শ্রাবণের মধ্যদুপুর পর্ব-৭+৮+৯

0
20

শ্রাবণের মধ্যদুপুর

কলেজে এসএসসি পরীক্ষা চলে। তাই প্রায় দেড় মাস ছুটি। কোচিং ও বন্ধ দিয়েছে, টিউশনির বাচ্চারা দাদী বাড়ি থেকে ফেরেনি। নানী একদিন বাবার অফিসে ফোন করলেন। নিম্মির মোবাইল নাম্বার নানিবাড়ির কাউকে দেওয়া হয়নি। বাবাকে একা রেখে নিম্মি খুব একটা নানী বাড়ি যায় না। কিন্তু এবার সে যাবে। কিছু প্রশ্নের উত্তর তার চাই।

শুক্রবার ভোরবেলা বাবা নানী বাড়িতে নিয়ে গেলেন নিম্মিকে। সাধ্যমতো জামাই আদর করলেন নানী। বিধবা মানুষ। ছোট্ট একটা ঘর পেয়েছেন। বাকি ঘর ফসলি জমি সব ভাগ করে নিয়েছে মামা খালারা। নিম্মির মায়ের অংশটুকু নিয়েও অনেক অশান্তি হয়েছিল। বাবা শেষ পর্যন্ত বলেছিল, মায়ের অংশ তার চাইনা। নানি বলেছে এই এক চিলতে ঘর নিম্মিকে দেবে। বাবা দুপুরে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করেই চলে গেল। রাতে এখানে থাকার জায়গা ছিল না। মামা খালারা তেমন একটা ভালোভাবে নেয় না বাবার আসা যাওয়াটা।যে যার জীবনে ব্যস্ত। মরা মানুষের খোঁজ কে রাখবে? কিন্তু নিম্মি খোঁজ নিবে, তার মায়ের সাথে কি হয়েছিল আসলে। বিকেলে নানী নাতি একসাথে উঠানের শেষ প্রান্তে বসে। যতদূর চোখ যায় শুধু কচি ধানের ক্ষেত সবুজ আর সবুজ। একটু বাতাস খেলে গেলেই অপরূপ লাগে।

• নানী তোমার সাথে কিছু কথা আছে?

• বল নানুভাই

• আমি মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে চাই

• সব তো জানিস

• ডাক্তার এসেছিলো? তোমরা দেখাওনি কেন?

• তোর দাদী, ফুপু আর দাই মিলে পুরুষ ডাক্তার ঢুকতে দেয়নি, তখন তোরা গ্রামের বাড়িতে ছিলি, সেদিন ছিলো ভীষণ বৃষ্টি। আকাশ যেন তার সমস্ত কান্না একেবারে ঢেলে দিতে চাইছিলো! তোর মায়ের প্রসব বেদনা উঠেছিল ভোর বেলা। ঘন কালো মেঘে চারপাশ আধার। আমি সময় অনুযায়ী গিয়েছিলাম। নাহলে তখন এমন টেলিফোন ছিলো না। দাই ডাকা হয়েছিলো। তোর অবস্থান ভালো ছিলো, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো, তোর আগমন হলো রাত আটটায়। যে অস্থায়ী আতুড় ঘর করেছিলো তাতে পানি উঠে গেছে। মেঝেতে খড় বিছানো, তোর বাবা কিছু ইট এনে বিছিয়ে দিলো, দাই তোকে দিয়ে গেল, ফুটফুটে মুখ খানা দেখতে ঐ বৃষ্টি মাথায় করে গ্রামের লোক ভীড় করলো। কিন্তু গর্ভফুল তখনও বের হয়নি। রক্ত যাচ্ছে প্রচুর। দাই এসে বললো একটা নার্স ডাকতে তখন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছিলো না। আর এই আবহাওয়ায় কোন নার্স আসবেনা, তোর বাবা সদর হাসপাতালের কাউকে আনতে না পেরে মিশনারি হাসপাতালে গেল বৃষ্টি তখনও পড়ছে মুসলধারে সেই সাথে ঝড়ো বাতাস, তোর দূর সম্পর্কের চাচার ভ্যান নিয়ে বের হয়েছিল তোর বাবা। মিশনারির ডাক্তার শুনেই চলে এলেন৷ কিন্তু…

• কি?

• তোর দাদি, ফুপু, দাই কেউ রাজি না তোর মায়ের এই অবস্থায় তার ওখানে যাওয়া, মেয়েদের পর্দার একটা ব্যাপার আছে

• পর্দা বড় না জীবন বড়?

• বলেছিলেন সেই ডাক্তার! কিন্তু কে শোনে কার কথা। তোর বাবা অনেক হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করেছিলো কিন্তু কাজ হয়নি

• বাবা শক্ত গলায় কেন বলেনি আমার স্ত্রী আমার সিদ্ধান্ত

• ভুল তো ছিলো, তাছাড়া জীবন বড় না পর্দা বড় সেটা শেখানোর কেউ ছিলো?

নানী নাতনি দুজনেই চোখ মোছে। মাসুম, নিম্মির মামাতো ভাই এগিয়ে আসছে, হাতে ঠোঙ্গা।

• কেমন আছ নিম্মি আপু?

• কত বড় হয়ে গেলিরে মাসুম

• তুমি তো আস না, দেখো না তাই বড় লাগে

• বাবাকে একা রেখে আসতে পারিনা

• দাদী তোমাকে খুব ভালো পায়, পুকুরে মাছ মারলে নিজের ভাগেরটা তোমার জন্য রাইখা দেয়, কেউ গেলে পাঠায়, ফুপার কি একলা খাওয়ার কষ্ট?

• না কষ্ট না, এক খালা আছেন, উনি রান্না করবেন, বাবা খাবে

• একা খাওন যায় না, মায়ে রাইন্ধা গোসলে গেলে, আমি বইসা থাকি

• আমার তো মা নেই

মাসুম বুঝলো ভুল কথা বলে ফেলেছে৷ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। নিম্মি হাত বাড়িয়ে বলে,

• কি এনেছিস আমার জন্য?

• সদাই

• তোদের তো সবকিছু সদাই

ঠোঙ্গার ভিতরে চানাচুর আর শন পাপড়ি৷ দুটোই ভীষণ ভালোবাসে নিম্মি। মিনি এগিয়ে আসে। মাসুমের ছোট বোন মিনি।

• কিরে কোন ক্লাসে উঠলি মিনি?

• ক্লাস টু

• বাহ! আম দিয়ে কি করবি?

• আম মাখাবো

• পারিস তুই?

• বটি ধরলে মা তোরে পিটাবে, বলে মাসুম

• দে বটি এনে দে, আমি কেটে দেই

• তুমি পারো?

• পারবো না কেন?

• মাসুম তুই এমনই থাকিস আজীবন

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মাসুম,
• ওরে কি আর এমন থাকতে দিবো দুনিয়া? কি মারটা খাইলো আমার নাতিন

• কেন?

• দোকানে বইছিলাম, এক বুড়া ভিক্ষুকরে কলা,পাউরুটি দিছিলাম টাকা নেইনাই, তাই আব্বা মারছে

• আমি সেদিন না থামাইলে কি যে হইত! আমিও কইছি আমার নাতিরে আর যদি মারে আমি চেয়ারম্যান সাবের কাছে বিচার দিবো

নিম্মি আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকে ধানের জমির দিকে। বটি, লবণ, মরিচ আনে মিনি। খুব ঝাল করে আম মাখিয়ে খায়, আরো ভাইবোনেরা এসে ভীড় করে৷ হুট করে মন ভালো হয়ে যায় নিম্মির।

(চলবে)

শ্রাবণের মধ্যদুপুর

সারাদিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে রাতে গভীর ঘুম, আবার ভোরে উঠে নানির হাতের মাখানো পাকা, আম, দুধ, মুড়ি খেয়ে আবার খানিক পাড়া বেড়িয়ে পুকুর পাড়ে বসে নিম্মি। অনেক পুরাতন পুকুর। পুকুরের জমি নিয়েও বিবাদ আছে, মাছ মারলে ১০/১২ ভাগ হয়। একপাশে বিশাল বাশ ঝাড় নুয়ে পড়েছে। পুরো পুকুরের চারপাশে কলা,কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারি গাছ। এক পাশে মাসুম জবা লাগিয়েছে লাল টুকটুক। একটা জবা ছিড়ে কানে গুজে নেয় নিম্মি। গ্রীষ্মের প্রখর রোদেও পানি ঠান্ডা থাকে পুকুরের। বেশ গভীর৷ সাতার জানলেও নিম্মির একা নামতে ভয় করে। গাছের ছায়া দুলে ওঠে, ছায়া সরে যাচ্ছে, বলে দিচ্ছে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আগমনী বার্তা।

• এইখানে একা বইসা কি করছ? কারেন্ট নাই? খালা জিজ্ঞেস করে

• আমি অনেকক্ষন বাইরে। কারেন্টের খবর জানিনা

• শুনলাম তর বিয়া?

• কই?

• সবুজের সাথে?

• ফুপু এমনি বলে বেড়ান

• আমারে কইলো কানের ঝুমকা বানায় রাখতে, মামা খালাদের থেকে এক সেট আর তর বাপ দিব এক সেট

• এত গহনার আমি কি করবো?

• আরে শোন পাগল মেয়ের কথা! মা মরা মাইয়া তুই, তরে যে নিবে সে তো এগুলান চাইবই

• মা মরা, বাপ মরা কত কত দোষ মেয়েদের

• হ! আমার সময় দোষ ছিলো বাপ মরা, তোর খালু আমারে ভালো পাইত

• এজন্য জমিটা খালুর নামে করে তারপর বিয়েটা হয়েছিল

• এগুলান ধরতে নাই, বিয়াতে হাজার কাম হইবো, সব ধরলে সংসার হয়না, ডুব দিবি? নাম আমার সাথে

• নাহ যাই দেখি নানী কি করছে?

• আইজ বড় ভাইয়ের ঘরে খাবি না? বাজার আনছে দেখলাম

• দেখি নানী কি বলে

ধীর পায়ে চলে যায় নিম্মি। নানী ঘরে নাই। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে সুইচ অন করে। আর হুড়মুড় করে মেসেজ আসতে থাকে। কত কবিতা, কত গানের কলি। বুকের ভেতর কেমন কেমন লাগে নিম্মির। নানীর শব্দ পেয়ে ফোন সরিয়ে রাখে নিম্মি

• চল ডুব দিয়া আসি

• খালার গোসল হোক

• কি হইছে?

• কিছুনা

• তোর মামী আজ তার ঘরে খাইতে ডাকছে

• যাব না, দুধ মুড়ি দাও

• কি হইছে?

• কিছু না নানী

• আইচ্ছা আমি তরকারি আইনা দিতাছি, তুই ডুব দিয়া আয়

নানীবাড়ির কয়টা দিন ভালোই কাটলো। ফেরার সময় নানী ফল,মাছ, দুধ, সবজি, মুরগি দিয়ে দিলেন সাথে। আর সাথে তার বিখ্যাত মরা কান্না। নিম্মিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেন, সেই কান্না কয়েক দিন হলো চলে এবার মাসুম কথা দিয়েছে তার বাবার ফোনে কথা বলিয়ে দেবে নানীর সাথে। তারপর কান্না সামান্য কমেছে!

মেসেজে মেসেজে কথা চালাচালি এগিয়ে গেল বহুদূর। কিন্তু কথা বলার সাহস তখনও হয়নি নিম্মির৷ মানুষের নামটা অব্দি জানেনা৷ অথচ অসীম ভালোবাসা নিয়ে মানুষটার মেসেজের অপেক্ষা করে সে। ওপাশের মানুষটা আসলেই তাকে ভালোবাসে কিনা এই প্রশ্ন কখনো মাথায় আসেনি তার৷ মেসেজ আসে,

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার–
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।

(অনন্ত প্রেম
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

ভালোবাসার অপর পিঠেই যে মন্দবাসার চিত্র লুকিয়ে তা নিম্মির তরুণীমনে আসেনা। নিম্মির মনের আকাশে প্রতিনিয়ত ফুটে ওঠে হাজার ঝিকিমিকি তারা। তারা গুলো মিটি মিটি হাসে আর নিম্মিকে জিজ্ঞেস করে, কি বলবে সে মানুষটার দেখা পেলে?

বাড়ি ফিরে দেখে বাসার অবস্থা বেহাল৷ বাবা রান্না করে দিলেও ঠিকঠাক খায়না। কাপড় চোপড় সবকিছু এলোমেলো করে রাখা। গাছের ফল সময়মত পাড়া হয়নি। নিম্মি এসে সব আবার গুছিয়ে নিল। কোচিং, কলেজ, টিউশনি সব আবার শুরু হলো। তার মধ্যে ফুপুর সেই অত্যাচার। মফস্বলে একটা মেয়ের বিয়ের কথা উঠলে, সেই বিয়ে না হলে খুব বদনাম হয়৷ বাবা সামলাতে পারছেনা বিষয়টা। এদিকে ফুপু এসে মায়ের কি কি গহনা আছে দেখতে চাইলো। বাবা সেদিন কিছুটা উত্তেজিত হয়ে গেল, ভাই বোনের বাক বিতন্ডায় বাবা আবার বুকে হাত চাপা দিয়ে পড়ে গেলেন। নিম্মি আর প্রতিবেশীরা মিলে হাসপাতালে ভর্তি করালো। ফুপুকে সেদিন বাড়ি পাঠালেও, ফুপু পরদিন হাসপাতালে হাজির!

ফুপুকে সেদিন বাড়ি পাঠালেও, ফুপু পরদিন হাসপাতালে হাজির! সাথে সবুজ ভাই৷ফুপু বাবার বিছানার পাশে বসে হাউমাউ করে কান্না। নিম্মি সবুজ ভাইকে ডাকে। হাসপাতালের গেটের পাশে বিরাট এক কাঠগোলাপ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দুজন।

• আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?

• তোমার আমার রাজি, নারাজে কোন কিছু যায় আসেনা, মা একবার যা ভেবে নিয়েছে তা করেই ছাড়বে

• আপনি আমাকে পছন্দ করেন?

• তুমি আমাকে পছন্দ করোনা সে আমি জানি

• তা কেন?

• মাকে পছন্দ করা সহজ না।আর তোমার তো দেখা সাক্ষাৎ মায়ের সাথেই হয়

• তেমন কিছু না

• তেমন কিছু না হলে তুমি এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না

• আপনি কি একটা উপকার করবেন?

• কি?

• আপনি আমাকে কটা দিন সময় দিন, সামনে এইচএসসি পরীক্ষা

• পরীক্ষার পর আর পড়া হবেনা যদি আমার সংসারে আসো

• তাও আমি আমার মতো চেষ্টা করতে চাই

• আমাকে কি করতে হবে?

• ফুপু সামলানোর দায়িত্ব আপনার

• বেশ

• বিনিময়ে কি পাবো আমি?

• সবকিছুর বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করতে নেই

নিম্মি হেটে চলে গেল। সবুজ কেন কথাটা বলে বসেছে, সে নিজেও জানেনা। নিম্মি আর তার ব্যাপক অমিল। মেধাবী নিম্মি জীবনে অনেক এগিয়ে যাবে৷ এই গ্রামের ক্ষেত খামার, চাষাবাদ করা ছেলে তার ভালো না লাগাই স্বাভাবিক। হয়তো কোন ভালো ঘর থেকে সমন্ধ আসবে৷ শুধু শুধু মেয়েটার জীবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কোন মানে হয়না৷ অভিমান হয় না রাগ হয় নিজের ওপর, স্বপন বুঝতে পারেনা। মাকে না নিয়েই সে বাড়ির পথ ধরে৷ তার একা থাকা প্রয়োজন। পরিবারের জন্য স্বার্থত্যাগ করা স্বপন আজ ভীষণভাবে অনুভব করে আরেকটু চেষ্টা করে যদি পরীক্ষায় ভালো ফল করা যেত। ভালো কলেজ,ভার্সিটিতে পড়া যেত তাহলে কেমন হত!

সবুজ রাগ করে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে একটা অটো সামনে পেয়ে উঠে যায়। অটো নামায় দেয় পার্কের সামনে। সে পুতুলের মতো ভাড়া দিয়ে পার্কে ঢুকে যায়। ছোট্ট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পার্কটা। ছোট একটা মঞ্চ আছে। কোন একটা স্কুলের গ্রোগাম ছিলো। রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো। ছোট ছোট বাচ্চারা এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বাবা মা পার্কের বেঞ্চে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। ছোট ছোট স্কুল ব্যাগ টিফিন বক্স পানির বোতল আরো কত কি পাশে রাখা। মহিলাদের সংসারী কালাপ পুরুষদের অফিসের আলাপ বেশ জমজমাট পরিবেশ। সবুজের নিজেকে কেমন বেমানান লাগে। কিন্তু এখানে বসে থাকতে তার ভীষণ ভালো লাগছে। বিয়ে হলে তার সন্তান হবে সে সন্তান শহরে স্কুলে পড়বে, এরকম রঙিন টিফিন বক্স পানির বোতল কিনে দেবে। এরকম স্বপ্ন সে আগেও দেখেছে। কোন নির্দিষ্ট নারীকে কেন্দ্র করে কখনো সে স্বপ্ন দেখেনি। মায়ের আগ্রহের কারণটা সে বোঝে। নিম্মি বাসায় বউ হয়ে এলে, সংসারের কাজ, সাধনার দায়িত্ব দিয়ে মা নিশ্চিন্ত হবেন। কিন্তু নিম্মি কি এরকম দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত? মেধাবী মেয়ে ভালোমতো পরীক্ষা দিলে ঢাকাতেও কোথাও চান্স পেয়ে যেতে পারে। মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা আইন বিষয়ে পড়তে পারে। তার এখন সাফল্যের সমস্ত দুয়ার খোলা। কেন সে সবুজের জীবনে নিজেকে বেঁধে বেড়াজালে আবদ্ধ হবে? আর মামার ওই ছোট্ট বাসাটার উপর মায়ের নজর বহু আগে থেকেই! কি হবে ঐ বাসাটা নিয়ে? তার খামার পুকুর সবকিছু গ্রামে।

• বসতে পারি? হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে চমকে ওঠে সবুজ

সাদা শাড়ি লাল পাড় পরা একটা মেয়ে, হাতে গলায় ফুলের গহনা।
• জি বসুন

• আসলে সব সিটে মানুষ তো এখানেই দেখলাম।আপনি একা বসে আছেন

• আপনার বাচ্চা কোন ক্লাসে পড়ে?

• আমার কোন বাচ্চা নেই

• ও আমি ভাবলাম আপনি ওই স্কুলের কোন বাচ্চার অভিভাবক

• না আমি অবিবাহিত

• আচ্ছা তবে কারো সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?

• না সেটাও না

• আমি কি খুব বিরক্ত করছি?

• না সেরকম কিছু না

• আমার নাম মিলি

• সবুজ

• আমার বাচ্চা নার্সারিতে পড়ে

একটু অবাক চোখে তাকায় সবুজ। মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে ২২, ২৩ হবে। বাচ্চা নার্সারিতে পড়ে। অবশ্য একটা সময় তো এটাই স্বাভাবিক ছিল যে মেয়েদের ১৭-১৮ বছর বয়সে বিয়ে আর তারপর বাচ্চা হয়ে যাবে। এখনকার সবার চিন্তাধারা হলো মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে বিয়ে দিতে হবে। এটাও ভালো চিন্তা। একটা মেয়ে কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া স্বামীর ঘরে চলে গেলে, বাচ্চাদের কিছু শিখাতে পারেনা। মা যদি আজকে আরেকটু শিক্ষিত হতো তাহলে আজ এ ধরনের কাজ কারবার করে বেড়াতো না। সবুজ খুবই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন একজন মানুষ। অথচ সে জীবনে যথেষ্ট কষ্ট করেছে। আজ তাকে নিম্মির সামনে কিরকম ছোট হতে হলো! ফোনের শব্দ চমকে ওঠে সবুজ। মায়ের কল। রিসিভ করতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু মা যখন একবার ফোন দেওয়া শুরু করে দিতেই থাকে কোন কিছু বোঝার চেষ্টা করে না। তাছাড়া মায়ের কাছে তো ফোন থাকার কথা না। নিশ্চয়ই কারো কাছ থেকে ধার করেছে।

চলবে।