শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৪৯
দুরুদুরু বুকে নিম্মি মেয়েদের কক্ষে গেল, চাচীকে কোথাও দেখলো না। আজ যদি সবার সামনে কিছু বলে বসেন? রাইসা শাড়ি গুছিয়ে বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলো, মামাতো,ফুপাতো বোনেরা সব জিজ্ঞেস করল, এই তোমার নিম্মি আপু?
রাইসা নিম্মিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
• অনেক সুন্দর লাগছে তোমাকে, পার্লারে আজ তোমাকেও সাজাবো
• ধুর পাগল আমি সেজে কি করবো
• আচ্ছা চলো
মেয়েরা সব হইচই করতে করতে পার্লারে রওনা দিলো। রিফাত দূর থেকে দেখার চেষ্টা করলো দলে নিম্মি আছে কিনা, লাল জামদানি পরা মায়াবতী মেয়েটার জন্য বুকের ভেতর আবার উথাল পাথাল ঝড় বয়ে যায় তার।
সেজেগুজে মেয়েরা ফিরেছে। এক পাশে একটু আড়াল করে কনের স্টেজ, চট করে বাইরে থেকে দেখা যায় না। পার্লারে নিম্মির চুলে শুধু ফুল পরিয়েছে, আর কিছু করতে দেয়নি সে, যদিও রিফাত বলে রেখেছিলো। ফটোগ্রাফার এসে বিভিন্ন পোজে কয়েকটা ছবি তুলে, আত্মীয় স্বজনদের খাওয়ার ভিডিও করতে চলে গেল। নিম্মি সবার সাথে সুন্দর করে কথা বলছে কিন্তু ওর চোখে মুখে কেমন একটা অস্বস্তি। মা আজ কিছু বলবে না, বাবা আর রিফাত মিলে বুঝিয়েছে। কিন্তু সেটা নিম্মিকে জানানো হয়নি। রিফাত কখনো নিম্মিকে কল,মেসেজ করেনা। তীব্র অপরাধবোধ ওর শ্বাসরোধ করে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বলতেই হবে। মেহমানদের খাওয়া শেষ, এবার বাড়ির লোকেরা বসেছে। নাজিমুদ্দিন এসে ঘুরে গেছেন। এই ভারী খাবার তাঁর সহ্য হবেনা। রাইসাকে আশীর্বাদ করে গেছেন। নিম্মি রাইসা, রাফিয়াদের সাথেই বসলো, জামাইকে আলাদা টেবিলে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। জেসমিন বেগম বসলেন মেয়েদের সাথে। রিফাত সবকিছু তদারকি করছে। খাওয়ার সময় কি একটা চোখে পড়ে তার। এক দৌড়ে নিজের ঘর থেকে একটা জিনিস পকেটে পুরে নেয়। খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার জায়গায় একটু একা পায় নিম্মিকে। জিনিসটা নিম্মির হাতে তুলে দিয়ে চলে যেতে চাইছিলো সে। নিম্মি তাকে থামায়। বলে এভাবে চোরের মতো কিছু দিলে আমি নিবো না। জিনিসটা আবার ফেরত দেয়। রিফাত দ্রুত সরে যায়, মা এদিকটায় আসছে!
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫০
বিয়ে বাড়ির হাজার কাজ। নিম্মি লেগে গেল জামাই বৌয়ের মালাবদল, আয়না দেখা, দুধ খাওয়ানো আরো মজার মজার কাজে। অনেক দিন বাদে সে মন খুলে হাসলো কিন্তু তার স্থায়িত্ব খুবই কম। শেষ বিকেলের আগেই রাইসার শ্বশুর মেয়ে বিদায় দিতে বললেন। জেসমিন, রাফিয়া কাঁদতে লাগলো। রিফাত, নিম্মির চোখ ভেজা। রিয়াজুদ্দিন অনেকক্ষন মেয়ের জামাইয়ের হাত ধরে অনুরোধ করলেন মেয়েকে ভালো রাখার। নিম্মি ভাবলো, বাবা কি সবুজকে কখনো বলেছিলো তাকে ভালো রাখতে! আজব সব প্রশ্ন মাথায় কখন যে উঁকি দেয়।
ডেকোরেটরদের সাথে হিসেব মিটিয়ে কাজ সারতে রাত হলো রিফাতের। অবাক হলো নিম্মি এখনো আছে! মায়ের সাথে বাড়ির কাজে সাহায্য করছিলো! সে বাসায় এগিয়ে দিতে চাইলো। নিম্মি সানন্দে রাজি হলো।
• কি দিয়েছিলেন তখন?
• চুড়ি
• বেশ এখন দিন
• এখনো তো চোরের মতোই দিচ্ছি
• উহু, নিজের হাতে পরান
• এই রাস্তায়? কেউ দেখলে?
• আমায় মন্দ বলবে, আপনার কি?
• তুমি আমার সম্মান!
• চাচীকে কি বলেছেন? বেচারি সহ্য করতে বাধ্য হয়েছেন?
• তেমন কিছু না
• বলেন না?
• হাত দাও
• নিন
দুই বাড়ির মাঝের সংক্ষিপ্ত পথে দাঁড়িয়ে রিফাত নিম্মির হাতে রেশমি চুড়ি পরিয়ে দিলো অনেকগুলো।
• তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন?
• সবুজ পেরেছে, সে গ্রামের ছেলে, আমি কেন পারবো না?
• সবুজ ভালোবেসেছে, তার কোন অপরাধবোধ ছিলো না
• আমিও ভালোবাসি, কি করলে বিশ্বাস করবে তুমি?
• আজ থেকে আমাদের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ, আমি শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকবো
• কি?
• হ্যাঁ, এই উপহার আমি আজীবন নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখবো
• না নিম্মি তুমি এমন করতে পারো না
• আপনি একমাত্র ছেলে, চাচীর পছন্দসই কাউকে বিয়ে করে সুখী হন, আপনার বিয়েতে দাওয়াত করবেন কিন্তু….
গল্প প্রায় শেষের দিকে। গল্প অযথা লম্বা করার বিপক্ষে আমি। মাঝে রামাদান আসায় নতুন গল্প গুছিয়ে লিখে পোস্ট করতে সময় লাগতে পারে। আপনার মূল্যবান মতামত অবশ্যই জানাবেন।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫১
নিম্মি আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে বাসায়। তারপর সোজা ছাদে উঠে বসে থাকে। তার ভীষণ কান্না পাওয়া উচিত কিন্তু সে কাঁদছে না। বুকে সীমাহীন যন্ত্রণা, পুরো একটা আস্ত পাহাড় যেন চেপে বসেছে। কিন্তু সে কাঁদছে না। ভোরে সাধনা যখন নিম্মিকে নামিয়ে নিয়ে গেল ঘরে, জ্বরে বেহুশ নিম্মি।
এক সপ্তাহ পর,
নিম্মি ডেকেছে সবুজকে। সে বাড়ি যেতে চায়। সবুজ বুঝতে পারছে না, তার খুশি হওয়া উচিত নাকি সংসারে জটিলতা বাড়ার ভয় পাওয়া উচিত। সে সাথে সাথেই রাজি হয়ে তৈরি হতে বলে নিম্মিকে। মামা চুপচাপ বসে আছেন। কোন কথা বলছেন না। সাধনা বলছিলো, নিম্মি জ্বরে ভুগেছে বেশ কিছুদিন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আবার নিম্মির সেবা করেছে সাধনা। গতকাল হেলাল এসে নিয়ে গেছে ও কে। সবুজ চাইলে এক সপ্তাহ পরে এসে নিয়ে যাবে বলতে পারতো কিন্তু তা বলেনি। বাড়িতে ফোন করে নিজের পুরনো ঘর খুলিয়ে, সাফ করিয়েছে। নিম্মি বেশি কিছু নিল না। মামা শুধু মেয়ের মাথায় হাত ছুয়ে দোয়া করে দিলেন। কি যেন একটা অনুপস্থিত, সবুজ বুঝতে পারছে না। মিনতির মা সাধারণত দরজা পর্যন্ত এসে বিদায় দেয়, আজ রান্নাঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। অটোরিকশায় চেপে বসে তারা। কেউ দেখলে বুঝবেই না এরা স্বামী স্ত্রী! বাড়িতে পা রাখতেই সালেহা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে নিম্মিকে। নিম্মির মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। সবুজের পুরনো ঘরে এখন একটা ছোট আলমারি, বইয়ের সেলফ,কাপড় নাড়ার একটা ছোট আলনা। আর সাধনার ড্রেসিং টেবিল যুক্ত হয়েছে। বেশ লাগছে দেখতে। পড়ার টেবিলে একটা ফুলদানি, তবে সেটা খালি। নিম্মি অবাক হলেও কিছু বললো না।
• ভালো লাগছে?
• হুম
• কিছু খাবে?
• না
• আমি একটু বসি?
• আপনার ঘর
এক শব্দে উত্তর দিচ্ছে নিম্মি। সালেহা খুব হাক ডাক পেড়ে খাবারের বন্দোবস্ত করেন। সাধনা ফোন করে বলেছে, আবার আগের মতো নিম্মিকে কাজে লাগিয়ে না দিতে। নিম্মির ক্লাস, পরীক্ষা আছে, শহরে গিয়ে দিতে হবে। নিম্মিকে রাখতে চাইলে আগের মতো ব্যবহার করা চলবে না। সালেহা চুপচাপ মেনে নেওয়ার মানুষ না হলেও তর্কে জড়ালেন না। দুপুরের খাবার টেবিলে মিলির সাথে দেখা হলো, নিম্মি যেন দেখতেই পায়নি এমন ভাব করে খাওয়া সেরে ঘরে চলে গেল। সবুজ ভাতঘুম দিতে ঘরে গিয়ে দেখে মিলির অগ্নিমূর্তি!
• বাহ! এখন তুমি সুখী?
• কেন?
• দুই বৌ আছে পাশে
• নিম্মি আমার স্ত্রী, ও আসতে চাইলে আমি না করে দেব? তোমারে বিয়ের আগেই কইছি ওরে আমি ছাড়তে পারুম না
মিলি সবুজের এই স্পষ্টভাষী রূপ দেখে অবাক। সাধারণত মা, বোনের জন্য সে এভাবে মুখ খোলেনা।
বিকেলে সালেহা গেলেন নিম্মির ঘরে। শুয়ে আছে মেয়েটা অপলক তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে।
• এতদিন পর মনে পড়লো একটা সংসার আছে তোমার?
নিম্মি উঠে বসে, পড়ার টেবিলের চেয়ারে বসে সালেহা। কোন জবাব দেয়না নিম্মি।
• এখন কি কথাও কইবা না?
• কি বলবো?
• ভাইজান জোর করে পাঠাইছেন?
• না নিজেই এসেছি
• এটা তো খুব ভালো কথা, এমনে শুইয়া আছ কেন?
• রাতে ঘুম হয়নি, ক্লান্ত লাগছে
• আচ্ছা, ঘুমাও তাইলে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে যান সালেহা, আরো কিছুক্ষন কথায় জর্জরিত করলে শান্তি পেতেন।
চলবে