শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১৬
বৈঠকখানার দরজায় নিম্মির ছায়া পড়ে। নাজিমউদ্দিন সাহেব দাঁড়িয়ে যান। কিন্তু নিম্মি ওখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। চোখ ভেজা, মারে বলে নাজিমুদ্দিন সাহেব নিজেই এগিয়ে গেলেন। নিম্মি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। ওর চোখ দুটো বেদনায় ভারী হয়ে আছে, কিন্তু শুকনো, বাবাকে দেখে এক ছুটে ঝাপিয়ে পড়া যায়না। অভিমান? নাকি বিয়ের পর বাবার সাথে আর সেই কিশোরসুলভ চপলতা মানায় না? জানেনা নিম্মি। বাবা কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়। কাছ থেকে মেয়ের অদ্ভুত অভিব্যক্তি তাকে আহত করে। শরীরে সাবানের গন্ধ, ভেজা চুল। তার মানে তার আসার সংবাদে মেয়ে গোসল করেছে, ঘরের কাজ করতে হবে এরকম সংসারে সেটা তো জানা কথা। সালেহা এগিয়ে আসে, বাপ মেয়েকে বেশিক্ষণ একা কথা বলতে দেওয়া যাবেনা,
• বসেন ভাইজান
• বৌ মুরগি জবাই দিছি, তুমি রান্ধো, ভাইজান একা একা বাড়িতে কি খায় না খায়
• ও গোসল করে আবার চুলার পাড়ে কেন যাবে? আমার মুরগি খেতে হবে না, যা রান্না হয়েছে তাই দাও, বিকেলের বাসে আমি মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি
• কেন ভাইজান কোন অপরাধ হইছে?
• তুমি এক সপ্তাহ বলে এক মাস রাখলে, মেয়ের পড়াশোনা তো কিছুই হচ্ছেনা
• পড়াশোনা করে আর কি হবে ভাইজান?
• এই কথাটা আমি তোমার মুখে আশা করিনি সালেহা, তিন বাচ্চা নিয়ে এভাবে পানিতে পড়তে না, যদি পেটে বিদ্যা থাকত
সালেহা কথা বাড়ান না, নিজেই মুরগি চুলায় বসিয়ে দেন। মেয়ে তো বাপকে কথা লাগানোর সুযোগই পায়নি, তাহলে ভাইজান এত রেগে আছে কেন?
খেতে বসে অবাক নাজিমুদ্দিন, এত মোটা চালের শক্ত ভাত তো নিম্মি খায়না। মেয়েটা ভাত নেড়েচেড়ে উঠে গেল। সাধনা তার সামনেও ভুত সেজে বসে আছে। গালে প্রজাপতি আকারের লাল নকশা করেছে, নিম্মি এসব কখনো করেনি, কিন্তু একাকীত্ব সইতে না পেরে সামান্য যে ভুল করেছে, তার হয়তো জীবনভর মাসুল দিতে হবে।
খেয়েই উঠে পড়তে চাইছিলেন নাজিমুদ্দিন কিন্তু বাসায় সবুজ ঢুকলো। বাস স্ট্যান্ডে দেখা হওয়ার কথা এড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
• কোথায় গিয়েছিলে বাবা? শুক্রবারের দিন
• আসসালামু আলাইকুম
• ঐ একটু টাকা পেতাম, তাই পাশের গ্রামে গেছিলাম
নাজিমুদ্দিন অবাক হলেন। মিথ্যা বলার কি দরকার ছিলো সবুজের?
• বাবা নিম্মিকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাই
• নেন মামা, ঘুরে আসুক
• না! আমি এখানেই ঠিক আছি, নিম্মি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলে
• মামা বলছেন ঘুরে আস, আমি গিয়ে নিয়ে আসবো আমার তো যেতেই হয়
• না আমি যাব না, বলে ঘরে চলে গেল নিম্মি
বাবাকে বিদায় দিতেও এলো না।
• আচ্ছা বেয়াদব মাইয়া, খাড়ান ভাইজান আমি ডাইকা আনি
• থাক সালেহা ওর রাগ জায়েজ, সামান্য একটা অপরাধে ও কে আমি কিসের মধ্যে ফেললাম
• কি কন ভাইজান?
• মামা ঠিকই বলেছেন, হুট করে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব ভুল করেছেন আপনারা, তিনটা জীবন নষ্ট করেছেন, বলে সবুজ লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে পড়ে
নাজিমুদ্দিন চলে যান। সালেহা চুপ করে নিজের ঘরে বসে আছে। মানুষ নির্বিবাদে সবকিছু মেনে নেওয়া মেয়ে পছন্দ করে, কিছুটা নির্বোধ, অকারণে জেদ, আহলাদ করবে, বোকার মতো কাজকর্ম করবে আবার সুক্ষ্ম বুদ্ধির কাজ দেখাবে, কিন্তু নিম্মি অদ্ভুত, তার জেদ, তার এই আচরণ সালেহার কাছে নতুন, বাবার বাড়িতে যে চপলা নিম্মি ছিলো, এই নিম্মি সে না, কয়দিনেই সে খুব পরিণত হয়েছে। রান্নাঘরের কাজ বুঝে নিয়েছে, রাত জেগে পড়ে আবার এলার্ম দিয়ে সকালে উঠে পড়ে, সালেহাকে কটু কথা বলার সুযোগ দেয়না, কিন্তু সবুজের রাশ টানেনা মেয়েটা, সবুজ নিজের খেয়াল খুশিতে চলে, কি চলছে নিম্মির মাথায়?
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১৭
মায়ের ঘরে প্রবেশ করে সবুজ,
• মা আসব? সবুজ জিজ্ঞেস করে
• আয় বাবা তোর তো দেখাই পাওন যায় না
• এখন বাড়িতে নতুন মানুষ এসেছে, কাজকাম তো বাড়ায় দিতেই হয়
• কি কস? কয়দিন হইলো বিয়ের… আর এর মইদ্যে?
• না মা, আমি নতুন মানুষ বলতে নিম্মিকেই বুঝাইছি
• তাই বল, কি বলতে চাইছিস?
• নিম্মি পরীক্ষাটা দিক
• এই মেয়ের পাখা যতদিন রাখবি, তত বিপদ
• না মা, বিপদ আপদ বলে কয়ে আসেনা, আমার কিছু হলে তোমরা যাতে পানিতে না পড় সেটাই চাই, সাধনা তো পড়াশোনা করেনা, সুমনা অসুস্থ মানুষ….
• এহন সব কাম তর বৌ করে, সব পড়া তর বৌ পড়ে এইগুলান মনে হইবোই, নতুন বিয়া
• নতুন বিয়ার কিছু নাই আম্মা, আমি তারে কথা দিছি, কথা রাখতে চাই, পুরুষ মানুষের এক কথা হওয়া উচিত
বলে চলে গেল সবুজ। নিম্মিকে বিপদে ফেলার ইচ্ছা তার নেই। ও পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাড়ালে সবকিছু অনেক সহজ হয়ে যাবে।
#
সন্ধ্যায় মিনতির মা দরজায় দাঁড়িয়ে। বাজার তেমন কিছু ছিল না বাসায়, যা ছিল তাই রান্না করেছে মিনতির মা। নাজিমুদ্দিন সাহেব বাসায় ঢুকলেন। মনে হচ্ছে পায়ের ওজন কয়েক মন। বাস স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে এসেছেন। বাস থেকে নেমে এতটাই আড়ষ্টতা ভর করেছিল, কোন রিক্সাওয়ালা কে বলাই হয়নি, হেঁটে পৌঁছে গেলেন বাসায়,
• আপনি একা কেন?
• অনেক বড় ভুল করেছি আমি, তার প্রায়শ্চিত্ত তো করতেই হবে
• তাই বলে আসবে না? নিজের বাড়িতে আসবে না?
• এই বাড়ি কি আমি ওর রেখেছি?
• এত অভিমান?
• যেখানে ভালোবাসা বেশি সেখানে অভিমানও বেশি
• তাই হইবো, আমি বাড়িত বইলা এলাম আমার যাইতে রাত হইবো, আমি তাইলে যাই
• হ্যাঁ যাও আর খাবারগুলো ফ্রিজে তুলে রেখে যাও
• আপনি খাইবেন না?
• আমার কি আজ কিছু গলা দিয়ে নামবে?
• মেয়েটা কেন এমন অবুঝপানা করলো?
• মেয়েটার চাইতে আমি বেশি অবুঝ, ও তো মন দিয়ে সংসার করছে
• থাক মন খারাপ কইরেন না, রাগ ভাঙলেই চইলা আসব
• তাই যেন হয়
নিম্মি পড়ার টেবিলে বসে আছে, বইয়ের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ। হঠাৎ একটা হাত তার কাধে পড়লো, চমকে পিছনে তাকিয়ে দেখে সবুজ তার কাধে হাত দিয়েছে, সবুজ বিয়ের এই এক মাসে হাত অব্দি ধরেনি! কিন্তু আজ….. সবুজের চোখমুখ বলে দিচ্ছে সে কি চায়। নিম্মি প্রস্তুত না, কিন্তু সে সবুজকে কোনভাবেই নিজের বিপক্ষে নিতে চায় না, আহবানের সাথে সাথেই সে সাড়া দেয়, সে জানতই এমন একটা দিন আসবে, তার চাওয়াতে কিছু যায় আসেনা, পকেট থেকে কাগজের বক্স বের করে সবুজ, তার মানে সে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। নিম্মি নিজেকে সপে দেয়। এছাড়া তার উপায় ছিলো না। বাসরের স্বপ্ন সব মেয়েই দেখে কিন্তু মেয়েদের চাওয়াটা একটু অন্যরকম, মানুষটা তাকে ভালোবাসুক, তার ছোট ছোট পছন্দ, অপছন্দ জানুক, হাতে হাত, চোখে চোখ, স্নেহময় আলিঙ্গন, নিষ্কাম চুম্বন….
চূড়ান্ত মুহূর্তের আগে আসুক অনেক সহজ,সুন্দর সাবলীল কিছু সময় কিন্তু তেমন কিছুই হয়না। ক্লান্ত হয়ে সবুজ পাশ ফিরে শোয় তখন গভীর রাতে, পেট চেপে বসেছিলো নিম্মি, সবুজ এক পাতা ওষুধ দেয়,
• নাও ব্যথানাশক ওষুধ, আমার বন্ধু বলেছিল লাগতে পারে, খাও
হাত বাড়িয়ে ওষুধ নেয় নিম্মি পানি ছাড়াই মুখে দেয় তিতা ওষুধ, তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে, ব্যথায় কাঁদছে ভেবেই সবুজ ওষুধ দেয়। কেন কাঁদছে নিম্মি নিজেও জানেনা,
• তোমার কি এখন একটু ভালো লাগছে?
• কিছুটা কেন?
• বলছি যে…. আমাদের কল পাড়ে গোসল না করে যদি চাচার ওখানে যাই, পাকা বাথরুম আছে, তোমার সুবিধা হবে
• উনারা এত রাতে আমাদের দেখে….
• কেউ দেখবেনা, ওরা ঢাকা গেছে, চাবি রাইখা দিছিলাম….
• চলেন
বর্ষার রাত, মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে চাঁদ, আনমনে সেদিকে তাকিয়ে হাটছিলো নিম্মি, বেকায়দা কাদায় পা পড়ে পিছলে পড়ে যেতে গেলে সবুজ ধরে ফেলে, নিম্মি চিৎকার দিতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয়।
তালা খুলে, চাচার বাড়িতে ঢোকে সবুজ নিম্মি। বাথরুম একটা আছে বাইরে আরেকটা চাচীর ঘরের ভিতর। বাইরেরটায় সবুজ গেল,আর ভিতরে নিম্মি। সাবান,কাপড়, তোয়ালে সবুজ গুছিয়ে এনেছে, তার মানে হুট করে আবেগের বসে না! বেশ আয়োজন করেই করেছে কাজটা। খুব ভালো করে গোসল সেরে বের হতেই ফজরের আজান দিলো।
• নামাজ এখানেই পড়বা?
• পড়া যায়, কিন্তু ফুপু উঠলে?
• কিছু হবেনা, যাও পড়, আমি মসজিদে যাই
• আমাকে বাড়িতে দিয়ে তারপর যান, জামাতের তো দেরি আছে। ভালো করে তালা লাগান
• হ্যাঁ ভালো বলেছো
সবুজকে আজ পরিপূর্ণ লাগছে। মিলি পুরো মাস দেখা করেনি। তার প্রতিশোধ হিসেবে কাজটা করেছে সে! খুব হাস্যকর যুক্তি। কিন্তু নিজেকে এভাবেই বুঝিয়েছে সবুজ। মসজিদের পথে হাটতে হাটতে হঠাৎ চোখ পড়ে, মোমেনা কাকীর ঘরের দিকে, ভাঙা বেড়া, ওদের কল পাড় খোলা, পায়খানায় টিন দিয়ে ঘেরা কিন্তু দরজা নেই, বস্তা দিতে আড়াল, মোমেনা কাকী তার মায়ের মতই বিধবা। ভীষণ দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। অনেক কষ্টে একমাত্র ছেলেকে কোনমতে খেয়ে পরে বড় করেন। ছেলেটা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করতে যায়। বছর খানেক ভালোই চলছিলো তারপর ছেলেটা এক্সিডেন্টে মারা গেল, মোমেনা কাকীর তখন পাগল দশা, ধানের মৌসুমে সবসময় কিছু চাল মোমেনা কাকীর জন্য বরাদ্দ রাখে সবুজ, কাকী হাত পেতে নেয় আর বলে,
• বাজান মনডা বড় রাখিস
তার মন কি বড় আছে? যার সাথে সংসার করার ইচ্ছে নেই তাহলে তার সাথে এসব কেন করতে গেল? তার আর পশুর মধ্যে কি পার্থক্য থাকলো?
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১৮
নামাজ পড়ে অনেকক্ষন মাথা নিচু করে বসেছিলো সবুজ। ইমাম সাহেব খেয়াল করলেন বিষয়টা, বয়োবৃদ্ধ মানুষটা লাঠি নিয়ে চলাচল করেন অথচ চোখের দৃষ্টি কত প্রখর, ঠিক সবুজের সমস্যা ধরে ফেললেন।
• কি সবুজ মিয়া?
• আসসালামু আলাইকুম
• ওয়ালাইকুম আসসালাম, কেমন আছ?
• আল্লায় রাখছেন
• আলহামদুলিল্লাহ বল, আল্লাহ যে অবস্থায় রাখছেন, বলতে হবে আলহামদুলিল্লাহ
• জি আলহামদুলিল্লাহ
• কি হয়েছে? কি নিয়ে এত পেরেশান?
• আপনি তো জানেন কোন পরিস্থিতিতে আমার বিয়ে হয়েছে?
• হ্যাঁ সব জানি, জোড়া লেখা হয় উপরে, বিয়ে হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছায়
• তাহলে জোড়া ভাঙে কেন ইমাম সাহেব?
• খেয়াল করে দেখবা,স্বামী স্ত্রী পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালন করে, একে অপরের হক আদায় করে, তারা কখনো আলাদা হয়না, আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বরকত দেন
• ভালো মানুষেরও তো বিয়ে ভাঙছে
• সেটা আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা অথবা নিয়ামত, আল্লাহর সিদ্ধান্তে আমাদের রাজি খুশি থাকতে হবে, সবর করতে হবে
সবুজ নিজেও জানেনা সে কি করবে। বাড়িতে ফিরে অনেকক্ষন নিজের ঘরে বসলো৷ নিম্মি এসে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করলো, সবুজ চুপচাপ বসে আছে। নিম্মি খাবার আনলো, সবুজ ঠায় বসা। নাস্তা করে ক্ষেত খামার দেখার নাম করে বেরিয়ে গেল। আজ একটা সিদ্ধান্তে আসবে সে। মিলির সাথে প্রয়োজনে বাসায় গিয়ে দেখা করবে। হনহন করে হেটে বেরিয়ে গেল সবুজ।
সালেহা পুরো দৃশ্য উঠানে বসে দেখল। ছেলেটা হাতের নাগালে আর নেই। নিম্মিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। মেয়েটা নিজেই পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু তাও রাগ হয়,কেন মেয়েটা আচলে বাধতে পারেনি স্বামীকে? স্বামীকে সংসারী করার দায়িত্ব তো স্ত্রীর! দুপুরে খেতে বসে কথা পাড়ে সালেহা,
• সবুজ কই যায় কি করে কিছু জানো?
• না ফুপু
• আম্মা কইয়া ডাকো না কেন ভাবী? সাধনা ফুট কাটে
• থাক মা ডাকন লাগব না, সংসার তো মন দিয়া করুক, সারাদিন খালি পড়া আর পরীক্ষার চিন্তা, কি নাই আমার সংসারে? কিছুর অভাব আছে? বিয়া কইরাই পাকা ঘর পাইছে? কি দেইনাই ওরে?
নিম্মি চুপ, সাধনা, সুমনা মায়ের স্বভাব জানে। সুমনা পারতপক্ষে মায়ের কথার বিপরীতে কিছু বলেনা, সাধনা কথা সাথে তাল মিলিয়ে কথা বলতে থাকে। নিম্মির হঠাৎ কি যেন হয়, সে কচু ভর্তা মাখা ভাতের থালিটা বাম হাতে তুলে নিয়ে নড়েচড়ে বসে, সে ভাবতে থাকে, তাদের বাড়ির ছোট্ট ফল বাগানের ছায়াঘেরা নির্জন দুপুর, উপুড় হয়ে বই পড়ছে সে, হাতে ভাতের থালায় পছন্দসই তরকারী, পাতের এক পাশে আমের ঝাল আচার,বই পড়তে পড়তে ভাত খেত নিম্মি, বাবা হাসতেন, বলতেন কি অভ্যাস যে বানাচ্ছিস! বাবা…. বাবা এসেছিলো, এভাবে বাবাকে ফিরিয়ে না দিলেও হতো…..
নিম্মি উঠে যায়। পাতের ভাত মুরগিকে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে। পিছনে মা, মেয়েরা হা করে দেখছে তাকে, দেখুক!
সবুজ পৌঁছে গেছে মিলিদের বাড়িতে। দারোয়ানকে বুঝিয়ে ভেতরে যায় সে, কলিং বেল বাজাতেই থাকে কিন্তু কেউ দরজা খোলেনা, সবুজ নিচে নেমে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে,
• বাড়িতে কেউ নাই?
• বাড়ির সবাই চাকরি করে, কে কোথায় আছে কেমনে কই?
সবুজ হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসে, সামনেই একটা ছোট চায়ের দোকান। দাড়িয়ে পড়ে সে, মিলি বলত খুব ভালো মালাই চা পাওয়া যায়, কিন্তু এখন কেবল বেলা এগারোটা, এখন দুধ কেবল চুলায় জ্বাল হচ্ছে।
• একটা দুধ চা
• কাউরে খুঁজেন?
• আমি মিলির অফিসে কাজ করি
• মিলি আপা? চারতলার মিলি আপা?
• হ্যাঁ
• আপা তো স্কুল মাস্টার
• আমিও তাই
• ও তাই কন, আপা ছুটি নেয়নাই?
• না তো, কেন কি হয়েছে?
• আপার মাইয়া তো হাসপাতালে ভর্তি
• কবে?
• দুই দিন হইছে মনে হয়
• কই দারোয়ান তো কিছু বললো না?
• ঐ আরেক হারা*মী, সারাদিন ঘুম, রাইতে বাজে নেশা
• কোন হাসপাতাল জানেন?
• সরকারি হাসপাতাল মনে হয়, আপনি ফোন করেন
• জি ধন্যবাদ
সবুজ ছুটে গিয়ে অটো ভাড়া করে, এখান থেকে তিন বার অটো বদলে যেতে হবে হাসপাতালে! নাহলে মোটা টাকা গুনে রিজার্ভ নিতে হয়। এত টাকা সাথে নেই তার।
হাসপাতাল বিল্ডিং বিশাল, কোথায় কোন বিভাগ জানা না থাকলে খুবই হয়রানি। শুনে শুনে শিশু বিভাগের সামনে যায় সবুজ। ভিতরে লোকে লোকারণ্য! এর ভিতর সে মিলিকে কোথায় পাবে। ফোনে তো ব্লক করে রেখেছে! সে দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে ঠিক করে। সবুজের কপাল ভালো, ডাক্তার এসে পড়ায় সবাইকে বের হতে বলে সিস্টার, তখনই চোখ পড়ে মিষ্টির বেড দরজা থেকে কাছেই, মিলির পিঠ দেখা যাচ্ছে। এটুকুতেই শান্তি পায় সবুজ। ডাক্তার বেশ সময় নিয়ে রাউন্ড দেয়। রাউন্ড শেষে আবার বাজার বসে ওয়ার্ডে। সবুজ এগিয়ে যায় মিষ্টির বেডের কাছে। মেয়েটার হাতে ক্যানুলা করা, স্যালাইন যাচ্ছে।
• তুমি? মানে আপনি? এখানে কিভাবে? মিলি চমকে যায়
• মন চাইলে খুঁজে পাওয়া যায়
• কি চাই?
• এখানেই কথা বলবা?
• মেয়েকে একা রেখে….
• পাঁচ মিনিট
• আপা আমি একটু বাথরুম থেকে আসি, মেয়েটাকে দেখবেন বলে পাশের বেডের এক বাচ্চার মাকে, বের হয় মিলি
• ভাই,ভাবী একটু আগেই এসেছিলো, দেখলে কি হত?
• ভালো হত, উনারা জানতেন আমাদের বিষয়টা
• কি বিষয় আমাদের? আমি কোন বিবাহিত লোকের রক্ষিতা হওয়ার মত মেয়ে না
• প্লিজ মিলি বোঝার চেষ্টা কর, আমি পরিস্থিতির শিকার
• বেশ, যত দ্রুত সম্ভব তুমি ডিভোর্স নিয়ে আমাকে বিয়ে করবা, নাহলে আমার সামনে আসার দরকার নাই
• নিম্মি যদি অনুমতি দেয়, তাহলে তো আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি, এখনই ডিভোর্স দিলে মেয়েটার সম্পর্কে মানুষের খারাপ ধারণা হবে
• ডিভোর্স বিয়ের একদিন বাদে হোক আর এক বছর বাদে, মানুষের ধারণা খারাপই হয়
• নিম্মি আমার মামাতো বোন, আমি এভাবে ও কে ছাড়তে পারিনা
• ছাড়তে বলছে কে? আমার রাস্তা ছাড়ো
• তুমি খুব ক্লান্ত, বাসায় গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসো আমি মিষ্টির কাছে বসছি
• তোমাকে আমি কতটুকু চিনি? নিজের মেয়ের ভার কিভাবে দেই?
• এই বিশ্বাস তোমার আমার উপর?
• হ্যাঁ, এই বিশ্বাস
মিলি চলে গেল ভিতরে। সবুজ রাগে দুঃখে নিজেকেই নিজের মারতে ইচ্ছা করছে। সেদিন কেন সে বলতে পারেনি, সে নিম্মিকে বিয়ে করবে না? আর কেনই বা সে স্বামীত্ব ফলাতে গেল? এখন নিম্মিকে মিলির কথা বললে সে কেমন ভাবে নেবে? সে কি রাজি হবে দ্বিতীয় বিয়েতে? আর মামা? মামা কিভাবে নেবে?
হাসপাতালের বাগানে বসে থাকে সবুজ। মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করে তার। সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে সে!
চলবে।