শ্রাবণের মধ্যদুপুর
শেষ পর্ব
মিলি চুপচাপ বসে আছে খাটিয়ার পাশে। মেয়েটার সাথে তার কোন সখ্যতা ছিলো না, বরং ফ্রিজের বরফ নিয়ে তার সাথে সালেহার বেশ কয়েকবার ঝগড়াঝাটি হয়েছে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে কেন সে এমন করলো? ক্ষণজন্মা এই মেয়েটাকে কি সে একটু ভালোবাসা দিতে পারতো না?
জানাজা বাদ জোহর রাখা হয়েছে। নাজিমুদ্দিন মসজিদে বসে আছেন। অনেকটা লুকিয়ে জানাজা পড়ে চলে যাবেন ভেবেছেন। নিম্মি আসতে চাইছিলো, কিন্তু বোনকে চেনেন নাজিমুদ্দিন, পুরো গ্রামের সামনে মেয়েটাকে হেনস্তা করবে, নিজের মেয়ের মৃত্যু শোক ভুলতে তার সময় লাগবে না। সবুজ এদিকে আসছিলো, তাকে দেখে সালাম দিয়ে বাসায় যেতে বলে, কিন্তু তিনি ভরসা পাননা। মসজিদেই ঠিক আছেন। সুমনা ছোটবেলায় খুব বায়না করতো, মেলায় নিতে হবে, চুড়ি ফিতা, জিলাপি, বাতাসা কিনে দিতে হবে। ঈদে বাজার নিয়ে এলে তার জন্য আলাদা কিছু আনতে হতো, অসুস্থ হয়ে মেয়েটা আর সামনেই আসতো না।
ফাল্গুন মাসেই চৈত্রের গরম। সবুজ বরফ আনতে পাঠায়। যদিও কিছুক্ষণ পরেই জানাজা। বোনের জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করছে! বিদেশে থাকাকালীন মা বলতো, বিয়ার পর তো পোলায় পর হইয়া যায়! সুমনা আইসক্রিমের বায়না করতো, মেলা ছাড়া এখানে কোন দোকানে আইসক্রিম ছিলো না। বাজারে একটা দোকানে ফ্রিজ আছে, তাদের কাছে আইসক্রিম ছিলো। চাচারা বাজারে গেলে আইসক্রিমের বায়না জুড়ে দিত সুমনা, আনলে তো একার জন্য আনা যায়না, বাড়ির সব বাচ্চার জন্য আনতে হতো, সবুজ বাড়তি টাকা পাঠাতো যেন সুমনার আইসক্রিম হয়। সে আজ আইসক্রিম খাবেনা, তার দরকার বরফ! বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। মাহফুজ জানায়, গোসল হয়ে গেছে। সবুজ গিয়ে বোনের মুখটা দেখে অদ্ভুত পবিত্র লাগছে মুখটা। যেন সদ্য জন্মানো এক পরী! এই মুখ চিরতরে দেখা বন্ধ হয়ে যাবে। কোনদিন একটা নরম হাত তার বাহু জড়িয়ে বলবে না,
• ভাই আর যাইয়েন না বিদেশ! দ্যাশে যা হয় তাই সই।
সুমনা ছাড়া কেউ তাকে এভাবে দেশে ফিরতে আহবান করেনি। আপনি না থাকলে বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লাগে….
আর কেউ বলবে না। আর কেউ পাকা আতা তার আসা উপলক্ষে পেড়ে রাখবে না। হাটতে হাটতে মসজিদের সামনে চলে এসেছে সবুজ। মসজিদের পাশেই একটা শিমুল গাছ। লাল ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ফুল ছড়িয়ে আছে গাছের নিচে। তার ফুলের মতো বোনটাও আজ চলে যাবে মাটির নিচে। ওখানেই বসে পড়ে সবুজ, কেঁদে ফেলে। মামা এগিয়ে এসেছেন। কাধে হাত দিয়ে শক্ত হতে বললেন। মানুষটা নিজেও অসুস্থ অথচ তাকে বাড়িতে নেওয়া যাচ্ছেনা। সবুজ উঠে দাঁড়ায়, চোখ মুছে এগিয়ে যায় মসজিদের পিছনে, ইমাম সাহেবের ঘর। ইমাম সাহেব ঘরেই আছেন, মামাকে একটু ঘরে বসতে দেওয়ার অনুরোধ করে।
দাফন শেষে নাজিমুদ্দিন বাস ধরতে যেতে চান। বাড়িতে যাওয়ার সাহস হয়না। তার বোন নাকি নিম্মির উপর সব দায় চাপিয়েছে। নিম্মির কারণে পুরো চিকিৎসা হয়নি মেয়ের। সবাই বলাবলি করছিলো। মেয়ের প্রতি যত্ন কোনদিন ছিলো না এখন দোষ নিম্মির। মানুষ ভ্যানে করে নিম্মিকেই নিয়ে যেতে দেখেছে। নিম্মি কেন চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটাবে এই প্রশ্ন মাথায় এলেও কেউ করেনি। সালেহা ঘুম থেকে উঠে কি কান্ড করবে তাতে ভয়ে কাঠ হয়ে আছে সবুজ। কারণ মেয়েকে শেষ দেখা সে দেখতে পারেনি। ডাকলেও উঠতে পারেনি।
সুমনার দাফন শেষ হতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। সবাই খুব অবাক হয়। ভিজে ভিজে কবরের পাশে কাঁদার মতো সুমনার কেউ নেই। সবাই কবরস্থানের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে থাকা বৃদ্ধের ঘরে আপাতত আশ্রয় নেয়। ভেজা মাটির অপুর্ব ঘ্রাণ। গাছের শুকনো পাতার ঘ্রাণ, আমের মুকুলের ঘ্রাণ…. তবে কি বিধাতা সুমনার বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন৷ সবচেয়ে অবহেলিত, দুঃখী মেয়েটার কি তবে এখন সুখ হবে? সবুজ বাইরে তাকিয়ে ভাবে। নাজিমুদ্দিন পড়লেন বিপাকে। এই বৃষ্টিতে ভেজা শরীরে কিভাবে বাসে চড়বেন, নির্ঘাত জ্বর আসবে। আবার বোনের বাড়িতে পা রাখা মানেই নিজের মেয়ের ইজ্জতহানী! সবুজ কাছে এসে দাঁড়ায়,
•মামা বাড়ি চলেন, মা ঘুমায়, বৃষ্টি কমলে আমি আপনাকে বাসে উঠিয়ে দেব
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নাজিমুদ্দিন সাহেব রাজি হন৷ সবুজদের নতুন ঘরে বসায় মামাকে। মিলি শরবত বানিয়ে আনে। সবুজ অবাক হয়। মরা বাড়িতে চুলো না জ্বলার রীতি এখন কেউ মানেনা। তাও মিলি চা না বানিয়ে শরবত বানিয়েছে৷ নাজিমুদ্দিন কোন কথা না বলে শরবত খান। সকালে আধখানা রুটি খেয়ে এসেছেন। ওষুধ ঠিকঠাক খাননি৷ এখন অসুস্থ বোধ করছেন। নিম্মি বলেছিলো এভাবে একা একা না আসতে, কিন্তু কি করার…. নিম্মিকে আনা সম্ভব ছিলো না।
সবুজের একটা ফোন আসে,
সুমনাকে রক্ত দিতে আসতে চাইছে একজন, কোথায় আসবে জিজ্ঞেস করলেন, সবুজের বুকটা হঠাৎ খালি হয়ে গেল, ধীর গলায় বলে, সে নেই, আসার আর দরকার হবেনা। যাতায়াত ভাড়া দিয়েছে তাকে রিফাত, কাকে বিকাশ করবে ফেরত দিতে জিজ্ঞেস করে, তাকেই করেন বলে রেখে দেয় ফোন। নিম্মির জন্য এতখানি কি সে কোনদিন করতো? নিম্মিকে পাওয়ার যোগ্যতা আসলে তার, তার কাছেই নিম্মি ভালো থাকবে।
সবুজের চাচী এসে সবাইকে দুপুরের খাবার পরিবেশন করলেন৷ ফুপুরা আজ কোন দোষ ত্রুটি বের করলেন না। দাদী শুধু বললেন, সুমনার ব্যবহার্য জিনিসপত্র দান করে দিতে, সোনা গহনা তো ছিলো না তার। কেউ কোন উত্তর করলো না৷ কোনরকমে সামান্য ভাত মুখে দিয়ে নাজিমুদ্দিন রওনা দিতে চাইলেন। সবুজ এগিয়ে দিতে চাইলে ওর এক বন্ধু বাইকে করে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দিতে গেলো। একা কথা বলার সুযোগ হলো না। হলে কি বলতো সবুজ? মাফ চাওয়া সম্ভব? নাকি অনুরোধ করা সম্ভব মেয়েকে সতীনের ঘর করতে দেওয়ার? তার মেয়ে হলে সে পারবে?
#
সকাল থেকে ভীষণ গুমোট প্রকৃতি। ঘুম ভাঙতেই দুঃসংবাদ। অনেকদিন ক্লাস মিস গেছে৷ আজ কলেজে ক্লাস করে, কোচিং এ যায় নিম্মি। গরমে সিদ্ধ। ফাল্গুনের দুপুরে এত গরম! বাবা এই রোদে জানাজা পড়ছে? ভাবনা হয়, কিন্তু সংকোচ কাটিয়ে সবুজকে কল দিতে পারেনা৷ কল আসে রিফাতের,
•তোমার বোন মারা গেছে?
•হুম, আজ ভোরে
•আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
•আসলে…. বলতাম, বাবা গেল জানাজা পড়তে, আমি এলাম ক্লাস নিতে
•তুমি ক্লাস নিচ্ছ?
•হুম
•বেশ আমি আসছি
নিম্মি ক্লাশ শেষ করে বের হয়৷ সকালে কিছু খায়নি, পেট গুড়গুড় করছে। আকাশ মেঘলা, কেমন যেন থমথমে। কোন রিকশা নেই রাস্তায়, ছাত্র ছাত্রীরা বেরিয়ে গেলে সেও বের হয়। রাস্তার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রিফাত। এক দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে পাশে আসে। চুপচাপ পাশে হাটতে থাকে, ঠিক তখনই শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। ফাল্গুন মাসে বছরের প্রথম বৃষ্টিতে দুজন ভিজে ভিজে হাটে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি থামার নাম নেই, যেন “শ্রাবণের মধ্যদুপুর” রিফাত প্রথম বারের মতো হাত বাড়ায় বিনা সংকোচে হাতটা ধরে নিম্মি। দোকানের ঝাপি বন্ধ, খুললে দেখতে পেত, ভরদুপুরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুজন তরুণ তরুণী হাটছে হাত ধরে, দুজনের চোখে জল। কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দিচ্ছেনা!
(সমাপ্ত)
এক শব্দে হলেও জানাবেন কেমন লেগেছে। নতুন ধারাবাহিক ইন শা আল্লাহ ঈদের দিন থেকে শুরু করবো।