#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৬
রাতটা কোন মতে সবাই পাড় করে। সকালের আলো ফুটতেই পুনরায় বাড়ি সাজানোর কাজ শুরু হয়ে যায় আগের দমে। হায়াই সবটা তদারকি করছে শুধু আগের মতো তার মুখে হাসিটা আর নেই। ভাবীদের পার্লারে পাঠানো থেকে শুরু করে ভাইদের বাসরঘর তৈরি করা সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে করছে।
ভাইদের বিয়ে নিয়ে তার এক্সাইটমেন্ট অনেক আগে থেকেই। দুই ভাইয়ের একমাত্র কলিজার টুকরা সে। হায়া অনেক আগে থেকেই বলে আসছিল ভাইদের বিয়েতে সব কিছু সে নিজে দাড়িয়ে থেকে করবে। আজ যখন সে সময়টা আসল তখন সে যদি নিজের পারসোনাল প্রবলেমগুলোর কারণে ঘরবন্দী হয়ে থাকে, তাহলে তার ভাইরা যে এক বাক্যে সব অনুষ্ঠান ক্যান্সেল করে দিবে সেটা হায়া বেশ ভালো করেই জানে। তাই তো নিজের বুকে অসীম কষ্ট লুকিয়ে রেখে সবকিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
কাল রাতের পর আশিয়ানকে আর দেখেনি হায়া। হায়া অবচেতন মন বারংবার তার প্রিয় পুরুষটিকে দেখতে চাইলেও হায়া অবাধ্য মনকে কঠোরভাবে শাসিয়ে দমিয়ে রাখছে। বাড়ির সকলেই তার হাতে হাতে সাহায্য করছে কিন্তু ঐ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নিলেই হায়া এড়িয়ে যাচ্ছে। হানিয়া মেয়ের অযাচিত সিদ্ধান্তে রাগারাগি করে নিজের প্রেশার বাড়িয়ে বর্তমানে স্বামীর তত্তাবধানে রেস্ট নিচ্ছে বেডরুমে।
___________________________
অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ গরমটা একটু বেশিই পরেছে। সূর্য মামা তার সমস্ত তেজ যেন আজ সরাসরি পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়েছে। বাতাসে নেই এক চিলতে শান্তি, ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর, ক্লান্ত করে তুলছে ক্ষণে ক্ষণে।
বাগানে জাহান-জায়িনদের জন্য স্টেজ সাজানো হচ্ছে, সেখানেই দাড়িয়ে সবকিছুর তদারকি করছে।প্রচন্ড তেষ্টায় হায়ার বুক শুঁকিয়ে কাঠকাঠ হয়ে গিয়েছে। তার উপর অতিরিক্ত গরম পরায় মাথা ঘুরচ্ছে হায়ার। কাল রাতে খায়নি সে, আজ সকালে কি থেকে কি খেলো তার নিজেরই মনে নেই। শরীর দূর্বল লাগছে। স্টেজ সাজানোর লোকগুলো ভালো করে সবটা বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে যায় তার। মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলে একটা পুরুষালি হাত এসে তাঁকে ধরে ফেলে।
হায়া কোন মতো নিজেকে সামলে পুরুষ টির দিকে তাকালে দেখতে পায় ব্যক্তিটি আর কেউ না তার শ্বশুর মশাই, তার দ্বিতীয় বাবা। আবরার চিন্তিত গলায় বলে–
—কি হয়েছে মামুনি? বেশি খারাপ লাগছে? চলো বাসায় চলো তো। এত গরমে তোমায় কে বলেছে এখানে দাড়িয়ে থাকতে?
হায়া তার কথার উত্তরে শুধু এইটুকুই বলে–
—আমি ঠিক আছি বাবাই।
—তা তো দেখতেই পারছি। চলো বাসার ভেতরে চলো রেস্ট নিবে কিছুক্ষণ।
হায়া বিনা বাক্য ব্যয়ে আবরারের সাথে বাসার ভেতরে এসে পড়ে। আবরার তাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে কিচেনের দিকে চলে যায়, যেখানে আপতত তার সহধর্মিণী আছেন।
আবরার কিচেনে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরেই স্পর্শ এক গ্লাস শরবত আর আবরার এক প্লেট খাবার নিয়ে হায়ার কাছে ফিরে আসে। স্পর্শ হায়ার কাছে এসেই তার পাশে বসে অস্থিরভাবে হায়ার শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করতে থাকে–
—তোর কি বেশি খারাপ লাগছে রে মা? তোরে এত করে বললাম এই কড়া রোদের মধ্যে বাহিরে এতক্ষণ থাকিস না তুই শুনলি না। নে এই শরবতটা একটু খা ভালো লাগবে।
স্পর্শ হায়ার জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে এনেছে। অতিরিক্ত গরমে ও খাওয়ায় অনিয়ম হওয়ার জন্য হায়ার প্রেশার ফল করেছে। হায়া অর্ধেকটা শরবত খেয়ে রেখে দেয়। স্পর্শ আবরারের হাত থেকে খাবারের প্লেট টা হাতে নিয়ে হায়ার সামনে এক লোকমা খাবার ধরে। হায়া তাঁকে বলে–
—মাম্মাম একটু আগে না ব্রেকফাস্ট করলাম, এখন আবার খাবার কেনো? আমার পেটে একটুও জায়গা নেই গো।
স্পর্শ চোখ গরম করে বলে–
—ঠাটিয়ে লাগাব এক থাপ্পড় তারপর ঠিকই জায়গা হয়ে যাবে। ঐটাকে খাওয়া বলে? দুই লোকমা ঠিক করে খেয়েছিস নাকি বলা মুশকিল। চুপচাপ খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে শাওয়ারে যাবি। আমার কথার এদিকে ওদিক হলে কিন্তু তুই আমার জল্লাদ শ্বাশুড়ির রূপ দেখবি বলে দিলাম।
স্পর্শ কথায় হায়া ভয় তো মোটেই পায় না বরং আরো মজা পায়। সে একটু নাটক করে ভীতু গলায় আবরারকে বলে–
—বাবাই, তোমার বউয়ের মধ্যে আজ জল্লাদ শ্বাশুড়ির ভুত চেপেছে। আমায় বাঁচাও বাবাই, নাহলে এই নারী আজ আমায় খাবারের নিচে চেপে মেরে ফেলবে। আমার ভীষণ ভয় করছে তাঁকে দেখে।
কথাটা শেষ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড সব শান্ত থাকে হুট করেই হায়া আর আবরার হাহা করে উচ্চস্বরে হেঁসে দেয়। তাদের হাসির মানে স্পর্শ প্রথমে বুঝতে না পারলেও খানিক পরেই বুঝতে পারে যে, হায়া আর আবরার তার খিল্লি উড়াচ্ছে। স্পর্শ রেগেমেগে হায়াকে কিছু বলতে নিলে হায়া তাকে হঠাৎই জড়িয়ে ধরে তার এক গালে জোরেসোরে একটা পাপ্পি দেয়। তারপর আদুরে গলায় বলে–
—এই শাশুমা, খবরদার আমার মাম্মাম থেকে শাশুড়ি হতে চেয়েছ তো। তোমার নামে কেস ঠুকে দিবো আমি। তুমি আমার মাম্মাম, মাম্মামই থাকবে সারাজীবন।
—তা তো থাকবই, কিন্তু আমার কথা না শুনলে আমি জল্লাদ শ্বাশুড়ির হয়ে যাবো বলে দিলাম। আর এখন ছাড় আমায়, খাবারটা মুখে নে।
হায়া স্পর্শকে ছেড়ে সোফায় পা উঠিয়ে বাবু হয়ে বসে। স্পর্শ তাকে খাবার খাইয়ে দিতে থাকে আর টুকটাক গল্প করতে থাকে। আবরারও তাদের সঙ্গ দেয়।খাবার শেষ করে হায়া উপরে যেতে নিলে আবরার তাকে কিছুক্ষণের জন্য বসতে বলে। হায়া বসে পড়লে আবরার আগের জায়গা ছেড়ে হায়ার পাশে এসে বসে।
হায়ার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে ধরা গলায় বলে–
—আই এম সরি মামনি।
আবরারের সরি বলায় হায়ার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে। সে ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলে–
—কিসের জন্য সরি বলছো বাবাই?
—কালকের থাপ্পড়ের জন্য মা। আমার তোমায় মারার কোন ইনটেনশন ছিলো না। তাও….
আবরারের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই হায়া মুখ চোখ আরো কুঁচকে নিয়ে বলে–
—উফফফফো বাবাই! তুমি এর জন্য এখনও গিল্টি ফিল করছো? আরে বাবা, আমি জানি তো তুমি ইচ্ছে করে মারো নি। আমিই তো যেচে তোমার আর উনার মাঝে চলে এসেছিলাম। আর ধরলাম ইচ্ছে করেই মেরেছ, তাতে কি হয়েছে? বাবারা কি সন্তানদের শাসন করে না? এতে সরি বলার কি আছে? তুমিও বাচ্চাদের মতো কথা বলো বাবাই।
হায়ার কথা শুনে আবরারের মন থেকে অপরাধবোধ টা সরে যায়। আবরার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–
—তুমি তো মা ভালোই বুঝদার। তাহলে একটা কথা বলি। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো।
আবরারের কথা শুনে হায়ার মুখের হাসিটা সরে যায়। সে কিছুটা বুঝতে পারছে আবরার কি নিয়ে কথা বলতে চাইছে। সে ঐ বিষয়ে কিছু শুনতে চাইছে না কিন্তু শ্বশুর + ফুপার কথা না শুনে উঠে যাওয়া বেয়াদবির মধ্যে পড়ে তার হায়া মুখটা গম্ভীর করে বসে থাকে আবরারের কথা শোনার জন্য।
আবরার তাকে বলে–
—আমি জানি আশিয়ান যা করেছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি এবং সেটা অন্যায়ের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মা রে, মানুষ মাত্রই ভুল। কোন মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। আশিয়ান একটা ভুল করে ফেলেছে তুমি তাকে শাস্তি দাও, যেমনটা আমি কাল দিয়েছি। কিন্তু ডিভোর্সের চিন্তা মাথায় এনো না মা। তুমি নিজেও জানো আশিয়ান তোমাকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে। এখন তুমি যদি পূর্বের একটা ভুলের রেশ ধরে তোমাদের এই সুন্দর সম্পর্কটাকে মৃত্যুদান করো তাহলে সেটার জেরে আরো কতগুলো সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে তুমি বুঝতেও পারছ না। তোমার মাকেই দেখো না, তোমার এমন সিদ্ধান্তের কথা শুনে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছে। তোমার বাবাও চিন্তিত। আমরা দু’জন যে চিন্তা মুক্ত তাও কিন্তু না। তোমাদের দু’জনকে কেন্দ্র করে আমরা সবাই চিন্তিত, অস্থিরতা ভুগছি। ছেলে-মেয়ে যখন সুখী থাকে, তাদের সুখ দেখে বাবা-মায়েরাও সুখ অনুভব করে। আমার ছেলেটা কাল ঐ রাতে বের হয়ে কোথায় গিয়েছে সেটা আমি একটু আগে খবর পেয়েছি। কাল সে বাড়িতে থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমি আফিফকে পাঠায় তার পেছনে। আফিফ তার বেস্টফ্রেন্ড হওয়ার কারণে সে জানে আশিয়ানের মন খারাপ হলে কোথায় যেতে পারে। কাল সারারাত দুটোতে একসাথেই ছিল। আফিফ আমায় বলেছে, আশিয়ান নাকি কাল সারারাত পাগলামি করেছে তোমার এমন সিদ্ধান্ত শুনে। একটা বার ভাবো, তুমি তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছ শুধু তাতেই এত পাগলামি। যদি কথাটা সত্যিই ফলে যায় তাহলে আমার ছেলেটার কি হবে? একবার ভাবো শুধু।
আবরার কিছুটা সময়ের জন্য থামে। তার চোখ জোড়া অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে গিয়েছে। সেই সাথে স্পর্শ আর হায়ারও। খানিক বাদে আবার আবার বলতে শুরু করে–
—একটা কথা বলো তো, তুমি কি পারবে আশিয়ানকে ছাড়া ভালো থাকতে?
হায়া আবরারের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর তার ফোঁপানোর আওয়াজ পাওয়া যায়। আবরার তার ফোঁপানোর আওয়াজ শুনে নিঃশব্দে হেঁসে দেয়। তারপর বলে–
—তুমি নিজেও যে ভালো থাকবে না সে তুমিও জানো। শুধু শুধু তাহলে বিচ্ছেদের মতো কঠিম শাস্তি নিজেদের উপর নিচ্ছো কেনো? বিচ্ছেদ কি এতই সহজ? বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন কতটা ভয়াবহ তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তাই বাবা হিসেবে একটা পরামর্শ দিচ্ছি, রাগ করো, অভিমান করো। শাস্তির নামে নাকানিচুবানি খাওয়াও কোন সমস্যা নেই। সবটাতে আমাকে অন্তত তোমার পাশে পাবে কিন্তু ডিভোর্সের মতো ভাবনা ভুলেও মস্তিস্কে এনো না। বুঝেছ আমার কথা?
হায়া মাথা নাড়িয়ে আবরারের কথায় সম্মতি জানায়। সে সত্যিই বুঝতে পেরেছে, বিচ্ছেদ কোন সমাধান না। আসলে কাল ফারাবি তার কাছে আশিয়ানের নামে অনেক নেগেটিভ কথা বলেছিল। সবচেয়ে বড় কথাটা ছিল, আশিয়ান নাকি হায়া’র সুখে থাকা দেখতে পারে না। আশিয়ান বিদেশে যাওয়ার পরে হায়ার ভেঙে পরা দেখে নাকি খুশি হতো। যখন আশিয়ান দেখল, হায়া তাকে ভুলে ফারাবির সাথে নতুন করে সবটা শুরু করতে চাইছিল তখনই আশিয়ান বাংলাদেশে ফিরে আসে হায়ার সুখে হস্তক্ষেপ করার জন্য। হায়াকে পুনরায় সমাজের সামনে লাঞ্চিত, অপমানিত করার জন্য আশিয়ান ফারাবির সাথে হায়ার বিয়েটা হতে দেয়নি।
এমনই আরে ভুজুংভাজুং কথা বলে হায়াকে আশিয়ানের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। ফারাবি যেহেতু ডাক্তার তাই সে মানুষের সাইকোলজি খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারত। হায়ার সাইকোলজি ধরা তার দুই মিনিটের ব্যাপার ছিল। এছাড়া সে আগের থেকেই হায়া আর আশিয়ানের বিষয়টা সব জানত বলে হায়াকে প্রভোক করতে বেশি সময় লাগে না।
শব্দসংখ্যা~১৪১৪
চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৭
[রোমান্টিক এলার্ট⚠️]
রুমে চিন্তিত হয়ে বসে আছে রাহা। কাল রাত এগারোটায় আফিফ বের হয়ে গিয়েছে বাসা থেকে আজ সকাল এগারোটা পেরিয়ে একটা বাজতে চলল, কিন্তু তাও তার কোন খবর নেই। ফোনটাও বন্ধ বলছে। রাতে শুধু একবার ফোন দিয়ে বলেছিল আজ ফিরবে না। ব্যস, তারপর আর কোন খবর নেই।
হঠাৎই রাহার নিজেকে আর পাঁচটা সাধারণ বউয়ের মতো মনে হচ্ছে, যার স্বামী কিনা রাতে বাড়ি না ফেরায় ভীষণ চিন্তিত। রাহার অবচেতন মন বলে উঠে–
—আচ্ছা, সেসব বউয়েরা তো তাদের স্বামীকে ভালোবাসে বলে এত চিন্তা করে। তাহলে আমিও কি ডাক্তার সাহেবকে ভালোবেসে ফেলেছি? এত তাড়াতাড়ি একজনকে ভুলে আরেকজনকে ভালোবাসা যায়?
সে জানে না কেন, আজ এই দিনে, পৃথিবীর এত কোলাহলের মাঝেও তার বুকের ভিতরটায় একটা নিঃশব্দ ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পা দুটো বিছানার কিনারায় ঝুলে আছে, কিন্তু মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে শতবার দেখেছে যদি কোনো কল, কোনো মেসেজ আসে। কিন্তু না, কিছুই আসে না।
রাহা নিঃশব্দে ফিসফিস করে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে—
—সেইসব মেয়েরা তো চোখে চোখ রেখে “ভালোবাসি” বলেছিল, তারপর হয়তো চিন্তায় কেঁদেছে। আমি তো কখনো বলিনি… তাও কেন এভাবে কষ্ট হচ্ছে?
হঠাৎই তার বুকটা ব্যথা করে ওঠে। মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। একফোঁটা নয়, দু’ফোঁটা নয়… একরাশ অজানা অশ্রু তার গাল বেয়ে ঝরে পড়ে।
—এটা যদি ভালোবাসা না হয়, তাহলে কি?
কেন আমি বারবার দরজার দিকে তাকাই? কেন এই নিঃশ্বাসগুলো এত ভারি লাগছে?ডাক্তার সাহেব… আপনি কেন ফিরছেন না?
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। নিজের ওপর রাগ হয়, লজ্জা হয়, আবার একরাশ অভিমানও জেগে ওঠে।
—আমি কি এতটাই দুর্বল? এত তাড়াতাড়ি একটা মানুষকে ভুলে, আরেকজনের জন্য কাঁদছি কেন?
নাকি ভালোবাসা ঠিক সময় দেখে আসে না, সে তো হঠাৎই এসে বসে পড়ে বুকের এক কোণে? তাহলে কি জাহানের প্রতি আমার কোন ভালোবাসাই ছিল না? যা ছিলয় তা শুধুই জেদ?
রাহা জানে না, উত্তরগুলো কোথায় লুকিয়ে আছে। শুধু জানে, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আগমন করা সেই পুরুষটির সাথে সে নিজেকে এমন বাজে ভাবে জড়িয়ে ফেলেছে, যাকে ছাড়া রাহা এখন নিজেকে একদণ্ড একা ভাবতেও পারে না। যখনই ভাবতে চায় তখনই তার বুক প্রচন্ডভাবে কেঁপে উঠে।
রাহা যখন আফিফকে নিয়ে তার কল্পনার রাজ্যে বিভোর, ঠিক তখনই ক্লান্ত পায়ে দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করে আফিফ। খটরমটর আওয়াজে রাহার ধ্যান ভঙ্গ হলে সে দরজার দিকে তাকায়। বহুল কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখে রাহা এতক্ষণ ধরে করা সব দুশ্চিন্তা কোথায় যে পালিয়ে যায় রাহা নিজেও জানে না। হুট করে রাহা বসা থেকে দাঁড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে আফিফের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আকস্মিকতায় আফিফ নিজের ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। বিষয়টা বুঝতে তার বেশ কতক্ষণ সময় লাগে। কিন্তু যখনই বুঝতে পারে তখনই তার বিস্ময়ের শেষ থাকে না। রাহা আফিফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, কেন কাঁদছে সে নিজেও জানে না। তার মনে হয়েছে বুকের ভেতর চাপা পড়া ভারী দীর্ঘশ্বাস গুলো মুক্ত করে দেওয়ার এটাই একটা পন্থা, তাই সে কাঁদছে।
আফিফ রাহার ফোঁপানোর আওয়াজ শুনে বিচলিত হয়ে পড়ে। কেউ কি তাকে কিছু বলেছে? নাহলে কাঁদছে কেন? আর কেই বা কিছু বলবে? বাসায় তো তারা হাতে গোনা চারজন মানুষ। তাহলে তার মায়ের সাথে কি কিছু হয়েছে?
আফিফ নিজের ভাবনা চিন্তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে ইতস্তত ভাবে রাহার মাথায় হাত রাখে। আস্তে আস্তে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত করতে চায়। রাহা কিছুটা শান্ত হয়ে আসলে আফিফ তাকে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে ময়নাপাখি? যেই চোখে সদা চঞ্চলতা খেলা করে সেই চোখে আজ বিষন্নতার অশ্রু কেনো?
এত আদুরে সম্বোধন আর কথা শুনে কার না ভালো লাগে। রাহা যেন আফিফের আলিঙ্গন আর সম্বোধনে আরেকটু প্রশ্রয় পায়। একটু শব্দ করে ফুপাতে থাকে। আফিফের চিন্তাগুলো এবার দুঃশ্চিতায় রূপ নেয়। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করে–
—কি হলো বলো? কেউ তোমায় কষ্ট দিয়ে কিছু বলেছে ? ওয়েট, আম্মু কি কিছু বলেছে তোমায়?
রাহা আফিফের বুকে মাথা রেখেই ডানে বায়ে মাথা নাড়ায়। তারমানে না, কেউ কিছু বলেনি তাঁকে। আফিফ আবারও জিজ্ঞেস করে–
—তাহলে কাঁদছ কেনো?
—আপনার জন্য।
সিক্ত গলায় উত্তর দেয় রাহা। আফিফ তার কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। তার জন্য রাহা কাঁদছে? কিন্তু কেনো? সে কি করল আবার যার জন্য মেয়েটা কাঁদছে?
—আমি আবার কি করলাম তোমায়?
—কি করেন নি বলেন।
হঠাৎই রাহা কান্না থামিয়ে দিয়ে ফুঁসে ওঠে। কোমড়ে দুই হাত রেখে রাগী গলায় বলে–
—অ্যাঁই, আপনি বাসায় ফিরেন নি কেনো হ্যা? আর আপনার ফোন বন্ধ কেন? চিন্তা লাগে না আমার? আপনি কি এখন একা যে যখন-তখন চলে যাবেন আর বাসায় ফেরার কোন তাড়া থাকবে না? আমায় কি মানুষ লাগে না আপনার হ্যা?
শেষের কথাটা বলতে বলতে রাহা আবারও কেঁদে দেয়। আফিফ তৎক্ষণাৎ তাকে নিজের বুকের আগলে নেয়। রাহা মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে কয়েক বার কিন্তু আফিফ তাকে ছাড়ে না। বরং সোফায় তাকে নিজের কোলে নিয়ে বসে পড়ে। তার মুখে ফুটে উঠেছে এক মনোমুগ্ধকর হাসি। রাহা তার জন্য চিন্তা করছিল। কথাটা মনে পড়তেই মনটা পুলকিত হয়ে উঠে। কেমন সুখ সুখ অনুভূতি হতে থাকে রাহাতের।
রাহাত মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বলে–
—আমি তো জানতাম না আমার জন্য কেউ এত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, তাহলে তো আরো আগে ফিরতাম সোনা। এই যে, এখন জেনে নিলাম। আজ থেকে আটটা বাজার সাথে সাথেই আমায় বাসায় পাবেন বেগম সাহেবা। এবার খুশি তো?
রাহার কান্না থেমে গিয়েছে ততক্ষণে। সে রাহাতের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে–
—হুম।
সেভাবেই তারা কিছুক্ষণ বসে থাকে। তাদের দু’জনের ধ্যান ভঙ্গ হয় দরজায় নক করার আওয়াজে। আফরা এসেছে। রাহা আফিফকে ছেড়ে উঠতে চাইলে আফিফ তাকে ছাড়ে না। জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। রাহা আফিফের শার্টের বোতাম খুঁচাতে খুঁচাতে মিনমিনে সুরে বলে–
—ছাড়ুন, আম্মু এসেছে।
আফিফ তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু ছাড়ার আগে রাহার কপালে নিজের উষ্ণ ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে তারপর ছাড়ে। রাহা বাধ্য মেয়ের মতো তা সাদরে গ্রহণ করে।কেনই বা করবে না। জীবনে যাকে সবচেয়ে বেশি চাইল তার ভালোবাসা তো পেলো না। এখন ওপরওয়ালা তার নামে যাকে লিখে দিল তার ভালোবাসা কোন সাহসে সে অগ্রাহ্য করবে? সে একদমই এমনটা করবে না। বরং লাগলে আরো চেয়ে চেয়ে নিবে। তার পূর্ণ হক আছে ভাই, হুহ্।
রাহা দরজা খুলে দিলে আফরা রুমে প্রবেশ করে। মা-ছেলে টুকটাক কথা বলার পর, হুট করে আফরা আফিফকে বলে–
—আজকের পার্টিতে যাবি না তোরা?
কথাটা বলে আফরা নিজেই থমকে যায়। সে অনুধাবন করতে পারে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। সবকিছু জানার পরও রাহার সামনে এই কথা উঠানোতে নিজের উপরই নিজের রাগ হয় আফরার।
আফিফ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য তাড়াতাড়ি করে বলে–
—না আম্মু যাবো না। আজ আমরা দুই জন একটু বাহিরে যাবো। এখন আমি একটু ঘুমাব, কাল ঘুমাইনি সারারাত।
আফরাও আফিফের কথা শুনে চলে আসতে নিলে রাহা তাকে পেছন ডেকে উঠে। আফরা তাদের দিকে তাকালে রাহা স্বাভাবিক ভাবে বলে–
—আমরা যাবো পার্টি আম্মু। তুমি গিয়ে রেস্ট নাও। সবাই একসাথে রওনা হবো পার্টিতে যাওয়ার জন্য।
—আমি বললাম তো আজ আমরা দু’জন বের হবো।
রাহা আফিফকে মেকি ধমক দিয়ে বলে–
—মাথা ঠিক আছে আপনার? আপনার বোনের রিসেপশন পার্টি আর আপনিই কিনা যাবেন না। মেয়েটার মন খারাপ হবে না আপনাকে না দেখতে পেলে? আমি একবার বলেছি যখন যাবো তখন যাচ্ছি আমরা। আর কোন কথা না। আপনি ফ্রেশ হতে যান আমি ততক্ষণে আপনার খাবার নিয়ে আসছি। (আফরার কাছে এসে তার হাত ধরে হাটতে হাঁটতে বলে) চলো তো, বেশি কথা বলে তোমার ছেলে। শুরুতে শুরুতে এমন চুপচাপ থাকত আমি ভাবতাম ছেলেটা কথা বলতে পারে না নাকি। এখন দেখি কথা বলার উপর পিএইচডি করে রেখেছে।
আফিফ আর আফরা দুইজনই রাহার কথা শুনে হেঁসে দেয়। রাহারা চোখের আড়াল হতেই আফিফ জামাকাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়।
___________________________
শ্বশুরের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে আসে হায়া। ক্লান্তি যেন তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জমে বসে আছে। কাল রাতটা চোখের পলক ফেলেনি সে একটিবারের জন্যও নয়। তার শরীরের এক দুর্বল দিক হলো, ঘুম না হলে সে খুব সহজেই ভেঙে পড়ে। মাথা ঝিমঝিম করে, দৃষ্টিও কেমন অস্পষ্ট হয়ে যায়।
নিঃশব্দে দরজাটা লক করে হায়া রিমোট হাতে নেয়, এসি চালু করে। তারপর ভারী পায়ের নিচে গালিচার নরম ছোঁয়া টের পেতে পেতে ধপ করে বিছানায় পড়ে যায়। চোখদুটো যেন অপেক্ষায় ছিল একটুখানি আরামের। মিনিট খানেকের মধ্যেই হায়া ঘুমের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়, সমস্ত ক্লান্তি আর অস্থিরতা পেছনে ফেলে।
ঘুমের গভীরতায় নিমগ্ন হায়া হঠাৎ টের পায় এক অতি চেনা, অতি আপন স্পর্শ তার মুখশ্রী ছুঁয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে আলতোভাবে, কিন্তু উত্তপ্ত এক উন্মাদনায়। কখনও তার ললাটে, কখনও চিবুকে, থুঁতনিতে, চোখের পাতায় এবং সবশেষে থেমে থাকে তার ওষ্ঠে। যেন প্রতিটা ছোঁয়া কোনো নিঃশব্দ আকুলতার ভাষা, অন্তহীন কামনার এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।
অস্বস্তিতে হায়ার নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে। ঘুমের ভেতরেও বিরক্তি ও অজানা আতঙ্কে সে ব্যক্তিটির ওষ্ঠে জোরে কামড়ে ধরে, যেন ব্যথায় সে সরে যায়। কিন্তু না, ব্যক্তিটি যেন আরও উন্মাদ হয়ে ওঠে হায়ার প্রতিরোধেই। তার দখলদারি আরও প্রবল, আরও নির্ভীক।
হায়ার শরীর জেগে উঠলেও মস্তিস্ক এখনো ঘুমের ঘোরে, চোখ মেলে তাকানো যেন এক দুঃসহ শাস্তি তার জন্য। তবুও সে কোনো মতে নিজের ওষ্ঠ ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় একপাশে, সেই পুরুষটির ঠোঁট থেকে নিজেকে আড়াল করতে চায়। এই সরল প্রত্যাখ্যানেই পুরুষটি আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মন যে এখনও অভিমানী, কাল যা করেছে হায়া, তাতেই কি কম কষ্ট পেয়েছে সে? আজ কাছে টানতে গেল, তাতেও তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
পুরুষটির রাগের উষ্ণতা ছুঁয়ে যায় হায়ার কাঁধে। পুরুষটির ধারালো দাঁতের এক প্রবল চাপ, যেন সে বুঝিয়ে দিতে চায় নিজের মালিকানা। ব্যথায় ছটফট করে ওঠে হায়া তখনও ঘুম আর বাস্তবতার মাঝামাঝি এক বিভ্রান্তকর অবস্থায় আঁটকে যায়। মুক্তি চায় সে, সেই অসহনীয় যন্ত্রণার ছায়া থেকে। কিন্তু মুক্তি কি এত সহজে মেলে? পুরুষটি তো তাকে ছাড়ার জন্য নয়, তাকে নিজের করে তোলার জন্যই ফিরে এসেছে।
হায়া ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলে পুরুষ টির বোধহয় একটু মায়া হয়। সে হায়ার কাঁধ থেকে মুখ সরিয়ে তার কানের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে, গম্ভীর পুরুষালি গলায় হিসহিসিয়ে বলে–
—লাগলে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিবো কিন্তু তাও তোকে আমার থেকে আলাদা হতে দিবো না। এই এক জনমে তুই শুধু আমার, আমার পারসোনাল প্রপার্টি।
হায়া সবটাই শুনে কিন্তু কোন প্রতিত্তোর করে না। গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। অন্যদিকে পুরুষটিও তার বউয়ের অসুস্থতার কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আর জ্বালায় না। সেও ভদ্রলোকের মতো বউয়ের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে। হায়াও অভ্যাসবসত তার ব্যক্তিগত পুরুষ টিকে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে।
____________________
হায়ার ঘুম ভাঙে বিকেল চার টায়। চোখ বন্ধ রেখেই সে অনুভব করে তার বুকের উপরটা হালকা। আশেপাশে হাতড়ে যখন কাউকে পায় না তখন ফট করে চোখ খুলে ফেলে। তার স্পষ্ট মনে আছে কেউ তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আদরের নামে কিছু বেদনাদায়ক আঘাত করল। শাসাল, তার বুকের উপর পূর্ণ অধিকার নিয়ে ঘুমাল। কিন্তু এখন নেই। কেনো নেই সেটা বুঝে উঠতে পারছে না হায়া। নাকি সবটাই তার ঘুমের ঘোরে দেখা এক সুখকর স্বপ্ন? স্বপ্নও নুঝি এত বাস্তব হয়?
হায়া কি মনে করে ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাড়ায়। কাধের থেকে কিছুটা জামা সরিয়ে সেদিকটায় দৃষ্টি নিবন্ধন করে। নিমিষেই ঠোঁটের কোণায় স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সেখানে জ্বলজ্বল করতে থাকা দুটো লাল লাল দাগ তাকে বলে দিচ্ছে, সে স্বপ্নে সেই স্পর্শ গুলো অনুভব করেনি। বরংচ ব্যক্তিটি বাস্তবেই এসে এসব করে গিয়েছে।
আয়নার প্রতিফলন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে গিয়েই হায়ার চোখ আটকে যায় এক কোণে রাখা শপিং ব্যাগে। কৌতূহল ভরেই এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা খুলে দেখে—ভেতরে রয়েল ব্লু রঙের এক মনমুগ্ধকর কাতান শাড়ি। পাড়জুড়ে সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ, যেন রাজকীয়তার প্রতীক হয়ে তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
শাড়িটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হায়া কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন শাড়ি যেন গল্পের রাজকন্যাদের জন্যই বরাদ্দ থাকে। হাত বোলাতে বোলাতে সে আবিষ্কার করে, শাড়ির নিচে একটা ছোট্ট চিরকুট গোঁজা ছিল। নিঃশ্বাস আটকে খুলে পড়ে চিরকুটটা।
সেই চিরকুটে স্পষ্ট, দৃঢ় এক হস্তাক্ষরে লেখা—
“এই শাড়ি বাদে যদি অন্য কোনো বস্ত্র তোমার অঙ্গে দেখি, তাহলে পরবর্তীতে আমি নিজ হাতে এই শাড়িটাই তোমায় পরাবো।
And I mean it, Mrs. Ashiyan Mirza.”
চিরকুটের শেষ লাইনে ‘Mrs. Ashiyan Mirza’ সম্বোধনে যেন হায়ার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে। এক অদৃশ্য অথচ অমোঘ দাবি—একবার যে সম্পর্কের বন্ধনে তারা বাঁধা পড়েছে, তা ছিন্ন করার অধিকার যেন কারও নেই। আশিয়ান যেন চোখে আঙুল দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই জন্মে নয়, কোনো জন্মেই সে হায়াকে ছাড়বে না।
চিরকুট টা পড়া শেষ হলে হায়া একটা ভেঙচি মারে। বিরবিরিয়ে বলতে থাকে–
—পরবো না তোর দেওয়া শাড়ি শয়তান চার চোখা মাস্টার।
হায়া মুখে তো বলে এক কথা কিন্তু কাজ করে উল্টো টা। শাড়ির সাথে দেওয়া ব্লাউজ আর পেটিকোট নিয়ে চলে যায় ওয়াশরুমে শাওয়ার নিতে।
____________________________
বাবার পরপর দেওয়া ফোন কলে হায়াকে চিন্তিত করে তুলে। সে পুষ্পে সজিত রুমটাকে আরেকবার পর্যবেক্ষণ করে সেটা থেকে বের হয়ে আসে। কলটা রিসিভ করে কানে লাগিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে থাকে–
—হ্যাঁ, পাপা বলো।
—তুমি কোথা মামুনি? পার্টি তো শুরু হয়েছে সেই কখন। সবাই তোমার কথা জিজ্ঞেস করে চলছে।
—পাপা একটু বিজি ছিলাম আমি আসছি দুই মিনিটে।
হায়া কল কেটে নিচে গার্ডেনের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়, যেখানে আপতত পার্টি চলছে। সে এতক্ষণ লাগিয়ে তার ভাইদের বাসর ঘর সাজালো।
____________________________
অন্ধকার রুম টিতে একটি পুরুষ হায়ার স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো ছুঁইয়ে দিচ্ছে তার হাত দ্বারা, সেই সাথে উন্মাদের মতো কাঁধে, গলায় ঠোঁটের স্পর্শ গুলো তো রয়েছেই। হায়ার অনেক চেষ্টা করেও লোকটির থেকে ছাড়া পাচ্ছে না। পুরুষ টির শরীর থেকে আসা হালকা স্মেলটা তার পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে কিন্তু সঠিকভাবে ঠাহর করতে পারছে না।
হায়া বহু কষ্টে নিজের শরীরের সব শক্তি কাজে লাগিয়ে পুরুষটিকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। চিলেকোঠার রুমটি তার অতিপরিচিত হওয়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারেও হাতড়াতে হাতড়াতে লাইটের সুইচ পেয়ে যায়। সুইচে চাপ দিতেই পুরো রুম আলোকিত হয়ে যায়। হায়া তাড়াতাড়ি করে পেছনে ঘুরে তাকে স্পর্শ করা পুরুষটিকে দেখার জন্য।
লোকটিকে দেখে হায়া হতভম্ব, স্তব্ধ হয়ে যায়। তার অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়–
—এ কি আপনি?
শব্দসংখ্যা~২০৪৪
~চলবে?
#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৮
[১৮+ এলার্ট। পর্বটি প্রাপ্তমনস্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত]
হায়া স্টেজের সামনে এসে দাঁড়াতেই জাভিয়ান উঠে গিয়ে স্টেজে পা রাখলেন। একহাতে মাইক তুলে নিয়ে হাসিমুখে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন—
—লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান,
আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আমার ছেলেদের রিসেপশন পার্টিতে এসে আমাদের আনন্দের অংশীদার হওয়ার জন্য। আপনারা দোয়া করবেন, যেন তারা চারজন ভবিষ্যতে সুখ, শান্তি ও ভালোবাসায় ভরপুর একটি জীবন গড়তে পারে।
আর এই বিশেষ সন্ধ্যার শুরুটা হতে যাচ্ছে এক অসাধারণ পরিবেশনার মাধ্যমে। পারফর্ম করবে আমার আদরের প্রিন্সেস, আমার মেয়ে জেসমিন তালুকদার হায়া এবং তার স্বামী, আমার প্রিয় ভাগ্নে আশিয়ান মির্জা।
আলোকিত এই ফ্লোর এখন তোমাদের অপেক্ষায়, প্রিন্সেস আর আশিয়ান। চলে এসো তোমরা।
হায়া তার বাবার এমন এনাউন্সমেন্ট শুনে ভীমড়ি খাওয়ার জোগাড় হয়। হ্যাঁ, সে ডান্স পারফর্মেন্স করতে চেয়েছিল আশিয়ানের সাথে কিন্তু মাঝের ঝামেলা টার কারণে কোন প্রাকটিসই করা হয়নি। এখন সে বিনা প্রেকটিসে নাচতে গেলে মান সম্মান খুইয়ে আসবে এটা সিউর। এসব ভাবতে ভাবতেই তার ঘাম ছুটে যায়। হঠাৎই একটি শক্তপোক্ত হাত তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। হায়া ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যক্তিটির দিকে তাকালে দেখতে পায়, ব্যক্তিটি আর কেউ না তার বর দ্যা গ্রেট আশিয়ান মির্জা।
হায়া আশিয়ানের দিকে ভালো করে খেয়াল করে দেখে, আশিয়ান তার সাথে ম্যাচিং করে রয়েল ব্লু কালারের পাঞ্জাবি পরেছে। পাঞ্জাবির হাতা গুলো কনুইয়ের কাছাকাছি গোটানো যার কারণে পুরুষালি হাতের পশমগুলো সবই উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে। বাম হাতের কব্জিতে দামী রোলেক্সে ব্রান্ডের ঘড়ি। চোখ ধাঁধানো হ্যান্ডসাম লাগছে আশিয়ানকে। হায়া আশিয়ানের এমন রূপ দেখে কয়েকটা ফাঁকা ঢোক গিলে নেয়।
হায়া ও আশিয়ান স্টেজে উঠে আসতেই “Main agar kahoon” গানটা বাজতে থাকে। আশিয়ান নিজের ইশারায় হায়াকে মুভ করাতে থাকে। হায়া কয়েক জায়গায় মিসব্যালেন্স হয়ে গেলেও আশিয়ান তাকে সামলে নেয়। ডান্স করতে করতে হায়া একটা ঘোরে চলে যায়। তার সেই ঘোর কাটে উপস্থিত সকলের করতালিতে।
একে একে নিউ কাপলরাও ডান্স করে। হায়া তার বাবা-মা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, আদিবার পরিবার সকলকে টেনে স্টেজে নিয়ে এসে নাচ করায়। খুবই সুন্দর ভাবে সময়টা কাটায় সকলে। প্রোগ্রাম শেষ হয় রাত এগারোটায়। হায়া অবশ্য তার ভাইদের বউদেরকে সাড়ে দশটার দিকেই নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলো গিয়েছে। তার প্ল্যান বিয়ের দিন এত ঝুট-ঝামেলার মাঝে দরজা আটকিয়ে টাকা নিতে পারেনি কিন্তু আজ সে নিবেই নিবে। বিয়ের সময় তে এসবেই আসল মজা।
________________________
অতিথিদের বিদায় দিয়ে জাহান-জায়িনের ঘরে আসার সুযোগ হয় রাত সাড়ে বারোটায়। জাহান নিজের রুমের সামনে এসে বড়সড় একটা ঝটকা খায়। জায়িনও তাই। তাদের ঘরে পাশাপাশি হওয়ায় দুই ভাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। জায়িন অবাক হয়ে ভাইকে জিজ্ঞেস করে–
—ভাই আমি যা দেখছি তুমিও কি তাই দেখছো?
জাহানও একই সুরে বলে–
—তুই কি দেখছিস আমি জানি না। কিন্তু আমি আমার রুমের দরজায় ঐতিহাসিক আমলের একটা মস্ত বড় তালা ঝুলানো দেখছি।
—আমিও তো তাই দেখছি।
দু’ভাই একে অপরের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎই দু’জনে একসাথে প্রশ্ন করে উঠে–
—কিন্তু এই কাজটা করল কে?
তখনই পেছন থেকে একটা নারী কণ্ঠ বলে উঠে–
—আমি করেছি ব্রাদার্স।
জাহান-জায়িন পেছনে ঘুরে দেখে মেয়েটি আর কেউ না তাদের কলিজার টুকরা বোন হায়া। হায়া চাবির গোছাটা আঙুলে ঢুকিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে আবারও বলে–
—আমি এই মহান কাজটি সম্পাদন করেছি, হে আমার সহদরেরা!
—কিন্তু কেনো?
জাহান-জায়িন পূর্বের মতোই একসাথে প্রশ্ন করে উঠে। হায়া তার সবগুলো দাঁত দেখিয়ে বলে–
—টাকা নেওয়ার জন্য।
—টাকা? কিসের টাকা?
জাহান প্রশ্ন করে উঠে হায়াকে। হায়া বলে–
—তোমাদের বিয়ের দিন তো আমি তোমাদের বাসর ঘরের দরজা ধরতে পারি নি। কিন্তু আজ আবারও একটা সুযোগ পেয়েছি, সেটাকে কিভাবে হাতছাড়া করি বলো ভাইয়েরা আমার?
কথাটা বলে হায়া একটা বিটকেল মার্কা হাসি দেয়। তার কথা শুনে জাহান আর জায়িন তব্দা খেয়ে দাড়িয়ে থাকে। হায়া তাদের সম্মুখে এসে দাড়িয়ে হাত পেতে বলে–
—টাকা ছাড়ো আর চাবি নিজেদের নামে লিখিয়ে নাও
জাহান-জায়িন নিজেদের চমকানো ভাবটা সামলিয়ে নেয়। জাহান শান্ত গলায় প্রশ্ন করে–
—কত চাই তোর?
—তোমার থেকে দশ, ছোট’দা ভাইয়ের থেকে দশ দিলেই হবে।
জায়িন তার কথা শুনে বলে–
—ওহহ বিশ টাকা। বোনু, তুই এখন বাচ্চাই রয়ে গেলি। বিশ টাকার জন্য এমন দরজায় তালা লাগানো লাগে? ভাইয়ের কাছে বললে কি দিতাম না আমি? ভাই (জাহানকে উদ্দেশ্য করে বলে) তোমার টাও আমি দিচ্ছি, তোমার দেওয়া লাগবে না।
কথাটা শেষ করে জায়িন পকেট হাতড় দুইটা দশটা টাকার নোট বের করে হায়ার সেই পেতে রাখা হাতে দেয়। হায়া তার ছোট’দা ভাইয়ের কথা আর কাজ দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। সে চাইল বিশ হাজার তাকে দিচ্ছে বিশ টাকা। এই বিশ টাকায় একটা আইসক্রিমও তো খেতে পারবে না সে।
হায়া টাকা গুলো মুচড়িয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে–
—হোপ, আমি চেয়েছি বিশ হাজার টাকা আর তোমরা আমায় বিশ টাকা?
হায়ার কথা শুনে জায়িনের ডান হাতটা অটোমেটিক বুকের বাম পাশে চলে যায়। সে বুকের বাম পাশে খামচে ধরে জাহানের গায়ে কিছুটা হেলান দিয়ে বলে–
—ভাই গো আমারে ধরো!! এই মাইয়া কি কয়? বিশ হাজার টাকা চাচ্ছে। অ্যাঁই তুই বলত বিশ হাজারের কয়টা শূন্য দিতে হয়।
জায়িনের এমন কটাক্ষ পূর্ণ কথায় হায়ার রেগে যায়। সে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে যেতে বলে–
—থাক তোমাদের দেওয়া লাগবে না। নো মানি, নো হানি।
হায়াকে চলে যেতে দেখে দুই ভাইয়েরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। এই মেয়ে তাদের রুমের দরজা খুলে না দিলে আজ সারা রাতও রুমে যেতে পারবে। অথচ চজ তাদের জীবনের বিশেষ একটি রাত। দুই ভাই দৌড়ে গিয়ে হায়ার দুই হাত ধরে তাকে আটকায়। জায়িন অনুনয়ের মতো করে বলে–
—বোনু, বোনু তালা না খুলে কোথায় যাস? তালা খুলে যা।
—আজ তালা খুলবে না। আমি এটা দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি, ঢাকার শহরের টপ বিজনেসম্যান জাভিয়ান তালুকদারের ছেলেরা নাকি এমন কিপ্টামি করছে। আচ্ছা বেশ করো কিপ্টামি। আমি যাই।
জাহানও জায়িনের মতো অস্থির গলায় বলে–
—তুইও তো জাভিয়ান তালুকদারের মেয়ে। উপরন্তু তোর আবার বড়লোক জামাই আছে। আমাদের তো সেটাও নেই।
হায়া তাদের দু’জনের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে–
—এত কথা বলতে আর শুনতে পারব না। “টাকা দাও, চাবি নাও” এই বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করলাম।
জাহান-জায়িন বুঝতে পারে টাকা না দিলে আজ তারা রুমে যেতে পারবে না। অগ্যাত তাদের টাকাই ছাড়তে হয়। জাহানের ওয়ালেটে সব মিলিয়ে দেশ হাজার পেলেও জায়িন তার পকেট খুজে পাঁচ হাজার পায়। ওয়ালেট আপাতত তার কাছে নেই। জাহান টাকাটা দেওয়ার সাথে সাথেই হায়া তার রুমের চাবিটা জাহানের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু জায়িনকে দেয় না।
জায়িন কাঁদো কাঁদো গলায় বলে–
—বোনু বিশ্বাস কর ওয়ালেট টা আমার কাছে নেই থাকলে দিতাম। আপতত এই টাকাতেই মেনে যা না কলিজা আমার।
—নো, নেভার, কাবহি নেহি। ওয়ালেট এনে টাকা ছাড়ো বাকিটা।
জায়িন তার কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভাবে। তারপর হাতের ঘড়িটা একবার চেক করে বলে–
—ও হ্যাঁ মনে পরেছে। আমার ওয়ালেটটা ছাদের চিলেকোঠার ঘরে ফেলে এসেছি। তুই দাঁড়া আমি নিয়ে আসছি।
এই বলে জায়িন ছুট লাগাতে নেয় তখন হায়া তাঁকে থামিয়ে দেয়। জাহানের হাতে চাবিটা দিয়ে বলে–
—এটা তুমি রাখো বড়দা ভাই। আমি যাচ্ছি চিলেকোঠা থেকে ছোট’দা ভাইয়ের ওয়ালেট নিয়ে আসতে। আমি ছোট’দা ভাইয়ের ওয়ালেট পেলে তোমায় ফোন করব, তখন তুমি চাবিটা ছোট’দা ভাইয়ের হাতে তুলে দিবে। ঠিক আছে?
জাহান নিজের মনের শয়তানি লুকিয়ে বাহিরে ভোলাভালা একটা হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বোনের কথায় সম্মতি দেয়। হায়া চলে যায় চিলেকোঠার ঘরের উদ্দেশ্য। সে চোখের আড়াল হতেই জাহান স্বল্প আওয়াজে বলে উঠে–
—সারাজীবন আমাদের এমন জ্বালানোর জন্য তোর এই চটপটে স্বভাব যেনো সর্বদা বিরাজ থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেনো, তোকে দুনিয়ার সবচাইতে সুখী করুন কলিজা আমার।
—আমিন।
জাহান জায়িনের রুমের চাবিটা তার হাতে তুলে দেয়। দুইভাই তালা খুলে নিজেদের রুমে প্রবেশ করে। তারা হয়ত জানেই না তাদের জন্য আরো একটি চমক অপেক্ষা করছে।
_______________________________
এদিকে হায়া গুনগুন করতে করতে চিলেকোঠার ঘরে এসে উপস্থিত হয়। রুমের দরজাটা আগের থেকেই আধখোলা থাকায় ঢুকতে কোনপ্রকার বাঁধা পায় না সে। রুমে ঢুকেই সে নিজেকে মনে মনে ভয়ংকর কিছু গালি দেয়। নিজের ফোনটা না নিয়ে আসার জন্য গালি গুলো দিলো আরকি।
হঠাৎই সে অনুভব করে তার পেছনে কেউ একজন দাড়িয়ে আছে। সে পেছন ফিরবে তখনই একটা পুরুষালি উষ্ণ হাত তার শাড়ির ভাজে হাত ঢুকিয়ে উন্মুক্ত কোমড় জড়িয়ে ধরে আর অন্যহাত দিয়ে হায়ার ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে সেখান টায় ওষ্ঠের উষ্ণ আর্দ্র আদর দিতে থাকে। হায়া আঁতকে উঠে এমন কান্ডে। ছটফটিয়ে লোকটির থেকে দূরে সরে যেতে চায় কিন্তু পারে না। তার কোমড়ে থাকা লোকটির হাত শক্ত পোক্ত হয়ে জড়িয়ে আছে।
বেশকিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর হায়া কোন মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়। চিলেকোঠার রুমটি তার অতিপরিচিত হওয়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারেও হাতড়াতে হাতড়াতে লাইটের সুইচ পেয়ে যায়। সুইচে চাপ দিতেই পুরো রুম আলোকিত হয়ে যায়। হায়া তাড়াতাড়ি করে পেছনে ঘুরে তাকে স্পর্শ করা পুরুষটিকে দেখার জন্য।
লোকটিকে দেখে হায়া হতভম্ব, স্তব্ধ হয়ে যায়। তার অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়–
—আশিয়ান আপনি?
আশিয়ান হায়াকে দূরে সরে যেতে দেখে উদগ্রীব হয়ে বলে–
—হ্যাঁ সোনা আমি। দূরে গেলে কেনো? কাছে আসো। আজ আমাদেরও বাসর হবে তো। তাড়াতাড়ি আসো কাম ফাস্ট।
বিয়ের পাঁচ মাস পর বাসর? এ-ও শোনার বাকি ছিল হায়ার। হায়া ভ্রু কুঁচকে বলে–
—বিয়ের পাঁচ মাস পর কিসের বাসর? আর আমাদের মধ্যে তো সব হয়েই গিয়েছে।
—হয়েছে আজ আবার হবে। আর বাসর করতে বিয়ের দিনই লাগে নাকি। আজ জাহান-জায়িনের ফুলে সজ্জিত বাসরঘর দেখে আমারও বাসর করতে মন চাইছে, তাই তো দুই ঘণ্টার মাঝে এই রুমটাকে নিজ হাতে সাজিয়েছি। কাম ফাস্ট জান, রাত তো পার হয়ে গেলো বলে।
হায়ার মনে হলো তার মাথায় কেউ বাশ দিয়ে বারি মেরেছে। শালাদের বাসরঘর দেখে নিজেরও বাসর করতে চাইছে। হায়রে অসভ্য পুরুষ! এই অসভ্য পুরুষটিই তার কপালে লেখা ছিল শেষ পর্যন্ত?
হায়ার ভাবনার মাঝেই আশিয়ান তার অনেকটা কাছে এসে পড়ে। হায়া তা বুঝতে পেরে সরে যেতে চায় কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আশিয়ান হায়ার দিকে খানিকটা ঝুকে তার হাঁটুর পেছনে হাত দিয়ে ধরে তাকে কাঁধে উঠিয়ে বেডের দিকে হাঁটা দেয়। হায়া ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে কিন্তু আশিয়ান তাকে ছাড়ে একদম বেডের উপরে।
আকস্মিকভাবে পরে যাওয়ায় হায়া কোমড়ে একটু ব্যথা পায়। সে আর্তনাদ করে বলে উঠে–
—বাবা গো, এই জল্লাদ আজকেও আমার কোমড় ভেঙে দিল।
আশিয়ানের মনে পরে যায় তাদের বিয়ের দিনটার কথা। সেদিনও ভাবেই তো হায়াকে ভুল বসত কোল থেকে ফেলেছি। কিন্তু সেই দিনটা আর আজকের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
পাঞ্জাবিটা আশিয়ান অনেক আগেই খুলে রেখেছিল। চিলেকোঠার গুমোট বাতাস ও হায়াকে নিয়ে করা চিন্তার কারণে শরীর ঘেমে উঠেছিল। বউটা আসতে যেনো ইচ্ছে করে সময় নিচ্ছিল। বিরক্তি আর অধীরতা মিলিয়ে তার ধৈর্য ফুরিয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই।
গায়ে এখন শুধু একটা সেন্ডো গেঞ্জি, যা তার পেশীবহুল কাঁধ আর বুকের রেখাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরছিল। আর পাঞ্জাবির সাথে মিল রেখে সাদা পায়জামা পরেছিল সেটা। আশিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সেন্ডো গেঞ্জিটাকেও এক টানে খুলে ফেলে দেয় দূর। তারপর হঠাৎই লাফ দিয়ে উঠে পড়ে বিছানায়।
হায়া থমকে যায়, তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে অজান্তে। পরের মুহূর্তে নিজেকে খুঁজে পায় আশিয়ানের চার হাত-পায়ের মাঝখানে বন্দি অবস্থায়, ঠিক যেন শিকারকে কৌশলে আটকে রাখা কোনও গর্বিত বাঘ।
হায়ার চোখে কেবল বিস্ময় নয়, ছিলো একটা কাঁচা ভয় আর অজানা উত্তেজনা। সে দুই হাত বাড়িয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করে আশিয়ানকে, বুকের কাছে ঠেলে দিতে চায়। আশিয়ান তার প্রতিহত করার উপায় দেখে মৃদু হাসে। তারপর শক্ত, উষ্ণ আঙুল গলিয়ে দেয় হায়ার আঙুলের ভাঁজে এবং হাত দুটোকে বিছানার সাথে চেপে ধরে দৃঢ়ভাবে।
তাদের চোখাচোখি হয় মুহূর্তখানেক। আশিয়ানের চোখে ছিল দাবির ঝিলিক, আর হায়ার চোখে ছিল মৃদু কাঁপন এবং অনুভূতিদের ঝড়।
আশিয়ান তার মুখটা নিয়ে আসে হায়ার কানের খুব কাছে। তার গরম নিঃশ্বাস হায়ার কাঁধে পরতেই হায়া আরো একবার কেঁপে ওঠে। আশিয়ান এক দহনজাগানো হাস্কি সুরে বলে—
—তুমি যতই আমার থেকে দূরে যেতে চাইবে, আমি ততই প্রগাঢ়ভাবে তোমার নিঃশ্বাস, তোমার অস্তিত্বের সাথে মিশে যাবো। তুমি আমার জেদ, আমার পাপ, আমার বৈধ অধিকার।
কথাটা শেষ করে আশিয়ান সকালে যেই জায়গাটায় কামড় দিয়েছিল সেই জায়গাটায় প্রগাঢ় এক চুম্বন করে। আশিয়ান তাতেই শুধু থেমে থাকে না একের পর আদরে হায়াকে নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে আসে।
হায়ার শরীরটা এক মুহূর্তে কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে জানে এটা ভয় নয়। এটা সেই অনুভব, যা তাকে ভেঙে না দিয়ে গলে দিতে চায়। হায়ার এই গলে যাওয়াটাই আশিয়ানকে গভীর ভালোবাসার প্রমাণ।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে দুই মানব-মানবী নিজেদেরকে ভালোবাসতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হায়া সকল মান-অভিমান সাইডে রেখে ভালোবাসার মানুষটির ডাকে সারা দেয়। হায়া সুখকর বেদনায় ডুবে থেকেই আশিয়ানকে বলতে থাকে–
—আপনি খারাপ আশিয়ান। ভীষণ খারাপ।
অস্থির নিঃশ্বাস ফেলে আশিয়ান বলে উঠে–
—আমি খারাপ তাহলে ভালো কে? ঐ ফারাবী? যে কিনা তোমার বরকে কয়েকবার জানে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল?
আশিয়ানের কথার স্পন্দন শ্রবণনালী ছুঁয়ে হায়ার স্নায়ুর উপর এক অজানা শিহরণ নামিয়ে দেয়, সে আঁতকে উঠে তাকায় চারপাশে, যেন শব্দ নয়, কোনো অস্ত্র তাকে বিদ্ধ করল। তার ভালোবাসার মানুষটিকে মারতে চেয়েছিল ফারাবী? হায়া আশিয়ানের উন্মুক্ত পিঠ খামচে ধরে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কি বলছেন আপনি? ফারাবী ভাইয়া আপনাকে মারতে চেয়েছিল?
ঘামে ভেজা কপালে নরম এক চুম্বন এঁকে আশিয়ান কানে কানে এক মোলায়েম কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলপ–
—জ্বি আমার ভালোবাসা। আমার বার্থডের পরের দিন যেই এক্সিডেন্ট টা হয়েছিল না, সেটাও কিন্তু ফারাবীই করেছে। এমনকি আরো অনেক ঝামেলা তৈরি করতে চেয়েছে সে আমাদের মাঝে যেগুলো না বললেই নয়।
হায়া ভয় পেয়ে যায় আশিয়ানের কথাগুলো শুনে। ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। আশিয়ানের বহু নিকটে থেকেও সে ভয়ে কাঁপতে থাকে মৃদু করে। চিলেকোঠার ঘরের কয়েকটা জানালা আছে। সেই জানালা গুলো দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলো এসে ঘরটাকে আলোকিত করে তুলেছে।
আশিয়ান হায়ার শরীরের মৃদু কম্পন ও আবছা আলোয় তার আতঙ্কিত মুখখানা সন্তর্পণে অবলোকন করে। তাদের এই স্পেশাল মুহূর্তে হায়ার ভয় নয় তার ভালোবাসা চায় আশিয়ান। তাই তো সে নিজ পন্থা অবলম্বন করে হায়ার ভয় দূর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হায়াও একসময় নিজের ভয় ভুলে আশিয়ানের পাগল করা ভালোবাসার ডুবে যায়। ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে হায়া শুধু একটা কথাই শুনতে পায়–
—আমার একটা ছোট্ট প্রিন্সেস চাই হায়া প্লিজ। আমার ঘর আলোকিত করার জন্য আরেকটা হায়া লাগবে আমার।
__________________________
জাহান রুমে এসে আঁতকে উঠে। অস্থির ও হতভম্ব গলায় বলে উঠে–
—হায় আল্লাহ! আমার বউ কই?
শব্দসংখ্যা~২১১১
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]