শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৪০
নিম্মি রিফাতকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। এলাকার কলেজেই ভর্তি হয়েছে। বাবাকে একা রেখে কোথাও যাওয়া সম্ভব না। প্রতি সপ্তাহে সবুজ আসে। কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যায়। লোকটা ভালো নেই, কেন ভালো নেই নিম্মি জানার চেষ্টা করে না। সবকিছু জানা উচিত না। বাবার রিটায়ারের সময় এসেছে। কাল একটা ছোট বিদায় অনুষ্ঠান হবে। বাবা খুব অস্থির আচরণ করছে। নিম্মি বোঝে, কিন্তু কি করবে সে, পড়াশোনা মন দিয়ে করার চেষ্টা করে, কিন্তু এই পোড়া মনই তো আগের মতো নাই। রিফাতকে যত প্রাণপণে দূরে রাখার চেষ্টা করে, তত যেন সব দুয়ার ভেঙ্গে, বাঁধন ছিড়ে লোকটা সবটা জুড়ে বসতে চায়। আজও সবুজ এসেছে, নিম্মি চা, নাস্তা বানিয়ে সামনে যায়, সহজ ভঙ্গিতে বসে সবুজের সামনে।
• নতুন বাড়িঘর, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট কিছুই তো দেখলা না
• ক্লাস, কোচিং সবকিছু মিলিয়ে সময় পাইনা, ফুপু তো আসাই বাদ দিলেন
• হাটুর ব্যথাটা খুব কষ্ট দিচ্ছে
• ভালো ডাক্তার দেখান
• মা তো ডাক্তার দেখাতে চায়না। মা চেয়েছিল সংসার তোমার হাতে দিয়ে বিশ্রাম করতে
• আমার হাতে?
• সেজন্যই তো বৌ করেছিলো তোমায়
• আচ্ছা
নিম্মি নির্বিকার। বাড়ির কতৃত্বের চেয়ে একটা মেয়ের কাছে তার স্বামীর ভালোবাসা বেশি জরুরি। সেটাই যখন সে পায়নি তখন সে আর কি করবে ঐ সংসারে?
• চুপ করে আছ যে? যাবা না তোমার সংসারে?
• আমার সংসার?
• আর কার?
নিম্মি বলতে পারেনা, সংসার আমার বলতে আমি ঐ সংসারের কাজের মেয়ে! যখন যা বিপদ আপদ হবে গায়ে খেটে, মেধা দিয়ে সমাধান করতে হবে! বিনিময়ে তিন বেলা ভাত জুটবে! সে চুপ করে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলেনা।
• তাহলে তুমি ঐ ছেলের সাথে আবার বিয়ে বসতে চাও?
• কি বলছেন এসব? বারবার এই কথা কেন বলেন?
• তুমি আমার সংসার করবা না, আবার একই জায়গায় কাজের নামে বেহায়াপনা করবা! তাহলে কিভাবে হবে? তুমি আমার স্ত্রী, মানুষ খারাপ কথা বলে
• মানুষ খারাপ কথা বলে? নাকি আপনার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা এসব? কবে কি দেখেছেন?
• তুমি বুদ্ধিমতি মেয়ে, তোমার সাথে আমি কথায় পারবো না, আমি কি বলেছি তুমি বুঝতে পারছ
• আমি এখন পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরতে চাই, বাবার শরীর ভালো না, মাসে অনেক টাকার ওষুধ লাগে
• এখানে কিসের সংসার? মামার চাকরি শেষ হলে, মামাকে নিয়ে আমার বাড়ি চলে আসো, ওষুধ যা লাগে কিনে দেব
• আপনি আসুন আজ আপনার মন মেজাজ ভালো না
বলে উঠে চলে গেল নিম্মি। সবুজ বুঝতে পারছে না, আঘাত করে, অপমান করে কার্যসিদ্ধি হবে? নাকি আবারও ভালো মানুষের মতো বারবার এসে মন গলাবে?
বাড়ি ফিরে যায় সবুজ। মিলি বসে বসে নেইল পলিস দিচ্ছে। সকালে এক বার বের হয়ে শুধু নাস্তা করেছে। মা দুপুরের রান্নার জোগাড় করছে, সুমনা পাশে বসে আছে। ও কে আরো রুগ্ন লাগছে। সাধনা রোদ পোহাচ্ছে। মুখে অন্যরকম একটা লাবণ্য।
• ভাইজান নিম্মি ভাবি আসবেনা?
• না, তার সময় নাই
• তাইলে আমারে কয়দিন রাইখা আস
• কই রাখাবো?
• মামার বাড়ি
• ঐখানে কই থাকবি,নিম্মি সারাদিন পর বাড়ি ফেরে
• সব খবর জানো দেখছি? মিলির প্রশ্ন
• মামা ডেকেছিলেন
• মামা ডাকেন নাকি তুমিই শহরে গিয়ে বসে থাকো?
• বাজার আনলি না? মা প্রশ্ন করে
• বাজার?
• সাধনা এসেছে, বললি বড় মাছ আনবি
• বিকেলে যাবো
• শহরে গেলি, একটু গোসত আনলে হত না?
• মা, সারাদিন আমি মাছ, গোসত নিয়ে চিন্তা করিনা, আমার অনেক চিন্তা আছে
উঠে খামারে চলে গেল সবুজ। দুপুরে ভাত খেতে যায়না। বাজারে বসে থাকে। গেলেই মা, মিলি, সাধনা ধরে বসবে! সাধনাকে রেখে আসা যায়, সে বাহানায় নিম্মির সাথে দেখা হবে। কাল, পরশুই রেখে আসবে চিন্তা করে সবুজ।
রাইসার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। বাড়িতেই অনুষ্ঠান হবে। বাড়ি রঙ করাচ্ছেন রিয়াজুদ্দিন সাহেব। সেই সাথে সাধ্যমতো আসবাবপত্র বদল চলছে। রিফাত বাড়ি থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরের এক ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে । রোজ যাতায়াত করেই আপাতত চাকরি শুরু করেছে। প্রথম মাস তাই ছুটি নিতে পারেনি। বাসার কাজকর্মের দেখভাল তেমন করতে পারছেনা। তার সাথে নিম্মি কোনরকম যোগাযোগ না রেখেই বাসার দায়িত্ব পালনে ভূমিকা পালন করছে! রাতে ভাত খেতে বসে শুনে অবাক হয় রিফাত।
রিফাত পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলো ঠিক তখনই আবার দেবদূতের মতো হাজির হয় ফাহিমা। রোজ ফোন কল, মেসেজ দিয়ে দিয়ে উজ্জীবিত করে। দুইবার বাড়িতেও বেড়িয়ে গেছে। ফাহিমা বিদেশে পিএইচডি করার চেষ্টা করছে। স্কলারশিপ পাওয়া সহজ না। তবে তার বিশ্বাস সে পারবে। বাসায় বিয়ে নিয়ে খুব বেশি অশান্তি হওয়ার সে আবার ঢাকায় চলে গেছে, পার্ট টাইম ছোট খাটো কাজ আর আইইএলটিএস এর পড়া পড়ে। সে জানেনা রিফাত কি আসলেই নিম্মিকে ভালোবাসে? নাকি পুরোটাই আত্মগ্লানি? নিম্মির স্বামী আবার বিয়ে না করলে কি রিফাত নিজেকে এভাবে শাস্তি দিত? তবে তার নসীবে রিফাত নেই এটা সে মেনে নিয়েছে, কিন্তু ভালোবাসা তো বন্ধ করা যায় না, তাই রোজ নিজের সাথে যুদ্ধ করে, হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে হলেও সে উৎসাহ দিয়েছে রিফাতকে। সে চেয়েছিলো নিম্মির সাথেও দেখা করতে কিন্তু নিম্মিকে বোঝানোর কেউ নেই। রাইসা,রাফিয়া ছোট মানুষ। তার মা নেই। বাবাকে এসব বলে লাভ নেই। পারিবারিক মান মর্যাদার নামে বাবারা অনেক নিষ্ঠুরতম আচরণ করে, নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারছে ফাহিমা।
রামাদানে ব্রেক দিব? নাকি ছোট ছোট পর্ব দিবো? নতুন করে লেখার সময় হবেনা। কমেন্টে মতামত দিবেন প্লিজ।
যারা অনলাইনে গল্প পড়েন, বইটই এ্যাপে আমার গল্পগুলো পড়বেন। আশাকরি ভালো লাগবে।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৪১
“বাড়িতে অনেক কাজ তাও ভাইয়া সময় বের করেনা।” মুখ ফুলিয়ে বলে রাইসা। রাইসা, রাফিয়া, নিম্মি তিনজন টুকটাক বাজার করতে বের হয়েছে, কিন্তু কাজ সারতে মাগরিবের আজান দিয়েছে। তিনজন ফেরার পথে রওনা দিবে তখনই মার্কেটে রিফাত আসে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত চেহারায় যেন হাজার ওয়াটের বালব জ্বলে ওঠে। বোনেরাও খুশি হয় তাকে দেখে। শুধু নিম্মি মুখটা নির্বিকার রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মাস খানেক পর মানুষটাকে দেখছে। চাকরির মিষ্টি হাতে গিয়েছিল বাসায়, কিন্তু সে দেখা দেয়নি। নিজের টিউশন ক্লাস গুলো সব নোটস সহ বুঝিয়ে দিয়েছে তাকে কিন্তু নিম্মি সামান্য ধন্যবাদটুকু দেয়নি।
• ভাইয়া তুই?
• আমি তো এদিক দিয়েই বাড়ি ফিরি রোজ, তোরা এই সময়ে কি করিস?
• ম্যাচিং ওড়না, জামার কাপড় টুকটাক জিনিস কিনে আমরা বাসায় যাচ্ছি
• ভাইয়া আমাদের ফুচকা খাওয়াতে হবে
• বেশ চল
রিফাত সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে। চারজনের মধ্যে শুধু নিম্মির কম ঝাল দিয়ে মিষ্টি টকের ফুচকা। রিফাতের মনে আছে। সেই অর্ডার দিলো। তিনটা টুল পেয়েছে। রাফিয়া দাড়াতে চাইলো, ঘাড় চেপে বসিয়ে দিলো রিফাত বোনকে। কিছুক্ষণ পর নিজেও টুল ম্যানেজ করলো। জায়গাটা সবসময় উৎসবমুখর। ভালো লাগে রিফাতের। আজ আরো বেশি ভালো লাগছে। দুই কদম হাটলেই ফুলের দোকান। কিন্তু একটা লাল গোলাপ দেওয়ার অধিকার তার নেই। কি মনে করে চট করে উঠে একটা ফুল কিনে পকেটে রাখে রিফাত। দিতে পারবে কিনা জানেনা। নিম্মি কোন কথাই বলেনা। দুটো রিকশা নেয়, রাইসা আর নিম্মি এক রিকশায়। তাই রিকশা থামে রিফাতদের বাড়িতে। রিফাত এগিয়ে দিতে চায় নিম্মিকে। নিম্মির ক্ষমতা ছিলো না নিষেধ করার। বুকের ভেতর এই অজানা কাপন আর কত লুকাবে সে? শুধু ভয় হচ্ছে, সবুজ দেখে ফেলে কোন অনাসৃষ্টি না করুক। মাটির সাথে মিশিয়ে না দিক তার সম্মান।
• কিছুই বলবে না?
• কিছু কি বলার ছিলো?
• এতবার গিয়েছি তোমাদের বাড়িতে
• বন্ধ দরজায় অযথাই কড়া নাড়িয়ে লাভ কি?
• এই দরজা খুলতে বাধ্য কারণ ভেতরে ফাঁপা
• বাসা এসে গেছে, ভেতরে আসুন
• তোমার সাহস হচ্ছে আজ?
• বাবার সাথে দেখা করে, চা খেয়ে যাবেন
দরজায় কড়া নাড়ে নিম্মি। ভিতর থেকে একটা মহিলা কন্ঠ শোনা যায়। জমে গেল নিম্মি। দরজা খুলে যায়,
• একা একা কই কই বেড়াও তুমি?
ফুপুর ঝাড়ি খেয়ে পিছনে তাকিয়ে অবাক হয় নিম্মি! কেউ নেই তার সাথে। ফুপুর কন্ঠ বুঝতে পেরে কেটে পড়েছে রিফাত। হাসি পায় নিম্মির। নিজেকে সামলে কৈফিয়ত গুছিয়ে দেয়। বাবার রিটায়ারের পর, এখন সংসার মূলত সেই চালায়। তার কাজকর্ম নিয়ে আসলে ফুপুর বলার কিছু নাই। তাও শাশুড়ি, এটুকু মানতেই হবে। যাওয়া আসার উপরে ছিলো। কিছুদিন হলো বাড়িতেই আছে। সবুজ এলেও তার সাথে সে ফিরে যায়নি। বাবাও জোর করেনি।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৪২
সাধনা এসেছে, নিম্মির সাথে তার কোনকালেই এত ভাব ছিলো না। কিন্তু অজানা কারনে নিম্মি খুশি হয়। স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে সাধনার। যদিও সারাদিন তার দেখভালের সময় পাবেনা সে, তবুও নিম্মি আন্তরিকতার সাথে সাধনাকে স্বাগত জানায়। হেলাল দুপুরের ভাত খেয়েই চলে যেতে চায়। নিম্মি হেসে নিজের রুম ছেড়ে দিয়ে বলে আপনাকে আজ ছাড়ছি না। সাধনা খুশি হয়। মানুষটাকে তার কাছে পাওয়াই হয়না। ভাবি কিভাবে যে সবকিছু বুঝে যায়! নিম্মি রাইসাদের বাড়ি আসে। বিয়ের আগের টুকটাক কাজ হাতে হাতে করে। রাইসার ব্লাউজ,পেটিকোট সবকিছু মাপমতো হয়েছে কিনা দেখছে। হঠাৎ একটা লাল জরি দেওয়া ওড়না পরায় রাইসা নিম্মিকে! আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিম্মি। সে অনেক বদলে গেছে। এই লাল ওড়না তার জন্য একসময় স্বপ্ন ছিলো, সেই ঘোমটা প্রিয় মানুষ তুলবে, তাকে দেখে মুগ্ধ হবে। তাকে চাঁদের সাথে তুলনা দেবে, ধীরে ধীরে কাছে আসবে, লজ্জায় জমে যাবে সে….. কিন্তু এই বাসরের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখন এটা কেবল মাত্র একটা লাল ওড়না! আর কিছুই না।
• কি এত ভাবছ?
• ভাবছি এই লাল ওড়না কারো কাছে স্বপ্নময়, কারো কাছে মূল্যহীন
• যে বলে মূল্যহীন তার কাছেও এটা অমূল্য
• কিভাবে?
• যদি প্রিয় মানুষ পরায় এই ওড়না
• বেশ কথা শিখেছিস? হুম?
• দুদিন বাদে আমার বিয়ে
• হুম…. পাকা বুড়ি
দরজায় শব্দ হতেই ওড়না মাথায় দিয়েই নিম্মি দরজা খোলে। জেসমিন বেগম দাঁড়িয়ে! এক টানে ওড়না ফেলে দেয় নিম্মি। জেসমিন বেগম নিম্মিকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করেন না। কিন্তু পুত্রবধূর রূপে তিনি কোনভাবেই নিম্মিকে দেখতে চান না। হঠাৎ করে রিফাতের জন্যই মেয়েটার জীবনে নেমে আসা অন্ধকারে রাইসা,রাফিয়া মেয়েটার সাথে বন্ধুত্ব করে। হয়তো এসব না হলে তার আপত্তি থাকতো না। কিন্তু বিবাহিতা মেয়ে নিজের বিয়ে ভেঙে তাদের বাড়ির বৌ হবে এটাও সহজ ভাবে নিতে পারেন না। সমাজ কিভাবে গ্রহণ করবে এই সম্পর্ক? রিফাতের মনে যে নিম্মির জন্য সহানুভূতি আছে সেটাও জানেন তিনি। চোখের সামনে বড় হওয়া মেয়ে। “কিন্তু” এই কিন্তু তার মনে কাটা হয়ে আছে। একমাত্র ছেলের জীবনে তিনি এমন মেয়ে মানতে পারেন না।
• নিম্মি তোমার কোন কাজ নেই? সারাদিন এই বাড়িতে পড়ে থাকার কি আছে? জেসমিন বেগম জিজ্ঞেস করেন
• আন্টি আমি…. রাইসার ব্লাউজের ফিটিং দেখতে এসেছি, কিছু করা লাগলে দর্জিকে আজই দিতাম
• কিছু করা লাগলে আমি দেখবো, তুমি যাও
নিম্মি আর দাড়াতে পারেনা। একছুটে বেরিয়ে যায়।
রামাদানের শুভেচ্ছা 🥰