে বসে কি যে আলাপ করে, নিজেরাও জানে না। কখনো হাঁটতে হাঁটতে দূরে নদীর ধারে চলে যায়। নদীর পাড়ের বালির ঢিবিতে ঘন ঘাস গজিয়েছে। সেখানে দুজন ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। ওপাড়ের ঘন সবুজ ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে মানুষ গরু, বাছুর আনে, সবার বাড়ি ফেরার তাড়া। তাড়া নেই কেবল সবুজ আর মিলির। বুকের ভেতরের সমস্ত আবেগ নিয়ে তারা নদীর বুকে সূর্যাস্ত দেখে। ডিমের কুসুমের মতো লাল সূর্যটা ধীরে ধীরে দিগন্তে মিলিয়ে যায়। কখনো বা রেখে যায় রক্তিম আভা। মেঘের সাথে সেই রক্তিম আভার নকশা যেন কোন নামকরা চিত্র শিল্পীর অপরূপ শিল্প। মাগরিবের আজানের সময়ে দুজন বাড়ি ফেরে। সালেহা খুব বিরক্ত হলেও কিছু বলার সাহস পান না। রাতের রান্নার জোগাড়, গরুর খাবার দেওয়া সব একা হাতে করতে হচ্ছে। সবুজের শখের দেশি গরু। সবুজের দাদার দেওয়া উপহার আজ অনেক বড় পরিবার। খামারে যদিও এখন মিশেল জাতের, কিন্তু বাড়ির গুলো সম্পুর্ণ দেশী। লাল রঙের গরুর কাজল কালো চোখ! সাদা, বাদামী সব রকমের আছে। কিন্তু লাল বাছুর সবচেয়ে প্রিয় সবুজের। এদের ঘাস, শাক পাতা কেটে খাওয়াতে হয়। নিম্মিকে দিয়ে সব করিয়ে নিতেন সালেহা, এখন বুঝতে পারছেন, তখন এত চাপ দিয়ে ভুল করে ফেলেছেন। শুরুতে কিছুই করাতেন না, কিন্তু গ্রামের বৌ ঝিরা বললো এতে নাকি বৌ মাথায় ওঠে, ঘরের সব কাজ আর একটু ভাতের কষ্ট না দিলে বৌ কখনো ঘরের হয়না। একেবারে মুর্খের মতো কাজ! এখন পরীক্ষার নাম করে বাড়ি গিয়ে বসে আছে। তার উপর সতীনের ঘর। আদৌ এই মেয়ে আর ফিরবে কিনা ভয়ে আছেন সালেহা!
মাঝে সুমনার চিকিৎসার উসিলায় শহরে গিয়েছিলেন সালেহা কিন্তু নিম্মির পরীক্ষা থাকায়, ফিরে আসতে হয়েছে। তাছাড়া ওখানে বাড়তি কোন ঘর নেই যেখানে মা, মেয়ে থাকতে পারবে। নাজিমুদ্দিন সাহেব আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন তাদের গ্রাম থেকে হেলথ কমপ্লেক্সে সরাসরি গিয়ে চিকিৎসা করাতে। মনে মনে আহত হলেও সালেহা কোন জবাব দেয় না। এরকমই হবার ছিল। সবুজ আরেকটা বিয়ে না করলে চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। নিম্মি এ পেয়েছে। নাজিমুদ্দিন সাহেব খুবই খুশি। মেয়ে এতকিছুর পরেও পাস করেছে, ভালো গ্রেডে এটা অনেক বড় বিষয়। মিষ্টি কিনে আনলেন, আশেপাশের বাড়িতে পাঠালেন। রাফিয়া, রাইসা এসে হইচই করছে। মাসুম এসেছে। বাড়িতে উৎসবের আমেজ। ভালো বাজার এসেছে, মিনতির মা রান্না করছে। নিম্মির ঘরে সবাই আড্ডা দিচ্ছে,
• মা কি বলে জানো? তোমাকে যদি আমাদের বাড়িতে রেখে দেওয়া যেত, তাহলে আর আমাদের প্রতিদিন এখানে আড্ডা দিতে আসতে হতো না
নিম্মি হাসে। কথার পিছনের নিগূঢ় অর্থ সে বোঝার চেষ্টা করে না। রিফাত ছুটে এসেছে ঢাকা থেকে, কিন্তু নিম্মির সাথে দেখা করে তাকে অভিনন্দন জানানোর সুযোগ পাচ্ছেনা। বাবার শরীর ভালো যাচ্ছেনা। তাই দোকানের হিসাব নিকাশ নিয়ে বসেছে, দুপুরে ভাত খেতে বাসায় গিয়ে শোনে রাফিয়া, রাইসা নিম্মিদের বাড়িতেই খাবে। মিষ্টি দিতে এসেছিলো নিম্মি, সবারই দাওয়াত কিন্তু রিয়াজুদ্দিন সাহেবের শরীর ভালো না তাই মা গেলেন না।
• তোকে ভাত বেড়ে দেই?
• আমার দাওয়াত নাই?
• আছে তো
এক ছুটে ঘরে গিয়ে পরিস্কার জামা কাপড় বের করে, গোসল করে, ফিটফাট হয়ে রওনা দিতেই তিনটা বেজে গেল। বেল দিতে দরজা খোলে নিম্মি। যেন তার অপেক্ষাতেই ছিলো।
• আসুন, খাবার তো সব ঠান্ডা হয়ে গেছে, আমি গরম করে আনছি
• ভাইয়া তোর এখন সময় হলো? জিজ্ঞেস করে রাফিয়া
• কাজ ছিলো
• সমস্যা নেই, বসুন
নিম্মি খাবার গরম করে আনে, পোলাও, মুরগির রোস্ট আর ডিমের কোরমা বেশ তৃপ্তি নিয়ে খায় রিফাত।
• তোমায় বিপদে ফেললাম?
• কিসের বিপদ?
• না মানে এই অসময়ে খাবার গরম করা
• আপনার জন্যই তো এই রেজাল্ট হয়েছে, সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে সাজেশন দিয়ে গেলেন, অনেকটা কমন পড়েছিল, না হলে যে আমার মানসিক অবস্থা ছিল, এ রেজাল্ট কোনভাবেই করতে পারতাম না
• একবার তো আমাকে জানাতে পারতে
• কি?
• পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?
• আপনি তো জিজ্ঞেস করেন নি?
• সবকিছু কি জিজ্ঞেস করতে হয়?
• কোন প্রশ্ন থাকলে স্পষ্ট ভাবে জিজ্ঞেস করাই ভালো
• আমি অতটা স্পষ্টবাদী না
নিম্মি খাবার প্লেট গুছিয়ে ঘরে চলে গেল। ঘর থেকে হাসির আওয়াজ আসছে। রিফাত বুদ্ধি করে আইসক্রিম আনতে পাঠালো মাসুমকে। ছাদে বসে সবাই মিলে আইসক্রিম খেল। নিম্মির ঘরে ঢোকাটা শোভনীয় ছিল না। কিন্তু ছাদে এতগুলো মানুষ এক সাথে আড্ডা দিলে খারাপ কিছু না। বহুদিন পর নিম্মির হাসিমুখ দেখে রিফাতের মন আজ পরিপূর্ণ!
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৩৮
মিলি পুকুর ঘাটে সবুজের পাশে বসে আছে। আরেকটু কাছে গিয়ে সবুজের ঘাড়ে মাথা রাখে মিলি। ইতস্তত বোধ করে সবুজ।
• আমি তোমার বিয়ে করা বৌ, এমন করো কেন?
বলে টুক করে একটা চুম্বন এঁকে দেয় মিলি সবুজের গালে, লজ্জা পায় সবুজ,মিলি বাধনহারা হতে চায়, উদ্দাম হতে চায়, সবুজ কেমন যেন ধীর স্থির, নিম্মির মতো অনেকটা, সালেহা বুঝেই বৌ এনেছিলেন। অয়ন বিছানায় এত উদ্দাম ছিলো, ভাবলে এখনো গাল রক্তিম হয় মিলির। সবুজের ভালোবাসা বাঁধভাঙ্গা না। ওর ভালোবাসা ধীর স্থির গভীর!
সবুজ ভাবছে অন্য কথা! ভালোবাসার মানুষের কাছে মেয়েরা এভাবেই নিজেকে মেলে ধরে। তাহলে কি নিম্মি এভাবেই….. ছেলেটা ভার্সিটি পাশ, সুদর্শন, লম্বা, ফরসা। তার মতো রোদে পুড়ে তামাটে রঙ হয়নি চেহারার। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে সবুজ খেটে খাওয়া মানুষের হাত। ঐ ছেলের হাত নিশ্চয়ই সুন্দর!
• কি এত ভাবছ?
• না কিছু না, মাগরিবের আজান দিচ্ছে, চল ভিতরে যাই
মিলি চা বানায়, পানি গরম করা কেটলি কিনে দিয়েছে সবুজ ওতেই চা বানায় মিলি। চা বানাতে বানাতে ভাবে তাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত। গ্রামের লোকলজ্জার ভয় যেখানে নেই। তাহলে সবুজ নিজেকে মুক্ত অনুভব করবে। তাদের দাম্পত্য জীবনের পালে নতুন হাওয়া লাগবে।
• চা নাও
• হুম
• বলছি কি, কোথাও ঘুরে এলে হয় না
• কোথায় যেতে চাও
• কক্সবাজার
• সে তো মেলা খরচ
• দেশের বাইরে তো আর যেতে চাইছি না
• নতুন ঘর করতে অনেক টাকা লাগবে, তার ওপর শান বাঁধানো পুকুরঘাট, এদিকে সুমনার চিকিৎসার খরচ, সাধনার বলে সুখবর আছে, সে আবার ছয় মাস কি আট মাস এই বাড়িতে থাকবে
• আমার জমানো টাকা দিয়ে চলো যাই
• না ঐ টাকা থাক, বিপদ আপদ তো বলা যায় না
• ধুর এভাবে কি জীবন চলে নাকি?
• তুমি বড় মিষ্টিকে আনো, কিছুদিন তোমার সাথে থাকলে দুজনেরই ভালো লাগবে
• আমি চাইছি আমাদের সম্পর্কে উন্নতি করতে, তুমি মাঝখানে নিয়ে আসছো বাচ্চা! বাচ্চা তো আল্লাহ চাইলে একদিন হবেই, তখন তার এই দিনগুলো পাব না
• তোমার কথাতেও যুক্তি আছে, আচ্ছা আমি চেষ্টা করে দেখি, কতদূর কি ম্যানেজ হয়
পরদিনই শহরে যায় সবুজ। আড়তদারের কাছে বেশ মোটা অংকের টাকা পাবে সে। এই টাকাটা পেয়ে গেলেই সব খরচ সুন্দরভাবে মিটে যাবে। কিন্তু আড়তদার আমতা আমতা করে সময় চাইলো। মেজাজ গরম নিয়ে আড়ত থেকে বের হয়েছে সে। আকাশ মেঘলা আছে, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। রিকশা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হেঁটেই রওনা দেয় সবুজ। কি মনে করে নিম্মির কোচিং সেন্টারের এলাকায় চলে যায়। ও রেজাল্টের খবর পেয়েছে মামার কাছ থেকে। ও একবার নিজে কল করতে পারত। মিষ্টি খাওয়াতে তো চাওয়া উচিত ছিল। না হয় সেই খাইয়ে দিবে। কি মনে করে ফোন বের করে ডায়াল করেনা সবুজ।
#
রিফাত সকাল সকাল উঠে গোসল করে, দাড়ি ট্রিম করে, নতুন শার্ট প্যান্ট পরে একেবারে সাহেব হয়ে নাস্তা করতে বসে।
• কিরে কোন ইন্টারভিউ নাকি? জিজ্ঞেস করেন রিয়াজ সাহেব
• না বাবা, আমার ছাত্রদের একটু ট্রিট দিবো আজকে
• এভাবে সেজেগুজে কে ট্রিট দেয় ভাইয়া
• আরে সাজলাম কই?
• ছাত্রদেরকে উৎসাহ দিতে ও নতুন কাপড়-চোপড় পরেছে তোমরা আর কথা বাড়িও না তো নাস্তা করো ধমক দিলেন মা
• কাকে উৎসাহ দিতে যাচ্ছে ভাইয়া সে তো আমরা ভালোভাবেই জানি
রিয়াজ সাহেব মুচকি হাসেন। পরক্ষণেই একটা দুশ্চিন্তার ঢেউ খেলে যায়। এই ভাবনাটা যদি তিনি আগে ভাবতেন হয়তো মেয়েটাকে আজ এই পরিস্থিতিতে পড়তে হত না। আদৌ কি নিম্মি এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে এসে নতুন সম্পর্কে জড়াতে চাইবে? ঐ পরিবারের অবস্থা তো বেহাল। তাছাড়া সবুজকে এত সহজে ছেড়ে দেবে?
• কি হলো ডিম নেবে না? জেসমিন বেগম জিজ্ঞেস করেন স্বামীকে
• অর্ধেক দাও আজ পুরো ডিম খাওয়ার রুচি নাই, ছেলের উত্তেজনা তার ভেতরেও ভর করেছে
• কিরে চা খেয়ে দৌড় দিচ্ছিস যে, আবার ধমকে বলেন ছেলেকে
• না মানে রেস্তোরাঁ বুকিং আগে থেকে দেইনি তো
• ও আচ্ছা যা তাহলে, রেস্তোরাঁ থেকে কিছু খেয়ে নিস
রিফাত একবার চিন্তা করে নিম্মিদের বাসায় গিয়ে ও কে আনলে কেমন হয়? আবার বাতিল করে দেয় চিন্তাটা। না ভালো হয়না। সবাইকে লাঞ্চ করাবে আজ কোচিং সেন্টার থেকে। প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল, শুধু এ প্লাস পাবে যারা তাদেরকে খাওয়ানো হবে। পরে একটা বিশেষ কারণে রিফাত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। নিম্মি এ প্লাস পায়নি, এ পেয়েছে! তাই এই ব্যাচের সবাইকেই খাওয়ানো হবে। রেস্তোরায় গিয়ে গেস্ট সংখ্যা বলে, বসার ব্যবস্থা করতে করতেই দুই একজন ছেলে হাজির। তারা একটু সাজাবে, সাদা টি শার্ট কিনেছে, একে অপরের গায়ে শুভ কামনা লিখবে ।
• এই তোরা এখানে র্যাগ ডে পালন করিস না
• না ভাইয়া, অনেকের সাথে মোটামুটি শেষ দেখা, তাই স্মৃতি রাখার জন্য করছি
ঠিকই তো, তার ব্যাচের দুই চারজন বাড়ি ফিরেছে, বাকিরা সবাই বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে, ঈদে,পুজোতে দেখা হয়। কেউ কেউ একেবারেই হারিয়ে গেছে। স্কুলের ক্রাস লম্বা চুলের অনন্যা, অবন্তি, দুই জমজ বোন। ছেলেরা পছন্দ করত একজনকে আর কথা বলার চেষ্টা করত আরেকজনের সাথে।
• কি ভাবছেন ভাই?
• কিছুনা, তোরা রেস্তোরাঁ ম্যানেজার কে বলে রাখিস
• হ্যাঁ অনুমতি নিয়েছি
কোচিং সেন্টারের বাকি বড় ভাইয়েরা আসা শুরু করলো, কিছুক্ষণ চললো রিফাতের লুকের প্রশংসা! একে একে ছাত্র ছাত্রীরা আসতে শুরু করে, রিফাতের চোখ খোঁজে একটা মুখ। মেয়েরা শাড়ি পরেছে। খুনসুটি, হাসাহাসি চলছে। নিম্মি কি আসবে না? টি শার্ট গায়ে না পরে, টেবিলে রেখে লিখছে মেয়েরা আর হাসাহাসি করছে, রেস্তোরাঁ মালিক আজ আর অন্য গেস্ট রাখেননি। বুক ধড়ফড় শুরু হলো রিফাতের, সত্যিই আসবেনা? রিফাতের চাতক পাখির চোখের শান্তি অবশেষে চলেই এলো, সেই গোলাপি কামিজ, শুধু আকাশী নীল হাতের কাজের ওড়না মাথায় জড়ানো। মেয়েরা অনুযোগ করলো শাড়ি না পরার জন্য। নিম্মি শুধু হাসলো, নিম্মি কি তার উপস্থিতির জন্য শাড়ি পরেনি? নিম্মির লজ্জাবনত চোখ দুটো না চাইতেও রিফাতের চোখে পড়লো। সে তার দিকেই তাকিয়ে! নিম্মি কি চাইছিলো রিফাত তাকেই দেখুক? নাকি অন্য মেয়ের দিকে তাকালে খুশি হতো? চোখ নামায় না নিম্মি।
কোন একটা উৎসব আয়োজন হচ্ছে রেস্তোরাঁয়। সবুজ গানের আওয়াজ পায়। কাচের দেয়াল ভেদ করে দৃষ্টি সহজেই পড়ে রিফাত আর নিম্মির দিকে। হাস্যোজ্জ্বল পুরো দলে শুধু এই দুটো মানুষের চোখ যেন নীরবে কথা চালাচালি করছে!
বাড়ি ফিরে সবুজ কেমন আনমনা হয়ে যায়। সে তার ভালোবাসা পেয়েছে। মিলি কখনো তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছোট করে দেখেনি, অন্তত বিয়ের আগে, মামা যেমন তাকে পাত্র হিসেবে গণ্যই করতো না। অবশ্য গণ্য না করাই স্বাভাবিক যদি এত সুদর্শন ভালো পরিবারের ছেলে পাওয়া যায়। তার মতো গেয়ো ভুতকে কেন চাইবে! মিলি বরং তাকে বিয়ে করে হয়তো পস্তাচ্ছে! তীব্র অভিমানে সবুজের সারা শরীর জমে যাচ্ছে, তার পা চলছেনা!
সালেহা ঘরে ঢুকলেন, সবুজ মাত্রই বাড়ি ফিরেছে,
• বাবা কিছু কথা ছিলো
• মা মাত্রই শহর থেইকা আসলাম, গরমে খুব ক্লান্ত লাগছে, পরে কইও
মিলি ঠান্ডা শরবত বানিয়ে আনে। বাইরে অবশ্য মেঘ করেছে, সাথে সবুজের মনেও জমে আছে মেঘ! মিলি বুঝতে পারে, কিন্তু কিছু বলেনা। নিম্মির সাথে দেখা করতে গিয়েছিল নাকি? নাহ! পাওনা টাকা মনে হয় পায়নি, তাই মন মেজাজ খারাপ।
• ঠান্ডা হয়ে খেতে আস
• মিলি একটু বসবা আমার সামনে?
• হুম
কোন কথা না বলে দুজন অনেকক্ষণ বসে রইলো। একটু অধৈর্য্য হয়ে উঠলো মিলি। সবুজ তার হাত ধরে বলে,
• যদি সুন্দর কাউকে জীবনে পেয়ে যাও, আমারে ছাড়বা না তো?
মিলি থমকে যায়। এ কি প্রশ্ন! অয়ন তো অনেক সুদর্শন ছিলো। কিন্তু সবুজের মতো সহিষ্ণু ছিলো না।
রাতে ঘুম আসেনা সবুজের। পুকুর পাড়ে বসে থাকে। মিলি এগিয়ে যায়। সবুজের মন খারাপের কারণ বুঝতে পারছে না,
• জীবন যখন খুব ভারী! বয়ে বেড়াতে হয় জীবন। না! ভাতের কষ্ট নেই! তাহলে কিসের কষ্ট? সবুজ বলে
• কিসের কষ্ট? একটা নির্ভার সকালের, কিংবা একটা জ্যোৎস্না স্নাত রাতের। সবকিছু থেকে মুক্তি! বুক ভরে টেনে নেওয়া অক্সিজেন। দু হাত বাড়িয়ে পাখি হতে চাওয়ার অপূর্ণ স্বপ্ন! নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দেয় সবুজ
• এত দুঃখ কিসের তোমার? চকিতে মনে পড়ে মিলির নিম্মি প্রকৃতি ভালোবাসে, তাহলে কি নিম্মি পাখি হতে চায়? যখন আকাশের দিকে অকারণ চোখ যায়?
• জানিনা মিলি….. আমি তো তোমাদের মতো শিক্ষিত না! আমার হাতটা একটু ধরবে?
সবুজের হাত জড়িয়ে পুকুর পাড়ে বসে থাকে মিলি, রূপালী চাঁদটা থেকে থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে এই বিরহ কাতর প্রেমিককে! যে প্রেম জয় করেও তীব্র ভালোবাসার অভাবে ছটফট করছে!
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৩৯
রিফাত কোচিং সেন্টারে সারাদিন পড়ায়। রাতে চাকরির জন্য পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা দিতে যায়। কিন্তু বিফলে ফেরত আসে। কিভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিম্মিকে পাবে কোন কূল কিনারা পায়না। একদিন ফাহিমা ফোন করে,
• কিরে বেচে আছি কিনা খোঁজ নিচ্ছিস? অভিমান রিফাতের গলায়
• তুই তাও নিস না
• কোচিং, চাকরির পরীক্ষা সব মিলিয়ে একেবারে নাজেহাল।
• পেলি স্বপ্ন কন্যাকে?
• জানিনা
• এ আবার কেমন কথা?
• সেও ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে
• কথা হয়?
• না
• তাহলে?
• কি আর বেঁচে থাকার জন্য ক্লাসের ফাঁকে ও কে কয়েক মুহূর্ত দেখলেই হয়ে যায়
• তুই ওর ক্লাস নিস
• না, বাকিরা নেয়, আমার কাছে ও পড়েনা
• এর অর্থ জানিস?
• কি?
• ও তোকে ভালোবাসে?
• তা কেন হবে? ভালোবাসার মানুষকে তো মানুষ দেখতে চায়
• “ বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয় ”
• আমরা কেউ শরৎ বাবু নই
• কিন্তু ওর জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখ, সংসার দোদুল্যমান, অসুস্থ বাবা, কি করার আছে ওর?
• এজন্যই আমি জান প্রাণ দিয়ে খাটছি যাতে কিছু একটা হয়
• হবে, অবশ্যই হবে, ইন শা আল্লাহ
• তোর খবর বল
• বাসায় পাত্র দেখছে
• তুই না একজনকে পছন্দ করিস, বলেছিস?
• সে তো করেনা
• তুই কিভাবে জানিস? নম্বর দে কথা বলি
• না, আমি জানি সে অন্য কাউকে ভালোবাসে
• ঐ মেয়েকে না পেলে হয়তো তোর কাছেই ফিরবে
• না সে ফিরবে না, ঐ মেয়েকে না পেলে সে নিজেও হারিয়ে যাবে
• এ কেমন প্রেমিক বাবা
• তোর মতো পাগল প্রেমিক, রাখছি
ফোন কেটে ফাহিমা জানালার গ্রিল ধরে কাঁদতে থাকে। মানুষ কেন ভুল মানুষকেই ভালোবাসে?
নিম্মি জেলা শহরের বিখ্যাত কলেজে ভর্তি হলো। ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রী নিবে। বাবা অনেক ভেবেছিলো ঢাকায় পাঠাবেন কিন্তু শরীর, মন কিছুই সায় দিলো না, কিছু টাকা পয়সা মেয়েটার জন্য জমিয়ে রাখা দরকার। তিনি কোনদিন বৈষয়িক ছিলেন না, যা রোজগার করেছেন তাতেই খুশি ছিলেন, জমি থেকে বর্গা চাষীর দেওয়া সামান্য ফসলেই বাবা, মেয়ের খাওয়া চলত, সালেহা বহুবার বলেছে, চাচাতো ভাইদের সাথে বসতে কিন্তু নাজিমুদ্দিন পারেন না। যাদের সাথে এক পাতে ভাত খেয়েছেন, স্কুলে গেছেন, বিকেলে পুরো গ্রাম চষে বেড়িয়েছেন, সেই একান্ত আপন মানুষের কদর্য রূপ তার সহ্য হয়না। সালেহা আজকাল আসাই বাদ দিয়েছে ,ওরা কি তালাকের কথা ভাবছে? মেয়েটার কি বয়স? বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। রিয়াজের বড় মেয়ের বিয়ের জন্য বললো। নিম্মির চেয়ে বড়, মফস্বলে এরকমই নিয়ম। খুঁজতে খুঁজতে একসময় ভালো ছেলে পাওয়া যায়। নাজিমুদ্দিন বলেই বসলেন, রিফাতের পরিচিত, বন্ধু বান্ধব কেউ নাই? রিয়াজুদ্দিন বেশ হতাশ হয়ে না বোধক উত্তর দিলেন।
রিফাত সারাদিন কোচিং আর নিজের পরীক্ষার পড়া নিয়ে এত ব্যস্ত যে বাসায় কিসের আয়োজন তাও জানেনা। সে অবাক হয়েছে ড্রয়িংরুমে নিম্মিকে দেখে, নিম্মি আর রাফিয়া মিলে কুশন বদলে দিচ্ছে, হাতে হাতে কাজ করে চলে যাচ্ছিলো নিম্মি, রাফিয়াকে নগদ পাঁচশ টাকা দিয়ে নিম্মিকে ছাদে পাঠাতে রাজি করাতে বললো। নিজে ছাদে উঠে বসে রইলো। ছাদের এক পাশে মসলা গবেষণা কেন্দ্র, সবুজের মেলা, আরেকপাশে ধানক্ষেত। ভীষণ সুন্দর ছাদ। নিম্মি এলো অনেক পরে
• কি ব্যাপার?
• তুমি আমাদের বাড়িতে?
• আন্টি ডাকলেন, আপনার এ কি হাল হয়েছে?
• নিজের পড়া, কোচিং এর পড়া সব মিলিয়ে
• এত চাপ নিচ্ছেন কেন? ধীরে সুস্থে করুন
• না, আমার সময় নেই, তুমি কি আমাকে একটু সময় দেবে?
• মানে?
• তুমি যদি আমার জন্য অপেক্ষা করো
• ছি ছি! আপনি একটা বিবাহিত মেয়ের সাথে কথা বলছেন
• প্লিজ আমার পুরো কথা শোন
নিম্মি এক দৌড়ে রিফাতদের বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। কিভাবে দৌড়ে বাসায় এসেছে জানেনা। নিজের ঘরে দরজা দিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে উঠলো। রিফাত কি বলে? সে কি পাগল হয়ে গেছে?
চলবে