শ্রাবণের মধ্যদুপুর পর্ব-১৯+২০+২১

0
23

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
১৯

নিম্মির কলেজের প্রিন্সিপাল মনিরা সুলতানা এসেছেন নিম্মিদের বাসায় । নাজিমুদ্দিন সাহেব মাথা নিচু করে বসে আছেন। মনিরা সুলতানা কিছুটা উড়ো কাহিনি শুনেছেন, এসব রসালো কথা বাতাসের বেগে ছোটে। তাই তিনি বাসায় এসেছেন, পুরো সত্যিটা জানার জন্য। তিনি খুব ভর্ৎসনা করলেন,

• আপনি একটা বার ভাবলেন না? একটা মেয়ে এত ভালো ফলাফল করেছে, কোনরকম বাড়তি শিক্ষক কোচিং ছাড়াই, সে নিজে ছাত্র পড়ায়, সে আজেবাজে কাজ কখন করবে? একটা বার নাহয় আমার সাথে আলাপ করতেন? মেয়ের বাবাকে অনেক ধৈর্য্যশীল হতে হয়।

• মেয়ের তো মা নেই আমাকে এসব বোঝাবে বলেন? আর আমার বোন সবসময় আমাকে উল্টোই বুঝিয়ে গেছে।

• আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে গ্রামের পলিটিক্সে হেরে গেলেন? সে এখন আপনার মেয়েকে পুরোপুরি হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলেছে। না হলে ও কোনভাবে ক্লাস মিস দিতো না

• আবার আমার উপর অভিমান থাকতে পারে

• যাইহোক খুব খারাপ লাগলো শুনে, এত ভালো একটা মেয়ে, রাস্তায় যখন হেঁটে যেত আমার প্রশংসা করতাম ওর দিকে তাকিয়ে, কখনো চোখ তুলে এদিক সেদিক তাকাতো না, আমরা বলতাম বড় ভাগ্য করে এসেছে ওর জামাই, অথচ এমন একটা পরিস্থিতিতে বিয়ে করে, আমার তো মনে হয় না আপনার ভাগনেও খুব সুখে আছে

• না, আমার ভুল তো আমি বুঝে এলাম

• এখন মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাসায় নিয়ে আসুন, যা ক্লাস পরীক্ষা বাদ গেছে, আমি ওকে তৈরি করে নিতে সাহায্য করব

• আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

নাজিমুদ্দিন সাহেব সবুজকে কল দেন। কিন্তু কল রিসিভ হয় না। সেদিন বাসস্ট্যান্ডে বেশ অদ্ভুত লাগছিল, সবুজের শহরে এত কি কাজ? আগে যেখানে মাকে একা একা পাঠিয়ে দিত? এখন সে শহরে এত কি কাজ করে? একটু খোঁজ নিতে হবে।

সবুজ এলোমেলো পায়ে বাসায় ঢুকলো। রাত বাজে এগারোটা। শেষ বাস ছিল সন্ধ্যার। বাস বাজারে নামিয়ে দিয়েছে অনেক আগে। বাজার শেষ হয়েছে, সব দোকানের ঝাঁপি বন্ধ হবার পর, সবুজ ধীর পায়ে বাড়িতে এসেছে। ফিরেই মায়ের সামনে পড়ে যায়,

• কোথায় ছিলি?

• শহরে গেছিলাম

• শহরে তোর এত কি কাজ?

• ব্যবসার কাজ

• মাছের খামারে যাস না তুই তিনদিন

• তোমাকে কে বলল?

• বেলাল আসছিল বাসায়, মাছের খাবারের টাকা চাইতে

• আমারে কল দিলেই হইত

• তুই তিন দিনে ওর কোন কল ধরিস নাই

• মোবাইলের সমস্যা মনে হয় দেখাইয়া আসুমনে

• তুই কাল আবার শহরে যাবি?

• কাজ থাকলে যাব না?

• কি কাজ সেটা তো ঠিক করে কইতে পারতাসোস না?

• তোমারে কইলে তুমি বুঝবা?

• না বুঝেই এত দূর আইছি আমি

• না মা তুমি বুঝো নাই, আব্বার জমি জিরাত ছিলো, আমি গায়ে গতরে খাটছি, মামা টাকা পাঠাইছে, তুমি আর সাধনা খুব ভালো জীবন কাটাইছো, সুমনাও ভালো জীবন পাইত, অর নসীব খারাপ, অসুখে অসুখে জীবন গেল, ওর ভালো চিকিৎসার জন্য যখন বিদেশ যাইতে কইলো ডাক্তার, তুমি জমি বেচতে রাজি হইলা না, মা তুমি খুব স্বার্থপর, খুব….

বলে সবুজ আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

নিম্মি অংক করছিলো, সবুজের চাচাতো বোনের বই খাতা নিয়ে এসেছে, সে এই বছর এইচএসসি দেবে। ফুপু ঘরে এসে বসে,

• তোমারে কইছিলাম স্বামীরে আচলে বানতে তার মানে এই না যে তুমি তার মনে মা বোনের জন্য বিষ ঢুকাবা
কোন জবাব দেয় না নিম্মি। সবুজের সাথে তার কথা খুব কম হয়, গতরাত বাদে সে সবসময় পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমাতো, আর কাল তো কোন প্রেম ভালোবাসা বিনিময় ছিলো না, কাল ছিলো চাহিদা পূরণ! তখন তো আর কোন কিছু বলার ছিলো না তার। এর মাঝে সে কি বিষ ঢালবে?

• আমি বুঝিনা মনে করছ? আমার সামনে চুপ থাক তুমি? তোমার মিচকা শয়তানী আমি বাইর করবো

• মা? কি হয়েছে?

সালেহা অবাক, সবুজ যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল, তাতে এখনই ফিরবে বুঝতে পারেনি।

• খাইতে আস বাবা, এটাই বলতে আসছিলাম, বৌমা না খাইয়া অপেক্ষা করতাছে…. কন্ঠে মধু ঢেলে বলে সালেহা

• খাবার এখানে পাঠায় দাও, তোমরা খাইছ?

• হ! আমার বয়স হইছে, বেশি রাত করলে অম্বল হয় আর….

• ঠিক আছে মা যাও

কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে সবুজ, মাথায় তার হাজার চিন্তা, মাছ,মুরগির খাবার কাল কিনে দিয়ে শহরে যেতে হবে, মিলি আর কতদিন এভাবে এড়িয়ে যাবে? দরকার হলে নিম্মিকে রাজি করিয়ে মিলিকে ঘরে তুলবে সবুজ! নিম্মি খাবার আনে, অন্যমনস্ক হয়ে খাবার খেতে গিয়ে বিষম খায় সবুজ, পানি এগিয়ে দেয় নিম্মি। পানি খেয়ে সবুজ বলে,

• আচ্ছা যদি ধরো, তুমি সত্যিই কাউকে ভালোবাসো, কিন্তু তোমারে বাধ্য কইরা অন্য কারো সাথে বিয়া দেওয়া হল, তুমি কি করবা?

• আপনার মাথা থেকে এখনো ওসব যায়নি?

• না না এটা অন্য প্রসঙ্গ?

• কি আর করব? মেয়েদের কি করার আছে?

• যদি বলি আমি কাউকে ভালোবাসি

• বাসতেই পারেন

• তাকে বিয়ে করে ঘরে আনতে চাই

• আনতে পারেন

• তুমি ভাইবা বলতেছ তো

• এখানে ভাবনা চিন্তার কি আছে?

• ভাবনা চিন্তার কিছু নাই?

• আমি যদি বলি আপনি বিয়ে করতে পারবেন না, তাহলে কি আপনি আপনার ভালোবাসা ভুলে যাবেন?

• তাও কথা

• এজন্য সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত আপনার

• আমি একজনকে ভালোবাসি, এই যে প্রতিদিন শহরে দৌড়ায় যাই, তার কাছেই যাই

• আমারও তাই মনে হচ্ছিল

• সে আমাকে বলছে তোমারে তালাক দিয়ে তারে বিয়ে করতাম

• তার কথাও যৌক্তিক

• তুমি তালাকে রাজি?

• এখানেই বা আমার কি করার আছে?

• আমি তালাক দিলে তোমার কিছু করার নাই?

• কোর্টে কেস করলে আপনি খোরপোষ দিতে বাধ্য থাকবেন, কোন মানুষকে কি এভাবে বেঁধে রাখা যায়?

• ঠিক

• তোমার শুনে খারাপ লাগছে না?

• একেবারে লাগছে না তা বলবো না, আপনার সাথে সংসার করবো ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছিলাম, এখন আপনি আর একজনকে ভালবাসেন, তার সাথে সংসার করতে চান, এটা মেনে নেওয়া কষ্টের, আপনি যদি সেদিন বাবাকে বুঝাতে পারতেন, আপনি বিয়ে করতে চাইছেন না, সেটা দুজনের জীবনের জন্য মঙ্গল হতো, এখন দুজনেরই জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতি আসবে সামনে

• তুমি সবকিছু খুব সুন্দর ভাবে চিন্তা কর

• আমি সবকিছু চিন্তা করেই বলেছিলাম আমাকে বিয়ে করবেন না

• তখন তোমার প্রেম ছিল

• আপনি জানেন আমার কারো সাথে প্রেম নাই, এবং ওই মোবাইলে মেসেজ মেসেজ খেলা আসলে কিছুই না, সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন, নিজের ভালোবাসার বিষয়টাকে সহজ করতে এখন আমার প্রসঙ্গ তুলবেন না, নিজের যে কোন সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখুন, কেউ আপনাকে কোন কাজে বাধ্য করেছে কোন একটা কারণে করছেন এটা আত্মবিশ্বাসের অভাবের লক্ষণ

নিম্মির বলা কথাটা শতভাগ সত্য। সবুজ জানে নিম্মির কারো সাথে প্রেম ছিলো না। কিন্তু নিজের বিষয়টা সহজ করতেই সে বারবার নিম্মির প্রেমের কথা তোলে। কিন্তু মুখের উপর এভাবে বলাটাও তার ভালো লাগলো না।

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২০

নিম্মি খাবার নিয়ে উঠে চলে গেল। রান্নাঘরে পিড়ি পেতে বসলো। টিনের চালের ফাঁকা অংশ দিয়ে চাঁদের আলো চুইয়ে পড়ছে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে নিম্মি। নিয়তি মেনে নিতে নিতে সে নিয়তির খেলার পুতুল বনে গেছে, সে প্রথম সাময়িকী পরীক্ষায় ভালো ফল করে শিক্ষকদের আশীর্বাদ পাওয়ার সময় কি সে জানত তার জন্য কি অপেক্ষা করছে? পুরো এক মাস চার দিন সে ক্লাস করেনা। ইশরাতকে বললে নোট হয়তো ম্যানেজ করা যাবে কিন্তু এখানে এই পরিবেশে কি তার পড়া হবে? তার কি বাড়ি ফেরা উচিত? বাবার উপর রাগ, অভিমান সবকিছু এক নিমেষেই গলে পানি হয়ে গেল। বাবাকে আসতে বলবে, সে তার পড়া চালিয়ে যাবে, সবুজের যে কয়টা মন চায় বিয়ে করুক, নিম্মি বাধা দেবেনা।

ভোরবেলা সালেহা অবাক, নিম্মি রান্নাঘরের মেঝেতে শুয়ে আছে! তাড়াতাড়ি ডেকে তোলে, নিম্মি হতচকিত হয়ে উঠে বসে। সালেহা তাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়, শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

রিফাতের ফোনে টুং করে একটা শব্দ হয়৷ বড়সড় একটা মেসেজ এসেছে, ফাহিমার লেখা,

ভালোবাসা হোক মুক্ত। নিজের প্রত্যাশা চাপিয়ে দিয়ে না হোক অবরুদ্ধ।
ভালোবাসা হোক শুদ্ধ। দেহের গন্ডির বাইরে গিয়ে ভালোবাসা ছুয়ে যাক অন্তর।
ভালোবাসা হোক শান্ত। পুরো পৃথিবীর কোলাহল পেরিয়ে ভালোবাসায় মিলুক প্রশান্তি।
ভালোবাসা হোক বিশ্বস্ত। প্রতারণার জালে বোনা এই ধূসর জীবনে ভালোবাসা হোক নির্ভরযোগ্য।
ভালোবাসা হোক সত্য। সকল মিথ্যে বুলির ভীড়ে ভালোবাসা থাকুক নির্মল।

ফাহিমা লিখছে, ভালোবাসা নিয়ে! সাথে সাথে কল দেয় রিফাত।

• বাহ দারুণ লেখ তো তুমি

• ক্লাসে আসো না কেন?

• ভালো লাগেনা

• কি সমস্যা?

• তোমাকে তো সব বলেছি

• এক মাসের বেশি হয়ে গেছে

• তাতে কি? আমি আসলে পারছি না

• কি?

• নিজেকে ক্ষমা করতে

• বেশ তাহলে নিজেকে তৈরি করো, যাতে ভুলে প্রায়শ্চিত্ত করতে পারো

• কিভাবে?

• ভালো রেজাল্ট করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে

• আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিম্মির কি উপকার করবো?

• নিম্মির যে জায়গায় বিয়ে হয়েছে তাতে ওর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, যতটুকু তুমি বলেছ, নিম্মি আরো পড়াশোনা করতে চাইবে, তখন তুমি তাকে সাহায্য করতে পারো

• সে কি আমার সাহায্য নেবে? আমাকে মাফ করবে?
করুণ শোনায় রিফাতের কণ্ঠ। ভালো লাগেনা ফাহিমার। কথা বলতে বলতে রিফাতকে ভালো লেগেছিল তার। কোন কুক্ষণে যে লাইন কয়টা লিখে পাঠালো….

রুমের লাগোয়া বারান্দায় যায় রিফাত। সামনে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি, বিশাল জায়গা জুড়ে, প্রচুর ফলের গাছ আছে তাতে। কেউ পাড়েনা, বস্তির বাচ্চারা প্রাচীর টপকে গিয়ে নিয়ে আসে অনেক কিছু। ফাহিমার সাথে তার আলাপ আছে। নিম্মি আর রতনের আলাপেও শালীনতা বিবর্জিত কিছু ছিলো না। তাহলে তার আর ফাহিমার বন্ধুত্ব যদি কলুষিত না হয়, তাহলে নিম্মিকে কেন সে এই শাস্তি দিলো? নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনা রিফাত। দিন রাত শুধু আফসোস করে যায়। একবার নিম্মির কাছে মাফ চাইতে পারলে হয়তো ভালো লাগবে। বাবা ঠিক করে কথা বলেনা। ছোট বোন অব্দি কথা শুনিয়েছে।

জ্বরের ঘোরে নিম্মি আবোলতাবোল বকে যাচ্ছে। মাথায় অনবরত পানি ঢালছে সালেহা, সাধনা প্রতিবেশী চাচীরাও উপস্থিত। কিন্তু জ্বর কমছে না। সবুজ উদভ্রান্তের মতো সকালেই বেরিয়ে গেছে, নিম্মির জ্বর নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা ছিলো না। সালেহা অসহায় বোধ করে। দিন গড়িয়ে যায়, জ্বর কমেনা, বাজারের ফার্মেসি থেকে পল্লী চিকিৎসক ডেকে আনে রাখাল। সে একটা স্যালাইন ঝুলিয়ে কিছু ওষুধ দিয়ে যায়। রাতেও জ্বর না কমলে সদর হাসপাতালে নিতে বলে। রাতটা খুব উৎকন্ঠায় কাটে। সুমনাকে নিয়ে প্রায়ই এমন অবস্থা হয়, কিন্তু নিম্মিকে নিয়ে সালেহার অনুভূতি মিশ্র, একবার মনে হয় এই আপদ না জুটালেও পারত, যার সাথে ভেগে যাওয়ার ভেগে যাক, আবার ভাবে ঐ ছায়াঘেরা বাড়িটার কথা! ছোট্ট এক চিলতে বাড়ি, কিন্তু রান্নাঘর, বাথরুম পাকা, পিছনে ফল বাগান, গহনা গুলো আলমারি থেকে সরিয়ে ফেলবে নাকি? চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দেয় সালেহা। সবুজ না এলে ভাইকে ডাকতে হবে। নাজিমুদ্দিন এবার মেয়েকে জোর করে নিয়ে যাবেন। বোনের উপর তো রাগ অবশ্যই করবেন। আর সবুজের সাথে কি সমস্যা সেটাও জেনে যাবেন…..

শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২১

সকালে মড়ার মত ঘুমাচ্ছে নিম্মি। ডাকলে হু হ্যাঁ করে সাড়া দেয়। কি যে হলো…. বাধ্য হয়ে ভাইকে খবর পাঠান সালেহা। মনের মধ্যে একেবারে যে ভয় কাজ করছে না তা না। নাজিমুদ্দিন সাহেব এসে মেয়ের অবস্থা দেখে দ্রুত সিএনজি ভাড়া করে শহরে নিয়ে গেলেন মেয়েকে। সাথে সাথেই হাসপাতালে ভর্তি করে নিল ডাক্তার। পরদিন সকালের আগে নিম্মির কি হয়েছে আসলে জানা যাবে না। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রাখা হবে, সকালে সিনিয়র ডাক্তাররা দেখবেন। নাজিমুদ্দিন মিনতির মাকে বসিয়ে রেখে মসজিদে গেলেন এশার নামাজের সময় হয়েছে, কিভাবে যে পুরো দিন পার হলো তিনি টেরই পেলেন না। সবুজ একবারও খোঁজ নেয়নি। সালেহা,সাধনাকে তিনি আসতে দেননি। মেয়েটাকে অহেতুক একটা দিন বিনা চিকিৎসায় ফেলে রেখেছিলো এরা। এশার নামাজ পড়ে, পাশের হোটেল থেকে কোনমতে মুখে ভাত গুজে হাসপাতালে এলেন নাজিমুদ্দিন। মিনতির মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চাইলে সে বলে বাড়ি থেকে মিনতিকে নিয়ে আসতে। তারপর সে যাবে। নাজিমুদ্দিন মিনতির মায়ের নিম্মির প্রতি ভালোবাসা দেখে আপ্লূত হন। মিনতিকে আনতে চলে যান। শহরের এক প্রান্তে নদীর ধারে, নিচু জমিতে আধাপাকা বাড়ি। রিকশা ওয়ালাকে মিনতির মা বুঝিয়ে দিয়েছিল বলে রক্ষা, এই এলাকায় তিনি কখনো আসেননি। মিনতিকে সবকিছু বলার পর সে এক কাপড়ে বের হয়ে এলো। নাজিমুদ্দিন সাথে কাপড় নিতে বললেন। রাস্তা থেকে কিছু শুকনো খাবার আর ফল কিনলেন। মিনতিকে হাসপাতালে রেখে তার মা বের হলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। সারারাত হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারি করে কাটালেন নাজিমুদ্দিন, তার রাতের ওষুধ কিছুই খাওয়া হয়নি। বুক ধড়ফড় করছে। ফার্মেসিতে বলে একটা প্রেসারের ওষুধ খেয়ে বারান্দায় বসলেন। অগণিত রোগী পড়ে আছে বারান্দায় , আত্মীয় স্বজনের আনাগোনা একটু কমেছে। কাল সকালে অফিসে গিয়ে ছুটির আবেদন দিয়ে আসতে হবে। কটা দিনই আর বাকি আছে চাকরির। তারপর এই মেয়েটাকে নিয়ে জীবন কাটানো…. তিনি সবুজ, নিম্মির বিয়ে সবকিছু যেন ভুলে বসে আছেন! কিংবা জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে রেখেছেন এই চিন্তা।

হাসপাতালে মিলির ভাইয়ের দেখা পেল সবুজ। কিভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারছে না, স্ত্রীকে রিকশায় তুলে দিয়ে নিজের গন্তব্যে যাবেন। সবুজ পিছু ডাকে,

• ভাই?

• আমাকে বলছেন? অবাক হন মিলন

• আসসালামু আলাইকুম

• ওয়ালাইকুম আসসালাম

• ভাই কিছু কথা ছিলো

• আমার সাথে?

• জি

• বলেন

• কোথাও বসে বলি? ঐ যে চায়ের দোকান

• আসেন, আমার একটু কাজ আছে

• ভাই চা নেন

ইতস্তত করে চা হাতে নেয় মিলির ভাই

• আমি মিলির ব্যাপারে কথা বলতে চাই

• মিলির কোন ব্যাপার?

• আমি মিলিকে বিয়ে করতে চাই

• কি যা তা বলছেন?আর দেখে তো ভদ্রলোক মনে হচ্ছে, বিয়ে-শাদির কথাবার্তা এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চায়ের দোকানে হয় নাকি?

• ভাই প্লিজ রাগ করবেন না খুব বিপদে পড়ে কথাটা এখানে বলতে বাধ্য হয়েছি

• কিসের বিপদ

• মিলি সবকিছু জানে

• মিলির সাথে আপনার পরিচয় কিভাবে হলো?

• মিলির স্কুলে

• হুম

• আমার সম্পর্কে সবকিছু আমি জানাবো, শুধু আমি এটুকু জানাতে চাই আপনারা বিয়েতে অমত করবেন না

• আমার মনে হয় আপনি খুব বড় কোন সমস্যার মধ্যে আছেন, আপনার কথাবার্তা খুবই অসংলগ্ন, আমার বোনকে বিয়ে করতে চাইলে, আমাদের বাড়িতে আপনার মা-বাবাকে নিয়ে আসুন, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিন, মিলির ক’দিনের ডিভোর্স, মিলির একটা বাচ্চা আছে

• সব জানি, আমি সব জানি মিলে সম্পর্কে

• বেশ তাহলে কথা ঐ রইলো, আসুন বাবা মাকে নিয়ে

• আমি বাবা নেই, মা থাকেন গ্রামে, আমি পড়াশোনা করে বিদেশে গিয়েছিলাম, চাকরি করে টাকা জমিয়ে আবার ফেরত এসেছি, এখন ব্যবসা করছি, আমার নিজস্ব খামার মুরগির ফার্ম আছে, আগামীতে গরুর ফার্ম দেওয়ার ইচ্ছা আছে

• বেশতো আপনার মাকে নিয়ে আসুন, আমি চলি আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে

সবুজ হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়। রাস্তার ওপার থেকে ছুটে আসছে মিলি।

• আপনি আমার ভাইকে কি বললেন?

• বাহ আপনি তে চলে গেছে?

• কি বললেন বলুন?

• আমাদের বিয়ের কথা

• মানে কি?

• তোমার আমার বিয়ের কথা

• আর তোমার স্ত্রী?

• তাকে আমি মানি না

• এত সাহস কোথায় ছিল তোমার? বিয়েতে কবুল বলার আগে একবার পারোনি কথাগুলো?

• পারিনি মিলি, কিন্তু এখন তো পারছি

• কারণ এখন তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে

• হ্যাঁ তোমার ভাইও বলছিল আমি নাকি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছি

• এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তো মেয়ের পরিবার এটাই বলবে তাই না? এত খারাপ দিন এসেছে আমার আজ রাস্তায় বিয়ের প্রস্তাব পেতে হচ্ছে?

• তুমি স্থান কাল দেখোনা পাত্রকে দেখো, এই আমাকে দেখো, আমি জীবনে কখনো কারো সাথে সজ্ঞানে কোনো অন্যায় করিনি

• তাহলে এখন করছ কেন?

• আমি আমার জীবন সাজাতে চাই তোমাকে আর মিষ্টি কে নিয়ে

• সবুজ এটা ভালোবাসা না এটা জেদ

• হোক জেদই হোক, কিন্তু আমি তোমাকেই চাই

• ভাইয়া কি বলেছে?

• প্রস্তাব পাঠাতে

• প্রস্তাব পাঠাও, সাথে তোমার প্রথম স্ত্রী কে অবশ্যই আনবে

• কেন বারবার এই প্রসঙ্গ তুলছো? আমি সবকিছু ম্যানেজ করে নেব

• শহরে এক বউ গ্রামে আরেক বউ?

• যদি তাই করি তোমার কোন সমস্যা আছে?

• অবশ্যই আছে, আমি কেন সতীনের সংসার করবো?

• আমাকে ভালোবাসো তাই

• না আমার কাছে ভালোবাসার চাইতে আত্মসম্মানের মূল্য বেশি

• বেশ আর মাকে নিয়ে তোমাদের বাড়ি আসছি।

• যা মনে চায় করো

মিলি হাসপাতালের দিকে চলে যায়। মিষ্টি শরীরটা এখন আগে থেকে অনেক ভালো। কাল ছুটি দিয়ে দিতে চেয়েছে ডাক্তার। এই বিপদটা না ঘটলে মনে হয় সবুজের এই পাগলামিটা দেখা যেত না। মিলির সবচেয়ে কাছের মানুষ হলো মিষ্টি। নিজের আত্মার অংশ মনে হয় মেয়েকে। কিন্তু সবুজের সংসার ভেঙে মিলি কখনোই চাইবে না, নিজের সংসার গড়তে। বড় ঝাকড়া আম গাছটার দিকে চোখ যায় মিলির। কত বয়স হবে গাছটার? কত কিছুর সাক্ষী সে! কত প্রেম, অপ্রেম! মিলি ভালো লাগাটা মনে স্থান দিতে চাইছে না। সবুজের মা কান্নাকাটি করলেই সবুজের সব রাগ, জেদ গলে পানি হয়ে যাবে। সবুজের স্ত্রী এই মাসে কত কাছাকাছি এসেছে? ওরা তো পূর্ব পরিচিত ,ওদের কি কাছে আসতে সময় লেগেছে? অবশ্য সেও তো বিবাহিত ছিলো। এসব ভেবে আর লাভ কি?

চলবে