শ্রাবণের মধ্যদুপুর পর্ব-৪+৫+৬

0
19

শ্রাবণের মধ্যদুপুর

রান্না ঘরে একসাথে কাজ করছে নিম্মি আর মিনতির মা।
• তোমার ফুফু প্রতি মাসে কেন আসে জানো?

• ডাক্তার দেখাতে

• নারে মা ডাক্তার সে দেখায় না

• তাহলে

• তোমারে দেখতে আসে

• আমাকে দেখার কি আছে

• তোমাকে সে ছেলের বউ করতে চায়

• শুনেছি

• তোমার কি মত

• বাবা যা বলবে তাই

• তোর ফুপু কিন্তু মানুষ সুবিধার না, তার মেজাজ মর্জি মুখের কথাও খারাপ, আবার শুনেছি একটা মেয়ে আছে অসুস্থ

• হ্যাঁ নাম সাধনা

• তোমারে নিতে চায়, তুমি যাতে ঐ মেয়েটারে দেখে রাখ, স্বার্থ ছাড়া আজকাল কেউ কোন কিছু করতে চায় না, আর তোমার বাবার যা কিছু আছে সব তো তোমারই, যা করবা বুইঝা করবা, তোমার তো মা নাই যে তোমারে বুঝাইবো, আমি অশিক্ষিত মানুষ, যা বুঝি অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝি

নিম্মি চুপ করে থাকে। সে আসলেই জানে না তার কিছু করা উচিত কিনা। সবুজ ভাই মানুষ ভালো। একটু বেশি বয়সে পাশ করেছেন ডিগ্রি। আর লেখাপড়া করবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু নিম্মি অনেক দূর পড়তে চায়। বিয়ে হয়ে গেলে যে ফুপু তাকে একেবারে রান্না ঘরে বন্দী রাখবে এটা সে বোঝে। সাধনার দেখভালের জন্য আসলেই আপন মানুষ দরকার।

সরিষা পোস্ত কাঁচা মরিচ বেটে দিয়ে মিনতি মা বলল,

• এবার সরষে ইলিশটা রেধে ফেলো

• আচ্ছা

ফুপু গোসলে গিয়েছেন গোসল থেকে ফিরে গরম গরম ভাত দিয়ে সরষে ইলিশ খাচ্ছেন। সাথে চিংড়ি দিয়ে এঁচোড়ের তরকারি, ডাল সজিনা আর ডিম ভুনা। এত পদ এই বাড়িতে শুধু ফুপু আসলেই করা হয়। নানাবাড়ি থেকে কেউ আসলে নিম্মিকে এত চাপ নিতে দেয় না। খালারা আসলে, মামীরা আসলে খাবার রান্না করেই নিয়ে আসেন। ফুপু বোধ হয় আস্তে আস্তে তাকে তৈরি করে নিচ্ছেন পুত্রবধূ হিসেবে। ভীষণ মন খারাপ হয় নিম্মির। ফোন বন্ধ করে বালিশের তলে চাপা দেওয়া আছে। ফুপুর নজরে পড়লে খবর আছে। একবার সানন্দা পত্রিকা হাতে দেখে কি হইচইটা বাঁধিয়ে দিয়েছিল। সানন্দা পত্রিকা এমনিতে বাড়িতে কখনো রাখা হতো না। বাবার কলিগের স্ত্রী নিয়মিত সানন্দা নিতেন। ট্রান্সফারের সময় অনেকগুলো পত্রিকা রেখে যান৷ বাবা নিয়ে আসেন বাসায় নিম্মির পড়ার শখ বিধায়। পত্রিকার সামনের পাতায় কোন এক নায়িকার ছবি ছিল। ব্যাস আর পায় কে! নায়িকার ছবি দেখে ফুপুর ভয়ংকর চিৎকার! নিম্মির বংশের মান সম্মান ডুবাচ্ছে বাবার অগোচরে! বাবা নিজেই লজ্জা পায়। এখন মোবাইল ফোন দেখলে আবার কি করে!

বেশ গরম পড়েছে। বাবা বারান্দায় শুয়েছে। একবার দেখে আসবে কিনা ভাবছে নিম্মি, সারাদিন বাবারও খাটনি গেছে। ফুপুর টানা কথা শোনাও ক্লান্তিকর। ঘুম আসছে না কোন এক অজানা কারণে। আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। নারিকেল পাতার ফাঁকে ঝিরিঝিরি আলো আসছে, অপার্থিব সৌন্দর্য। জানালায় দাঁড়িয়ে রইলো অনেকক্ষন। দরজায় কড়া নাড়ছে কে যেন, বাবা তো ডাকেন না এই সময়। খুলতেই ফুপু দাঁড়িয়ে।

• কি জেগে আছিস?

• জি

• সকাল সকাল ঘুমাইতে হবে সকাল সকাল উঠতে হবে

• রাত জেগে পড়ার অভ্যাস আছে

• এসব এখন বাদ দেওন লাগবো

• কেন

• জীবন কি আর খালি ওই বই পড়া ওই দুই পদ রান্না করলেই হয়?

• তাহলে জীবন কি?

• আমারে দেখস নাই? তোর ফুফা মইরা যাওনের পর থেকে এত কষ্ট কইরা জীবন চালাইতেছি

ফুপু আসন গেড়ে বসে গেলেন নিম্মির বিছানায়। ঘরের আসবাব দেখছেন। আলনায় ঝোলানো নিম্মির অন্তর্বাস দেখে লুকিয়ে রাখতে বললেন। পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্প উপন্যাস পড়া কত বাজে অভ্যাস! মেয়েরা ঘর সংসারের কাজ করবে! এত পড়ে কি হবে বিষয়ক বিশাল আলোচনা ফেদে বসলেন!

শ্রাবণের মধ্যদুপুর

ফুপার মৃত্যুর পর থেকে খুব কষ্ট করেছেন ঠিক আছে কিন্তু প্রতি মাসে বাবাকে যে মোটা অংকের একটা ভর্তুকি দিতে হত এটা নিম্মিও জানে। সেটা নিয়ে বাবাকে কেউ কখনো কিছু বলেনি। ফুপু নিজে এসে টাকাটা নিয়ে যেতেন প্রতিমাসে। বছরখানেক হলো স্বপন ভাই এই জিনিসটা বন্ধ করেছেন। একদিন এসে বাবার দুহাত ধরে বলেছিলেন, আপনি যা করেছেন আপনার ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু ব্যাপারটায় ফুপু খুব একটা খুশি হতে পারেননি। শুনে বলেছিলেন, সংসারে বহু খরচা থাকে আমার ভাই আমার দুটো টাকা দিলে তোদের কি যায় আসে? ভাইয়ের সংসারে আছেই আর কে। চাকরি করছে বেতন পায়, আমার বাপের জমির উপরে বাড়ি করে আছে। কিন্তু সবুজ ভাই স্পষ্ট স্বরে বাবাকে টাকা দিতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর থেকে টাকাটা বাবা একটা ডিপিএস খুলে জমা করেন।

• কি এত ভাবিস?

• কিছু না

• মাইয়াদের ভাবুক হইতে নাই, ভাবুক হইতে পারে পোলারা তারা কবিতা লিখব, প্রেম করবো, মাইয়াদের সংসারী হইতে হয়, তোর মা নাই তোরে আর এগুলা কে শিখাইবো? এজন্য আমি মাসে মাসে আইসা তোরে দেখি

মিনতির মায়ের প্রতিটি কথায় সত্য। নিম্মি ভাবতে থাকে। দরজায় আবার টোকা, দরজা খোলাই ছিল। বাবা আসেন,
• সালেহা যাও ঘুমায় যাও

• কেন ভাইজান ভাস্তির সাথে একটু কথা বলবো না?

• সারাদিন মেয়েটা রান্নাঘরে লেগেছিল এখন একটু ঘুমাক

• তাহলে আপনি বলতে চান যে আমি আসছি দেখে মেয়েটার কষ্ট হয়ে গেছে?

• সালেহা কথা বেশি বোঝা বন্ধ কর, ঘুমাতে যাও

• মাইয়ারে এমনি পাহারা দিয়ে কয়দিন পারবেন?

• ঘুমাতে যাও

অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফুপু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাবা নিম্মির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

• মারে দুনিয়াটা অনেক কঠিন

• জানি বাবা

• আমি চেষ্টা করব তোকে ছায়া দিয়ে যাওয়ার, বাকিটা আল্লাহ ভরসা

• চিন্তা করো না বাবা, তুমি থাকলেই হবে

বাবা চলে যান, ক্লান্ত পায়ে । বাবা কি জীবনটা বয়ে বেড়াচ্ছে? শুধুমাত্র তার জন্য? নিম্মি আবার জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মন খারাপ হয়। ভীষণ খারাপ। চাঁদ কিছুটা সরে গেছে। কিন্তু তার আলো ঠিকই আসছে। চাঁদের আলোয় উঠান ভেসে যাচ্ছে। মন ভীষণ খারাপ লাগছে নিম্মির। ফোন বালিশের তলা থেকে বের করে, দেখে অসংখ্য মেসেজ। মন ভালো হয়ে যায় তার। অনেক রাত অব্দি শুয়ে শুয়ে পড়ে মেসেজগুলো। বারবার পড়ে!

“ আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে
খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু – একই আলো পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়… ”
(জীবনানন্দ দাশ)

শ্রাবণের মধ্যদুপুর

ফুপু শনিবার সকালে চলে যায়। এবার থেকে গেলেন৷ কিছুতেই অংক ক্লাস মিস দেওয়া যাবেনা৷ এদিকে সকালে উঠতেও দেরি হয়ে গেছে নিম্মির। চা বানিয়ে, বাবা,ফুপুকে চা বিস্কুট দিয়ে দৌড়ে যায় ক্লাসে৷ ফুপু মুখটা শক্ত করে ছিলেন। অংক আর ইংরেজি ক্লাস করেই বাসায় এসেছে নিম্মি। এসে দেখে বাবা অফিসে, ফুপু মিনতির মাকে দিয়ে বাথরুমের পিছনের ঝোপঝাড় পরিস্কার করাচ্ছেন।

• আসছো? আমি তো ভাবলাম সারাদিনের মত গায়েব? তোমার বাপে যে ছুট দিয়ে রাখছে, শ্বশুরবাড়িতে এমন পাইবা?

• সে জইন্য কি একটা মাইয়া বাপের বাড়িতেও কষ্ট করবো? জবাব দেয় মিনতির মা

• কামের বেটি কাম করবা ,মুখে মুখে কথা কইবা না ধমক দেয় ফুপু, যাও মুখ হাত ধুইয়া স্বাইস্থ্য কমপেলেস যাইতে অইবো

• স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

• হ, বুঝলেই হইলো

কলেজে সালওয়ার কামিজের উপরে চওড়া ওড়না মাথায়, শরীরে পেঁচিয়ে যায় নিম্মি। মুখ হাত ধুয়ে সামান্য কিছু খেয়ে তৈরি হয়ে নেয় নিম্মি।

• এমনে যাইবা?

• জি

• না, বুরকা পরো

• আমার তো বোরকা নাই

• মা নাই কে শিখাইবো, আমার বুরকা পইরা নাও। আমি দুইটা আনছি

নিম্মি বোরকা পরে নেয় বিনা বাক্যে। দুজন রিক্সায় উঠে পড়ে। ফুপু নানা নীতিবাক্য ঝাড়ছিলেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পৌঁছে দেখে বিশাল লাইন।

• এই জইন্যেই সকাল সকাল আসতে চাইছিলাম, তোমার তো কলেজ পইরা গেল

নিম্মি চুপ করে আছে। লাইনেও ফুপুর অসহিষ্ণুতায় মানুষ বিরক্ত। অবশেষে ডাক্তারের কাছে বসলেন। হাটুর ব্যথার জন্য ওষুধ চাইলেন৷ ডাক্তার একটা পরীক্ষা আর ওষুধ দিলেন। কাগজটা ওষুধ পেতেই ফেলে দিলেন ফুপু৷ নিম্মি অবাক,

• হাটুর এক্সরে করাবেন না?

• ওষুধ খাইয়া যা হয়, অত রোগ সারায়া কাম নাই, বৌ আনুম কয়দিন পর, সংসার বুঝাইয়া দিমু, আমার দায়িত্ব শেষ

• ডাক্তার যে বললেন?

• ঐ ডাক্তারনি তো কত কিছুই কইবো, সব মানা যাইবো, এরা টাকা খাইয়া ওষুধ লেখে টেস দেয়, এইগুলান কুনু কামের না, ঐ যে বেডি হইয়া এত গুলা মরদ মাইনষের মধ্যে বইসা, চুল খুইলা রুগী দ্যাখতাছে, এগুলান ভালো বাড়ির মাইয়ার কাম? এগুলা ভালো বাড়ির মাইয়া না। এদের দেইখা বড় পাস দিমু ডাক্তার হমু এগুলান বলবি না! পর্দা পুসিদার একটা ব্যাপার আছে না?

• আমার মায়ের সময় যদি ডাক্তার আসতো তাইলে আজ মা আমাদের মাঝে থাকতো

• ডাক্তর তো আনছিলো তর বাপ, পুরুষ ডাক্তর, আমি দেখাইতে দেইনাই, তর নানীর কি কান্না, নারীর ইজ্জতের চেয়ে বড় কিছু আছে? বেগানা পুরুষ মেয়েমানুষের গোপন জিনিস দেখবো ছি ছি

• ডাক্তার এসেছিলো? কিন্তু দেখানো হয়নি?

সালেহা আর কোন কথা বলেনা। ডাক্তার বলেছিলো এভাবে ফেলে রাখলে বাচ্চার মা বাচবে না। আতুড়ঘরে সালেহা আর কাউকে ঢুকতে দেয়নি, সাথে তার মাও (নিম্মির দাদী) সমর্থন দিয়েছিলেন । দিশেহারা নাজিমুদ্দিন কিছু ভেবে পাচ্ছিলেন না। বাচ্চা বেরিয়ে এলেও গর্ভফুল দ্রুত বের না হলে রক্তক্ষরণে বাচ্চার মা মারাও যেতে পারেন। কিন্তু পাত্তা দেয়নি সালেহা। ডাক্তার অনেক বুঝিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন, নিজে উপস্থিত হয়েও কিছু করতে পারেননি। এই ঘটনা নিম্মি পরিস্কার ভাবে জানেনা। বাবাকেও জিজ্ঞেস করেনি, বাবা কষ্ট পাবেন সেই ভয়ে।

চলবে