শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৫
নিম্মির পুরোদমে ক্লাস শুরু। দিন রাত মেহনত করছে সে। যাতে অন্তত পাস করে যায়। সবুজ এলো পুরো এক মাস পর। সে মাথা নিচু করে বসে আছে।
• কেমন আছেন?
সবুজ একটু অবাক চোখে তাকায়।
• তুমি আর বাড়ি যাবা না?
• বাবা বলেছে পরীক্ষা দিয়ে যেতে
• সে তো অনেক দিন বাকি
• সাইন্সের ক্লাস না করলে তো পাস হবেনা
• তা ঠিক, আমি তো সাইন্স নিয়ে পড়িনি, তোমাকে কিছু বলতে চাই
• বলেন, তার আগে আমি চা, নাস্তা আনি
সবুজকে অবাক করে দিয়ে নিম্মি চা, নাস্তা সাজিয়ে আনে ট্রে তে। এর আগের দিন, নিম্মি খাবার আনার পরেই কঠিন কথাগুলো শুনেছিলো।
• মায়ের কথা তোমাকে তালাক দেওয়া যাবেনা, মিলির কথা সে সতীনের ঘর করবে না, তোমার কথা কি?
• আপনি যেভাবে ভালো থাকবেন সেটাই করেন
• তোমার কোন দাবী নাই?
• না কোন দাবী নাই
• আমি যে ঐ রাতে….
• আমরা স্বামী স্ত্রী, হতেই পারে
• তুমি কি তালাক চাও?
• এখন চাইনা, পরে চাইবো কিনা জানিনা
• তোমার জীবনে আসলেই কেউ নাই?
• না, আপনি খান, গাছ পাকা পেঁপে, আমার হাতে লাগানো গাছ, এখন অবশ্য হাই ব্রিড অনেক জাত এসেছে, দেশি গাছ অনেক কষ্ট করে খুঁজে এনেছি
• তোমার কি গাছের শখ?
• গাছ, বই…. কেন উপহার দিবেন?
• দিতেও পারি
• একশটা কদম গাছ লাগালে একটা তালাক ফ্রি এমন?
• মজা করছ?
• আপনার তো শালী নাই, আমিই মজা করি
সবুজের ভীষণ মন খারাপ হয়। এই অসাধারণ মেয়েটাকে সে কষ্ট দিতে যাচ্ছে। সে কি আসলে সুখী হবে? নিম্মি রান্নাঘর গুছিয়ে ঘরে আসে। ওর পরনে সাদা গোলাপি সুতির কামিজ, ভীষণ আটপৌরে কিন্তু মিষ্টি একটা মুখ। কিছুক্ষন পড়াশোনা করে বিছানায় আসে। কিং সাইজ বিছানা বানিয়েছেন নাজিমুদ্দিন। সুবিধাই হলো, দুজনের দুই প্রান্তে ঘুমাতে।
সবুজ ভোরে উঠে বেরিয়ে গেল। কাল মামার সাথে কথা বলতেই সে এসেছিলো, কিছু শক্ত কথা সে সাজিয়ে এনেছিলো কিন্তু নিম্মির স্নিগ্ধ মুখ আর সহজ ব্যবহার তাকে বিহ্বল করে দিল। সে কিছুই বলতে পারলো না। আবার সে মিলির স্কুলের বাইরে চক্কর লাগাতে শুরু করলো।
মিলি স্কুল সেরে, বাজারে গেল, মেয়ের জন্য মুরগি কিনতে হবে, স্যুপ বানিয়ে খাওয়াতে হবে, মিষ্টি এখনো বেশ দুর্বল। সামান্য খেলাধুলা করলেই হাপিয়ে যায়। পিছু নেয়া সবুজকে মিলি দেখেছে। কিছু বলছে না মিলি। আজ হঠাৎ যেন এই ভর দুপুরে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। ভাই ভাবি যথেষ্ট ভালোবাসে তাকে, কিন্তু এই যে ভর দুপুরে রোদ মাথায় করে, রোজ তাকে কিছু না কিছু কিনতে বাজারে যেতে হয়, কি হতো কেউ যদি তার হয়ে কাজটা করে দিত? কিংবা নাহয় সাথেই থাকতো? সবুজ এখন রাগে জেদে এই কাজগুলো করছে। বিয়ের পরেই কথার আগের চেহারায় ফেরত যাবে, সবুজের বাড়ি গ্রামে, তার মা এই সম্পর্কটা সহজভাবে নিবেন বলে মনে হয় না মিলির। নিজের ভাইঝির বদলে মিলি কে আপন করে নেওয়ার তো কোনো কারণ নেই। সবুজকে এই কথাগুলো কে বোঝাবে? দাঁড়িয়ে পড়ে মিলি। সবুজে থমকে দাঁড়ায়।
পেছনে ঘুরে মিলি বলে,
• কিছু বলতে চান?
• যা বলতে চাই তুমি তো সব জানো
• তাহলে পিছনে আসছেন কেন?
• কারণ তুমি শুনতে চাইছো না
• আসুন কোথাও বসে কথা বলি
সবুজ যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। হাটা দুরত্ব একটা কফি শপ আছে। সেখানেই বসলো দুজন, মফস্বল হলেও জ্যুস বার, কফি শপের কোন অভাব নেই।
• দেখুন আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে, এভাবে আমার পিছু নেওয়া আপনার উচিত হচ্ছে না
• আমি মেয়েদের পিছনে ঘুরবার মতো ছেলে না
• তাহলে কেন করছেন এসব?
• তোমাকে ভালবাসি বিয়ে করতে চাই তাই, হ্যাঁ আমার অন্যায় হয়েছে, ঐদিন এতগুলো লোকের সামনে আমি বলতে পারিনি যে আমি একজনকে ভালোবাসি, আমি পারবো না নিম্মিকে বিয়ে করতে, মামা তখন খুবই উত্তেজিত অবস্থায় ছিলেন, কিছুদিন আগেই মামার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, হাসপাতালে ছিলেন বেশ কিছুদিন, চিকিৎসা এখনো চলছে, আমার তখন মনে হয়েছিল আমি যদি আমার ভালবাসার কথা বলি, বিয়েতে অস্বীকৃতি জানাই, তাহলে হয়তো উনি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যাবেন, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম, একটা মানুষের জীবনের চাইতে তবু আর কিছু বড় হতে পারে না, নিম্মির জীবন নিয়ে ছেলে খেলা হয়ে গেল
• কই আমাকে তো এত কিছু বলেননি?
• বলার সুযোগ কোথায় পেলাম? আমি তো দিনরাত তোমার স্কুলের চারপাশে ঘুরে ঘুরেই কাটাই
• বিয়ের পর থাকবে এই ভালোবাসা?
• আমি জানি আমার বাড়ির পরিবেশ তোমার জন্য খুব একটা সুখকর হবে না, কিন্তু কষ্ট দেবো না তোমাকে, কথা দিতে পারি
• আর নিম্মি?
• ও কে আমি সবকিছু খুলে বলেছি
• প্রতিউত্তরে ও কি বলেছে?
• তেমন কিছু না
• কান্নাকাটি করেনি?
• না
• তাহলে তো ভয়ঙ্কর মেয়ে
• কেন?
• কোন মেয়ে মানুষ যদি ঠান্ডা মাথায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে,সে কিন্তু সাধারন মেয়ে না
• নিম্মি ভালো মেয়ে, আমাদের বাড়িরই মেয়ে, এজন্যই আমি এখন ও কে হুট করে তালাক দিতে পারছি না
• বেশ তাহলে কিছুদিন পরেই দিন, বিয়েটাও পরেই হোক
• না তা সম্ভব না
• কেন?
• আমি এভাবে শহরে এসে ঘুরতে থাকবো, লোকজন বাজে কথা বলবে, আমার খামার,গাছগাছালি, পুকুর কোন কিছুরই দেখভাল করছি না আমি মাস খানেক
• আপনি স্বস্তি চাইছেন ভালোবাসা না
• জীবনের স্বস্তির চাইতে বড় কিছু কি আছে?
• বেশ আমি বাসায় কথা বলব, ভাইয়া ভাবি যদি রাজি হয় আমি আপনাকে ফোন করবো তার আগে একটা অনুরোধ
• কী অনুরোধ?
• আপনি শহরে এসে এভাবে ঘুরপাক খাবেন না, আমার পিছু নেবেন না
• বেশ নেব না, তুমি রোজ কথা বলবে তো?
• বলবো
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৬
মিলি বাসায় ফিরে গোসল খাওয়া সেরে মেয়ের জন্য স্যুপ বানায়। আকাশের কালো মেঘ। আকাশের মনে হয় মন খারাপ। কিন্তু তার মন শঙ্কিত। সবুজ যে ভালোবাসার আশ্বাস দিয়েছে সে ভালোবাসা তো একদিন অয়নের চোখেও ছিল। স্কুল জীবনের প্রেম, কিশোর বয়সের অবাধ্য মন, ভাই ভাবী তখনও আপত্তি করেছিলেন, পালিয়ে বিয়ে করে মিলি আর অয়ন। তারা ক্লাসমেট ছিল, কখন যে বন্ধুত্ব প্রেম রূপান্তরিত হলো নিজেরাও জানতো না। অয়নের মা মিলিকে অনেক আগে থেকেই চিনতেন। কিন্তু তিনি এত তাড়াতাড়ি মিলিকে পুত্রবধূ হিসেবে আশা করেননি। কিন্তু বাসায় থাকতে দিয়েছিলেন। সিনেমার মতো তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়নি। অয়নের ঘরের সিঙ্গল বেডে হয়েছিল তাদের বাসর। মাস খানিক বাদে ভাইয়া ভাবি এসেছিল। তারা মিটমাট করে নিলো। সবকিছু চলছিল ভালই। দুজনের পড়াশোনা পরীক্ষা, ঘরের কাজকর্ম করতে হতো অবশ্য, তাতে মিলির দুঃখ ছিল না। সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রান্নাঘরে কাজ করতো। শাশুড়ি টুকটাক ভুল ধরলেও খুব একটা সমস্যা করতেন না। পড়ার খরচ ভাইয়া দিত। একবার ঈদের সময় মিলিকে ভাইয়া শাড়ি দিয়েছিল। বাসায় পরা জামা একেবারে ত্যানা হয়ে গিয়েছিল, অয়নকে লজ্জায় বলতেও পারছিল না মিলি। ঈদের বাজার হলো বেশ কয়েকবার, অয়নের পরিবার, কাছের আত্মীয় সবার জন্য উপহার এলো, কেনাকাটা হলো না তার জন্য, শাশুড়ির কথা শাড়ি তো পেয়েছে! ঈদের দুই দিন আগে থেকে রান্না যজ্ঞ শুরু, কিন্তু মন লাগিয়ে কাজ করতে পারছেনা মিলি, শরীরটাও ভালো যাচ্ছেনা, রান্নার গন্ধে শরীর বেশি খারাপ লাগে কিন্তু কিছু বলতে পারেনা মিলি। ভাবী একদিন ইফতার দিতে খেয়াল করে , বলে ডাক্তার দেখাতে, কিন্তু অয়নের সেই চিন্তা নেই। সে খুশি মনে পড়াশোনা আর ঈদের প্ল্যান করে যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে অয়ন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে চলে গেল। মিলির শরীর খুব বেশি খারাপ দেখে তাকে একা রেখে দাওয়াত খেতে চলে গেল বাকিরা। বমি করে ভাসালো মিলি,নিজেই সাফ করলো। কাপড় বদলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারছিল না। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো সে জানেনা। সবাই দাওয়াত খেয়ে ফিরেছে। অয়নের বড় ভাই অভি আর ভাবী এসেছেন ঢাকা থেকে, উনারা আড্ডা দিচ্ছেন ড্রয়িংরুমে। চা বানানোর ডাক পড়লো মিলির। মিলি চুপচাপ চা বানাতে চলে গেল, নিজের জন্য ছোট এক কাপ বানালো, বিস্কুট দিয়ে খাবে। ও কে দেখে ওর ভাসুর অভি খুব অবাক হলেন। সামনে বসতে বললেন, জিজ্ঞেস করলেন অসুস্থ কিনা! শাশুড়ি লুকানোর চেষ্টা করলেও, তিনি চেপে ধরে সব শুনলেন। পরদিন তিনি আর ভাবী মিলে ডাক্তার দেখালেন, সুখবরটা তারাই দিলেন কিন্তু মিলি চোখে অন্ধকার দেখছে, সামনে পরীক্ষা কত কষ্ট করে পড়েছে, একটা বছর নষ্ট হবে? নাকি আদৌ পড়াই হবেনা। অভি ভাই ,ভাবীকে ডেকে জানালেন। শ্বশুর বাড়িতে এই খবরে কেউ খুশি ছিলো না। এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা! অথচ নিজেদের আবিস্কারের সময় যদি কেউ একটু বুঝিয়ে বলত…..
ফোনের শব্দে ধ্যান ভাঙে মিলির। সবুজের ফোন। প্রবল ভালোবাসার বিধ্বংসী রূপ মিলির দেখা আছে, তাই ভীষণ ভয় লাগে তার।
মিলন একটা থ্রিলার বই নিয়ে বসেছে। রাতে ঘুমানোর আগে বই পড়ার নেশা তার ছোটবেলা থেকে। স্ত্রী রিমি চুল আচড়ে বেধে কি সব মুখে হাতে ডলতে ডলতে কাছে এসে বসল, সুগন্ধিটা ভালো লাগে মিলনের। কেমন একটা আপন আপন গন্ধ।
• কি ভাবলে?
• কি নিয়ে?
• মিলির বিয়ে
• ঐ সবুজের সাথে? কখনোই না
• আমি কিন্তু ফোনে ফিসফিস করতে শুনে এলাম
• বাপ,মা মরা বোনটাকে আমি কখনো শাসন করিনি,আজ তার ফলাফল পাচ্ছি
• আহা! এভাবে বলো না, হয়তো ছেলেটা ভালো
• সবুজের মাকে দেখেছ? মহিলা একদম সুবিধার না, আর ঐ গণ্ডগ্রামে থেকে মিষ্টির জীবন নষ্ট হবে
• মিষ্টি যাবে কেন গ্রামে? ও আমাদের কাছেই থাকবে, মিলির একটু কষ্ট হবে, এতদূর যাতায়াত করে স্কুল করা, চেষ্টা করলে আশেপাশের স্কুলে চাকরি পেয়ে যাবে
• তুমি তো দেখছি একেবারে প্ল্যানিং সেরে ফেলেছ
• আগের বার আমরা অপ্রস্তুত ছিলাম, এবার যা করা হবে গুছিয়ে করা হবে, মিলির বয়স কতই বা? দাম্পত্যের স্বাদ ও সেও চাইবে তাইনা?
• হুম
• মিষ্টির ভবিষ্যৎ নষ্ট না করতে চাইলে এটাই সমাধান, আর গ্রামাঞ্চলে এই তালাকপ্রাপ্ত সন্তানসহ মেয়েকে কোন চোখে দেখা হয় তুমি তো জানো, আমাদের মিলি দেখতে শুনতে ভালো, শুধু অল্প বয়সের একটা ভুলে জীবন নষ্ট হতে পারে না
• সবই বুঝলাম, কিন্তু এই সবুজ কেন? দুনিয়ায় ছেলের কমতি পড়েছে?
• তা পড়েনি, যাকে যার মনে ধরে
• কি মনে হয়? আবার অয়নের মতো হবে না তো?
• অয়ন ছেলে ভালো, কত সুন্দর ব্যবসা করছে, শুধু ওদের সময়টা খারাপ ছিলো, অয়নের ভাই অভি যদি সঠিক সময়ে মিলিকে ডাক্তার না দেখাতেন, কি হতো বল? অল্প বয়সে তাদের এই প্রেম,বিয়ে, বাচ্চা সহজভাবে নিতে পারেননি অয়নের বাবা,মা। ওদের যদি এখন বিয়ে হত, দারুণ ভাবে সংসার করতে পারত
• ছেলে ভালো তাহলে মেয়ের উপর টান নাই কেন?
• প্রেগন্যান্সির পুরোটা সময় মিলি আমাদের সাথে ছিলো, অয়ন ওদের ভাঙ্গনের কারণ হিসেবে মিষ্টিকেই দায়ি করে এজন্য সহজ হতে পারে না, এখন টান দেখছ না, বয়স হোক দেখবা মেয়ের জন্য পরাণ পুড়বে! আমাদের কাছে এসে হাতে, পায়ে ধরবে মেয়ের সাথে যোগাযোগের জন্য
•তখন কিন্তু যোগাযোগ করতে দিবো না
•আচ্ছা দিও না, এখন যা বললাম মন দিয়ে ভাবো
#
সাধনাকে মাসুদ চিরকুট দিয়েছে। গতকাল সারারাত বৃষ্টি পড়েছে। আজও পড়ছে, এই আবহাওয়ায় কেউ স্কুলে যাবেনা। এটাই সুযোগ! কোন একটা ফাঁকা রুম পেলেই তারা মনোবাসনা পূরণ করতে পারবে। সালেহা সকাল সকাল তৈরি হতে দেখে অবাক হয়,
• কিরে এই বৃষ্টিতে কই যাছ?
• স্কুলে মা
• স্কুল বাদ দে, কাপড় বদলে সবজি খিচুড়ি আর ডিম ভাজি করে ফেল, সবুজ বাড়ি আছে, ও তো বাড়িতেই থাকেনা, একটু পেট ভরে খাক
• আমি কি তোমার ছেলের বৌ? নিজে গিয়া রান্না কর, আমারও ভবিষ্যৎ আছে, ভাবীরে বাপের বাড়ি থেইকা আনো না কেন?
বলে ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়ে সাধনা। মেয়ের কাজে ভীষণ অবাক সালেহা ভাড়ার ঘরে যান, চাল, ডাল আনাজপাতি বের করে রান্না করতে বসে যান। সুমনা বেরিয়ে বৃষ্টি দেখছে, দুটো ঝাড়ি দেন সালেহা, তারপর নিজেরই খারাপ লাগে, সাধনার রাগ সুমনার উপর ঝেড়ে কি হবে, কাছে ডেকে বসান, টুকটাক গল্প করেন, মেয়েকে রক্ত দিতে হবে, ভালো পথ্য দিতে হবে, সাধনার একটা গতি হলে সুমনাকে নিয়ে ভাবা সহজ হতো, কিন্তু মেয়ের মতিগতি তো ভালো না। সবুজ নিজেই যা করে বেড়াচ্ছে, তাতে তাকে বলে কি আদৌ কোন লাভ আছে?
• মা অত ভাইবো না, আল্লায় যা করবো ভালোই করবো
বলে উঠে যায় সুমনা উঠানে বসে বৃষ্টি দেখে, তার জীবনে সুখের উপলক্ষ খুব কম, আগে ভাই মেলায় নিত, জিলাপি, বাতাসা, লাল চুড়ি আনত, ধানের মৌসুমে দুই বোন সুগন্ধি সাবান আর আলতা কিনত, টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখত, কিন্তু সাধনা এখন নিজের দুনিয়ায় মগ্ন আর সবুজ ভাই যে কি করছে,নিম্মি আপু যতদিন ছিলো খুব খেয়াল রাখত….
সবুজ উঠানের অন্য পাশে বসে সবজির ক্ষেত ডুবে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় বিভোর। বোনের চলে যাওয়া তার চোখ এড়ায়নি। নিজের ঝামেলা মিটিয়ে সাধনার জন্য পাত্র আর সুমনার জন্য ভালো ডাক্তার খুঁজতে হবে। ভিতর থেকে মায়ের ডাক শুনে এগিয়ে যায়, খিচুড়ি ডিম ভাজির সুগন্ধ আসছে। এবার, সরিষার ফলন কি ভালো হবে? অবশ্য দেরি আছে কেবল তো শরৎকাল চলে।
সাধনা চিরকুট মোতাবেক ছোটদের ক্লাসে হাজির হয়। বড় ক্লাসে দুই চারজন এলেও ছোটদের ক্লাস ফাঁকা, পুরো প্রাইমারি স্কুলটাই ফাঁকা শিক্ষকেরা এলেও হাজিরা দিয়ে বাড়ি চলে গেছে, মাসুদ বুঝেই ডেকেছে এখানে। সাধনা ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দেয় মাসুদ।
• কি কর?
• প্রেম!
• দরজা বন্ধ করে কেন?
• উম…. বোঝনা? কচি খুকি?
মাসুদ এলাকার চেয়ারম্যানের ভাইপো, এছাড়াও এমপির স্ত্রীর দূর সম্পর্কের আত্মীয় এলাকায় তাদের প্রভাব আছে। মাসুদের চেয়ারম্যানের মেয়ের সাথে বিয়ের কথা পাকা। মটর সাইকেল সে আগেই পেয়েছে, শুধু তার স্কুলের গন্ডি পার করা বাকি, চার বছর ধরে সে ক্লাস নাইনে! টেনে উঠতে পারছেনা। সে বছরে এক, দুই বার ক্লাসে আসেই শুধু নতুন মেয়ে বাছাই করতে। কিভাবে পাস করবে! তার বাইক, পোশাক, সানগ্লাস, ঘড়ি, স্বস্তা সুগন্ধি গ্রামের মেয়ের লোলুপতা বাড়ায়। বেঞ্চে বসায় সে সাধনাকে। গালে, গলায় আলতো হাত বুলিয়ে একটা সিটি গোল্ডের চেন পরিয়ে দেয়।
• তুমি আজ থেইকা আমার বৌ, বলে মুখ নামিয়ে নেয়, সাধনার ফরসা গাল আপেলের মতো লাল হয়
শ্রাবণের মধ্যদুপুর
২৭
জীবনে প্রথম বার পাওয়া এই সুখ সাধনাকে অন্য জগতে নিয়ে যায়, পরমুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ আর চিৎকারে হিতাহিত জ্ঞান হারায় সাধনা, মাসুদের প্ল্যান করাই ছিলো পিছনের জানালা দিয়ে সে পালিয়ে যায়। বহু মেয়ের সাথে সে এভাবেই সম্পর্ক করেছে। টলোমলো পায়ে দরজা খোলে সাধনা। স্কুলের জমা টেনেটুনে ঠিক করে। ঠোঁট আর গলার জমাট বাধা রক্ত ঢাকার মতো অবস্থা তার ছিলো না।
হেড মাস্টার গফুর আলী ভীষণ বিরক্ত। এমন বৃষ্টির দিনে তিনি চা আর পিয়াজু আনিয়ে ভালো একটা বই পড়েন। কিন্তু এই লম্পট ছেলেপেলেরা তার এই সামান্য সুখের সময়টা নষ্ট করছে। সামনে সালেহা, সবুজ বসে আছে। সাধনাকে কোন ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে ধারণা করেছে এক শিক্ষিকা, তাকে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার জন্য।
• এখন বলেন কে সেই ছেলে?
• কে আমরা কিভাবে জানব?
• আপনাদের মেয়ে কোথায় কি করে বেড়াচ্ছে তা জানবেন না?
• সে স্কুল কইয়া বাইর হইছে, জরুরি কেলাস, আপনারা এইখানে ঘুম পাড়েন জানলে মাইয়া পাঠাইতাম না, ঝাঝের সাথে বলেন সালেহা
কিছুটা কাজ হয়। কারণ দিনে দুপুরে, শিক্ষকদের উপস্থিতিতে কিভাবে এই কাজ হয়? আর কে এই কাজ করতে পারে? কি নাকি ওষুধ! মেয়ের যদি কোন ক্ষতি হয়? প্রাইমারি সেকশনের আয়া আজ আসেনি, দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, যে ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছেনা,
• এটা রেপ, আমার বোন এরকম কাজ করতেই পারেনা, ওরে ফাদে ফেলে জোর করে এসব করা হইছে, আমি পুলিশ ডাকবো, সবুজ বলে ওঠে
• এতে তোমার বোনের মান সম্মান শেষ হবে, থানা পুলিশ করলে মেয়েকে কে বিয়ে করবে ভেবেছ? মাথা গরম কইরো না বাবা…. সালেহা আপা আপনি বুঝান। হেড মাস্টার গফুর আলী বুঝানোর চেষ্টা করেন, তার স্কুলের ভয়াবহ বদনাম ঠেকাতে যা যা দরকার করতে হবে
মিলির আজ সবুজের সাথে দেখা করার কথা। সকাল থেকে কল দিয়ে যাচ্ছে, সবুজ রিসিভ করছে না। সেদিন রাতে ভাই,ভাবীর কথা আবছা শুনেছে। মিষ্টিকে ছেড়ে সে থাকতে পারবে না, চাকরিটাও সে ছাড়তে চায়না, গ্রামে গিয়ে সংসার করা তার জন্য কঠিন, গ্রামের লোকেরা তালাকপ্রাপ্ত এক বাচ্চার মাকে কিভাবে নিবে সেটাও প্রশ্ন! সবুজের হলোটা কি? স্কুলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে যায় মিলি। সবুজ সারাদিন যোগাযোগ করেনা।
সদর হাসপাতালে বেশিক্ষণ থাকেনা সাধনা, অটোতেই তার জ্ঞান পুরোপুরি ফিরেছে। দুর্বলতার কথা বলে ভিটামিন নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলে নিষেধ করেনা সাথের শিক্ষিকা। তিনি বোঝেন ডাক্তার রোগ নির্ণয়ের জন্য অনেক প্রশ্ন করবেন যা সাধনার জন্য বিব্রতকর। গ্রামের কেউ দেখলে তো সর্বনাশ!
সাধনা দরজা বন্ধ করে বসে আছে। গ্রামের প্রভাবশালী পরিবারে বিয়ে হলে কি কি সুবিধা পাবে অনেক জল্পনা কল্পনা করেছিলো সে, নিম্মির চেয়েও ভালো বিয়ে হবে তার, বাইক নিয়ে উড়ে বেড়াবে যখন মন চায়! যেদিকে খুশি ঘুরতে বেরিয়ে যাবে, মাসুদ তাকে ভালোবাসে, এই তার ভালোবাসা? সামান্য একটা বিষয়ে পালিয়ে গেল? আর বদনাম হলো সে? জীবনে প্রথমবার এত কাছাকাছি এসেছে সে কোন পুরুষের, টুকটাক ছোয়াছুয়ি হলেও এতখানি কেউ সাহস পায়নি। মাসুদ কি তাকে ভালোবাসে না? হেড মাস্টারের সামনে নাম তো বলেনি, কিন্তু মা, ভাইয়ের সামনে কি করবে সে? বাইরেই অপেক্ষা করছে তারা। কি বলবে সে? কথা খুঁজে পায়না। পুরো রাত ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে কিন্তু বের হয়না। সকালে বের হতেই মায়ের জেরা শুরু,
• কেন গেছিলি তুই প্রাইমারি বিল্ডিংয়ে?
• রূপা ডাকছিলো, বললো এক সাথে অংক করবে
• তারপর?
• আমি গেলাম, দেখি কেউ নাই, ক্লাসের ভিতর যাই, রূপাকে ডাকি ভাবি মজা করতাছে, পরে দেখি রূপা না অন্য একজন আমারে একটা কি যেন শুকাইলো তারপর আর কিছু মনে নাই!
• কে সে? হারামজাদার নাম বল, আমি দেহ থেইকা কল্লা নামায় দিমু
• আমি চিনিনা!
• চিনিস না?আগে কখনো দেখিস নাই?
• আমি কি ছেলেদের সাথে কথা কই? আমি মাথা নিচু কইরা বাড়ি আসি
• আচ্ছা ভাত খা
চিন্তায় ডুবে যায় সালেহা, রূপা কলেজে সেদিন যায়নি, কেয়া এসে তাকে সব খবর দিয়েছে। মেয়েটা মিথ্যা কথা বলছে, ছেলেটাকে বাঁচাতে, প্রেম ভালোবাসার চক্কর, সবুজটাও ঐ ডাইনির মেয়ের কবলে পড়ে নিজের এত সুন্দর সংসার ভাঙতে রাজি, আর এই মেয়েটা…. কি যে আছে তার নসীবে! নাহ! সুমনারে ডাক্তার দেখাতে হবে। কাউকে তো হতে হবে তার শেষ সম্বল।
নিম্মি দিন রাত এক করে পড়ছে, এক মাসের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়তি পড়ছে, ইশরাত বেশ সাহায্য করছে তাকে, বিকেলে তাকে অবাক করে রিফাতের বোন রাইসা এসেছে, সে অনার্স প্রথম বর্ষ। দুই বছরের বড়। কোন সাহায্য লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করছে। স্থানীয় কলেজে পড়ছে। চা বানিয়ে ছাদে যায় দুইজন, আজ বৃষ্টি ধরে এসেছে, কিন্তু রোদের তেজ খুব বেশি না। দুজন বসে অনেক গল্প করে। বিকেলে অফিস থেকে বাবা এসে আড্ডায় যোগ দেন, অনেক দিন পর নিম্মির মনে হয় বুকটা একটু হালকা হলো।
কিন্তু প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বুকটা আবার ভারী হয়ে যায়। সবুজের বিয়ে কি হয়ে গেছে? একটা ফোন করে জিজ্ঞেস করবে? খুব কি নির্লজ্জ আচরণ হবে? প্রায় এক মাস হতে চললো ফুপু আসেনা। সে নিজেকে পড়া, পরীক্ষার চিন্তায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে।
বুকের ভেতর একটা অসহ্য অনুভূতি। এই অনুভূতির নাম জানেনা নিম্মি। ভালোবাসা, হিংসা, রাগ নাকি অপারগতা? অসহায়ত্বের তীব্র অনুভূতি শরীর, মন বিচলিত করে।
#
এলাকার মুরুব্বি আর স্কুলের কিছু শিক্ষক মিলে সবুজদের বাসায় এসেছে। থানা পুলিশ করতে পারেনি, কিন্তু কয়েকজন মাসুদের নাম বলেছে। মাসুদ পালিয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেব নিজেও বিব্রত। এই ধরনের কাজ তার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর, এলাকায় ভাব গাম্ভীর্য বজায় রাখতে সে বদ্ধপরিকর। ইতালি প্রবাসী এক পাত্রের খোঁজ এনেছে, পাত্রের নাম হেলাল খান, বাবা নাম দিয়েছিল হেলাল উদ্দিন, কিন্তু পরবর্তীতে তার নাম হেলাল খান হয়ে যায়! পরিবার ভীষণ দরিদ্র ছিলো, এখন টাকার মুখ দেখেছে, মেঝে পাকা করে টিনের ঘর তুলেছে, বোনদের বিয়ে দিয়েছে, ফসলি জমি কিনেছে, এবার বিয়ে করে থিতু হতে চায়, সমস্যা হলো বয়স চল্লিশের ঘরে, তাতেও সমস্যা ছিলো না! যা বয়স তার চেয়ে বেশি বয়স্ক লাগে অনিয়ম আর রোদে পুড়ে কাজ করার জন্য। সে নিজেই এসেছে এলাকাবাসীর সাথে। প্রাথমিক কথা সেরে সে পরিবার আনবে। সাধনাকে তার মনে ধরেছে, রূপবতী মেয়ে তার উপর সারাক্ষণ সেজেগুজে থাকে, মাসুদের ব্যাপারটা কিছু না, এই বয়সে এসব হতেই পারে। সবুজ সালেহা দুজন চুপচাপ সবার বক্তব্য শুনল। দুজনেই সময় চাইল। হেলাল খানের তর সইছে না। আজ একটু সাধনার সাথে যদি কথা বলা যেত। কিন্তু মনে হয়না এরা রাজি হবে।
এলাকাবাসী চলে গেলে সাধনা ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো তড়পাতে লাগলো, সেই সাথে বিকট চিৎকার করে কান্না।
•আমারে কাইটা গাঙে ভাসায় দাও মা তাও এই বিয়া দিও না… মা…. মাগো….আমি বিষ খামু, বিয়া বসুম না
আশেপাশের প্রতিবেশীরা আবার ছুটে এলো। তবে এবার বেশিরভাগ মেয়েরা। কারণ ছেলেরা জানে কান্নার কারণ। চাচীরা সব মিলে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওর কান্না কিছুতেই থামছে না। হিস্টিরিয়া রোগীর মতো হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদতে লাগলো। মাসুদ তাকে ভালোবাসে, হয়তো ভয় পেয়ে পালিয়েছে। চলে আসবে ফিরে। মাসুদের জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করবে। সালেহা আর সবুজের মনের মধ্যে দ্বিধা থাকলেও, এখন তারা বদ্ধপরিকর। এই বিয়েটা না দিলে সাধনা তাদের মান সম্মান শেষ করবে। কারো সাথে আলাপের ধার ধারলো না সবুজ, পর দিনে বাজারে গিয়ে হেলালের চাচাকে জানিয়ে আসলো, বিয়েটা হবে, তারা যেন তারিখ নিতে বাড়ি আসে। হেলালের মা চাচী, না জানিয়েই এক বিকেলে ঘুরে গেল। ঘরে যা ছিল তা দিয়ে কোনরকম আপ্যায়ন করলেন সালেহা। বাড়ির বউ কই প্রশ্ন উঠেছিল, সালেহা খুব গর্বের সাথে বললেন,
• আমি ওরে পড়তে পাঠাইছি। আমার ঘরের পোলা মাইয়া ডিগ্রী পাস ছাড়া থাকবো না।
• তাইলে কি আপনার মাইয়ারেও পড়াইতে হইবো? সঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে হেলালের মা
• এটা আপনাদের ইচ্ছা, আমরা তো জোর জবরদস্তি করতে পারি না
• তা ভালো কইছেন, যে ঘরের মাইয়াই হোক, পরের ঘরে গেলে সেই ঘরের মোতাবেক চলতে হয়
• আমার মেয়ের বয়স কম, দেখতে শুনতে পরীর মত, হেলাল বাবা বয়স্ক মানুষ, আমার মেয়েটাকে একটু আদর ভালোবাসা দিয়ে রাখলেই হইবো
• পুরুষ মানুষের আবার বয়স কিসের?
• না বয়স নিয়া তো কোন কথা কইতাছি না, আমার মাইয়ারে ভালো রাখলেই হইল, সালেহা বুঝল সব জায়গায় বেশি কথা না বলাই ভালো
চলবে।