#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৩
আজ রাহা জেদ ধরেছে সকলের জন্য রাতে খাবার বানাবে। তাও আবার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ও স্বামীর পছন্দ অনুযায়ী খাবার গুলো রাঁধবে নাকি। বাপের ঘরে যে মেয়েটি অহংকার বসত এক গ্লাস পানি পর্যন্ত নিয়ে খায়নি সে আজ নিজ থেকে রান্না করতে চাইছে। সত্যিই অবাক করা আবদার বটে।
অবশ্য এই মাসে খানের মধ্যে রাহা আফরা কাছ থেকে প্রায় বেশ কয়েকটা আইটেন রান্না করা শিখে নিয়েছে। বিয়ের আগে রাহার মা মুনতাহা কতো করে বলত– মেয়ে হয়েছিস একটু রান্না বান্না শিখ, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কাজে লাগবে। কিন্তু রাহাত প্রতিবার মুনতাহাকে ধমকিয়ে চুপ করিয়ে দিত। মূলত রাহাতের কারণেই রাহা বেশি বিগড়ে গিয়েছে, নাহলে রাহা মেয়েটা খারাপ না বেশি একটা।
আফরা শুরুতে তাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছে রান্না করা চারটে খানি কথা না। রাঁধতে গেলে হাত কেটে যায়, অনেক সময় পুড়েও যায়। তার মতে আদুরের দুলালি হুট করে এত বড় আয়োজন করতে পারবে না। কিন্তু রাহা শুনে না। পরে তাকে কড়া গলায় মানা করলেও মন খারাপ করে আফরার সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে, নড়ে না জায়গা থেকে। আফরা বুঝে যায় মেয়ে ভালোই জেদি। আফরা তার কাজে মত দেয় ঠিকই কিন্তু এ-ও বলে দেয়, একা সব কাজ করতে পারবে না। হেল্পিং হ্যান্ড সব কেটে বেছে দিবে আর সে ইনস্ট্রাকশন দেবে, তবেই সে রাঁধার অনুমতি পাবে। রাহাও খুশি মনে আফরার কথা মেনে যায়, উপরন্তু খুশি হয়ে আফরাকে চুমুও খায়।
মাহমুদ বাড়ির লোকদের পছন্দ খুবই সাধারণ। আফরা গ্রামের মেয়ে হওয়ায় বিয়ের এত বছরেও গ্রামের প্রতি তার একটা আলাদা টান রয়েই গিয়েছে। সেই টান থেকেই আফরা খাবারের মধ্যে পছন্দের তালিকায় রয়েছে গরম গরম ভাতের সাথে বিভিন্ন পদের ভর্তা। আদিয়াতের পছন্দ সর্ষে ইলিশ বা বড় মাছের কোন একটা আইটেম আর তার বরের পছন্দ হলো মিষ্টি জাতীয় যেকোন খাবার। এসব সে জেনেছে তার শ্বাশুড়ির থেকে।
আফরা আর রাহা বাড়িতে দুই বান্ধবীর মতো থাকে বাড়িতে। বিয়ের আসরে রাহা আর রাহাতের কীর্তিকলাপ শুনে আফরার মনে রাহার জন্য একটা খারাপ ধারণা তৈরি হয়ে যায়, যার কারণে আফিফ ও রাহার বিয়ের পর শুরুতে শুরুতে সে রাহাকে একদমই সহ্য করতে পারত না। বিষয়টা আফিফ খেয়াল করে এবং একদিন সে তার ভুল ভেঙে দেয়। তারপর থেকে রাহা আর আফরা দু’জনে আম আর দুধের মতো মিলে মিশে থাকে। আফিফ আর আদিয়াত আঁটি হয়ে গড়াগড়ি খায়।
মাগরিব নামাজ পড়েই রাহা রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। আফরার সাহায্যে সে কয়েক পদের রান্না প্রায়ই শেষ করে ফেলেছে। বাকি শুধু আফিফের জন্য পায়েশ আর আদিয়াতের জন্য সর্ষে ইলিশ। রাহা এক চুলায় দুধ ফুটতে বসিয়ে দেয় আরেক চুলায় আদিয়াতের রান্নাটা হচ্ছে। এরই মধ্যে এশারের আজান দিয়ে দিলে রাহা আফরাকে বলে–
—আম্মু, তুমি গিয়ে এশারের নামাজটা পড়ে নিয়ে একটু রেস্ট নাও। রান্না তো প্রায়ই হয়ে এসেছে। আমি বাকিটুকু করে নিতে পারব।
আফরা কপট রাগ দেখিয়ে বলে–
—কান টেনে ঘরে নিয়ে যাবো কথা না রাখলে। এমনটা তো কথা ছিল না। রান্না না শেষ হওয়ার আগে আমি নড়ছি না এখান থেকে।
রাহা আফরার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে–
—উফফফফ, মাদার বাংলাদেশ তুমি বড্ড নাটুকে। আমি কি বাচ্চা নাকি এসব পারব না? তোমার হাই প্রেশারের সমস্যা ভুলে গিয়েছো? আজ আমার কারণে এতক্ষণ রান্নাঘরে থাকলে, তোমার উনি আর আমার উনি শুনলে আমাকেই না উল্টো বকা খেতে হয়। তুমি যাও তো। ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছো।
রাহার কথা শুনে আফরা আলতো করে কান টেনে বলে–
—ওরে দুষ্টু মেয়ে! ভালোই তো কথা জানিস।
রাহা মিছেমিছি ব্যথা পাওয়ার ভান করে বলে–
—গেলো গেলো রে, এই বয়সেই না বয়রা হওয়া লাগে। মাত্র বিয়েটা হলো আমার, তোমাদের নাতি-নাতনির মুখ দেখানোর আগেই কান টেনে বয়রা করে দিচ্ছো শাশু মা? তারপর তোমার নাতি-নাতনি যদি আমার মতো বয়রা হয়ে যায় তখন কিন্তু দোষ দিতে পারবে না আমায়।
রাহা দুষ্টুমির ছলে কি থেকে কি বলে ফেলেছে তার নিজেরই খেয়াল নেই। এদিকে রাহার কথা শুনে আফরা তার কান ছেড়ে দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। একটু বাদেই রাহার খেয়াল হয় সে কি থেকে কি বলে ফেলেছে। মনে মনে জিভ কেটে কথাটা কাটানোর জন্য আফরাকে ঠেলেঠুলে তার ঘরে দিয়ে আসে।
রান্নাঘরে এসে দেখে দুধ উতলিয়ে গিয়ে পাতিল থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। রাহা তাড়াতাড়ি করে গিয়ে চুলার জাল কমাতে যায় কিন্তু এরই মাঝে বেশ খানিকটা দুধ উতলিয়ে পড়ে যায়। দুধের কিছু অংশ রাহার হাতেও এসে পড়ে। টগবগিয়ে উতলিয়ে পড়া গরম দুধ রাহার হাতে পড়ে জায়গাটা সাথে সাথে পুড়ে গিয়ে ফোস্কা পড়ে যায়। রাহা “ও মা গো” বলে তাড়াতাড়ি করে পুড়ে যাওয়া হাতটা ট্যাবের পানির নিচে ধরে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।
__________________________
রাত নয়টা বাজতেই মাহমুদ বাড়ির সকলে একসাথে খেতে বসে। অন্যদিন আফরা সকলকে খাবার সার্ভ করলেও আজ রাহা করছে। খুশি-খুশি মনে সকলের পাতে নিজের করা রান্নাগুলো তুলে দিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক ধরণের উত্তেজনা। রাহা উদগ্রীব হয়ে আছে নিজের রান্নার প্রশংসা শোনার জন্য।
আদিয়াত ও আফিফ জানত না আজকের রান্না আফরা করেছে। আফিফ ছিলো হসপিটালে আর আদিয়াত মাগরিবের নামাজ মসজিদের পড়তে গিয়ে একদম এশারের নামাজের পর এসেছে। তারা দু’জনই এক লোকমা করে খাবার মুখে দিতেই বুঝে যায় এই রান্না আফরা করেনি।
আফিফই প্রথমে বলে–
—আম্মু, নতুন কুক রেখেছো? খাবারের টেস্টটা আজ ভিন্ন লাগছে যে।
আদিয়াতও তার কথায় তাল মেলায়৷ রাহা আফিফের কথা শুনে মন খারাপ করে মাথা নিচু করে রেখেছে। আফিফ খেয়ে যখন প্রশংসা করল না তার মানে ভালো হয়নি রান্নাটা। আফরা খেতে খেতে বলে–
—না নতুন কুক রাখা হয়নি। আজ অন্যকেউ রেঁধেছে রান্নাগুলো।
—অন্যকেউ? কে সে?
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে। কারণ এই বাড়িতে আফরাই রান্নাবান্না সামলায়, সে অসুস্থ হলে তাদের হেল্পিং হ্যান্ড মহিলাটি রেঁধে দেয়। কিন্তু তার রান্নার টেস্ট অন্যরকম সেটা আদিয়াত আর আফিফ জানে। তারা বাদে আর কে রান্না করেছে সেটা জানতে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে বাবা-ছেলে। আফরা তাদেরকে বেশি অপেক্ষা করায় না, সে বলে–
—আজ আমার একমাত্র পুত্রবধূ শখ করে আমাদের সকলের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করেছে।
আফরার কথা শুনে আদিয়াত আর আফিফ বেশ ভালোই অবাক হয়ে। তাদের অবাক হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আদিয়াত যেমন অবাক হয়েছে তেমনই সাথে খুশি হয়। সে হাসি মুখে–
—আম্মাজান, আপনি শুধু শুধু এত কষ্ট করতে গেলেন কেনো?
—কষ্ট কোথায় আব্বু। আমি কি আমার ফ্যামিলির জন্য কিছু করতে পারি না? নাকি আপনারা আমায় এই পরিবারের সদস্য ভেবে উঠতে পারছেন না এখনও?
লাস্টের কথাটা মলিন মুখ করে বলে রাহা। আদিয়াত তার কথা শুনে হেসে দেয়। সে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে গিয়ে রাহার সামনে এসে দাঁড়ায়। তার মাথা হাত রেখে বলে–
—অবশ্যই পারো ফ্যামিলির জন্য কিছু করতে। কিন্তু আম্মাজান আপনি তো এখনও ছোট আর এই বিষয়ে এতটা পরিপক্ব নন। আগে আপনার শ্বাশুড়ির থেকে কিছুদিন ধীরে সুস্থে সবটা দেখে শিখেন তারপর গোটা জীবন তো পরেই আছে আমাদের রান্না করে খাওয়ানোর জন্য। আপনি হলেন আমার দ্বিতীয় মেয়ে, এক মেয়েকে বিদায় দিয়ে আরেক মেয়েকে ঘরে তুলেছি। আর তাছাড়া যদি আপনার হাত-টাত পুড়ে বা কেটে যেতো তাহলে কিন্তু আমি ভীষণ কষ্ট পেতাম।
রাহা আদিয়াতের শেষ কথাটা শুনে নিজের ডান হাতটা ওড়না দিয়ে লুকিয়ে নেয়। সেটা আর কারো চোখে না পড়লেও আফিফের চোখে ঠিকই পড়েছে।
রাহা আদিয়াতের কথা শুনে আবেগি হয়ে যায়। তার বাবার কথা মনে পড়ে যায়। জেদের বশে কতদিন হয়ে গেলো মা-বাবার সাথে কথা বলেনি। কিন্তু এখন তাদের জন্য মন পুড়ছে।
আদিয়াত রাহাকে আফিফের পাশে বসিয়ে নিজে তাকে বেড়ে দেয় খাবার। তারপর নিজের জায়গায় বসে বলে–
—আজ আমরা সকলে একসাথে খাবো। সকলে খাওয়া শুরু করো।
আদিয়াতের কথা অনুযায়ী আফরা আর আফিফ খেতে শুরু করলেও রাহা হাত গুটিয়ে বসে থাকে। সকলে বিষয়টা কিছুক্ষণ পর প্রত্যক্ষ করে। আদিয়াত বলে–
—কি হয়েছে মামুনি? খাচ্ছো না কেনো?
রাহা আমতা আমতা করে বলে–
—আব্বু, আমার পেট ভরা সন্ধ্যায় স্ন্যাক্সের কারণে। আমি খাবো না।
রাহার কথা শুনে আদিয়াত বা আফরা কিছু বলতে নিবে তার আগেই আফিফ গম্ভীর গলায় বলে–
—পেট ভরা নাকি হাত পুড়িয়ে ফেলেছ, আর সেই পোড়া হাত দিয়ে খেতে পারবে না বলে মিথ্যে বলছো? কোনটা?
আফিফের কথা উপস্থিত তিনজনেরই বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আদিয়াত ও আরার বিস্মিত হয় এটা শুনে যে, রাহা হাত পুড়িয়ে ফেলেছে এবং সেটা কাউকে জানায়নি পর্যন্ত। আর রাহা বিস্মিত হয়, আফিফের জানতে পেরে যাওয়ার কারণে।
রাহা আবার মিথ্যাে বলতে নিলে আফিফ প্রথমবারের মতো তাকে জোরে একটা ধমক দিয়ে বলে–
—চুপ!! আর একটা মিথ্যাে কথা বললে তোমার খবর আছে আজ। দেখি হাত বের করো ওড়নার নিচ থেকে।
আফিফের ধমক খেয়ে রাহার বুক ধকধক করতে থাকে। বিয়ের এতগুলো দিনে সে সবসময় আফিফকে মিষ্টিভাষী ও কোমল ব্যবহার করতে দেখেছে। আজ এমন রুহ কাঁপানো ধমক খেয়ে সে বেশ ভয়ই পায়, সেই সাথে অভিমানও হয় তার।
রাহা মুখ ফুলিয়ে হাতটা বের করে সকলের সামনে। ডান হাতের উপরের পিঠে বেশ অনেকটা জায়গা ফোস্কা পড়ে রয়েছে। সকলে তার হাতের অবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে। আফিফ খাওয়া ছেড়ে উঠে গিয়ে রাহার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দেখতে থাকে তার পুড়ে যাওয়া জায়গাটা। তারপর আবারও সেখান থেকে উঠে গিয়ে রুম থেকে বার্নার এনে সযত্নে রাহার হাতে লাগিয়ে দেয়। রাহা এক ধ্যানে আফিফকে দেখতে থাকে। আফিফ ভ্রু-জোড়া কুঁচকে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাজটা করছে দেখে রাহার মনে হলো, আফিফ তার প্রতি দিনকে দিন দূর্বল হয়ে পড়ছে। পরক্ষণেই তার মন এটাও বলে উঠে–
—শুধু আফিফ না রে পাগলী! তুইও আবার এক ডাক্তারের প্রেমে পরছিস, সেটা কি তুই বুঝতে পারছিস?
কথাটা ভেবে রাহার পিলে চমকে উঠে। সেদিন রাহাকে আফরাই খাইয়ে দেয় পরম আদরে, মাতৃস্নেহে আগলে।
________________________________
সকালে হায়া আর আশিয়ান ব্রেকফাস্ট সেড়ে নিজেদের কাজের উদ্দেশ্য রওনা হয়। আশিয়ান হায়াকে তালুকদার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ভার্সিটিতে যাবে। আগামীকাল জাহান-জায়িনের রিসেপশনপার্টি তাই মির্জা বাড়ির সকলে আগে থেকেই তালুকদার বাড়িতে উপস্থিত থাকতে হয়েছে।
_________________________________
জাহান-জায়িনের রিসিপশন পার্টি তালুকদার বাড়ির পেছনের বাগানে অনুষ্ঠিত হবে বলে পুরো বাড়ি সাজানো হচ্ছে। নিচে অনেক মানুষ থাকায়, আদিবা আর হায়াকে উপরে পাঠিয়ে দেয় হানিয়া। তারা দু’জন গল্প করার উদ্দেশ্য মেহরিমার রুমে আসে। কিন্তু রুমে ঢুকে তারা কাউকে পায় না। নিচেও মেহরিমা ছিলো না। তাহলে মেয়েটা গেলো কোথায়?
হায়া বেলকনিতে গিয়ে দেখে সেখানে ফ্লোরে হাঁটুর উপর মুখ গুঁজে বসে রয়েছে মেহরিমা। আদিবা আর হায়া একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারা বুঝতে পারে মেহরিমার হয়ত মনটা খারাপ। তারা দু’জনও মেহরিমার দুই পাশে গিয়ে বসে পড়ে।
নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মেহরিমা হাটু থেকে মুখ উঠিয়ে দেখে তার বান্ধবীরা এসেছে। এদিকে মেহরিমা মুখ উঠানোর পর তার মুখশ্রী প্রত্যক্ষ করে হায়া বুকটা হুহু করে উঠে। মেহরিমার চোখজোড়া অশ্রুসিক্ত আর লাল হয়ে রয়েছে। মেয়েটা নিরবে বসে নিজের কষ্ট বিলাশ করছিল।
হায়া মেহরিমার আরো কাছে এসে বসে। তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে–
—কি হয়েছে দোস্ত? তুই কাঁদছিস কেনো? কেউ তোকে কিছু বলেছে? বড়দা ভাই তোকে কিছু বলেছে বা বলেছে?
মেহরিমা তার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে তারপর মাথাটা ডানে বায়ে নাড়ায়। মানে জাহান কিছু বলেনি। হায়া আবারও জিজ্ঞেস করে–
—তাহলে কাঁদছিস কেনো?
মেহরিমা হায়ার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে। আদিবা তার কাঁধে হাত রেখে বলে–
—তুই কিছু না বললে আমরা বুঝবো কিভাবে তোর কি হয়েছে? দেখ নিজের কষ্টটা নিজের মধ্যে চেপে না রেখে আমাদের সাথে শেয়ার কর, দেখবি হালকা লাগবে। এমনও তো হতে পারে আমরা এমন কিছু সাজেশন দিলাম যার মাধ্যমে তোর সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।
আদিবার কথায় হায়াও সম্মতি জানায়। মেহরিমারও তার কথাটা ভালো লাগে। মেহরিমা ধীরে সুস্থে বলা শুরু করে। তার কথাগুলো শুনে হায়া ও আদিবার মনটাও বিষাদে ছেয়ে যায়।
শব্দসংখ্যা~১৭০৫
~চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৪
আদিবা মেহরিমার কাঁধে হাত রেখে বলে–
—তুই কিছু না বললে আমরা বুঝবো কিভাবে তোর কি হয়েছে? দেখ নিজের কষ্টটা নিজের মধ্যে চেপে না রেখে আমাদের সাথে শেয়ার কর, দেখবি হালকা লাগবে। এমনও তো হতে পারে আমরা এমন কিছু সাজেশন দিলাম যার মাধ্যমে তোর সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।
আদিবার কথায় হায়াও সম্মতি জানায়। মেহরিমারও তার কথাটা ভালো লাগে। মেহরিমা ধীরে সুস্থে বলা শুরু করে। তার কথাগুলো শুনে হায়া ও আদিবার মনটাও বিষাদে ছেয়ে যায়।
—আমাদের সম্পর্কটা যেনো কোথাও গিয়ে থেমে গেছে—একটা সোজা রেখার মতো, যেখানে কোনো বাঁক নেই, উত্তাপ নেই। আমি জানি, একটা ভুল করেছিলাম আমি, আর সেটার জন্য ওর অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমি অনুতপ্ত… সত্যিই অনুতপ্ত।
সে আজও আমার যত্ন নেয়। আমার সবচেয়ে ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলো পর্যন্ত বুঝে ফেলে নিঃশব্দে। আমার খেয়াল রাখে এমনভাবে, যেনো আমি তার সমস্ত পৃথিবী। অথচ, কোথাও একটা ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। একটা না বলা “কিন্তু” যেনো আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
সে আমার স্বামী, অথচ এততদিনেও সে আমাকে নিজের করে টানেনি… একটিবারও না। এই চুপচাপ ভালোবাসায় হয়তো অনেক গভীরতা আছে, কিন্তু আমার ভেতরটা কেমন যেনো অপূর্ণতায় ডুবে যায়। তার এই উত্তাপহীন ভালোবাসা আমায় ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। নিজেকে বারবার অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। আমার এই ছোট্ট জীবনে পূর্ণতার খাতা একদমই শূন্য। কিন্তু আমার সকল অপূর্ণতা পূর্ণতায় রূপান্তর হয়েছে জাহানকে পেয়ে। তার মতো এত নিক্ষুত, এত যত্ন করে কেউ আমাকে ভালোবাসতে পারবে না। কিন্তু এই পূর্ণতার তৃপ্ততা আমি উপভোগ করতে পারছি না তার বিমুখতায়। আমার ভীষণ কষ্ট হয় তার ইগনোরে।
কথাগুলো বলতে বলতে মেহরিমার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। হায়া ও আদিবা নিশ্চুপ হয়ে তার কথাগুলো শুনে। তারাও মেহরিমার কষ্টটা অনুধাবন করতে পারছে। ভালোবাসার মানুষটি চোখের সামনে থাকার পরও তাকে স্পর্শ না করতে পারার কষ্ট যে কেমন সেটুকু বুঝার বোধ তাদের হয়েছে।
হায়া পূর্বের ন্যায় মেহরিমার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে–
—কাঁদিস না দোস্ত। ভাইয়া তোকে কোন ইগনোর করছে না। তুইই বল ভালোবাসার মানুষটিকে ইগনোর করে কেউ থাকতে পারে? অন্তত ভাইয়ার মতো লোক পারবে?
—তাহলে সে যে করছে। সে আমার হয়েও আমার না। সত্যি করে বল, আমাদের মধ্যকার দূরত্ব কি তোদের চোখে পড়েনি? আদিবা তুই তো আমার সাথে এই বাড়িতে থাকিস, তুই বল।
আদিবা মেহরিমার কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। হ্যাঁ, তারও চোখে পড়েছে জাহান আর মেহরিমার সম্পর্কের শীতলতা। হায়া সব শুনে চিন্তায় পড়ে যায়। কিভাবে এদের সম্পর্কে পূর্বের মতো স্বাভাবিক করে তুলবে সেই ভাবনায় মশগুল হয়ে পড়ে।
হায়া কতক্ষণ ভাবনার পর হুট করে বলে–
—আচ্ছা তুই ভাইয়াকে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিস?
মেহরিমা তার হঠাৎ প্রশ্নে ভরকে যায়। সে সরল গলায় বলে–
—না, এখনো জানায় নি।
হায়া মেহরিমার কথা শুনে কপাল চাপড়াতে থাকে। আদিবাও কিছুটা বুঝতে পারে। মেহরিমা হায়ার কপাল চাপড়ানো দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি রে এমন করছিস কেন?
হায়া রেগে নিজের হাত দু’টো দিয়ে মেহরিমার গলার কাছে এনে টিপে ধরার মতো করে বলে–
—তোরে হালকা করে পটলের ক্ষেতে পাঠাতে মন চাচ্ছে বেদ্দপ মহিলা।
মেহরিমা হায়ার কথা শুনে মুখ গোমড়া করে বলে–
—হ্যা দে না পাঠিয়ে। ভালোই হবে, আপদ বিদায় হবে।
হায়া মেহরিমার গালে আস্তে করে একটা থাপ্পড় মেরে বলে–
—বদল জানি কোথাকার! না বুঝে সবসময় বেশি লাফাস তুই, আর সাফার করতে হয় বাকিদের। না আমার ভাইকে বুঝতে পারছিস না আমাকে।
মেহরিমা হায়ার কথা শুনে মন খারাপ করে নিচের দিলে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে থাকে। হায়া তার এমন কাজে একটু মায়া হয় সেই সাথে বিরক্তও হয়। সে মেহরিমার মাথাটা উঠিয়ে দিয়ে তার চোখের পানি মুছে দেয়, তারপর যেই গালে থাপ্পড় দিয়েছিল সেই গালে টাইট করে একটা পাপ্পি দেয়। কাজটা শেষ করে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলে–
—নে আদর করে দিলাম। আর কাঁদিস না। এখন আসল কথা শুন।
মেহরিমাও হেঁসে দেয় হায়ার এহেন কাজে। সে বলে–
—হুম বল।
—ভাইয়া তোকে এসব ইগনোর করছে তোর মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনতে।
—কিহ্হ্?
—হ্যা রে ছাগল। দেখ বিয়ের আগে ভাইয়া তোকে ভালোবাসার কথা অনেকবারই বলেছে, কিরে বলেছে না?
—হুম।
—কিন্তু তুই কি একবারও আমার ভাইকে তোর মনের কথা জানিয়েছিস?
মেহরিমা ডানে বায়ে মাথা নাড়ায়।
—এক্স্যাক্ট এই কারণেই ভাইয়া এখনও তোকে নিজের কাছে টানছে না। আমি আমার ভাইকে যতটা চিনি তার উপর ভিত্তি করে বলতে পারি,ভাইয়া আর রেগে নেই তোর কাছে। সে শুধু দেখতে চাইছে তুই তার রাগ ভাঙাতে কি কি করতে পারিস। সহজ কথায় বলতে গেলে তার ভালোবাসার মানুষটির কাছে তার মনের কথা জানতে চাইছে। বুঝেছিস বুদ্ধু?
মেহরিমা আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকে হায়ার দিকে কতক্ষণ। তারপর মাথা নাড়িয়ে বুঝায় সে বুঝতে পেরেছে। হায়ার কথায় আদিবাও তাল মেলায়–
—হ্যাঁ, আমিও হায়ার সাথে একমত। তোর উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাইয়াকে তোর মনের কথাটা জানিয়ে দেওয়া। দেখিস এর পরে ভাইয়া আর তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না।
মেহরিমা হায়া আর আদিবার কথাগুলো কতক্ষণ সময় নিয়ে ভেবে বুঝতে পারে তারা দু’জন সঠিকই বলছে। কিন্তু এখনও একটা ভাবনা রয়েই যায়। সে মলিন মুখে বলে–
—কিন্তু কিভাবে জানাবো আমার মনের কথা? আমি তো তার সামনে গেলেই সব গুলিয়ে ফেলি। সে যখন চশমার অপর পাশ দিয়ে ছোট ছোট চোখে তাকায়, আমার ঘাবড়ে যাই, হাত-পা কাঁপতে থাকে।
—কেন রে আমার ভাই কি বাঘ নাকি ভাল্লুক যে তাকে এত ভয় পাস?
হায়া ভ্রু নাচিয়ে মেহরিমাকে প্রশ্ন করে। মেহরিমা জবাবে বলে–
—ভয় না দোস্ত, তাকে ইদানীং ভয় লাগে না বরং সে আশেপাশে থাকলে কেমন সেফ ফিল হয়। ভালোলাগা ঘিরে ধরে। এতবছর যেই ফিলটা আমি চাচ্ছিলাম, তাকে বিয়ের করার পর থেকে সেটা পাচ্ছি। কিন্তু….
আড়ালে থাকা মানুষটির ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা যায়। সে আবারও কান পাতে রমণীগণের কথা শুনতে।
হায়া বলে–
—ব্যস, আর কোন কিন্তু না। ভালোবাসা প্রকাশে কোন কিন্তু পারান্তুর জায়গা নেই। শুন, তুই কাল তোদের রিসেপশনের পরই তোর মনের কথা জানাবি আমার ভাইকে। তোর প্রপোজ করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ আমি তৈরি করে দিবো। তুই শুধু নিজের সব অস্বস্তি, লজ্জা কয়েকঘন্টার জন্য দূরে সরিয়ে আমার ভাইকে তোর মনের কথা জানাবি। কি পারবি তো?
মেহরিমা হায়ার কথায় কোন জবাব দেয় না। তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আদিবা তার কাঁধে হাত রেখে বলে–
—দোস্ত বেশি দেরি করিস না নিজের মনের কথা জানাতে। যত দেরি ততই তোকে কষ্ট পেতে হবে, আর ভাইয়ার অভিমান গাঢ় হতে থাকবে। এমন চলতে থাকলে একসময় ভাইয়াও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে তোর থেকে।
আদিবার কথা শুনে মেহরিমা আঁতকে ওঠে। সে অস্থির হয়ে বলে–
—না না আমি কালই জানাব তাকে আমার মনের কথা। আমার জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ এখন শুধু উনি। উনার এই অভিমানই আমি সহ্য করতে পারছি না, উনি যদি কখনো আমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় আমি তো একদম মরে যাবো।
লাস্টের কথাগুলো সিক্ত গলায় বলে মেহরিমা। হায়া মেহরিমাকে ভরসা দিয়ে বলে–
—এমন কিছুই হবে না। বেশি ভাবিস না। এখন চল উঠ, শপিংয়ে যাবো কেনাকাটা করতে হবে অনেক কিছু।
তিন রমণী ঘরে আসার আগেই বেলকনির দরজার আড়াল থেকে একজনে নিঃশব্দে সরে যায়।
___________________________
ফোনে টাইম চেক করে হায়ার মনে পড়ে এখন আশিয়ানের ক্লাস আওয়ার। তারমানে আশিয়ানের ফোন এখন তার কেবিনে। হায়া আশিয়ানকে ফোন না দিয়ে একটা মেসেজে জানিয়ে দেয় সে শপিংয়ে যাচ্ছে। নাহলে ক্লাস শেষ করে এসে তাকে ফোনে না পেলে টেনশনে তার জামাই বাসাতেই এসে পড়বে।
মেসেজ পাঠানো শেষ করার সাথে সাথে হায়ার ফোনটা অফ হয়ে যায়। চার্জ শেষ কিনা তাই। হায়া ফোনটাকে চার্জে লাগিয়ে, রেডি হয়ে চলে যায় বান্ধবীরূপী ভাবীদের সাথে শপিংয়ে। বাসাতেও সকলকে জানিয়ে যায় তাদের শপিংয়ে যাওয়ার কথা।
___________________________
শপিংমলে এসে হায়া আর আদিবা একটার পর একটা শাড়ি মেহরিমার গায়ে রেখে দেখতে দেখতে পাগল করে ফেলছে তাকে। কিন্তু মেহরিমার কাছে একটাও ভালো লাগছে না। ভালো লাগবে কিভাবে, সবগুলো যে একটু বেশিই পাতলা আর ফ্যানফ্যানা। মেহরিমা একা থাকতেই এমন শাড়িতে নিজেকে জড়ানোর সাহস করবে না, সেই শাড়ি পরে কিনা সে জাহানের সামনে যাবে। কথাটা ভাবতেই মেহরিমার গা শিউরে ওঠে।
হায়া মেহরিমার জন্য শাড়ি চুজ করার দায়িত্বটা আদিবার উপর দিয়ে সে রুম ডেকোরেশনে সামগ্রি কিনতে চলে যায়।
__________________________
তিন ঘণ্টা হায়ার জন্য অপেক্ষা করার পরও যখন হায়া আসে না তখন আদিবা আর মেহরিমার মনে ভয়ের উদগ্রীব হয়। তারা দু’জন রুম ডেকোরেশন সেকশনে গিয়ে অনেকগুলো শপে হায়ার ছবি দেখিয়ে তার কথা জিজ্ঞেস করে, কিন্তু কেউ হায়ার কথা বলতে পারে না।
তারা দু’জন ভয় পেয়ে যায়। আদিবা ভয়ে ভয়ে জায়িনকে ফোন করে কথাটা জানায় আর মেহরিমা জাহানকে। বোন পাগল দুই ভাই তখনই তাদের সকল কাজ ফেলে বোনকে খুঁজেতে বের হয়ে যায়। আদিবা সবশেষে ভয়ে ভয়ে আশিয়ানকে ফোন দেয়। আশিয়ান ফোনটা রিসিভ করতেই আদিবা বলে–
—জিজু, হায়াকে না কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
আশিয়ান মাত্রই ক্লাস শেষ করে ভার্সিটি থেকে বের হচ্ছিল অফিসের উদ্দেশ্য। আদিবার কাছে এমন কথা শুনে আশিয়ান জোরে ব্রেক কসে। সে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—পাওয়া যাচ্ছে না মানে? কোথাও গেলো হায়া?
—জানি না ভাইয়া। আমরা তিনজন শপিংয়ে এসেছিলাম, হায়া ডেকরেশনের সামগ্রী কিনতে যায় কিন্তু তিন ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন ফিরে আসে না আমরা তাকে খুঁজতে শুরু করি কি কোথাও পাই না। বাসায় কল দিয়ে ওর কথা জিজ্ঞেস করলে, তারা জানায় সে বাসায়ও যায়নি।
আশিয়ান আদিবার কথা গুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
~চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৫
আশিয়ান, জাহান ও জায়িন হায়াকে খুঁজতে খুঁজতে পাগলপ্রায়। সম্ভাব্য সব জায়গা, চেনা-পরিচিত সকলের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়ে গিয়েছে হায়ার কথা, কিন্তু হায়াকে কোথাও খুজে পাওয়া যায় নি। বাসায় জানাবে না জানাবে না করেও একসময় জানিয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই হাসি-খুশি, আনন্দে ঘেরা মহলটা বিষন্নতায় ছেয়ে গিয়েছে।
আট ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন আশিয়ান হায়াকে দিকে টেনশনে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছে, তাই জাহান-জায়িন জোর করে তাকে ধরে বাসায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু আশিয়ান হায়াকে না দেখা অব্দি শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই।
হঠাৎই কলিংবেলের আওয়াজ শোনা যায়। হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলে সে একদম অবাক হয়ে যায়। কারণ তার সামনে হায়া দাড়িয়ে আছে আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে হায়ার না হওয়া বর মানে ফারাবি। হায়ার মুখে গম্ভীর্যতার কালো আধার লেপ্টে আছে, অন্যদিকে ফারাবির হাসিহাসি মুখে দাড়িয়ে আছে।
হায়া গম্ভীর গলায় বলে–
—ভেতরে ঢুকতে দেন খালা।
কাজের মহিলাটি প্রায় অনেক বছর ধরেই তালুকদার বাড়িতে কাজ করছে। এতদিনের কর্মজীবনে হায়া তার সাথে কখনোই এমন গম্ভীর গলায় কথা বলেনি। এই বাড়ির সকলে তাকে পরিবারের একজনের মতো ট্রিট করে। হায়াও তাকে “খালা” বলে ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। সেই মেয়ে আজ প্রথম এমন গম্ভীর গলায় আদেশের মতো কথা বলায় মহিলাটি একটু না বেশ ভালোই চমকে যায়। সে তাদের ভেতরে যাওয়ার জায়গা করে দেয়।
জাহান-জায়িন আশিয়ানকে বাসায় রেখে হায়াকে খুঁজতে আবারও বের হচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয় হায়া। দুই ভাই কতক্ষণ ভ্যাবলার মতো বোনের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে এটা কি আসলেই তাদের বোন, নাকি তাদের কোন হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।
এদিকে ভাইদের এমন অদ্ভুত কান্ডে হায়ার মেজাজ গরম হয়। এমনিতেই মন মেজাজ ভালো না, তারউপর তার ভাইয়েরা এমন কাজ করছে, সে রেগে খানিকটা ধমকের সুরে বলে–
— সামনে থেকে সরবে নাকি ধাক্কার দিবো?
হায়ার ধমক খেয়ে জাহান-জায়িন সিউর হয় এটা তাদের হ্যালুসিনেশন না। দুই ভাই হুট করে আদরের বোনকে জড়িয়ে ধরে। হায়া কয়েক কদম পিছিয়ে যায় ভাইদের এমন হুট করে জড়িয়ে ধরায়, সে পরতে পরতো নিজেকে সামলে নেয় কোন মতো। সেও কোন মতে দুই ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে–
—আরে বাবা, পরে যেতাম তো। এমন করে কেউ।
জাহান বোনকে ছেড়ে দিয়ে তার দুইগালে হাত রেখে অস্থির গলায় বলে–
—বনু, কই গিয়েছিলে তুমি? জানো আমরা কত চিন্তা করছিলাম তোমার জন্য।
জায়িনও জাহানের সুর ধরে এবার নিজেই ধমক দিয়ে বলে–
—হ্যাঁ, কোথায় গিয়েছিলি তুই? বেশি পা বড় হয়ে গিয়েছে না তোর? আশিয়ান ভাইকে বলে তোর পা ভাঙাচ্ছি আমি দাঁড়া।
হায়া জায়িনের কথায় পৃষ্ঠায় তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
—দেখো তোমার আশিয়ান ভাইকেই না আবার চৌদ্ড শিকের পেছনে দেখতে পাও।
হায়ার কথা শুনে জাহান-জায়িনের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। জায়িন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—মানে? কি বলতে চাইছিস তুই?
হায়া গুরুগম্ভীর গলায় বলে–
—সবাইকে ডাকো, সবার সামনে বলছি আমি কোথায় ছিলাম আর কেনো ছিলাম।
জায়িন আরো প্রশ্ন করতে চায় কিন্তু জাহান তাকে থামিয়ে দেয়। জায়িন যায় সকলকে ডাকতে। একে একে সকলকে ডাকা শেষ করার পর সবার লাস্টে জায়িন আসে হায়ার রুমে। যেখানে বর্তমানে অবস্থান লরছে আশিয়ান ও স্পর্শ। আশিয়ানকে পাহারা দেওয়ার জন্যই মূলত স্পর্শ তার পাশে বসে আছে, যাতে আশিয়ান অসুস্থ শরীর নিয়ে আবার বের না হতে পারে।
জায়িন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে–
—আশিয়ান ভাই, নিচে চলো। হায়া ফিরে এসেছে।
আশিয়ানকে আর থামায় কে। সে ঝড়ের গতিতে নিচে নামতে শুরু করে। স্পর্শ আর জায়িন তার হওয়ার মতো ছুট দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায় তারপর তারাও নিচে চলে যায়। নিচে এসে দেখতে পায় আশিয়ান সকলের সামনেই হায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে কিন্তু হায়া নির্বাক চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। আশিয়ানকে জড়িয়ে ধরে নি সে।
আশিয়ান হায়ার হাত,গাল ছুয়ে দিতে দিতে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে –
—এই বউ, কই গিয়েছিলে তুমি? জানো তোমার জন্য আমার কত টেনশন হচ্ছিল। এমনটা করে কেউ? জানো না তোমাকে একমুহূর্ত না দেখলে আমি কেমন অস্থির হয়ে যাই? তাও কেন এমনটা করো আমার সাথে তুমি বারংবার?
আশিয়ানের শেষের কথাটা ভীষণ করুণ শোনায়। হায়া এক দৃষ্টিতে আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আশিয়ান বা অন্য কারো একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছে না।
বাকিরা আশিয়ানের এমন জড়িয়ে ধরা বা পাগলামো করায় কিছু মনে করছে না। কারণ সকলেই জানে আশিয়ান তার বউয়ের জন্য কতটা পাগল। জাভিয়ান পেছন থেকে সামনে এসে হায়াদের সামনে এসে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কোথায় গিয়েছিলে তুমি কাউকে না জানিয়ে?
হঠাৎই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাবি সামনে এসে বলে–
—হায়াকে আমি আমার সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আঙ্কেল কিছু সত্য জানানোর জন্য।
ফারাবিকে তো আশিয়ান এমনিতেই দেখতে পারত না, তারউপর এমন কথা শুনে আশিয়ানের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। সে হায়াকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ফারাবির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। “ইউ বাস্টার্ড” বলে ফারাবিকে এক ঘুষি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তার শার্টের কলার ধরে নিচ থেকে টেনে তুলে পুনরায় ঘুষি মারতে যাবে তখনই হায়া এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফারাবির থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে–
—অসভ্য লোক দূরে থাকুন ফারাবির থেকে। আর কত উনার ক্ষতি করবেন? এবার তো একটু রহম করুন লোকটার উপর।
ঘটনাগুলো এত তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে সবটা বাকিদের মাথার উপর দিয়ে যায়। আশিয়ানসহ বাকিরা হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার এমন কথায়। আশিয়ান নিজেকে সামলে হায়ার কাছে এসে তার দু’গালে হাত রেখে বলে–
—এই বউ, কি বলছো তুমি এসব? কি ক্ষতি করেছি আমি ফারাবির?
হায়া আশিয়ানের হাত দু’টো নিজের গাল থেকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে–
—আবার নির্লজ্জের মতো জিজ্ঞেস করছেন, কি ক্ষতি করেছে আপনি তার? কেন মনে নেই, আমাদের বিয়ে আপনি সেই ব্যক্তি যে কিনা, ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করেছিলেন? নাকি ভুলে গিয়েছেন সময়ের সাথে সাথে সবটা?
হায়ার কথা শুনে আশিয়ান ও তাদের পরিবারের সবাই আরো একবার হতভম্ব হয়ে যায়। আশিয়ান এটা ভেবে হতভম্ব হয়ে যায় যে, হায়া এসব জানতে পারল কিভাবে? আর বাকিরা হতভম্ব হয় এটা জেনে যে, আশিয়ান ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করিয়েছে।
আশিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি জানলে কি করে এসব? কে বলেছে তোমায় এগুলো?
—আমি বলেছি।
ফারাবি আশিয়ানের প্রশ্নের জবাব দেয়। জায়িন তার কথা শুনে বলে উঠে–
—তোমার কাছে কি প্রমাণ আছে যে, তোমার বোনকে আশিয়ান ভাইয়াই কিডন্যাপ করিয়েছিল বিয়ের দিন? তুমি যে আশিয়ান ভাই আর বনুর সম্পর্কে চিড় ধরাতে এসব করছ না এটার কি প্রমাণ?
ফারাবি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–
—আমি জানতাম এমন প্রশ্ন উঠবে। তাই সব ব্যবস্থা নিয়েই এসেছি। একটু ওয়েট করো, সবটা প্রমাণ করে দিচ্ছি।
কথাটা বলে ফারাবি পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেনো কল করে ভেতরে আসতে বলে আবার কলটা কেটে দেয়। কল কাটার দুই মিনিট পর দু’টো কালো মতো লোক আসে। একটা লোককে উদ্দেশ্য করে ফারাবি বলে–
—যা জানো সবটা বলো।
ফারাবির নির্দেশ মোতাবেক লোকটি বলতে থাকে–
—৫মাস আগে উনি (আশিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে) আর উনার এক ডাক্তার বন্ধু, তার নাম মনে হয় আফিফ। উনারা দুইজন আমাগো ডেড়ায় আসে একটা মাইয়ারে অপহরণ করানো লেগা। ডা.আফিফ আমারে চিনে কারণ আমার বাপ বহুদিন তার কাছে চিকিৎসা নিছিল তাই। তারা দু’জন আমারে উনার (ফারাবি) বোনের ছবি দেখাইয়া বলে মাইয়া ডারে দুইদিনের জন্য নাকি অপহরণ কইরা রাখতে হইবো। আমি এইসব কাজ অনেক আগেই ছাইড়া দিছিলাম, খালি ডা. সাহেবের কারণে আমার বাপে সুস্থ হইয়া উঠছিলো বইলা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমি কাজটা করি।
সকলে লোকটার কথা শুনে আরো একবার হতভম্ব হয়ে যায়। তাদের সকলকে না চাইতেও বিশ্বাস করতে হয় কারণ, লোকটা যদি মিথ্যে বলত তাহলে আফিফ সম্পর্কে তার ধারণা থাকার কথা না। লোকটা ফরফর করে আশিয়ান আর আফিফের বন্ধুত্বের কথাটা বলে দিয়েছে। এটাও বলে দিয়েছে যে, আফিফ একজন ডাক্তার। ফারাবি আফিফ সম্পর্কে জানে না। কারণ টা সিম্পল। বন্ধু টা হলো আশিয়ানের, তাই যেখানে আশিয়ান সম্পর্কেই তার ধারণা খুবই নগন্য, সেখানে আফিফের কথা জানা তো বহু দূরের কথা।
________________________
—আই ওয়ান্ট ডিভোর্স। আমি কোন ক্রিমিনালের সাথে সংসার করতে চাই না।
হায়ার এই একটা কথায় আশিয়ানের পুরো সত্ত্বা নাড়িয়ে দেয়। হায়া কথাটা বলে কাঁদতে কাঁদতে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে যায় নিজের রুমে। আশিয়ান কেবল অশ্রু সিক্ত চোখে তার প্রস্থান দেখে।
শব্দসংখ্যা~১২০০
চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৫[বর্ধিতাংশ]
তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমের বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সকলে আশিয়ানের কথা কর্মকান্ডের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়ার চোখে বেদনা মিশ্রিত অশ্রু কণা খেলা করছে, আর আশিয়ান সেই দৃশ্যটুকু সনতর্পণে অবলোকন করছে। এখানে সকলের মধ্যে শুধু একজনের মনের হালাত বেশ ভালো।
ব্যক্তিটি হলো ফারাবি। তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ীদের হাসি। যেই হাসি আশিয়ানকে বলছে, ফারাবি আজ ভাগ্যের চরম নিষ্ঠুরতার খেলায় অস্বাভাবিকভাবে জিতে গিয়েছে। আর আশিয়ান জিতের দারপ্রান্তে এসেও হেরে গিয়েছে। আচ্ছা সত্যিই কি আশিয়ান হেরে গিয়েছে? সে যদি হেরে যায় তাহলে সেই হার তো শুধু তার একার হবে না, বরং সেই হারের মাধ্যমে ভেঙে যাবে একটা সুন্দর যৌথ পরিবার। মৃত্যু ঘটবে একটি সুন্দর ভালোবাসার গল্পের।
_____________________________
আবরার ধীর পায়ে সকলের পেছন পেরিয়ে এসে থেমে দাঁড়ান আশিয়ানের সামনে। আশপাশে তখন ঘন নীরবতা, বাতাসে অজানা এক ভয়ের প্রতিধ্বনি। তাঁর কণ্ঠে যেনো লোহার মতো ঠান্ডা দৃঢ়তা—
—আমি একটা প্রশ্ন করব, হ্যাঁ অথবা না-তে উত্তর দেবে। ঠিক আছে?
আশিয়ান মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়ায়। মুখে অভিব্যক্তি নেই, চোখে একরাশ জমাট বিষণ্ণতা।
আবরার গলা খাঁকারি দিয়ে কথাটা ছুড়ে দেন, যেন নিজের বিশ্বাসের বুক চিরে বার করে আনছেন
প্রশ্নটা—
—তুমি কি সত্যিই ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করেছিলে? হ্যাঁ অথবা না?
প্রশ্নটা যেন এক ছুরি হয়ে কেটে যায় বাতাস, রক্তাক্ত করে ফেলে পিতৃত্ব আর সন্তানের বন্ধনের ভিত। আশিয়ান স্থির চোখে বাবার দিকে তাকায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আড়ালে এক সমুদ্র অশ্রু লুকিয়ে আছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, আবরারের চোখজোড়াও ভিজে উঠছে নিঃশব্দে। যে মানুষটি এতদিন অনড় পাহাড় হয়ে থেকেছেন, আজ তার ভিতরটা ভেঙে পড়ছে নীরবে।
এই বয়সে এসে আবরার যেন আবারও নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর আদর্শ, তাঁর নীতি, তাঁর শিক্ষায় গড়া ছেলেটি এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে এই সত্যটা কিছুতেই মানতে পারছেন না তিনি। আর আশিয়ান? সে বাবার চোখে চোখ রাখতে পারে না। পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে সে চোখ নামিয়ে নেয় নিচের দিকে, গলায় কাঁপন এনে ক্ষীণ স্বরে উত্তর
দেয়—
—হ্যাঁ।
একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই ‘হ্যাঁ’ যেন বজ্র হয়ে আছড়ে পড়ে আবরারের হৃদয়ে। আর পর মুহূর্তেই সেই হৃদয়ঘাতী শব্দের প্রতিধ্বনি হয়ে আবরারের হাতের থাপ্পড় আছড়ে পড়ে আশিয়ানের গালে।
এক প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুম। উপস্থিত সবাই থমকে যায়, বিস্ময়ে, আতঙ্কে। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু থাপ্পড়ের প্রতিধ্বনি যেন এখনও দেয়ালে দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে।
আশিয়ান হাত তুলে চেপে ধরে তার লাল হয়ে ওঠা গাল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নির্বিকার নয়, যেন নিঃশেষ এক অনুতাপে ডুবে।
কিন্তু আবরারের রাগ থেমে থাকে না। তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করার জন্য আরও একবার হাত তুলতেই হায়া ছুটে এসে দাঁড়িয়ে যায় বাপ-ছেলের মাঝখানে। সবকিছু ঘটে যায় এক মুহূর্তের ঝড়ের মতো। আর সেই ঝড়ে হায়ার গালে পড়ে আবরারের দ্বিতীয় থাপ্পড়।
এক পুরুষালি হাতে এত জোর থাপ্পড়—তা কি হায়ার মতো ছোটখাটো মেয়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব? মুহূর্তেই তার মুখটা ঘুরে যায়, শরীর দুলে ওঠে। ভারসাম্য হারিয়ে সে পড়ে যেতে উদ্যত হয়, কিন্তু ঠিক তখনই আশিয়ান তাঁকে জাপটে ধরে। নিজের বাহুর মধ্যে আগলে রাখে তাকে, যেন পৃথিবীর সব কষ্ট, সব অপমান থেকে রক্ষা করতে চায়।
ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে যায় যে, কেউ কিছু বোঝার আগেই যেন সময় থেমে গিয়ে একটা ইতিহাস লিখে ফেলে।
ড্রয়িংরুমে তখন নিঃশব্দ এক বিস্ফোরণ। প্রত্যেকেই স্তব্ধ, বিস্ময়সূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই তিনটা প্রাণের দিকে যাদের চোখে, মুখে, শরীরে লেখা হয়ে গেছে অভিমানের এক অনুচ্চারিত অধ্যায়।
আবরার হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার এহেন কান্ডে। সেই সাথে ড্রয়িংরুমে অবস্থান করা প্রত্যেকটি ব্যক্তি। আবরার একবার নিজের বাড়ন্ত হাতটার দিকে আরেকবার আশিয়ান ও হায়ার দিকে তাকাচ্ছে। সে তার আদরের ভাগ্নীকে জীবনের প্রথম অনিচ্ছা সত্ত্বেও থাপ্পড় মেরেছে–কথাটা এখন তার মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে পারছে না। কিন্তু গ্রহণ যে তাকে করতে হবেই। তার স্তব্ধতায় ভাঙণ ধরে ফারাবির অযাচিত আগমনে।
ফারাবি হায়ার কাছে যাওয়ার সময় আবরারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে যায়। আবরার এমন আকস্মিক ধাক্কায় পড়ে যেতে নিলে জায়িন এসে তাকে ধরে ফেলে। ফারাবি হায়ার কাছে এসে তার বাহু টেনে ধরে আশিয়ানের কাছ থেকে খানিকটা সরিয়ে এনে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করতে থাকে–
—হায়া, দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছো?
হায়ার শরীরে একজন পরপুরুষের স্পর্শ বুঝি আশিয়ান দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখবে? এত ভালো বুঝি সে? সে ফারাবির বুকে জোড়দাড় একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দেয় আর হায়াকে টেনে আবার নিজের বুকে নিয়ে আসে। ফারাবির দিকে তাকিয়ে রাগে হিসহিসিয়ে বলে–
—স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই ওয়াইফ, আদারওয়াইস আই উইল শো ইউ আ সাইড অফ মি দ্যাট উইল মেইক ইউ উইশ ইউ ওয়্যার নেভার বর্ন।
ফারাবিও রাগান্বিত দৃষ্টিতে আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের চোখে চোখে যেনো এক নিরব যুদ্ধ চলছে, কে হায়াকে জিতে নিতে পারে। হায়া তখনও আশিয়ানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে নিজে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। আশিয়ান ফারাবির থেকে চোখ সরিয়ে বুকে থাকা প্রেয়সীর দিকে মনোযোগ দেয়। সে আলতো হাতে হায়াকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে তার ব্যথা পাওয়া গাল টায় হাত রাখে, অতি সাবধানে, অতি যত্নে। গালটা কয়েক মুহূর্তের মাঝেই গাল হয়ে কিছুটা ফুলে গিয়েছে। আশিয়ান সেদিকে নিজের দৃষ্টি নিবন্ধন রেখে মলিন গলায় বলে–
—তুমি আসলে কেন আমাদের মাঝে হু? বাবা মারছিল মারত, শুধু শুধু আমাদের মাঝে এসে নিজে মারটা খেলে। দেখেছো কতটা লাল হয়ে ফুলে যাচ্ছে। সবসময় তোমার বেশি বেশি না করলে হয় না?
শেষের কথাটা কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বলে। হঠাৎই হায়া ঝট করে আশিয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে–
—বন্ধ করুন আপনার নাটক। দয়া করে আর নাটক করবেন না। আপনার ক্লান্ত লাগে না এত নাটক করতে?
আশিয়ান অবাক হয়ে যায় হায়ার কথা শুনে। সে হায়াকে জিজ্ঞেস করে–
—কিসের নাটক করছি আমি?
—আবার জিজ্ঞেস করছেন কিসের নাটক? তাহলে শুনুন, ভালোবাসার নাটক। আপনি তো আমায় ছোট থেকেই সহ্য করতে পারেন না। আমি পৃথিবীতে আসায় আপনার আদর-ভালোবাসায় কম পরেছে, তাই আপনি আমায় দেখতে পারতেন না। আর আমিও সেরা বলদ, সেই আপনাকেই ভালোবেসে ফেললাম। একবার কষ্ট পেয়ে শিক্ষা হয়নি আবারও ভালোবাসলাম। আপনি এসব কিডন্যাপিংয়ের ঘটনা সাজিয়েছেন আমায় আবারও কষ্ট দেওয়ার জন্য তাই না?
আশিয়ান হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার কথা শুনে। তার এতদিনে ভালোবাসাকে হায়াকে আজ নাটক বলে আখ্যায়িত করলো? এটা কি সে প্রাপ্য? এই পাঁচ মাসের সংসারে একটা দিনের জন্যও হায়ার মনে হয়নি, আশিয়ানও তাকে ভালোবেসে?
আশিয়ান হায়ার কাছে আসতে চায় তাকে বুঝানোর উদ্দেশ্য। কিন্তু হায়া হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়। সে ভাঙা অথচ দৃঢ় গলায় বলে–
—আমি ডিভোর্স চাই। এমন ক্রিমিনাল, হিপোক্রিট মানুষের সাথে আমি আর থাকতে চাই না।
হায়ার এই কথাটা যেনো ড্রয়িংরুমে বোম ফেলার মতো কাজ করে। ডিভোর্স চাইছে হায়া, কথাটা যেনো কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না। হানিয়া আর জাভিয়ান দ্রুত এগিয়ে আসে মেয়ের কাছে। রাগের মাথায় ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিতে চায় কিন্তু হায়া শুনে না তাদের কথা।
হায়া সেই জায়গা ত্যাগ করার আগে সকলকে বলে যায়–
—ভাইদের রিসেপশন পার্টি কালই হবে, এটা যেনো না পেছায়। যদি আমার জন্য পেছনাে হয় তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো বলে দিলাম। তাদের রিসেপশন পার্টির পরেই আমার আর উনার ডিভোর্সের কার্যক্রম শুরু হবে।
কথাটা বলেই হায়া ড্রয়িংরুম ত্যাগ করার উদ্দেশ্য হাঁটা দেয়।
চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]