শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১০
তারানা তাসনুবা বৃষ্টি
নিম্মি ওষুধের লিস্ট নিয়ে হাসপাতালের সিড়ি বেয়ে নামতে থাকে। সরকারি হাসপাতালে। প্রচুর ভীড়। বারান্দায় মানুষের বেড করা। মাঝে হাইওয়ে, রাস্তা পার হয়ে সারি সারি ওষুধের দোকান আর ডায়গনস্টিক সেন্টার। ফুপু বেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে৷ সবুজ ভাই অতিরিক্ত রেগে গিয়েছিলেন, উনি কি স্বাভাবিক হয়েছেন? রাগ করে ফুপুকে না নিয়ে বের হয়ে গেলেন৷ দুশ্চিন্তা হয় নিম্মির। ওষুধ নিয়ে সিস্টার কে দেয় নিম্মি। খুব একা লাগছে। রোগীর স্বজনরা যে যার মতো ভাত নিয়ে বসেছে। সকাল থেকে ভীষণ ক্ষুধা পেলেও একা একা ছোটাছুটি করে আর খেতে যাওয়া হয়নি। ফুপু এসে শুরু করলেন নতুন হাঙ্গামা! ফোনের শব্দে চমকে ওঠে নিম্মি। অচেনা নম্বর,
• হ্যালো
• নিম্মি বলছ? আমি তোমার জামিল আঙ্কেল
• আসসালামু আলাইকুম
• ওয়ালাইকুম আসসালাম, মা কয়তলায় ভর্তি নাজিম উদ্দীন ভাই?
• তিন তলা, ডান পাশের সিড়ি
• আচ্ছা
জামিল আঙ্কেল হাতে একটা টিফিন বাটি ধরিয়ে জোর করে খেতে পাঠালেন৷ বাবার কাছে তিনি বসে রইলেন। মিনিট পাঁচেক পর সিস্টার ওয়ার্ড খালি করতে বলায় তিনি বারান্দায় এসে দেখেন নিম্মি দাঁড়িয়ে। তিনি এসে ডাক দেন। তারপর সাথে করে ক্যান্টিনে নিয়ে যান৷ ভাত আর সবজির তারকারি ছিলো বাটিতে আঙ্কেল দুটো চা নিলেন। নিম্মির খাওয়া শেষে বললেন,
• দেখ মা, জীবনে আমাদের অনেক পরীক্ষা আসবে, নিজের শক্তি, সামর্থ্য দিয়ে সেই পরীক্ষা দিতে হবে, তুমি অনেক ছোট, তোমার বাবা অনেক চিন্তা করে তোমাকে নিয়ে, আমি জানি তুমি কিরকম চমৎকার একটা মেয়ে, আমার ফুপুর ব্যাপারটাও আমি শুনেছি, সে তার স্বার্থ দেখছে, তোমার দিকটা দেখছে না
• পৃথিবীতে বাবা ছাড়া তো কেউ নেই আমার
• এজন্যই তোমাকে আরো শক্ত হতে হবে,উপরে আল্লাহ আছেন আর নিচে আমরা, ভালো মানুষ তুমি অবশ্যই আশেপাশে পাবা, নিজাম ভাই সব সময় মানুষের উপকার করেছেন, তিনিও একা হবেন না, আল্লাহ কাউকে না কাউকে অবশ্যই সাহায্যকারী হিসেবে পাঠাবে, কিন্তু আমরা মানুষ, দুশ্চিন্তা করাটা আমাদের স্বভাব
• বাবা ভিতরে ভিতরে এত ভেঙ্গে পড়েছে আমি বুঝতেও পারেনি
• কিছু মানুষের স্বার্থপরতা মানুষকে খুব দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়
• আমার কি হবে আঙ্কেল? বাবা কি পুরোপুরি ঠিক হবে না?
• আরে বোকা মেয়ে, এত ভয় পেলে চলে?
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দুজন ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে বাইরে বারান্দায় দাঁড়ালেন।
• আমি আর উপরে না যাই। অফিসে একটু চাপ আছে। অফিসের কাজ শেষ করে মাগরিবের পর দেখি একবার ঢু মেরে যাব। আর ফোনটা চার্জ দিয়ে রেখো। অফিসে, তোমার আঙ্কেলরা চাইলে যাতে খোঁজ নিতে পারে।
• জি আচ্ছা
নিম্মির ভীষণ ক্লান্ত লাগছে বারান্দার চেয়ার গুলোর একটায় বসে পড়লো। হালকা ঝিমুনি ভাব আসছে। চা খেয়ে রাতের ঘুমের অভাব তো পূরণ হয়না। তাও পেটে কিছু পড়েছে। খোলা বারান্দায় আছে বলে রক্ষা, জৈষ্ঠ্যমাসের তাল পাকা গরমে অতিষ্ঠ সবাই। কেউ কেউ হাতপাখা চালাচ্ছে। বিশেষ করে মায়েরা। মা শব্দটা মনে হতেই গলায় কেমন যেন একটা দলা পেকে যায় নিম্মির। কান্না আসে না, অদ্ভুত এক অভিমান মায়ের উপর। কেন চলে গেল তাকে ছেড়ে এভাবে? এখন মা থাকলে একটা নির্ভরতার হাত থাকতো।
এর চেয়ে তো মনে হয় বাবা আরেকবার বিয়ে করলে ভালো হতো। কি মনে করে মামার ফোনে একটা কল দেয় নিম্মি। মামা শুনে সাথে সাথে আসতে চাইলেন। কিছুটা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে নিম্মি৷ বিকেলে মেসেজ আসে।
বাবার কথা জিজ্ঞেস করছে। অবাক হয় নিম্মি। বাবার কথা কি বলেছিল সে? কয়দিন হলো কোন গান, কবিতা সে পাঠায়নি! কিন্তু পরক্ষণেই ভুলে যায়! একাকীত্ব ভয় চিন্তা সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মেসেজে। মানুষটা যেন তার পাশে বসে থাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এত আপন কেন লাগে মানুষটাকে? কয়েকদিন আগে পাড়ার ফ্লেক্সিলোডের দোকানে রিফাত ভাইয়ের সাথে দেখা। শহরের প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ছে। দোকান ওনার বাবার। দেখতে সুদর্শন।
• কার্ড চাইতেই হেসে বলে এত টাকা কিসের খরচ করিস? প্রেম করছিস নাকি?
• না ভাইয়া টুকটাক ক্লাস বিষয়ে কথাবার্তাই হয়
• সেটাই ভালো এই বয়সে প্রেম ভালো জিনিস না, পড়ালেখা করে এখন জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সময়
নিম্মির চকিতে মনে পড়ে কথাগুলো। কিন্তু এই যে ভরসাস্থল। কোথায় পাবে এমন মানুষ? দিনে ঘন্টা ঘন্টায় কে নেবে খোঁজ? নিম্মি কি আনমনে রিফাতের কথা কি ভাবছিল? মানুষটা দেখতে কেমন? ভালো হোক, মন্দ হোক সে ভালোবেসে ফেলেছে। এই হাতটাই সে ধরতে চায়, বাবা কি বুঝবে তার কথা? নাকি জোর করে সবুজ ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিবে? সিস্টার ডেকে পাঠায়৷ বাবা খুব অস্থির হয়ে গেছে। নিম্মিকে দেখে শান্ত হন বাবা। কিছুক্ষণ বাবার কাছে থাকতে বলে সিস্টার। রাতের রাউন্ডের পর জানা যাবে বাবার অবস্থা। দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কত চোখের সাথে চোখাচোখি হয় নিম্মির। কিছুক্ষণ আগে মারা যাওয়া এক রোগীকে দেখে বাকি রোগীরা অস্থির হয়ে গেছে। স্বজনরা ছলছল চোখে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে৷ দ্রুত লাশ সাদা চাদরে মুড়ে স্ট্রেচারে তুলে নিচে নামানো হয় । হায়রে মানবজনম। শ্বাস ছেড়ে দিলে, নিজের বিছানা বালিশ, ঘর কিছুই নিজের থাকেনা। একটা মুহূর্ত স্বজনেরা সময় দেয়না। নিজের সবকিছু শেষ বারের মতো ছুয়ে দেখা যায় না। মায়ের শেষ দেখা জিনিস কি ছিলো? মা কি তাকে দেখতে পেয়েছিলো? মা কি তাকে ছুঁতে পেরেছিলো? মা মারা গিয়েছিলো আতুড় ঘরে। মা শেষ বারের মতো কি তার চুলে চিরুনি দিয়েছিল? আয়নায় দেখেছিল নিজেকে? কিসব আবোল তাবোল চিন্তা!
কিছুক্ষণ পর, মামা মামী এলেন। নিম্মিকে জোর করে বাসায় পাঠানো হলো। খাওয়া গোসলের জন্য। নানী এসেছে বাসায়। তালা দেওয়ায়, পাশের বাড়ি বসে আছে। নিম্মি তাড়াতাড়ি বের হয়ে যায়।
দুইদিন পর,
বাবাকে ডিসচার্জ দেওয়া হবে। ফুপু এসেছে দেখা করতে। আজ কোন হাঙ্গামা করেনি কারণ বাবার কলিগরা উপস্থিত। সবুজ এসে দেখা করে চলে গেছে। মাকে নিয়ে ফিরবে, বলে গেছে। সে প্রথমে গেলো সেই পার্কে আজ কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সে কিছুক্ষণ বসে এক বাদাম ওয়ালাকে প্রশ্ন করে,
• ভাই একটা কথা ছিলো
• বাদাম নিবেন?
• দেন একশ গ্রাম
বাদাম নিয়ে সবুজ প্রশ্ন করে,
• নীল, সাদা ড্রেস কোন স্কুলের? কইতে পারবেন
• সঠিক তো জানিনা
• এই কয়দিন আগেই গান বাজনা করলো এই পার্কে
• তাইলে কোচিং পাড়ার বাচ্চাদের স্কুল হইবো
• আচ্ছা
কিছুক্ষণ বসে সবুজ কোচিং পাড়ার স্কুলে চলে যায়। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে, মিষ্টি নামের কোন বাচ্চা পড়ে কিনা। সে বলতে পারেনা। কেন সে মিলিকে খুঁজছে তাও জানেনা। আবার হাসপাতালে ফিরে যায় সবুজ। মামার ডিসচার্জ পেপার তৈরি। সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে নিম্মি এতটুকু মেয়ের উপর কি দায়িত্ব। সে জানে দায়িত্ব পালন কত কঠিন। মায়া লাগে তার। সাধনার দেখভালের জন্য নিম্মির জীবন নষ্টের কোন মানে হয়না। মামাকে বাসায় দিয়ে তারা বাড়ি ফিরবে ঠিক হলো। সবুজ যেতে চাইছিলো না। এই ভরদুপুরে ভাতের আয়োজন করা কঠিন নিম্মির জন্য। দিন রাত হাসপাতালে কাটিয়ে মুখটা এতটুকু হয়ে গেছে। কিন্তু মায়ের ভাই প্রীতি প্রদর্শনে বাঁধা কে কবে দিতে পেরেছে? অগত্যা মামা বাড়ি যেতে হলো। বাজার করা ছিলো না। নিম্মির নানীকে দেখে খুব একটা খুশি হন না সালেহা, তিনি জানেন নিম্মি,সবুজের বিয়ে এরা ভালো চোখে দেখবে না। খিচুড়ি, আচার আর ডিম ভাজি করলো নিম্মি আর নানী মিলে।
খেতে বসে,
• ডিমে তো পুরো তেলের বোতল উলটে দিছস নিম্মি, এমন রান্না কইরা আমার ভাইরে আরো অসুস্থ বানাবি?
• মা, ক্ষীণ স্বরে বলে সবুজ
• কি হইছে?
• আজ না। আল্লাহর দোহাই লাগে
দ্রুত খাওয়া সেরে, মাকে জোর করে অনেকটা উঠিয়ে নিলে গেল সবুজ। যাওয়ার আগে নিম্মির ক্লান্ত চোখ তাকে ব্যথিত করলো।
শুক্রবার সকাল সকাল হাজির সালেহা আর সবুজ। ভাইয়ের দেখভাল করতে এসেছেন সালেহা, গাছের ডাব, মুরগির বাচ্চা আর এক কাদি কলা এনেছে। সবুজ বাইরে গেলো। শহরে এলেই সে কোচিং পাড়ায় ঘুরপাক খায়। আজ শুক্রবার, আজ মিলির দেখা সে পাবেনা, তাও কি মনে করে সে বাচ্চাদের স্কুলের সামনে গেল, কোন একটা কোচিং ছুটি দিয়েছে কিশোর কিশোরীর দল হাসতে হাসতে আড্ডা দিতে দিতে বাসায় যাচ্ছে। বুকের মধ্যে কেমন একটা অস্থিরতা তার। কই তার তো এমন কৈশোর ছিলো না। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তাহের দুই দিনের ক্লাস সে সব সময় করতে পারতো না। সে স্কুলে এলে কামলাদের সাথে মায়ের বাকবিতন্ডা লেগে যেত, নাহয় সাধনাকে মা মারধর করতো। সেই সাধনার জন্য এখন নিম্মির পিছনে লেগে আছে।
• সবুজ সাহেব?
চমকে পিছনে তাকায় সবুজ
• আ আ…. আপনি
• আমাকে খুঁজতেই তো এসেছেন?
• আমি মানে
• মিষ্টির স্কুলের দারোয়ান বলছিলো, আমি বুঝেছিলাম আপনিই হবেন, ফোন নম্বর তো দিয়ে যাবেন
• আমার মনে হয়েছিল প্রকৃতি যদি আবার আমাদের দেখা করায় তবেই আমি বুঝবো আমাদের দেখা করা উচিত
• কি আজব চিন্তা ভাবনা
• আসুন কোথাও বসি
• চলুন
একটা কফি শপে বসে। খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। বেশিরভাগ ছাত্র,ছাত্রীরা খাচ্ছে।
• নিন অর্ডার দিন
• আমি আসলে এসব জায়গায় আসিনি কখনো, আপনি দিন, সরল স্বীকারোক্তি সবুজের
হাসে মিলি। বলে,
• সবকিছুর প্রথম থাকে, আমিও কারো সাথে প্রথম এসেছিলাম
• ঠিক
সবুজ মুগ্ধ হয়ে মিলির কথা শোনে। মিলি ভাইয়ের বাসায় থাকে। নিজের ও মেয়ের পড়ার খরচ চালাতে কোচিং করায়। মোটামুটি উপার্জন হয়। মা,মেয়ের চলছে। ভাই ভাবী অনাহুত ভাবেন না, বরং ভাবী মিষ্টিকে দেখভাল করে। তাই মানসিক চাপ নেই। সবুজ তার দুঃখের কাহিনি বলতে চায়না। মিলি অল্প বয়সে অনেক কিছু সয়েছে। তার কষ্ট বাড়িয়ে লাভ নেই। নম্বর বিনিময় করে বাসায় আসে সবুজ।
বাসায় ফিরে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চায়। নাজিমুদ্দিন তাকে নামাজ পড়ে খেয়ে যেতে বলে। নিম্মির নানী আর মামাতো ভাই মাসুম আছে। তারাই হাতে হাতে কাজ করছে। বরগাদার ধান দিয়ে গেছে। সেই ধান মিলে না ভাঙিয়ে এবার বিক্রির দায়িত্ব নিয়েছে স্থানীয় দোকানদার নাম রতন। নিজ দায়িত্বে ধান বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে যাবে। এই যুগে এত পরিশ্রম কে কার জন্য করে? সবুজ অবাক হয় কিন্তু কিছু বলেনা। বাড়ির ফল গাছগুলো থেকে সালেহা ফল পাড়িয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করতে বলেছে। দুপুরে খেয়ে আজ কেমন ক্লান্ত লাগছে। এই বাড়িতে ঘর নেই আলাদা। বাড়ির পিছনে ফল বাগানে একটা চৌকি পাতা, সবুজ সেখানেই ঘুমিয়ে যায়।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১১
নিম্মির পড়াশোনার বেশ ঘাটতি পড়েছে। বেশ অনেক ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল নিম্মি। বান্ধবী ইসরাত এসেছে বাসায়। সে যতোটুকু সম্ভব নোট করে নিয়ে এসেছে। যদিও এখন নিজেই নিজের হাতে লেখা বুঝতে পারছে না! নিম্মি যতটুকু পারছে নোট খাতায় তুলে রাখছে। মাথা ধরে গেছে, আকাশে কেমন মেঘ মেঘ করেছে।
• হায় হায় বৃষ্টি পড়বে নাকি?
• পড়লে সমস্যা কি?
• বাসায় ফিরব কিভাবে?
• চিন্তা করিস না সারাদিন তো আর বৃষ্টি পড়বে না, দুপুরে আমার সাথে ভাত খা
• সে না হয় খেলাম, এখন একটু চায়ের ব্যবস্থা কর, মাথা ব্যথা করছে
• আচ্ছা
নিম্মি রান্নাঘরে যেতেই, তোর ফোনটা হাতে নেয় ইসরাত। মেসেজগুলো পড়ে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যায় মেয়েটা। কিসব কবিতা লেখা। চা হাতে ফিরে আসে নিম্মি।
• আমার মোবাইলে কি দেখিস?
• এই মেসেজ কার পাঠানো? কত দিনের প্রেম?
আমাকে কিছুই বললি না? এই বন্ধুত্ব আমাদের?
• আরে না, তেমন কিছু না
• সেটা দেখতেই পাচ্ছি…..তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে টুকরো করে কাছি
আমি ডুবতে রাজি আছি আমি ডুবতে রাজি আছি! হুম?
• প্লিজ কাউকে বলিস না, পরীক্ষার আগে এসব জানাজানি হলে, খুব বিপদে পড়বো
• বিপদের কি আছে?
• বাবা জানতে পারলে খুব রাগ করবে
• টেনশন করিস না, কেউ জানবে না, কিন্তু ছেলেটা কে? কোথায় পড়ে?
• বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, বলে সময় হলে জানাবে
• এলাকার কেউ?
• আমার তো তাই মনে হয়
• কে হতে পারে?
• তেমন কারো কথা আমার মাথায় আসছে না
• আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তোর আশেপাশের কেউই হবে
• আমারও তাই মনে হয়
টুং করে শব্দ হয় মেসেজ আসার,
“লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে, লিখবো তোমার নাম,
হাজার পাখির সুর দিয়, গাইবো তোমার গান,
তুমি আমার জান, তুমিই আমার প্রাণ।”
ইসরাত হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। নিম্মি একটু লজ্জা পায়। ফোনটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বালিশের তলে রেখে দেয়। দুজন মিলে পড়ায় মন দেয়। বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে। টিপ টিপ বৃষ্টি। গুমোট গরম। মিনতির মা এসে জানালো রান্না হয়ে গেছে। আরেকটু পড়ে তারপর খাবে বলে দিলো। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে এই মেসেজ নিয়ে। বৃষ্টি কমে এলে ইসরাতকে এগিয়ে দেয় নিম্মি। বাবার অফিসে যেতে হয়েছিল আজ কিছু কাজ ছিলো যদিও এখন ছুটিতে আছে, বাবা ভিজে বাসায় ফিরেছে, মসলা চা বানিয়ে দেয় নিম্মি।
• মা আমার সামনে একটু বস
• বৃষ্টির মধ্যে এভাবে না এলেই পারতে
• বৃষ্টি কখন থামবে তার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারিনি
• শরীর খারাপ লাগছে?
• না রে মা অযথা দুশ্চিন্তা করিস না
• নাও চা খাও
• তুই খাবি না?
• আমি খেয়েছি, ইসরাত এসেছিল কলেজের ক্লাসের নোট নিয়ে
• পড়া সব তুলে নিতে পেরেছিস?
• নিচ্ছি বাবা একদিনে তো হবে না
• তোর পড়ালেখার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল
• না বাবা তোমার চেয়ে আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ আর কি আছে?
সপ্তাহখানেক ধরে প্রতি শুক্রবার সালেহা আর সবুজ যাচ্ছে নিম্মিদের বাসায়। সবুজ কোনমতে সালাম দিয়ে বেরিয়ে পড়ে, চা অব্দি খায়না। ফিরে এসে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। মাকে রাখেনা। সালেহা ছেলের মেজাজ মর্জি কিছু বুঝতে পারছে না। নিম্মি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। ভাইকে এখন চাপ দেওয়া সম্ভব না। তিনি হতাশ হয়ে দুই শুক্রবার আর গেলেন না ভাইয়ের বাসায়, যদিও সবুজ চলে গেছে শহরে। তার শহরে এত কি কাজ জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়না। বেশ হাসিখুশি, প্রাণবন্ত লাগে ছেকেটাকে। আজ তো নতুন শার্ট প্যান্ট পরেছে। বেশ দেখাচ্ছে। সালেহা বুঝতে পারছেন না কি হচ্ছে। ছাত্রজীবনে কখনো এত প্রাণবন্ত ছিলো না সে। সবুজ কি নিম্মির প্রেমে পড়েছে?
#
জুমআর নামাজ আদায় করে এলাকাবাসী বের হয়েছে। সবাই বাড়ি না গিয়ে ছোট খাটো জটলা পাকিয়ে গল্প করছে। নাজিমুদ্দিন সাহেব দাঁড়িয়ে, সবাই তার শরীরের খবর জানতে চাইছে, হঠাৎ রিফাত বের হয় দোকান থেকে, দোকানের কর্মচারী রতনকে মারতে মারতে বের করে, রাস্তায় মানুষ জমে গেছে, এগিয়ে যান নাজিমুদ্দিন।
• কি হয়েছে রিফাত? এভাবে মারছো কেন? ছেলেটা তো মরে যাবে
• দেখেন ওর ফোন দেখেন, আপনার মেয়ের সাথেই কি কীর্তিকলাপ করেছে দেখেন, দুজন মিলে…… যা তা অবস্থা
মসজিদের ইমাম সাহেব এগিয়ে আসেন। তিনি হাতে নেন ফোন। কোন অশালীন কথা লেখা নেই কিন্তু ভালোবাসার কথা লেখা। কিছু প্রেমের গান, কবিতাও আছে। তিনি রিফাতকে থামান। উত্তেজিত জনতাকেও সামলে নেন। কিন্তু যা ঘটার ঘটে গেছে। রাগে,অপমানে নাজিমুদ্দিন সাহেব টলতে টলতে বাড়ি ফেরেন সাথে এলাকার কিছু মুরুব্বি। নিম্মি আজ দেশি মুরগির ঝোল করেছে নিজ হাতে, গোসল হয়নি। এই অবস্থায় এত মানুষ দেখে ঘাবড়ে যায় সে। বাবা কিছু বলার আগেই রিফাত রতনকে নিয়ে হাজির হয়। নিম্মির মোবাইল চায়। নিম্মি সহজে মোবাইল দিতে রাজি হয়না। কিন্তু দিতে বাধ্য হয়। সব মেসেজ ডিলিট করার সময় সে পায়নি। কিছু মেসেজ সবাইকে দেখিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসে রিফাত। বাবার রুমে কিছু মুরুব্বি আর রিফাত বসে। নিম্মি পাগলের মতো কেঁদে যাচ্ছে, রতনের রক্ত মাখা মুখ, ছেড়া শার্ট, পেয়ারা গাছের নিচে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। রিফাত বেরিয়ে গেল। বড়রা কি যেন আলাপ করছেন। মিনতির মা ছুটে এসেছে। নিম্মিকে আগলে বসে আছে সে।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১২
কেউ কোথাও রতনের সাথে নিম্মিকে দেখেনি। আর নিম্মি বারবার বলছে, সে জানেনা এই মেসেজ কে করতো। ইমাম সাহেব সবাইকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠালেন। সামনে পরীক্ষা মেয়েটার। সবাই চলে গেলে, নাজিমুদ্দিন বোনকে ফোন করে আসতে বলেন। সবুজকে সাথে নিয়ে। রাতেই বিয়ে পড়াবেন মেয়ের, দৃঢ় সংকল্প তার। নিম্মির নানী আর মাসুম গতকাল বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। তাদের খবর দেওয়ার কথা কারো মনে আসেনি। নিম্মির ফোন বাবার কাছে। মায়ের বিয়ের শাড়ি,গহনা নিয়ে মিনতির মাকে বলেন পরিয়ে দিতে। মাগরিবের আজানের পরেই সালেহা বাড়িতে ঢোকেন। সবুজ এত জরুরি তলবের কারণ বুঝতে পারেনা। কিছুক্ষন পর এলাকাবাসি আর ইমাম সাহেব চলে আসেন। নতুন জামাইয়ের
জন্য একটা নতুন পাঞ্জাবি কেনা হয়েছে, সেটা পরে নিতে বলে সবাই। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। পাঞ্জাবি পরে, সবার মধ্য মনি হয়ে বসা সবুজ দেখে ইমাম সাহেব তার বিয়ের কথা বলছে, হতবাক হয়ে অনেকটা সময় পরে সবুজ কবুল বলে। নিম্মি বলেই অজ্ঞান হয়েছে।
নিম্মির ঘরেই বাসর। আশেপাশের অতি উৎসাহী কিছু মানুষ ইতস্তত ফুল ছিটিয়ে দিয়েছে। বিছানায় নতুন চাদর। পড়ার টেবিলে এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা। ব্যাস এই বাসরঘরের সাজ! নিম্মি শুয়ে আছে। সে বার কয়েক অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল, শুনেছে সবুজ। আজ তার আজ ঘুম আসবেনা। মিলিকে বলা প্রতিটি কথা, এক সাথে দেখা স্বপ্ন যেন সাপের মতো দংশন করছে তাকে। সে মিলিকে একটা মেসেজ করে রাখলো।
মিলি ভীষণ বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। মাফ করতেই হবে আমাকে।তুমি যদি মাফ না করো আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবোনা।
ভোরে ঘুম ভাঙল সবুজের বিছানার এক কোনে হেলান দেওয়ায় হাত,কাধ ব্যথা করছে। উঠে হাতমুখ ধুয়ে, কাপড় বদলে নেয়। মিনতির মা রান্নাঘরে কাজ করছে। সালেহা কি নিয়ে যেন কথা শোনাচ্ছে। সকাল আটটায় স্কুল। এখন বের হয়ে গেলে মিলিকে পাওয়া যাবে। ছুটে বেরিয়ে যায় সবুজ। নাজিমুদ্দিনের চোখ এড়ায় না। সারারাত তিনিও জেগে। সালেহার কন্ঠস্বরে এখন মনে হচ্ছে আবেগের বসে মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দিলেন। ছেলে উঠে ছুটে বেরিয়ে গেছে তার কোন খোঁজ নেই, নিম্মি কেন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে তাই নিয়ে কটু কথা শুরু করেছে সালেহা। মিনতির মা কাল এসে আর বাড়িতেই যায়নি, কিন্তু সালেহার নিম্মির হাতের চা খেতে হবে। নিম্মিকে উঠিয়ে, কাপড় বদলে, মুখ হাত ধুয়ে তৈরি করে দেয় মিনতির মা। মেয়েটা একদিনেই যেন অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। নাজিমুদ্দিন কি করলেন এটা? নিম্মি চা বানিয়ে দিয়ে গেল। মুরগির কষা মাংস আর পরোটা করে নিল হাতে হাতে। সবুজ ফেরেনি। তাই নিম্মি খেতেও পারছেনা। সালেহা আয়েশ করে খেয়ে, ভাইয়ের কাছে আব্দার করছে, কয় গ্রামের লোক খাওয়াবে।
সবুজ মিলির কোচিং সেন্টারের বাইরে অপেক্ষা করছে। সকালে মনে হয় ওর ক্লাস নেই। মিলি এলো দশটায়। ক্লাস নিয়ে তারপর তারা পার্কে বসলো।
• কাল তোমার মেসেজ দেখেই আমি বুঝেছি তুমি বিয়ে করেছো, এটাই হবার ছিলো, হয়েছে ঠান্ডা গলায় বলে মিলি
• আমি পরিস্থিতির স্বীকার
• মামাতো বোনের সাথে বিয়ের কথা পাকা ছিলো, আর তুমি ঘুরেছ আমার সাথে, আমাকে স্বপ্ন দেখিয়ে আজ অন্যের হয়েছ, এখন কি চাও? আমি আজীবন তোমার রক্ষিতা হবো?
• ছিহ! আমি কি কখনো তোমার সাথে কোন অশালীন আচরণ করেছি?
• না কিন্তু এখন করতে চাইছ
• আমি তোমাকে আর মিষ্টিকে আমার জীবনে চাই
• পারবে নিম্মিকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করতে?
সবুজ ফিরে যায়। সে জানে সে আবার আসবে আবার নিজের ভালোবাসার অর্ঘ্য সমর্পণ করবে মিলির চরণে। তার মন, মস্তিস্ক জুড়ে মিলি ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু সে নিম্মির সাথে অন্যায় করবে না, অন্যায় হতেও দেবেনা। দরজায় কড়া নাড়তেই সালেহা খুলে দেন। ঢুকতেই চড়াও হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাইয়ের উপস্থিতিতে কিছুই বললেন না।
• নাস্তা না করেই এত সকালে বেরিয়ে গেলে?
• কাজ ছিলো মামা
• বেশ এখন দুপুরের খাবার খেয়ে নাও
ছোট করে একটা আয়োজন হচ্ছে। প্রতিবেশী আর নিম্মির নানাবাড়ির আত্মীয়রা আমন্ত্রিত। নানাবাড়ির কেউ এলো না। নানী আর মাসুম আসবে ভেবেছিলো নিম্মি। দুপুরের খাবার ঘরে বসে খেতে চাইলো সবুজ। এত প্রশ্নের উত্তর তার কাছে এখন নেই। নিম্মি খাবার সাজিয়ে ঘরে আনল।
• তুমিও বসো
• জি আপনি শুরু করেন
• কিছু কথা ছিলো
• আমারও ছিলো
• বেশ তুমিই আগে বলো
• আমাকে পরীক্ষাটা দিতে দেন
• পরীক্ষা দিয়ে কি লাভ?
• আপনি তো জানেন শিক্ষিত হওয়ার কত সুবিধা, আপদে, বিপদে শিক্ষাই তো কাজে দেয়
• আমার ডিগ্রি পাসের তো কোন মূল্য ছিলো না তোমার কাছে
• সেটা আপনাকে কে বলেছে?
• ভালোবাসলে ঐ দোকানদারকে
• আপনি তো জানেন, আমি নাম, পরিচয় কিছুই জানতাম না
• কি ভেবেছিলে? কোন বিরাট বড়লোক?
• না, তেমন কিছু মাথায় আসেনি, আমার একাকী সময়ের সঙ্গী ছিলো ঐ মেসেজ গুলো
• সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না
• আপনি অন্তত করুন
অনুনয় নিম্মির চোখে মুখে। মায়া লাগে সবুজের। মা, মামা মিলে এটা কি করলো? দুটো জীবন নষ্ট করে দিলো? খেয়ে রুমের বাইরে হাত ধুতে বের হতেই মায়ের সামনে পড়ে সবুজ।
• কই গেছিলি?
• একটু কাজ ছিলো
• এত ভোরে কি এমন কাজ?
• মা, পুরুষ মানুষের সব কাজ যদি তোমরা বুঝে ফেলতে তাহলে তো তোমাকেই পাঠাতাম।
সালেহা ছেলের মতিগতি কিছুই বুঝতে পারছেন না!
চলবে