শ্রাবণের মধ্যদুপুর পর্ব-৫২+৫৩+৫৪

0
25

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫২

বুচির মা বারান্দা ঝাড়ু দিচ্ছে। রোজ দুই বেলা ঝাড়ু দিতে হয়। সারাদিন এমনভাবে কাজ করায় মিলি যাতে সালেহা কোন কাজ দিতে না পারেন।

• বুচির মা বাসন ধুইয়া লও, সালেহা ডাকেন

• হাতের কাম সাইরা আইতাছি

• রাতে কি রানবা?

• মুগের ডাল ভাইজা মাছের মুড়া, আর ফুলকপি, শিম, আলুর তরকারি।

• রোজ এক জিনিস, আমারে বেগুন পুইড়া ঝাল কইরা ভর্তা দিও

• আইচ্ছা

বুচির মা সালেহাকে খুব বেশি পাত্তা দেয়না, আবার বেয়াদবিও করেনা। শুনেছিল বাড়িতে দুই বৌ। বড় বৌয়ের বয়স কম, দেখতেও ভালো, বাচ্চাকাচ্চা নাই! সে হিসাব বুঝতে পারেনা। সন্ধ্যায় নিম্মি নিজেই চা বানাতে আসে। এক কাপ চা বানিয়ে চলে যায়। আর কেউ খাবে কিনা প্রশ্ন করে না। অবশ্য মিলি তো এটুকুও করেনা।

সবুজের ঘুম ভাঙল মাগরিবের আযান শুনে। দ্রুত ওজু করে মসজিদে চলে গেল। আসার সময় হাতে কিছু পুরি,পিয়াজু, চানাচুর আনে। নিম্মির ঘরে যায়,নিম্মি বই হাতে বসে আছে, সামনে চায়ের কাপ

• একটা দিন ছুটি নাও, আজও পড়া?

• অনেক ছুটি গেছে, জ্বর ছিলো, একটা বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো

• হুম, আমি তোমার ঘরে আসি তোমার কোন সমস্যা নাই তো?

• আমি তো নিষেধ করিনি

• নিষেধ করলে আসবো না

• আপনার বাড়ি,কিভাবে নিষেধ করি?

• তোমার কি হইছে?

• কি হবে?

• এমন তো ছিলা না

• অনেক দিন পর দেখা হলো, তাই এমন লাগছে

• বাইরে বসবা? পুকুর পাড়ে

• চলেন

সবুজ আর নিম্মি পুকুর পাড়ে বসে থাকে অনেকক্ষণ। কেউ কোন কথা বলেনা। অন্ধকারেও সবুজ ঠাহর করতে পারে এই নিম্মি সেই নিম্মি না। একদিন ভাত খেতে বসে নিম্মি বলেছিলো তার সাথে মানিয়ে গুছিয়ে সংসার করতে চায়, সেদিন তার চোখে সেই আন্তরিকতা ছিলো, তার কন্ঠে প্রাণ ছিলো, আজ সবকিছু জোরপূর্বক মনে হয়। অথচ সে কোন জোরজবরদস্তি করেনি। তাহলে কি ঐ ছেলে গ্রহণ করেনি নিম্মিকে? নাকি নিম্মি গ্রহণ করতে পারছেনা ছেলেটাকে? সে এতটাও উদার না যে নিজের বৌকে তালাক দিয়ে বলবে, যাও তুমি মুক্ত। তোমার ভালোবাসার মানুষের কাছে যাও! বারান্দার আলো জ্বলে উঠলো, মিলি দাঁড়িয়ে আছে, এদিকেই তাকিয়ে আছে। সে কি উঠে যাবে? উঠে গেলে নিম্মি তাকে আবার কটাক্ষ-বানে আক্রমণ করবে। নাকি তাও করবেনা! সেটা পাওয়ার যোগ্যতাও তার হারিয়ে গেছে?

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫৩

ব্যাংকের কাছেই সাবলেট নিয়েছে রিফাত। দোতলা বাসার নিচতলার এক রুম। ব্যাংকের পাশেই। যাতায়াতের কষ্ট নাই। যার জন্য সব কষ্ট সহ্য করা যেত হাসিমুখে, সেই তো থাকছে না! অসময়ে বাড়িওয়ালা রমিজ আলীর ফোন পেয়ে অবাক রিফাত। ভদ্রলোকের তিন মেয়ে, সারাদিন ছাদে আড্ডা বাজি করে। কিন্তু বাসাটা জীবন্ত। ভীষণ ভালো লাগে তার। নিজেদের বাসাটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। রাফিয়া একা একা মন খারাপ করে বসে থাকে। রিফাতের আজকাল খুব বেশি একা লাগে। কিন্তু অসময়ে বাসায় কেন ডাক পড়লো? জিএম স্যারকে বলে চলে গেল। নিজের রুমের তালা খুলতেই সবচেয়ে ছোট মেয়েটি তাদের বাসায় ডাকলো। সারাদিন অফিস করে এসব ভালো লাগেনা। রমিজ সাহেবকে বলতে হবে। দোতলায় উঠে অবাক হলো রিফাত। ফাহিমা বসে আছে। আজ সে বোরকা পরলেও নীল ওড়না পরেছে। চোখে কাজল, আর কোন সাজ নেই, কিন্তু কি ভীষণ মায়াবতী লাগছে, যেমন না সাজলেও একজনকে লাগে…. বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস ঠেলে বের হয়ে আসে।

• কেমন আছিস?

• তার আগে বল, সারপ্রাইজ কেমন লাগলো?

• দারুণ, তোকে এখানে একদম আশা করিনি

• শুভ জন্মদিন

• থ্যাঙ্কিউ

• শুকনো থ্যাঙ্কিউ চলবে না, আমাদের পার্টি চাই

• মানে?

• জি ভাইয়া, তিন বিচ্ছু সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো

সারা বিকাল খুঁজে একটা কেক কিনে আনলো রিফাত। বাড়িওয়ালার ড্রয়িংরুম চারজন মিলে সাজিয়েছে। বাড়িওয়ালা গিন্নি শুনে প্রথমে বিরক্ত হলেও মেয়েদের উৎসাহে কাজে নেমেছেন। চিকেন বিরিয়ানি, আলুবোখারার চাটনি, সালাদ আর কেক। খাবারের চেয়ে হইচই হচ্ছে বেশি। মুরগির এই পদ এভাবে রান্না করেননি সালমা। যদিও শহুরে রান্না এখন টেলিভিশনের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে গ্রামের ঘরে ঘরে। কিন্তু এরা ঝাল মুরগি ভালোবাসে। ফাহিমার অনুরোধে রান্না শুরু করে বুঝছেন, খেতে মন্দ হবেনা।

অপটু হাতের চিকেন বিরিয়ানি আর মফস্বলের কেক স্বাদ অকারণেই আজ অমৃতের মতো লাগছে। স্কুলের গন্ডি পার না করা তিন বোন এক সপ্তাহ আগেও অপরিচিত থাকা মানুষটাকে নিজের বড় ভাইয়ের মতো করে আপন করে নিয়েছে। ফাহিমার মন ভালো হয়ে গেল। খাওয়া সেরে যে যার মতো ঘুমাতে গেল। ফাহিমা আর রিফাত বারান্দায় বসে আছে, এই বারান্দা হলো, ড্রইং কাম ডাইনিং আবার এক পাশে খোলা বারান্দা। সামনের দোকানের হইচই, স মিলের শব্দ, মসলা ভাঙানোর মিলের উটকো গন্ধ ভেদ করে কেমন অদ্ভুত, মন উদাস করা বাতাস বইছে। শীত তার চলে যাওয়ার সম্মতিপত্র দিয়েছে আর বসন্ত তার আগমনী বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে আমের মুকুলে।

• তুই কিভাবে জানলি এদের ম্যানেজ করতে পারবি?

• তুই সাবলেট নিয়েছিস সেটাই অবাক লাগছিলো, তারপর আংকেলকে কল দিতেই রমিজ আংকেলের নম্বর পেলাম, কথায় বুঝলাম অমায়িক মানুষ

• কিন্তু এমন মফস্বলে, ধরা যায় গ্রামে একটা মেয়ে এসে এভাবে হইচই করবে….

• আমি তো আর আসবো না এখানে, তুই একটু মানিয়ে নিস, হয়তো এটাই শেষ দেখা

• মানে?

• আমি মালটা যাচ্ছি….মালটা, ইউকে

• হ্যাঁ তা বুঝেছি

• কিন্তু কি কাজ নিয়ে যাচ্ছিস?

• অনেকটা হাউজকিপিং, পরবর্তীতে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করবো

• দেশ ছাড়া কি খুব জরুরি

• হুম

• না গেলেই নয়?

• তুই একবার বল, না যেতে আমি যাব না

• মানে?

• একবার হাতটা ধর

• আমি….

• এইত পারবি না! তোর হৃদয়ে এখন শুধু একজনের বসবাস

• এমন কিন্তু হওয়ার কথা ছিলো না

• হুম…. বন্ধুরা মজা করতো, আমাদের নাকি বিয়ে হবে, ওরা একদম নিশ্চিত ছিলো

• যদি নিম্মি না ফেরে?

• আমায় মালটা নিয়ে যাস

• আমি অপশন তাইতো?

চুপ করে বাইরে তাকিয়ে থাকে ফাহিমা। চোখে জল।

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
৫৪

সালমা বেগম আড়ালে বসে অনেকক্ষন কথা শুনলেন। না…. এরা সত্যিই বন্ধু! হাতটা অব্দি ধরেনা। কিন্তু মেয়েটার চোখমুখে ছেলেটার জন্য ভালোবাসা ঠিকরে বের হচ্ছে। কিন্তু ছেলেটার মনে অন্য কারো বসবাস। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে যান সালমা, তার বুকেও এমন চাপা দীর্ঘশ্বাস আছে। মামাতো ভাইকে ভালোবাসতেন, কিন্তু মৃত বড় বোনের স্বামী রমিজ আলীকে বিয়ে করতে হয়েছে বড় দুই মেয়ে চৈতী, শৈলীর দিকে তাকিয়ে। তারপর তারও সংসার হয়েছে, নিজের পেটের সন্তান মৌ এসেছে।

• কি হলো? কিছু পেলে গোয়েন্দাগিরি করে?

• নিজের বাড়িতে এমন অচেনা যুবক যুবতী থাকলে একটু ভেবে চলতে হয়

• কি পেলে?

• মেয়েটা চৈতীর ঘরে গিয়ে দরজা দিয়েছে

• যাক, তুমিও ঘুমাও, কাল ভোরে যাবে মেয়েটা

পরদিন বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেয় ফাহিমাকে রিফাত। বাস স্ট্যান্ডের পাশেই হোটেলে নাস্তা করতে বসেছে তারা, রমিজ আলী আর সালমা বেগম অনেক অনুরোধ করেছিলেন নাস্তা করার কিন্তু ফাহিমা রাজি হয়নি।

• আবার কি দেখা হবে আমাদের?

• তুই চাইলে হবে। আবার দেখা গেল কেউ আমার বাড়িতে তোর আমার কথা জানিয়ে দিলো আর আমারও একটা সবুজ ভাই জুটে গেল

দুজনেই হেসে ফেলে ফাহিমার কথায়।
• মাকে কিভাবে রাজি করাবো?

• তোর কাছে মা কে রাজি করানো বেশি কঠিন
লাগছে? আমার তো মনে হয় নিম্মি রাজি হবেনা

• নিম্মি মায়ের জন্যই এমন করেছে আমার সাথে

• নিম্মি তোকে ভালোবাসে?

• হ্যাঁ

• কিভাবে জানলি?

• রাইসার বিয়েতে কত কাজ করলো, একেবারে ঘরের মেয়ের মতো

• আমার পরীক্ষা না থাকলে আমিও কাজ করতাম তার মানে কি….

• তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তোর কথা আলাদা

• বাসের সময় হলো

• আধঘন্টা পরপর বাস পাবি, চিন্তা করিস না

• এখান থেকে শহরে, শহর থেকে ঢাকার বাস

• বেশি চিন্তা হলে আমি আসবো?

• তুই পারবি?

• না পারার কি আছে?

• অফিস?

• আজ বৃহস্পতিবার, আমি স্যারকে ফোন করে দিচ্ছি

• ফোনেই কাজ হবে?

• নাহলে বকা খাবো, সমস্যা নেই

ফাহিমা আরেকটু সময় রিফাতকে পাশে পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনা। দুজন রওনা হয় শহরের পথে, জানালার পাশে বসায় রিফাত ফাহিমাকে, প্রতিটা অপরিচিত মানুষের ছোয়া থেকে আপ্রাণ বাচিঁয়ে চলেছে ছেলেটা….

নিম্মি তুমি কি জানো এক সমুদ্র ভালোবাসা বুকে নিয়ে কি অদ্ভুত একটা ভালো মানুষ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে? হ্যাঁ সে একটা ভুল করেছে, তার জন্য তাকে এভাবে কষ্ট দিও না। লেখাটা লিখে সেভ করে রাখে ফাহিমা। নিম্মিকে একদিন মেসেজ করবে তবে আজ না! শহরে নেমে ঢাকার ভালো বাসে টিকিট কেটে তুলে দেয় ফাহিমাকে রিফাত। তারপর বাড়ির পথে এগোয়। জোহরের আজান দিয়েছে। মসজিদে নামাজ আদায় করে বাসার পথ ধরলো রিফাত। বাবা আসেনি নামাজে, কি হলো আবার? বাসায় ঢুকতেই কেমন এক শূন্যতা গ্রাস করে রিফাতকে। রাফিয়া দৌড়ে এসে কি কি যেন বলে,

• বাবা বিয়ের কাজ করে ক্লান্ত, তাই আজ মসজিদে যায়নি। হাটু ব্যথাটা বেড়েছে…. মা নামাজ পড়ছে, গোসল সেরে ভাত খাবে ভাইয়া

মাত্র কয়েকটা দিনেই যেন বাড়িটা অপরিচিত লাগছে। দুই বোনের কলকাকলিতে মুখরিত থাকত বাসা। ছুটিতে এসে ফেরার ইচ্ছে করতো না। বাবা ফ্যাকাসে হাসি দিলো। মা লম্বা মোনাজাত করছে চোখের পানি ফেলে। রিফাত পিছনে বসে থাকে, মা মোনাজাত শেষে পিছন ফিরে ছেলের দিকে ভেজা চোখে হাসিমুখে তাকান।

• কার জন্য এত দোয়া কর মা?

• পৃথিবীর যত মানুষ বিপদে আছে, যত মানুষের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সমস্যা, নিরাপত্তার অভাব আছে, যত মানুষ আজ হাসপাতালে ভর্তি, যত মানুষের আজ কবরে মুনকার নাকিরের সওয়াল জবাব চলছে, আযাব চলছে, জীবনে কঠিন পরীক্ষা চলছে, মায়ের কোল খালি হয়েছে, নবজাতক মা হারা হয়েছে, নিজের মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব নেই, প্রিয়জন শুয়ে আছে মর্গে, রাতের ট্রেন,বাসে যাত্রা করছে, পথের বালা মুসিবত আছে সবার জন্য দোয়া করি

• বাহ, আর একটা মানুষের জন্য কি দোয়া করতে পারো?

• নিম্মি?

• না মা, আমার জন্য

• তোর জন্য তো সবসময় আল্লাহ পাককে স্মরণ করি

• মা কোনভাবে কি…..

• না, নিম্মিকে আমি মানতে পারবো না

• কেন মা?

• কারণ ও তো আর এখন স্বাভাবিক নেই, তুই আমার একমাত্র ছেলে, তোর স্ত্রী হবে সুস্থ স্বাভাবিক মেয়ে, ঐ সতীনের ঘর করে ও কি আর শারীরিক, মানসিকভাবে সুস্থ আছে?

• আছে মা, এখনো সময় আছে

• এটা আমার আত্মসম্মানের ব্যাপার, এখানে আমি নিজেকে ছোট করতে পারবো না, আমাদের সামাজিক মর্যাদা আছে, বিবাহিতা মেয়ে, তালাক দিয়ে বিয়ে করানো, কোনভাবেই সম্ভব না

• মা তুমি জানো বিয়েটা কিভাবে হয়েছে

• হ্যাঁ সব জেনেই বলছি এটা সম্ভব না, গোসল করে খেতে আয়, এই বিষয়ে আমি আর কিছু শুনতে চাইনা, বলতেও চাইনা, তোর বান্ধবী ফাহিমার কথা ভেবে দেখতে পারিস, মেয়েটা চমৎকার

• ও বিদেশ চলে যাচ্ছে

• তো মানা কর

• আমি মানা করলেই ও কেন শুনবে?

• তুই একবার বলেই দেখ

• বাদ দাও মা, আমি গোসলে যাই, ভাত দাও

চলবে