শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২২
মুখটা তিতা হয়ে আছে,জিহবায় ভিটামিনের অভাবে ঘা হয়ে খুবই ব্যথা। হাতে একটা বাটিতে নরম করে রান্না করা খিচুড়ি। নিম্মি নাড়াচাড়া করছে। মিনতি বসে আছে মেঝেতে, বাবা খাবার এনেছে। খুব খারাপ ইনফেকশন নিয়ে ভর্তি হয়েছে নিম্মি। প্রসাবের ইনফেকশন। মেয়েরা হালকা জ্বর, প্রসাবে জ্বালাপোড়া সহ্য করেই চলে, মনে করে এটাই স্বাভাবিক, পানি খেলেই ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু ঠিক হয়নি। আরো দেরি হলে ক্ষতি হয়ে যেত। সারাক্ষণ এই স্যালাইনের ক্যানুলা চামড়ায় আঘাত করছে, ঘুমাতে গেলে পাশ ফিরতে কষ্ট। নার্স বলেছে, ডাক্তার ছুটি দিলে তবেই এই ক্যানুলা খোলা হবে, তার আগে নয়!
• মা, খাওয়ার চেষ্টা কর
• করছি বাবা
বাবার সাথে কথা খুব কম হচ্ছে। নিম্মির শরীর ভীষণ দুর্বল। এদিকে ফুপু চলে এসেছে। তাকে শক্তভাবে কথা বলতে বারন করেছে বাবা, সবুজ আসেনি। সবুজ তাহলে বিয়েটা করেই ফেলবে! নাকি বিয়ে করেই ফেলেছে? সেদিন তাকে জানিয়েছে শুধু? তার খারাপ লাগছে কেন? সবুজকে সে কোনদিন ভালোবাসেনি? তাও কেন কষ্ট হচ্ছে? তাও কেন বুকের মধ্যে কেউ মিহি সুই ফোটাচ্ছে?
বাসায় এসেছে নিম্মি। খবর পেয়ে ইশরাত এসেছে দেখতে,
• কি হাল করেছিস নিজের? আমি তো ভাবতেই পারিনি রিফাত ভাই এমন একটা কাজ করতে পারেন
• তুই চিনিস?
• আমার খালাতো ভাই
• ভুল আমারই ছিল, অচেনা অজানা মানুষের সাথে কেন মনের কথা বলতে গেলাম?
• তোর কোন দোষ নেই, রিফাত ভাইয়ের নিজের বন্ধু বান্ধব নাই? উনি কি পীর আউলিয়া?
• থাক বাদ দে, যা হওয়ার তো হয়েই গেছে
• প্রিন্সিপাল ম্যাম তো খুব কষ্ট পেয়েছিলেন সবকিছু শুনে, উনি তো তোর গ্রামেই চলে যাচ্ছিল
• আমার গ্রামে?
• মানে তোর শ্বশুর বাড়ি
• তারপর?
• আমরা সবাই মিলে বললাম, আঙ্কেলের সাথে দেখা করতে, পরে ম্যাম আঙ্কেল এর সাথে কথা বলেছেন, তুই যদি এখন ক্লাস শুরু করিস উনিই তোকে সবরকম সাহায্য করবেন
• আমি কি এ বছর পরীক্ষায় বসতে পারব?
• মাত্র কয়েকটা দিনেরই তো ব্যাপার, আমার মনে হয় তুই যদি চেষ্টা করিস পারবি
• না মানে কলেজের একটা নিয়ম কানুন আছে না?
• সেটাতো ম্যাডাম বলেই দিয়েছেন, সাহায্য করবেন
• তাহলে আমি কাল থেকে ক্লাস করতে চাই
• না না পাগল নাকি? এই শরীরে ক্লাস করার দরকার নাই অন্তত এক সপ্তাহ বিশ্রাম নিবি
• অনেকদিন তো নষ্ট হল
• হোক তুই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নে, তোর শাশুড়ি কি বলল?
• কিছুই বলেনি, হাসপাতালে খানিক চেঁচামেচি করলো, নার্স বের করে দিল
• এখানে থেকে পরীক্ষা দিতে দিবে?
• জানিনা রে
• আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তোর অসুখের পিছনে একটা কারণ আছে
• ঐ পানি খেতাম না অনিয়ম করতাম
• আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আরো কারণ আছে
• আর কি কারণ?
• আমি তোর খুব কাছের বন্ধু না, আমি কিন্তু বুঝতে পারি
• সবুজ আমাকে একটা কথা বলেছে
• কি কথা?
• সে একজনকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করতে চায়
• সে কি?
• হ্যাঁ
• এত সর্বনাশা কথা
• কেবল একমাস হলো বিয়ের, এখনই এমন কথাবার্তা
• সে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় নাকি তোকে তালাক দিতে চায়?
• আর তো তার সাথে কোন কথা হয়নি
• হাসপাতালে দেখতে আসেনি?
• না
• তাহলে তো বিপদের কথা
• আমি আসলে কিছু বুঝতে পারছি না
• আচ্ছা ঠিক আছে এখন এত কিছু ভাবতে হবে না, তুই বরং বিশ্রাম নে, আমি পরশু এসে ঘুরে যাব, কোন নোট লাগলে বলিস, ফোন এখন তোর কাছেই আছে না?
• হ্যাঁ বাবা দিয়ে দিয়েছে
• তাহলে বলে দিস কোনটা লাগবে
• পুরো দেড় মাসের সমস্ত লেকচার দরকার
• পেয়ে যাবি দুশ্চিন্তা করিস না, তোর টিউশনিগুলো কে করছে জানিস?
• কে?
• দিপু
• ভালো হয়েছে, ও তো অনেক ভালো ছাত্র
• ও বলেছে তুই চাইলে আবার ফেরত দিবে
• আমার জীবন তো এখন অন্যরকম হয়ে গেল
• কিছুই হয়নি, মন শক্ত করে পড়া শুরু কর, মনে কর একটা একটা দুর্ঘটনা
ইশরাত চলে গেল। সবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। ভাদ্রের তাল পাকা গরম কমেছে। থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে, সবুজ কি বিয়ে করে ফেলেছে? হাসপাতালে ছুটির সময় মা ছেলে কেউ এলো না। ছাদের কিনারে বসে পড়ে নিম্মি। সিড়িতে পায়ের আওয়াজ বাবা উঠছে নাকি, হঠাৎ উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে যায় নিম্মির, বাবা ছুটে এসে ধরে,
• মারে আমি ভুল করেছি জানি,তাই বলে তুই এমন করবি?
• আমি কি করেছি বাবা?
• ছাদের কিনারে বসে আছিস কেন?
• একতলা ছাদ, কিছুই হবেনা
• হাত,পা ভাঙলে?
• সেতো ডাক্তার বলছিল, এক দুই দিন দেরি হলে কিডনি সমস্যা হতে পারত,এত খারাপ ইনফেকশন ছিলো
• মারে তোর অনেক অযত্ন হয়েছে না?
• না বাবা শশুর বাড়ি এমনই হয়, তোমার আর কি দোষ
এক মাসে মেয়েটা কেমন পর হয়ে গেল। মা মরা মেয়েটাকে এভাবে বিয়ের পিড়িতে বসতে বাধ্য করা উচিত হয়নি। চোখ কোটরে ঢুকে গেছে, ফ্যাকাসে মুখ। এলোমেলো চুলে কতদিন তেল পড়েনা, মুখের সেই লাবণ্য হারিয়ে কেমন শূণ্য দ্বিধাগ্রস্ত দৃষ্টি! কেন যেন মনে হয়, জীবনের সবকিছু হারিয়ে বসে আছে মেয়েটা….
নতুন শার্ট প্যান্ট পরে তৈরি হয় সবুজ। মায়ের জন্য নতুন শাড়ি এনেছে। বিয়ের সময় মায়ের জন্য শাড়ি কেনা হয়েছিল, কিন্তু সে আবার আরেকটা শাড়ি এনেছে। এলাকার সবচেয়ে ভালো মিষ্টির দোকান থেকে দশ কেজি মিষ্টি কেনা হয়েছে। সুমনা সাধনা দুজনই অবাক, ভাবিকে আনতে এত তোড় জোড়?
• আরে বাবা এসবের কি দরকার? অসুস্থ রোগী দেখতে কি নতুন জামা কাপড়, নতুন শাড়ি পড়া জরুরী? তারপর আবার এত মিষ্টি? কোন সুখবর পাইছিস নাকি?
• রোগী দেখতে যাচ্ছি কে বলল মা? সুখবর তো বটেই
• তাইলে কই যাচ্ছি?
• গেলেই বুঝবা
• আগে বল, একটা প্রস্তুতি আছে না?
• প্রস্তুতি তো আমি করেছি, শহর থেকে এক গোছা ফুল কিনে নেব, এখন চলো
• আমিও যাব?
• তোমাকে তো যেতে হবে, যাও শাড়ি পরে ভালোভাবে তৈরি হয়ে এসো, আর সাধনারে বল তোমাকে একটু আতর বা কিছু একটা লাগায় দিতে
• কেন আমার গায়ে কি গন্ধ?
• পানের একটা গন্ধ থাকেই মা
সালেহা বেশ অপমানিত বোধ করেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না। নিম্মিদের বাসায় যাচ্ছেনা সবুজ। তাহলে কোথায় যাচ্ছে? বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় উঠতে আরো অবাক হয়ে গেলেন সালেহা। একটা সাদা গাড়ি দাঁড়ানো।
• গাড়ি ভাড়া করছোস?
• হ্যাঁ মা যেখানে যাচ্ছি সেখানে সিএনজি অটোতে যাওয়া যায় না, মানে ভালো দেখায় না আর কি
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৩
সালেহা আর কোন প্রশ্ন করেন না। ছেলে হাত থেকে অনেক আগেই বের হয়ে গেছে। একটাই ছেলে তার। খুব অসহায় লাগে তার। মনে হয় জোর করে বিয়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি, নিম্মি মেয়েটাই সব শেষ করলো, জন্মে মাকে খেল, এখন সংসারটা শেষ করলো…. শাপ শাপান্ত শেষ না হতেই গাড়ি পৌঁছে গেল একটা টাওয়ার বিল্ডিংয়ের সামনে। বিশাল বিল্ডিং, নিচে নিচে সারি সারি গাড়ি দাঁড়ানো, এক ভদ্রলোক এসে দরজা খুলে দিলো, সালেহা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে নামে, সালাম দেয় লোকটা, পোশাক দেখে তো দারোয়ান মনে হচ্ছে, কিন্তু চেহারা খুব সুন্দর! সালেহা কিছুক্ষন তাকিয়ে সবকিছু দেখে,
• আসো মা
সবুজ লিফটের সামনে দাঁড়ায়।
• আমি এতে উঠুম না
• আম্মা অনেক উপরে হেঁটে উঠতে পারবেন না
লিফটের অপেক্ষায় থাকাকালীন সবুজের কানে এলো দুই নিরাপত্তা রক্ষীদের আলাপ,
• কই যায়?
• মিলি আপা গো বাসায়
• মিলি আপার খুঁজে আইছিলো এই লোক
• বিয়া শাদির ব্যাপার মনে হয়
• তাই হইবো, আপা ভালো মানুষ, তার ভালো ঘরে বিয়া হওন দরকার….
বাকিটা আর শোনা হয়না সবুজের। লিফটের ৫ বোতাম চাপে সবুজ। এতক্ষণ তার আত্মবিশ্বাস অটুট থাকলেও এখন বুক ধড়ফড় করছে তার। ছয়তলা উঠে কলিং বেল চাপে সবুজ। হৃদপিন্ড গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে মনে হচ্ছে! দরজা খুলে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানায় মিলির ভাই, ভাবী। সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমে বসায়। সবকিছু তাকিয়ে দেখছে সালেহা। সাথে সাথেই হরেক পদের খাবার চলে এলো, সবকিছু চেনেনা সালেহা। মিলির ভাবী একটা প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে।
• বাড়ি কি আপনাদের? জিজ্ঞেস করেন সালেহা
• না আন্টি ভাড়া বাড়ি, আমরা তিনজনেই চাকরি করি, চলে যাচ্ছে দিনকাল
• সবুজের বাবার দশ বিঘা জমি ছিল, চাষের জমি, ধান সরিষা মরিচ আবাদ হয়, আর আমাদের বসতভিটা এক বিঘার উপর, ৫ বিঘা সবুজ লিজ নিয়েছে, তাতে সবুজের মাছের খামার মুরগির খামার আছে, বিদেশি গরু কেনারও ইচ্ছা আছে
• বাহ চমৎকার
চা নিয়ে ঢোকে মিলি, মিলির পরনে মেজেন্টা রংয়ের একটা কটন গাদোয়াল, চওড়া কালো সোনালি পাড়। ভীষণ সুন্দর লাগছে। সবুজ চোখ ফেরাতে পারছে না। সালেহা অবাক হন, তিনিও এত সুন্দর মেয়ে আশা করেননি।
• এই আমাদের বোন মিলি
• মিষ্টিকে দেখছি না, ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করে সবুজ
• ও রোজ বিকেলে পাশের বাড়ি খেলতে যায়
• আচ্ছা
• মিষ্টি কে? সালেহা জিজ্ঞেস করেন
• আমার মেয়ে, আমার এর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, জবাব দেয় মিলি
সালেহা অবাক হয়ে যান, বাড়িঘর নাই, জমি জমা নাই, এই মেয়েকে কোন আক্কেলে সবুজ পছন্দ করলো? এর চেয়ে তো নিম্মি ভালো ছিলো। না, ঐ বিয়ে ভাঙতে দেওয়া যাবে না। যে করেই হোক ঐ বিয়ে টিকিয়ে রাখা লাগবে।
• মেয়ে আপনাদের সামনে, এই কাছে একটা স্কুলে চাকরি করে, বাচ্চা একটা মেয়ে আছে, আমার বোনটা খুব লক্ষী, যে সংসারে যাবে সে সংসারে অনেক বরকত আসবে
হ্যাঁ সেজন্যই তো আগে স্বামী ছাইড়া দিছে। মনে মনে বলেন সালেহা।
• ভাইয়া তোমার অনুরোধে আমি আজকে সামনে এসেছি। আমার কিছু কথা বলার ছিল
• হ্যাঁ অবশ্যই
• সবুজের বিয়ে হয়েছে, মামাতো বোনের সাথে, মামাতো বোনের কি যেন সমস্যা হয়েছিল, তাই তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করতে হয়েছে, অনেকটা বাধ্য হয়ে নাকি বিয়ে করতে হয়েছে, বিয়ে কিন্তু অনেক আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, মানে মায়ের ইচ্ছা ছিল আর কি, সেই ইচ্ছা উনি পূরণ করেছেন, কিন্তু তিনি ভালোবাসেন আমাকে, তাই আজ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এখানে এসেছেন
• আপনি বিবাহিত? আপনার স্ত্রী জীবিত? চিৎকার করে ওঠেন মিলির ভাই মিলন
• জি, মাত্র এক মাস হয়েছে বিয়ের, এখনই যদি আমি মেয়েটাকে তালাক দিই, ভীষণ বিপদে পড়ে যাবে মেয়েটা, ওর পড়াশোনার খুব ইচ্ছা, ও পড়াশোনা চালায় যাক, তারপরে একটা সুবিধা জনক সময়, আমি তাকে তালাক দিব, মাত্র এক মাসে তালাক দিলে, পরবর্তীতে বিয়ে করতে ওর সমস্যা হবে
• আপনার স্ত্রীকে নিয়ে যখন আপনার এত চিন্তা, তাহলে তার সাথে সংসার করছেন না কেন?
• মিলি বলে দিয়েছে আমি তাকে ভালোবাসি
• দেখুন বিয়ে কোন ছেলে খেলা না, মিলির সাথে আগেও একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাই আমি চাইনা মিলির সাথে আবার কোন অন্যায় হোক
• আমরা একে অপরকে ভালোবাসি, বলে সবুজ
• কিন্তু আমি কারো দ্বিতীয় স্ত্রী হব না, বলে মিলি
• আমাকে একটু সময় দিন প্লিজ, ভাই আপনি একটু বুঝান, কাতর কণ্ঠে বলে সবুজ
• আপনারা আসতে পারেন, এই কথাগুলো আপনার আমাকে আগে জানানো উচিত ছিল, অন্তত ফোন করতে পারতেন, আমিও আপনাদেরকে বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করতে চাইনি
• ভাই প্লিজ
• আপনারা প্লিজ আসুন
সালেহা সবুজের হাত ধরে টেনে বাসা থেকে বের হয়।
• সারা জীবন আমার দিকে চোখ তুইলা কেউ তাকাইতে পারে নাই, যা বলছি কেউ অমান্য করতে পারে নাই, আজ জীবনে প্রথমবার আমি এমন অপমানিত হইলাম, তোর জন্য
• আপনি যখন বলছিলেন আপনার ভাইয়ের বাড়িতে যেতেই হবে, ভাই মেয়েরে উদ্ধার করতেই হবে, আমি কি তখন কিছু বলছি?
• চল নিচে চল
• না আমি যাব না
• পাগলামি করিস না বাবা
• মিলন ভাই এভাবে আমাকে বের করে দিতে পারেন না
• আচ্ছা আবার আসন যাইব এখন চল
কোনমতে ছেলেকে বুঝ দিয়ে গাড়িতে ওঠেন সালেহা। তিনি নিম্মিকে কিভাবে সামলাবেন, বুঝতে পারছেন না। এদিকে ছেলেটা তো বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে। খুব অসহায় লাগে সালেহার। স্বামী চলে যাওয়ার সময় মনে হয় তিনি এমন পানিতে পড়েননি।
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৪
তারানা তাসনুবা বৃষ্টি
পরদিন সালেহা ছুটলেন ভাইয়ের বাসায়। নিম্মি কলেজে গেছে। মিনতির মা কাজ করছে। আজ ভুল ধরছেন না সালেহা নিজের চিন্তায় মগ্ন। ক্লাস পুরোটা না করেই ফেরত এসেছে নিম্মি। শরীর এখনো দুর্বল। প্রিন্সিপাল ম্যামের সাথেও দেখা করেছে সে, তাঁর কারণেই হয়তো বাকি শিক্ষকেরা কিছু বলেননি, অবশ্য অংকের স্যার বললেন এবছর পরীক্ষায় না বসে ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আগামী বছর বসতে, কিন্তু নিম্মির মন বলছে একটা বছর নষ্ট করা কোনভাবেই উচিত হবেনা। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন তার আর নেই। কিন্তু অনার্স, মাস্টার্স করে একটা চাকরি তাকে করতেই হবে। সেই পথ এত সহজ না। বিবাহিত জীবনের এক মাসেই সে যে কদর্য রূপ দেখেছে মানুষের, তাতে তার ভিতরে গভীর হতাশা জমেছে। বাসায় ফিরে সালেহাকে দেখে মন বিষিয়ে গেল, কিন্তু চেহারা নির্বিকার।
• আমার পোলার জীবন তুমিই নষ্ট করলা
• আসসালামু আলাইকুম
• আর সালাম দোয়া দিয়া কি হইবো? আমি ওদের মুখের উপর বইলা আসছি এই বিয়া হইবো না, কোনভাবেই না
• আপনি আপনার বিবাহিত ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন?
সালেহা থমকে গেল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক করে আবার ধমক দিয়ে বলে,
• জামাই ধরে রাখতে জানা লাগে, সারাদিন পড়া পড়া করলে জামাই নিজের থাকে?
• আমি এক মাস তেমন পড়াশোনা করিনি, কি সংসার করেছি নিজেই দেখেছেন
• বাড়িত চলো, আমি ঠিক কইরা দিমু
• কিছুই ঠিক হবেনা, আপনার ছেলে এই বিয়ে করবেই, আপনি আটকাতে পারবেন না
• বাড়ি চলো
• সালেহা নাকি? নাজিমুদ্দিন বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করেন
• জি ভাইজান, বৌ নিতে আসলাম
• ভালো কথা, বৌ হাসপাতালে ভর্তি ছিলো তোমার ছেলে তো একবারও দেখতে এলো না
• খুব ব্যস্ত ভাইজান
• কি কাজে ব্যস্ত সেটা নিয়ে আমি মুখ খুলতে চাই না
• ভাইজান
• মেয়েটাকে পড়ে পরীক্ষা দিতে দাও
• ভাইজান একটু বাইরে চলেন
• কি হয়েছে?
• আসেন
সালেহা নিম্মির ঘর থেকে বের হয়ে নাজিমুদ্দিন সাহেবের ঘরে বসে,
• ভাইজান পরীক্ষা পরীক্ষা কইরা ঘর ভাঙতে নিছে, এখন সংসার করতে দেন, পড়াশোনা পরেও করতে পারব
• না, যা ভুল হওয়ার হয়ে গেছে, আর কোন ভুল সিদ্ধান্ত আমি নিতে চাইনা
• কি কন? এক মাস হয় নাই বিয়ার, অহন তালাক হইলে মাইয়ার আবার বিয়া দিতে পারবেন?
• তালাক? কি বল তুমি সালেহা?
• সবুজ আবার বিয়া করবো, অয় এক মাইয়ারে ভালোবাসে
• সেটা বিয়ের আগে বলেনি কেন?
• আপনি সেদিন যেমনে আমাদের ডাইকা আইনা বিয়া পড়াইলেন,আমার সবুজ তো মুখের উপর কথা কইতে পারেনা
• হুম ভুল আমারই ছিলো, নিজের মেয়েকে ভরসা না করে এমন একজনকে ভরসা করলাম, তোমার বিয়ের পর থেকে আমি সাধ্যমতো তোমাদের জন্য করেছি
তার উত্তম প্রতিদান দিয়েছ মা ছেলে মিলে
• ভাইজান, খোটা দিতেছেন? তাও এই মাইয়ার লাইগা?
• এই মাইয়া মানে কি?
• আপনের মাইয়া কম করছে?
• এটাই আমার ভুল ছিলো, নিজের মেয়েকে চিনতে পারিনি, তুমি বাড়ি যাও, সবুজকে পাঠাও, আমি কথা বলবো
সালেহা বুঝলেন পরিস্থিতি খুব খারাপ, নিম্মির দোষ বের করে পার পাওয়া গেল না। আর দোষ ছিলোই বা কি? সেটা পুজি করে সবুজের অপকর্ম ঢাকা যায়না। তবুও মা হিসেবে চেষ্টা করেছেন সালেহা। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সালেহা, গহনা তো মনে হয় আলমারিতেই আছে, সুযোগ মতো বের করে নিতে হবে। বাড়িটা আর পাওয়া হবেনা সবুজ আরেকটা বিয়ে করলে। এই প্রথম খালি মুখে বের হলো সে এই বাড়ি থেকে অটো নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখেন, কিসের একটা অবরোধ চলছে। আসার সময় তো সব স্বাভাবিক। আর ভাইয়ের বাড়ি ফিরতে মন চাইলো না, বাস কাউন্টারে বসলেন সালেহা, অনেক মানুষ অপেক্ষা করছে বাসের। তার তো তাও যাওয়ার জায়গা আছে,অনেকের শহরে যাওয়ার মতো জায়গা নাই। তাদের বাসস্ট্যান্ডে রাত্রি যাপন করতে হবে।
নাজিমুদ্দিন সাহেব নামাজ পড়ে বের হলেন, অন্যমনস্ক হয়ে হোচট খাচ্ছিলেন রাস্তায় তাঁকে ধরে ফেললেন রিয়াজ সাহেব।
• কেমন আছেন ভাই?
• আলহামদুলিল্লাহ
• কোন সমস্যা?
• আর সমস্যা ভাই…. জানেনই তো! মেয়েটাকে নিয়ে…
• রিফাত খুবই অনুতপ্ত, অবশ্য ওর অনুতাপে আর কি যায় আসে
• না ভাই, দোষ তো আমার, আমার মেয়েকে আমার চেনা উচিত ছিলো
• আসেন বাসায় একটু বসেন, খুলে বলেন কি সমস্যা
নাজিমুদ্দিন সবকিছু খুলে বলেন। রিয়াজ সাহেব আর তার স্ত্রীও শুনলেন।
• কি আর বলবো ভাই, ছেলেটা কি একটা কাজ করলো, এত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিম্মির, এত মেধাবী একটা মেয়ে
• বলেন ভাই, মেয়েকে সতীনের ঘর করতে পাঠাবো?
• বিয়ে তো হয়নি, আমরা কথা বলি সবুজের সাথে
• লাভ নাই ভাই, তার মায়ের মতো স্বার্থপর সে
• অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা দিক, তারপর নাহয় ভেবে দেখবেন
• এতদিন পর কি ঐ সংসারে সে আর কোন স্থান পাবে?
• তার কি আদৌ কোন স্থান আছে?
নাজিমুদ্দিনকে রিয়াজ সাহেব বাসায় দিয়ে গেলেন। এরপর নামাজে গেলে ডাক দিতে বলে গেলেন।
• কি হয়েছে বাবা? রিয়াজ চাচার কন্ঠ মনে হলো?
• হ্যাঁ আমাকে দিয়ে গেল
• কেন কি হয়েছে?
• নামাজ পড়ে শরীর ক্লান্ত লাগছিলো
• তুমি বাসাতেই নামাজ পড়ে নিও
• বেশি খারাপ লাগলে তাই করবো, মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন নাজিমুদ্দিন, বেদনার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি
চলবে।